#অন্তহীন_প্রেম_আমার
#আফীফা_আফনান
#পর্ব_২৩
[কপি করা নিষিদ্ধ]
"এতো রাতে আপনি এখানে শাহাজ ভাই.....!"
রাতের নিস্তব্ধতা তখন চরমে। বাগানের কৃত্তিম বাল্বের আলো সেই সাথে রাস্তায় থাকা ল্যাম্পপোস্টের ম্লান হলুদ আলো আর আকাশের রূপালি জ্যোৎস্না মিলেমিশে ধরনীতে যেন এক মায়াবী পরিবেশ তৈরি করেছে।
অন্যদিকে শাহাজ রুহির সামনে একদম নিস্পন্দ হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। তার পরনে একটা কালো শার্ট, যার হাতাগুলো কনুই পর্যন্ত গোটানো। পকেটে হাত গুঁজে সে রুহির দিকে এমনভাবে তাকিয়ে আছে, যেন তার চাহনি কোন রহস্যময় উত্তাল সমুদ্র।
শাহাজের সেই স্থির, পলকহীন দৃষ্টির তীব্রতায় রুহি যেন কুঁকড়ে যাচ্ছিল।
রুহি নিজের গায়ে জড়ানো ওড়নাটা একবার টেনে ঠিকঠাক করে নিল। বুকের ভেতরটা যেন তার ড্রাম পেটাচ্ছে, অথচ বাইরে সে নিজেকে স্বাভাবিক দেখানোর আপ্রাণ চেষ্টা করছে।
রুহি কিছুটা জড়তা নিয়ে আবার প্রশ্ন করল, “শাহাজ ভাই, আপনি হঠাৎ এত রাতে এখানে? কোনো কাজ ছিল কি?”
অন্যদিকে শাহাজ রুহির দিকে তাকিয়ে, এক মুহূর্তের জন্যও দৃষ্টি সরাল না। তার চোখের মণি দুটো যেন কফির মতো গাঢ় আর নেশাতুর। সে আগের মতোই শান্ত ও গম্ভীর গলায় অতি সংক্ষিপ্ত উত্তর দিল— “হুম।”
রুহি এবার একটু কৌতূহলী হয়ে উঠল। শাহাজের এই অসময়ে আসা আর এই রহস্যময় আচরণ তার ভাবনার জগতকে যেন ওলটপালট করে দিচ্ছে। সে কিছুটা এগিয়ে এসে নিচু স্বরে জিজ্ঞেস করল, “কী কাজ শাহাজ ভাই? খুব বেশি গুরুত্বপূর্ণ কি?”
শাহাজ এবার পকেট থেকে হাত বের করে নিজের মোবাইলের স্ক্রিনের দিকে তাকাল। অতপর মাথা না তুলে ধীরস্থিরভাবে বলল— “হুমমম।”
রুহি একটু হাসল। তার হাসিতে যেন চাঁদের আলো আরও খানিকটা উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে। সে বলল, “বাড়ির সবাই তো এখন ঘুমাচ্ছে। বেশি গুরুত্বপূর্ণ কিছু হলে আমাকে বলুন শাহাজ ভাই , আমি কি কোনো সাহায্য করতে পারি?”
এবার শাহাজ তার চোখের দৃষ্টি ওপরের দিকে তুলল। সেই চাউনিতে ছিল এক অদ্ভুত শীতলতা, কিন্তু তার গভীরে লুকিয়ে ছিল এক প্রবল সম্মোহন। রুহির মনে হলো, ওই দুজোড়া চোখ যেন যে কারো হৃদয়ে অনায়াসেই আধিপত্য বিস্তার করে নিতে পারে। শাহাজ এক কদম রুহির দিকে এগিয়ে এল। সাথে সাথেই তার শরীরের সেই চিরচেনা পারফিউমের ঘ্রাণ রুহির নাকে এসে লাগল।
শাহাজ একদম ঠান্ডা আর গম্ভীর গলায় বলল, “কাজ তো অনেকটাই গুরুত্বপূর্ণ রুহি। কিন্তু সেই কাজের জন্য তুই এই মুহূর্তে প্রস্তুত নস। আরেকটু সময় গড়াক, সময় আসুক... তারপর নাহয় তোকে বলব।”
রুহি যেন মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে শাহাজের প্রতিটি শব্দ গিলছিল। কথাগুলোর গূঢ় অর্থ হয়তো তার এই অল্প বয়সের মস্তিষ্কে পুরোপুরি ধরা দিচ্ছে না, কিন্তু শাহাজের কণ্ঠের সেই গভীরতা তাকে এক ঘোরলাগা আবেশে ডুবিয়ে দিল। তাই সে কথা না বাড়িয়ে এক অবুঝ বালিকার মতো মাথা নাড়িয়ে শাহাজের কথায় সায় জানাল।
নিস্তব্ধ রাতে কেবল দুজনের নিশ্বাসের শব্দ আর ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক। শাহাজ আর রুহির মাঝখানের এই নীরবতা যেন হাজারো না বলা শব্দের চেয়েও বেশি মুখর হয়ে উঠেছে।
নিস্তব্ধ রাতটাকে আরও মায়াবী করে দিয়ে শাহাজ হঠাৎ নীরবতা ভাঙল। রুহির চোখের দিকে তাকিয়ে অত্যন্ত মায়াভরা এবং কোমল কণ্ঠে জিজ্ঞেস করল, “হাঁটতে যাবি আমার সাথে?”
