"ভালোবাসি পিয়াস ভাই! আমি তোমাকে ভালোবাসি!" হাতে থাকা টকটকে লাল গোলাপটি পিয়াসের দিকে বাড়িয়ে দিয়ে এক নিশ্বাসে কথাটি বলে ফেলল রুহি।
রুহি খন্দকার বাড়ির সকলের আদরের ছোট কন্যা, পুরো নাম #আরোহী_জামান_রুহি আর তার সামনে যে সুঠাম দেহী যুবক দাড়িয়ে সে হলো খন্দকার পরিবারের দ্বিতীয় বড় সন্তান #খন্দকার_শাহরিয়ার_পিয়াস।
রাতের ঝাপসা ম্লান আলোয় ছাদের এক কোণে দাঁড়িয়ে আছে রুহি। তার নবকিশোরী অপরিণত মনে আজ হাজারো প্রজাপতির ওড়াউড়ি। সামনে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটি— পিয়াস, যার জন্য রুহির ব্যাকুল মনের প্রতিটি কোনে সর্বদা এক অদ্ভুৎ অনুভূতি বরাদ্দ থাকে।
ভালোবাসি কথাটা বলার সাথে সাথেই রুহির সারা মুখমন্ডলে একরাশ লজ্জার আভা ছড়িয়ে পড়ল। তার ফর্সা গাল দুটো অপার্থিব লাল রঙে রাঙানো। মাথা নিচু করে নিজের পায়ের নখের দিকে তাকিয়ে রইল সে। পিয়াস কিন্তু একদম স্বাভাবিক। তার চোখের পলক পর্যন্ত নড়ছে না, যেন রুহি এমন কিছু বলবে সেটা সে আগে থেকেই জানত।
রুহি মনে মনে তখন নিজের ব্যাকুলতার জাল বুনছে। ভাবছে, পিয়াস ভাই কি রাগ করল? নাকি সেও ভালোবাসে? আবার মনের কোনে সুপ্ত অনুভুতিরা জানান দিচ্ছে, বিগত বেশ কিছুদিন ধরে সে তো পিয়াসের ব্যবহার দেখছে অনুভব করছে তাহলে ভয় কিসের। হঠাৎই পিয়াস পা বাড়াল। রুহির খুব কাছে এসে দাঁড়াল সে। নিস্তব্ধতার বুক চিরে পিয়াস তার লম্বা আঙুল দিয়ে রুহির থুতনিটা স্পর্শ করল। পরম মমতায় রুহির নত মাথাটা উপরে তুলল সে।
চারটি চোখ এক হলো। রুহির চোখ চকচক করছে খুশিতে, আর পিয়াসের চোখে এক রহস্যময় শীতলতা। পিয়াস ফিসফিস করে বলল,
— "ফুলটা কি আমার জন্য এনেছিস?"
রুহি কোনো কথা বলতে পারল না। ঠোঁটের কোণে এক চিলতে তৃপ্তির হাসি নিয়ে শুধু মাথা নেড়ে 'হ্যাঁ' জানাল। পিয়াস মৃদু হেসে আবার বলল,
— "ফুলটা আমি এক শর্তে নেব। যদি তুই হাঁটু গেড়ে একদম প্রোপোজ করার মতো করে আমাকে এটা দিস।"
রুহি এক মুহূর্তও দ্বিধা করল না। তার প্রিয় মানুষটির থেকে এমন আবদার আসবে, তা সে কল্পনাও করেনি। পিয়াসের কথার বিপরীতে সে সাথে সাথেই হাঁটু গেড়ে ছাদের মেঝেতে বসে পড়ল। হাতের গোলাপটি সর্বোচ্চ আবেগ দিয়ে পিয়াসের দিকে বাড়িয়ে ধরল সে। পিয়াসও খুব সুন্দর করে ফুলটি গ্রহণ করল।
রুহির মনে হলো, আজ সে আকাশের চাঁদ হাতে পেয়েছে। তার এতদিনের জমানো ভালোবাসা সার্থক। পিয়াস ভাই তবে তাকে ফিরিয়ে দেয়নি!
