#অন্তহীন_প্রেম_আমার
#আফীফা_আফনান
#পর্ব_৩৭ (প্রথমাংশ)
[কপি করা নিষিদ্ধ]
খন্দকার বাড়ির ড্রয়িংরুমের ভেতর তখন যেন টানটান উত্তেজনার এক অদৃশ্য কুরুক্ষেত্র! বাতাসের গুমোট স্তব্ধতা ভেঙে হঠাৎই এক চিৎকার ভেসে এল—
"ছয়! ছয়! ছয়! আল্লাহ একটা ছয় দাও!"
মুগ্ধর চিৎকারে যেন ড্রয়িংরুমের ছাদ ফেটে যাওয়ার জোগাড়। সে এতো জোড়ে চিৎকার করছে যে বাড়ির দেওয়ালে ও তার শব্দ যেন প্রতিধ্বনিত হচ্ছে। এদিকে লুডুর বোর্ডের ওপর ঝুঁকে পড়েছে চার-চারটি মুখ। মাঝখানে রাখা রঙচটা পুরনো লুডুর বোর্ডটিকে ঘিরে গোল হয়ে বসে আছে রুবি, মুগ্ধ, মমতাজ বেগম আর সিমি। উত্তেজনার পারদ এখন তুঙ্গে, কারণ ম্যাচের ভাগ্য এখন মাত্র একটি ছক্কার ওপর ঝুলে আছে।
মমতাজ বেগম চশমাটা নাকের ডগায় নামিয়ে অত্যন্ত গম্ভীর মুখে গুঁটির দিকে তাকিয়ে আছেন। তাঁর লাল গুঁটিটা একদম জয়ের শেষ সীমানায় দাঁড়িয়ে, কিন্তু দাবার চালের মতো তিনি এখানেও বেশ হিসেবি। তাঁর ঠিক পাশেই বসা মুগ্ধ উত্তেজনায় রীতিমতো কাঁপছে। তার হাতে ধরা প্লাস্টিকের ছক্কা চালার সেই ঘটিটা। সে মনে মনে সমস্ত দোয়া-দরুদ পড়ছে যাতে অন্তত একটা 'ছয়' পড়ে।
অপরদিকে রুবি মিচকি হাসছে, তার গুঁটিগুলো বেশ সুবিধাজনক অবস্থানে। সে মুগ্ধর উত্তেজনা দেখে টিপ্পনি কেটে বলল, "যত যাই করিস মুগ্ধ, আজ কিন্তু আমরাই জিতবো। তোর কপালে আজ বড়জোর এক কি দুই আছে!"
মুগ্ধ রুবির কথায় পাত্তা না দিয়ে চোখ বন্ধ করে ঘটিটা জোরে ঝাকিয়ে বোর্ডের ওপর চাল দিল। খটখট শব্দ করে ছক্কাটা ঘুরতে ঘুরতে গিয়ে মাঝে গিয়ে থামল। সবার নজর এখন এক জায়গায় স্থির।
"ইয়েসসস! ছয়! দাদি দেখো ছয় পড়েছে!" মুগ্ধর আনন্দ দেখে কে! সে লাফিয়ে উঠে বলতে গেলে একটা ছোটখাটো নাচই দিয়ে দিল।
সিমি এতক্ষণ চুপচাপ নিজের গুঁটি সাজাচ্ছিল, সে একটু মুখ কুঁচকে বলল, "আরে অত লাফানোর কী আছে? ছয় পড়েছে তো কী হয়েছে, এখনো তো খেলা বাকি।"
আসলে সিমির গুঁটিগুলো সব ঘরের ভেতর আটকে আছে, একটাও বেরোতে পারছে না। তাই তার মেজাজটা একটু খিটখিটে। অন্যদিকে মমতাজ বেগম নাতির আনন্দ দেখে মনে মনে হাসলেও মুখে গাম্ভীর্য বজায় রেখে বললেন, "বেশি লাফালাফি করিস না মুগ্ধ, মন দিয়ে খেল। লুডু খেলায় শেষ দান পর্যন্ত বিশ্বাস নেই।"
ড্রয়িংরুমের মাঝখানে যখন লুডুর বোর্ড ঘিরে যখন চারজনের টানটান উত্তেজনা আর চিল চিৎকার চলছে, ঠিক তার পেছনের সোফাটায় বসে আছে বাড়ির অন্যরা। একদিকে তারুণ্যের উচ্ছ্বাস, আর অন্যদিকে বড়দের স্নিগ্ধ আড্ডা—সব মিলিয়ে খন্দকার বাড়ির ড্রয়িংরুমটা আজ যেন জীবন্ত এক ক্যানভাস।
