#অন্তহীন_প্রেম_আমার
#আফীফা_আফনান
#পর্ব_০৭
[কপি করা নিষিদ্ধ]
বাড়িতে আজ উৎসব আর বিষণ্ণতার এক অদ্ভুত মিশেল। বেলা বাড়তে বাড়তে রোদের তেজ চড়চড় করে বাড়ছে, আর সেই সাথে বাড়ছে খন্দকার বাড়ির ব্যস্ততা। সদর দরজা দিয়ে আত্মীয়-স্বজনের আসা-যাওয়া লেগেই আছে। উঠানের একপাশে বিশাল ডেকচিতে রান্না হচ্ছে, যার ম ম ঘ্রাণে চারপাশ মউ মউ করছে। আজ সেই বহু প্রতীক্ষিত দিন—পিয়াসের বিদেশ যাত্রার লগ্ন।
রান্নাঘরে যেন আজ যুদ্ধের প্রস্তুতি চলছে। তানজিনা বেগম আর নাসরিন বেগম হরেক পদের আয়োজনে ব্যস্ত থাকলেও ইয়াসমিন বেগমের হাত আজ বারবার থমকে যাচ্ছে। নিজের বড় ছেলে তাকে ছেড়ে হাজার মাইল দূরে পাড়ি দিচ্ছে—এই সত্যটা মেনে নিতে মায়ের মন যেন বারবার বিদ্রোহ করছে।
তানজিনা বেগমও বড় বোনের মতো পরম মমতায় জা-কে সান্ত্বনা দিচ্ছেন, "আরে ইয়াছমিন , কাঁদিস না তো! ছেলে তোর রাজপুত্র হয়ে ফিরবে। ওর উজ্জ্বল ভবিষ্যতের জন্যই তো এই ত্যাগ। তুই যদি এভাবে বিলাপ করিস তাহলে ছেলেটার তো মন ছোট হয়ে যাবে!"
জা এর কথায় ইয়াসমিন বেগম আঁচলে চোখ মুছে আবার কাজে মন দেন, কিন্তু পরক্ষণেই আবারও ফুঁপিয়ে ওঠেন নিজের দীর্ঘশ্বাস গোপন করতে পারেন না।
বাড়ির কর্তারা আজ সবাই উপস্থিত। মোস্তফা কামাল থেকে শুরু করে চাচারা পর্যন্ত আজ অফিস থেকে ছুটি নিয়েছেন। পিয়াসের নানাবাড়ির লোকজন ও আজ এসে ভিড় জমিয়েছেন খন্দকার বাড়িতে। হৈ-চৈ, হাসি-ঠাট্টায় পুরো বাড়ি সরগরম। শুধু রুহির বাবা আখতারুজ্জামান সাহেব চাকরির সুবাদে রাঙামাটিতে আটকে আছেন, তবে ফোনের মাধ্যমে প্রতি ঘণ্টায় ভাইপোর খোঁজ নিচ্ছেন।
পুরো বাড়ি যখন পিয়াসকে নিয়ে উন্মাদনায় মত্ত, খোদ পিয়াসের মধ্যেই আজ কোনো চনমনে ভাব নেই। যে ছেলে বিদেশ যাওয়ার উত্তেজনায় দিন গুনছিল, সে আজ বাড়ির উঠানের নির্জন দোলনাতে একা গুম হয়ে বসে আছে। পিয়াসের ভেতরে গত রাতের সেই মুহূর্তটি বিষের মতো কাজ করছে। রুহির মুখে সেই 'বাঁদরের গলায় মুক্তোর মালা'র খোঁচা সে সারারাত হজম করতে পারেনি। অপমানে আর রাগে তার সারা রাত দুচোখের পাতা এক হয়নি। তার ইগোতে এমন আঘাত রুহি আগে কখনও করেনি, এ যেন অকল্পনীয়।
মধ্যরাতে ভোর হওয়ার আগেই পিয়াস পরিকল্পনা করেছিল, আজ সকালে রুহিকে সে এমন এক শিক্ষা দেবে যা মেয়েটি সারাজীবন মনে রাখবে। কিন্তু ফজরের পরে কিভাবে যেন তার চোখ বুজে আসে, সারা রাত জাগা ও ক্লান্তিতে তার ঘুম ভাঙতে দেরি হয়ে যায়। সকাল সাড়ে আটটায় তড়িঘড়ি করে রুহির ঘরে গিয়ে পিয়াস যা দেখল, তাতে তার পিত্তি জ্বলে উঠল। ঘর খালি। রুহি নেই।