কিন্তু রুহির এই সুখের তরী নিমেষেই ডুবে গেল এক বিকট শব্দে। অন্ধকার কোণ থেকে হুট করে বেশ কিছু মানুষের অট্টহাসি ভেসে এল। রুহির ভাবনার সুতো ছিঁড়ে গেল। সে হতবাক হয়ে দেখল, ছাদের অন্ধকার কোণাগুলো থেকে একে একে বেরিয়ে আসছে তার কাজিনরা— ফুফাতো বোন মিমি, সিমি, আর ফুফাতো ভাই সিফাত। সাথে চাচাতো ভাই কাব্য আর পিয়াসের কাছের বন্ধু সোহান। সবার মুখে বিদ্রূপের হাসি।
শুধু এক কোণায় দাঁড়িয়ে আছে তিন ভাইবোন— মুগ্ধকে কোলে নিয়ে রুবি আর রিমু। ছোট মুগ্ধ রুবির কোলে বসেই না বুঝেই বাকিদের সাথে তাল মিলিয়ে হাসছে আর বাকি দুজনের মুখে কোনো হাসি নেই, বরং সবার এই নিষ্ঠুর খেলা দেখে তারা গোমড়া মুখে চুপ করে দাঁড়িয়ে আছে। তারাও অবাক হয়ে এসব দেখছে, একটু আগেই মিলি তাদের মজার কিছু দেখানোর নাম করে এখানে এনেছিলো। দুজনের একজনও বুঝতে পারে নি এখানে এসে তারা এমন কিছু দেখবে ।
হঠাৎ করেই পিয়াস এবার রুহির দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে পেছনে দাড়িয়ে থাকা বাকিদের দিকে তাকাল। বিজয়ের হাসি হেসে চিৎকার করে বলে উঠল,
— "ডেয়ার ডান! দেখলি তো? কাজটা কত সহজ ছিল!"
'ডেয়ার' শব্দটা রুহির কানে এসে তপ্ত সিসার মতো বিঁধল। তার হাতের আঙুলগুলো যেন অবশ হয়ে এল। যে হাঁটু গেড়ে সে একটু আগে ভালোবাসার স্বীকৃতি চেয়েছিল, সেই হাঁটু দুটোই এখন কাঁপছে। তার মানে, এই সবকিছুই একটা বাজি ছিল? তার এতোদিনের পবিত্র ভালোবাসা কি তবে পিয়াস ভাই এর কাছে স্রেফ একটা বিনোদনের খোরাক?
রুহির চোখের সামনে পুরো পৃথিবীটা যেন ঘুরতে লাগল। তার লজ্জিত মুখটা মুহূর্তেই ফ্যাকাসে হয়ে গেল, যেন শরীর থেকে কেউ সবটুকু রক্ত শুষে নিয়েছে। সে ফ্যালফ্যাল করে পিয়াসের দিকে তাকিয়ে রইল, কিন্তু পিয়াসের চোখে এখন আর সেই মায়া নেই— সেখানে কেবল বাজি জেতার উল্লাস।
রুহি পাথরের মতো স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। পায়ের তলার ছাদটা যেন বনবন করে ঘুরছে। তার দুই চোখের মণি স্থির হয়ে আছে পিয়াসের ওপর। পিয়াস— যাকে সে তার আকাশের ধ্রুবতারা ভাবত, সেই মানুষটার চোখে এখন বিন্দুমাত্র করুণা নেই। পিয়াস এখন নিজের বন্ধুদের সাথে হাততালি দিতে ব্যস্ত, রুহির সেই ব্যাকুল চাহনি তার স্পর্শকাতর মনে কোনো রেখাপাতই করছে না।
এদিকে মিমি তার ফোনের স্ক্রিনটা সবাইকে দেখাচ্ছে। একটু আগে রুহি যে বুকভরা প্রেম নিয়ে হাঁটু গেড়ে বসে পিয়াসকে ফুলটা দিয়েছিল, তার প্রতিটি মুহূর্ত মিমি ভিডিও করে রেখেছে। সেই ভিডিও দেখে হাসির রোল উঠেছে ছাদ জুড়ে। রুহি বিস্ময়ে দেখল, তার এতদিনের লালিত আবেগ এখন একটা ডিজিটাল পর্দার সস্তা কৌতুক মাত্র।
মিমি হাসতে হাসতে পেটে খিল ধরিয়ে ফেলেছে। সে বাঁকা চোখে রুহির দিকে তাকিয়ে বলে উঠল,
— "আমাদের রুহিকে যে এত সহজে বোকা বানানো যায়, তা তো আমাদের ধারণাই ছিল না! ইশ, পিয়াস ভাইয়ার ফ্লাইটটা যদি আর দুদিন পর না হতো, তবে এই মজাটা আরও কয়েকদিন চালিয়ে নেওয়া যেত। জাস্ট আমেজিং ছিল সিনটা!"