সোফার এক কোণে বসে ইয়াসমিন বেগম আর পারভীন সুলতানা মৃদু হাসছেন। মমতাজ বেগমের মতো একজন মুরুব্বি মানুষ যেভাবে নাতি-নাতনিদের সাথে পাল্লা দিয়ে লুডু খেলায় মেতেছেন, তা দেখে ইয়াসমিন বেগম রসিকতা করে বললেন, "আপা দেখেন, আম্মা তো দেখি মুগ্ধর মতোই ছোট হয়ে গেছেন, দেখেন এদের চেয়েও তিনি খেলায় বেশি সিরিয়াস! হারজিতের নেশা ওনার এখনো গেল না।" পারভীন সুলতানাও ভাবির কথায় সায় দিয়ে হেসেই খুন।
বিপরীত দিকে মিমির জগতটা সম্পূর্ণ আলাদা। সে সোফায় শরীর এলিয়ে দিয়ে একমনে ফোনে আঙুল চালিয়ে যাচ্ছে। তার কানে দামী এয়ারপড, মাঝে মাঝে ফোনের স্ক্রিন দেখে মৃদু হাসছে। এই পারিবারিক কোলাহল বা লুডুর ছক্কার আওয়াজ তার কানে পৌঁছাচ্ছে কি না সন্দেহ। তার কাছে এই আড্ডাগুলো বড্ড সেকেলে আর একঘেয়ে।
এ সবের মাঝে সোফার ঠিক কোনায় রিমু তার স্বভাবজাত শান্ত ভঙ্গিতে বসে আছে। নাকের ডগায় জিরো পাওয়ারের চশমাটা ঝুলিয়ে সে মেডিকেলের এক মোটা বইয়ে চোখ বুলাচ্ছে। চারপাশে এত শোরগোল, অথচ তার একাগ্রতা দেখার মতো। মাঝে মাঝে বইয়ের পাতা উল্টে সে একবার পডুয়াদের মতো চশমাটা ঠেলে দিচ্ছে।
কিন্তু সবচাইতে অদ্ভুত অবস্থা রুহির। তার কোলের ওপর মোস্তফা কামালের সদ্য কিনে দেওয়া ট্যাব, তাতে চলছে তার অনলাইন ক্লাসের লেকচার কিন্তু এই ক্লাসের একটা শব্দও তার মস্তিষ্কে যেন ঢুকছে না। সে স্থির দৃষ্টিতে সামনের স্কিনের দিকে তাকিয়ে থাকলেও, কিন্তু তার মন পড়ে আছে অন্য কোথাও। রুহির মনের ভেতর এখন অজস্র প্রশ্নের আনাগোনা, যার প্রতিটির শুরু এবং শেষ একজনকেই ঘিরে আর সে হলো তার 'শাহাজ ভাই' ।
গত রাতের সেই রহস্যময় উপস্থিতি, সেই চন্দন আর কস্তুরীর ঘ্রাণ, আর সবচাইতে বড় ধাঁধা—শাহাজ ভাই কীভাবে জানলেন যে এই দামী হাতঘড়িটিই রুহির দীর্ঘদিনের পছন্দ ছিল? তার ওপড় সকালে বিন্তির হঠাৎ আগমন কিন্তু শাহাজ জানলো রুহি জানলোনা। এই প্রশ্ন সে শাহাজকে করতে না পারলেও বিন্তিকে ঠিক করেছে। তখন বিন্তি তাকে জানিয়েছে শাহাজই তাদের জন্য রিকশা ঠিক করে দিয়েছে, এবং রিকশাওয়ালাকে বলে দিয়েছে নিয়ম করে বিন্তিকে রিসিভ করে রিকশা নিয়ে তাদের গেটে দাঁড়াতে।
একদিকে শাহাজ ভাইয়ের সেই গম্ভীর চাহনি আর শাসন আবার আড়ালে তার জন্য এতো যত্ন নেওয়া ও খেয়াল রাখা। সেই সাথে আজ সকালের নাস্তার টেবিলে তার পক্ষ নিয়ে কথা বলা—সব মিলিয়ে রুহির ভাবনার সুতো ছিঁড়ে যাচ্ছে। রুহির একবার মনে হয় পড়শী ঠিকই বলেছিলো কিন্তু পরক্ষণেই আবার সেই ভাবনা ঝেড়ে ফেলে।
