#অন্তহীন_প্রেম_আমার
#আফীফা_আফনান
#পর্ব_৪৬(খ)
[কপি করা নিষিদ্ধ]
স্টোর রুমের বদ্ধ দরজার দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে দাঁড়িয়ে আছে রুহি। তার চোখের সামনে এখনো গতরাতের সেই রহস্যময় দৃশ্যটা যেন সিনেমার মতো ভাসছে। গতরাতের ওই ঘটনার পর রুহির দুচোখের পাতা এক মুহূর্তের জন্যও এক হতে পারেনি। বলতে গেলে, প্রচণ্ড ভয়ে কম্বল মুড়ি দিয়ে সারাটা রাত সে কুঁকড়ে শুয়ে ছিল। ভোরের দিকে যখন ক্লান্তিতে চোখ দুটো বুজে এসেছিল, এরপর মাত্র কয়েক ঘণ্টার ঘুম। ঘুম থেকে ওঠার পর থেকেই তার মনে কেবল একটাই প্রশ্ন—শাহাজ ভাই উধাও হলেন কীভাবে?
সেই কৌতূহল আর হালকা ভয়ের রেশ নিয়েই সে এখন স্টোর রুমের দরজার সামনে দাঁড়িয়ে। ভেতরে ঢুকবে কি ঢুকবে না, এই নিয়ে যখন সে গভীর চিন্তায় মগ্ন, ঠিক তখনই তার কানে এল এক অদ্ভুত শব্দ। খসখস করে কিছু একটা নড়াচড়া করার শব্দ। শব্দটা খুব ধীর, যেন কেউ অতি সন্তর্পণে কিছু একটা খুঁজছে।
রুহি কৌতূহল দমাতে পারল না। শব্দটা আরও স্পষ্টভাবে শোনার জন্য সে নিজের কান আর মুখটা দরজার একদম কাছে নিয়ে ঝুঁকে দাঁড়াল। কিন্তু ঠিক সেই মুহূর্তেই সব নিস্তব্ধ হয়ে গেল। আর কোনো শব্দ নেই। রুহি যেই না হতাশ হয়ে মাথাটা সরিয়ে নিতে চাইল, অমনি মুহূর্তের মধ্যে দরজাটা দড়াম করে খুলে গেল!
"হুয়াহ্!"—ভেতর থেকে বিকট শব্দে চিৎকার করে উঠল মুগ্ধ।
আকস্মিক এই ঘটনায় রুহি নিজের কলিজা যেন হাতের মুঠোয় ধরে ফেলল। ভয়ে তার আত্মা কেঁপে উঠল, দু-পা পিছিয়ে সে সজোরে চেঁচিয়ে উঠল। রুহির কুঁচকানো মুখ আর ভয়ার্ত অবস্থা দেখে মুগ্ধ হাসতে হাসতে প্রায় মেঝেতে গড়িয়ে পড়ার দশা। আসলে মুগ্ধ ভেতর থেকেই রুহিকে আসতে দেখেছিল, তাই তাকে ভয় দেখানোর জন্যই এতক্ষণ সুকৌশলে জিনিসপত্র নাড়াচাড়া করে রুহিকে কাছে টেনে এনেছিল।
ভয় কাটিয়ে রুহি যখন বুঝতে পারল এটা মুগ্ধর শয়তানি, তখন সে রাগে কটমট করে বুক চেপে ধরে বলে উঠল, "শয়তান মুগ্ধ! হার্টফেল করাতি নাকি আমাকে?"
মুগ্ধর হাসির দমক যেন থামছেই না। রুহি এবার দপ করে জ্বলে উঠে এক লাফে মুগ্ধর সামনে গিয়ে তার কান মলে দিল। "বড় হয়েছিস আর শয়তানিও বেড়েছে, না?"
"আহ্! উহ্! আপু ছাড়ো, লাগছে! আর করব না, সত্যি আর করব না!"—ব্যথায় মুখ বিকৃত করে আবদার শুরু করল মুগ্ধ।
রুহির বুক তখনো ধড়ফড় করছে। সে কান ছেড়ে দিয়ে একটু ধাতস্থ হয়ে ঝাঁঝালো কণ্ঠে বলল, "এই তুই এখানে কী করছিস এত সকালে? আর আমাকে ওভাবে ভয় দেখালি কেন শুনি?"
ছাড়া পেতেই মুগ্ধ হাসতে হাসতে নিজের কান ডলতে ডলতে বলল, "শীত চলে এসেছে না আপু? ব্যাডমিন্টন খেলার সময় তো এখনই। নিজের রুমে অনেক খুঁজলাম কিন্তু ব্যাটটা পেলাম না। শেষে আম্মু বলল যে স্টোর রুমে রাখা হয়েছে। তাই সকাল সকাল ওটা খুঁজতেই এখানে এসেছিলাম। ব্যাট তো পেয়ে গেলাম, বের হওয়ার সময় দেখলাম তুমি দরজার ওপাশে আছো, তাই ভাবলাম একটু মজা করি!"
