#অন্তহীন_প্রেম_আমার
#আফীফা_আফনান
#পর্ব_০৫
[কপি করা নিষিদ্ধ]
রাত এগারোটা। কৃষ্ণপক্ষের এই নিশীথে প্রকৃতির বুকে যেন এক মায়াবী নিস্তব্ধতা নেমে এসেছে। গ্রীষ্মের তপ্ত দিন শেষে রাতটা এখন কিছুটা শীতল, তবে গুমোট ভাবটা একদম কেটে যায়নি। জানালার বাইরে ঝিঁঝিঁ পোকার একঘেয়ে ডাক আর দূর থেকে ভেসে আসা নাম না জানা নিশাচর পাখির পাখসাট—সব মিলিয়ে পরিবেশটা এক অপার্থিব গাম্ভীর্য ধারণ করেছে।
এই নিভৃত প্রহরে খন্দকার বাড়ির দোতলার এক কোণে টেবিল ল্যাম্পের ম্লান আলোয় জ্বলজ্বল করছে একটি প্রাণ। আরোহী জামান রুহি। আজ সে দিন-দুনিয়া ভুলে নিজের সাথে করা নিজেরই প্রতিজ্ঞায় মগ্ন। গত কয়েক মাসে যে বইগুলোর দিকে সে ভালোভাবে ফিরেও তাকায়নি, আজ সেই বইয়ের প্রতিটি পাতায় সে জীবনের অর্থ খুঁজছে। সব কিছু যে সে খুব ভালো বুঝতে পারছে তা নয়, কিন্তু তার অদম্য চেষ্টা আর একাগ্রতা আজ রিমু ও রুবিকেও অবাক করে দিয়েছে। দুই বোন রুহিকে সাহায্য করতে গিয়ে বারবার বিস্ময়ে থমকে গেছে—যে মেয়েকে আগে এক পাতা পড়াতে ঘাম ছুটে যেত, সে আজ প্রশ্নবানে তাদের জর্জরিত করে তুলছে।
নাসরিন বেগম একটু পরপরই এসে দরজার আড়াল থেকে উঁকি দিয়ে গেছেন। যতবার এসেছেন, ততবারই দেখেছেন মেয়েটি পাথরের মূর্তির মতো পড়ার টেবিলে ঝুঁকে আছে। তার বুকটা আজ এক অজানা সুখে যেন ভরে উঠেছে। নিজের একমাত্র ননদের কথায় কথায় সেই বিষাক্ত শব্দগুলো তার কানে বাজছিল—মিমি নাকি রুহির সাথে মিশে বিগড়ে যাচ্ছে! অথচ নাসরিন বেগম ভালো করেই জানেন, রুহি যে বখে গিয়েছিল তা মিমির ছায়ার নিচে থেকেই। আজ রুহির এই একনিষ্ঠা যেন সেই সব অপবাদের মোক্ষম জবাব।
ঘড়ির কাঁটা সময়ের নিয়ম মেনে এগোচ্ছে। একটানা বসে থাকায় রুহির পিঠে একটা চিনচিনে ব্যথা শুরু হয়েছে। সন্ধ্যার নাস্তা খেয়েছে এরপর থেকেই সে পড়াশোনাতে মগ্ন।, পড়ার ঘোরে ভুলেই গিয়েছিল যে নাছরিন বেগম তার জন্য রাতের খাবার রেখে গেছেন। রুহি এক পলক দেয়ালে টাঙানো ঘড়িটার দিকে তাকালো, টেবিলের পাশে রাখা ভাতের থালা থেকে ঢাকনা খুলতেই দেখল সব ঠান্ডা হয়ে আছে। এত রাতে সেই ঠান্ডা খাবার খাবে, অন্যদিকে খিদের তীব্র জ্বালা বড়ছে । অতপর পেটের দায়ে সে এবার চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ালো।
সাবধানে দরজার কপাট খুলে বাইরে উঁকি দিল রুহি। বাড়ির নীলচে ডিম লাইটের আবছা আলোয় চারপাশটা হালকা উজ্জ্বল হয়ে আছে। রুহি পা টিপে টিপে সিঁড়ির দিকে এগোতে থাকে। কিন্তু সিঁড়ির গোড়ায় পৌঁছাতেই তার কান খাড়া হলো। অস্পষ্ট কয়েকটা কণ্ঠস্বর নিচ থেকে উপরে উঠে আসছে। রুহি ত্বরিত নিজেকে সিঁড়ির রেলিংয়ের আড়ালে লুকিয়ে ফেলল।
কণ্ঠস্বর গুলো পরিচিত। একটু পরেই সিঁড়ি দিয়ে উপরে উঠে আসতে দেখল সিফাত, কাব্য আর পিয়াসকে। এত রাতে তাদের একসাথে দেখে রুহি খুব একটু অবাক হলো না, কারণ তাদের রাত-বিরাতে এরকম আড্ডা প্রায় হয়ে থাকে। রুহি তাদের কথাতে বিশেষ একটা পাত্তা দিল না , কিন্তু হঠাৎই তাদের কথায় বুঝলো ভাইদের এই মধ্যরাতের আড্ডার মূলে আজ সে-ই , রুহি বেশ অবাক হলো, রুহি এবার মনোযোগ দিল তাদের কথা শুনতে।
কাব্যের কণ্ঠে আজ এক ধরণের অনুশোচনা। সে পিয়াসকে উদ্দেশ্য করে বলছে—
"বুঝলে ভাই, রুহির সাথে কাজটা আমাদের বোধহয় ঠিক হয়নি। ও তো আমাদের সবার ছোট। একটু পেট পাতলা বলে হয়তো কথাগুলো বলে ফেলেছিল, তাই বলে ওভাবে করাটা..."
