#অন্তহীন_প্রেম_আমার
#আফীফা_আফনান
#পর্ব_৪৫(ক)
[কপি করা নিষিদ্ধ]
আকাশ আজ মেঘলা, ঘুটঘুটে অন্ধকার। মেঘের আড়ালে তারারা মুখ লুকিয়েছে ঠিকই, কিন্তু বাগানের ঝোপঝাড়ে অসংখ্য জোনাকি পোকা যেন আলোর মালা গেঁথে উড়ে বেড়াচ্ছে। দুপুরের সেই অঝোর বৃষ্টির পর প্রকৃতিতে এখন এক স্নিগ্ধ শীতল আর্দ্রতা। জানালার বাইরে ভেজা মাটির সোঁদা গন্ধ আর ঠান্ডা বাতাসের ঝাপটা যেন ঘরে এসে লাগছে। এদিকে রুহি তার স্টাডি রুমের জানালাটা খুলে জানালার পাশেই বই নিয়ে বসে আছে। রাত পোহালেই তার জীবনের সবচেয়ে বড় যুদ্ধের দিন—ভর্তি পরীক্ষা। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হলো, বইয়ের পাতায় আইনের জটিল ধারাগুলো আজ রুহির চোখে ভাসছে না। বরং তার মনের পর্দায় ভেসে উঠছে দুপুরের সেই বৃষ্টিভেজা নীলচে মুহূর্তগুলো।
রুহি আনমনে জানালার বাইরে তাকিয়ে ভাবছে। দুপুরের সেই হঠাৎ আসা ঝমঝমিয়ে বৃষ্টি, জনমানবশূন্য রাস্তা, আর এক অজানা ভয় যখন তাকে গ্রাস করছিল—ঠিক তখনই সেই অমোঘ কণ্ঠস্বর! সেই সাথে শাহাজ ভাইয়ের শক্ত বুকে আছড়ে পড়ার সেই মুহূর্তটা মনে পড়তেই রুহির গাল দুটো যেন লজ্জায় আরক্তিম হয়ে উঠল। এই আজ প্রথমবারের মতো সে নিজে যেচে শাহাজ ভাইকে জড়িয়ে ধরেছিল। জড়িয়ে ধরাটা অনাকাঙ্খিত হলেও রুহির মনে যেন এর বেশ প্রভাব পড়েছে। হঠাৎ এসব ভাবতে ভাবতেই সে নিজের ওড়নাটা আঙুলে জড়িয়ে কামড় দিল, ঠোঁটের কোণে ফুটে উঠল এক চিলতে মায়াবী হাসি। এদিকে কল্পনার সাথে সাথে লজ্জার মাএা বাড়তে শুরু করলে একসময় রুহি হাত দিয়ে নিজের মুখ ঢেকে ফেলল, যেন অন্ধকারে উড়ে চলা সেই জোনাকিরাও তার এই গোপন ভালোলাগা দেখে ফেলছে।
তবে এসবের মাঝেও একটা প্রশ্ন রুহিকে বারবার ভাবাচ্ছে। সে মনে মনেই ভাবতে শুরু করে, "ওই গলিটা তো শাহাজ ভাইয়ের ভার্সিটি বা অফিসে যাওয়ার রাস্তা নয়। কোচিং আর বাসার মাঝামাঝি ওই নির্জন রাস্তায় শাহাজ ভাই ঠিক সেই মুহূর্তেই কীভাবে উপস্থিত হলেন? তিনি কি জানতেন রুহি সেখানে আটকা পড়েছে? নাকি ছায়ার মতো তিনি সবসময় রুহিকে অনুসরণ করেন?" এই অমীমাংসিত রহস্য আর শাহাজ ভাইয়ের সেই সিক্ত চুলের মায়া রুহিকে যেন এক গভীর ঘোরের মধ্যে ডুবিয়ে দিচ্ছে।
হঠাৎ করেই রুহির ভাবনার সুতো ছিঁড়ে গেল। মোবাইলের স্ক্রিনটা জ্বলে উঠল, সাথে সাথে টুং করে মেসেজ আসার শব্দ। রুহি ভাবল হয়তো কোন গুরুত্বপূর্ণ বার্তা এসেছে। তাই পরম আগ্রহে সে ফোনটা হাতে নিল, কিন্তু ফোনের স্কিনে আসা মেসেজটি দেখা মাত্রই তার মুখের সেই স্নিগ্ধ হাসি মিলিয়ে গিয়ে একরাশ বিরক্তি ভর করল।