ছোট ভাইয়ের কথা শুনে রুহি চোখ পাকিয়ে বলল, "বড্ড দুষ্ট হয়েছিস তুই। দাঁড়া, আজ বড় আব্বুর কাছে তোর নামে নালিশ করছি আমি।"
মুগ্ধ এবার আরও শব্দ করে হেসে উঠল। "করো নালিশ! আমিও সবাইকে বলব যে আমার ভার্সিটি পড়ুয়া আপুটা একটা ছোট বাচ্চার ভয় দেখে ল্যাম্পপোস্টের মতো দাঁড়িয়ে ছিল! এত বড় হয়ে কেউ এভাবে ভয় পায়?"
"এই চুপ কর! স্কুল নেই আজ? সকাল সকাল যতসব ফালতু কথা। যা নিজের রুমে যা!"—রুহি তাড়া দিল।
মুগ্ধ আর কথা বাড়াল না, তবে যেতে যেতে আবার পেছন ফিরে তাকিয়ে রুহিকে শুনিয়ে শুনিয়ে বলল, "ভয় পেয়ে চেতছে মানুষ, বুঝলাম!" বলেই সে সেখান থেকে এক দৌড়ে পালাল। কিন্তু তখনো করিডোর দিয়ে তার হাসির প্রতিধ্বনি এখনো রুহির কানে বাজছে।
রুহিও এবার না হেসে পারল না। সত্যিই তো, সে অযথাই ভয় পাচ্ছিল। এটা তার নিজের বাড়ি, এখানকার ধূলিকণা পর্যন্ত তার চেনা। তাই একরাশ সাহস সঞ্চয় করে সে এবার ধীরপায়ে স্টোর রুমে প্রবেশ করল।
রাতের সেই ম্লান আলো এখনো জ্বলছে ঠিকই, কিন্তু দিনের আলোয় সেটার আর প্রয়োজন নেই। ওপরের ছোট্ট ভেন্টিলেটরগুলো দিয়ে সকালের উজ্জ্বল রোদ তেরছাভাবে ঘরের ভেতর ঢুকেছে। গতরাতে যে জায়গাটা রহস্যময় আর আবছা লেগেছিল, এখন সেটা একদম পরিষ্কার। রুহি রুমটি খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখতে লাগল। দেয়ালের নতুন রঙের গন্ধ নাকে আসছে। সম্প্রতি মেরামত করার ফলে রুমটা এখন আর আগের মতো ভাঙাচোরা বা ঘিঞ্জি নেই। অপ্রয়োজনীয় জিনিসগুলো একপাশে গুছিয়ে রাখা হয়েছে। সাথে পুরো রুমটাতে দিনের আলোয় যেন ঝলমল করছে। রুহি চারপাশটা খুব গভীর মনোযোগ দিয়ে দেখছে, মনে মনে খুঁজছে সেই গতরাতের রহস্যের কোনো কিনারা পাওয়া যায় কি না। আগে এই রুমে আসতে তার বিরক্ত লাগলেও বর্তমানে স্টোর রুমের এই নতুন পরিচ্ছন্নতা আর উজ্জ্বলতা যেন তাকে এক অদ্ভুত স্বস্তি দিচ্ছিল।
রুহি ধীরপায়ে ঘুরে ঘুরে যখন রুমের চারপাশটা দেখছিল। হঠাৎ তার চোখ আটকে গেল দেয়ালে লাগানো বিশালাকার এক ফ্রেমের ওপর—সেখানে অমর সৃষ্টি ‘মোনালিসা’র ছবি। রুহির স্পষ্ট মনে আছে, তানজিনা বেগম একদিন গল্পচ্ছলে বলেছিলেন যে এই অসাধারণ ছবিটি শাহাজ নিজের হাতে এঁকেছে। রুহি এর আগেও এ রুমে না চাইতেও কয়েকবার এসেছে কিন্তু এই ছবিটি সে আগে তেমন একটা খেয়াল করেনি। ছবির প্রতিটি টানে যেন ফুটে উঠেছে সূক্ষ্ম কারুকাজ। তুলির আঁচড়গুলো এতটাই নিখুঁত যে মনে হচ্ছে জীবন্ত কোনো এক রূপসী নারী দেয়ালে স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। এদিকে রুহি মন্ত্রমুগ্ধের মতো হা করে ছবিটির দিকে তাকিয়ে রইল । যেন নজর সড়াতে পারছে না।
ছবিটি দেখে কৌতূহল আর মুগ্ধতা মিলেমিশে একাকার হয়ে গেল তার মনে। সে আরও কাছে গিয়ে দাঁড়াল। ছবিটির স্নিগ্ধতা যেন তাকে চুম্বকের মতো টানছে। রুহির খুব ইচ্ছে হলো ছবিটির ক্যানভাসে একবার হাত ছুঁয়ে দেখতে। সে যেই না কাঁপা কাঁপা হাতে ছবিটির দিকে হাত বাড়িয়েছে, অমনি ‘খট’ করে শব্দ করে স্টোর রুমের দরজা খুলে ভেতরে প্রবেশ করলেন শাহাজ।