সে জানে, এই প্রশ্নগুলোর উত্তর পেতে হলে তাকে সরাসরি শাহাজ ভাইয়ের মুখোমুখি হতে হবে। কিন্তু সেই অটল পাহাড়ের মতো মানুষটার সামনে দাঁড়িয়ে প্রশ্ন করার সাহসটুকু জোগাড় করা এই মুহূর্তে রুহির জন্য হিমালয় জয়ের চেয়েও কঠিন।
রুহি আনমনে তার কবজিতে থাকা সেই রোজ গোল্ড কালারের ঘড়িটি একবার স্পর্শ করল। ঠান্ডা ধাতুর ছোঁয়ায় তার মনে হলো, উত্তরগুলো হয়তো এই সময়ের কাঁটাতেই কোথাও লুকিয়ে আছে, শুধু তাকে সঠিক মুহূর্তের জন্য অপেক্ষা করতে হবে।
এদিকে রান্নাঘর থেকে সরিষার তেলে মুড়ি মাখানোর সুঘ্রাণ ভেসে আসছে; তানজিনা বেগম আর নাসরিন বেগম রাতের খাবারের আয়োজনে ব্যস্ত। এই ব্যস্ততার ফাঁকেও নাসরিন বেগম সবার জন্য চানাচুর আর মুড়ি মাখিয়েছে। ওদিকে ড্রয়িংরুমে তখন লুডু খেলা জমজমাট । মুগ্ধর জেতার একদম দোড়গোড়ার ঠিক আগ মুহূর্ত, কিন্তু ঠিক তখনই কোনো প্রকার শব্দ না করে সদর দরজা দিয়ে ভেতরে প্রবেশ করল শাহাজ। আজ সাথে গাড়ি ছিল না বলে বাড়ির কেউ টেরই পায়নি তার উপস্থিতি।
শাহাজ ভেতরে পা দিয়েই প্রথম দৃষ্টিটা নিক্ষেপ করল সোফায় বসে থাকা রুহির দিকে। কিন্তু রুহি নিজের ঘোরে এতটাই মগ্ন যে শাহাজের আসাটা তার ইন্দ্রিয়ে পৌঁছালো না; সে যেমনি জড়বস্তুর মতো বসে ছিল, তেমনি রইল। শাহাজ রুহিকে ভালোভাবে পরখ করে এবার নিজের তীক্ষ্ণ দৃষ্টি সরালো লুডু খেলায় মত্ত মুগ্ধর দিকে। মুগ্ধ তখন পরম উৎসাহে ছক্কার চাল দেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে, ঠিক তখনই শাহাজের বজ্রকণ্ঠ শোনা গেল—
"তোর পড়াশোনা নেই? পড়া ফেলে রেখে এসব করিস বাড়িতে?"
আকস্মিক শাহাজের কন্ঠে মুগ্ধ যথারিতি ভ্যাবাচেকা খেয়ে গেলো, নিজের পেছনে শাহাজকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে মুহূর্তেই মুগ্ধর সেই হাসিহাসি মুখটা যেন ফুটো হওয়া বেলুনের মতো চুপসে গেল। শাহাজের গলার আওয়াজে ড্রয়িংরুমের সবার হুল্লোড়ও এক লহমায় থেমে গেল। ঠিক সেই সময়েই রান্নাঘর থেকে মুড়ির বোল হাতে বেরিয়ে এলেন নাসরিন বেগম। শাহাজের এমন প্রশ্ন কানে যেতেই তিনি যেন মোক্ষম এক সুযোগ পেলেন। অভিযোগের ঝুলি খুলে তিনি শাহাজের দিকে তাকিয়ে বলতে শুরু করলেন—
"কাকে পড়ার কথা বলছিস বাবা? ও তো একটা আস্ত পড়া-চোর! সারাদিন মোবাইল চালাতে দে, গেম খেলতে দে—ওসব নিয়ে ওর কোনো ক্লান্তি নেই। কিন্তু পড়তে বসতে বললেই যত রাজ্যের অজুহাত শুরু হয়; কখনো মাথা ব্যথা, কখনো পেট ব্যথা, কখনো কান ব্যাথা। তুই ও বাড়ি থাকতে গিয়ে যে পড়ে আসতো জিজ্ঞেস কর সামনেই আছে, বাড়ি এসে রাতে একবারের জন্য কি ও বই ছুঁয়ে দেখেছে? পড়তে বললে বলে সব নাকি পড়া শেষ!"