নিচে এসে তানজিনা বেগমের কাছে পিয়াস জানতে পারে, রুহি নাকি সাতসকালেই টিউশনিতে বেরিয়ে গেছে। বড় আম্মু আর নাসরিন বেগম বারবার বারণ করেছিলেন যে আজ বাড়িতে বড় আয়োজন, আজ যেন ও বাইরে না যায়। কিন্তু রুহি কারো কথা শোনেনি। জেদ করে ব্যাগ কাঁধে নিয়ে সে বেরিয়ে গেছে।
পিয়াসের মেজাজ এখন তুঙ্গে। সে বাগানের দোলনায় বসে একদৃষ্টিতে গেটের দিকে তাকিয়ে আছে। চারদিকের আত্মীয়দের কোলাহল তার কানে যাচ্ছে না। তার মনে এখন একটাই চিন্তা—রুহি ফিরুক একবার। যাওয়ার আগে এই 'অবাধ্য মেয়েকে তার আসল জায়গা বুঝিয়ে দিয়ে তবেই সে এয়ারপোর্টের উদ্দেশ্যে রওনা হবে।
********
স্কুলের করিডোর দিয়ে বয়ে যাওয়া ফাগুনী বাতাসের তোড়ে জানালার পর্দাগুলো দুলছে। ক্লাসরুমের ফার্স্ট বেঞ্চে বসে রুহি একমনে বিন্তির খাতা থেকে নোট করে চলেছে। আজ সকালের সেই তড়িঘড়ি করে বাসা থেকে বের হওয়াটা ছিল স্রেফ পিয়াস নামের ওই বিভীষিকা থেকে নিজেকে দূরে রাখার একটা কৌশল। বাড়িতে আজ উৎসবের আমেজ, অথচ রুহির কাছে সেই উৎসব মানেই পিয়াসের বিষাক্ত কথা আর তাচ্ছিল্য ভরা চাহনি। তার চেয়ে স্কুলের এই একঘেয়ে পড়ালেখার জগতটাও যেন আজ অনেক বেশি শান্তির।
রুহির ঠিক পাশেই বসে আছে মেহেরজান বিন্তি। ষষ্ঠ শ্রেণী থেকেই ওরা একে অপরকে চেনে, কিন্তু রুহি কোনোদিন ওর সাথে কথা বলেনি। রুহির ধারণা ছিল বিন্তি হয়তো ভীষণ গম্ভীর, ওই টাইপের আঁতেল মেয়ে যারা বই ছাড়া আর কিছু বোঝে না। কিন্তু গত দুদিনে রুহির সেই ভুল ধারণা তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়েছে। ফার্স্ট বেঞ্চে বসার পর বিন্তিই প্রথম রুহির সাথে আগ বাড়িয়ে কথা বলা শুরু করেছিল, আর এখন মনে হচ্ছে—ও যেন রুহির জীবনের এক পশলা বিশুদ্ধ বাতাস। বিন্তি শুধু মিশুকই নয়, ও জানে কীভাবে কথা দিয়ে মানুষের মন হালকা করতে হয়।
বিন্তি কথা বলতে বলতেই খাতার এক কোণে ছোট করে একটা কার্টুন এঁকে রুহিকে দেখাতেই রুহি মুচকি হাসল। বিন্তি চুপিচুপি ফিসফিস করে বলল, "
রুহি, অঙ্কটা কি তোমার মাথায় ঢুকছে, নাকি মাথার ওপর দিয়ে পাস করছে?"
বিন্তির এমন কথার ধরন দেখে রুহি হেসে জবাব দিল, "মাথার ভেতরেই রাখার চেষ্টা করছি !"
