#অন্তহীন_প্রেম_আমার
#আফীফা_আফনান
#পর্ব_৫০ [প্রথমাংশ]
[কপি করা নিষিদ্ধ]
ভার্সিটি থেকে ফেরার পথে আজ আকাশটা বেশ পরিষ্কার। বিন্তি আর রুহি একটা রিকশায় চড়ে বাড়ির দিকে ফিরছে। দুই বান্ধবীর মধ্যে সারাপথের গল্প যেন শেষই হতে চায় না—কখনো ডিপার্টমেন্টের ক্লাস, কখনো বা ক্যান্টিনের বিচ্ছিরি চা, এসব নিয়ে টুকটাক খুনসুটি চলছেই।
রিকশাটা যখন মাঝরাস্তায়, তখন হঠাৎ বিন্তি একটু হেসে রুহির দিকে তাকিয়ে বলে উঠল, "রুহি, তুই কি জানিস আমাদের ডিপার্টমেন্টে নতুন যে স্যারটা জয়েন করেছে না তার ওপর পুরো ক্লাসের সবাই ক্রাস খেয়ে বসে আছে এমনকি ছোঁয়াও। কি কিউট দেখতে জানিস একদম রসগোল্লার মতো। আমার তো ইচ্ছে করে ধরে খেয়ে ফেলতে।
"তো খেয়ে ফেল, ধরে রেখেছে কে?" বিন্তির কথার প্রসঙ্গে দুষ্টামি করেই কথাটি বলে উঠলো রুহি।
"খেতে তো চাই কিন্তু, আমি যে তার আগেই অন্য কারো সৌন্দর্যের ওপর উষ্ঠা খেয়ে পড়ে আছি তার কি হবে?" রুহির দিকে তাকিয়ে হালকা বাঁকা হেসে বলে উঠলো বিন্তি।
"বাহ!বাহ! তো কে সেই মহাপুরুষ যার সৌন্দর্যের ওপর তুই উষ্ঠা খেয়ে আছিস বল দেখি? একটু ব্যাঙ্গ করেই বললো রুহি।
রুহির কথা শেষ হতেই অত্যন্ত লাজুকভঙ্গীতে বিন্তি বলে উঠলো, " শাহাজ ভাই! আমি শাহাজ ভাইয়ের ওপর ক্রাস খেয়ে বসেছি দোস্ত। অতঃপর বিন্তি রুহির দিকে আড়চোখে তাকিয়ে মজা করেই বলে উঠলো, কিন্তু হায় আফসোস বর্তমানে সে আমার প্রান প্রিয় বান্ধবীর হার্ট, লিভার, কিডনি সব কিছু তাই আর কি করার আপাতত নিজেকে শান্তনা দিচ্ছি।" কথাটি বলেই বিন্তি এক প্রকার নাটকীয় ভাবেই রুহির কাঁধে নিজের মাথা ঠেকিয়ে হাহুতাশ করতে শুরু করলো।
কিন্তু পরক্ষণেই কিছু একটা ভেবে সে সোজা হয়ে বসে রুহিকে বলে উঠলো, "জানিস কি আমার মনে হয় আমি কেন আমার মতে উনাকে যেই প্রথম দেখবে তারই হার্ট মিস হবে। আমার তো মনে হয় ওনার ভার্সিটির অর্ধেক মেয়ের ক্রাশ হবেন উনি? মানে, তাঁর ওই লুক আর পার্সোনালিটি... উফ! এক কথায় হ্যান্ডসাম আর স্মার্ট বলতে যা বোঝায়, শাহাজ ভাই ঠিক তা-ই। আমি হান্ড্রেড পার্সেন্ট শিওর ওনার ডিপার্টমেন্টের অনেকের পছন্দের তালিকার একদম ওপরে যে ওনার নাম থাকবে, এতে আমার কোনো সন্দেহ নেই।"
বিন্তির মুখে শাহাজের এমন প্রশংসা শুনে রুহি একটু থমকে গেল। কেমন যেন হৃদপিণ্ডটা মোচড় দিয়ে উঠলো। কিন্তু নিজেকে স্বাভাবিক রেখে আলতো করে গায়ের ওড়নাটা ঠিক করতে করতে খানিকটা অবজ্ঞার সুরে বলল, "ধুর! কী যে বলিস না বিন্তি। শাহাজ ভাই তো সবসময় গম্ভীর হয়ে থাকেন। কারো সাথে ঠিকমতো কথাই বলেন না। আমি তো রুবি আপুর কাছ থেকে শুনেছি ক্লাসে নাকি সবাই তাকে রীতিমতো ভয় পায় আর এড়িয়ে চলে। ওরকম একটা রাশভারী মানুষের ওপর আবার কে ক্রাশ খাবে?"