মোবাইলের স্ক্রিনে ফুটে আছে একটি মোটিভেশনাল মেসেজ: পাঠিয়েছে রুহির অনাকাঙ্ক্ষিত আশিক।
"আগামী দিনের এই মহাযুদ্ধের জন্য রইল অতলান্ত শুভকামনা, হে আমার স্নিগ্ধ প্রিয়া! সাফল্য আজ তোমার দোরগোড়ায় দাঁড়িয়ে প্রতীক্ষারত। শুধু একটু হাত বাড়িয়ে তাকে ছুঁয়ে নেওয়ার অপেক্ষা। তুমি পারবে, কারণ তুমিই আমার অনুপ্রেরণা।"
— ইতি, তোমার আজন্মের
কাসাফাদ্দৌজা আশিক।
রুহি এক দীর্ঘশ্বাস ফেলে বিরক্তিভরা কণ্ঠে বিড়বিড় করে বলে উঠল, "বিরক্তিকর আশিক!"
নাম্বারটি সে এই নামেই সেভ করে রেখেছে। এই লোকের এমন আদিখ্যেতা আর অযাচিত মেছেজ এই মুহূর্তে তার কাছে তিতকুটে বিষের মতো মনে হলো। শাহাজের দেওয়া সেই নীরব সাহসের পর এই সাজানো শব্দগুলো রুহির কাছে কেবলই অর্থহীন জঞ্জাল। সে ফোনটা সশব্দে টেবিলের ওপর উল্টে রেখে আবারও জানালার বাইরের সেই অন্ধকার আর জোনাকির আলোর দিকে মন দিল, যেন যেখানে কেবল তার শাহাজ ভাইয়ের গম্ভীর কণ্ঠের প্রতিধ্বনি ভাসছে।
~~~~~ আজকের সকালটা যেন অন্যদিনের চেয়েও বেশি উজ্জ্বল আর স্নিগ্ধ। পূব আকাশে রোদের আভা ছড়িয়ে পড়েছে, সেই সাথে গাছের পাতায় জমে থাকা শিশিরবিন্দুগুলো মুক্তোর মতো চকচক করছে। প্রকৃতিতে এক শান্ত আবহাওয়া বিরাজ করছে, কিন্তু খন্দকার বাড়িতে আজ তুমুল ব্যস্ততা। আজ রুহির জীবনের সেই অগ্নিপরীক্ষার দিন—ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষা।
রুহি হালকা নীল রঙের একটি সুতির কামিজ পরে তৈরি হয়ে নিচে নেমে এসেছে। ড্রয়িংরুমে পা রাখতেই দেখল মোস্তফা কামাল আর শাহাবুদ্দিন সাহেব ওর জন্যই অপেক্ষা করছেন। রুহির বড় আব্বু আর শাহেব চাচ্চুই আজ তাকে পরীক্ষার কেন্দ্রে পৌঁছে দেবেন। রুহি নিচে নামতেই বাড়ির সবাই ওকে ঘিরে ধরল। নাসরিন বেগম মেয়ের মাথায় হাত বুলিয়ে বারবার দোয়া পড়ছেন, চোখে তাঁর আনন্দ আর উদ্বেগের জল। রুহি নিচু হয়ে একে একে দাদী, বড় আব্বু, চাচ্চু আর বড় মার আর বাকি সবার পা ছুঁয়ে সালাম করল। সবার চোখেমুখে একটাই প্রার্থনা—রুহি যেন তার কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌঁছাতে পারে।
দোয়া নেওয়া শেষ করে রুহি ব্যাগটা কাঁধে ঝুলিয়ে নিল। কিন্তু তার চোখ দুটি অবচেতনভাবেই ড্রয়িংরুমের চারপাশ থেকে শুরু করে সিঁড়ির ওপরের দিকটা পর্যন্ত খুঁজে ফিরছে। সেই চিরচেনা গম্ভীর মুখখানা দেখার জন্য তার মনটা ভেতরে ভেতরে যেন ভীষণ ছটফট করছে। এই যাএা বেলায় শাহাজ ভাইকে কি একবারও দেখা যাবে না? অন্তত এক নজর দেখলেও তো মনের জোর অনেক বেড়ে যেত।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরীক্ষা বলে কথা, ট্রাফিক জ্যামের কথা মাথায় রেখে শাহাবুদ্দিন সাহেব তাড়া দিলেন, "চল মা রুহি, দেরি করলে আবার রাস্তায় আটকে যাব। আমাদের এখনই বের হওয়া উচিত।" মোস্তফা কামালও সায় দিয়ে বললেন, "হ্যাঁ মা, চলো। সময়মতো পৌঁছানোটা খুব জরুরি।"
