#অন্তহীন_প্রেম_আমার
#আফীফা_আফনান
#পর্ব_৫৭(খ)
[কপি করা নিষিদ্ধ]
অন্ধকার স্টোর রুমের স্তব্ধতায় বর্তমানে কেবল রুহির ঘন ঘন নিশ্বাসের শব্দ পাওয়া যাচ্ছে। রুমের ওপরের সরু ভেন্টিলেটর দিয়ে আসা চাঁদের নীলচে আলোটা তির্যকভাবে এসে পড়েছে সেই উন্মোচিত হওয়া সাদা দরজাটির ওপর। যা দেখে রুহি কাঠ হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। চোখের পলক ফেলতে যেন সে ভুলেই গেছে। বিষ্ময় আর এক অজানা শিহরণে তার শরীরের প্রতিটি লোম যেন খাড়া হয়ে উঠেছে।
দেখতে গেলে এটা তো সাধারণ একটা স্টোর রুম! যেখানে বাড়ির ভাঙাচোরা আসবাব, পুরোনো ট্রাঙ্ক আর বছরের পর বছর অব্যবহৃত জিনিসের স্তূপ জমা হয়ে আছে। যে কক্ষটিকে বরাবরই সে বাড়ির সবচাইতে অবহেলিত অংশ বলেই জানত, কিন্তু তার ভেতরেই যে অদৃশ্য কোনো রহস্যময় অধ্যায়ের মতো একটা গোপন দরজা থাকতে পারে—তা রুহির কল্পনাকেও হার মানায়।
বর্তমানে রুহি একদৃষ্টে দরজাটির দিকে তাকিয়ে আছে। এই বাড়িতেই তার জন্ম, এই আঙিনাতেই তার বেড়ে ওঠা। প্রতিটি ইট-কাঠ-পাথরের খবর তার নখদর্পণে থাকার কথা, অথচ আজ সে নিজের বাড়ির ভেতরেই এক অচেনা গোলকধাঁধায় দাঁড়িয়ে।
একটি চিএ আর তার পেছনে একটি গুপ্ত দরজা রুহি কি করবে ভেবে উঠতে পারছে না, অতঃপর এবার সে অবশ হাতে ধীর পায়ে এগিয়ে গেল দরজাটির কাছে। কাঁপাকাঁপা আঙুলগুলো দরজার গায়ে স্পর্শ করতেই রুহি যেন থমকে গেল। নতুন রং করলে হাত দিলে যেমন মসৃণ আর আলাদা একটা গন্ধ পাওয়া যায়, এই দরজাটির ক্ষেত্রেও তাই। দরজাটি মোটেও জরাজীর্ণ বা পুরোনো নয়। এবার রুহি ভালোভাবেই নজর দিতেই দেখল, দরজার লকটি চকচক করছে। একদম আধুনিক এবং নতুন লাগানো তালা। যেন সদ্যই কিনে লাগানো হয়েছে।
এদিকে এসব দেখে রুহির মস্তিষ্কে তখন হাজারো প্রশ্নের ঝড়। কেন এই লুকোচুরি? কে এই স্টোর রুমের ভেতরে নতুন করে রং করিয়ে, নতুন তালা লাগিয়ে একটি গোপন কক্ষ বা পথ তৈরি করেছে? আর সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—এই দরজার ওপারে আসলে কী আছে?