রুহির কাছে এ যেন 'মেঘ না চাইতেই পানি' পাওয়ার মতো অবস্থা। শাহাজের মুখ থেকে এমন একটা প্রস্তাব আসবে, তা সে কল্পনাও করতে পারেনি। মুহুর্তেই যেন রুহির বুকের ভেতরটা এক অদ্ভুত আনন্দে তোলপাড় শুরু করেছে। সে অবাক হয়ে বড় বড় চোখ করে শাহাজের দিকে তাকিয়ে রইল, যেন কানে শোনা কথাগুলো বিশ্বাস করতে তার কিছুটা কষ্ট হচ্ছে ।
শাহাজ এবার দৃষ্টি সরিয়ে আকাশের সেই উজ্জ্বল চাঁদটার দিকে তাকাল। চাঁদের রুপালি আলো তার চিবুকে আছড়ে পড়ছে। সে শান্ত গলায় বলতে শুরু করল, “কেউ একজন কিছুক্ষণ আগে লিখেছে—আজকের চাঁদটা নাকি অনেক সুন্দর। এই চাঁদনী রাতে নিরিবিলিতে প্রিয় মানুষের হাত ধরে হাঁটতে পারা নাকি স্বর্গীয় অনুভূতির মতো! এখন আমার তো কোনো প্রিয় মানুষ নেই, আর তোর কথা মতো বাসার সবাইও ঘুমাচ্ছে। শুধু তুই আর আমিই জেগে আছি, তাই বলছিলাম কি—হাঁটতে যাবি আমার সাথে?”
শাহাজ তাকে সরাসরি হাঁটার অফার দিচ্ছে! রুহি নিজের মনে বিড়বিড় করতে লাগল, “এসব কি সত্যি? নাকি আমি গভীর ঘুমে কোনো রঙিন স্বপ্ন দেখছি?” ঘোরগ্রস্ত রুহি যখন নিজের ভাবনায় বিভোর, তখন সে খেয়ালই করেনি শাহাজ তার উত্তরের অপেক্ষায় না থেকে উল্টো ঘুরে ধীরপায়ে সামনের দিকে হাঁটতে শুরু করেছে।
রুহিন যখন ঘোর ভাঙলো ততক্ষনে শাহাজ তার থেকে বেশ খানিকটা দূরে এগিয়ে গিয়েছে, হঠাৎ শাহাজকে চলে যেতে দেখে রুহি বিচলিত হয়ে এক প্রকার চিৎকার করেই বলে উঠল, “দাঁড়ান শাহাজ ভাই! যাবেন না!”
রুহির সেই আকুল ডাক শুনে শাহাজ থমকে দাঁড়াল। পেছনে না ফিরলেও তার ঠোঁটের কোণে এক চিলতে বিজয়ের হাসি ফুটে উঠল, যা রুহির অগোচরেই রয়ে গেল। পরক্ষণেই নিজের গম্ভীর ভাবমূর্তি ফিরিয়ে এনে শাহাজ আবার রুহির দিকে ফিরে তাকাল। রুহি তড়িঘড়ি করে ওড়নার খুঁট আঙুলে পেঁচাতে পেঁচাতে শাহাজের সামনে এসে দাঁড়াল। লাজুক অথচ উৎসুক গলায় জিজ্ঞেস করল, “আপনি সত্যিই আমার সাথে হাঁটবেন?”