রুহির পা যেন সরছে না। তার মন কিছুতেই সায় দিচ্ছে না শাহাজ ভাইকে না দেখে চলে যেতে। শেষমেশ কোনো উপায় না দেখে সে বড় মা তানজিনা বেগমের কাছে এগিয়ে গিয়ে খুব নিচু স্বরে ফিসফিস করে জিজ্ঞেস করল, "বড় মা, শাহাজ ভাই কোথায়? ওনাকে তো দেখছি না। উনি কি এখনো ঘুম থেকে ওঠেননি?"
তানজিনা বেগম একটু ম্লান হেসে বললেন, "ও তো অনেক ভোরেই রেডি হয়ে বেরিয়ে গেছে রে মা। বলে গেল আজ ওর খুব গুরুত্বপূর্ণ একটা কাজ আছে, তাই ফিরতে দেরি হতে পারে।"
এক মুহূর্তের জন্য রুহির মনটা একদম দমে গেল। বুকের ভেতরটা কেমন যেন খালি খালি লাগছে। মনে মনে নিজেকে বোঝানোর চেষ্টা করল, শাহাজ ভাই তো পেশায় লেকচারার , হয়তো জরুরি কোনো কাজ পড়েছে বা আছে। তবুও তার অবেচেতন মন যেন মানছে না, পরীক্ষার এই বিশেষ দিনে একটা বার তার প্রিয় মানুষের সাথে দেখা হলো না ভেবে তার চোখ দুটো ঝাপসা হয়ে এলো।
ঠিক তখনই বাইরে থেকে মোস্তফা কামালের হাঁক শোনা গেল, "রুহি, মা এসো!" রুহি দ্রুত চোখের কোণটা মুছে নিল। বড় মাকে শেষবারের মতো একটু শক্ত করে জড়িয়ে ধরে দোয়া নিয়ে সে দ্রুত পায়ে গাড়ির দিকে এগিয়ে গেল। বাড়ির সদর দরজা পেরিয়ে গাড়িতে ওঠার সময়ও সে একবার অনিচ্ছাসত্ত্বেও পেছনে তাকিয়ে দোতলার জানালার দিকে তাকালো, যদি ভুল করেও শাহাজ ভাইকে একটু অনুভব করা যায়। কিন্তু সেখানে কেবল পর্দার আড়াল ছাড়া আর কিছুই চোখে পড়ল না।
★★★
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস আজ এক জনসমুদ্র। চারদিকে হাজারো পরীক্ষার্থী আর অভিভাবকদের ভিড়। কার্জন হল থেকে শুরু করে কলা ভবন—প্রতিটি মোড়ে এক টানটান উত্তেজনা। পরীক্ষা শুরুর সময় ঘনিয়ে আসায় গেটে কড়া পাহারা, একে একে সবাই ভেতরে প্রবেশ করছে। মোস্তফা কামাল রুহির মাথায় হাত রেখে শেষবারের মতো সাহস জোগালেন, "যা মা, শান্ত মাথায় পরীক্ষা দিস।" তিনি কথাগুলো বলেই সরে দাঁড়াতেই রুহি সামনের দিকে পা বাড়াল। ছোঁয়ারা এর মধ্যেই কয়েক কদম এগিয়ে গেছে।
কিন্তু রুহির পা যেন কিছুতেই এগোতে চাইছে না। তার মনটা বারবার গেটের বাইরের ওই জনারণ্যে ফিরে যাচ্ছে। চাতক পাখির মতো সে কাকে যেন খুঁজে ফিরছে এই ভেবে যে যদি তার কল্পনা সত্যি হয়ে যায়।
এদিকে রুহিকে দাড়িয়ে থাকতে দেখে ছোঁয়া পেছন ফিরে ডেকে উঠল, "এই রুহি! দাঁড়িয়ে পড়লি কেন? জলদি চল, সময় শেষ হয়ে যাচ্ছে তো!"