মিমির কথা শেষ হতেই অট্টহাসির তোড়ে চারপাশের বাতাস যেন ভারী হয়ে উঠল। সেই হাসিতে কোনো বন্ধুত্ব ছিল না, ছিল এক নবকিশোরীর পবিত্র অনুভূতির প্রতি চরম বিদ্রূপ।
মিমির মুখে এমন কথা শুনে আরো একবার হোঁচট খেলো নবকিশোরী প্রানটি। এই পুরো পরিবারে একমাত্র মিমিই এমন একজন যে রুহির সমবয়সী এবং বান্ধবী স্বরুপ, একমাএ মিমির কাছে রুহির মনের সব কথা খোলা বইয়ের পৃষ্ঠা মতো ছিলো। রুহির বুঝতে বেশি সময় লাগলো না, যে সে চরম ভাবে ঠকেছে , খুব কাছের মানুষগুলোই তার নিষ্পাপ মনটাকে ভেঙে চুরে শেষ করেছে।
মিমির কথার শেষ হতেই পাশ থেকে কাব্য এবার পিয়াসের দিকে এগিয়ে এল। রুহির দিকে তাকিয়ে দাঁত কেলিয়ে হাসতে হাসতে সে বলল,
— "যে মেয়ে সারাদিন আমাদের নাকে দম করে রাখে, বকবক করে মাথা খেয়ে নেয় তাকে আজ এভাবে চুপ দেখে বেশ লাগছে রে! কী রে রুহি? আর আমাদের পেছনে লাগবি? আর বড়দের কাছে আমাদের নামে নালিশ দিবি? আমি প্রেম করি শুনে খুব তো চটাং চটাং করে বলেছিলি যারা প্রেম করে তারা ভালো না — তুই নাকি কখনো কারো প্রেমে পড়বি না! এখন তো দেখছি এমন প্রেমে পড়লি যে সোজা উষ্ঠা খেয়ে উপুড় হয়ে পড়লি!"
কাব্য হাসতে হাসতে পিয়াসের ঘাড়ে একটা থাপ্পড় মেরে বলে উঠল,
— "সাবাস ভাই! কী খেলটাই না দেখালি! পুরাই কুপোকাত!"
কাব্য এর কথার বিপরিতে পিয়াস ঘাড় এপাশ ওপাশ করে নাড়িয়ে বলে উঠে, — "শাহরিয়ার পিয়াস কখনো কোন চ্যালেন্জে হারতে শিখেনি কাব্য!"
রুহি দেখল, পিয়াসও কাব্যের কথায় মৃদু হাসছে। তার হৃদয় ভঙ্গ করে কি সুন্দর বড়াই করছে, সে একবারের জন্যও রুহির দিকে তাকিয়ে বলল না যে এতোক্ষণ তুই যা দেখেছিস রুহি সব ভুল ছিল। কিন্তু না এমন কিছুই হলো না, রুহির মনে হলো, তার বুকের ভেতরটা কেউ ধারালো কোনো অস্ত্র দিয়ে ক্ষতবিক্ষত করে দিচ্ছে। যে হাতটা দিয়ে পিয়াস একটু আগে তার থুতনি উঁচিয়ে ধরেছিল, সেই স্পর্শটা এখন তার কাছে বিষের মতো মনে হচ্ছে।
তার দুচোখ ছাপিয়ে জল আসতে চাইছে, কিন্তু সে প্রাণপণে তা আটকে রাখল। এই নিষ্ঠুর মানুষগুলোর সামনে সে নিজের কান্না বিসর্জন দিয়ে আর সস্তা হতে চায় না। কিন্তু পিয়াসের সেই 'ফ্লাইট' এর কথাটা তার মাথায় বাজছে। পিয়াস ভাই চলে যাবে? হে পিয়াস চলে যাবে দেখেই তো এতো সাহস করে তাকে মনের অনুভুতি জানানোর জন্য এতো আয়োজন করেছিলো, নিজের পছন্দের গাছের লাল গোলাপ তার জন্য যত্ন করে রেখেছিলো, আর তার প্রিয় মানুষটি যাওয়ার আগে তার মনের সাথে এমন একটা নোংরা খেলা খেলে গেল?