শাহাজ শুধু শান্ত গলায় উত্তর দিল— “হুমমম।”
এরপর শুরু হলো এক মায়াবী যাত্রা। মাথার ওপর ঝলমলে চাঁদের রূপালি আলো, আর নিচে নির্জন পিচঢালা রাস্তা। দুই পাশে সারিবদ্ধ গাছগুলো যেন সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে এই গন্তব্যহীন হাঁটার। শাহাজের হাঁটার ভঙ্গি বরাবরের মতোই রাজকীয় ও স্বাভাবিক, কিন্তু রুহির মনের ভেতর তখন নতুন প্রেমের এক তীব্র স্পন্দন।
রুহি আড়চোখে বারবার শাহাজকে দেখছে। সে চেষ্টা করছে শাহাজের প্রতিটি দীর্ঘ কদমের সাথে নিজের ছোট ছোট কদমগুলো মিলিয়ে নিতে। শাহাজের ছায়া যখন রাস্তার ওপর লম্বা হয়ে পড়ছে, রুহিও সন্তর্পণে নিজের ছায়াটা সেই ছায়ার সাথে মিশিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করছে। এই নিস্তব্ধ রাতে শাহাজের পাশে হাঁটাটা রুহির কাছে কোনো এক রূপকথার গল্পের চেয়ে কম কিছু মনে হচ্ছে না।
★★★
রাতের নিস্তব্ধতা তখন এক অন্যরকম মায়াজালে রূপ নিয়েছে। চারপাশের পৃথিবীটা যেন হঠাৎ করেই ছোট হয়ে কেবল এই পিচঢালা রাস্তা আর দুজনের ছায়ায় এসে সীমাবদ্ধ হয়েছে। রুহি এক অদ্ভুত বিমোহিত অবস্থায় শাহাজের পাশে পাশে হাঁটছে। তার মনে হচ্ছে, এই মুহূর্তটি যদি এখানেই থমকে যেত, তবে মন্দ হতো না।
শাহাজের গম্ভীর ব্যক্তিত্বের পাশে নিজেকে আজ বড্ড বেশি সুরক্ষিত আর বিশেষ কেউ মনে হচ্ছে রুহির। রূপালি চাঁদের আলো শাহাজের সুঠাম শরীরের একপাশে পড়ায় তাকে কোনো এক প্রাচীন গ্রিক দেবতার মতো মহিমান্বিত লাগছে। রুহি মাঝে মাঝে আড়চোখে সেই তীক্ষ্ণ নাক আর শান্ত মুখাবয়বটা দেখছে আর মনে মনে ভাবছে—এই মানুষটা কি সত্যিই তার পাশে হাঁটছে?
রাস্তার ধারের ঘাসফুলগুলোও রাতের শিশিরে ভিজে এক স্নিগ্ধ গন্ধ ছড়াচ্ছে। শাহাজ নিরবে হাঁটলেও রুহি যেন তার হৃদপিণ্ডের ধুকপুকানি স্পষ্ট শুনতে পাচ্ছে। হাটতে গিয়ে মাঝে মাঝে তাদের হাত দুটো খুব কাছাকাছি চলে আসছে, কিন্তু কেউ কারো হাত স্পর্শ করছে না। এই না ছোঁয়ার মাঝেই যেন এক গভীর অনুরাগের টান লুকিয়ে আছে। রুহি নিজের প্রতিটা কদম ফেলছে খুব সাবধানে, যেন কোনো শব্দ না হয়, যেন এই স্বপ্নিল মুহূর্তটা হুট করে ভেঙে না যায়।
শাহাজ হঠাৎ থামল। শাহাজ থামতেই রুহিও থমকে দাঁড়িয়ে তার দিকে তাকাল। শাহাজ আকাশের দিকে মুখ তুলে গভীর একটা শ্বাস নিয়ে বলল, “এই নিস্তব্ধতাটা অনুভব করতে পারছিস রুহি? মাঝেমধ্যে ভিড়ভাট্টার চেয়ে এই নীরবতা অনেক বেশি কথা বলে। মাঝে মাঝে এই নিরবতাই নিজেদের মনের অনেক কথাকেই, আমাদের অজান্তেই প্রকাশ করতে পারে।”
রুহি কোনো উত্তর দিল না, শুধু বড় বড় চোখে শাহাজের দিকে তাকিয়ে রইল। সে যেন কথা বলতে ভুলে গেছে, রুহি তখন কেবল বিমোহিত হয়ে সামনে দাড়িয়ে থাকা এই মানুষটাকে আর এই রাতটাকে নিজের হৃদয়ে গেঁথে নিতে ব্যস্ত।
নির্জন পিচঢালা পথ, মাথার ওপর রূপালি চাঁদ আর দুই পাশে নিস্তব্ধ প্রকৃতি—এই গন্তব্যহীন যাত্রায় দুজন হেঁটে চলেছে। শাহাজের ধীরস্থির কদমের সাথে পা মেলাতে মেলাতে রুহি একবার সামনের অজানার দিকে তাকাল। কৌতূহল সামলাতে না পেরে জিজ্ঞেস করল, “শাহাজ ভাই, আমরা কোথায় যাচ্ছি? সামনে!”
