#অন্তহীন_প্রেম_আমার
#আফীফা_আফনান
#পর্ব_৪৩
[কপি করা নিষিদ্ধ]
কার্তিক মাস এখনো তার নিজস্ব মহিমা নিয়ে এখন প্রকৃতিতে পূর্ণরূপে বিরাজমান। ভোরের শিশিরভেজা ঘাস আর হালকা কুয়াশার চাদর ছাপিয়ে চারদিকে এখন ছাতিম ফুলের তীব্র ও মাদকতাময় সুবাস। কার্তিকের সন্ধ্যায় যখন এই ছাতিম ফুল ফোটে, তখন তার উগ্র অথচ মিষ্টি গন্ধে বাতাস যেন ভারী হয়ে ওঠে। এ যেন এক প্রাচীন মায়া, যা হেমন্তের আগমনীকে পূর্ণতা দেয়। প্রকৃতির এই স্নিগ্ধ পরিবর্তনের সাথে তাল মিলিয়ে খন্দকার বাড়ির পরিবেশটাও এখন বেশ থিতু হয়েছে।
খন্দকার এন্টারপ্রাইজ আবারও তার পুরনো তেজ ফিরে পেয়েছে। ধসে পড়া সাম্রাজ্যকে শাহাজ যেভাবে টেনে তুলেছে, তার সুফল এখন দৃশ্যমান। এদিকে মোস্তফা কামালও এখন পুরোপুরি সুস্থ। ব্যবসায়িক উন্নতির গ্রাফ দেখে তাঁর মেজাজ আর মন দুটোই এখন ফুরফুরা। সবচাইতে বড় স্বস্তির বিষয় হলো, গত কয়েকদিনে ছেলের সাথে তাঁর কোনো বাকবিতণ্ডা হয়নি।
সেদিন বাবার অনুরোধের সুরে গলে গিয়ে শাহাজ অফিসে যেতে রাজি হয়েছিল। যার ফল স্বরুপ পরদিনই যথাসময়ে শাহরিয়ার কবির ও শাহাবুদ্দিন সাহেবের সাথে কাব্যকে নিয়ে শাহাজ অফিসে উপস্থিত হয়।
ভার্সিটিতে ক্লাস না থাকায় সেদিন পুরোটা সময় সে অফিসের খুঁটিনাটি বিষয় নিয়ে সকলের সাথেই আলোচনা করে। হঠাৎ করে শাহাজ অফিস যাওয়ার জন্য রাজি হওয়াতে পরিবারের সবাই ভেবেছিল শাহাজ হয়তো এবার থিতু হবে, পুরোপুরিভাবে অফিস সামলাবে। কিন্তু সেদিন রাতেই অফিস থেকে ফিরে ডাইনিং টেবিলে শাহাজ সবার সামনে স্পষ্ট করে জানিয়ে দিল—সে নিয়মিত অফিসে জয়েন করবে না। সে কেবল ততদিনই যাবে যতদিন না কাব্য সবকিছু হাতে-কলমে শিখে নিচ্ছে। এছাড়া ভবিষ্যতে যদি কোম্পানি কখনো খুব বড় কোনো সংকটে পড়ে, একমাত্র তখনই সে হাল ধরবে এর আগে নয়। কারণ স্বরূপ সেও এও জানিয়েছিল যে, চাকরি নিয়ে সে বেশ সন্তুষ্ট ও আরামে আছে। আপাতত সে শুধু তার ভার্সিটির চাকরিটাতে ফোকাস করতে চায়।
প্রথম দিকে মোস্তফা কামাল এই কথা শুনে বেশ মন খারাপ করেছিলেন। কিন্তু পরে কবির সাহেব তাঁকে নিরিবিলিতে বোঝালেন যে, "বড় ভাই, জোর করে কিছু হয় না। ও যখন যাওয়া শুরু করেছে, করুক। করতে করতেই দেখবেন এক সময় মায়ার টানে জড়িয়ে যাবে। আপাতত ওই দু-তিন ঘণ্টাই সই।" ভাইয়ের যুক্তিতে মোস্তফা কামাল কিছুটা শান্ত হলেন। সেই অনুযায়ী এখন শাহাজের প্রধান কাজ কাব্যকে তৈরি করা। যার জন্য শাহাজ প্রতিদিন কয়েক ঘণ্টার জন্য অফিসে যাচ্ছে—এই ভেবেই মোস্তফা কামাল সন্তুষ্ট।
তবে মোস্তফা কামালের সবচাইতে বড় স্বস্তির জায়গাটা ছিল অন্যখানে। বিশ্ববিদ্যালয় আর অফিসের ব্যস্ততায় শাহাজের এখন দম ফেলার সময় নেই এখন প্রায় শাহাজেরর বাড়ি ফিরতে রাত হয়ে যায়। ওদিকে রুহিও কোচিং আর বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষার প্রস্তুতিতে নিজেকে ডুবিয়ে রেখেছে। যার ফলে রাতে শাহাজ যখন বাড়ি ফেরে, রুহি তখন পড়ার টেবিলে ব্যস্ত থাকে। ফলে এই কয়েকদিন তাদের মধ্যে কোনো দেখা-সাক্ষাৎ বা কথা হয়নি। মোস্তফা কামাল ভাবছিলেন দিনগুলো বুঝি এভাবেই শান্তিতে কেটে যাবে। কিন্তু কথায় আছে না যে মানুষের সুখ খুব বেশিদিন সয় না।