অন্ধকারেও রুহির বিষ্ময়মাখা চোখের মণিগুলো চকমক করে উঠল। সে বুঝতে পারল, সে এমন এক সত্যের দোরগোড়ায় দাঁড়িয়ে আছে, যা হয়তো খন্দকার বাড়ির কোনো সদস্যেরই জানা নেই। শাহাজের আঁকা সেই চিত্রকর্মটির আড়ালে লুকানো এই শুভ্র দরজাটি যেন রুহিকে হাতছানি দিয়ে ডাকছে এক গভীর রহস্যের দিকে। আর এদিকে ভয় আর কৌতূহল—এই দুইয়ের টানাপোড়েনে রুহির আত্মা যেন খাঁচাবন্দি পাখির মতো ছটফট করতে শুরু করল।
এদিকে অন্ধকারে দরজার সামনে দাঁড়িয়ে রুহি যখন নিজেই নিজের মনের সাথে দন্দে লিপ্ত তখনই হঠাৎ তার মনে পড়ে গেল—শাহাজ ভাই এই বাড়িতে ফিরে আসার ঠিক কিছুদিন পরেই এই স্টোর রুমে মিস্ত্রি দিয়ে কাজ করানো হয়েছিল। তখন রুহি জানত না ভেতরে ঠিক কী কাজ হচ্ছে, শুধু এটুকু জানত শাহাজ নিজের তত্ত্বাবধানে কক্ষটি ঠিক করাচ্ছে। তবে কি এই রহস্যময় বন্ধ দরজার নেপথ্যে শাহাজ ভাইয়ের কোনো গোপন পরিকল্পনা আছে? রুহির নিজেকে পাগল পাগল মনে হতে লাগল; তার অতি পরিচিত মানুষটি কি তবে এতটা রহস্য লুকিয়ে রেখেছে নিজের বুকে?
এতক্ষণ ভয় লাগলেও এবার রুহির মনে প্রবল কৌতূহল আর জেদ চেপে বসল। এই দরজার ওপারে কী আছে, তা আজ সে দেখেই ছাড়বে। কিন্তু সমস্যা হলো মজবুত সেই নতুন তালা। একে তো চারদিকে অন্ধকার, তার ওপর স্টোর রুমের প্রধান দরজাটিও মিমি বাইরে থেকে আটকে দিয়ে গেছে। তাই এবার সব দ্বিধাদ্বন্দ্ব ঝেড়ে ফেলে রুহি সিদ্ধান্ত নিল—সে তালা ভাঙবে।
যেমন ভাবনা ঠিক তেমন কাজ রুহি স্টোর রুমের ভেতরেই হাতড়ে হাতড়ে তালা ভাঙার জন্য শক্ত বা লোহার কিছু একটা খোঁজার চেষ্টা করল। যেহেতু এটি পুরনো জিনিসের ঘর, তাই লোহার রড বা ভারী কিছু পাওয়া অসম্ভব নয়। বেশ কিছুক্ষণ খোঁজার পর অবশেষে তার হাতে একটি ছোট কিন্তু বেশ ভারী লোহার টুকরো ঠেকল। রুহি বুঝলো কাজের জন্য এটিই যথেষ্ট।
অতঃপর রুহি লোহাটি নিয়েই দরজার সামনে গিয়ে তার সর্বশক্তি দিয়ে তালাটির ওপর আঘাত করল। একবার, দুবার, তিনবার—কিন্তু তালাটি যেন পাথর! ভাঙার কোনো নামই নেই। রুহি দম না হারিয়ে আবারও জোর দিয়ে আঘাত করতে যাবে, ঠিক তখনই তার কান খাড়া হয়ে উঠল। কেউ একজন বাইরের প্রধান দরজাটি খুলছে!
রুহি ভাবলো এই মুহূর্তে কেউ তাকে এখানে দেখে তাহলে কৈফিয়ত দিতে দিতেই তার প্রাণ যাবে, আর এই গোপন দরজার রহস্য জানাও তার অসম্পূর্ণ থেকে যাবে। তাই বাহিরের মানুষটি রুমে প্রবেশ করার আগেই রুহি দ্রুত শাহাজের আঁকা সেই মোনালিসার চিত্রটিকে টেনে গোপন দরজার সামনে আগের মতো স্থির করে দিল। এরপর পাশে থাকা পুরনো কিছু কাঠের চেয়ারের স্তূপের আড়ালে নিজেকে লুকিয়ে ফেলল। অন্ধকার থাকায় সে নিজেকে একদম গুটিয়ে নিল যাতে কারো নজরে না পড়ে।
রুহি লুকাতেই পরক্ষণেই স্টোর রুমের দরজা খুলে ভেতরে একটি ছায়ামানব প্রবেশ করল। এদিকে রুহি কোণায় বসে রুদ্ধশ্বাসে ভাবছে—এই ছায়ামানবটি কে? একসময় তার মনে হলো সম্ভবত এই গোপন কক্ষের সাথে এই মানুষটির কোনো গভীর যোগসূত্র আছে। ভাবতে ভাবতেই হঠাৎ রুমের এক কোণে দেশলাই জ্বলে উঠল। আগুনের হালকা আলোতে রুহি যা দেখল তাতে সে থমকে গেল। মানবটি আর কেউ নয়—পিয়াস!