কাব্যের কথার পিঠেই সিফাত পিয়াসের দিকে তাকিয়ে বলে উঠলো, "রুহিটার যে কি হল বুঝতে পারলাম না, আচ্ছা পিয়াস, তোর কী মনে হয়? আমাদের রুহি কি পারবে সেই শর্ত পূরণ করতে? ও কি সিক্সটি পার্সেন্ট নম্বর রাখতে পারবে?"
রুহি অন্ধকারের আড়ালে শ্বাস রুদ্ধ করে দাঁড়িয়ে রইল। সে অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছে—এই হৃদয়হীন মানুষটি তাকে নিয়ে কী ভাবে, তা শোনার জন্য।
পিয়াস সিফাতের প্রশ্নের উত্তরে এক তাচ্ছিল্য হাসি হাসল। অত্যন্ত তাচ্ছিল্যভরে সে বলে উঠল—
"আরে ভাই! গরুর গলায় স্বর্ণের ঘণ্টা পরিয়ে তাকে সুন্দর করে সাজালেই কি তার নাম বা জাত পরিবর্তন হয়ে যায়? গাধা কি কখনো ঘোড়া হতে পারে?"
কথাটা শোনামাত্র কাব্য আর সোহাগ হো হো করে হেসে উঠল। পিয়াস হাসতে হাসতে যোগ করল—
"সিক্সটি পার্সেন্ট তো অনেক দূরের স্বপ্ন, ও আদৌ পাশ করবে কি না আমার তাতেই সন্দেহ আছে। ও তো একটা ফাজিল মেয়ে, ওকে দিয়ে পড়াশোনা হবে না। দেখবি সেঝ আব্বু একদিন ওকে ভালো কোনো পাত্র দেখে বিয়ে দিয়ে দেবে। আমাদের মা-চাচিদের মতো চুলা আর রান্নাঘরেই ওর জীবনটা কাটবে।
এ বাড়ির বাকি সব মেয়েরা একরকম, আর ও অন্য রকম... পুরাই ডিসকাস্টিং! আমার তো মাঝে মাঝে সন্দেহ হয় আদো কি ও সত্যি রিমুর বোন! নাকি হসপিটাল থেকে চেন্জ হয়ে গেছে।"
পিয়াসের এ ধরনের মন্তব্যে বাকি দুজনের জন্য হাসি থামছে না, ওরা হাসতে হাসতে নিজের নিজের রুমের দিকে চলে গেল। রুহি স্থির দৃষ্টিতে তাদের চলে যাওয়ার পথের দিকে তাকিয়ে আছে। পিয়াসের শেষ বাক্যগুলো রুহির কানে যেন গলিত সীসার মতো বিঁধল। কিন্তু এবার তার দুচোখ দিয়ে জল পড়ল না। তার ভেতরে এখন এক প্রলয়ংকরী জেদ দানা বাঁধছে।
সে দাঁতে দাঁত চেপে নিজের মনেই ফিসফিস করে বলল—
"সিক্সটি পার্সেন্ট? না পিয়াস্সা ভাই। এই খন্দকার আরোহী জামান যদি পুরো স্কুলে টপার হয়ে না দেখিয়েছে, তবে আমি নিজের নাম বদলে ওই তোমার বলা ‘গরু’ নামটাই রাখব। দেখে নিও!"