রুহি এক দীর্ঘশ্বাস ফেলে শেষবারের মতো গেটের দিকে তাকিয়ে যেই না ভেতরে ঢোকার জন্য ঘুরবে, ঠিক তখনই সেই মাদকতাময় গম্ভীর কণ্ঠস্বর চারপাশের কোলাহল ছাপিয়ে তার কানে আছড়ে পড়ল,
— "রুহি, স্টপ!"
রুহি বিদ্যুৎবেগে পেছন ফিরল। ভিড়ের মাঝে দাঁড়িয়ে আছে শাহাজ। তার পরনের শার্ট ঘামে ভিজে জবজবে, কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম জমছে। সে ঘনঘন নিঃশ্বাস ফেলছে, দেখে মনে হচ্ছে মাইলের পর মাইল দৌড়ে এসেছে সে। শাহাজের এই বিধ্বস্ত দশা দেখে রুহি সব ভুলে ব্যস্ত হয়ে তার কাছে ছুটে এল। ব্যতিব্যস্ত হয়ে জিজ্ঞেস করল, "আপনার এই অবস্থা কেন শাহাজ ভাই? কী হয়েছে আপনার? এমন কেন দেখাচ্ছে আপনাকে?"
এদিকে শাহাজ কিছুক্ষণ বুক ভরে শ্বাস নিয়ে নিজেকে একটু স্বাভাবিক করার চেষ্টা করল। ধপাস করে একটা নিশ্বাস ফেলে বলল, " রিকশা পাচ্ছিলাম না। যা একটা পেলাম, সেটাও মাঝপথে জ্যামে আটকে গেল। এদিকে তোর ভেতরে ঢোকার সময় হয়ে যাচ্ছিল, তাই আর দেরি না করে কোনোমতে দৌড়ে এসেছি।"
রুহি চোখ বড় বড় করে অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল। তার কণ্ঠস্বর বিস্ময়ে রুদ্ধ হয়ে এল, "আপনি আমার জন্য এতখানি পথ দৌড়ে এসেছেন?"
"হুম, শুধু তোর জন্য," শাহাজের খুব সহজ আর সংক্ষিপ্ত স্বীকারোক্তি।
এই চারটে শব্দ রুহির মনের ভেতর এক তীব্র রোমাঞ্চের ঢেউ তুলে দিল। শাহাজের শান্ত চোখের গভীরতা যেন তাকে গ্রাস করে নিচ্ছে। ঠিক সেই মুহূর্তে শাহাজ তার প্যান্টের পকেট থেকে একটি ছোট বক্স বের করে রুহির সামনে ধরল। রুহি বিষ্ময়ে তাকিয়ে রইলো শাহাজের হাতে ধরে থাকা বক্সটির দিকে।
"ধর এটা।" শাহাজের কন্ঠ ঠান্ডা শিতল।
শাহাজের কথাতে রুহি একটু ইতস্তত করে হাত বাড়িয়ে বক্সটি নিল। নেড়েচেড়ে দেখে সে কৌতূহলী চোখে তাকাতেই শাহাজ বলল, "খুলে দেখ।"
রুহি বক্সটি খুলতেই দেখল ভেতরে একটি অসাধারণ সুন্দর কলম। শাহাজ একটু এগিয়ে এসে নিচু স্বরে বলল, "ভার্সিটির পক্ষ থেকে দেড় মাসের জন্য আমাকে একটা বিশেষ ট্রেনিংয়ে পাঠানো হচ্ছে। এখান থেকেই সরাসরি চলে যেতে হবে। হয়তো আজ আর দেখা হবে না। এই কলমটা আমার খুব পছন্দের, বলতে পারিস আমার জন্য এটা খুব লাকি। আজ আমি এটা তোকে দিলাম। তোর জীবনের সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ দিনটিতে আমি চাই এই কলমটি তোর সঙ্গী হয়ে থাকুক।"
রুহির বুকের ভেতরটা হঠাৎ হাহাকার করে উঠল।, সেই সাথে এক অমোঘ ভালোলাগা তার হৃদয় ছুঁয়ে গেলো। সে কম্পিত গলায় জিজ্ঞেস করল, "আপনার সাথে কি তবে বাড়িতে গেলে আর দেখা হবে না শাহাজ ভাই?"
