#অন্তহীন_প্রেম_আমার
#আফীফা_আফনান
#পর্ব_৫৬(ক)
[কপি করা নিষিদ্ধ]
ঘড়ির কাঁটায় তখন সকাল নয়টা। প্রতিদিনের মতোই আজও রান্নাঘরে সকালের ব্যস্ততা তুঙ্গে। তবে আজকে তানজিনা বেগমের রুটিনে কিছুটা পরিবর্তন এসেছে। তাঁর সম্পূর্ণ মনোযোগ এখন তাঁর একমাত্র ছেলের দিকে। ডাক্তারের কড়া পরামর্শ অনুযায়ী তিনি বর্তমানে রান্নাঘরে শাহাজের জন্য হালকা কিন্তু পুষ্টিকর নাস্তা তৈরি করছেন। অন্যদিকে শাহাজের অবস্থা আগের চেয়ে অনেক ভালো, তবে শরীর এখনো প্রচণ্ড দুর্বল। তাই গত রাতে শাহাজের অবস্থা সম্পর্কে জানানোর জন্য ডাক্তারকে মোস্তফা কামাল নিজে ফোন করেছিলেন। তখনই ডাক্তার জানিয়েছেন কোনো প্রকার মানসিক বা কাজের চাপ এই মুহূর্তে তাকে দেওয়া যাবে না। তাই রাতেই তানজিনা বেগম নিজের স্বামী মোস্তফা কামালকে স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দিয়েছেন যে —শাহাজ পুরোপুরি সুস্থ না হওয়া পর্যন্ত তাকে কোনো অফিসের কাজে যুক্ত করা চলবে না। মোস্তফা কামালও স্ত্রীর এই যৌক্তিক দাবি ফেলতে পারেননি। কারন তিনি এটা মানেন যে ইদানিং শাহাজের উপর সত্যিই তিনি বেশি কাজের প্রেসার দিয়ে ফেলেছেন। তাই গতরাতেই কাব্যকে ডেকে তিনি শাহাজের পেন্ডিং কাজগুলো একাই সামলানোর নির্দেশ দিয়েছেন।
এদিকে সময় গড়ানোর সাথে সাথে ডাইনিং রুমে একে একে বাড়ির সদস্যরা নামতে শুরু করলো। একটু পরে রিমুও তার দাদি মমতাজ বেগমকে ধরে ধরে এনে ডাইনিংয়ের চেয়ারে বসিয়ে দিল। কিছুক্ষণের মধ্যেই ডাইনিং টেবিল কানায় কানায় পূর্ণ হলো, কেবল শাহাজ আর রুহির চেয়ার দুটি খালি পড়ে আছে।
এদিকে মোস্তফা কামাল চেয়ারে বসেই সাহাজকে সকালের নাস্তা পাঠানো হয়েছে কিনা জানতে চাইলে তানজিনা বেগম রান্নাঘর থেকে উত্তর দেন, "মাত্রই বানিয়ে শেষ করলাম এখনই নিয়ে যাচ্ছি।"
বলেই কিছু সময়ের মধ্যে যখন তানজিনা বেগম হাতে নাস্তার ট্রে নিয়ে শাহাজের রুমের দিকে এগিয়ে যাবে, তখনই শাহরিয়ার কবির সাহেবের নজর সিঁড়ির দিকে যাবে, তিনি সেদিকে তাকিয়ে বলে উঠলেন, “ওই তো, শাহাজ নিচে নামছে!”
তানজিনা বেগম হাতের নাস্তার পাত্র নিয়েই স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে পড়লেন। সিঁড়ির দিকে তাকিয়ে দেখলেন, শাহাজ আর রুহি একসাথে নামছে। রুহি শাহাজের এক হাত শক্ত করে ধরে আছে, আর অন্য হাতটি শাহাজের সামনে আগলে রেখেছে—যেন কোনো অতর্কিত বিপদ এলে সে ঢাল হয়ে দাঁড়াবে। ওর চোখেমুখে এমন এক ভঙ্গি যেন শাহাজ একটু টাল খেলেই সে তাকে পাজা করে ধরে ফেলবে।
অতঃপর তানজিনা বেগম হাতের ট্রেটি ডাইনিং টেবিলের উপর রেখেই দ্রুত এগিয়ে এসে বললেন, “নিচে কেন আসতে গেলি বাবা? আমি তো নাস্তা উপরেই নিয়ে আসছিলাম!”
এদিকে মায়ের এমন কথায় শাহাজ ম্লান হেসে ধীর গলায় বলল, “একা একা ঘরে কতক্ষণ ভালো লাগে মা? শরীরটা বরং আরও খারাপ লাগে। তাই ভাবলাম নিচে আসি, সবার সাথে একটু দেখা-সাক্ষাৎ হলে মনটা হয়তো ভালো লাগবে।”
“সাবধানে নাম বাবা, তোর শরীর এখনো অনেক দুর্বল,” তানজিনা বেগমের কণ্ঠে মায়ের চিরন্তন উদ্বেগ। ঠিক তখনই শাহাজের পাশে থাকা রুহি এবার বুক ফুলিয়ে বলে উঠল, “চিন্তা করো না বড় মা! আমি আছি তো। শাহাজ ভাই পড়ে যেতে নিলেই আমি একদম খপ করে ধরে ফেলব।”
কথাটি শুনেই তানজিনা বেগম মুচকি হাসলেন। এদিকে সিঁড়িতে রুহির প্রতিটি পদক্ষেপ ছিল শাহাজের কদমের সাথে মেলানো। সে যেভাবে শাহাজকে আগলে ধরে নামছে, তাতে যে কেউ বুঝবে—এই মেয়েটির কাছে শাহাজ এখন সবচেয়ে দামি সম্পদ।
এসব দেখে তখনই নিচে দাঁড়িয়ে থাকা কাব্য এবার একটু খ্যাপানোর সুরে চেঁচিয়ে উঠলো, “কিরে রুহি! ওভাবে ধরে হাঁটছিস কেন? শাহাজ ভাইকে ধরতে গিয়ে তুই না উল্টো হয়ে পড়িস!”