রুহির চোখের সেই সংকল্পের দীপ্তি অন্ধকারের ওই নীলচে আলোকেও হার মানালো। সে আর রান্নাঘরের দিকে গেল না, বরং পেটের ক্ষুধা ভুলে এক আকাশ জেদ নিয়ে পুনরায় নিজের পড়ার টেবিলের দিকে পা বাড়াল।
রাতের সেই নিস্তব্ধ প্রহরে রুহি যখন একবুক জেদ নিয়ে নিজের রুমের দিকে ফিরে যাচ্ছিল, তখন সে ঘুণাক্ষরেও টের পায়নি যে অন্ধকারের আড়ালে কেউ তাকে লক্ষ্য করছে। ডিম লাইটের আবছা নীলচে আলোয় একটি দীর্ঘ ছায়া নিঃশব্দে রুহির প্রতিটি পদক্ষেপ অনুসরণ করছে। রুহির হঠাৎ মনে হলো কেউ যেন পেছনে দাঁড়িয়ে আছে। সে স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে পড়ল, এক অজানা শিহরণ বয়ে গেল তার মেরুদণ্ড দিয়ে। যেই না সে পেছনে ফেরার জন্য ঘাড় ঘোরাতে যাবে, অমনি সেই রহস্যময় অবয়বটি অত্যন্ত দ্রুততার সাথে পাশের দেওয়ালের আড়ালে নিজেকে লুকিয়ে ফেলল। রুহি পেছনে তাকিয়ে কাউকে দেখতে পেল না। শূন্য করিডোর আর নির্জীব দেওয়াল ছাড়া সেখানে আর কেউ ছিল না। একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে সে নিজের রুমে ঢুকে দরজা বন্ধ করে দিল।
********
পরদিন সকালে প্রকৃতির এক অপূর্ব রূপের মধ্য দিয়ে দিনের শুরু হলো। পুব আকাশে রক্তিম সূর্যটা তখন আপন মহিমায় উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে। জানালার বাইরে আমগাছের ডালে এক জোড়া দোয়েল আর ফিঙে পাখির কিচিরমিচির শব্দে ঘুম ভাঙল রুহির । ভোরের সেই স্নিগ্ধ হাওয়া যখন খন্দকার বাড়ির আঙিনায় লুটোপুটি খাচ্ছিল, তখন বাগান থেকে হাসনাহেনার ম ম ঘ্রাণ বাতাসে মিশে এক সতেজ আমেজ তৈরি করেছে। সকাল আটটা বাজতেই বাড়ির চিরচেনা কর্মব্যস্ততা যেন শুরু হয়ে গেল।
রান্নাঘরে তখন সাজসাজ রব। বাড়ির তিন গৃহিণী—তানজিনা, ইয়াসমিন আর নাসরিন বেগম অত্যন্ত মনোযোগের সাথে সকালের নাস্তা তৈরিতে ব্যস্ত। উনুন থেকে ধোঁয়া ওঠা গরম গরম রুটির সুবাস আর একপাশে ডিম ভাজার চড়চড় শব্দে ঘর মুখরিত। তানজিনা বেগম নিপুণ হাতে আটার লেচি কাটছেন, ইয়াসমিন বেগম সেগুলো বেলে দিচ্ছেন আর নাসরিন বেগম ঝটপট সেঁকে তুলছেন। কাজের মাঝেও তাদের নিচু স্বরে ঘরোয়া আলাপ চলছে।
রান্নাঘরের জানালার ফাঁক দিয়ে রোদের ঝিলিক এসে মেঝেতে জ্বলজ্বল করছে । এই রৌদ্রোজ্জ্বল দিনটি যেন এক নতুন সম্ভাবনার ইঙ্গিত বয়ে আনে। নাস্তা বানানোর তোড়জোড়ে ব্যাস্ত সময় পার করছে তিনজনই, দেখে মনে হচ্ছে এসবে তাদের পরম শান্তি।
ঘড়ির কাঁটায় তখন ভোর ৭:১৫। বাড়ির তিন গৃহিণী—তানজিনা, ইয়াসমিন আর নাসরিন বেগম নিজের কাজে মহাব্যস্ত। এমন সময় রান্নাঘরের দরজায় একটি ছায়া দাড়ালো।
— "মা!"
এতো সকালে রুহির কণ্ঠস্বর শুনে তিনজনেই চমকে দরজার দিকে তাকালেন। যা দেখলেন, তাতে তাদের নিজেদের চোখকেই বিশ্বাস হচ্ছিল না। সামনে স্কুল ইউনিফর্মে পরিপাটি হয়ে দাঁড়িয়ে আছে রুহি, কাঁধে তার স্কুল ব্যাগ। যে মেয়েকে সকাল ৯টার আগে বিছানা থেকে তোলা মানে যুদ্ধ জয় করা, সেই মেয়ে আজ ভোরে একদম প্রস্তুত! তিন মায়ের হাতের কাজ থেমে গেল, তারা পাথরের মূর্তির মতো রুহির দিকে তাকিয়ে রইলেন।
তাদের এমন বিমূঢ় চাহনি দেখে রুহি কিছুটা অপ্রস্তুত হয়ে পড়ল। নিজেকে সামলে নিয়ে সে নাসরিন বেগমকে উদ্দেশ্য করে বলে ওঠে ,
— "আম্মু, আমি টিউশনিতে যাচ্ছি।"
এবার যেন তিনজনের মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ল। রুহির টিউশনি জীবনের ইতিহাস বেশ করুণ। এর আগে যতজন টিচার তাকে পড়াতে এসেছেন, রুহির অতিরিক্ত অবান্তর প্রশ্ন আর দুষ্টুমিতে অতিষ্ঠ হয়ে তারা দু-তিন দিনেই ইস্তফা দিয়েছে। শেষমেশ কোন দিশাবিশা না পেয়ে নাসরিন বেগম নিজে পড়ানো শুরে করে আর বাকিটা সামলাতো রুহির শাহাজ ভাই। সেই রুহি আজ নিজ থেকে টিউশনিতে যাওয়ার কথা বলছে! নাসরিন বেগমের মনে হচ্ছিল তিনি খুশিতে এখনই চিৎকার করে উঠবেন।
তানজিনা বেগম অবাক হয়ে রুহিকে জিজ্ঞেস করলেন,
— "তোর টিউশনি কবে ঠিক করলো মা? তোর বড় আব্বু তো আমাকে কিছুই বলেনি!"