তাঁর হাতে একটা কাঠের বক্স, যার ভেতর থেকে উঁকি দিচ্ছে নানা রঙের কালার টিউব আর বিচিত্র সব তুলি। শাহাজকে এভাবে হঠাৎ ঢুকতে দেখে রুহি একদম ভড়কে গেল। অপরাধী ধরার পড়ার মতো সে তড়িঘড়ি করে হাত সরিয়ে পেছনে ফিরে আড়ষ্ট হয়ে দাঁড়িয়ে রইল।
এদিকে শাহাজ রুমে প্রবেশ করেই রুহির ভীতি লক্ষ্য করলো। তবে আজ তাঁর কণ্ঠস্বর অন্যদিনের চেয়ে বেশ নরম। সে শান্ত গলায় জিজ্ঞেস করলেন, "তুই এত সকালে এখানে কী করছিস?"
রুহি আমতা আমতা করে কোনোমতে নিজেকে সামলে বলল, "আমি... আসলে আমি মুগ্ধের সাথে এসেছিলাম। ওর ব্যাডমিন্টন ব্যাট খুঁজে পাচ্ছিল না তো, তাই ওটা খুঁজতেই আসা।"
শাহাজ এবার রুমের চারদিকে একবার চোখ বুলিয়ে জিজ্ঞেস করলো, "মুগ্ধ কোথায় তাহলে?"
"এই তো, মাত্রই ব্যাট নিয়ে বেরিয়ে গেল। আমিও চলে যেতাম, আসলে ছবিটা দেখছিলাম। বড্ড সুন্দর হয়েছে! বড় মা বললেন এটা নাকি আপনিই এঁকেছেন?"—রুহি কিছুটা সাহস নিয়ে কথাগুলো বলল।
শাহাজ ছবির দিকে একবার তাকিয়ে নিরাসক্ত গলায় বললেন, "হুম।" এরপর রুহির দিকে ফিরে আবার প্রশ্ন করলেন, "আর কোনো কাজ আছে তোর এখানে?"
রুহি মাথা নিচু করে বলল, "উহু।"
"তাহলে কি এখানেই দাঁড়িয়ে থাকবি?" শাহাজের এই ছোট প্রশ্নটাই রুহির জন্য যথেষ্ট ছিল। সে আর এক মুহূর্ত অপেক্ষা না করে সুরসুর করে রুম থেকে বেরিয়ে গেল।
এদিকে রুহি বের হওয়া মাত্রই শাহাজ এগিয়ে গিয়ে সজোরে স্টোর রুমের দরজাটা বন্ধ করে দিলো। আকস্মিক এমন শব্দে বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা রুহি চমকে উঠল। শাহাজের এই হুট করে দরজা বন্ধ করে দেওয়াটা তার কাছে কেমন যেন অস্বাভাবিক মনে হলো। রুমের ভেতরে কী এমন কাজ আছে যা তাকে এভাবে দরজা আটকে করতে হবে? শাহাজের সেই রহস্যময় ‘উধাও’ হওয়া আর এখনকার এই আচরণ রুহির মনে নতুন করে সন্দেহের দানা বাঁধতে শুরু করল। সে দরজার দিকে একপলক তাকিয়ে ধীরপায়ে নিজের রুমের দিকে পা বাড়াল, কিন্তু তার মনটা পড়ে রইল ওই বন্ধ দরজার ওপারেই।
★★★
রান্নাঘরে দুপুরের রান্নার তোড়জোড় চলছে। ইয়াসমিন বেগম আর নাসরিন বেগম মসলা বাটা আর রান্নার আনুষঙ্গিক কাজে ব্যস্ত। রান্নাঘরের ঠিক বাইরে রাখা বড় কাঠের টেবিলটাতে বসে ছুরি দিয়ে কুচি কুচি করে শীতের সতেজ পালং শাক কাটছেন তানজিনা বেগম। রোদের হালকা ওম আর টাটকা শাকের ঘ্রাণে চারপাশটা বেশ স্নিগ্ধ হয়ে আছে।
ঠিক তাঁর পাশের চেয়ারটাতেই আয়েশ করে বসে আছে পিয়াস, আর অন্যপাশে সিমি সে একদৃষ্টিতে বড় মার শাক কাটা দেখছিল। হঠাৎ নীরবতা ভেঙে পিয়াস একটু বাঁকা হেসেই বলে উঠল—
"শাহাজ ভাইকে বিয়ে করাচ্ছ না কেন বড় মা? বাড়িতে ছেলের বউ আসলে অন্তত তোমার এই কাজের ভার তো কিছুটা কমত।"