এদিকে বিন্তি দমলোনা বরং এবার আরও জোর দিয়ে বলল, "আরে পাগলী, ওই গাম্ভীর্যটাই তো আসল আকর্ষণ! উনি যতই গম্ভীর থাকুন না কেন, ওরকম একজন হ্যান্ডসাম মানুষকে পছন্দ না করে থাকা যায় নাকি? বিশ্বাস কর, আড়ালে আবডালে অনেকেই তাঁকে নিয়ে স্বপ্ন দেখে বুঝলি। হয়তো শাহাজ ভাই বুঝতে পারেন তাই সবাইকে এড়িয়ে চলেন, বুদ্দু। "
অপরদিকে বিন্তির কথাগুলো রুহির মনে যেন একটা সূক্ষ্ম অস্বস্তি তৈরি করল। তার চোখের সামনে মুহূর্তেই শাহাজের সেই ধারালো মুখাবয়ব ভেসে উঠল। একে একে মনে পড়ে গেল দিঘির পাড়ে, বাড়ির ছাদে কাটানো সেই সুন্দর মুহূর্ত গুলোর কথা, শাহাজের সেই অধিকারবোধে ভরা ডাক— 'চঞ্চলা'।
এবার রুহি একটু চিন্তিত হয়ে পড়ল; সত্যিই কি তবে অন্য মেয়েরা শাহাজ ভাইয়ের দিকে ওরকম নজরে তাকায়? কেমন যেন একটা অজানা ঈর্ষা তার বুকের ভেতরটা কামড়ে ধরল।
কিন্তু পরক্ষণেই রুহির ঠোঁটের কোণে এক চিলতে আত্মবিশ্বাসের হাসি ফুটে উঠল। অতঃপর সে রিকশার বাইরের দিকে তাকিয়ে মনে মনে নিজেকেই আশ্বস্ত করল। রুহি মনে মনে ভাবল, "অন্যরা যতই পছন্দ করুক না কেন, শাহাজ ভাই তো শুধু আমাকেই পছন্দ করেন। তাঁর ওই গাম্ভীর্যের আড়ালে যে ভালোবাসা লুকিয়ে আছে, তার ভাগীদার তো কেবল আমিই। আর সেখানে ঢোকার দুঃসাহস কারো নেই।"
এদিকে রিকশার টুংটাং আওয়াজের মাঝে রুহি মনে এক অদ্ভুত প্রশান্তি অনুভব করল। সেই সাথে রুহি এও অনুভব করলো যে শাহজাদা মোস্তাফা তাঁর জীবনে নিজের তৈরি যে দেয়ালে অন্যদের আটকে রাখে, সেই দেয়ালেই সবসময় রুহির জন্য একটা খোলা দরজা রাখা আছে—আর এই সত্যটাই রুহিকে সবার থেকে আলাদা করে রাখে।
একসময় তারা গন্তব্যে পৌছালো, রিকশা থেকে নেমে দুই বান্ধবী দুতিকে বিদায় নিল। শীতের দুপুর হওয়ায় রোদ বেশ চড়া হলেও মাঝে মাঝে আসা ঝিরঝিরে বাতাস শরীরও মন যেন জুড়িয়ে দিচ্ছিল। এদিকে রুহি পা চালিয়ে বাড়ির মোড়টা পার হচ্ছে, ঠিক তখনই কোথা থেকে যেন এক অপরিচিত অথচ অদ্ভুত এক নারী কণ্ঠের ডাক ভেসে এল— "রুহি!"