বিন্তির সাথে কথা বলতে বলতেই রুহির মনের কোণে হঠাৎ শাহাজ ভাইয়ের সেই গম্ভীর কিন্তু সতেজ মুখটা ভেসে উঠল। শাহাজ ভাই একবার খুব সুন্দর একটা কথা বলেছিলেন। রুহি এখন সেই কথাটার মর্ম বুঝতে পারছে। বন্ধুত্ব মানেই তো একগাদা মানুষের ভিড় নয়। শাহাজ ভাইয়ের সেই অমোঘ উক্তিটি যেন আজ রুহির জীবনের মূলমন্ত্র হয়ে দাঁড়িয়েছে:
"সহস্র স্বার্থপর বন্ধুর মিছিলে নিজেকে হারিয়ে ফেলার চেয়ে, হৃদয়ের বিশালতা বোঝা একজন খাঁটি বন্ধুর হাত ধরে অন্ধকার পথ পাড়ি দেওয়া অনেক বেশি সম্মানের।"
রুহি আড়চোখে বিন্তির দিকে তাকাল। যে রুহি প্রতিজ্ঞা করেছিল আর কাউকে বন্ধু করবে না, সেই রুহি আজ দুদিনের আলাপের এই নতুন বন্ধুত্বের মাঝে এক অদ্ভুত শান্তি খুঁজে পাচ্ছে।
ক্লাস শেষের ঘণ্টা বাজতেই রুহি একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। এবার তাকে ফিরতে হবে। পিয়াসের সেই অগ্নিদৃষ্টির সামনে গিয়ে দাঁড়াতে হবে। কিন্তু আজ আর রুহির মনে কোনো ভয় নেই। মনের শান্তি আর শাহাজ ভাইয়ের অনুপ্রেরণা তার দুচোখে এক নতুন সতেজতা এনে দিয়েছে।
ক্লাসরুমের জানালার বাইরে রোদের তেজ এখন মধ্যগগনে। রুহি তখন বিন্তির খাতা থেকে অঙ্কের সূত্রগুলো দ্রুত নিজের খাতায় টুকে নিচ্ছে। পেনসিলের খসখস শব্দের মাঝেই হঠাৎ একটা ছায়া এসে পড়ল তাদের টেবিলের ওপর। রুহি একপলক চোখ তুলে দেখল—প্রিয়া। তার সাথে ক্লাসের আরও দুই-তিনজন সহচরী, যারা সাধারণত একসময় রুহির সাথে ব্যাকবেঞ্চে আড্ডা দিয়ে সময় কাটাত।
প্রিয়া ভ্রু কুঁচকে রুহির করা নিঁখুত নোটগুলোর দিকে তাকাল। তার চোখেমুখে রাজ্যের বিস্ময় আর কিছুটা হিংসে। এই রুহি তো সেই মেয়ে নয়, যাকে সে চিনত। রুহির চেহারায় এখন আর সেই চঞ্চলতা নেই, বরং ফুটে উঠেছে এক ধরণের ধীরস্থির গাম্ভীর্য।
প্রিয়ার ডাকে রুহির মনোযোগে ব্যাঘাত ঘটল।
— "কিরে রুহি! তুই তো দেখছি আমাদের চিনতেই পারছিস না। নতুন বান্ধবী জুটিয়ে একদম পুরাতনদের ভুলে গেলি?" প্রিয়া আড়চোখে বিন্তির দিকে তাকিয়ে কথাটা বললো , যেন বুঝিয়ে দিল বিন্তির এখানে থাকাটা তার পছন্দ হচ্ছে না।
বিন্তি কিছু বলল না, শুধু একবার রুহির দিকে তাকিয়ে চুপচাপ নিজের ব্যাগ গোছাতে লাগল। রুহি হাতের কলমটা ডায়েরির ভাজে রাখল। তারপর খুব শান্ত ভঙ্গিতে প্রিয়ার চোখের দিকে তাকিয়ে বলে উঠলো—
— "নতুন কিছু পেলে মানুষ পুরাতনকে গুরুত্ব দেওয়া কমিয়ে দেবে, এটাই তো জগতের নিয়ম প্রিয়া। এতে অবাক হওয়ার কী আছে? আর নতুন বান্ধবীর কথা বলছিস? আমার সামনে বসতে ইচ্ছে হয়েছে তাই এখানে বসেছি, বিন্তি বাদে অন্য কেউ হলেও তার সাথেও আমার ব্যবহার এমনই হলো, আফটার-অল আমার পরিবার আমাকে অনেক ভালো শিক্ষা দিয়েছে!"
প্রিয়া এবার একটু দমে গিয়ে বিদ্রুপের সুরে বলল, "আগে তো পেছনে বসে হাসাহাসি করতেই তোর বেশি ভালো লাগত, হঠাৎ সামনের এই ফার্স্ট বেঞ্চে বসার শখ হলো কেন? এত পরিবর্তন কিসের?"