পিয়াসের এই আগ বাড়িয়ে বলা কথায় তানজিনা বেগমের হাতের ছুরিটা এক মুহূর্তের জন্য থেমে গেল। তিনি চোখ তুলে পিয়াসের দিকে তাকালেন। অন্যদিকে রান্নাঘর থেকে ইয়াসমিন বেগম আর নাসরিন বেগমও যেন কাজ থামিয়ে দরজার দিকে কান পাতলেন। শাহাজের মতো গম্ভীর আর একরোখা ছেলের বিয়ের কথা এভাবে হঠাৎ উঠবে, তা কেউ ভাবেনি।
পিয়াস বড় মার প্রতিক্রিয়ার অপেক্ষা না করেই আবার বলল, "বয়স তো কম হচ্ছে না, এখনো আইবুড়ো হয়ে বসে আছে। বড় ভাই হিসেবে আগে তো ওনার বিয়ে হওয়া উচিত, তাই না? আর ছেলের বউ আসলে তোমারও সাহায্য হতো।"
এদিকে তানজিনা বেগম পিয়াসের কথা শুনে মৃদু হাসলেন। হাতের ছুরিটা একপাশে রেখে পিয়াসের দিকে তাকিয়ে মমতাভরা স্বরে বললেন, "তোর কি মনে হয় বাবা, আমি ছেলে বিয়ে করিয়ে ছেলের বউকে দিয়ে কাজ করাব? মোটেও না। আমি তো আমার পুত্রবধূকে নিজের মেয়ের মতো করে আগলে রাখব।"
পিয়াস দমবার পাত্র নয়। সে একটু নড়েচড়ে বসে বলল, "আরে তা তো রাখবেই, কিন্তু তার জন্য তো আগে বিয়েটা করাতে হবে!"
তানজিনা বেগম এবার একটু গম্ভীর হলেন। "তুই আজ হঠাৎ ওর বিয়ের পেছনে কেন লাগলি বল তো? তুই কি শাহাজকে চিনিস না? ওকে এখন বিয়ের কথা বলতে যাওয়া মানে বাড়িতে অশান্তি ডেকে আনা। ও নিজের মর্জি ছাড়া কিছুই করে না, এটা তো তুই ভালোই জানিস।"
পিয়াস নাছোড়বান্দার মতো বলল, "বড় মা, অশান্তি হবে কেন? তোমরা আগে মেয়ে পছন্দ করো, তারপর বিয়ে করিয়ে দাও। আর তাছাড়া আমাদেরও তো বয়স হচ্ছে, তাই না? বড় ভাইয়ের বিয়ে না হলে আমরাই বা কীভাবে কী করি!"
রান্নাঘর থেকে নাসরিন বেগম এতক্ষণ সব শুনছিলেন। তিনি এবার মুখ টিপে হেসে ফোড়ন কাটলেন, "কী রে পিয়াস! তোর কি কোনো পছন্দ-টছন্দ আছে নাকি? সেটা বল আগে। শাহাজের আগে নাহয় তোরটাই সেরে ফেলি! নাকি আমাদের খুঁজতে হবে?"
পিয়াস এবার একটা বাঁকা হাসি দিল, সে সরাসরি কিছু না বলে ইশারা করে বুঝিয়ে দিল যে তার পছন্দ খুব কাছেরই কেউ। পিয়াস যেন বোঝাতে চাইল, ঘরেই যখন হীরা আছে, তখন বাইরে খোঁজার দরকার কী! এদিকে সিমি এতোক্ষন পিয়াসকে দেখছিলো, তাই পিয়াসের ইশারা দেখে বসে সে লজ্জায় লাল হয়ে মাথা নিচু করে ফেলল। সে ভাবল পিয়াস হয়তো তাকে নিয়েই ইঙ্গিত দিচ্ছে। সিমি আড়চোখে পিয়াসকে একবার দেখে নিয়ে লাজুক হাসল।
বাড়ির বড়রা অবশ্য পিয়াসের এই কথাকে নিছক দুষ্টামি বলে ধরে নিলেন। তারা হেসে উড়িয়ে দিলেন বিষয়টাকে। কিন্তু কেউ ঘুণাক্ষরেও বুঝতে পারল না যে পিয়াসের তীরের নিশানায় আসলে রুহি।
ঠিক সেই মুহূর্তে সদর দরজা দিয়ে বাড়িতে প্রবেশ করল রুহি। আজ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ফিরতে ওর বেশ তাড়াতাড়ি হয়ে গেছে কারণ কিছু ক্লাস বাতিল হয়েছে। ড্রয়িংরুমের এই জমায়েত দেখে সে অবাক হয়ে এগিয়ে এল। তানজিনা বেগম রুহিকে ঘরে প্রবেশ করতে দেখে হাত বাড়িয়ে কাছে ডাকলেন। রুহি গিয়ে বড় মার পাশে দাঁড়িয়ে জিজ্ঞেস করল, "কী ব্যাপার? তোমরা সবাই মিলে কী নিয়ে কথা বলছ?"