শাহাজ এক দীর্ঘশ্বাস ফেলে ম্লান হাসল। "হয়তো হবে না, কারণ আমি একটু পরেই স্টেশনের দিকে রওনা দেব। একটু নিরবতা এরপরে আবারও অধিকার বোধ নিয়ে শাহাজ বললো, " ঠিক মতো পরিক্ষা দিস, একা একা বাড়ি থেকে বের হোস না, মাকে দেখে রাখিস। সেঝ মাকে জ্বালাতন করিস না। সেই সাথে নিজের যত্ন নিস।"
ততক্ষণে বিন্তি আর ছোঁয়া আবার চিৎকার করে ডাকছে, গেট প্রায় বন্ধ হওয়ার পথে। এখনই ভেতরে ঢুকতে হবে। রুহি পা বাড়াল, কিন্তু কয়েক কদম গিয়েই আবার থমকে দাঁড়াল। সে পেছন ফিরে শাহাজের দিকে তাকালো। শাহাজ মুচকি হেসে ইশারায় তাকে ভেতরে যেতে বলছে।
কিন্তু রুহি নিজেকে সামলাতে পারল না। সে আবার দৌড়ে শাহাজের কাছে ফিরে এল।
একদম সামনে দাঁড়িয়ে ডাগর চোখে তাকিয়ে আর্দ্র গলায় বলল, "আমি কি আপনাকে আপনার ফ্রি সময়ে কল দিতে পারব শাহাজ ভাই?"
একটু দম নিয়ে আবারও বললো, "কখনো যদি খুব একা লাগে, আপনাকে কি একটু মেসেজ করতে পারব?"
শাহাজ এবার রুহির দিকে গভীর চোখে তাকালো। তার সেই শীতল গাম্ভীর্য ভেদ করে একরাশ উষ্ণতা বেরিয়ে এল। সে পরম মমতায় বলল, "তোর জন্য আমি সবসময় ফ্রি চঞ্চলা। তোর যখনই মন চাইবে, আমাকে কল বা মেসেজ দিস। আমি তোর অপেক্ষায় থাকব। মনে রাখবি এই ধরনীতে তোর জন্য এক আমি সর্বদা অপেক্ষমান।"
রুহির ঠোঁটের কোণে এবার এক চিলতে মোহনীয় হাসি ফুটে উঠল। সে ধরা গলায় শুধু বলল, "জলদি ফিরে আসবেন শাহাজ ভাই, আমিও আপনার অপেক্ষায় থাকব।"
কথাটি বলেই রুহি আর এক মুহূর্ত দেরি না করে হলের দিকে ছুটে গেল। এদিকে শাহাজ ঠায় দাঁড়িয়ে রুহির চলে যাওয়ার পথের দিকে তাকিয়ে রইল। রুহির সেই শেষ কথাগুলো— "আপনার অপেক্ষায় থাকব"— শাহাজের পাথুরে হৃদয়ে এক অদ্ভুত আলোড়ন তৈরি করল। রুহির এই আকস্মিক স্বীকারোক্তি আর সাহসে সে যেন এক নতুন প্রাণের স্পন্দন খুঁজে পেল। এ যেন দীর্ঘ লড়াইয়ের শেষে সেই প্রশান্তি যা তপ্ত মরুর বুকে এক পশলা বৃষ্টির মতো।
শাহাজ এবার এক দীর্ঘশ্বাস ফেলে ভাবল, দেড় মাসটা হয়তো এবার বড্ড বেশি দীর্ঘ হয়ে যাবে।
এদিকে রুহি যখন শাহাজের দেওয়া সেই প্রিয় কলমটি আঁকড়ে ধরে হলের ভেতর মিলিয়ে গেল, শাহাজও পা বাড়ালো প্রস্থানের জন্য। কিন্তু কয়েক কদম এগোতেই সে থমকে দাঁড়ালো। সামনেই দাঁড়িয়ে আছেন মোস্তফা কামাল। তাঁর তীক্ষ্ণ দৃষ্টি শাহাজের ওপর নিবদ্ধ। শাহাজ বুঝতে পারল, এতক্ষণ রুহির সাথে তার প্রতিটি মুহূর্ত এনার নজর এড়ায়নি।