এদিকে সময় এখন তার নিজস্ব গতিতে ঘুরে কালবেলায় এসে দাঁড়িয়েছে। হাতে আর মাত্র একটা দিন; পরশুই রুহির জীবনের এক বড় পরীক্ষা—বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষা। আর এই পরীক্ষাকে কেন্দ্র করেই খন্দকার বাড়িতে আবারও শুরু হতে যাচ্ছে নতুন কোনো সমীকরণ।
★★★
কার্তিকের হিমেল পরশমাখা রাত। খন্দকার বাড়িতে সবাই যখন গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন, রুহির ঘরের টেবিল ল্যাম্পটা তখনও জ্বেলে রাখা। হাতে মাত্র আর একটা দিন। এরপরই সেই কাঙ্ক্ষিত মুহূর্ত—বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি পরীক্ষা। রুহির টেবিলের অবস্থা দেখলেই বোঝা যায় গত কয়েকটা দিন তার ওপর দিয়ে কী ঝড় বয়ে গেছে।
পুরো টেবিল জুড়ে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে মোটা মোটা সাধারণ জ্ঞানের বই, ল' অ্যাডমিশন গাইড আর অসংখ্য মলাটহীন পুরোনো ডায়েরি। ডায়েরির পাতায় পাতায় কলমের কালিতে আঁকিবুঁকি করা গুরুত্বপূর্ণ সাল, সংবিধানের প্রধান ধারা আর আন্তর্জাতিক আইনের জটিল সব সংজ্ঞা। এদিকে রুহির চোখের নিচে কালচে ছায়া পড়েছে, নির্ঘুম রাতের সাক্ষী হয়ে আছে তার লালচে চোখ দুটো। পড়ার টেবিলের এক কোণে পড়ে আছে আধ খাওয়া এক কাপ ঠান্ডা চা, যা খাওয়ার কথা সে বেমালুম ভুলেই গিয়েছিল পড়ার চাপে।
প্রতিটি ভর্তি পরীক্ষার্থীর মধ্যে যেমন একটা অদ্ভুত অস্থিরতা কাজ করে, রুহিও তার ব্যতিক্রম নয়। যেহেতু তার লক্ষ্য আইন বিভাগ, তাই সাধারণ জ্ঞানের বিশাল সমুদ্র তাকে পাড়ি দিতে হচ্ছে। মাঝে মাঝে তার মনে হচ্ছে—সবই তো পড়লাম, আবার মনে হচ্ছে কিছুই তো মনে নেই! টেবিলের সামনে দেয়াল জুড়ে সে ছোট ছোট চিরকুটে লিখে রেখেছে গুরুত্বপূর্ণ সব 'লিগ্যাল টার্মস' আর ম্যাক্সিম। পড়ার সময় সে অবচেতন মনে হঠাৎ হঠাৎই দাঁত দিয়ে কলমের পেছনটা কামড়াচ্ছে, কখনোবা আনমনে মাথার চুলগুলো আঙুলে জড়াচ্ছে—এগুলোই জানান দিচ্ছে তার ভেতরের প্রচণ্ড মানসিক চাপের কথা।
এদিকে রুহির এই দীর্ঘ যাত্রার প্রতিটি ধাপে বটগাছের মতো ছায়া দিয়ে দাঁড়িয়ে ছিলেন মোস্তফা কামাল। রুহি যখন পড়ার চাপে দিশেহারা, তখন বড় আব্বুই সবটা আগলে রেখেছেন। অনলাইনের জটিল ফরম ফিলাপ থেকে শুরু করে পেমেন্ট করা—সবই মোস্তফা কামাল নিজের তদারকিতে করিয়েছেন। এমনকি আজ বিকেলে যখন রুহি পড়ার টেবিলে মুখ গুঁজে ছিল, মোস্তফা কামাল নিঃশব্দে রুমে ঢুকে তার হাতে পরীক্ষার অ্যাডমিট কার্ডটি তুলে দিয়ে গেছেন। লেমিনেটিং করা সেই কার্ডটির দিকে রুহি বারবার তাকাচ্ছে; এটি যেন কেবল একটি কাগজ নয়, বরং তার স্বপ্নপূরণের ছাড়পত্র।
বলতে গেলে বিগত কয়েক দিন ধরে রুহি নিজেকে একদম ঘরবন্দি করে ফেলেছে। বাড়ির মানুষের সাথে তার কথা হয় কেবল খাওয়া আর টুকটাক কেউ তার রুমে এলে তখন। এদিকে ডাইনিং টেবিলে বসলেও তার চোখ থাকে শূন্যে, মনের ভেতর চলে ব্রিটিশ আইন বা রাষ্ট্রীয় কাঠামোর কোনো কঠিন তথ্যের রোমন্থন। এমনকি তার প্রিয়।মানুষগুলোর ডাকও যেন আজ তার কানে পৌঁছাচ্ছে না। তার ধ্যান-জ্ঞান এখন কেবল ওই একটি ওএমআর শিট আর একশো নম্বরের একটি প্রশ্নপত্র।