শাহাজ কেবল সংক্ষিপ্ত স্বরে উত্তর দিল, “হুম।”
রুহি ভ্রু কুঁচকে আবার প্রশ্ন করল, “সামনে কোথায় শাহাজ ভাই? জায়গাটা কি খুব কাছে, নাকি আরও দূরে যেতে হবে?”
শাহাজের দিক থেকে আবারো সেই যান্ত্রিক প্রতিধ্বনি, “ হুম।”
রুহি এবার কিছুটা বিরক্ত হলো। শাহাজের এমন দায়সারা উত্তরে তার ফুরফুরে মেজাজে যেন একটু মেঘ জমল। সে দাঁড়িয়ে পড়ে গাল ফুলিয়ে বলে উঠল, “কী শাহাজ ভাই! শুধু ‘হুম’ ‘হুম’ করছেন কেন? একটু সুন্দর করে গুছিয়ে কথা বলতে পারেন না? একটু সুন্দর ভাবে কথা বললে কি হয়!”
হঠাৎ শাহাজের চলন্ত পদযুগল থেমে গেল। সে ঘুরে দাঁড়াল। জ্যোৎস্নার আলোয় শাহাজের মুখটা এখন আরও বেশি রহস্যময়। সে রুহির বিরক্তিমাখা মুখটার দিকে গভীর ও স্নিগ্ধ চোখে তাকিয়ে শান্ত গলায় বলে উঠল, “তুই কি আমার প্রেমিকা যে তোর সাথে খুব রসিয়ে সুন্দর করে কথা বলব? যা বলছি শুনে চুপচাপ হাঁটতে থাক। কোথায় যাচ্ছি, সেখানে গেলেই দেখতে পাবি।”
শাহাজের এমন সপাটে উত্তরে রুহি যেন এক নিমেষে চুপসে গেল। তার অভিমানী মুখটা ছোট হয়ে এল। সে আপন মনে বিড়বিড় করে কিছুক্ষণ বকল, কিন্তু পরক্ষণেই শাহাজের দিকে তাকাতেই দেখল শাহাজ এখনো স্থির হয়ে তার দিকেই তাকিয়ে আছে। রুহি থতমত খেলো অতপর তার ঠোঁটের কোণে এবার একটা চপল হাসি ফুটিয়ে তুললো। সে আবারো শাহাজের পাশে পাশে পা মিলিয়ে হাঁটা শুরু করল।
হাঁটতে হাঁটতে রুহির মস্তিষ্কে শাহাজের বলা কথাটাই বারবার প্রতিধ্বনি হতে লাগল—‘তুই কি আমার প্রেমিকা?’ রুহি আনমনে আবারও থেমে গেল। শাহাজ কিছুটা এগিয়ে গেছে। শাহাজ এগিয়ে যেতেই রুহি পেছন থেকে আপাদমস্তক একবার শাহাজকে পর্যবেক্ষণ করল। দীর্ঘদেহী, স্মার্ট, সুঠাম গড়ন আর গাম্ভীর্যে মোড়া এক ব্যক্তিত্ব। রুহি মনে মনে ভাবল, ‘শাহাজ ভাই তো একদম পারফেক্ট! এমন একজন কমপ্লিট মানুষের কি সত্যিই কোনো প্রেমিকা নেই? নাকি আছে, অথচ গোপন করে রেখেছে?’ এই ভাবনাটা মাথায় আসতেই কেন জানি রুহির বুকটা ধক করে উঠল, মুখটা হঠাৎ উদাস হয়ে গেল।
ততক্ষণে শাহাজ অনেকটা এগিয়ে গেছে। রুহি দ্রুত পায়ে দৌড়ে গিয়ে আবার তার সমান্তরালে এল। আড়চোখে দেখল শাহাজ একদম স্বাভাবিক, তার দৃষ্টি সামনের দিকে নিবদ্ধ—যেন চারপাশের কোনো ভাবান্তরই তাকে স্পর্শ করছে না।
রুহি নিজের মনের সকল সংশয় দূর করতে হঠাৎ করেই প্রশ্ন করে বসল, “শাহাজ ভাই, আপনি কি কাউকে পছন্দ করেন? বা এমন কেউ কি আছে যার প্রতি আপনি দুর্বল?”