রুহির সেই লজ্জামাখা মুখটা এখন অপমানে নীল হয়ে গেছে। সে শুধু অস্ফুট স্বরে নিজের মনেই বলল, "কিছু প্রেম এভাবেই শেষ হয় ?"
পেছনের অট্টহাসিগুলো তীরের মতো রুহির পিঠে বিঁধছে। সে আর এক মুহূর্তও সেখানে দাঁড়িয়ে থাকার শক্তি পেল না। তার সেই লজ্জামাখা আরক্তিম মুখটা এখন ছাইয়ের মতো সাদা হয়ে গেছে। কোনো প্রতিবাদ নয়, কোনো চিৎকার নয়; রুহি অত্যন্ত ধীর পায়ে ছাদের সিঁড়ির দিকে এগিয়ে গেল। প্রতিটি সিঁড়ি ভাঙার সময় তার মনে হচ্ছিল, সে তার শৈশব আর বিশ্বাসকে ওই ছাদেই ফেলে যাচ্ছে। পেছনে তখনো শোনা যাচ্ছে মিমির উচ্চকণ্ঠ আর বাকিদের তাচ্ছিল্যভরা মন্তব্য।
রুহি অদৃশ্য হতেই রুবি ভিড় ঠেলে সবার সামনে গিয়ে দাঁড়াল। তার ছোট ছোট চোখদুটো রাগে জ্বলজ্বল করছে। পিয়াসের একদম সামনে গিয়ে তর্জনী উঁচিয়ে সে ধরা গলায় বলে উঠল,
— "কাজটা একদমই ভালো করলে না পিয়াস ভাই। কাজটা জঘন্য হয়েছে!"
হঠাৎ রুবির এই আক্রমণাত্মক ভঙ্গিতে হাসির রোলটা কিছুটা স্তিমিত হয়ে এল। পিয়াস ভ্রু কুঁচকে তাকাল। রুবি থামল না, সে আরও জোর গলায় বলতে লাগল,
— "ও ছোট মানুষ, ও সরল। সেদিন তোমরা লুকিয়ে সিগারেট খেয়েছিলি সেই কথাটা ও সবার সামনে বলে দিয়েছিল বলে তোমরা ওর সাথে এমন করলে? তোরা তো জানিসই ও একটু বেশি কথা বলে, একটু চঞ্চল। তাই বলে একটা নিষ্পাপ মনের ভালোবাসা নিয়ে এভাবে ফালতু খেলা খেলার কোনো মানে আছে? তোমরা সবাই মিলে একটা মেয়েকে এভাবে ঠকালে!"
পিয়াসের চেহারায় এবার বিরক্তির ছাপ স্পষ্ট। সে পকেট থেকে ফোনটা বের করতে করতে অবহেলার সুরে বলল,
— "ছোটদেরকে সবসময় ছোটদের মতো থাকতে হয় রুবি। অত জ্ঞান দিস না। আর আমাদের মধ্যে এসব দুষ্টুমি নতুন কিসের! আর রুহির কথা বলছিস ছোট চাচ্চুর আদর পেয়ে পেয়ে ও বেশি মাথায় উঠে নাচছিল। সবার সামনে আমাদের হাঁড়ি ভেঙে দেবে আর আমরা কিছু বলব না? ওকে একটু সায়েস্তা করা খুব প্রয়োজন ছিল। আর এটা একটা মজা ছিলো মাএ। এসব প্রেমট্রেম ওর ওই বিচ্ছু মাথায় ডুকবেনা। "
পিয়াশের কথা থামতেই পাশ থেকে মিলি হাসতে হাসতে বলে ওঠে, — "এবার অন্তত এই ভিডিওটা সবাই দেখবে, সেই ভয়ে হলেও রুহি নিজের স্বভাবে কিছু পরিবর্তন আনবে। বেশি চটাং চটাং করাটা এবার বন্ধ হবে ওর।"