নাসরিন বেগমের অভিযোগ শুনে শাহাজ মুগ্ধর দিকে এক শীতল ও কঠোর দৃষ্টি নিক্ষেপ করল। মুগ্ধ তখন চোরের মতো মুখ নিচু করে বসে আছে, যেন মাটির সাথে মিশে যেতে পারলেই বাঁচে। শাহাজের সেই চিরচেনা গম্ভীর কণ্ঠ আবারও ড্রয়িংরুমে প্রতিধ্বনিত হলো—
"নাস্তা শেষ করেই নিজের বই নিয়ে আমার রুমে আসবি। এক সেকেন্ডও যেন দেরি না হয়। কুইক!"
শাহাজ ভাইয়ের এমন কড়া ধমকে মুগ্ধর অবস্থা করুণ হয়ে পড়লেও নাসরিন বেগম মনে মনে বেশ খুশি হলেন। তিনি জানেন, এই বাড়ির ছোটদের মধ্যে রুবি থেকে শুরু করে মুগ্ধ পর্যন্ত সবাই যদি কাউকে বাঘের মতো ভয় পায়, তবে সে কেবল শাহাজ। শাহাজের শাসনের সামনে কারোর টু শব্দটি করার সাহস নেই। শাহাজ যেমন শাসন করে ঠিক তেমন সবাইকে ভালোবেসে আগলেও রাখে।
ড্রয়িংরুমের সেই থমথমে পরিস্থিতির মাঝেই শাহাজ আর কাউকে কিছু না বলে সিঁড়ির দিকে পা বাড়াল। নাসরিন বেগম পেছন থেকে পরম মমতায় জিজ্ঞেস করলেন, "নাস্তা করবি না বাবা? তোর পছন্দের মুড়ি মাখিয়েছি সাথে এলাচি দিয়ে চা খেয়ে যা।"
সিঁড়ি দিয়ে উঠতে উঠতেই শাহাজ ঘাড় না ফিরিয়েই গম্ভীর গলায় জবাব দিল, "এখন কিছু খাব না সেঝ মা। শুধু এক কাপ চা উপরে পাঠিয়ে দাও চা হলেই হবে ।"
শাহাজ উপরে চলে যাওয়ার পর নাসরিন বেগম রান্নাঘরের দিকে এগোলেন চা বানাতে। ওদিকে রুহি সোফায় পাথরের মতো বসে শাহাজের প্রস্থান দেখছিল। যেন ভুমিকম্পের মতো এলো আর সুনামির মতো সব গুলিয়ে দিয়ে চলে গেলো। কিছুক্ষণ পরেই নাসরিন বেগম ধোঁয়া ওঠা চায়ের কাপ নিয়ে ড্রয়িংরুমে এসে রুহিকে ডেকে বসলেন। রুহি মায়ের ডাক শুনে কাছে এগিয়ে যেতেই তিনি কাপটি তার হাতে ধরিয়ে দিয়ে বললেন, "যাতো মা, এটি তোর শাহাজ ভাইকে দিয়ে আয়। মুগ্ধ তো পড়তে বসবে, ওকে ডিস্টার্ব করিস না।"
অন্য সময় হলে রুহি হয়তো মায়ের সাথে একটু খুনসুটি করত বা যেতে আপত্তি জানাত, কিন্তু আজ সে এক বাধ্য মেয়ের মতো নিঃশব্দে চায়ের কাপটি হাতে নিয়ে উপরে উঠে গেল।
চায়ের কাপ হাতে নিয়ে রুহি শাহাজের রুমের দরজার সামনে গিয়ে কয়েক মুহূর্ত স্থির হয়ে দাঁড়াল। নিজের এলোমেলো শ্বাস আর ধুকপুক করা বুকটাকে শান্ত করার চেষ্টা করল সে। অতঃপর ধীরলয়ে রুমের ভেতর প্রবেশ করল। রুমে ঢোকা মাত্রই এক মায়াবী সুঘ্রাণ রুহির ইন্দ্রিয়কে যেন আচ্ছন্ন করে ফেলল।