সবার সামনে কাব্যকে এভাবে বলতে দেখে রুহি এবার গাল ফুলিয়ে বলল, “শাহাজ ভাই দুর্বল তো, তাই যদি পড়ে যান—সেই ভয়ে ধরেছি। তুমি এমন করছো কেন?”
শুনেই কাব্য অট্টহাসি দিয়ে বলল, “তুই যে মেয়ে! হাঁটতে গেলে নিজেই ১০০ বার আছাড় খাস, তুই ধরবি শাহাজ ভাইকে? তোকে দেখেই তো দুর্বল বালিকা মনে হচ্ছে। বরং দেখা গেলো তুই নিজে পড়েছিস আর শাহাজ ভাই তোকে ধরে আছে!”
কাব্যের খোঁচায় রুহি এবার বেশ রাগ দেখিয়ে বলল, “উহু! আমি মোটেও দুর্বল নই। আমার অনেক শক্তি আর সাহস, বুঝলে? বলতে গেলে আমি খুব ইউনিক!" অতঃপর রুহি নিজের হাতের দিকে তাকিয়ে, "আর এই যে ধরেছি, দেখবে শাহাজ ভাই একদম পড়বে না।”
এদিকে পাশে থাকা শাহাজ এতক্ষণ রুহির কাণ্ড দেখছিল। সে হঠাৎ নিচু স্বরে রুহিকে শুনিয়ে বলে উঠল, “আসলে তুই সত্যিই অনেক ইউনিক! তা না হলে কি আমার মতো কঠিন বরফকে তুই নিমিষেই গলিয়ে দিতে পারতি? তোর মধ্যে জাদুকরী কিছু একটা তো অবশ্যই আছে।”
শাহাজের এমন আকস্মিক আর অর্থপূর্ণ কথায় রুহি চমকে ওর দিকে তাকাল। আর ঠিক তখনই তাল হারিয়ে রুহি নিজেই সিঁড়ি থেকে পিছলে পড়ে যেতে নিল। কিন্তু মুহূর্তের ব্যবধানে শাহাজ নিজের সবটুকু শক্তি দিয়ে রুহির কোমর জড়িয়ে ধরে ওকে নিজের বুকের সাথে জাপটে ধরল।
এদিকে রুহিকে পড়ে যেতে দেখেই নিচ থেকে তানজিনা বেগম আঁতকে উঠে বললেন, “সাবধানে শাহাজ! ধরে রাখ, ছাড়িস না, নাহলে রুহি পড়ে যাবে!”
অন্যদিকে হঠাৎ তানজিনা বেগমের চিৎকারে ডাইনিং টেবিল থেকে সবাই এবার উৎসুক চোখে তাকালো । শাহাজ রুহিকে ধরে আছে দেখেই কাব্য সুযোগ পেয়ে আবারও শব্দ করে হেসে উঠল, “আসছে আমার ‘সাহসী ইউনিক’! এখন নিজেই তো শাহাজ ভাইয়ের গায়ে ঝুলে আছে। নিজেই সামলাতে পারে না, আবার নাকি ভাইকে ধরবে!”
কাব্যের এমন কথাতে রুহি এবার লজ্জায় লাল হয়ে উঠলো, অতঃপর শাহাজকে ফিসফিস করে বলল, “ছাড়ুন আমাকে! দেখুন কাব্য ভাইয়া কী সব বলছে! শুধু আমাকে অপমান করে।”
বিরক্তি মাখা কন্ঠে রুহি কথাটি শেষ করতেই, শাহাজ এবার দুষ্টুমি করে ওর চোখের দিকে তাকিয়ে বলল, “সত্যিই ছেড়ে দেব?”