রুহি স্বাভাবিক গলায় উত্তর দিল,
— "ঠিক করেনি বড় আম্মু, আজ গিয়ে করব। আমাদের স্কুলের ওই টাকলা মুরাদ স্যার আছেন না? কথাটি বলেই রুহি থেমে গেলো, এরপরই খুবই সুন্দর করে বলে, মানে আমাদের ক্লাস টিচার মুরাদ স্যার , উনি তো ইংলিশ পড়ান। উনার কাছে গিয়ে বললেই উনি ব্যাচে নিয়ে নেবেন।"
এরপর রুহি তানজিনা বেগমের পেছনে চোখ বড় বড় করে দাড়িয়ে থাকা নাসরিন বেগমের দিকে তাকিয়ে বলে,
— "মা, কিছু টাকা দাও তো।"
নাসরিন বেগমের চোখ এবার বিস্ময়ে যেন আরও বড় হয়ে গেল। আগে তো রুহি টাকা চাইত না, ড্রেসিং টেবিল বা আলমারিতে যা পেত নিজের ইচ্ছামতো তুলে নিয়ে যেত। সেই ভয়ে নাসরিন বেগম টাকা লুকিয়ে রাা শুরু করেছিলেন। আজ মেয়ে হিসাব করে টাকা চাইছে দেখে তিনি যেন ঘোর কাটিয়ে উঠতে পারছেন না।
রুহি এবার অধৈর্য হয়ে আবার বলে,
— "মা, জলদি দাও! রিকশা ভাড়া আর টিফিন খরচ—সব হিসাব করে টাকা দিও।"
রান্নাঘরের একটি কোণায় ডালের কৌটোর মধ্যে ছোটদের যাতায়াত খরচের জন্য তিন নারীই কিছু টাকা জমা রেখেছে । নাসরিন বেগম সেখান থেকে ৫০ টাকার একটি নোট বাড়িয়ে দিলেন। রুহি বিনা বাক্যে টাকাটা নিয়ে চলে যেতে উদ্যত হতেই তানজিনা বেগম পেছন থেকে ডাকলেন,
— "কিরে নাস্তা করবি না? খালি পেটে যাবি?"
রুহি যেতে যেতেই জবাব দিল,
— "টিফিন পিরিয়ডে স্কুলে করে নেব বড় আম্মু। প্রথম দিনের টিউশনিতে দেরি হলে স্যার ভাববেন আমি রোজই দেরি করব। আসি!"
রুহি চোখের আড়াল হয়ে গেল, কিন্তু রান্নাঘরের সেই স্তব্ধতা কাটল না। তিন মা একে অপরের মুখের দিকে তাকিয়ে রইলেন—এ কি সত্যিই তাদের সেই অবাধ্য রুহি, নাকি অন্য কেউ?
*******
খন্দকার বাড়িতে দিনের দুটি সময় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ—সকাল আর রাত। এই দুই সময়েই পুরো পরিবারকে একসাথে ডাইনিং টেবিলে পাওয়া যায়। এটি কেবল আহারের সময় নয়, বরং সারাদিনের পরিকল্পনা আর মান-অভিমান ভাগাভাগি করে নেওয়ার শ্রেষ্ঠ মুহূর্ত। আজও তার ব্যতিক্রম হয়নি; পুরুষ সদস্যরা নিয়ম মেনে টেবিলে আসন গ্রহণ করেছেন, আর গৃহিণীরা ব্যস্ত হাতে ধোঁয়া ওঠা নাস্তা পরিবেশন করছেন।
ধোঁয়া ওঠা রুটি আর আলু ভাজির সুবাসে ডাইনিং টেবিল তখন ম ম করছে। বড় আব্বু মোস্তফা কামাল সাহেব তৃপ্তিভরে এক লোকমা মুখে তুলে হঠাৎ লক্ষ্য করলেন—সবার উপস্থিতি থাকলেও একটি চিরচেনা প্রাণবন্ত মুখ আজ নেই। তিনি খাওয়া থামিয়ে নাসরিন বেগমের দিকে তাকিয়ে পরম স্নেহে জিজ্ঞেস করলেন,
— "সেজ বউ, আমার রুহি মার চেয়ারটা খালি কেন? ও কি এখনো ঘুমাচ্ছে নাকি?"
নাসরিন বেগম মুখ খুলে হাসিমুখে কিছু বলবেন, ঠিক তখনই রুহির ফুফু পারভীন সুলতানা চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে টিপ্পনী কেটে উঠলেন,
— "এ আর নতুন কী ভাই! ঘুমাচ্ছেই হবে। এ বাড়ির সব সদস্যের জন্য নিয়ম এক রকম হলেও, আমাদের রুহি রানীর কাছে ওসব নিয়মের কোনো বালাই নেই।"
তিনি নাসরিন বেগমের দিকে তাকিয়ে খানিকটা ব্যাঙ্গাত্মক স্বরে যোগ করলেন,
— "একটু তো শাসন করতে পারো ভাবি। বয়স তো কম হচ্ছে না। এখন যদি না শেখে তবে কবে শিখবে? শাসন না করলে মেয়েটা তো মাথায় উঠবে।"
ননদের এমন ধারালো কথায় নাসরিন বেগমের উজ্জ্বল মুখটা মুহূর্তেই ফ্যাকাশে হয়ে গেল। একমাত্র আদরের ননদ বলে তিনি অপমানেও চুপ করে রইলেন। কিন্তু মোস্তফা কামাল সাহেব বোনের এমন কথা একদমই মেনে নিতে পারলেন না। তিনি সাথে সাথেই কড়া স্বরে বোনকে থামিয়ে দিলেন—
— "এভাবে বলছ কেন পারভীন? ও ছোট মানুষ। বয়স অনেক বাকি, সময় হলে ও ঠিকই সব শিখে যাবে। আর বাড়ির ছোটরা দুষ্টামি না করলে কি আমরা বুড়োরা করব?"