রুহি জানে, এই একটা দিনই ঠিক করে দেবে তার সামনের কয়েকটা বছর কোন ক্যাম্পাসের ঘাসে তার পা পড়বে। নিজেকে একজন দক্ষ ‘অ্যাডভোকেট’ হিসেবে দেখার স্বপ্ন তাকে এক মুহূর্ত স্থির হয়ে বসতে দিচ্ছে না। শেষ সময়ের রিভিশন দিতে গিয়ে সে যখন কোনো চেনা প্রশ্নের উত্তর মেলাতে পারছে না, তখন অভিমানে তার চোখ ভিজে উঠছে। ঠিক পরক্ষণেই বড় আব্বুর সেই ভরসা মাখানো মুখটার কথা মনে করে আবারও চোখের জল মুছে নিজেকে শক্ত করছে সে। একজন যোগ্য যোদ্ধার মতোই সে প্রস্তুত হচ্ছে জীবনের এই বড় লড়াইয়ের জন্য।
~~~~~তখন নিঝুম রাত।
পড়ার টেবিলে বই-খাতার পাহাড়ের সামনে রুহি যেন এক ক্লান্ত মানবী, রাত গভীর হওয়ার সাথে সাথে তার দু-চোখ জুড়ে ঘুমের অবাধ্য বাসা। চেয়ারে বসে বসেই সে ঘুমে ঢুলুঢুলু করছে, কলম ধরা হাতটাও যেন বারবার শিথিল হয়ে আসছে। তন্দ্রার ঘোরে যখন তার চারপাশটা আবছা হয়ে আসছিল, ঠিক তখনই নিস্তব্ধতা চিরে ভেসে এল সেই অতি পরিচিত, মন মাতাল করা মাউথ অর্গানের সুর।
যে সুরের মোহনীয় মায়ায় রুহি জীবনে প্রথমবার ভালোবাসার আচ্ছন্ন হয়েছিল, আজ গভীর রাতে সেই চেনা সুর কানে আসতেই তার তন্দ্রা যেন এক নিমেষে ছুটে গেল। সেই সাথে পুরো শরীরের লোমগুলোও যেন মুহূর্তেই দাঁড়িয়ে গেল, সেই সাথে এক শিরশিরে শীতল অনুভূতি তার শিরদাঁড়া বেয়ে বয়ে গেল। রুহি আর বসে থাকতে পারল না। বুক চিরে এক তীব্র ক্রোধ জেগে উঠল পিয়াসের ওপর। সে জানে, এই সুর পিয়াসই বাজায়; এই সুরের প্রেমে পড়েই তো পিয়াসের প্রতি তার যত দুর্বলতা। এতগুলো বছর পর আজ আবারও সেই একই সুর স্পষ্টভাবে শুনে রুহি মনে মনে ফুঁসে উঠে বলে উঠল, "আবার কোন নতুন ছলনায় নামলেন পিয়াস ভাই? একবার ছলনা করে কি মন ভরেনি আপনার?"
রুহি খেয়াল করল, এর আগেও কয়েকবার সে এই সুর আবছা শুনেছে, কিন্তু আজকে সুরটা একদম জীবন্ত, যেন খুব কাছ থেকে কেউ বাজিয়ে চলেছে। কিন্তু পরক্ষণেই মনে হলো সুরটি ক্রমশ দূরে সরে যাচ্ছে। রুহি আর স্থির থাকতে পারল না। এক অদ্ভুত ঘোরের মধ্যে সুর অনুসরণ করে সে কক্ষ থেকে বেরিয়ে এল। জনমানবশূন্য দীর্ঘ করিডোর পেরিয়ে সে যখন বুঝতে পারল সুরটি ছাদের দিক থেকে ভেসে আসছে, তখন তার দ্বিধা আর ভয় দুটোই বাড়ল।
তবুও সে এগিয়ে গেলো, কিন্তু তৃতীয় তলা পেরিয়ে ছাদের সিঁড়িতে পা রাখতেই এক অজানা আতঙ্ক তাকে গ্রাস করতে চাইল। রুহি এবার মনে মনে ভাবলো, "এত রাতে একা একা ছাদে যাওয়াটা কি ঠিক হবে?" কিন্তু হঠাৎই সেই মোহনীয় সুরটি আবারও বেজে উঠল। সুরটি যেন তাকে মন্ত্রমুগ্ধের মতো টানছে। পিয়াসকে হাতেনাতে ধরে তার মনের সব জমানো কথা শুনিয়ে দেওয়ার জেদ নিয়ে এক বুক সাহস জোগাড় করে, গভীর এক নিশ্বাস টেনে রুহি ছাদে পা রাখল।
কিন্তু রুহি যেই না সিঁড়ি বেয়ে ছাদে পা রাখলো ঠিক তখনই সেই চিরচেনা সুরটি আচমকা বন্ধ হয়ে গেল। চারপাশ ডুবে গেল এক গা ছমছমে নিস্তব্ধতায়। কার্তিকের হালকা শীতের হিমেল বাতাসে রুহির সর্বাঙ্গ যেন কেঁপে উঠল। ভয়ে ভয়ে সে ছাদের ভেতরে প্রবেশ করলো, চারপাশটা একটু ভালো করে দেখল, হঠাৎই তার চোখ পরল সামনের দিকে, আর সেদিকে চোখ পড়তেই রুহি যেন স্তব্ধ হয়ে গেল। কারন সামনের কর্নারে তার দিকে পিঠ করে দাঁড়িয়ে আছে একটি অবয়ব।
সেই চওড়া পিঠ দেখেই রুহির নিশ্বাস যেন এক সেকেন্ডের জন্য বন্ধ হয়ে গেল। সে অস্ফুট স্বরে বলে উঠল, "শাহাজ ভাই...!"