“হ্যাঁ, ছাড়ুন!”রুহি আবারও বললো।
রুহির কথামতো শাহাজ যেই না তাকে ছাড়ার ভান করল, তখনই রুহি বুঝতে পারল সিঁড়ির মাঝখানে ভারসাম্য ছাড়া দাঁড়িয়ে আছে তারা, এখন শাহাজ যদি তাকে ছেঁড়ে দেয় তাহলে সে নিশ্চিত নিচে গিয়ে পড়বে। তাই এবার ভয়ে প্রায় কাঁদো কাঁদো হয়ে সে বলল, “না না! আগে সিঁড়িতে ঠিকমতো দাঁড় করান শাহাজ ভাই , তারপর ছাড়বেন।”
অতঃপর রুহিকে ভয় পেতে দেখে শাহাজ মুচকি হেসে ওকে সামলে নিয়ে যত্ন করে ধরে নিচে নামিয়ে আনল। এদিকে নিচে নেমে রুহি চেয়ারে বসতেই কাব্য আবারও ওর মজা ওড়াতে শুরু করল। কবির সাহেব একবার ধমক দিলেও ভাই-বোনের এই মিষ্টি খুনসুটি সবাই উপভোগ করছিল। কাব্যের এসব কান্ডে রুহি যখন মুখ ভার করে বসে আছে, ঠিক তখনই পেছন থেকে ইয়াসমিন বেগম ওর মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বললেন, “এই কাব্য, একদম চুপ! আমাদের মেয়েটাকে নিয়ে এমন করছিস কেন? ও তোর চাইতেও অনেক বেশি দায়িত্ববান। সবার ছোট হলেও বাড়ির সবার জন্য ওর টান সবচাইতে বেশি।”
ঠিক তখনই তানজিনা বেগমও নাস্তা বেড়ে দিতে দিতে ইয়াছমিন বেগমের কথাতে সায় দিয়ে বললেন, “আমাদের রুহি খুব লক্ষ্মী। যার বাড়িতেই ও বউ হয়ে যাবে, সেই সংসারটা ও মায়ায় ভরিয়ে রাখবে।”
দু'জন মাকেই রুহির পক্ষ নিতে দেখে কাব্য এবার পরিস্থিতি বুঝে নিজের দুই হাত জোড় করে মায়েদের কুর্নিশ করলো। অতঃপর দু কান ধরে রুহির সামনে মাফ চাওয়ার ভঙ্গি করে বললো, “মাফ করে দে বোন, আমার ভুল হয়ে গেছে।” রুহি এবার কাব্যকে একটু মুখ ভেঙচিয়ে খিলখিল করে হেসে উঠল।
এদিকে পুরো ঘর যখন হাসিতে মুখর, তখন শাহাজ আড়চোখে তাকাল মোস্তফা কামালের দিকে। দেখলো মোস্তফা কামাল সাহেবের মুখটা হঠাৎ গম্ভীর হয়ে উঠেছে , তবে তাঁর দৃষ্টি শাহাজের ওপর নিবদ্ধ। শাহাজ বুঝতে পারল, তানজিনা বেগমের বলা ‘কারো বাড়িতে বউ হয়ে যাবে’ কথাটি মোস্তফা কামালের কানে বেশ অন্যভাবে লেগেছে। হঠাৎই শাহাজ বাবার দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসল। সেই হাসিতে একটা গূঢ় ইঙ্গিত ছিল—যা মোস্তফা কামাল সাহেব ধরতে পেরে সাথে সাথে আরও গম্ভীর হয়ে গেলেন।
★★★
ডাইনিং টেবিলের পরিবেশ তখন হাসিখুশিতে ভরপুর। সবার খাওয়া প্রায় শেষের দিকে, ঠিক এমন সময় আকস্মিক কলিং বেলের তীক্ষ্ণ শব্দে পুরো বাড়ির মনোযোগ সদর দরজার দিকে ঘুরে গেল। ইয়াসমিন বেগম হাত ধুয়ে এগিয়ে গেলেন দরজা খুলতে। কিন্তু দরজাটা খুলতেই তিনি যেন নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারলেন না। বিস্ময়ে তাঁর মুখ দিয়ে কোনো কথা সরল না; কারন দরজার ওপাশে দাঁড়িয়ে আছেন এক অপ্রত্যাশিত মানবী—রূপাঞ্জলি হাসান।
“আসসালামু আলাইকুম ভাবি, কেমন আছেন?”
বহু বছর পর পরিচিত এই কণ্ঠস্বর থেকে ‘ভাবি’ সম্বোধন শুনে ইয়াসমিন বেগম মুহূর্তেই আবেগে আপ্লুত হয়ে পড়লেন। তাঁর চোখের সামনে যেন এক যুগের পুরনো স্মৃতিগুলো সিনেমার মতো ভেসে উঠল। ঠিক তখনই ভেতর থেকে তানজিনা বেগম উচ্চস্বরে জিজ্ঞেস করলেন, “কিরে সেঝ ? কে এসেছে রে?”
ইয়াসমিন বেগম কোনো উত্তর দিতে পারলেন না, তাঁর গলা যেন ধরে এসেছে। এদিকে রূপাঞ্জলি ইয়াসমিন বেগমের এই জড়তাটুকু বুঝতে পারলেন। তিনি বিষণ্ণ এক ফালি হাসি দিয়ে বললেন, “ভেবেছিলাম জীবনে আর কোনোদিন এই বাড়ির ছায়া মাড়াব না। কিন্তু ভাগ্য না চাইতেও আমাকে আজ আবারও এই দরজায় নিয়ে এসেছে। ভেতরে আসতে বলবে না ভাবি?”
হঠাৎ এমন কথাতে ইয়াসমিন বেগম সম্বিৎ ফিরে পেয়ে দ্রুত দরজার সামনে থেকে সরে দাঁড়ালেন। অতঃপর রূপাঞ্জলি ধীরপায়ে ভেতরে প্রবেশ করলেন। দীর্ঘ এক যুগ পর খন্দকার বাড়িতে পা রেখেই তাঁর বুকটা হাহাকার করে উঠল। একসময় এই বাড়ির প্রতিটি ধূলিকণা তাঁর আপন ছিল, আইনত এখনো হয়তো তিনি এই বাড়িরই অংশ। কিন্তু দীর্ঘ বছরের মান-অভিমান আর তিক্ততা তাঁকে প্রতিটি মানুষের কাছ থেকে যোজন যোজন দূরে সরিয়ে দিয়েছে। বাড়ির প্রতিটি দেয়াল, আসবাবপত্র আজ যেন তাঁকে তাঁর ফেলে আসা অতীতের কথা মনে করিয়ে দিয়ে বিদ্রূপ করছে।
এদিকে রুপাঞ্জলি যখন চারপাশটা দেখতে ব্যস্ত তখনই ইয়াসমিন বেগম আগে আগে হাঁটছেন, একসময় তাকে অনুসরণ করে পেছনে এগোলো রূপাঞ্জলি।
ড্রয়িংরুম পেরিয়ে তাঁরা যখন ডাইনিং এর কাছাকাছি আসলো তখনই তানজিনা বেগম আবারও ব্যস্ত হয়ে জিজ্ঞেস করলেন, “কিরে মেঝ? কে এসেছে? পরিচিত কেউ নাকি? কথা বলছিস না যে?”