বড় ভাইয়ের ধমক খেয়ে পারভীন সুলতানা সাথে সাথেই দমে গেলেন। তিনি তবুও কিছু একটা বলতে নিতেই দাদী মমতাজ বেগম হাতের লাঠি দিয়ে মেঝেতে সজোরে শব্দ করে গম্ভীর কণ্ঠে বলে ওঠেন,
— "খাওয়ার সময় অতিরিক্ত কথা আমার পছন্দ না। চুপচাপ খা । নাসরিন বেগমের দিকে তাকিয়ে, সেজ বউ, যাও তো ওরে ডাইকা আনো।"
এবার তানজিনা বেগম পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে হালকা হেসে বলে ওঠেন , "মা, রুহি তো বাড়িতে নেই।"
কথাটা শোনামাত্র মোস্তফা কামাল সাহেবসহ টেবিলের প্রতিটি পুরুষ সদস্য অবাক হয়ে চাইলেন। শাহরিয়ার কবির সাহেব ভ্রু কুঁচকে জিজ্ঞেস করলেন, "রুহি বাড়ি নেই, কোথায় গেল সাতসকালে?"
এবার ইয়াসমিন বেগম বেশ উৎফুল্ল নিয়ে বলেন, "টিউশনিতে গেছে গো! সেই সাতটার দিকে রেডি হয়ে বের হয়ে গেছে।"
মুহূর্তেই যেন ডাইনিং টেবিলে এক অদৃশ্য ঘূর্ণিঝড় বয়ে গেল। মিমি আর সিমি দুই বোন একে অপরের দিকে তাকিয়ে আছে, —তাদের চোখেমুখে অবিশ্বাসের ঘোর। যে রুহি পড়াশোনার নামে বদনাম কামিয়েছিল, সে আজ ভোরে উঠে টিউশনি যাচ্ছে? কাব্যও হতভম্ব হয়ে খাবার হাতে নিয়ে মূর্তির মতো বসে রইল।
তবে পিয়াসের মনের ভেতর তখন অন্য রকম এক তোলপাড় চলছে। সেই রাতের অপমানের পর, যখন সে রুহিকে বলেছিল তার 'অপয়া চেহারা' না দেখাতে, তারপর থেকে রুহি সত্যিই তার সামনে আসেনি। ঘটনাক্রমে সামনে পড়ে গেলেও রুহি একবারের জন্য চোখ তুলে তাকায়নি, যেন পিয়াস সেখানে একটা অদৃশ্য ছায়া মাত্র। অথচ এই রুহিই এক সময় কারণে-অকারণে তার চারপাশে ঘুরঘুর করত, পিয়াসের একটু মনোযোগ পাওয়ার জন্য ব্যাকুল হয়ে থাকত। পিয়াস মনে মনে দাউদাউ করে জ্বলে উঠল। সে মনে মনেই ভাবছে—"আমাকে অদেখা করছে? শাহরিয়ার পিয়াসকে অবহেলা করার সাহস এই মেয়ে পায় কোত্থেকে? এ কি অপমান নাকি অন্য কিছু?"
এই বিশৃঙ্খল আলোচনার মাঝে একমাত্র শাহাজ একদম নির্বিকার। তাকে দেখে মনে হচ্ছে যেন পৃথিবীর কোনো খবরই তার কাছে মূল্যহীন, একমাএ খাবারই মুখ্য, সে অত্যন্ত ধীরস্থিরভাবে নাস্তা করছে, যেন এই সুস্বাদু আলুর স্বাদ নেওয়াই এখন তার জীবনের প্রধান লক্ষ্য।
******
স্কুলের বিশাল কৃষ্ণচূড়া গাছটার নিচে জিরিয়ে নিচ্ছে রুহি। ঝিরঝিরে বাতাসে ওর মনের ভেতরের অস্থিরতা আজ অনেকটা শান্ত। মুরাদ স্যারের টিউশনিতে ভর্তি হওয়ার কাজটা কোনো ঝামেলা ছাড়াই মিটে গেছে এটাই তার জন্য শান্তির বিষয়।
রুহি ভাবছে সকালের কথা, আজ সকালে যখন সে টিউশনিতে যায়, প্রথমে তাকে সাতসকালে স্যার নিজ বাড়ির দরজায় দেখে বেশ থতমত খেয়ে গিয়েছিলেন। চশমাটা নাকের ডগায় নামিয়ে জিজ্ঞেস করেছিলেন, "কী রে রুহি! তুই এই সময়ে এখানে? কোনো কাজে এসেছিস নাকি?"