তখনই ভেতর থেকে নাসরিন বেগম হাসতে হাসতে বললেন, "আমরা তোর পিয়াস ভাইয়ার জন্য মেয়ে ঠিক করছি রে রুহি। এখন ওকে জিজ্ঞেস করলাম কাউকে পছন্দ কি না, আর অমনি দেখ কেমন চুপ মেরে গেছে!"
এদিকে পিয়াস এবার সরাসরি রুহির দিকে তাকিয়ে রহস্যময় এক হাসি দিয়ে বলল, "পছন্দ তো আছেই সেজ মা, সময় হলে ঠিকই বলব। আর বিশেষ করে তোমাকেই আগে বলব। শত হলেও পছন্দের মানুষ বলে কথা! আমার কিন্তু তখন তোমাকে খুব প্রয়োজন পড়বে বুঝলে।"
পিয়াসের এই কথার দ্ব্যর্থবোধক মানে রুহি ছাড়া আর কেউ ধরল না। নাসরিন বেগম খুশিতে গদগদ হয়ে বললেন, "হ্যাঁ বাবা, বলিস। দরকার পড়লে মেয়ে তুলে নিয়ে আসব, তাও ছাড়ব না!"
রুহির কাছে পিয়াসের এই 'ঢং' আর আদিখ্যেতা অসহ্য লাগছিল। তাই তার ভেতরটা বিরক্তিতে রি রি করে উঠল। সে আর সেখানে দাঁড়ানো সমীচীন মনে করল না। গাম্ভীর্য বজায় রেখে সোজা গিয়ে ফ্রিজ খুলে একটা আপেল নিল, তারপর কোনো কথা না বাড়িয়ে নিজের রুমের দিকে চলে গেল।
রুহি যেতেই পিয়াস সিটে হেলান দিয়ে রুহির যাওয়ার পথের দিকে তাকিয়ে রইল। তার ঠোঁটে লেগে রইল সেই চিরচেনা বিষাক্ত আর বাঁকা হাসি। সে মনে মনে হাসল, কারণ রুহির বিরক্তিই যেন এখন তার পরম তৃপ্তি।
★★★
পড়ন্ত বিকেল। আকাশের বুক চিরে রক্তিম আভা ছড়িয়ে সূর্য ধীরে ধীরে দিগন্তের ওপাড়ে মুখ লুকোচ্ছে। পাখিরা ডানা ঝাপটিয়ে কিচিরমিচির শব্দে আপন নিড়ে ফিরছে। আর কিছু সময় পরেই ধরণীজুড়ে সন্ধ্যার আঁধার ঘনিয়ে আসবে। এমন এক মায়াবী সময়ে ছাদের বাগানে নিজের অতি প্রিয় গোলাপ গাছগুলোর পরিচর্যায় মগ্ন রুহি। তার সাথে আছে বাড়ির ছোট ছেলে মুগ্ধ, যে মাঝে মাঝে রুহিকে এটা-ওটা এগিয়ে দিয়ে সাহায্য করছে। কিন্তু এমনি এমনি নয়, এই সাহায্যের বিনিময়ে রুহিকে রাতে তার সাথে ব্যাডমিন্টন খেলতে হবে।
এদিকে রুহির ছোট বাগানটি এখন যেন কলিদের রাজত্ব। প্রায় প্রতিটি গাছেই অসংখ্য কুঁড়ি এসেছে। রুহি খুব যত্ন করে গাছের গোড়ায় সার দিচ্ছে আর নিড়ানি দিয়ে মাটি আলগা করে দিচ্ছে, যাতে প্রতিটি ফুল সুন্দরভাবে ফুটে উঠতে পারে। গাছের প্রতি রুহির এই মমতা দেখে বোঝা যায়, এই বাগানটি তার কতটা হৃদয়ের কাছের।
ওদিকে ছাদের এক কোণে জমে উঠেছে আড্ডার আসর। রিমু, রুবি আর সিমির সাথে সেখানে আছে কাব্যও। কাব্যকে আজকাল বাড়িতে খুব একটা দেখা যায় না; বাবার চাচাদের সাথে পুরোদমে ব্যবসার কাজ শিখতে সে ভীষণ ব্যস্ত। আজ একটু ফুরসত পেয়েছে বলেই বাড়ি ছিলো তাই আড্ডায় যোগ দিয়েছে। আড্ডার মাঝেই কাব্য রুহির দিকে তাকিয়ে হাঁক ছেড়ে বলল, "কী রে রুহি, হলো তোর? আর কতক্ষণ লাগবে? এই গাছে সার দিতে দিতেই কি সন্ধ্যা পার করে দিবি?"