রুহির কাছে দৃশ্যটি অবাস্তব মনে হচ্ছিল। সে উত্তেজিত হয়ে বলে উঠল, "শাহাজ ভাই, আপনি? আপনি এই সুর বাজাচ্ছেন? আপনি কোথায় পেলেন এটা? এই সুর তো পিয়াস..."
ঠিক তখনই শাহাজ পেছনে ফিরল। তার চোখ-মুখ প্রথমটায় একদম শক্ত, যেন কোন কারনে রেগে আছে, কিন্তু পরক্ষনেই রুহিকে দেখে তা মুহূর্তেই কোমল হয়ে গেল। অতঃপর শাহাজ কানে থাকা হেডফোনটা খুলে অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল, "এত রাতে না ঘুমিয়ে তুই এখানে কী করছিস?"
শাহাজকে হেডফোন খুলতে দেখে রুহি বুঝতে পারল, রুহি যে এতোক্ষন ডাকলো বা সেই সুর শাহাজ আসলে কিছুই শোনেনি। অতঃপর এক দীর্ঘশ্বাস ফেলে শান্ত গলায় জবাব দিল, "পরশুদিন ভর্তি পরীক্ষা, খুব ভয় আর টেনশন হচ্ছে, তাই ঘুম আসছিল না। তাই ভাবলাম একটু ছাদ থেকে......."
এদিকে শাহাজের তীক্ষ্ণ নজর রুহির ক্লান্ত চোখের ওপর নিবদ্ধ হলো। হঠাৎ শাহাজকে এভাবে তাকাতে তেখে রুহি ভাবলো হয়তো শাহাজ বকবে বা ধমক দিয়ে বসবে, কিন্তু এমন কিছুই হলো বরং শাহাজ আকস্মিক তার গম্ভীর কণ্ঠে অথচ শান্ত ভাবে বলে উঠলো, "আমার পাশে এসে বস, রুহি।"
আকস্মিক শাহাজের এমন আহবানে রুহি বিনাবাক্যে এগিয়ে গিয়ে তার পাশে বসলো। নিঝুম রাতের ছাদ। মাথার ওপর একফালি চাঁদ আর নিচে কার্তিকের হিমেল হাওয়ার দীর্ঘশ্বাস। রুহি বসতেই শাহাজ রুহির পাশে একটু দূরত্ব রেখে বসল। রুহির চোখেমুখে থাকা দুশ্চিন্তার রেখাগুলো শাহাজের তীক্ষ্ণ নজর এড়াল না।
"খুব ভয় করছে?" শাহাজের কন্ঠস্বরে নমনীয়তা।
"হুম" রুহির ক্ষুদ্র উত্তর কিন্তু তাতে যেন একরাশ ভয় আর হতাশা মিশে আছে।
"এতো ভয় কিসের? আমার জানামতে তুই নিজেকে পরিক্ষার জন্য ভালোভাবেই তৈরি করেছিস।"
"তবুও কেন জানি খুব ভয় করছে।" রুহির সরল স্বীকারোক্তি।
হঠাৎ শাহাজ রুহির দিকে গভীর দৃষ্টি নিক্ষেপ করলো,"এতো ভয় পাওয়ার কারন কি? দেখি বল আমাকে, আমার রুহি এতোটা কি নিয়ে ভয় পাচ্ছে শুনি?" শাহাজের এহেন বাক্যে রুহি এবার তার দিকে ফিরে তাকালো, অতঃপর বললো, "আমি এই জীবনে যা সবচাইতে বেশি চেয়েছি তাই হারিয়েছি। যেটা পাওয়া ইচ্ছে পোষন করেছি বা আঁকড়ে ধরতে চেয়েছি তাই আমার থেকে দূরে সড়ে গিয়েছে। তাই ভয় হয় এবারও যদি আমি ব্যর্থ হই।
যদি সবার আশানুরূপ সাফল্য অর্জন করতে না পারি।" কথাগুলো বলতে বলতে এবার রুহি তার দৃষ্টি নিচের দিকে স্থির করলো।
এদিকে রুহি কথা শেষ হতেই শাহাজ কিছুক্ষণ চুপ রইলো, অতঃপর আকাশের দিকে তাকিয়ে শান্ত গলায় বলতে শুরু করল:
"রুহি, জীবনটা না এই আকাশের মতো। মাঝেমধ্যে মেঘ এসে হঠাৎ যেমন চাঁদটাকে ঢেকে দেয়, মনে হয় চারপাশটা কত অন্ধকার! কিন্তু মেঘ কি সারা জীবন থাকে? একটু বাতাস এলেই কিন্তু আকাশটা আবার পরিষ্কার হয়ে যায়। তোর এই ভর্তি পরীক্ষা, এই টেনশন—সবই সেই হঠাৎ আসা ক্ষণস্থায়ী মেঘের মতো।"