রুহি যখন জানালো সে আজ থেকে নিয়মিত স্যারের কাছে ইংরেজি পড়তে চায়, তখন মুরাদ স্যার যতটা অবাক হয়েছিলেন, তার চেয়েও বেশি খুশি হয়েছিলেন। একে তো একজন ছাত্র বাড়া মানে মাসের শেষে কিছু বাড়তি টাকা, তার ওপর ক্লাসের সবচাইতে অবাধ্য মেয়েটি নিজে থেকে পড়তে এসেছে—এ তো বিরাট সাফল্য! তবে তিনি কড়া গলায় সাবধান করে দিয়েছেন, "পড়তে এসেছিস ভালো কথা, কিন্তু কোনো প্রকার দুষ্টুমি বা আজেবাজে কথা বললে সাথে সাথে ঘাড় ধরে বের করে দেব।" রুহি মাথা নিচু করে বিনীতভাবে সব মেনে নিয়েছিলো।
হঠাৎ স্কুলের ঘণ্টা বাজতেই রুহি সম্বিৎ ফিরে পেল। সে ধীর পায়ে ক্লাসরুমের দিকে পা বাড়ালো। ক্লাসে ঢুকতেই দেখল শেষ বেঞ্চে প্রিয়া বসে আছে। প্রিয়া আজ রুহিকে দেখে রীতিমতো অবাক কারন, মিমি আজ স্কুলে আসেনি, আর মিমি ছাড়া রুহি একা একা স্কুলে চলে আসবে—এটা প্রিয়ার কাছে অমাবস্যার চাঁদের মতো দুর্লভ ঘটনা।
প্রিয়াকে দেখামাত্রই রুহির কানে সেই রাতের ফোন কলের প্রতিটি বিদ্রূপাত্মক শব্দ বাজতে লাগল—'ভুটকি', 'ভ্যাবল', 'মানায় না পিয়াস ভাইয়ের সাথে'। রুহির বুকের ভেতরটা অপমানে একবার জ্বলে উঠল, কিন্তু সে নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করল। প্রিয়া অবশ্য আগের মতোই গদগদ হয়ে হাত নেড়ে রুহিকে তার পাশের সিটটা দেখিয়ে ইশারা করল।
কিন্তু প্রিয়াকে বজ্রাহতের মতো স্তব্ধ করে দিয়ে রুহি একদম সামনের সারির অর্থাৎ ফার্স্ট বেঞ্চের মাঝখানের সিটটাতে গিয়ে বসল। পুরো ক্লাস যেন থমকে গেল। যে রুহি আর প্রিয়া,মিমি ‘ব্যাকবেঞ্চার’ হিসেবে শিক্ষকসহ সবার কাছে পরিচিত ছিল, বকাঝকা, পড়া না পারলে কান ধরে বাহিরে দাঁড়িয়ে থাকা যাদের রুটিন ছিল, সেই রুহি আজ ফার্স্ট বেঞ্চে!
ক্লাস টিচার মুরাদ স্যার রুমে ঢুকে রুহিকে সামনের সারিতে দেখে চশমাটা একবার মুছে নিলেন। তিনি ভাবলেন হয়তো তিনি ভুল দেখছেন, স্যার চশমা আবারও চোখে রাখেন, আবারও তাকান, নাহ সত্যিই মেয়েটি আরোহী জামান,স্যার মনে মনে বললেন, মেয়েটাকি আজ ভুল করে এখানে বসেছে।
স্যার ক্লাস শুরু করেন, এরপরেই তিনি আরো অবাক হস, কারন রুহি ক্লাসের পুরোটা সময় স্যারের প্রতিটি কথা গোগ্রাসে গিলছিল, তার পুরো মনোযোগ আজ মুরাদ স্যারের টপিকের মধ্যে। যেখানেই ওর বুঝতে সমস্যা হচ্ছিল, সে নির্ভয়ে দাঁড়িয়ে প্রশ্ন করে উত্তর বুঝে নিচ্ছিল। রুহির এই আকস্মিক পরিবর্তন প্রিয়া থেকে শুরু করে ক্লাসের প্রতিটি ছাত্রছাত্রীর কাছে যেন এক জীবন্ত বিস্ময়।
রুহি মনোযোগ দিয়ে পরপর কয়েকটি ক্লাস শেষ করে। স্যার যেতেই টিফিন পিরিয়ডে প্রিয়া যখন রুহির কাছে এসে কৈফিয়ত চাইল, "কিরে রুহি তোর হলো টা কি, আজ এখানে বসলি, আর এতো মনোযোগ!"