রুহি তার কাজ প্রায় শেষ করে এনেছিল। হঠাৎ কাব্যের ডাক শুনে সে হাতের কাঁচা মাটি মাখা অবস্থাতেই হাসিমুখে তাদের পাশে এসে দাঁড়াল। নিজের পরিশ্রমের ফসল অর্থাৎ সেই গোলাপ কুঁড়িগুলোর দিকে একপলক তাকিয়ে কাব্যকে উদ্দেশ্য করে উৎসাহের সাথে বলল—
"দেখো না কাব্য ভাই, আমার গাছগুলোতে কেমন কলি এসেছে! আজ বাদে কাল দেখবে পুরো বাগান ফুলে ফুলে ভরে গেছে। তখন যে কী সুন্দর লাগবে দেখতে, একদম চোখ জুড়িয়ে যাবে। আমার তো আর সবুর সইছে না, ইচ্ছে করছে এখনই যদি সব ফুল ফুটে যেত!"
রুহির চোখের সেই উজ্জ্বলতা আর উচ্ছ্বাস দেখে কাব্য হেসেই ফেলল সাথে রুবি আর রিমুও, অন্যদিকে সিমির মন আজ বেশ ভালো তাই সেও রুহির দিকে তাকিয়ে একটু মৃদু হাসল।
একসময় রুহির বাগানের কাজ শেষ হলো। সে কোমরে হাত দিয়ে দাঁড়িয়ে তৃপ্তির সাথে নিজের হাতে সাজানো বাগানটাকে দেখছিল। ঠিক তখনই হাতে কফির মগ নিয়ে ছাদে প্রবেশ করল পিয়াস। সে ধীরপায়ে এগিয়ে এসে কাব্যদের পাশে দাঁড়াল। পিয়াসকে দেখে আড্ডারত রুবিরা কিছুটা সোজা হয়ে বসল। এদিকে পিয়াস কফিতে চুমুক দিয়ে রুহির বাগানের দিকে তাকিয়ে প্রশংসা করে বলল, "বাগানটা তো বেশ সাজানো! দেখতেতো বেশ লাগছে। এই সব গাছ কি রুহিই লাগিয়েছে?"
পিয়াশ প্রশ্ন শেষ করতেই পাশ থেকে রুবি উত্তর দিল, "হ্যাঁ, সবই ওর হাতে করা। দু-একটা গাছ বড় আব্বু লাগিয়েছেন, তবে বাকি সব রুহিরই কেনা।"
পিয়াস কৌতূহলী হয়ে জিজ্ঞেস করল, "গোলাপ বুঝি ওর খুব পছন্দের?"
এরপর রিমু হেসে বলল, "পছন্দ মানে? পারলে সারাদিন এই বাগান নিয়েই ও পড়ে থাকে। বলতে গেলে এই গাছগুলোর মধ্যেই ওর প্রাণ লুকিয়ে আছে। আমাদের কাউকে একটা ফুল পর্যন্ত ছিঁড়তে দেয় না। ভুল করে যদি কেউ একটা ফুল ছিঁড়েছে আর রুহি টের পেয়েছে, তবে রক্ষে নেই চিৎকার-চেঁচামেচি করে বাড়ি মাথায় তুলবে।"
রুহি এতক্ষণ পিয়াসকে খেয়াল করেনি এতোটাই ডুবে ছিলো বাগানে, হঠাৎ পিয়াসকে দেখেই নিজের শরীর আর হাতভর্তি মাটি ও সার দেখে সে আর সেখানে দাঁড়ানো সমীচীন মনে করল না। কারও সাথে কথা না বলেই দ্রুত সিঁড়ি দিয়ে নিচে নেমে গেল ফ্রেশ হওয়ার জন্য।
ধীরে ধীরে গোধূলির আলো মিলিয়ে গিয়ে অন্ধকার ঘনিয়ে এল। একে একে কাব্য, রুবি আর রিমুও ছাদ থেকে নিচে নেমে গেল। কিন্তু ছাদের কোণে রয়ে গেল কেবল পিয়াস আর সিমি। পিয়াস রেলিংয়ে হেলান দিয়ে মোবাইলে বুঁদ হয়ে আছে, আর সিমি কিছুটা দূরত্ব বজায় রেখে বসে একদৃষ্টে পিয়াসের দিকে তাকিয়ে আছে।
বেশ কিছুক্ষণ পর নীরবতা ভাঙল সিমি। মিনতিভরা স্বরে বলল, "বাড়িতে আমাদের কথা কবে জানাবে পিয়াস ভাই? আজ তো সেজ মামিও জিজ্ঞেস করছিল। আমারও তো বয়স হচ্ছে, বাড়ি থেকে বিয়ের সম্বন্ধ দেখছে। আর কতদিন চুপ করে থাকবে?"