শাহাজ থমকে দাঁড়াল। চারপাশে পিনপতন নীরবতা। কয়েক সেকেন্ডের সেই স্তব্ধতা যেন অনন্তকাল মনে হলো রুহির কাছে। শাহাজ গভীর ও ধীরস্থির চাহনিতে রুহির চোখের দিকে তাকাল। তার সেই দৃষ্টি যেন তলোয়ারের মতো ধারালো, অথচ তাতে এক অদ্ভুত শীতলতা মিশে আছে। অন্যদিকে রুহির মনের ভেতর তখন কৌতূহলের এক উথাল-পাথাল ঝড় বইছে।
হঠাৎ নীরবতা ভেঙে শাহাজ তার সেই চিরচেনা গম্ভীর ও স্বাভাবিক টোনে কেবল একটি শব্দ উচ্চারণ করল, “না।”
রুহির অবচেতন মন যেন এই উত্তরটার জন্যই চাতক পাখির মতো তৃষ্ণার্ত ছিল। শাহাজ লক্ষ্য করল, তার ওই একটি ক্ষুদ্র শব্দে রুহির উৎকণ্ঠায় ভরা মুখটা মুহূর্তেই শরতের আকাশের মতো ঝলমলে হয়ে উঠল। যেন এক অন্যরকম প্রশান্তির আভা ছড়িয়ে পড়ল তার চোখেমুখে।
দুটি ব্যাকুল এখন মুখোমুখি দাঁড়িয়ে। চাঁদের আলোয় সিক্ত এই দুই মানব-মানবী যেন একে অপরের না বলা অনুভূতির সাক্ষী হয়ে রইল। কেউ কাউকে মুখ ফুটে কিছু বলছে না, অথচ এই নিস্তব্ধতার মাঝেই যেন এক দীর্ঘ প্রেমের মহাকাব্য রচিত হয়ে চলেছে।
শাহাজের সেই সংক্ষিপ্ত 'না' শব্দটি শোনার পর রুহির মনের সব মেঘ যেন এক নিমেষে কেটে গেল। তার ঠোঁটের কোণে যে হাসিটা ফুটে উঠল, তা জ্যোৎস্নার চেয়েও উজ্জ্বল। শাহাজ সেটা খেয়াল করল, কিন্তু বরাবরের মতোই কোনো মন্তব্য করল না। কিছুক্ষণ মুখোমুখি দাঁড়িয়ে থাকার পর শাহাজ আবারো হাঁটা শুরু করল। এবার রুহি আর পিছে নেই, সে একদম শাহাজের হাত ঘেঁষে হাঁটছে।
হাঁটতে হাঁটতে তারা এসে দাঁড়াল শহরের এক নির্জন লেকের পাড়ে। রাতের এই সময়ে এখানে কোনো জনমানব নেই। লেকের স্থির জলে চাঁদের প্রতিবিম্ব কাঁপছে। মৃদুমন্দ বাতাসে রুহির অবাধ্য চুলগুলো বারবার তার চোখের ওপর এসে পড়ছে। রুহি মুগ্ধ নজরে সব অবলোকন করলো। অতপর দুহাত দিয়ে লেকের রেলিং চেপে ধরে একটা গভীর তৃপ্তির শ্বাস নিল।
শাহাজ রুহির থেকে এক হাত দূরত্ব বজায় রেখে দাঁড়িয়ে। সে রুহির এই আনন্দিত রূপটা আড়চোখে দেখছে। রুহি হঠাৎ মাথা ঘুরিয়ে শাহাজের দিকে তাকিয়ে বলে উঠল, "শাহাজ ভাই, আপনি কি জানেন—আপনি যখন গম্ভীর হয়ে থাকেন, তখন আপনাকে ভীষণ ভয় লাগে। কিন্তু আজ কেন জানি আপনাকে একদম অন্যরকম লাগছে।"
শাহাজ ভ্রু কুঁচকে তাকাল। "কেমন অন্যরকম?"