রুহি এবার ঠোঁটের কোণে হালকা একটা হাসি ফুটিয়ে তুলল। সেই হাসিতে কোনো রাগ ছিল না, ছিল একরাশ পরিপক্কতা। সে ধীরস্থির কণ্ঠে জবাব দিল—
— "মানুষ মাত্রই পরিবর্তনশীল প্রিয়া। আজ যা আমাদের খুব পছন্দের, কালও যে তাই থাকবে—এর কোনো মানে নেই। মানুষের রুচি বদলায়, লক্ষ্য বদলায়। এমনকি আজ যাকে খুব ‘প্রিয়’ মনে হয়, সময়ের ব্যবধানে সে-ই হয়তো সবচাইতে ‘ঘৃণিত’ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।"
রুহির শেষ কথাটি যেন তীরের মতো গিয়ে বিঁধল প্রিয়ার বুকে। সে বুঝতে পারল রুহি শুধু বসার জায়গার কথা বলছে না, সে তার জীবনের প্রতিটি সমীকরণ বদলে ফেলেছে। প্রিয়া কিছু বলতে গিয়েও থেমে গেল। রুহি আর এক মুহূর্ত কথা না বাড়িয়ে আবার নিজের খাতায় মনোযোগ দিল।
পেছনের সারিতে রাজত্ব করা প্রিয়া আজ ফার্স্ট বেঞ্চের সামনে দাঁড়িয়ে নিজেকে বড্ড তুচ্ছ আর নগণ্য মনে করতে লাগল। সে যেন এক অচেনা রুহির মুখোমুখি হয়েছে, যাকে তর্কে হারানো এখন আর তার সাধ্যের মধ্যে নেই।
জোহরের আজানের ঠিক আগ মুহূর্তে স্কুল ছুটি হয়ে গেছে। আজ হাফ-ডে স্কুল হওয়ায় আকাশটা যেন একটু বেশিই নীল আর রোদের তেজটাও বেশ কড়া। রুহি আর বিন্তি হাত ধরাধরি করে স্কুলের গেট পেরিয়ে ফুটপাত ধরে সামনের দিকে হাঁটছে। বিন্তিই রুহির হাত আকড়ে ধরে আছে। দুপুরের এই তপ্ত রাস্তায় ধুলো উড়ছে, কিন্তু দুই নতুন সহচরী আলাপের জোয়ারে সেই গরম যেন টেরই পাওয়া যাচ্ছে না।
রুহি আর বিন্তি ষষ্ঠ শ্রেণি থেকেই একই ক্লাসে পড়ে। অথচ দীর্ঘ এই তিন-চার বছরে তাদের মধ্যে বড়জোর দু-একবার চোখে চোখ পড়লে একটু শুকনো হাসির বিনিময় হয়েছে, এর বাইরে কেউ কারো দুনিয়ার খবর রাখেনি। রুহির কাছে বিন্তি ছিল এক রহস্যময় 'আঁতেল' চরিত্র—যে কি না ষষ্ঠ থেকে নবম শ্রেণি পর্যন্ত নিজের এক নম্বর রোলটা আঠার মতো আঁকড়ে ধরে রেখেছে। শিক্ষকরা বিন্তিকে আদর্শ ছাত্রী হিসেবে উদাহরণ দিতেন, আর রুহির ধারণা ছিল বিন্তি হয়তো গম্ভীর ও একরোখা ।
কিন্তু গত দুদিনে রুহির সেই ভ্রান্ত ধারণা তাসের ঘরের মতো ভেঙে চুরমার হয়ে গেছে। বিন্তি শুধু মেধাবীই নয়, ও আস্ত একটা ‘গল্পের ঝুড়ি’। প্রথম দিন রুহি যখন ফার্স্ট বেঞ্চে ওর পাশে বসল, বিন্তিই প্রথম আগ বাড়িয়ে কথা বলে বন্ধুত্বের হাত বাড়িয়ে দিয়েছিল। আর আজ তো অবস্থা এমন যে, রুহিকে কথা বলার সুযোগই দিচ্ছে না সে। হাঁটতে হাঁটতে রুহি অবাক হয়ে আবিষ্কার করল, বিন্তি আসলে অসম্ভব মিশুক এবং প্রাণোচ্ছ্বল। কথায় কথায় রুহি জানল, তাদের মধ্যে ভৌগোলিক দূরত্বও খুব সামান্য। রুহিদের বাড়ির ঠিক দুই গলি পেছনেই বিন্তিদের বাসা—হেঁটে গেলে মাত্র ১৫ মিনিটের পথ।
বিন্তি হাসতে হাসতে বলছিল, "জাস্টিস ফর রুহি! এত বছর পাশের গলিতে থেকেও আমরা কেউ কাউকে চিনলাম না!"