শাহাজের কথায় রুহি অবাক হয়ে তার দিকে তাকালো। শাহাজ বুঝলো রুহি তাকিয়ে আছে তাই সে তার অভ্যস্ত গম্ভীর কিন্তু মায়াবী কণ্ঠে আবার বলে উঠলো:
"তুই ভয় পাচ্ছিস কারণ তুই হারতে চাস না। আর এই হারের ভয়টাই মানুষকে সবচেয়ে বেশি দুর্বল করে দেয়। মনে রাখবি, বইয়ের পাতার কয়েকটা প্রশ্ন তোর মেধা বা তোর ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করার ক্ষমতা রাখে না। তুই যখন ছোট ছিলি, তখন পড়ে যাওয়ার ভয়ে কি হাঁটা বন্ধ করে দিয়েছিলি? দিসনি। তবে আজ কেন একটা পরীক্ষার ভয়ে নিজের ওপর বিশ্বাস হারিয়ে ফেলছিস?"
শাহাজ এবার একটু ঘুরে রুহির চোখের দিকে সরাসরি তাকালো। তার চোখের সেই আত্মবিশ্বাসের ছটা যেন রুহির হৃদয়ে গিয়ে বিঁধল। অতঃপর শাহাজ মৃদু হেসে বলল:
"নিজের লক্ষ্যটাকে অর্জুনের তীরের মতো স্থির কর। চারপাশের সব কোলাহল বন্ধ করে শুধু নিজের সামর্থ্যের ওপর ভরসা রাখ। রুহি, তুই জানিস না তোর ভেতরে কতটা জেদ লুকিয়ে আছে। তুই দুর্বল নোস, তুই সেই মেয়ে যে চাইলে পাহাড় ডিঙাতে পারে। তাই বলছি নিজেকে ভেঙে পড়তে দিস না। পরশু যখন পরীক্ষার হলে বসবি, তখন ভাববি তুই শুধু পরীক্ষা দিচ্ছিস না, তুই নিজের স্বপ্নকে সত্যি করার প্রথম সিঁড়িতে পা রাখছিস। দেখবি তোর নিজের মনোবলই তোকে তর স্বপ্নের দ্বারপ্রান্তে নিয়ে দাঁড় করিয়েছে।"
এদিকে শাহাজের প্রতিটি শব্দ রুহি মনোযোগ দিয়ে শুনছিলো, যেন রুহির কানে এতোক্ষন কোনো জাদুকরী মন্ত্রের বাজছিল। এতক্ষণের যে টেনশন তাকে কুরে কুরে খাচ্ছিল, শাহাজের সেই ধীরস্থির কথাগুলো শোনার পর রুহির মনে হলো—সত্যিই তো, ভয় পাওয়ার কী আছে? সে তো একা নয়, তার এই পরিশ্রমের সাক্ষী এই রাত, এই নিস্তব্ধতা।
রুহি যখন নিজেই নিজেকে সাহস যোগাচ্ছে ঠিক তখনই শাহাজ আলতো করে রুহির মাথায় হাত রেখে বলল, "সাফল্য মানে শুধু ভালো রেজাল্ট করা নয় রুহি, সাফল্য মানে হলো প্রতিকূলতার সামনে বুক চিতিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা। আর তুই সেই সাহসী মেয়েটাই হয়ে দেখা। আমি জানি, তুই পারবি।"
এদিকে শাহাজের কথা শেষ হতেই তার প্রতিটি কথাতে রুহি যেন অনুভব করল, তার বুকের ভেতরের পাথরগুলো যেন নিমেষেই নেমে গেছে। সেই সাথে রুহির মনের ভয়গুলোকে নিছক দুঃস্বপ্নের মতো উড়িয়ে দিয়েছে। শাহাজের এই শান্ত ভঙ্গি আর তপ্ত আশ্বাস তাকে নতুন করে বাঁচার এবং লড়ার শক্তি জোগালো। অন্ধকার ছাদের সেই কোণে দাঁড়িয়ে রুহি প্রথমবার অনুভব করল—ভয় নয়, বরং জয়ের নেশাটাই এখন তার চোখে বেশি উজ্জ্বল।