হঠাৎ এমন সম্বোধনে রুহি থমকে দাঁড়িয়ে চারপাশে তাকাল। এই ভরদুপুরে এই গলির ভেতর তাকে কে ডাকবে? চারপাশে তাকিয়ে কাউকে দেখতে না পেয়ে মনের ভুল ভেবে সে আবার হাঁটতে শুরু করল। দু-কদম এগোতেই আবারও সেই ডাক, এবার আরও স্পষ্ট। রুহি দাঁড়ালো, চারপাশে পরখ করলো অতঃপর পেছন ফিরতেই দেখল সাথী হন্তদন্ত হয়ে তার দিকেই হেঁটে আসছে।হঠাৎ তাকে এই সময় এখানে দেখে রুহি বেশ অবাক হলো।
সাথীকে সে কিছুদিন আগেই রুবির সাথে ভার্সিটিতে দেখেছে।সেই সাথে সাথী বোনের বান্ধবী, সেই সূত্রে জানাশোনা। তাই পূর্ব পরিচিত হওয়াতে রুহি মার্জিত এক টুকরো হাসি ফুটিয়ে সাথী কাছে আসতেই জিজ্ঞেস করল, "কেমন আছেন আপু? হঠাৎ আপনি এখানে?"
সাথী হাঁপাচ্ছিল। রুহির সামনে এসে একগাল হেসে শ্বাস নিতে নিতে বলল, "ভালো রুহি। তুমি কেমন আছো?"
"আমিও ভালো। কোনো দরকার ছিল কি এদিকে?" রুহি কৌতূহলী চোখে তাকাল।
সাথী এবার কোনো কথা না বলে নিজের সাইড ব্যাগ থেকে ধীরলয়ে একটি সাদা রঙের সুন্দর খাম বের করল। অতঃপর সে খামটি রুহির হাতে ধরিয়ে দিলো। এদিকে খামটি রুহির হাতে দেওয়ার সময় সাথীর দু-গালে যেন লাজুকতার লাল আভা ছড়িয়ে পড়ল। সে রহস্যময় ভাবে নিচের দিকে তাকিয়ে ঠোঁট কামড়ে হাসল, আর যা রুহির সন্ধানী দৃষ্টি এড়াল না।
অন্যদিকে রুহি হাতে পাওয়া খামটির দিকে তাকিয়ে কিছু একটা জিজ্ঞেস করতে চাইল, কিন্তু তাকে সুযোগ না দিয়েই সাথী চটপট করে বলে উঠল, "এটা শাহজাদা স্যারকে দিয়ে দিও তো রুহি। একদম ভুলো না কিন্তু! যদি জিজ্ঞেস করেন কে দিয়েছে, তবে আমার নাম বলার দরকার নেই। শুধু বলবে ভার্সিটি থেকে পাঠিয়েছে। এমনিতেও উনি এটা দেখলেই বুঝে যাবেন এটা কে পাঠিয়েছে এবং কি কাজে।"
কথাগুলো বলার সময় সাথীর ঠোঁটের কোণে সেই লাজুক হাসিটা আরও চওড়া হলো, যেন সে কোনো গোপন প্রেমের বার্তা পৌঁছানোর দায়িত্ব রুহিকে দিচ্ছে। এদিকে রুহি যেন চরম পরিসরে অবাক, তাই সে হন্তদন্ত হয়ে কিছু একটা বলতে যাচ্ছিল, কিন্তু তার আগেই সাথী হঠাৎ করেই ঘড়ির দিকে তাকিয়ে বলল, "আরে! আমার একটা কাজ আছে, দেরি হয়ে যাচ্ছে। আসি কেমন রুহি, মনে করে স্যারকে দিয়ে দিও কিন্তু!"
সাথী যেভাবে বাতাসের মতো হুট করে এসেছিল, ঠিক সেভাবেই রুহিকে উত্তরের সুযোগ না দিয়ে দ্রুতপদে চলে গেল। এদিকে রুহি খামটা হাতে নিয়ে একদম আহাম্মকের মতো মাঝরাস্তায় দাঁড়িয়ে রইল। সে একবার খামটার দিকে তাকাচ্ছে, আর একবার সাথীর চলে যাওয়ার পথের দিকে।
হঠাৎ করেই রুহির হাতের খামটা যেন ভারী ঠেকতে লাগল। সে মাথার ওড়নাটা ভালো করে তুলে খামটাকে চোখের সামনে এনে এপিঠ-ওপিঠ করে নাড়িয়ে চাড়িয়ে দেখার চেষ্টা করল। সাথী বলল এটা ভার্সিটি থেকে এসেছে, কিন্তু খামের গায়ে তো কোনো দাপ্তরিক সিল নেই, এমনকি কারো নাম-ঠিকানাও লেখা নেই! দুটো পিঠই একদম ধবধবে সাদা।
রুহির মনের ভেতর কৌতূহলের পোকাটা নড়াচড়া দিয়ে উঠল। সে ভাবল, "ভার্সিটির জরুরি কাগজ এমন বেনামী খামে আসবে কেন?" একবার ভাবল খুলে দেখবো কি? পরক্ষনেই বিবেক জাগ্রত হলো "ঠিক হবে না,"কিন্তু পরক্ষণেই এক অদৃশ্য ঈর্ষা তাকে বাধ্য করল। অতঃপর কাঁপাকাঁপা হাতে অতি সাবধানে রুহি খামের মুখটা খুলতেই বেরিয়ে এল হালকা গোলাপি রঙের একটা কাগজ। ওটা কোনো নোটিশ নয়, বরং সুগন্ধি মাখানো একটা নিখাদ প্রেমপত্র!