কিছুক্ষণ পর, ব্যস্ত রাস্তার ধারের এক কোলাহলমুক্ত টং দোকানের পাশে বসে আছে বাবা আর ছেলে। দুজনের হাতেই ধোঁয়া ওঠা মাটির ভাঁড়ে চা। আজ আবারও বহুদিন পরে একসাথে চা নিয়ে বসেছেন দুজনে। বেশ কিছুক্ষণ দুজনের মধ্যে এক অস্বস্তিকর মৌনতা বিরাজ করল। অবশেষে মোস্তফা কামালই সেই নীরবতা ভাঙলেন। চায়ের ভাঁড়ে শেষ চুমুক দিয়ে তীক্ষ্ণ স্বরে বলে উঠলেন, "মেয়টার মাথা তো দেখছি একদম চিবিয়ে খেয়েছ! আমার অবুঝ মেয়েটাকে শেষমেশ নিজের মায়াজালে ফেঁসেই নিলে তাই তো?"
শাহাজ কোনো উত্তর দিলো না শুধু মৃদু হাসল। সেই হাসিতে কোনো অপরাধবোধ ছিল না, বরং ছিল এক গভীর আত্মবিশ্বাস। এদিকে মোস্তফা কামাল সেই হাসি দেখে আরও চটে গেলেন, "এভাবে নির্লজ্জের মত হাসছো কেন? তুমি কি মনে করো আমি কিছু বুঝি না?"
অতঃপর এবার শাহাজ শান্ত গলায় জবাব দিল, " যেখানে ভালোবাসা নিঃস্বার্থ হয়, সেখানে ফাঁসাতে হয় না; বরং হৃদয়ের টানেই মানুষ কাছে আসে। রুহি এখন আর আগের মতো অবুঝ নেই, সে তার ভালোমন্দের পার্থক্য করতে জানে।"
মোস্তফা কামাল এবার ছেলেকে আরেকটু ঘা দেওয়ার জন্য বাঁকা সুরে বললেন, "সম্পর্কে ও আমার ছোট ভাইয়ের মেয়ে, সেই হিসেবে তোমার বোন হয়। আবারও এমন তো নয় যে বয়সে তোমরা দু এক বছরের ছোট বা সমবয়সী। বরং বয়সে প্রায় দশ-বারো বছরের পার্থ্যক্য তোমাদের ! বয়স আর সম্পর্কের এই বিশাল ফারাকটা একবার ভাব। লজ্জা করে না নিজের ছোট বোনের ওপর এমন নজর দিতে?"
শাহাজ এবার চায়ের খালি ভাঁড়টা নিচে নামিয়ে রেখে সোজা হয়ে দাঁড়ালো। মোস্তফা কামালের চোখের দিকে স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে সে বলতে শুরু করল, "আমি তো কোনোদিন অস্বীকার করিনি যে রুহি আপনার ভাইয়ের মেয়ে। এটা আমি খুব ভালো করেই জানি এবং মানিও। কিন্তু সমস্যাটা অন্য জায়গায়—রুহি আমার বোন নয়। আমি এজীবনে ওকে কোনোদিন বোনের চোখে দেখেছি আর না মেনেছি, আর যাকে মনে-প্রাণে কোনোদিন বোন হিসেবে স্থানই দিইনি, সমাজ বা সম্পর্কের দোহাই দিয়ে তাকে আমি বোন ভাবতে যাব কেন?"