রুহি একটু সাহস সঞ্চয় করে বলল, "একদম আপন কোনো মানুষের মতো। মনে হচ্ছে, এই রাতটা যদি কোনোদিন শেষ না হতো! এভাবেই যদি থমকে
যেতো "
শাহাজ এবার পুরোপুরি রুহির দিকে ঘুরল। তার সেই সম্মোহনী চোখের গভীরতা রুহিকে যেন পাথর করে দেয়। শাহাজ খুব ধীরপদে রুহির এক কদম কাছে এগিয়ে এল। রুহি ভয়ে আর উত্তেজনায় স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। শাহাজ তার হাতটা পকেট থেকে বের করে রুহির কপালে এসে পড়া একগুচ্ছ চুল আলতো করে সরিয়ে দিল। শাহাজের শিতল আঙুলের স্পর্শ রুহির কপালে লাগতেই তার সারা শরীরে যেন এক পশলা বিদ্যুৎ খেলে গেল।
শাহাজ নিচু স্বরে বলে উঠলো, "সব রাত যেমন শেষ হয়, এই রাতও শেষ হবে চঞ্চলা। কিন্তু কিছু মুহূর্ত থেকে যায়... যা মানুষ সারাজীবন মনে রাখে।"
"চঞ্চলা" শাহাজ আজ আরো একবার রুহির সামনে স্ব-জ্ঞানে নামটি উচ্চারিত করলো।
নামটি শুনেই রুহি পলকহীন চোখে শাহাজের চোখের মণির দিকে তাকিয়ে রইল। সে অনুভব করতে পারছে, শাহাজ হয়তো মুখে বলছে না, কিন্তু তার এই নীরবতা আর এই গভীর চাহনি অনেক না বলা কথারই ইঙ্গিত দিচ্ছে। এই নির্জন লেকের পাড়ে, দুই অপার্থিব হৃদয়ের মাঝে এক অদৃশ্য সুতোয় টান পড়ছে। তারা কেউ প্রেম স্বীকার করছে না, অথচ এই নিস্তব্ধতায় দুজনের নিশ্বাসের শব্দ এক হয়ে মিশে যাচ্ছে।
রুহি মনে মনে বলল, ‘শাহাজ ভাই, আপনি মনে না রাখলেও আমি জানি, আজ থেকে এই রাতের প্রতিটি স্মৃতি আমার হৃদয়ে কেবল আপনার নামেই লেখা থাকবে। এই অদ্ভুৎ অনুভূতির নাম কি তা আমাকে বের করতেই হবে!’
চাঁদের আলোয় ভেজা এই দুজন মানুষ একে অপরের অনুভূতির খুব কাছে দাঁড়িয়েও যেন এক অদ্ভুত সুন্দর দূরত্ব বজায় রেখে চলল—যে দূরত্বে কেবল ভালোবাসা থাকে, কিন্তু হারাবার ভয় থাকে না।
★★★
লেকের পাড়ের সেই মায়াবী আবেশ মুহূর্তেই যেন বিষাদে রূপ নিল। শাহাজ যেন চোখের পলকে নিজের রূপ বদলে ফেলল; একটু আগের সেই স্নিগ্ধতা ধুয়ে-মুছে সেখানে ফিরে এল এক কঠিন গাম্ভীর্য। সে রুহির কপাল থেকে হাত সরিয়ে নিয়ে এক কদম পিছিয়ে গেল। তার চোয়াল শক্ত হয়ে উঠল, কণ্ঠস্বর হয়ে গেল বরফের মতো শীতল।
পকেটে হাত গুঁজে ঘড়ির দিকে এক পলক তাকিয়ে শাহাজ অত্যন্ত গম্ভীর গলায় বলে উঠল, "রাত অনেক হয়েছে। এবার বাড়ি ফিরতে হবে। চল।"
রুহি বিস্ময়ে বিমূঢ় হয়ে তাকিয়ে রইল। একটু আগের সেই মানুষটা আর এই মানুষটার মধ্যে যেন আসমান-জমিন তফাত। সে কিছু বলতে চাইল, কিন্তু শাহাজের কঠিন চাউনি দেখে আর সাহস পেল না। দুজন আবার সেই পিচঢালা পথ ধরে বাড়ির দিকে হাঁটা শুরু করল। ফেরার পথে রুহি শাহাজের আকষ্মিক পরিবর্তন নিয়ে ভাবতে ভাবতেই হঠাৎই শাহাজের থেকে অনেকটা পিছিয়ে পড়ল। সে আনমনে ভাবতে লাগল—শাহাজ ভাই এমন কেন? এই মানুষটা কি মেঘের মতো? এই রোদ তো এই বৃষ্টি! এই নরম তো এই শক্ত! কেমন যেন হুট করে পাথরের মতো শক্ত হয়ে যায়?
এসব সাত-পাঁচ ভাবতে ভাবতে রুহি যখন নিজের ভাবনায় বিভোর, ঠিক তখনই নিস্তব্ধতা চিরে বিকট এক শব্দ হলো। অন্ধকারের আড়াল থেকে কোথা থেকে একটা কালো কুচকুচে কুকুর বেরিয়ে এসে রুহির দিকে তাকিয়ে সজোরে ঘেউ ঘেউ শব্দ করে উঠল।
আকস্মিক এই শব্দে আর ভয়ে রুহির আত্মা যেন কেঁপে উঠল। সে দিগ্বিদিক জ্ঞান হারিয়ে একছুটে গিয়ে সামনে থাকা শাহাজকে পেছন থেকে সজোরে জড়িয়ে ধরল। রুহির দুহাত শাহাজের পিঠ ছাপিয়ে তার বুকের ওপর শক্ত করে চেপে বসল। ভয়ে সে শাহাজের পিঠে মুখ গুঁজে থরথর করে কাঁপছে আর কম্পিত কণ্ঠে হাপাতে হাপাতে বলছে, "কু...কু...কুকুর! শা..হাজ ভাই কুকুর!"