এদিকে রুহির চোখ জোড়া যেন ছানাবড়া! ভার্সিটি থেকে আজকাল শিক্ষকদের এমন রঙিন চিঠি পাঠানো শুরু হয়েছে নাকি? সে আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না, উৎসুক হয়ে পড়তে শুরু করল চিঠিখানা।
এখন মধ্যাহ্নবেলা। শীতের এই রোদ ঝলমলে বারোটার সময়টাকে সাহিত্যের ভাষায় বলা হয় ‘মার্তণ্ড-দীপ্ত মধ্যাহ্ন’। আর ঠিক এই সময়টাতেই রুহির চারপাশটা যেন ঝকঝক করছে, খুব একটা গরমও নেই, কিন্তু চিঠিটা পড়তে পড়তে রুহির কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম জমতে শুরু করল। চিঠির প্রতিটি লাইনে সাথী তার শাহাজ ভাইয়ের প্রতি মনের জমানো সব মোহ আর আসক্তি ঢেলে দিয়েছে। সেখানে শাহাজের সেই গম্ভীর ব্যক্তিত্বের গুণগান গাওয়া হয়েছে, তাকে পাওয়ার আকুতি ঝরে পড়েছে প্রতিটি অক্ষরে।
রুহি যত এগোচ্ছে, তার চোখ-মুখ ক্রোধে লাল হয়ে উঠছে। রাগে তার শরীর কাঁপছে। এটা কোনো সাধারণ চিঠি নয়, এটা তার শাহাজ ভাইয়ের সাম্রাজ্যে অন্য এক নারীর অনধিকার প্রবেশ! পড়া শেষ হতেই রুহি ঘেন্নায় মুখ বিকৃতি করল। মনে মনে সাথীকে একশ একটা গালি দিয়ে উঠল— "নির্লজ্জ মেয়ে! আমার শাহাজ ভাইয়ের ওপর নজর দেওয়ার সাহস হয় কী করে?"
অতঃপর সে রাগের মাথায় চিঠিটা মুঠো করে রাস্তার ধারে ফেলে দিতে চাইল। কিন্তু হঠাৎ তার মস্তিষ্কে এক অদ্ভুত চিন্তা খেলে গেল। যদি বাতাসে উড়ে চিঠিটা আবার শাহাজের কাছেই পৌঁছে যায়? কিংবা শাহাজ ভাই যদি বিকেলে হাঁটতে বেরিয়ে কোনোভাবে এই গোলাপি কাগজটা দেখতে পান? না, রুহি কোনো ঝুঁকি নিতে রাজি নয়। এই বিষাক্ত ভালোবাসার চিহ্ন সে পৃথিবীর কোথাও রাখবে না।
রুহি এক মুহূর্ত ভাবল, তারপর পাগলামির চূড়ান্ত সীমায় পৌঁছে খাম পাশের ড্রেনে ফেলে সেই গোলাপি চিঠিখানা সোজাসুজি নিজের মুখে পুরে দিল! দাঁত দিয়ে কচকচ করে চাবাতে চাবাতে সে বাড়ির দিকে হাঁটতে লাগল। এই মুহুর্তে কাগজের বিস্বাদ তেতো ভাবটা তার কাছে সাথীর ওই সস্তা প্রেমের চেয়েও ভালো মনে হলো। এদিকে তার শাহাজ ভাইকে নিয়ে লেখা অন্য কোনো নারীর শব্দরাশি রুহি নিজের অস্তিত্ব দিয়েই পিষে ফেলতে চাইল।