ইয়াছমিন বেগম দেখলেন সবাই তার দিকে কৌতুহল চোখে তাকিয়ে অতঃপর তিনি ডাইনিং টেবিলের সামনে এসেই কিছুটা সরে দাঁড়ালেন। মুহূর্তেই সবার চোখের সামনে রূপাঞ্জলি হাসানের প্রতিচ্ছবি দৃশ্যমান হলো। যেন কোনো স্থির চিত্রপটে হঠাৎ রঙের ছটা পড়ল। ডাইনিং টেবিলে বসা প্রতিটি মানুষ পাথরের মতো স্থবির হয়ে গেলেন। কারন খন্দকার বাড়িতে আজ এই মুহূর্তে রূপাঞ্জলিকে কেউ প্রত্যাশা করেনি।
সবচেয়ে বড় বিস্ফোরণটা ঘটল মমতাজ বেগমের মাঝে। রূপাঞ্জলির মুখটা দেখামাত্রই তাঁর শরীর রাগে রি রি করে উঠল। তিনি হাতের গ্লাসটা সজোরে টেবিলের ওপর রেখে চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ালেন। বার্ধক্যের শরীর হলেও তাঁর কণ্ঠস্বর এখনও অত্যন্ত গম্ভীর ও তেজস্বী। তিনি তর্জনী উঁচিয়ে চিৎকার করে বলে উঠলেন—
“এই বাড়িতে কেন এসেছে ও? কে আসতে বলেছে ওকে? কোন সাহসে ও আবার এই চৌকাঠে পা রাখার ধৃষ্টতা দেখাল?"
মমতাজ বেগমের সেই বজ্রকণ্ঠের গর্জনে পুরো বাড়ির প্রাণোচ্ছ্বল পরিবেশ এক লহমায় বিষণ্ণ আর থমথমে হয়ে গেল। সবাই রুদ্ধশ্বাসে তাকিয়ে আছে রূপাঞ্জলির দিকে। কেউ বিস্ময়ে, কেউ ভয়ে, আর কেউবা হাসিমুখে । এক যুগের সেই পুরনো আগ্নেয়গিরিটা যেন আজ আবারও লাভা উগরে দেওয়ার জন্য প্রস্তুত হচ্ছে।
এদিকে মমতাজ বেগমের অগ্নিঝরা প্রশ্নের মুখে সবাই ভিতু হলেও রূপাঞ্জলি কিন্তু দমে গেলেন না। বরং তিনি শান্ত স্বরে কিন্তু স্পষ্ট উচ্চারণে বললেন, “আমাকে কেউ আসতে বলেনি আম্মা, আমি নিজ থেকে এসেছি। শুনলাম শাহাজ খুব অসুস্থ, তাই ওকে একবার দেখেই চলে যাব। টেনশন করবেন না, আমি এখানে থাকতে আসিনি।”
মমতাজ বেগম এবার যেন আরও ফুঁসে উঠলেন। তাঁর তীক্ষ্ণ দৃষ্টি বাড়ির বাকি সদস্যদের ওপর বুলিয়ে গর্জে উঠলেন, “শাহাজ অসুস্থ তুমি জানলে কীভাবে? কে বলেছে তোমাকে? আমার অগোচরে কে তোমার সাথে যোগাযোগ রাখে এই বাড়িতে?”
শ্বাশুড়ির কথাতে রূপাঞ্জলি এবার হালকা একটু হাসলেন। সেই হাসিতে একরাশ বিষণ্ণতা মেশানো ছিল। তিনি বললেন, “আপনার আদেশ অমান্য করে আমার সাথে যোগাযোগ রাখবে, এই বাড়িতে তেমন দুঃসাহস কার আছে আম্মা?” কথাটি বলে রূপাঞ্জলি উপস্থিত সবার চেহারার দিকে একবার তাকালেন। বাড়ির বউরা জড়োসড়ো হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। সেই সাথে তিনি দেখলেন ডাইনিংয়ের এক কোনে রুবি আর রিমু অপরাধীর মতো মুখ করে দাঁড়িয়ে আছে। কিন্তু তার ঠিক বিপরীতে শাহাজ আর রুহি দাঁড়িয়ে।
শাহাজের চেহারায় কোনো ভীতি নেই, বরং এক অদ্ভুত স্থৈর্য। আর অন্যদিকে রুহি রূপাঞ্জলিকে দেখেই মুচকি হাসছে; যেন মনে হচ্ছে তার এই অনাকাঙ্ক্ষিত আগমনে মেয়েটা যে বড্ড খুশি হয়েছে, তা ওর উজ্জ্বল চোখ দেখলেই বোঝা যায়।
একসময় রূপাঞ্জলি আবারও মমতাজ বেগমের দিকে দৃষ্টি রাখলো, ঠিক তখনই তিনি আবারও ধমকের সুরে বললেন, “তোমাকে যদি কেউ কিছু না বলে থাকে, তবে তুমি কীভাবে জানলে যে আমার নাতি অসুস্থ? বাড়ির মানুষ ছাড়া তো বাইরের কারো জানার কথা নয়।”
এতক্ষণ শাহাবুদ্দিন নীরব দর্শক হয়ে সব দেখছিলেন। এবার তিনি ধীরপায়ে এগিয়ে এলেন এবং সবাইকে অবাক করে দিয়ে বললেন, “ওকে আমি জানিয়েছি শাহাজের কথা। তবে আমি ভাবতে পারিনি যে ও শাহাজকে দেখার জন্য এভাবে হুট করে এখানে চলে আসবে।”
বাড়ির বড়রা যেন আকাশ থেকে পড়লো। এদিকে মমতাজ বেগম নিজের কানকে যেন বিশ্বাস করতে পারছেন না। তিনি অবিশ্বাসের সুরে বললেন, “তুই? তুই এই মেয়ের সাথে আবার যোগাযোগ করেছিস? যে মেয়ে আমাকে সম্মান দেয়নি, আমার পরিবার ভাঙতে চেয়েছে, নিজের জেদ আর অহংকারকে বড় করে দেখে এই বাড়ির সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করেছে—তার সাথে তুই আবারও যোগাযোগ করলি?”