রুহিও হেসে মাথা নেড়ে তার কথায় সায় দিচ্ছিল। কিন্তু হঠাৎ ওর দৃষ্টি গেল সামনের রাস্তার দিকে। একটি ঝকঝকে সাদা গাড়ি তাদের পাশ কাটিয়ে ধীরগতিতে এগিয়ে যাচ্ছে। গাড়ির জানালার কাঁচ নামানো, আর সেখান থেকে প্রিয়া তীক্ষ্ণ ও অদ্ভুত দৃষ্টিতে রুহি আর বিন্তির দিকে তাকিয়ে আছে। প্রিয়ার সেই চাহনিটা মোটেও স্বাভাবিক ছিল না; তাতে ছিল এক ধরণের অবিশ্বাস আর চাপা আক্রোশ। যেন সে কিছুতেই হজম করতে পারছে না—তার সেই ডানপিটে রুহি কীভাবে ক্লাসের টপার বিন্তির সাথে এভাবে গলাগলি করে হাঁটছে!
রুহি প্রিয়ার দিকে এক পলক তাকিয়েই চোখ সরিয়ে নিল। বিন্তি খেয়াল করে জিজ্ঞেস করল, " তোমার বান্ধবী প্রিয়া মনে হয় আমাকে পছন্দ করে না তাই না। তোমার সাথে মিশছি দেখে কি ও রাগ করেছে! "
রুহি ছোট করে একটা শ্বাস ফেলে বলল, "না, ওর পছন্দ অপছন্দের কি আছে, আমি কার সাথে মিশবো তা আমার মর্জি। এসব বাদ দাও আমরা বরং হাঁটি।"
রুহি সামনে এগোলো কিন্তু সে মনে মনে জানত, আজ বাড়ি ফেরার পথটা ওর জন্য খুব একটা সহজ হবে না। একদিকে পিয়াসের বিদায়ী হাঙ্গামা, অন্যদিকে প্রিয়ার এই বাঁকা নজর—সব মিলিয়ে দিনটা যেন এক বড় পরীক্ষার দিকে এগোচ্ছে।
*******
গলির মোড়ে এসে বিন্তি আর রুহি একে অপরের থেকে বিদায় নিল। বিন্তি তার গলির দিকে পা বাড়াতেই রুহি বুক ভরে একটা শ্বাস নিল। বাড়ির গেট যত কাছে আসছে, রুহির ভেতরের অস্বস্তি তত বাড়ছে। সে জানে, আজকের দিনটা অন্য সব দিনের মতো সাধারণ না।
বাড়ির উঠানে দোলনাটা এখন স্থির। পিয়াস এতক্ষণ সেখানে বসে রাগে গজগজ করছিল। তার মা আর মামি এসে বারকয়েক ভেতরে যাওয়ার জন্য ডেকে গেছেন, কিন্তু পিয়াসের মনের ভেতরে গত রাতের অপমানের আগুন তখনো দাউদাউ করে জ্বলছে। সে ঠিক করেছে, যাওয়ার আগে রুহিকে তার স্পর্ধার চরম মূল্য চুকিয়ে দিয়ে যাবে। দোলনা থেকে উঠে সে যেই না ঘরের দিকে পা বাড়াতে যাবে, অমনি গেট দিয়ে রুহিকে ঢুকতে দেখল। ঘামে ভেজা মুখ, অবিন্যস্ত চুলে সেই নবকিশোরী রুহি—যে গত রাতে তাকে চরম উপেক্ষা করেছে, যা সে সহ্য করতে পারেনি।
রুহি আনমনে মাটির দিকে তাকিয়ে কী যেন ভাবছিল। কিন্তু মেইন গেট দিয়ে বাড়ির মূল ফটকে পা রাখতেই তার ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় জানান দিল, বিপদ সামনে। মাথা তুলে তাকাতেই দেখল যমদূতের মতো পিয়াস দাঁড়িয়ে আছে। তার রক্তবর্ণ চোখ আর চোয়ালের শক্ত হওয়া পেশিগুলোই বলে দিচ্ছিল সে কতটা উন্মত্ত হয়ে আছে। রুহি থমকে দাঁড়াল। সে বুঝতে পারল, পিয়াস এখন তাকে ছেড়ে কথা বলবে না। হয়তো রাতের ঝালটা এখন তার ওপর দিয়েই মিটবে। রুহি মানসিকভাবে নিজেকে প্রস্তুত করল—আরেকটা লড়াইয়ের জন্য, আরও কিছু বিষাক্ত কথা শোনার জন্য।