বাড়ির মেইন গেটে পা রাখতেই রুহি শেষবারের মতো গলার জোর দিয়ে একটা ঢোক গিলল। সাথীর ভালোবাসার প্রমাণ এখন রুহির পাকস্থলীতে বন্দি! গেট দিয়ে ভেতরে ঢোকার সময় রুহির চোখেমুখে যেন এক পৈশাচিক তৃপ্তি ফুটে উঠল। সে মনে মনে বলে উঠল, "সরি সাথী আপু, তোমার ভালোবাসা আজ আমার দুপুরের নাস্তা হয়ে হজম হয়ে গেল! শাহাজ ভাই শুধু আমার, তাঁর দিকে হাত বাড়ানোর আগে কি হকে পারে তোমার তা হিসেবে রাখা উচিত ছিল।"
এদিকে রুহি ওগনার কাছা দিয়ে কপালের ঘামটুকু মুছে খুব স্বাভাবিক ভঙ্গিতে বাড়ির কলিংবেলে হাত রাখল, যেন একটু আগে সে কোনো বিশ্বজয়ের মিশন শেষ করে ফিরল।
অপরদিকে বাড়িতে ফিরে রুহি নিজেকে অস্বাভাবিক রকমের শান্ত করে ফেলল। বাইরের ঝড় ভেতরে পুষে রেখে সে প্রতিদিনের রুটিন অনুযায়ী হাত-মুখ ধুয়ে, কাপড় বদলে, খেয়ে নিজের রুমে গিয়ে চুপচাপ শুয়ে পড়ল। ওপর থেকে দেখলে মনে হবে সে খুব ক্লান্ত, কিন্তু তার ভেতরে তখন আগ্নেয়গিরির লাভা ফুটছে।
রুহি বালিশটা শক্ত করে জড়িয়ে ধরে সিলিংয়ের দিকে তাকিয়ে মনে মনে শাহাজের ওপর এক আকাশ সমান রাগ পুষতে শুরু করল। তার যুক্তিতে, আজকের এই চিঠিকাণ্ডের পেছনে সব দোষ আসলে শাহাজের।
সে বিড়বিড় করে বলতে লাগল, "সব দোষ ওই গম্ভীর শাহাজ ভাইয়ের। কী দরকার ছিল প্রতিদিন ওরকম টিপটপ হয়ে, আয়রন করা শার্ট পরে, বাবু সেজে ভার্সিটিতে যাওয়ার? ওরকম সেজেগুজে সামনে ঘুরঘুর করলে তো বিন্তির মতো মেয়েরা ক্রাশ খাবেই, আর সাথী আপুরা গোলাপি চিঠি পাঠাবেই। নিজের চেহারা নিয়ে উনার কি একটুও হুঁশ নেই? কেন উনি একটু অগোছালো হয়ে যেতে পারেন না? কেন উনাকে অতটা হ্যান্ডসাম দেখাতেই হবে?"
রুহির মতে, শাহাজের এই 'পারফেক্ট' থাকাটাই আসলে সবচেয়ে বড় অপরাধ। সে ভাবল, শাহাজ ভাই যদি মুখটা আরও একটু বেশি গম্ভীর করে রাখতেন বা একটু সাধারণ পোশাক পরতেন, তবে হয়তো কারো সাহস হতো না তাঁকে নিয়ে এমন রঙিন স্বপ্ন দেখার।
নিজের পাকস্থলীতে হজম হয়ে যাওয়া সেই চিঠির বিস্বাদ স্বাদটা সে এখনো যেন জিভে অনুভব করছে। রাগে রুহির দুই পা দিয়ে বিছানায় লাথি মারতে ইচ্ছে করছে। সে মনে মনে ঠিক করে ফেলল, আজ শাহাজ ভাই বাড়িতে ফিরলে সে তাঁর সাথে কথা তো বলবেই না, বরং এমন একটা ভাব করবে যেন শাহজাদা মোস্তাফা নামের কেউ এই পৃথিবীতে অস্তিত্বশীল নেই।