রুবির খুব ইচ্ছে করছিল মিলিকে কিছু কড়া কথা শুনাতে সেই সাথে পিয়াসের হাতে থাকা ফুলটা কেড়ে নিয়ে ছিঁড়ে ফেলতে, কিন্তু সে পারল না। সে শুধু দেখল, একদল তথাকথিত শিক্ষিত আর বড় ভাইবোনেরা মিলে কীভাবে একটা ১৫ বছরের কিশোরীর আত্মবিশ্বাসকে চূর্ণবিচূর্ণ করে দিল।
কিছুক্ষন পরেই পিয়াস ছাদ থেকে নেমে নিজের রুমে চলে আসলো, রুহি এতোক্ষন তার রুমের পাশেই লুকিয়ে দাড়িয়ে ছিলো, পিয়াস রুমে প্রবেশ করতেই রুহি উন্মাদের মতো তার পিছু পিছু ঘরে ঢুকল। পিয়াস তাকে দেখে ভ্রু কুঁচকালো, রুহির চোখে তখন পানিতে টইটম্বুর । পিয়াস আলমারি থেকে নিজের প্যাকিং করা ব্যাগটা গোছাতে গোছাতে অত্যন্ত স্বাভাবিক গলায় বলল,
— "আবার কেন এসেছিস? শোন, কান্না করতে হবে না! ভিডিওটা ডিলিট করে দেব, টেনশন নিস না। ওটা স্রেফ একটা মজা ছিল, তুই তো জানিসই আমরা এমন মজা মাঝেমধ্যেই করি।"
রুহির কানে পিয়াসের কোনো কথাই ঢুকছিল না। তার মাথায় তখন রক্ত বইছে, শিরা-উপশিরায় কেবল পিয়াসকে হারানোর ভয়। কোনো কিছু না ভেবেই সে পিয়াসকে সজোরে জড়িয়ে ধরল। পিয়াস হকচকিয়ে গেল, রুহির এমন আকস্মিক আচরণ সে কল্পনাও করেনি। রুহি আর্তনাদ করে কেঁদে উঠল,
— "আমি তোমাকে সত্যিই ভালোবাসি পিয়াস ভাই! এটা আমার কাছে কোনো মজা ছিল না। তুমি কি আমায় একটুও ভালোবাসো না? আমাকে এভাবে ফিরিয়ে দিও না, প্লিজ!"
পিয়াস রুহিকে নিজের থেকে ছুটাতে চাইছে, কিন্তু এতে করে রুহি তাকে আড়ো জোড়ে আকড়ে ধরছে, এবার পিয়াশ রাগে হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে ফেলল। গায়ের জোরে রুহিকে নিজের থেকে ছাড়িয়ে নিল সে। রাগে গর্জে উঠে বলল,
— "বেয়াদবির একটা সীমা আছে রুহি! তুই শুধুমাত্র আমার ছোট বোন, এর বাইরে কোনো কিছুই না। তোকে কতবার বলব যে এটা জাস্ট একটা 'ডেয়ার' ছিল? ভাইবোনদের মধ্যে এমন খুনসুটি হতেই পারে, এটাকে এত সিরিয়াসলি নেওয়ার কী আছে?"
রুহি তখন হিতাহিত জ্ঞানশূন্য। সে আবার পিয়াসের হাত আঁকড়ে ধরল। তার চোখের জল গাল বেয়ে টপটপ করে পড়ছে। চিৎকার করে সে বলল,
— "না! আমি কিচ্ছু শুনতে চাই না। আমি তোমাকে ভালোবাসি, ব্যস এতটুকুই! তোমাকেও আমাকে ভালোবাসতে হবে!"