এদিকে, শাহাজ আর রুহি যখন ছাদের কার্নিশে বসে কথা বলাতে মগ্ন তখনই পিয়াস বাড়িতে ফিরলো। আধঘণ্টা আগে সিগারেটের নেশায় বাড়ি থেকে বেরিয়েছিল সে। আর এমন রাত বিরাতে বেড়িয়ে সিগারেট খাওয়া পিয়াসের পুরোনো স্বভাব। তাই পিয়াস যখন বাড়ি ফিরলো, সদর গেইট ডিঙিয়ে বাগান ফেলে ঘরের দিকে আসতেই তার হঠাৎ ছাদের দিকে নজর গেলো। আর যা দেখলো তাতে তার বুকটা যেন জ্বলে উঠল। সে দেখল, কার্নিশে শাহাজ আর রুহি খুব কাছাকাছি বসে নিবিড়ভাবে কথা বলছে। এতো রাতে দুজনকে কাছাকাছি দেখেই ঈর্ষায় পিয়াসের হাতের আঙুলগুলো মুষ্টিবদ্ধ হয়ে গেল। শুধু আজ নয় পিয়াস এর আগেও দুজনকে এমন কাছাকাছি দেখেছে যাতে করে তার মাথাতে কিছু একটা চিন্তা এলো যার ফলে তা ভেবেই পিয়াসের ক্রোধ যেন আরো বাড়লো।
এদিকে শাহাজের সান্নিধ্যে রুহি যেন বেমালুম ভুলেই বসেছিলো সে ছাদে কেন পা রেখেছিলো। অপরদিকে অনেক রাত হওয়ায় একসময় শাহাজ রুহিকে ঘরে যাওয়ার পরামর্শ দিল। রুহিও বুঝলো অনেক রাত হয়ে গিয়েছে, তাই সেও উঠে দাঁড়ালো, অতওপর পা বাড়ালো নিজ রুমের দিকে। কিন্তু দরজার কাছে গিয়ে হঠাৎ সে থমকে দাঁড়ালো, পেছন ফিরে মিষ্টি এক হাসিতে বলল, "থ্যাঙ্ক ইউ শাহাজ ভাই, আপনার কথাগুলোতে অনেক সাহস পেলাম। এই মুহূর্তে আমার সত্যিই কাউকে খুব প্রয়োজন ছিল যাকে আমি আমার মনের সকল কথা জানাতে পারব। আর আজকের এই নিঝুম রাতে আপনিই আমার সে সঙ্গী হিসেবে সামনে এলেন। গুড নাইট।"
কথাগুলো বলেই রুহি সিঁড়ি বেয়ে নিচে নেমে গেলো। এদিকে রুহি চলে
যাওয়ার পর ছাদের প্রতিটি ধূলিকণায় যেন তার ফেলে যাওয়া রেশটুকু তখনও লেপ্টে আছে। রুহি চলে গেলো কিন্তু শাহাজ তখনো নড়লোনা যেখানে ছিলো সেখানে স্থির দাঁড়িয়ে রইল, যেন নড়লে এই মায়াবী ঘ্রাণটুকু হারিয়ে যাবে। মাথার ওপর অসীম আকাশ, আর নিচে তার হৃদয়ে বয়ে চলা এক কালবৈশাখী ঝড়। অতঃপর শাহাজ তার পকেট থেকে সেই লাল মাউথ অর্গানটি বের করে আনল, যা আজ রাতে তার আর রুহির মাঝে এক অদৃশ্য সুতো হয়ে কাজ করেছে।
সেটি হাতের তালুতে ঘষতে ঘষতে শাহাজ আকাশের ধ্রুবতারার দিকে অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল। তার চোখ দুটি তখন এক অদ্ভুত নেশায় টইটম্বুর। হঠাৎই সে চাপা স্বরে সে বলে উঠল:
"রুহি... তুই জানিস না, তোকে ঘিরে আমার এই আসক্তি ঠিক কতটা গভীর। আমি শুধু তোকে ভালোবাসি না , আমি তোকে নিয়ে বেঁচে থাকি। তোকে সাফল্যের চূড়ায় দেখাটা শুধু তোর স্বপ্ন নয়, ওটা আমার অস্তিত্বের লড়াই। আমি নিজের কাছে নিজে শপথ করেছি—তোর চলার পথে যত কাঁটা আসবে, সব আমি নিজের রক্ত দিয়ে পিচ্ছিল করে দেব, তবুও তোকে এক বিন্দু আঁচড় লাগতে দেব না।"
শাহাজ থামলো তার কণ্ঠস্বর গভীর থেকে গভীরতর হতে লাগল। তার প্রতিটি শব্দে মিশে ছিল এক দুর্ভেদ্য অধিকারবোধ। সে যেন এক মৌন সাধক, যে শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে শুধু এক রমণীর আরাধনা করে চলেছে। অতঃপর সে আবার বললো:
"যতদিন না তুই নিজের পায়ে শক্ত করে দাঁড়াচ্ছিস, ততদিন আমি এভাবেই তোর ছায়া হয়ে থাকব। আমি হব তোর সেই অদৃশ্য বর্ম, যা তোকে পৃথিবীর সব নোংরা দৃষ্টি থেকে আড়াল করে রাখবে। আমি জানি, আড়ালে থেকে তোকে আগলে রাখা কতটা যন্ত্রণার; কিন্তু তোর সফলতার জন্য আমি এই নরক যন্ত্রণা হাসিমুখে মেনে নেব। আমি চাই তুই প্রজাপ্রতির মতো উড়ে আকাশ ছুঁয়ে দেখ, আর আমি নিচ থেকে তোর সেই জয়ের আলোয় নিজেকে পুড়িয়ে ছাই করি"
বলতে বলতেই হঠাৎ শাহাজের চোয়াল শক্ত হয়ে এল। তার দু-চোখে এক আদিম নেশা আর তীব্র তৃষ্ণা ফুটে উঠল। সে যেন মনে মনে রুহির ললাটে তার অদৃশ্য মালিকানা লিখে দিল।
"কিন্তু মনে রাখিস রুহি, যেদিন তুই তোর গন্তব্যে পৌঁছাবি, যেদিন তোর লড়াই শেষ হবে—ঠিক তার পরের মুহূর্ত থেকে তুই শুধুই আমার। সেদিন আর কোনো আড়াল থাকবে না, কোনো সংস্কার থাকবে না, থাকবেনা কোন দেওয়াল, আর না থাকবে দূরত্ব। সেদিন তুই হবি আমার সেই নিষিদ্ধ আসক্তি, যা আমি পুরো পৃথিবীর সামনে বুক চিতিয়ে উপভোগ করব। এই মহাবিশ্বের কোনো শক্তির দুঃসাহস হবে না তোকে আমার এই বাহুডোর থেকে ছিনিয়ে নেওয়ার। তুই তখন শুধুই শাহাজের—অপরিমেয়, অবিনশ্বর এবং একান্ত।"
কথাগুলো বলেই শাহাজ এক দীর্ঘ, দহনমাখা নিশ্বাস ফেলল। বাতাসের প্রতিটি কম্পন যেন শাহাজের এই মৌন ঘোষণা রুহির কানে পৌঁছে দেওয়ার চেষ্টা করছে। সে জানে, এই অপেক্ষা তাকে তিলে তিলে পোড়াচ্ছে, কিন্তু সেই পোড়ার মাঝেই সে এক অদ্ভুত তৃপ্তি খুঁজে পায়। রুহিই তার ধ্বংস, আর রুহিই তার পরম মুক্তির পথ কারণ যে এই একটাই।
~~~~~ এদিকে শাহাজের সাথে কথা বলে নিজের মনের সব সংশয় দূর করে রুহি যখন নিজের রুমের দিকে যাচ্ছিলো, তখনই সিঁড়ি দিয়ে নিচে নামার সময় হঠাৎ রুহির সামনে পিয়াস এসে দাঁড়াল। তার চোখেমুখে কঠোরতা। সে এক অদ্ভুৎ অধিকারবোধ নিয়ে রুক্ষ স্বরে হঠাৎ জিজ্ঞেস করল, "এত রাতে কোথায় গিয়েছিলি তুই?"
আকস্মিক এমন কথায় রুহি মুখ বিকৃত করে ফেলল, সেই সাথে পিয়াসের মুখ থেকে আসা বিচ্ছিরি সিগারেটের গন্ধে রুহির ঘেন্না লেগে উঠলো। সে পিয়াসকে একপ্রকার অগ্রাহ্য করে চলে যেতে চাইলে পিয়াস হঠাৎই কোন সংকেত না দিয়ে তার বাহু শক্ত করে চেপে ধরল। পিয়াসের আকস্মিক এমন কাজে রুহিযেন হতভম্ব। সেই সাথে রাগে তার মাথার গর গুলো নিলচে কারারে ফুটে উঠলো। রুহি একপ্রকার ঝটকা দিয়ে হাত সরিয়ে রাগে ফেটে পড়ল, "খবরদার! আমার সাথে অসভ্যতা করতে আসবেন না! বাড়িটা আমার আমি যেখানে খুশি যাব, আপনাকে কৈফিয়ত দেব নাকি?"
রুহির এমন তেজ দেখে হঠাৎই পিয়াস বাঁকা হেসে উঠলো অতঃপর বলল, "এখন আর আমাকে ভালো লাগে না, তাই না? নতুন কাউকে পেয়ে আমাকে ভুলে গেলি বাহ? কবে থেকে এমন হলি? এক বাড়ির দুই ছেলের সাথে ডলাডলি করতে লজ্জা করে না তোর?"