এবার আর হালকা নয় সেই পরিচিত কড়া চন্দন আর কস্তুরীর সুবাস যেন রুমের প্রতিটি কোণে মিশে আছে। এতোক্ষন রুহির মস্তিষ্কে চলতে থাকা সব দুশ্চিন্তা যেন সেই মায়াবী সুগন্ধিতে নিমেষেই মিলিয়ে গেল। সে এক অজানা আবেশে রুমের মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে ।
নিস্তব্ধ রুমে রুহি যখন একা দাঁড়িয়ে শাহাজের পরিপাটি ঘরটি খুঁটিয়ে দেখছিল, ঠিক তখনই পাশ থেকে বাথরুমের দরজা খোলার শব্দ হলো। রুহি পাশ ফিরে তাকাতেই তার চোখের মণি স্থির হয়ে গেল। শাহাজ বাথরুম থেকে বেরিয়ে এসেছে; উদোম শরীর, পরনে কেবল একটি কালো ট্রাউজার। দেখেই বোঝা যাচ্ছে সদ্য গোসল সেড়ে বেরিয়েছে যার ফলে পানির বিন্দু বিন্দু কনা তার পেটানো শরীরে চিকচিক করছে। সে দরজায় একটি সাদা তোয়ালে দিয়ে নিজের ভেজা চুল মুছছে।
এদিকে রুহি হা করে বড় বড় চোখ মেলে তাকিয়ে রইল। সুঠাম দেহের শাহাজকে এই অবস্থায় দেখে সে যেন নড়ার শক্তি হারিয়ে ফেলেছে। লজ্জায় চোখ সরিয়ে নেবে নাকি পাথর হয়ে দাঁড়িয়ে থাকবে—তা যেন তার মাথায় আসছিল না।
শাহাজ রুহিকে এভাবে তাকিয়ে থাকতে দেখেও বিন্দুমাত্র বিচলিত হলো না। সে স্বাভাবিকভাবেই হেঁটে এসে রুহির একদম সামনে দাঁড়াল। রুহি এতটাই ঘোরের মধ্যে ছিল যে, শাহাজ যে তার নিঃশ্বাসের দূরত্বে চলে এসেছে, তাও সে টের পেল না। শাহাজ হঠাৎই রুহির মুখ বরাবর ঝুঁকে একটি ফুঁ দিল। যার ফলে রুহির কপালের অবাধ্য চুলগুলো কিছুটা নড়ে উঠল, কিন্তু তার ঘোর তখনো কাটল না। রুহির এমন অবস্থা দেখে শাহাজের ঠোঁটের কোণে সেই বিরল বাঁকা হাসিটি ফুটে উঠল। অতঃপর সে হাত বাড়িয়ে রুহির কপাল বরাবর তর্জনী দিয়ে একটি টোকা দিল।
সেই তীক্ষ্ণ টোকার আঘাতেই রুহির এবার হুঁশ ফিরল। হঠাৎ শাহাজকে এত কাছে দেখে সে কিছুটা ভড়কে গিয়ে ছিটকে দুই কদম পেছনে সরে এলো। এবং মাথা নিচু করে সে কোনমতে আড়ষ্ট হয়ে দাঁড়িয়ে রইল; রুহির এক হাতে ধরা চায়ের কাপ, আর অন্য হাতে সে ওড়নার কোনা আঙুলে পেঁচিয়ে চলেছে।এদিকে শাহাজ এক দৃষ্টিতে রুহির দিকে তাকিয়ে তার এমন অবস্থা পর্যাবেক্ষন করছে, মুখ চোখ একদম স্বাভাবিক কোন জড়তা বা সংকোচ তার ভেতর তেখা যাচ্ছে না। এভাবেই কিছু সেকেন্ড কাটলো হঠাৎ শাহাজ তার হাত সামনের দিকে বাড়াল।
আকস্মিক শাহাজের এমন কাজে রুহি আরও কিছুটা জড়োসড়ো হয়ে পড়লে শাহাজ শান্ত গলায় বলে উঠলো —
"আমার চা টা?"