পিয়াস বড় বড় কদমে রুহির ঠিক সামনে এসে দাঁড়াল। ঠিক যখনই সে রুহিকে আক্রমণাত্মক কিছু বলার জন্য মুখ খুলতে যাবে, অমনি পেছন থেকে একটা পরিচিত গর্জন শোনা গেল।
একটি শক্তিশালী বাইক ঠিক রুহির পেছনে এসে ব্রেক কষল। পিয়াস আর রুহি দুজনেই চমকে পেছন ফিরল। হেলমেটের কাঁচ তুলে তাদের দিকে স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে শাহাজ। শাহাজ তীক্ষ্ণভাবে আরো একবার বাইকের হর্ন বাজাল। হর্নের আওয়াজ শুনেই রুহি তড়িঘড়ি করে একপাশে সরে দাঁড়াতেই শাহাজ বাইক নিয়ে সোজা বাড়ির লাগোয়া গ্যারেজে ঢুকে গেল।
পিয়াস রাগে অস্থির হয়ে শাহাজের চলে যাওয়ার অপেক্ষা করতে লাগল। সে ভাবল শাহাজ ভেতরে ঢুকলেই সে রুহির ওপর ঝাঁপিয়ে পড়বে কথার তুবড়ি নিয়ে। শাহাজ বাইক পার্ক করে গ্যারেজ থেকে বেরিয়ে সোজা ঘরের দিকে হাঁটা দিল। কিন্তু কয়েক কদম এগিয়েই সে হঠাৎ থেমে গেল। শাহাজ যেন না তাকিয়েও বুঝতে পারছিল পেছনকার পরিস্থিতি। সে ঘাড় না ঘুরিয়েই গম্ভীর আর গম্ভীর কণ্ঠে আদেশ দিল—
— "রুহি, স্কুল ছুটি হয়েছে আধঘণ্টারও বেশি। এই কড়া রোদে এখানে দাঁড়িয়ে আছিস কেন? যা, জলদি ঘরের ভেতরে যা!"
শাহাজের কথায় যেন জাদুর মতো কাজ হলো। পিয়াসের সব পরিকল্পনা এক নিমেষে ধূলিসাৎ করে দিয়ে রুহি এক মুহূর্ত দেরি না করে তিরের মতো ছুটে বাড়ির ভেতরে ঢুকে গেল। পিয়াস হাত মুষ্টিবদ্ধ করে রুহির চলে যাওয়ার পথের দিকে তাকিয়ে রইল। সে কিছুই করতে পারল না।
শাহাজ এবার পিয়াসের দিকে ফিরল। তার শীতল কিন্তু তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে পিয়াস কেমন যেন কুঁকড়ে গেল। শাহাজ স্বাভাবিক গলায় বলল—
— "তুই এখানে রোদে দাঁড়িয়ে কেন? চল, ভেতরে চল। সবাই নিশ্চয় অপেক্ষা করছে। "
শাহাজের কথার অবাধ্য হওয়ার সাহস পিয়াসের নেই। সে শুধু মাথা নেড়ে আসছি বলে সায় দিল। শাহাজ শান্ত পায়ে ঘরের দিকে এগিয়ে চলল, আর তার ঠিক পেছনে একরাশ অতৃপ্ত ক্রোধ নিয়ে পিয়াস অনুসরণ করতে লাগল। রুহি আজকের মতো ঠিকই বেঁচে গেল।
বাড়ির ভেতরে ঢুকেই রুহি কোনমতে সিঁড়ি বেয়ে নিজের রুমে গিয়ে দরজায় খিল আঁটল। মনের মধ্যে জেদ চেপে বসল—আজ আর যাই হোক, সে পিয়াসের সামনে পড়বে না। আগের রুহি হলে হয়তো পিয়াসের প্রতিটি কটু কথা শুনতে বেহায়ার মতো দাঁড়িয়ে থাকত, কিন্তু এখনকার রুহি জানে কোথায় নিজেকে থামিয়ে দিতে হয়। আর মাত্র কয়েক ঘণ্টা, তারপর এই লোকটা সীমানা পার হবে; মিছেমিছি কেন শেষ মুহূর্তে তিক্ততা বাড়ানো?