পিয়াস মোবাইল থেকে নজর না সরিয়েই নির্লিপ্তভাবে বলল, "আমাদের কথা কী জানাব?"
সিমি কিছুটা লাজুক হাসল, "এই যে... আমাদের মধ্যকার সম্পর্কের কথা।"
পিয়াস এবার কফির মগটা পাশে রেখে নির্বিকার গলায় বলল, "আমাদের মধ্যকার সম্পর্ক তো সবাই জানে। তুই আমার ফুফাতো বোন। এখানে নতুন করে জানানোর কী আছে?"
সিমির মুখের হাসি মুহূর্তেই মিলিয়ে গেল। সে অবাক হয়ে বলল, "তুমি মজা করছ কেন পিয়াস ভাই? আমি সিরিয়াসলি বলছি।"
এবার মোবাইল থেকে নজর তুলল পিয়াস। সিমির চোখের দিকে সরাসরি তাকিয়ে বলল, "আমিও সিরিয়াস। তুই আমার বোন, এতে মজার কী দেখলি? আর এর বাইরে আমাদের মাঝে আছেই বা কী?"
সিমি যেন আকাশ থেকে পড়ল। পিয়াসের কথার অর্থ বুঝতে তার কষ্ট হচ্ছে সেই সাথে সে যেস বিশ্বাস করতে পারছে না। কম্পিত কণ্ঠে সে বলল, "আমাদের মাঝে আর কোনো সম্পর্ক নেই পিয়াস ভাই? তাহলে এত বছর ধরে যা চলছে, সেটা কী ছিল? তোমার বিদেশ যাওয়ার আগে থেকে শুরু করে আজ পর্যন্ত আমাদের মাঝে যা যা হয়েছে, তুমি কি সব অস্বীকার করছ?"
এবার পিয়াস একটা তাচ্ছিল্যের হাসি দিয়ে বলল, "শোন সিমি, আমার জানামতে আমাদের মধ্যে ভাই-বোন আর বন্ধুত্বের বাইরে কোনো সম্পর্ক কোনোদিন ছিল না। বিদেশে যাওয়ার আগে কী হয়েছে না হয়েছে, ওসব ছেলেমানুষি আমি কবেই ভুলে গেছি। আমি তোকে কোনোদিন অন্য নজরে দেখিনি।"
সিমি কান্নায় ভেঙে পড়ার উপক্রম হলো। সে আকুতি জানিয়ে বলল, "পিয়াস ভাই, দয়া করে এমন নিষ্ঠুর মজা করো না। আমি জানি তুমি দুষ্টামি করছ। প্লিজ, এই মজাটা বন্ধ করো।"
পিয়াসের মুখভঙ্গি এবার কঠোর হলো। সে শীতল গলায় বলল, "আমি কোনো মজা করছি না সিমি। আমাদের মাঝে কিছুই ছিল না, আর হবেও না। কারণ..." পিয়াস একটু থামল, তারপর স্পষ্ট স্বরে বলল, "আমি বর্তমানে রুহিকে পছন্দ করি এবং ওকেই বিয়ে করতে চাই। তাই দয়াকরে নিজের ননসেন্স কথাবার্তা বন্ধ কর।"
কথাগুলো শুনে সিমির পায়ের তলার মাটি যেন সরে গেল। তার জানামতে যে রুহিকে পিয়াস পছন্দ করতো না, একসময় কতো অপদস্ত করেছে, কতো আঘাত করেছে আর আজ কিনা পিয়াস বলছে সে সেই রুহিকে ভালোবাসে আবার বিয়েও করতে চায়। আকস্মিক রুহির নাম ও এমন কথা পিয়াসের মুখে এভাবে শুনে সিমির বুকটা যেন হাহাকার করে উঠল। মনে হলো সবটা স্বপ্ন, সবটা মিথ্যে।
সিমি ভেবেছিলো স্বপ্ন কেটে যাবে পিয়াস বলবে আসি মজা করছি তোমার সাথে আমি তোমাকেই ভালোবাসি কিন্তু নাহ এমন কিছুই হলো না, বরং পিয়াস তাকে একবারও সান্ত্বনা দিলো না আর না কিছু বললো। শুধু নিষ্ঠুর মানবের মতো তার হৃদয় ভেঙ্গে সামনে দিয়ে সেখান থেকে হেঁটে নিচে চলে গেল।