রুহি যেন ভুলেই গিয়েছিল সে কেন এখানে এসেছে। শাহাজের চা চাওয়াতে সে ভীষণ লজ্জিত হলো। কাঁপাকাঁপা হাতে সে চায়ের কাপটি শাহাজের দিকে এগিয়ে দিলে শাহাজ বিনাবাক্যে তা নিয়ে নিলো। কাপ হাতে নিয়ে শাহাজ চাতে এক চুমুক দিয়েই মুখটা কুঁচকে ফেলল। তবুও এক ঢোকে পুরো কাপ চা শেষ করে সে চোখ তুলে রুহির দিকে তাকিয়ে বলল, "চা তো একদম ঠাণ্ডা করে ফেলেছিস। যা, আমার জন্য আরেক কাপ চা নিয়ে আয়।"
রুহি কিছু একটা বলতে চেয়েও পারল না, কারণ ঠিক সেই মুহূর্তেই কাঁধে ব্যাগ নিয়ে মুগ্ধ রুমে ঢুকল। শাহাজ দ্রুত একটি টি-শার্ট গায়ে জড়িয়ে নিয়ে মুগ্ধকে আদেশের সুরে পড়তে বসার জন্য তাড়া দিল।
মুগ্ধও শাহাজের কথা শুনে তার খাটের দিকে যেতে যেতে রুহির দিকে তাকিয়ে তাকে জানাল যে তানজিনা বেগম নিচে রুহিকে ডাকছেন। রুহি আর কোনো কথা না বলে রুম থেকে বেরিয়ে যাওয়ার উপক্রম করল। দরজার কাছে গিয়ে সে অবচেতনেই একবার পেছন ফিরে তাকাল। মুহূর্তের জন্য তার চোখাচোখি হলো শাহাজের সাথে; শাহাজও তখন তার দিকেই তাকিয়ে ছিল। রুহি দ্রুত নজর নামিয়ে কোনোমতে সেখান থেকে সড়ে নিচে নেমে এল।
নিচে এসে তানজিনা বেগমকে না দেখে রুহি সোজা রান্নাঘরের দিকে গেলো। তানজিনা বেগম রুহিকে দেখে তাকে আর রুবিকে নিয়ে বের হওয়ার কথা জানালেন এবং তৈরি হওয়ার তাড়া দিলেন। রুহি কথায় মাথা নেড়ে রান্নাঘর থেকে বের হওয়ার সময় নাসরিন বেগমকে চুপিচুপি বলে গেল শাহাজের জন্য আরেক কাপ চা পাঠিয়ে দিতে। কথাটি বলেই সে দ্রুত পায়ে দোতলায় নিজের রুমে গিয়ে ঢুকল, যেন কেউ তাকে তাড়া করছে। শাহাজের চোখ এড়াল না রুহির এই অস্থিরতা। শাহাজ আনমনেই মুচকি হসলো, সামনের দিকে নজর ঘুরাতেই দেখল মুগ্ধ তার দিকে অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে। যেন বিরল কিছু দেখে ফেলেছে। মুগ্ধকে এভাবে তাকাতে দেখে শাহাজ আবারও নিজের চেহারায় গাম্ভীর্য ফুটিয়ে তুললো এবং ধমকের সাথে মুগ্ধকে পড়ায় মনোযোগ দিতে বলল। শাহাজের এক ধমকেই মুগ্ধ চোখ নামিয়ে মিনমিনে স্বরে পড়তে শুরু করল।
"জোড়ে পড়তে পারিস না? " শাহাজের রাগান্বিত কন্ঠ শুনে মুগ্ধ এবার উচ্চস্বরে পড়তে লাগলো।
এদিকে কিছুক্ষণ পর রুহি রেডি হয়ে নিচে নামল। তানজিনা বেগম আর রুবি তখন তার জন্য ড্রয়িংরুমে অপেক্ষা করছিল। রুহি নামতেই তিনজন মিলে রাতের শহরের উদ্দেশ্যে বাড়ি থেকে বেরিয়ে গেল। কিন্তু রুহির মনে তখনো শাহাজের সেই বাঁকা হাসি আর কপালে দেওয়া সেই টোকার রেশ টাটকা হয়ে লেগে আছে।