রুহির এই জেদ আর উচ্চকণ্ঠ পিয়াসের ধৈর্য চ্যুতি ঘটাল। কোনো কিছু বুঝে ওঠার আগেই পিয়াস নিজের ডান হাতটা সজোরে রুহির গালে বসিয়ে দিল। সেই চড়টা এতটাই জোরালো ছিল যে রুহি টাল সামলাতে না পেরে ছিটকে গিয়ে খাটের কোণায় পড়ল। খাটের কোণার সাথে মাথায় আঘাত লাগতেই রুহির কপালের একপাশে হালকা কেটে রক্ত গড়িয়ে পড়ল।
রুহি স্তব্ধ। গালের জ্বালা ছাপিয়ে তার কপালের রক্ত নয়, বরং মনের রক্তক্ষরণ তখন তীব্র। সে হতভম্ব চোখে পিয়াসের দিকে তাকাল। যে হাতটা পরম যত্নে তার মাথায় থাকবে ভাবত, সেই হাতটা আজ তার গায়ে এভাবে উঠল? পিয়াস তখনো থামেনি, সে ঘৃণার স্বরে বিষ উগড়ে দিতে লাগল:
— "তুই ভাবলি কী করে যে তোকে আমি ভালোবাসব? তোর মধ্যে আছেটা কী ভালোবাসার মতো? নেহাৎ ভাগ্য করে এই বংশে জন্মেছিস, তাই আমাদের বোন হতে পেরেছিস; নাহলে তো তুই আমাদের বোন হওয়ার যোগ্যতাও রাখিস না। সারাদিন ছেলেদের মতো পোশাক পরে ঘাসফড়িংয়ের মতো লাফিয়ে বেড়াস। দেখতে একদম আনাড়ি আর ক্ষ্যাত লাগে তোকে। আর তুই ভাবিস আমি তোকে ভালোবাসবো? কাজিনদের মাঝে ভালোবাসতে হলে স্মার্ট কাউকে বাসবো যেমন সিমি, সিমির মতো কাউকে ভালোবাসব। সিমিকে কখনো দেখেছিস? শুধু গায়ের রঙ ধবধবে সাদা হলেই হয় না, স্মার্টনেস বলে একটা কথা আছে। তোরতো দুটোর কোনটাই নেই! তাই তোকে এসব বুঝিয়েও লাভ নেই, তোর সেই জ্ঞান থাকলে আমাকে এভাবে বিরক্ত করতি না!"
রুহির মনে হলো, তার পায়ের তলা থেকে মাটি সরে গেছে। তার স্মার্টনেস নেই, সে ক্ষ্যাত— এই কথাগুলো পিয়াসের চড়ের চেয়েও হাজার গুণ বেশি ব্যথার সৃষ্টি করল। তার মনে হলো তার জীবনের সবটুকু সৌন্দর্য এখন যেন ভাঙা কাঁচের মতোই বিদীর্ণ।
রুহি তখনো স্তব্ধ হয়ে পিয়াসের দিকে তাকিয়ে দাঁড়িয়ে আছে, এবার রুহি কাঁপা কন্ঠে পিয়াস কে বলে উঠলো, "তাহলে তুমি কখনো আমাকে ভালোই বাসোনি"।
তখনই পিয়াস বিরক্তি কন্ঠে বলে "নাহ",
তাহলে ও সব কিছু কি ছিলো পিয়াস ভাই। আমাকে এতো গিফ্ট ঘুরতে নিয়ে যাওয়া, সব সব কি একটা খেলার অংশ?
পিয়াস স্বাভাবিক ভাবেই উত্তর দিলো, একদম তুই কি বেশি কিছু আশা করেছিলি। আসলে তোর থেকে এর বেশি আশাই বা কি করা যায়, পড়ালেখায় ও তো অষ্টরম্ভা, কোন মতে টেনেটুনে পার করিস। রুবি, মিমি, সিমি ওদের দেখেছিস, ওদের রেজাল্ট দেখেছিস ফেল টুস কোথাকার।
পিয়াসের কথার বিপরীতে এবার রুহি এক প্রকার চিৎকার করে বলে , " তুমি আমাকে আঘাত করেছ, আমি কখনো ভুলবো না! তুমি খুব খারাপ পিয়াস ভাই খুব খারাপ।
রুহির এমন চেঁচানোতে পিয়াস দরজার দিকে ইশারা করে দাঁতে দাঁত চেপে বলে ওঠে
— "বের হ আমার রুম থেকে! আর দুটো দিন দেশে আছি, পরিবারের সাথে শান্তিতে থাকতে চাই। নিজের এই অপয়া মুখটা দেখিয়ে আমার মেজাজ আর দিনগুলো নষ্ট করিস না।"
সে অপয়া এটাই হয়তো শোনার বাকি ছিলো — রুহি আর কোন বাক্য ব্যয় করলো না। মাথা নিচু করে, এক হাত দিয়ে কপাল চেপে ধীর পায়ে রুম থেকে বেরিয়ে এল। তার বিধ্বস্ত মনের হাহাকার আর অপমানের তপ্ত নিঃশ্বাস সারা ঘরে বিষবাষ্পের মতো ছড়িয়ে রইল। আজ থেকে রুহি নামের সেই চঞ্চল মেয়েটা চিরতরে ওই ঘরেই যেন মারা গেল।
★★★
এদিকে নিজের ঘরে এসে দরজা আটকে দেয় রুহি। আয়নার সামনে গিয়ে দাঁড়াতেই নিজের প্রতিবিম্ব দেখে তার ঘৃণা হতে লাগল। এই সেই মুখ, যা একটু আগে পিয়াস ভাই পরম যত্নে তুলে ধরেছিল? এই সেই ঠোঁট, যা দিয়ে সে ভালোবেসে প্রস্তাব দিয়েছিল?