শাহাজের জন্য এই স্পর্শটা ছিল সম্পূর্ণ অনাকাঙ্ক্ষিত। তার মতো গম্ভীর আর আত্মকেন্দ্রিক মানুষের জীবনে এটাই ছিল কোনো নারীর প্রথম নিবিড় আলিঙ্গন। এক মুহুর্তের জন্য শক্তপোক্ত মানবটি যেন তার হৃদয়ের ওপর থেকে সংযম হারিয়ে দিকহারা হয়ে পড়লো। রুহির শরীরের উষ্ণতা আর তার আতঙ্কিত হৃদস্পন্দন শাহাজ নিজের পিঠে স্পষ্ট অনুভব করতে পারল। এক মুহূর্তের জন্য শাহাজের সেই কঠিন গাম্ভীর্য যেন মোমের মতো গলে গেল; তার বুকের ভেতর এক অজানা শিহরণ বয়ে গেল। কিন্তু পরক্ষণেই সে নিজেকে সামলে নিল।
শাহাজ অত্যন্ত সাবধানে, কিন্তু কিছুটা রুক্ষভাবে রুহির হাত দুটো নিজের শরীর থেকে ছাড়িয়ে দিল। সে রুহির দিকে না তাকিয়েই গম্ভীর কণ্ঠে ধমকের সুরে বলে উঠল, "রাস্তাঘাট একটু দেখে হাঁটতে হয় রুহি। সামান্য কুকুরের ডাকে ভয় পেলে বাড়ি থেকে বেরিয়েছিস কেন। আর এখানে অহেতুক ভয় পাওয়ারই বা কী আছে? জলদি পা চালিয়ে চল।"
শাহাজের এমন শীতল আচরণে রুহির লজ্জা আর অপমানে কুঁকড়ে যাওয়ার অবস্থা হলো। তার কান দুটো গরম হয়ে উঠল। এই প্রথম সে কাউকে এভাবে জড়িয়ে ধরেছে, আর তার প্রতিদান মিলল এমন এক তুচ্ছতাচ্ছিল্যে! অপমানের রেশের থেকেও লজ্জাটাই তাকে বেশি ঘিরে ধরেছে। সে লজ্জায় মাথা নিচু করে মুখ লুকিয়ে শাহাজের পেছনে পেছনে দ্রুত হাঁটতে শুরু করল।
রাতের শেষ প্রহরে দুই ছায়া যখন বাড়ির গেটের সামনে এসে পৌঁছাল, তখন রুহির মনে একটাই প্রশ্ন—শাহাজ ভাই কি তবে সত্যিই এক কঠিন পাথর, যার মনে কোনো দাগ কাটা যায় না? নাকি নারকেলের মতো ভেতরটা নরম শুধু সামনে কঠিক হয়ে থাকার ভান ধরে থাকেন।
★★★
রাতের শেষ প্রহরে বাড়িটা যখন গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন, রুহি তখন গেট পেরিয়ে বাগানের অন্ধকার চিরে ধীরপায়ে ঘরের দরজার দিকে এগোচ্ছিল। তার বুকের ভেতরটা এখনো শাহাজের সেই সান্নিধ্য আর অনাকাঙ্ক্ষিত আলিঙ্গনের রেশে কাঁপছে। কিন্তু দরজার চৌকাঠ পার হতেই রুহির সারা শরীর যেন বরফ হয়ে গেল।
সামনে যমদূতের মতো দাঁড়িয়ে আছেন বড় আব্বু মোস্তফা কামাল।
আচমকা বড় আব্বুকে সামনে দেখে রুহির দুচোখ ছানাবড়া হয়ে গেল, মুখটা যেন ফ্যাকাশে হয়ে পাংশুটে আকার ধারণ করল। মোস্তফা কামালের ডায়াবেটিস আছেন যার দরুন প্রাই রাতে তিনি পানি খাওয়ার জন্য ঘুম থেকে ওঠেন। আজ জগ খালি থাকায় ড্রয়িংরুমে এসেছিলেন পানি নিতে, কিন্তু সদর দরজা খোলা দেখে তাঁর কৌতূহল জাগে। এতো রাতে কে বেরিয়েছে দেখার জন্য বাইরে বেরোতেই তিনি রুহিকে চোরের মতো ঘরে ঢুকতে দেখলেন।
মোস্তফা কামাল বজ্রগম্ভীর কণ্ঠে প্রশ্ন করলেন, "এত রাতে কোথায় গিয়েছিলে রুহি?"