এদিকে মায়ের কথায় শাহাবুদ্দিন সাহেব কয়েক মুহূর্ত চুপ রইলেন, কিন্তু একটু পরেই কিছু একটা ভেবে মাথা উঁচু করলেন। অতঃপর মায়ের চোখের দিকে তাকিয়ে দৃঢ় কণ্ঠে বলে উঠলেন, “মা, মানুষ মাত্রই ভুল হয়। আমরা কেউ ফেরেশতা নই। ওর বয়স কম ছিল, তাই ও ভুল করেছে। ভুল করেই তো মানুষ শিখে। আমিতো আমার জীবনে অনেক ভুল করেছি মা, তুমি কি আমাকে কখনো ত্যাগ করতে পেরেছ?”
এবার তিনি মায়ের কাছে গিয়ে হাত দুটো জড়িয়ে ধরে বললেন, “সৃষ্টিকর্তা আমাকে আর একবার সুযোগ দিয়েছেন মা নিজের ঘরটা গুছিয়ে নেওয়ার। আমি চাই তুমি ওকে মেনে নাও। যাই হয়ে যাক না কেন, এটা তো মিথ্যে নয় যে ও আমার স্ত্রী। আজও আমরা একটা পবিত্র সম্পর্কে আবদ্ধ।”
মমতাজ বেগম নিজ ছেলে শাহাবুদ্দিনের কাছে এমনটা আশা করেন নি, অতঃপর তিনি ঝটকা দিয়ে নিজের হাতের ওপড় থেকে ছেলের হাত সরিয়ে দিলেন। সাথে এই যুক্তি তাঁর কাছে অসহ্য ঠেকল। তিনি চিৎকার করে বললেন, “তুই আমাকে ওয়াদা করেছিলি এই মেয়ের সাথে কখনো যোগাযোগ করবি না! তুই তোর কথা রাখিসনি শাহাবুদ্দিন!”
এদিকে মায়ের অবজ্ঞা দেখে শাহাবুদ্দিন একটু ম্লান হাসলেন। ব্যথিত কণ্ঠে বললেন, “আপনি বলেছিলেন আমি যেন নিজ থেকে ওর সাথে যোগাযোগ না করি। আমি আমার ওয়াদা রেখেছি মা। আমি সত্যিই কোনোদিন ওর খোঁজ নেইনি। কিন্তু ভাগ্য বা সৃষ্টিকর্তার কোনো এক রহস্যময় চক্র আমাদের আবারও সামনাসামনি দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। না চাইতেও আমরা একে অপরের মুখোমুখি হয়েছি।”
শাহাবুদ্দিন এবার এগিয়ে গিয়ে সবার সামনে পরম সম্মানে রূপাঞ্জলির হাতটি ধরলেন। উপস্থিত সবার সামনে নিজের অবস্থান পরিষ্কার করে বলে উঠলেন, “যে সুযোগ আমার পাওয়ার কথা ছিল না, ভাগ্যক্রমে আমি তা আবারও পেয়েছি। এবার আমি আর এই সুযোগ হাতছাড়া করতে চাই না। আমি আমার সংসার করতে চাই। হ্যাঁ, আমি জানি আমার স্ত্রী হয়তো কোনোদিন মা হতে পারবে না—তাতে আমার কোনো সমস্যা নেই। আমার কি সন্তানের কমতি আছে?”
তিনি ভাইদের ছেলেমেয়েদের দিকে ফিরে গভীর মমতায় বললেন, “ওদের জন্মের পর থেকে ওরা আমাকে ছোট বাবা বলেই ডেকেছে, আমিও ওদের নিজের সন্তানের মতোই বড় করেছি। যেখানে শাহাজের মতো একজন দায়িত্ববান ছেলে আর রুহির মতো একজন মিষ্টি আদুরে সন্তান আছে, সেখানে আমার নিজের বাচ্চা হলো কি না তাতে আমার কোনো আফসোস নেই।”
বাড়ির সবাই যখন এমন কথা শুনে স্তব্ধ দখন রূপাঞ্জলি মুগ্ধ হয়ে তাঁর স্বামীর কথা শুনছিলেন। তিনি কল্পনাও করেননি শাহাবুদ্দিন আজ এভাবে তাঁর পক্ষ নিয়ে রুখে দাঁড়াবেন। এবার পরম তৃপ্তি নিয়ে রূপাঞ্জলি শাশুড়ির মুখের দিকে তাকাবেন অতঃপর বললেন, “আমি বাড়ি থেকে যাওয়ার পর আপনার ছেলে কোনোদিন আমার সাথে যোগাযোগ করেনি আম্মা। হয়তো আপনার কথা রাখতে কোনোদিন করতও না—যদি সেদিন শাহাজ আমাদের দেখা না করাতো।”
“শাহাজ দেখা করিয়েছে!”—এই কথাটি শোনার সাথে সাথে বাড়ির পরিবেশ যেন এক লহমায় আরও গুমোট হয়ে উঠল। বড়দের চোখেমুখে বিস্ময় আর ঘোর সন্দেহ। তিন রমণী এবার ভয়ে আড়ষ্ট হয়ে গেলেন যে এর পরিণাম কী হতে পারে। মোস্তফা কামাল সাহেব এতক্ষণ চুপ ছিলেন, কিন্তু সবকিছুর মূলে যে তাঁর ছেলে আছে তা জেনে তিনি কঠোর দৃষ্টিতে শাহাজের দিকে তাকালেন।
মমতাজ বেগমও থরথর করে কাঁপছিলেন রাগে। এবার তিনি শাহাজের দিকে তাকিয়ে বললেন, “দাদুভাই... এটা সত্যি যে তুমি ওদের দেখা করিয়েছ?”