বাইরে তখন উৎসবের ঘনঘটা। আত্মীয়-স্বজনদের পদচারণা আর হাসাহাসিতে পুরো বাড়ি ম ম করছে। জোহরের পর শুরু হলো দুপুরের ভোজনপর্ব। আজকের প্রতিটি পদ রান্না করা হয়েছে পিয়াসের পছন্দ মাথায় রেখে—খাসির রেজালা থেকে শুরু করে নানা পদের ফিরনি-পায়েস। বড় বড় পাটের দস্তরখান বিছিয়ে সবাই যখন খেতে বসল, তখন ড্রয়িং রুম আর ডাইনিং এক হয়ে গেছে।
এতো এতো মানুষের ভিড়ে আর রান্নার ব্যস্ততায় আজ আর কেউ রুহির অনুপস্থিতি খেয়াল করার সময় পেল না। অন্যদিকে রুহিও যেন সব ঝঞ্ঝাট থেকে নিজেকে মুক্তি দিয়ে ফ্যানের বাতাসে গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন হয়ে পড়ল। বাইরের হট্টগোল তাকে আর স্পর্শ করতে পারছে না।
সবার খাওয়া-দাওয়া যখন শেষের পথে, তখন শাহাজ তার আসন থেকে উঠে দাঁড়াল। হাত মুছতে মুছতে তার তীক্ষ্ণ নজর একবার রুহির সেই খালি চেয়ারটার দিকে গেল। শাহাজ পাশে দাঁড়িয়ে থাকা রুবির দিকে তাকিয়ে শান্ত কিন্তু গম্ভীর স্বরে নির্দেশ দিল—
— "রুবি, তুই যখন উপরে যাবি, রুহির জন্য একটা থালায় খাবার বেড়ে নিয়ে যাবি। ও ঘুমাচ্ছে হয়তো, ঘুম ভাঙলে ওকে খাইয়ে দিস।"
শাহাজের কথায় এতোক্ষনে সবার টনক নড়ে যে রুহি উপস্থিত নেই, বড় ভাইয়ের কথার অবাধ্য হওয়ার স্বভাব রুবির নেই। সেও সায় দিয়ে রুহির জন্য খাবার সাজাতে লাগল। এভাবেই পুরো দুপুরটা খন্দকার বাড়ির সদস্যদের হাসি-ঠাট্টা আর খোশগল্পের মধ্য দিয়ে কেটে গেল। একদিকে বিচ্ছেদের সুর আর অন্যদিকে ভবিষ্যতের স্বপ্ন—সব মিলিয়ে বাড়ির বাতাস যেন এক থমথমে প্রশান্তিতে ভারী হয়ে আছে।
********
বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যার ছায়া নামার আগেই খন্দকার বাড়িতে কান্নার রোল উঠল। পিয়াসের এয়ারপোর্টে যাওয়ার সময় হয়েছে। এতক্ষণের হইচই মুহূর্তেই গুমোট এক বিষণ্ণতায় রূপ নিয়েছে। ইয়াসমিন বেগম যেন পাগলপ্রায়; তার বুকফাটা আর্তনাদ আর ডুকরে কেঁদে ওঠা বাড়ির প্রতিটি দেয়ালকে স্পর্শ করছে। দাদী মমতাজ বেগম লাঠিতে ভর দিয়ে দরজার সামনে পাথর হয়ে দাঁড়িয়ে আছেন, তার ঝাপসা চোখে নাতির জন্য শেষ দুয়া আর একরাশ শূন্যতা।
বাড়ির প্রতিটি সদস্য পিয়াসের সাথে কথা বলছে, জড়িয়ে ধরে শেষ বিদায় জানাচ্ছে। রুহি নিচে নামতে চায়নি, কিন্তু নাসরিন বেগমের কঠিন হুমকি আর ধমকের মুখে সে একপ্রকার অনিচ্ছাসত্ত্বেও ড্রয়িং রুমের এক কোণে এসে দাঁড়িয়েছে। পিয়াস সবার থেকে বিদায় নিল, কিন্তু রুহির সাথে তার দৃষ্টিবিনিময় হলো না। রুহি কোনো কৃত্রিম আবেগ দেখালো না, আবার কোনো বিদ্রূপও করল না। সে যেন সেখানে স্রেফ এক দর্শক।