রুহির কণ্ঠস্বর ভয়ে বুজে এল, সে থরথর করে কাঁপতে কাঁপতে কোনোমতে জবাব দিল, "বা... বাইরে একটু হাঁটতে গিয়েছিলাম বড় আব্বু।"
মেয়ের মুখে এমন দায়িত্বজ্ঞানহীন কথা শুনে মোস্তফা কামালের মেজাজ সপ্তমে চড়ল। তিনি ধমকে উঠলেন, "তুমি এত রাতে একা একা বাইরে হাঁটতে গিয়েছিলে? এতো সাহস কবে বাড়লো রুহি!"
রুহি ভয়ে চোখ বন্ধ করে তড়িঘড়ি বলে উঠল, "আমি একা যাইনি বড় আব্বু, শাহাজ ভাই আমাকে হাঁটতে নিয়ে গিয়েছিল।"
'শাহাজ' নামটি শোনামাত্রই মোস্তফা কামাল যেন বৈদ্যুতিক শক খেলেন। তাঁর রাগী চেহারায় এক অদ্ভুত চমক আর স্তব্ধতা নেমে এল। তিনি আর একটি শব্দও উচ্চারণ করলেন না। শুধু হাত দিয়ে ইশারা করে রুহিকে রুমে যেতে বললেন। রুহি মাথা নিচু করে প্রায় দৌড়ে নিজের রুমে পালিয়ে গেল।
মোস্তফা কামাল এবার ধীরপায়ে বাগানে গিয়ে দাঁড়ালেন। জ্যোৎস্নার আলোয় তিনি দেখলেন, বাগানের শেষ মাথায় গেটের কাছে শাহাজ প্যান্টের পকেটে দুহাত গুঁজে অটল পাহাড়ের মতো দাঁড়িয়ে আছে। তার দৃষ্টি সরাসরি বাবার চোখের ওপর নিবদ্ধ। বাবা আর ছেলের মাঝে কোনো কথা হলো না, কিন্তু সেই নিস্তব্ধ রাতে তাদের চোখের চাহনিতে এক দীর্ঘ নীরব দ্বন্দ্ব ফুটে উঠল।
শাহাজের চোখে কোনো অপরাধবোধ নেই, বরং এক ধরনের জেদ আর সতর্কতা; আর বাবার চোখে রাজ্যের বিস্ময় আর প্রচ্ছন্ন হুঁশিয়ারি। যেন চোখের পলকেই তারা একে অপরকে কঠিন কোনো বার্তা দিয়ে দিল।
এদিকে, এই পুরো নাটকীয় ঘটনার সাক্ষী হয়ে আছে ওপরের ছাদ। পিয়াস, যার বিদেশ থাকার দিনগুলোতে সিগারেটের অভ্যাস হয়েছিল, সে প্রায় ঘুম না আসলে রাতের নির্জনে ছাদের এক কোণে দাঁড়িয়ে সিগারেট টানে, আজো সে সেটাই করছিলো। সিগারেট খেতে গিয়ে হঠাৎই গেট খোলার আওয়াজে, এতো রাতে কে এলো কৌতুহল হয়ে সে যখন কার্নিশ দিয়ে নিচে তাকাল, তার হাতের জ্বলন্ত সিগারেটটা প্রায় পড়ে যাওয়ার উপক্রম হলো।
সে দেখল রুহি ভেতরে ঢুকছে, পিয়াস বেশ অবাক হলো, এরপরই এাটু পেছনে চোখ যেতেই সে দেখলো রুহির ঠিক পেছনেই দাঁড়িয়ে আছে শাহাজ। রুহি যখন গেইট থেকে বাড়ির দিকে এগিয়ে যাচ্ছিল, শাহাজের দৃষ্টি শুধু মাএ রুহিতেই বিদ্যমান ছিল। হঠাৎ রুহি থমকে দাঁড়ালো, পিছন ফিরে শাহাজের দিকে দৃষ্টি দিল, অতপর একটি মুচকি হাসি। পরক্ষণে হাত নাড়িয়ে বিদায় জানালো। এত রাতে শাহাজের সাথে রুহিকে নির্জনে বাইরে দেখে, তার ওপর রুহির এমন ভাব ভঙ্গিমা, পিয়াসের ভেতরটা হঠাৎই জ্বলে উঠলো। তার ওপর এখন মোস্তফা কামাল ও শাহাজের এমন নিরবতা পিয়াসের কাছে যেন সবটাই ঘোলাটে ও রহস্যময় মনে হতে লাগলো।
চলবে______