দাদীর কথা শুনে এবার শাহাজ শান্ত স্বরে জবাব দিল, “হ্যাঁ দাদি, আমি করিয়েছি।”
“তার মানে ওই মেয়ের সাথে তোমার আগে থেকেই যোগাযোগ ছিল?”মমতাজ বেগম আবারও প্রশ্ন করলেন।
“হ্যাঁ দাদি, ছিল।”শাহাজ সহজ ভাবেই বললো।
“আর কার কার যোগাযোগ ছিল ওর সাথে? সত্যি করে বলো!”মমতাজ বেগম এবার বাড়ির সবার দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করে উঠলেন।
মমতাজ বেগমের কথা শেষ হতে না হতেই এবার রুহি মাথা নিচু করে এসে শাহাজের পাশে দাঁড়াল। কামাল সাহেব, কবির সাহেব, কাব্য আর পিয়াস—সবার চক্ষু যেন চড়কগাছ। এদিকে রুহির এমন সাহসীকতায় শাহাজ আড়চোখে রুহিকে দেখে একটু হাসল। কিন্তু সবার বিস্ময় আরও বাড়িয়ে দিয়ে একে একে রুবি আর রিমুও এসে তাঁদের পাশে কাতারবদ্ধ হয়ে দাঁড়াল।
পুরো খন্দকার বাড়ি জুড়ে এখন এক পিনপতন নীরবতা। বড়রা একপাশে, আর বাড়ির নতুন প্রজন্ম অন্যপাশে। মাঝখানে দাঁড়িয়ে রূপাঞ্জলি আর শাহাবুদ্দিন। দেখে মনে হলো দীর্ঘ বছর পর এই বাড়ির ইটের দেওয়ালে দেওয়ালে এক নতুন বিদ্রোহের সুর বাজতে শুরু করেছে।
এদিকে মমতাজ বেগম রাগে চটফট করছেন। শাহরিয়ার কবির আর কামাল সাহেব তাঁদের মাকে শান্ত করার আপ্রাণ চেষ্টা করছেন, কিন্তু কোনো কাজই হচ্ছে না। শাহাজ এসব দেখে চরম বিরক্ত। তার দাদি এখনো সেই মান্ধাতা আমলের চিন্তা নিয়ে পড়ে আছেন, কারো কোনো যৌক্তিক কথাই তাঁর কানে ঢুকছে না। একসময় বিরক্ত হয়েই শাহাজ কিছু বলতে যাবে, ঠিক তখনই সবাইকে থমকে দিয়ে এক অভাবনীয় কাণ্ড ঘটিয়ে বসল রুহি।
রুহি শাহাজের পাশ থেকে হঠাৎ বলে উঠল, "দাদু, একটা কথা বলি কিছু মনে করো না। আজ ছোটমার জায়গায় যদি তোমার নিজের মেয়ে অর্থাৎ ফুফি থাকত, তাহলেও কি তুমি এমনটা করতে? তুমি কি চাইতে তোমার নিজের মেয়ের সংসারটা এভাবে ভেঙে যাক?"
অনাকাঙ্ক্ষিত এই কথাটি মমতাজ বেগমের কানে যেতেই তিনি পাথরের মতো স্থির হয়ে গেলেন। যেন নিজের কানকেই বিশ্বাস করতে পারছেন না যে বাড়ির সবচাইতে আদুরে আর শান্ত মেয়েটি তাঁকে এমন একটা প্রশ্ন করতে পারে!
অন্যদিকে পিয়াস যেন সুযোগ খুঁজছিল রুহির ওপর রাগ ঝাড়ার। আর হঠাৎই সুযোগ পেয়ে সে রুহিকে ধমক দিয়ে বলে উঠল, "তুই কী বলছিস রুহি, তোর কোনো ধারণা আছে? তুই ওনার সাথে আমাদের ফুফির তুলনা করছিস! কোথায় ফুফি আর কোথায় এই মহিলা!"
পিয়াসের এমন কথাতে রুহি মুখ কুঁচকে নিলো, অতঃপর তড়িৎ জবাব দিল, "কেন এক নয় কেন? ফুফি যেমন দাদুর মেয়ে, ছোটমাও তো কারো মেয়ে। তাঁর মা বাবা কি কষ্ট পাননি যখন শুনেছিলেন মেয়ের সংসার ভেঙে যাচ্ছে? আমার কথায় রাগ করো না দাদু, কিন্তু তুমি অন্যায় করছো। আমরা ছোট হয়ে যেটা দেখছি, তুমি বড় হয়েও সেটা দেখতে পাচ্ছ না।"
মমতাজ বেগম একদম চুপসে গেলেন। এদিকে রুহির এমন কথা শুনে মোস্তফা কামাল সাহেব এবার গম্ভীর কণ্ঠে বলে উঠলেন, "রুহি, তুই এখনো ছোট। বড়দের এসব বিষয়ে থাকা ও কথা বলা তোর ঠিক নয়। রুমে যাও। "
কিন্তু পরিস্থিতি শান্ত হওয়ার বদলে আরও জটিল হয়ে উঠল যখন রুবি এগিয়ে এল। যে মেয়ে কোনোদিন বাবা-মায়ের কথার ওপর কথা বলেনি, সে আজ বলে উঠল, "বড়রা যদি অবুঝের মতো কাজ করে বাবা, তবে ছোটদের সেখানে কথা বলতেই হয়।"
মোস্তফা কামাল সাহেব রীতিমতো চমকালেন। এবার পিছিয়ে রইল না রিমুও। সেও এগিয়ে এলো দাদুর দিকে তাকিয়ে বলল, "বাবার মুখে শুনেছি আম্মুকে যখন এই বাড়িতে পছন্দ করে আনা হলো, আম্মু তখন কিছুই পারতো না। বরং তুমি নাকি নিজের হাতে সব শিখিয়েছো কারণ আম্মু তোমার পছন্দ ছিল। তাহলে ছোটমার বেলায় কেন এত অন্যায় দাদু? কারণ কি এটাই যে ছোট চাচু নিজে পছন্দ করে বিয়ে করেছিলেন আর তোমার পছন্দ করা মেয়েকে বিয়ে করেন নি?"