বড় আব্বু, মেজ আব্বু আর রুহির শাহেব চাচ্চু সহ শাহাজ, কাব্য আর সিফাত পিয়াসকে এয়ারপোর্টে এগিয়ে দিতে গাড়িতে উঠল। গাড়িটা যখন মেইন গেট দিয়ে বের হয়ে গেল, খন্দকার বাড়ির বিশাল অট্টালিকায় যেন নিস্তব্ধতা নেমে এলো, কিছুক্ষণ পরেই আত্মীয়-স্বজনরা একে একে বিদায় নিতে শুরু করল। ভেতরে কেবল প্রতিধ্বনিত হতে থাকল ইয়াসমিন বেগমের বিলাপ।
বাড়ির এই হাহাকার আর সশব্দ কান্না সহ্য করতে না পেরে রুহি পা টিপে টিপে ছাদে উঠে গেল। ছাদের সেই হলদেটে আলো আর খোলা আকাশ তাকে যেন আলিঙ্গন করছে। রুহির মুখে কোনো বেদনার ছাপ নেই, আবার নেই কোন বিজয়ের হাসি। সে ধীর পায়ে ছাদের রেলিংয়ের কাছে গিয়ে দাঁড়াল।
আকাশের ওই বিশালতার দিকে তাকিয়ে রুহি একটা দীর্ঘ নিঃশ্বাস নিল। হঠাৎ তার চোখের কোণ বেয়ে দুটি ফোঁটা জল গড়িয়ে পড়ল। এই জল কেন? ইয়াসমিন বেগমের সেই বুকফাটা কান্নায় রুহির হৃদয় ছিঁড়ে গেছে, নাকি পিয়াস নামক যে অধ্যায়টি তার জীবনে এতদিন রাজত্ব করেছে তার চিরতরে বিদায়ের এই বিষণ্ণতা? রুহি নিজেও জানে না। তবে সে এটুকু জানে, এই চোখের জল দুর্বলতার নয়।
সে নিজের ওড়না দিয়ে চোখ মুছে আকাশের দিকে মুখ তুলে তাকাল। তার চোখের দৃষ্টিতে এখন এক অদ্ভুত স্থিরতা। রুহি মনে মনে নিজেকে বলল— "আজ থেকে এই রুহির আর কোনো পিছুটান নেই।" তার একমাত্র লক্ষ্য এখন নিজেকে পরিবর্তন করা। রুহি শুধু এটা জানে যে তাকে বদলাতে হবে, নিজেকে যোগ্য হিসেবে তৈরি করা, নিজের যোগ্য তাকে সবার কাছে তুলে ধরা এবং নিজেকে প্রমাণ করা।
নিজেকে বদলানোর যে কঠোর শপথ সে নিয়েছে, তা এই সন্ধ্যার আকাশকে সাক্ষী রেখে আরও দৃঢ় করল সে।
খন্দকার বাড়ির ছাদের ওপর দিয়ে বয়ে যাওয়া তপ্ত বাতাস যেন রুহির কানে কানে বলে গেল— আজ থেকে এক নতুন রুহির জয়যাত্রা শুরু। নতুন য্এা নতুন সম্ভাবনা, নতুন ভালোবাসার পরশ। রুহি দূর আকাশে তাকিয়ে ভাবছে,
ঠিক তখনই দূর থেকে কোন একট টং দোকান থেকে ভেসে এলো গানের মধুময় কিছু শব্দ ___
তুমি আকাশের বুকে বিশালতার উপমা
তুমি আমার চোখেতে সরলতার প্রতিমা
আমি তোমাকে গড়ি ভেঙেচুরে শতবার
রয়েছো তুমি বহুদূরে আমাকে রেখে ছলনায়
এ হৃদয় ভেঙে গেলে জানো কি তা
লাগে না, লাগে না জোড়া
লাগে না, লাগে না জোড়া
আমার পথে তোমার ছায়া
পড়লে আড়াল করে
থমকে সে যাবে জীবনগতি
সে কি তোমার অজানা?
রয়েছো তুমি বহুদূরে আমাকে রেখে ছলনায়
এ হৃদয় ভেঙে গেলে জানো কি তা
লাগে না, লাগে না জোড়া
লাগে না, লাগে না জোড়া
চলবে_____