শহরের ব্যস্ত রাস্তায় রাতের আলো-আঁধারিতে ঘন্টাখানেক ধরেই তানজিনা বেগম আর রুবি কেনাকাটায় মগ্ন। আগামীকালই পারভীন সুলতানা, মিমি আর সিমিরা চলে যাবে, তাই মোস্তফা কামাল সাহেব নিজেই বলে দিয়েছেন তাদের জন্য কিছু উপহার কেনাকাটা করতে। রুহিও হেটে হেটে তাদের সাথে টুকটাক জিনিস দেখছিল।
কেনাকাটা করতে করতে হঠাৎই রুহি চারপাশে একবার নজর বুলালো অতঃপর রাস্তার ওপাড়ে একটি বাইক শোরুমের দিকে রুহির নজর আটকে গেল। সেখানে সারিবদ্ধভাবে অনেকগুলো দামী বাইক সাজানো, কিন্তু একটি বিশেষ বাইক দেখামাত্রই রুহির ঠোঁটের কোণে এক চিলতে হাসি ফুটে উঠল। তানজিনা বেগম আর রুবি যখন গৃহস্থালির কিছু কাঠের শৌখিন সামগ্রী কিনতে ব্যস্ত, রুহি সেই সুযোগে তাদের না জানিয়েই রাস্তা পার হয়ে শোরুমটির ঠিক সামনে গিয়ে দাঁড়াল।
বাইকটি দেখতে ঠিক শাহাজের সেই পুরনো বাইকটির মতো—কুচকুচে কালো। তবে এটি সেই মডেলের নয় বরং নতুন লেটেস্ট আপডেট ভার্সন, যা দেখতে আগেরটির চেয়েও অনেক বেশি আকর্ষণীয়। বাইকটির দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতেই হঠাৎ রুহির মনে একরাশ বিষাদ নেমে এল। শাহাজের কাছে তার আগের সেই বাইকটি ছিল প্রাণের চেয়েও প্রিয়। কিন্তু রুহি মনে করে সেদিন তার কারণেই মোস্তফা কামাল রাগের মাথায় সবার সামনে শাহাজের প্রিয় বাইকটি পুড়িয়ে ছাই করে দিয়েছিলেন।
সেই দাউ দাউ করে জ্বলে ওঠা আগুনের স্মৃতি মনে পড়লে আজও রুহিকে অপরাধবোধে দগ্ধ করে। তার মনে হয়, আজ শাহাজ বাইকহীন কেবল তার জন্যই।
মন খারাপের মাঝেই একটি দীর্ঘশ্বাস ফেলে রুহি নিজের ব্যাগ থেকে মোবাইল বের করল। বাইকটির কয়েকটি ছবি তুলে নিল সে— মনে মনে কোনো এক পরিকল্পনা আঁকা হয়ে গেলো তার । ঠিক সেই সময় ওপাশে রুবি আর বড় মা কেনাকাটা শেষ করে রুহিকে না দেখে অস্থির হয়ে খুঁজতে শুরু করেন। হঠাৎ রুবির নজর পড়ল রাস্তার ওপাড়ে বাইক শোরুমের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা রুহির ওপর। রুবি হাত নেড়ে জোরে জোরে রুহিকে ডাকতে শুরু করল।
রুবির ডাক শুনে রুহি পেছনে ফিরে তাকাল এবং "আসছি" ইশারা করে রাস্তা পার হওয়ার জন্য যখন পা বাড়াল। কিন্তু ঠিক সেই মুহূর্তেই রুবি দেখতে পেল একটি গাড়ি প্রচণ্ড গতিতে রুহির দিকে ধেয়ে আসছে। রুবি আতঙ্কে চিৎকার করে রুহিকে সাবধান করতে চাইল, কিন্তু ততক্ষণে অনেক দেরি হয়ে গেছে।
গাড়িটি একদম রুহির কাছাকাছি চলে এসেছে। আকস্মিক নিজের সামনে বিপদ দেখে রুহি যেন হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে স্তব্ধ হয়ে চোখমুখ খিচে মাঝরাস্তায় দাঁড়িয়ে পড়ল।