একের পর এক সত্যের আঘাতে বাড়ির বড়রা হোঁচট খেতে লাগলেন। অপরদিকে শাহাজ একপাশে দাঁড়িয়ে রুহি ও রুবিদের দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসছে। রুহির চোখে তখন ন্যায়ের এক তীব্র ক্রোধ। রুহি এবার আরও শক্ত কণ্ঠে বলে উঠল, "তোমার ছোটমার ওপর রাগটা আসলে কী নিয়ে দাদু? উনি তোমার কথা শোনেননি ওটা, নাকি উনি মা হতে পারবেন না তাই? কোনো মেয়ে মা হতে পারবে কি পারবে না, তা তো তার হাতে নেই—ওটা সৃষ্টিকর্তার হাতে। ধরো, ভবিষ্যতে আমাদের বিয়ে হলো, আর আমি বা রিমু-রুবি আপুর মধ্যে কারো যদি সন্তান না হয়, তখন যদি আমাদের স্বামীরা আমাদের এভাবেই বের করে দেয়, তুমি কি সেটা মেনে নিতে পারবে?"
ছোটদের এই যুক্তির সামনে মমতাজ বেগমের সমস্ত তেজ যেন কর্পূরের মতো উড়ে গেল। তিনি আর এক মুহূর্ত সেখানে দাঁড়ালেন না। হাতের লাঠিটা ‘ঠক ঠক’ করে বাজিয়ে নিজের রুমের দিকে চলে গেলেন এবং সজোরে দরজা বন্ধ করে দিলেন। দাদি সরতেই নাসরিন বেগম রুহিকে বকতে তেড়ে এলেন, কিন্তু শাহাজ তাঁর দিকে এমন এক শীতল নজরে তাকালো যে নাসরিন বেগম আর এক কদম এগোতে পারলেন না।
অন্যদি পিয়াস আবারও খেঁকিয়ে উঠল, "বেশি পেকেছিস রুহি, তাই না? এতো বেয়াদব কবে হলি? কার সাথে থেকে এতো বেয়াদবি শিখেছিস? দাদুর সাথে এভাবে কথা বলতে তোর বুক কাঁপল না? এখন যদি ওনার কিছু হয়ে যায়, তবে তার দায় কে নেবে?"
শাহাজ এতোক্ষন সবটা হজম করছিলো, কিন্তু এবার শাহাজ রুহিকে আড়াল করে পিয়াসের সামনে দাঁড়ালো। গম্ভীর কণ্ঠে বলল, "রুহিকে কেউ কোনো কথা বলবে না। দাদুর সাথে আমি কথা বলেছি। এখান থেকে যাওয়ার পর যদি রুহির সাথে কেউ বিন্দুমাত্র খারাপ আচরণ করো, তবে আমার চেয়ে খারাপ কেউ হবে না।" বলেই শাহাজ ধীর পায়ে মমতাজ বেগমের রুমের দিকে চলে গেল।
বাড়িতে তখন পিনপতন নীরবতা। শাহাজ দাদির রুমে প্রবেশ করেছে অনেকটা সময় অতিবাহিত হলো। ভেতরে কি কথা হচ্ছে তা কেউই আন্দাজ করতে পারছে না কারন দরজা বন্ধ।
অতঃপর একসময় পর রূপাঞ্জলি শাহাবুদ্দিনের দিকে তাকিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, "আমি তো শুধু শাহাজকে দেখতে এসেছিলাম। কিন্তু এখানে এত কিছু হয়ে যাবে কল্পনাও করিনি। আম্মা এত রেগে যাবেন জানলে কখনোই এই বাড়িতে আসতাম না।" এবার তিনি একটু থামলেন, একটু সময় নিয়ে আবারও বলে উঠলেন, "আমার মনে হয় এবার আমার বিদায় নেওয়া উচিত।"
কথাটি বলেই রূপাঞ্জলি সবার দিকে তাকিয়ে ম্লান হেসে যেই না বেরিয়ে যেতে চাইলেন, অমনি মমতাজ বেগমের রুমের দরজা খোলার শব্দ হলো। ঠক ঠক করে লাঠির শব্দ তুলে মমতাজ বেগম আবার ফিরে এলেন, পেছনে তাঁর শাহাজ। তিনি সোজা গিয়ে শাহাবুদ্দিন আর রূপাঞ্জলির সামনে দাঁড়ালেন। রূপাঞ্জলির হাতটা খপ করে ধরে চেঁচিয়ে উঠলেন, "কোথায় যাচ্ছো তুমি? বাড়িটাকে কি হোটেল পেয়েছ? নিজের মর্জি মতো আসবে আর যাবে?"