" কথা আছে না—পাগলেও নিজের স্বার্থ ষোলো-আনা বোঝে! সেখানে তো আমি একজন সুস্থ-সবল পূর্ণবয়স্ক মানুষ।
সে একটু থামলো অতঃপর শাহাজের ঠোঁটে এক বাঁকা হাসির রেখা ফুটে উঠল। সে আবারও দরাজ গলায় বলে উঠল, "আর লজ্জার কথা যদি বলেন... আমার জানামতে আমার মা-ও সম্পর্কে আপনার দূর সম্পর্কের বোন হতেন। যেখানে বাবা হয়ে আপনি যখন একবারও লজ্জাবোধ করেননি, সেখানে আপনার ছেলে হয়ে আমি কীভাবে সেই লজ্জা পেতে পারি, বলুন তো?"
ছেলের মুখে নিজের জীবনের সেই পুরনো সত্য এমন নির্লজ্জের মতো কঁতা শুনে মোস্তফা কামাল যেন বাকরুদ্ধ হয়ে গেলেন। তিনি স্তম্ভিত হয়ে শাহাজের দিকে তাকিয়ে রইলেন। রাগে দাঁতে দাঁত চেপে তিনি ফিসফিস করে বলে উঠলেন, "অসভ্য! বদমাইশ ছেলে! এত লেখাপড়া করে শিক্ষিত হয়ে শেষ পর্যন্ত বাপের মুখের ওপর তর্ক করাছো! এসব শিখেছ তুমি?"
শাহাজ এক মুহূর্ত বিচলিত হলো না। বরং সে ধীর পায়ে গিয়ে চায়ের বিল মিটিয়ে দিয়ে মোস্তফা কামালের পাশে এসে আবার দাঁড়ালো। গলার স্বর নামিয়ে খুব ঠান্ডা মাথায় বলে উঠলো "মানুষের প্রথম শিক্ষক হয় তার বাবা মা। আমার ক্ষেত্রেও তাই। আমার জীবনে শিক্ষার হাতেখড়ি আপনার হাতেই হয়েছে আব্বু। এখন যদি সেই শিক্ষায় কোনো ঘাটতি থেকে থাকে বা আমি যদি কুশিক্ষিত হয়ে থাকি, তবে সেই ব্যর্থতাটুকু আমার শিক্ষকের। আপনি বরং তাঁকেই জিজ্ঞেস করুন তিনি কেন আমাকে সঠিক শিক্ষা দিতে পারেননি। আর আমার সেই মহান শিক্ষকের নাম হলো—মোস্তফা কামাল।"
ব্যস, এইটুকুই যথেষ্ট ছিল। মোস্তফা কামালের সব যুক্তি, সব রাগ যেন মুহূর্তেই জল হয়ে গেল। নিজের ছেলের কাছে এভাবে তর্কে হেরে যাবেন সেটা তিনি কল্পনাও করেননি। তিনি আর এক মুহূর্তও সেখানে দাঁড়ালেন না; শাহাজের দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে গটগট করে নিজের গাড়ির দিকে হেঁটে চলে গেলেন। এদিকে শাহাজ দাঁড়িয়ে রইল।
তার চোখেমুখে তখন এক অদ্ভুত তৃপ্তি। বাবার সাথে এই দ্বন্দ্বে সে আজ শুধু রুহিকে আগলে রাখার লড়াইয়ে জয়ী হয়নি, বরং নিজের অস্তিত্বের দাবিটাকেও প্রতিষ্ঠিত করেছে। একসসয় দীর্ঘশ্বাস ফেলে সে-ও ধীর পায়ে তার গন্তব্যের দিকে রওনা দিল, আর সাথে মনে মনে রুহির সেই অপেক্ষার প্রহর গুনতে শুরু করল।
চলবে........