তখন রুহি কেবল ডায়েরিটা গুছিয়ে রাখছিলো, কাজটি করতে করতে শান্ত গলায় বলল, "সময় বদলাচ্ছে প্রিয়া, তাই অভ্যাস বদলানো তো খুব সামান্য ব্যাপার।" এই বলেই রুহি রুম থেকে বেরিয়ে গেলো।
প্রিয়া যেন হোচট খেলো। সে হা করে রুহির যাওয়া দেখছে, যেন আজ এক নতুন রুহিকে আবিষ্কার করলো সে।
*********
দুপুর ১২.৩০ টা। মাথার ওপর সূর্যটা যেন আজ অগ্নিকুণ্ড হয়ে দাঁড়িয়েছে। গ্রীষ্মের খাঁ খাঁ রোদে পিচঢালা রাস্তা থেকে যেন আগুনের হল্কা বের হচ্ছে। গাছের পাতাগুলো তপ্ত বাতাসে নিথর হয়ে ঝুলে আছে, কোথাও কোনো শীতলতার চিহ্ন নেই। প্রখর রৌদ্রে চারদিকের দৃশ্যপট যেন কাঁপছে। আজ ভোরে রুহি রিকশা করে স্কুলে এসেছিল, ফেরার পথেও ভেবেছিল রিকশা পাবে। কিন্তু স্কুলের গেটের সামনে দীর্ঘক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকার পরও কোনো খালি রিকশা না পেয়ে বাধ্য হয়েই সে হাঁটতে শুরু করল।
মাথার ওপর আগুনের গোলক আর পায়ের নিচে তপ্ত রাস্তা। রুহি কিছুটা দূর এগোতেই হঠাৎ থমকে দাঁড়াল। রাস্তার ওপাশে কবির সাহেবের সাদা চকচকে গাড়িটা দাঁড়িয়ে আছে। গাড়ির পাশে পিয়াস, সিমি আর মিমি দাঁড়িয়ে আইসক্রিম খাচ্ছে। ওদের হাসাহাসির শব্দ রুহির কান পর্যন্ত পৌঁছাচ্ছে। পিয়াস কত সহজভাবে সিমি আর মিমির সাথে কথা বলছে, অথচ এই মানুষটাই রুহিকে দেখার পর বিষোদগার করে।
রুহি একদৃষ্টিতে ওদের দিকে তাকিয়ে রইল। রোদ আর মনের ভেতরের দহন—সব মিলিয়ে হঠাৎ ওর চোখের সামনে সবকিছু ঘোলাটে হয়ে আসতে লাগল। ঘামে ওর কপাল আর পিঠ ভিজে একাকার। মনে হলো চারদিকের তপ্ত বাতাস ওর দম বন্ধ করে দিচ্ছে। এক মুহূর্ত... রুহির পা দুটো টলতে শুরু করে, পৃথিবীটা যেন লাটিমের মতো ঘুরছে। সে যখন জ্ঞান হারিয়ে মাটির দিকে লুটিয়ে পড়তে যাচ্ছিল, ঠিক তখনই এক জোড়া শক্ত হাত পেছন থেকে তাকে জাপ্টে ধরে।
রুহি কোনোমতে চোখ মেলে তাকানোর চেষ্টা করল। ঘামে ভেজা চোখের পাতায় ঝাপসা অবয়বটি স্পষ্ট হতেই সে দেখল—শাহাজ ভাই! শাহাজের চোখেমুখে আজ গাম্ভীর্য নয়, বরং উপচে পড়া উদ্বেগ। সে পরম যত্নে রুহিকে আগলে রেখেছে।
শাহাজ রুহিকে পাঁজাকোলা করে রাস্তা থেকে সরিয়ে একটি গাছতলার ছায়াযুক্ত স্থানে নিয়ে বসালো। ওর ফ্যাকাসে মুখের দিকে তাকিয়ে অত্যন্ত বিচলিত কণ্ঠে জিজ্ঞেস করল—
— "রুহি! ঠিক আছিস তুই? শরীর এমন খারাপ লাগছে কেন তোর? আর এই ভর দুপুরে এখানে একা একা কী করছিস?"
রুহি কোনো উত্তর দিতে পারল না। ওর কথা বলার শক্তিটুকুও যেন নিভে গেছে। সে শুধু ক্লান্তিতে চোখ বন্ধ করে মাথা নাড়াল। শাহাজ ওর মুখের ওপর হাত বুলিয়ে কপালে জমে থাকা ঘাম মুছে দিল। রুহির ঠোঁট শুকিয়ে সাদা হয়ে গেছে দেখে শাহাজ তীক্ষ্ণ গলায় আবার প্রশ্ন করল—
— "সকালে কিছু খেয়েছিলি?"