হঠাৎ রুহি পাগলের মতো নিজের ড্রেসিং টেবিলের ওপর রাখা কাঁচের শোপিসটা ছুঁড়ে মারল আয়নার ওপর। ঝনঝন শব্দে আয়নাটা ভেঙে চুরমার হয়ে গেল। রুহির মনের ভেতরের চঞ্চল মেয়েটা আজ ঠিক এভাবেই ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে গেছে। যে রুহি সারাবাড়ি হাসিয়ে বেড়াত, সেই রুহির চোখে এখন এক অদ্ভুত শূন্যতা আর প্রতিশোধের কাঠিন্য।
সেনিজের প্রতিবিম্ব দেখেই তাচ্ছিল্যের হাসি হেসে মনে মনে প্রতিজ্ঞা করল, পিয়াস ভাইয়ের দেওয়া এই শিক্ষা সে কোনোদিন ভুলবে না। আজ থেকে রুহি আর কারো কাছে নালিশ করবে না, কারো ওপর রাগ করবে না। আজ থেকে রুহি হবে এক পাথরখণ্ড, যাকে ছোঁয়া যায় কিন্তু ভাঙা যায় না।
কাচ ভাঙার আওয়াজে এতোক্ষণে রুমের বাহিরে রুবি ও রিমু এসে দাড়িয়েছে, তারা বারবার দরজায় আঘাত করে রুহিকে খুলতে বলে যাচ্ছে।,
" এই রুহি দরজা খোল না বনু, কি ভেঙ্গেছিস, রুবির কন্ঠে অসহায়ত্ব। রিমুও এবার অনুনয় করে বলে, " ছোটমাকে বলবোনা তাও দরজাটা খুল হুতুম পেচা।" দু বোনের সাথে ছোট মুগ্ধ ও নিজের কোমল হাত দিয়ে দরজায় আঘাত করে বোনকে ডাকছে।
রুহি জানে সে নিরব থাকলে এই দুই মানবী এখান থেকে নড়বে না। তাই সে নিজেকে স্বাভাবিক রেখে বলে উঠলো, " আমি ঠিক আছি আপু, তোমরা যাও আমরা ঘুম পাচ্ছে, আর আজ আমি একাই ঘুমাবো! ডিস্টার্ব করো না।
রুহির কথা এতোটা ঠান্ডা দেখে রুবি ও রিমু দুজনই ভাবলো হয়তো ছাদের ব্যাপারটায় রুহির মনে তেমন কোন আঘাত পড়েনি। তাও সন্দেহ দূর করতে রুবি আবারও জিজ্ঞেস করলো "বনু তুই কি সত্যি ঠিক আছিস?"
রুহি যথাসম্ভব নিজের আবেগ চেপে রেখে বলে ওঠে, হে একদম ঠিকাছি, কি হবে আমার! আর তোমরা আমাকে বিরক্ত করো না ঘুম পাচ্ছে আমার।
রুহির কথায় দুজনই স্থান ত্যাগ করলো, আর অন্যদিকে রুহি অন্ধকার রুমে একরাশ অভিযোগ ও ভঙ্গুর আবেগ নিয়ে চোখের নোনাজল জমিয়ে বসে রইলো।
চলবে_________
#অন্তহীন_প্রেম_আমার
#আফীফা_আফনান
#সূচনা_পর্ব