এদিকে গাড়িটি যখন রুহিকে ধাক্কা দিতেই যাবে, ঠিক তখনই একটি বলিষ্ঠ হাত রুহিকে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরে সজোরে একপাশে টেনে নিল। প্রচণ্ড এক হেঁচকা টানে রুহি গিয়ে আছড়ে পড়ল এক শক্ত বুকের ওপর। আতঙ্কে রুহি চোখ দুটো শক্ত করে বন্ধ করে নিয়েছিল। কয়েক সেকেন্ড পর নিজেকে অক্ষত আবিষ্কার করে সে যখন ধীরে ধীরে চোখ মেলল, দেখল সে কারো বাহুবন্ধনে শক্তভাবে আবদ্ধ।
তাকে কে এভাবে ধরেছে তা দেখতে মাথা তুলে তাকাতেই রুহির বিস্ময়ের সীমা রইল না। তার সামনে দাঁড়িয়ে স্বয়ং শাহাজ! তার চোখ দুটো উদ্বেগে অস্থির, কপালে চিন্তার ভাঁজ। এই জনবহুল রাস্তায় এই সংকটময় মুহূর্তে শাহাজ কোথা থেকে উদয় হলো, তা রুহির কল্পনারও বাইরে ছিল। রুহিকে তাকাতে দেখে শাহাজ অত্যন্ত নরম ও বিচলিত কণ্ঠে বলে উঠল—
"ব্যথা পেয়েছিস রুহি? লেগেছে কোথাও? বল আমাকে, এখনই ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাচ্ছি।"
রুহি তখনো ঘোরের মধ্যে। সে অবিশ্বাস্য চোখে শাহাজের দিকে তাকিয়ে রইল। ঘোরলাগা অবস্থায় কোনোমতে মাথা নেড়ে অস্পষ্ট স্বরে বলল যে সে ঠিক আছে।
ওদিকে রাস্তার ওপাড়ে তানজিনা বেগম আর রুবির আত্মা যেন খাঁচাছাড়া হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু রুহিকে সুস্থ অবস্থায় দেখে এবং পাশে শাহাজকে দেখে তাদের পরানে যেন প্রান ফিরে এল। তারা দ্রুত পায়ে রাস্তা পার হয়ে সেদিকে দৌড়ে আসতে লাগল।
দুজনকে আসতে দেখে শাহাজ আস্তে করে রুহিকে ছেড়ে দিল, কিন্তু সড়লো না পাশে দাঁড়িয়ে রইল। তানজিনা বেগম এবং রুবি এসেই রুহির কোথাও লেগেছে কিনা চেক করতে লাগলো, অতঃপর তানজিনা বেগম ধমকে উঠলেন, "না বলে এপাড়ে এসেছিলি কেন, বলে আসা যেত না? আর এভাবে না দেখে কে রাস্তা পাড় হয় বোকা মেয়ে!"
তখনই পাশ থেকে রুবি বলে উঠলো, "ভাগ্যিস ভাই এখানে উপস্থিত ছিলো না হলে আজকে কি হত আমার তো ভেবেই এখন হাত পা কাঁপছে!"
এরপরে রুবি শাহাজের দিকে তাকিয়ে কিছুটা অবাক হয়ে প্রশ্ন করলো," ভাই তুমি হঠাৎ এখানে কিভাবে এলে? তুমি....."
তানজিনা বেগম মাঝপথে থামিয়ে দিয়েই বলে উঠলো, "কিভাবে এসেছে সেটা বড় কথা নয়, ও এসেছে দেখে আমরা এত বড় বিপদ থেকে রক্ষা পেলাম না হলে আজ যে কি হতো? রুহি কিছু হলে আজ আমি নাসরিনকে কিভাবে মুখ দেখাতাম।"
অতঃপর তানজিনা বেগম আর এক মুহূর্ত দেরি না করে বাড়ির পথে রওনা দিতে হুকুম ছুড়লেন, কিন্তু এসবের মাঝেও রুহির দৃষ্টি ছিলো তার শাহাজ ভাইয়ের দিকে, শাহাজের চেহারা তখনও থমথমে, যেন খুব প্রিয় কিছু হারানোর ভয় তা চোখে মুখে স্পষ্ট, হঠাৎই রুহি শাহাজের দিকে তাকিয়ে বলে উঠলো, "শাহাজ ভাই আপনি কিভাবে জানলেন যে আমরা এখানে আছি, বিশেষ করে আমি এপাশে আছি? আপনি কি আমার পিছু নিচ্ছিলেন?"
চলবে..........