বিশাল এই ছাদে সিমি একা দাঁড়িয়ে রইল তার ক্ষতবিক্ষত হৃদয় নিয়ে। শীতের কনকনে বাতাস যেন তার বুকের হাহাকারকে আরও বাড়িয়ে দিল। অপমানে আর যন্ত্রণায় নীল হয়ে সিমি টলমলে পায়ে বসে পড়লো নিচে।
এদিকে শীতের সন্ধ্যা ঘনিয়ে এসেছে, দূর থেকে ভেসে আসছে মাগরিবের আজানের সুমধুর ধ্বনি। কিন্তু সিমির কানে সেই পবিত্র সুর আজ পৌঁছাল না। সে ছাদের এক কোণে পাথরের মতো বসে আছে, তার গাল বেয়ে নামছে তপ্ত অশ্রুধারা। যে পিয়াসকে সে বছরের পর বছর নিজের সমস্ত আবেগ দিয়ে ভালোবেসে এসেছে, সেই পিয়াসের কাছে আজ সে কেবলই এক 'ফুফাতো বোন' এর তকমা পেলো! এই যে কতো ভালো ভালো সম্বন্ধ এলো এক পিয়াসের জন্যই তো সবাইকে না করলো। আর আজ তার প্রতিদান এভাবে পেলো সে।
সিমির মাথায় এখন পুরোনো স্মৃতিগুলো হাতুড়ি পেটা করছে। সে বুঝতে পারছে, পিয়াস আসলে কোনোদিন তাকে ভালোবাসেনি। পিয়াস কেবল রুহিকে ঈর্ষান্বিত করার জন্য কিংবা রুহির কাছাকাছি থাকার একটা মাধ্যম হিসেবে সিমিকে ব্যবহার করেছে। এই চরম সত্যটা সিমির ভেতরকার সমস্ত মায়া আর কোমলতাকে মুহূর্তেই বিষে রূপান্তর করে দিল।
যন্ত্রণার চরম সীমায় পৌঁছে সিমি এবার উঠে দাঁড়াল। তার ভেতরের সমস্ত হাহাকার এখন প্রচণ্ড এক আক্রোশে পরিণত হয়েছে। তার সাথে হওয়া সব অপরাধের জন্য সে দায়ী করলো নিষ্পাপ রুহিকে।
যে রুহির জন্য সে আজ পরিত্যক্ত, সেই রুহির ওপর তার ঘৃণাটা আগ্নেয়গিরির লাভার মতো ফুটতে লাগল। সে জানে রুহির গায়ে হাত তোলার সাধ্য তার নেই, কিন্তু রুহির সবচেয়ে প্রাণের জিনিসটি তো তার সামনেই পড়ে আছে।
পাগলের মতো সিমি এগিয়ে গেল রুহির সেই সাজানো-গোছানো বাগানটির দিকে। একটু আগেও যে বাগানটি ছিল স্বপ্নের মতো সুন্দর, প্রতিটি কলি যেখানে আগামীকালের ফুটন্ত হাসির স্বপ্ন দেখছিল, সেখানে নেমে এল ধ্বংসলীলা।
সিমি এক একটা টব সজোরে আছাড় মেরে ভাঙতে লাগল। রুহির প্রিয় সেই গোলাপ গাছগুলো, যেগুলোকে সে নিজের সবটা দিয়ে যত্ন করে সার-মাটি দিয়েছিল, সিমি সেগুলোকে দুই হাতে টেনে ছিঁড়ে ফেলল। মড়মড় শব্দে ডালগুলো ভাঙতে লাগল, ঝরে পড়ল অসংখ্য অপরস্ফুট কুঁড়ি। রুহির সাধের বাগানটা কয়েক মিনিটের মধ্যে এক বিধ্বস্ত ধ্বংসস্তূপে পরিণত হলো।
চারপাশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে ভাঙা টবের মাটির ডেলা আর ক্ষতবিক্ষত গাছের ডাল। শীতের আমেজের ঘ্রাণে ভরা সেই স্নিগ্ধ বাগান এখন কেবল ধ্বংসের সাক্ষী। সিমির হাত গোলাপের কাঁটায় রক্তাক্ত হলেও তার কোনো হুঁশ নেই। বিধ্বস্ত বাগানের মাঝখানে দাঁড়িয়ে সিমি হাঁপাচ্ছে; তার চোখে প্রতিশোধের আগুন আর পায়ের নিচে পড়ে আছে রুহির লালিত প্রতিটি স্বপ্ন।
সন্ধ্যা নামার আগেই বাগানটির সব আলো নিভে গেল, রয়ে গেল কেবল ধ্বংসের এক বীভৎস ছাপ।
চলবে.......