রুহি নিরব। ওর এই নীরবতাই বুঝিয়ে দিল যে সকাল থেকে সে কিছু খায়নি । রুহি কিছু না খাওয়ায় এবং দীর্ঘক্ষণ রোদে হাঁটার ক্লান্তিতে ওর শরীর ভেঙে পড়েছে। শাহাজ আর এক মুহূর্ত দেরি করল না। সে রুহিকে সাবধানে ধরে দাঁড় করিয়ে পাশের একটি এসি রেস্টুরেন্টে নিয়ে ঢুকল। ঠাণ্ডা বাতাসের স্পর্শে রুহি যেন প্রাণ ফিরে পেল।
শাহাজ রুহিকে একটি চেয়ারে বসিয়ে গ্লাসে পানি ঢালতে ঢালতে গম্ভীর কিন্তু মমতা মাখানো স্বরে বলল—
— "পরিবর্তন হওয়া ভালো রুহি, কিন্তু শরীর শেষ করে নয়। কাল থেকে যদি না খেয়ে বেরিয়েছিস তো থাপরিয়ে দাত ফেলে দেবো,"
রুহি নড়ে চড়ে বসলো, শাহাজের এই রাগকে সে সর্বদাই ভয় পায়, রুহি কে এভাবে নড়তে দেখে শাহাজ আবারো বলে ওঠে, "এখানে চুপচাপ বসে থাক, খাবার আসছে।"
খাবার আসতে আসতেই রুহি আনমনে রেস্টুরেন্টের জানালার কাঁচ দিয়ে বাইরে তাকালো, দেখল পিয়াসরা এখনো গাড়ির পাশে হাসাহাসি করছে। কিন্তু এই প্রথম রুহির বুকটা হাহাকার করে উঠল না। কারণ, আজ পিয়াসের অবহেলার মাঝেও শাহাজ ভাইয়ের এই পরম নির্ভরতা ওকে যেন এক নতুন শক্তি দিচ্ছে।
রেস্টুরেন্টের শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত স্নিগ্ধ পরিবেশে ওয়েটার যখন ধোঁয়া ওঠা এক প্লেট সুগন্ধি বিরিয়ানি রুহির সামনে রেখে গেল, রুহি তখনও জানালার কাঁচের ওপারে পিয়াসদের চলে যাওয়া দেখছিল। তার মনের আকাশে তখন হাজারো মেঘের আনাগোনা। হঠাৎই নাকে আসা বিরিয়ানির সুবাসে রুহি বাস্তবে ফিরে এল। সে লক্ষ্য করল, ঠিক তার মুখের সামনে কেউ একজন অত্যন্ত যত্ন করে এক লোকমা খাবার তুলে ধরেছে।
রুহি চমকে ওঠে পাশে তাকাতেই দেখল শাহাজ ভাই! তার সেই গম্ভীর, পাথরের মতো শান্ত শাহাজ ভাই আজ বিরিয়ানির লোকমা হাতে নিয়ে পরম মমতায় তার দিকে তাকিয়ে আছে। রুহির দুচোখে রাজ্যের বিস্ময়। সে কি স্বপ্ন দেখছে? যে শাহাজ ভাই কথা বলার সময়ও মুখের দিকে তাকায় না, সে আজ নিজের হাতে তাকে খাইয়ে দিচ্ছে!
রুহিকে ওভাবে স্থবির হয়ে তাকিয়ে থাকতে দেখে শাহাজ নকল রাগ দেখিয়ে এক ধমক দিয়ে উঠল—
— "কী হলো, এভাবে হা করে দেখছিস কী? খাবারটা কি মুখে এমনি এমনি ঢুকে যাবে? হা কর!"
শাহাজের সেই পরিচিত ধমকের স্বরে রুহি অনেকটা যান্ত্রিকভাবেই মুখ খুলে হা করলো । শাহাজ অত্যন্ত আলতো করে লোকমাটি রুহির মুখে পুরে দিল। রুহির মনে হলো, বিরিয়ানির স্বাদের চেয়েও ওই স্পর্শের মমতা অনেক বেশি দামি। রুহি খাবারটা চিবোতে চিবোতে দেখল, শাহাজের চোখে এখন আর সেই শাসন নেই, বরং সেখানে এক অদ্ভুত শীতল প্রশান্তি কাজ করছে।
শাহাজ এবার প্লেটটা রুহির আরও কাছে এগিয়ে দিয়ে মৃদু স্বরে বলল—
— "বাকিটা এখন নিজে নিজে খা। অনেক লড়াই করতে হবে তোকে, খালি পেটে কি আর যুদ্ধ জেতা যায়? লক্ষ্মী মেয়ের মতো সবটা শেষ কর।"
রুহি শাহাজের এমন ধাচের কথার অর্থ বুঝলো না , কিন্তু সেই সাথে আর কোনো বাক্য ব্যয়ও করল না। বাধ্য মেয়ের মতো মাথা নিচু করে খাবার খেতে শুরু করল। তার মনের ভেতর এক অদ্ভুত ভালোলাগার ঢেউ খেলছে। সে ভাবছে, এই মানুষটা কেন এত রহস্যময়? কখনও পাহাড়ের মতো কঠোর, আবার কখনও বর্ষার প্রথম বৃষ্টির মতো শীতল।
শাহাজ চুপচাপ বসে রুহির খাওয়ার দৃশ্যটি দেখছিল। বাইরের কাঠফাটা রোদ যখন পৃথিবীকে জ্বালিয়ে দিচ্ছে, তখন এই ঠান্ডা ঘরে শাহাজের এই নীরব সমর্থন রুহিকে বুঝিয়ে দিল—পৃথিবীর সবাই তাকে ছুড়ে ফেলে দিলেও, এই একজন মানুষ ছায়ার মতো তার মাথার ওপর আছে। পিয়াসের দেওয়া সব অপমান যেন শাহাজের এই এক লোকমা খাবারের কাছে মুহূর্তেই তুচ্ছ হয়ে গেল।
চলবে_____
~~~~~~
#আফীফা_আফনান