"সেজেগুজে ভার্সিটি যাওয়া বের করছি আপনার, আজ আসুক বাসায়!"— দাঁতে দাঁত চেপে রুহি এই প্রতিজ্ঞা করে জানালার ওপাশে বিকেলের ম্লান আলোর দিকে তাকিয়ে রইল। এদিকে তার এই পাগলামি মেশানো ঈর্ষা আজ শাহাজের জন্য এক কঠিন পরীক্ষার সংকেত দিচ্ছে।
★★★
রাত তখন ১০টা। জানালার ওপাশে শীতের রাতটা আজ বেশ জাঁকিয়ে বসেছে। রুহি আড়মোড়া ভেঙে যখন চোখ মেলল, তখন রুমের ভেতরটা নিঝুম। বিকেলের সেই তীব্র রাগ আর অস্থিরতা যেন গভীর ঘুমের অতলে কিছুটা থিতিয়ে গেছে। কম্বলের ওম ছেড়ে বের হতে মন চাইছে না, কিন্তু পেটের ভেতরটা এখন বিদ্রোহ শুরু করেছে।
নাসরিন বেগম আর তানজিনা বেগম সন্ধ্যার পর থেকে কম ডাকাডাকি করেননি। এমনকি মুগ্ধও কয়েকবার এসে দরজায় টোকা দিয়ে গেছে। রুহি সব শুনেছে, কিন্তু ওই যে—একটু অভিমান আর অনেকটা আলসেমির কারণে সাড়া দেয়নি। শেষে রাতের খাবারের সময়ও যখন সে গেল না, তখন নাসরিন বেগম সম্ভবত দমে গেছেন। মা বোধহয় এবার একটু শক্ত হয়েছেন; শাস্তি হিসেবে মেয়ের রুমে খাবার পাঠানোর চিরাচরিত নিয়মটা আজ আর পালন করেননি।
"সবাই কেমন পাষাণ! আমি যে না খেয়ে আছি কারো কোনো চিন্তাই নেই," রুহি বিড়বিড় করে নিজের ওপরই একটু রাগ দেখাল। কিন্তু খিদের জ্বালায় এখন পেটের ভেতরের ইঁদুরগুলো দৌড়াদৌড়ি করছে। ১০টা বেজে গেছে, এখন কি আর কেউ জেগে আছে?
অবশেষে ক্ষুধার কাছে হার মেনে সে আড়মোড়া ভেঙে বিছানা ছাড়ল। ওড়নাটা গায়ে ভালো করে জড়িয়ে নিয়ে পা টিপে টিপে রুম থেকে বের হলো। নিচতলার আলো আধারি করিডোর দিয়ে সে রান্নাঘরের দিকে এগোতে লাগল। বাড়ির সবাই সম্ভবত এখন নিজেদের রুমে। রুহি মনে মনে প্রার্থনা করছে যেন ফ্রিজে অন্তত বিকেলের কোনো নাস্তা বা রাতের বেঁচে যাওয়া এক-আধটু খাবার পাওয়া যায়।
এদিকে সিঁড়ি দিয়ে নিচে নামার সময় কাঠের ধাপগুলো হালকা শব্দ করছে। তাই রুহির প্রতিটি কদম এখন সাবধানে ফেলছে কারন সে এখন খাবারের সন্ধানে। এখন যদি নাসরিন বেগম জেগে যায় তাহলে শেষ।
এদিকে রুহি যখন নিচে নামছে তখন সে জানত না যে এই নিশুত রাতে কেবল তার পেটই নয়, তার মনটাও এক অদ্ভুত অভিজ্ঞতার অপেক্ষায় আছে। রান্নাঘরের দরজায় পৌঁছানোর আগেই রুহি হাঠাৎ দেখল ডাইনিং টেবিলের এক কোণে একটি আবছা আলো জ্বলছে। কেউ কি তবে এখনো জেগে আছে? নাকি তার জন্যই কেউ অপেক্ষা করছে?