পিয়াসের কথা শুনে রুহি যেন স্তব্ধ, পিয়াস মাএ যা বললো রুহির যেন বিশ্বাস হলো না, রুহি যখন পিয়াসার কথাগুলো মস্তিষ্কে ভালোভাবে মেলাচ্ছে ঠিক তখনই পিয়াস একদম রুহির সামনে একদম মুখ বরাবর এসে দাড়ালো, আবারো আগের মতোই বলেউঠল, "রাত-বিরাতে শাহাজ ভাইয়ের সাথে তোর এই ঢলাঢলি আমার একদম পছন্দ হচ্ছেনা। শাহাজ ভাইয়ের থেকে তুই দূরে থাকবি রুহি। আমি যাতে নেক্সট টাইম তোকে তো আর আশেপাশেও না দেখি।"
পিয়াসের মতো মজনুষের মুখ থেকে শাহাজের নামে এমন কুৎসিত কথা শুনে রুহির শরীরের রক্ত টগবগ করে উঠল। হঠাৎই তার রাগের পারদ ফেটে পড়লো, পিয়াসের সেই কুরুচিপূর্ণ মন্তব্যে রুহির সহ্যশক্তির বাঁধ ভেঙে গেল। এতক্ষণ যে অপমান আর বিরক্তি সে মনে চেপে রেখেছিল, তা এবার আগ্নেয়গিরির লাভার মতো বেরিয়ে এল। রুহি হঠাৎই পিয়াসকে সজোড়ে ধাক্কা দিয়ে তীক্ষ্ণ স্বরে বলল, "চুপ করুন! নির্লজ্জ লোক, নিজের ফালতু মুখে আমার শাহাজ ভাইয়ের নাম উচ্চারণ করবেন না। একদম করবেন না, সবাইকে কি নিজের মতো মনে করেন? মানসম্মান নেই আপনার? নিজেকে কি ভাবেন আপনি? শুনে রাখুন আপনাকে আমি শেষ বারের মতো সতর্ক করছি, আমার আর শাহাজ ভাইয়ের জীবন থেকে নিজেকে দূরে রাখুন। টোটালি দূরে রাখুন এতে আপনার জন্যই মঙ্গল।"
অতঃপর সে পিয়াসের চোখের দিকে সরাসরি তাকিয়ে, স্থির এবং তীক্ষ্ণ কণ্ঠে বলে উঠল:
"আরও একটি কথা পিয়াস ভাই, আপনার জেনে রাখা দরকার—হ্যাঁ, আপনি ঠিক ধরেছেন আমি শাহাজ ভাইকে পছন্দ করি। ভীষণভাবে করি। কিন্তু আমি এটাও জানি, তাঁর মতো মানুষকে নিজের করে পাওয়ার সাধ্য বা যোগ্যতা এই জীবনে হয়তো আমার নেই। তিনি এক বিশাল আকাশ, আর আমি সামান্য ধূলিকণা।"
রুহি এক মুহূর্ত থামল, তার চোখে তখন এক অদ্ভুত উজ্জ্বলতা। পিয়াসকে অবজ্ঞার চূড়ান্ত সীমায় রেখে সে আবার বলতে শুরু করল:
"কিন্তু জানেন তো? এতে আমার বিন্দুুমাত্র আফসোস নেই। কারণ আমি অন্তত এবার একজন সত্যিকারের যোগ্য মানুষকে পছন্দ করেছি, আপনার মতো কোনো নিচু মানসিকতার অযোগ্য মানুষকে নয়। একজনের প্রতি শ্রদ্ধা রেখে তাকে না পাওয়াটাও অনেক ভাগ্যের ব্যাপার, যা আপনার মতো মানুষের পক্ষে বোঝা সম্ভব না।
আর হে আপনি তখন যেন কি বললেন ভালোবাসা, তাও আপনাকে? আপনার চাইতে রাস্তার কুকরকে ভালোবাসা উত্তম। তাতে ওই কুকুরের আনুগত্য পাওয়া যায়।"
এদিকে রুহির কথাগুলো যেন তপ্ত তীরের মতো পিয়াসের বুকে গিয়ে বিঁধল। পিয়াস কিছু বলার সুযোগ পাওয়ার আগেই রুহি এক মুহূর্ত দেরি না করে গটগট করে নিজের রুমে ঢুকে সজোরে ‘ধরাম’ করে দরজাটা বন্ধ করে দিল। সেই শব্দের প্রতিধ্বনি যেন পুরো বাড়িতে রুহির জয়ের বার্তা পৌঁছে দিল।
এদিকে, নিঝুম অন্ধকারের মাঝে একা দাঁড়িয়ে রইল পিয়াস। অপমানে তার কান দিয়ে গরম ভাপ বেরোচ্ছে, আর ক্রোধে পুরো শরীর থরথর করে কাঁপছে। নিজের হাতের মুঠিটা সে এত জোরে বন্ধ করল যে নখগুলো তালুতে বসে যাচ্ছিল। রুহির মুখে নিজের সাথে শাহাজের এই তুলনা আর এই প্রকাশ্য প্রত্যাখ্যান পিয়াসকে যেন জ্যান্ত পুড়িয়ে মারছে। অন্ধকারের সেই নিস্তব্ধতায় সে শুধু একাই ফুঁসতে লাগল, তার ভেতরের প্রতিহিংসার আগুন তখন ধিকিধিকি জ্বলছে।
চলবে......