বলেই তিনি রূপাঞ্জলিকে টেনে নিয়ে সোফার ওপর বসালেন। নিজেও বসলেন রাজকীয় ভঙ্গিতে। এবার পানের বাটা থেকে পান সাজিয়ে মুখে পুরতে পুরতে তানজিনা বেগমের দিকে তাকিয়ে হুংকার দিয়ে বললেন, "বড় বউ, ওকে ভেতরে নিয়ে যাও। ওর বিয়ের শাড়ি আর গয়না যা যাওয়ার সময় তেরামো করে রেখে গিয়েছিলো সব আমার আলমারির তৃতীয় তাকে রাখা আছে। বের করে ওকে সুন্দর করে সাজিয়ে দাও।"
আকস্মিক মমতাজ বেগমের উপস্থিতিতে এবং সেই সাথে এমন কথাতে সবাই একে অপরের মুখ চাওয়াচাওয়ি করতে লাগল। এর পরেই মমতাজ বেগম মোস্তফা কামালের দিকে তাকিয়ে বলে উঠলেন, "এলাকার মসজিদের ইমাম সাহেবকে খবর দাও, দ্রুত আসতে বলো।"
একের পর এক এমন কথা শুনে রূপাঞ্জলি আর শাহাবুদ্দিন দুজনেই বাকরুদ্ধ। এদিকে তানজিনা বেগম শ্বাশুড়ির কথার অর্থ না বুঝে অবাক হয়ে আবার জিজ্ঞেস করলেন, "আম্মা, শাড়ি-গয়না আর হুজুর দিয়ে কী হবে?"
মমতাজ বেগম খেঁকিয়ে উঠলেন, "শাড়ি-গয়না আর হুজুর দিয়ে কী হয় শুনি?
এদিকে মমতাজ বেগম এর কথা শেষ হতেই দূরে দাঁড়িয়ে থাকা রুবি, রিমু আর রুহি একযোগে চিৎকার করে উঠল— "বিয়ে হয়!"
মমতাজ বেগম এবার বড় বউযের দিকে দৃষ্টি রাখলেন, অতঃপর বললেন, "আমার নাতি-নাতনিরা যেটা বুঝতে পেরেছে, সেটা তুমি ধরলে পারোনি? তোমার মতো বিচক্ষণ মানুষের কাছে তো এটা আশা করা যায় না বড় বউ।
কথাটি শেষ করেই তিনি উপস্থিত সবার দিকে একবার তাকালেন, এরপরে বেশ শান্ত কন্ঠে বললেন, আমি এই মুহূর্তে আমার ছোট ছেলের বিয়ে দেব। এখনই ওকে সাজিয়ে আনো। ওদের আজ আবারও বিয়ে হবে।"
মমতাজ বেগমের এই ‘বিস্ফোরক’ সিদ্ধান্তে পুরো ঘর যেন আনন্দে দুলে উঠল। রুবি, রিমু আর রুহি একযোগে ‘ইয়াহু’ বলে চিৎকার করে উঠল। আর অন্যদিকে শাহাজ এগিয়ে গিয়ে শাহাবুদ্দিন চাচুকে জড়িয়ে ধরল।
একসময় মমতাজ বেগম উঠে দাঁড়িয়ে শান্ত স্বরে সবার উদ্দেশ্যে বললেন, "আমার কোনোদিন এই মেয়ের প্রতি অভিযোগ ছিল না। আমার সমস্যা ছিল ওর জেদ আর একরোখামিতে। বাড়ির অন্য তিন বউ যখন আমার কথা মতো চলত, সেখানে ও ছিল একদম উল্টো। তাই ওকে আমি বেশ অপছন্দ করতাম। কিন্তু একসময় পছন্দ করতেও শুরু করি। কিন্তু একসময় যখন জানলাম ও কোনদিন আমার ছেলেকে সন্তানের সুখ দিতে পারবে না তখন কষ্ট পেলাম। হ্যাঁ, ও মা হতে পারবে না—তা নিয়ে আমার আক্ষেপ ছিল। কিন্তু সেই সাথে সহানুভূতি ও ছিলো। কিন্তু ও যে জেদ দেখিয়ে ভুল বুঝে একসময় অন্য কারো কথাতে একবারে এই বাড়ি ছেড়ে চলে যাবে, তা কখনো ভাবিনি। আর সেই থেকেই এই মেয়েকে আমার আরো অপছন্দ।"
অতঃপর নাতি-নাতনিদের দিকে তাকিয়ে তিনি ম্লান হাসলেন, "কিন্তু আজ বুঝলাম, বাড়ির ছোটরা বড় হচ্ছে। আমাদের চিন্তাধারা আর তাদের চিন্তাধারা এক নয়। মাঝে মাঝে অন্যের খুশির জন্য সময়ে সুযোগে নিজেদের বদলাতে হয়। তাই আজ আমি আমার সিদ্ধান্ত বদলালাম। কিন্তু আজ তোমাদের কাছে আমি হেরে গিয়েও যেন আনন্দ পাচ্ছি। তবে এই মেয়েকে আমি এখনো ক্ষমা করি নি। যতোদিন না ও আমার মনের মতো হতে পারবে। আমার বাকি বউদের মতো এই সংসার জুড়ে রাখবে, সবাইকে নিয়ে সুন্দর ভাবে চলতে পারবে। ততদিন পর্যন্ত ওকে আমার থেকে দূরে থাকতে বলবে। একমাএ সেদিনই আমি ওকে ক্ষমা করবো যেদিন ও সত্যিই এই পরিবারের একজন সদস্য হয়ে উঠতে পারবে।
চলবে.........