রুহি ডাইনিং রুমের কাছে গিয়েই চারপাশে একবার তীক্ষ্ণ নজর ঘোরালো, কিন্তু কোথাও কাউকে দেখল না। পুরো বাড়ি নিঝুম হয়ে আছে। তাই সে সোজা গিয়ে ফ্রিজের সামনে দাঁড়ালো। কিন্তু ফ্রিজের হাতল ধরে টান দিতেই আবিষ্কার করল—তা শক্তভাবে তালাবদ্ধ। রুহি কপালে হাত দিয়ে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। অতঃপর ফলের ঝুড়ির দিকে তাকিয়ে দেখল সেখানেও একটা শুকনো লেবু ছাড়া আর কিচ্ছু নেই। রুহি বুঝল, নাসরিন বেগম আজ তার ওপর সত্যিই ভীষণ চটেছেন; মেয়েকে জব্দ করতে তিনি সব খাবার ফ্রিজে তুলে তালা ঝুলিয়ে দিয়েছেন।
মায়ের এই চালাকি বুঝতে পেরে রুহি ফোঁস করে একটা নিশ্বাস ফেলল। কিন্তু পরক্ষণেই তার ঠোঁটের কোণে একটা বাঁকা হাসি ফুটে উঠল। সে বিড়বিড় করে বলল, "তুমি যদি আমার মা হও, তবে আমিও তোমার পেটকাটা মেয়ে! বুদ্ধি আমারও কম নেই।"
তাই সে পা টিপে টিপে এগিয়ে গেল রান্নাঘরের ক্যাবিনেটের দিকে। পাল্লা খুলে হাত বাড়িয়ে দিতেই ওখান থেকে দুটো ওরিও বিস্কুটের প্যাকেট বেরিয়ে এলো। এগুলো মূলত মুগ্ধর জন্য আনা হয়েছিল, কিন্তু রুহি নিজের জন্য আগেভাগেই সরিয়ে রেখেছিল। এবার সে বিস্কুটটা ডাইনিং টেবিলের ওপর রেখে পাশের একটা তাক থেকে কিছু একটা নেওয়ার জন্য হাত বাড়ালো। কিন্তু উচ্চতায় কুলাতে না পেরে কয়েকবার লাফিয়েও নাগাল পেল না। নানপেরে সে যখন হাল ছেড়ে দিলো ঠিক তখনই হঠাৎ রুহি দেখল, পেছন থেকে একটা সুগঠিত হাত খুব সহজেই কৌটাটা নিয়ে তার দিকে এগিয়ে দিচ্ছে।
একই সাথে নাকে এল সেই পরিচিত পারফিউমের মোহনীয় সুঘ্রাণ। রুহি ভাবল এটা নিশ্চিত শাহাজ! ভাবনা অনুযায়ী সে একরাশ হাসি নিয়ে পেছন ফিরতেই তার মুখের হাসিটা মুহূর্তেই মিলিয়ে গেল। সামনে শাহাজ নয়, বরং পিয়াস দাঁড়িয়ে আছে। সেই সাথে তার ঠোঁটে তখন এক কুৎসিত হাসি।
রুহি বিরক্তিতে মুখ কুঁচকে পাশ কাটিয়ে চলে যেতে চাইল, কিন্তু পারলো না কজরন পিয়াস পথ আটকে দাঁড়াল।
পিয়াসের এহেন সাহস দেখে রুহি এবার শক্ত গলায় বলল, "পথ ছাড়ুন।"
পিয়াস সরল না। বরং সে রুহির আরেকটু কাছে এসে দাঁড়িয়ে চার বছর আগের সেই পুরনো স্মৃতি উসকে দিতে চাইল—কীভাবে রুহি একসময় তাকে পছন্দ করত, কীভাবে পিয়াসকে সে ফুল দিয়ে প্রপোজ করেছিল।
আবারও সেই পুরনো আঘাত মনে হতেই রুহি এবার সোজা হয়ে দাঁড়াল। পিয়াসের দিকে তীব্র তিক্ততায় তাকিয়ে খেঁকিয়ে উঠে বলল, "আপনার কি লজ্জা-শরম বলতে কিছু নেই? কোথায় বিক্রি করে দিয়েছেন সব? এই যে নির্লজ্জের মতো কয়েকদিন পর পর এসব পুরনো কাসুন্দি ঘাটেন, আপনার কি আত্মসম্মানে লাগে না? আপনার না লাগলেও আমার লাগে। তাই বলছি আর নিচে না নেমে, আমার থেকে দূরে থাকুন। এখনো বড় ভাই হিসেবে সম্মান দিচ্ছি, পরবর্তী সময়ে কিন্তু সেটাও দেব না।"
কথাগুলো বলেই রুহি যেই না সামনে পা বাড়াবে, ঠিক সেই সময় পিয়াস আবারও তাচ্ছিল্যের স্বরে বলে উঠল, "শাহাজ ভাইয়ের জন্য আমাকে ইগনোর করছিস, তাই না? তোর কি মনে হয় উনি আদেও তোকে বিয়ে করবেন? আমার তো মনে হয় না।"
রুহি এবার থমকে দাঁড়াল। মুখমন্ডলে তার রাগ স্পষ্ঠ। সে পেছনে ফিরে তীক্ষ্ণ কণ্ঠে জিজ্ঞেস করল, "কী বলতে চাইছেন আপনি?"
রুহির কথা শুনে পিয়াস আরও এক ধাপ এগিয়ে এল। বাঁকা হেসে বলল, "তুই শাহাজ ভাইকে কদিন চিনিস? কী জানিস তাঁর সম্পর্কে? চট্টগ্রাম থেকে উনি কি কি করছেন জানিস তুই? উনি জাস্ট তোকে ইউজ করছেন নিজের ফ্রি টাইম পাস করার জন্য। দিন শেষে উনিও যখন তোর চেয়ে ভালো কাউকে পাবেন, তোকে অনায়াসেই ছেড়ে দেবেন একবারও ভাববেন না তোর কি হবে। তাই বলছি সময় থাকতে আমার দিকে..."
পিয়াসের কথা শেষ হওয়ার আগেই এক অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটলো, পিয়াস যখন এসব বলছিলো তখনই রুহি ঘৃণাভরে পিয়াসের মুখের ওপর এক দলা থুতু ছিটিয়ে দিল। আকস্মিক এই ঘটনায় পিয়াস যেন একদম বেকুব বনে গেল। সে মারাত্মক ক্ষেপে গেলো, রাগে অন্ধ হয়ে রুহিকে কিছু একটা বলতে যাবে, তার আগেই রুহি চিৎকার করে বলে উঠল:
"একদম চিৎকার করবেন না! এটা ভদ্রলোকের বাড়ি, তাই নিজের অভদ্রতা এখানে দেখাবেন না। আর আপনি কী বোঝাতে চাইছেন? সবাই কি আপনার মতো নোংরা? প্রথমে আমাকে নিয়ে খেললেন, এরপর সিমি আপুকে নিয়ে... কী ভেবেছেন? আমি চুপ আছি দেখে সাপের পাঁচ পা দেখেছেন? ভুলে যাবেন না আমি কে! আমি আরোহী জামান, আখতারুজ্জামানের মেয়ে। আর আপনি যাকে নিয়ে আজেবাজে কথা বলছেন, তিনি মোস্তফা কামালের আদরের সন্তান। সবাইকে কি নিজের মতো বস্তাপচা আলু ভাবেন? ওহ হে আমিতো ভুলেই গিয়েছিলাম, যে যেমন সে তো অন্যদের তেমনই ভাববে। আপনার মতো মানুষের থেকে এর চাইতে ভালো আর কী-ই বা আশা করা যায়!"
রুহি একটু থামল, তাঁর বুক রাগে ওঠানামা করছে। সে আবারও ঘৃণাভরে বলে উঠলো , "আমার না মেজ মা আর মেজ বাবার জন্য আফসোস হয়। তাঁরা কত ভালো মানুষ, আর তাঁদের সন্তান হয়ে আপনি কতটা জঘন্য! কখনো যদি আপনার আসল চেহারা তারা দেখে তাহলে.......আর হ্যাঁ, মাত্র কী যেন বললেন? শাহাজ ভাই আমাকে ইউজ করছেন? করুক না! কিন্তু মনে রাখবেন, এই রুহি মরে গেলেও আপনার মতো অযোগ্য মানুষের কাছে ফিরবে না। কারণ রুহি যেদিক থেকে একবার মুখ ঘুরিয়ে নেয়, সেদিকে সে থুতুও ফেলে না। তবুও আজ নিজের মূল্যবান থুতু আপনার ওপর নষ্ট করলাম।"
যাওয়ার আগে রুহি পিয়াসের একদম সামনে এসে স্থির কণ্ঠে বলল, "আর হ্যাঁ, শুনে রাখুন— শাহাজ ভাইয়ের মতো পারফিউম ব্যবহার করলেই শাহাজ ভাই হওয়া যায় না। তাঁর শরীরে এই ঘ্রাণ যেমন মোহনীয় লাগে, আপনার শরীরে তা ততটাই দুর্গন্ধযুক্ত ঠেকছে আমার কাছে।"
কথাগুলো শেষ করে রুহি ওরিও বিস্কুটের প্যাকেট নিয়ে এক মুহূর্তও না দাঁড়িয়ে গটগট করে সিঁড়ি দিয়ে ওপরে উঠে গেল। এদিকে পিয়াস নিচে দাঁড়িয়ে নিজের হাত দিয়ই মুখে লেগে থাকা থুতুটুকু মুছতে মুছতে অপমানে আর রাগে স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। সে বুঝতেও পারেনি, শান্ত মেয়েটা আজ এভাবে আগ্নেয়গিরির মতো ফেটে পড়বে।আর এমন অনাকাঙ্ক্ষিত কান্ড ঘটিয়ে বসবে।
চলবে............