স্টোর রুমে এই সময়ে পিয়াসকে দেখেই রুহি বিড়বিড় করে উঠল, “তবে কি পিয়াস ভাইয়ের সাথে এই দরজার কোনো সম্পর্ক আছে?” কিন্তু পরক্ষণেই তার ভুল ভাঙল। রুহি দেখল পিয়াস ঠোঁটের ফাঁকে একটি সিগারেট গুঁজে দিয়ে তাতে আগুন জ্বালিয়ে আয়েশ করে ধোঁয়া ছাড়ছে।
দৃশ্যটি দেখেই রুহির মনে পড়ে গেলো, এর আগেও সে পিয়াসকে এখানে লুকিয়ে সিগারেট খেতে দেখেছে। রুহি বুঝলো বাড়িতে অনেক মানুষ থাকায় আজ পিয়াস এখানে কেবল সিগারেট খাওয়ার জন্যই নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে এসেছে।
এভাবেই মিনিট খানেক সময় পার হলো। এদিকে পিয়াস নিজের মনে সিগারেট শেষ করে অবশিষ্টাংশটুকু পাশের একটি পুরনো আসবাবের গায়ে চেপে নেভালো, তারপর সেটাকে আসবাবের পেছনে ছুড়ে ফেলে দিল। এরপরে পকেট থেকে একটি চুইংগাম বের করে মুখে পুরে সে রুম থেকে তাড়াহুড়ো করে বেরিয়ে গেল। তবে এবার আর দরজা বাইরে থেকে লক করল না, দরজাটি কেবল আবছাভাবে ভিড়িয়ে দিয়ে গেল।
এদিকে পিয়াস চলে যেতেই রুহি যেন হাফ ছেড়ে বাঁচল। তবে এবার সে দ্রুত উঠে গিয়ে স্টোর রুমের দরজাটি ভেতর থেকে আটকে দিল। এরপর লুকানো জায়গায় ফিরে গিয়ে সেখান থেকে সেই লোহার রডটি নিয়ে আবারও ছবির আড়ালে থাকা তালাটিতে উপর্যুপরি ঘা বসাতে শুরু করল। কয়েকবার আঘাত করার পর এক সময় ক্যাঁচক্যাঁচ শব্দ করে তালাটি ভেঙে নিচে পড়ে গেল। তালা ভেঙেছে দেখেই রুহি যেন এক স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল।
এবার রুহি কাঁপা হাতেই সে সাদা দরজাটি ধীরে ধীরে খুলল। এদিকে দরজা পুরোপুরি খুলে যেতেই রুহি ধীরপায়ে ভেতরে প্রবেশ করল। কিন্তু সেখানে প্রবেশের পর তার চোখে যা ধরা পড়ল, তার জন্য রুহি কোনোকালেই প্রস্তুত ছিল না। রুমের ভেতরের অবস্থা দেখে বিষ্ময়ে তার জবান যেন বন্ধ হয়ে এল; তার চিরচেনা খন্দকার বাড়ির অন্তরালে এমন কিছু থাকবে, রুহির যেন তা কোনকালে দুঃস্বপ্নেও ভাবেনি।
এদিকে দরজাটি উন্মুক্ত হতেই রুহি থমকে দাঁড়িয়ে গেল। দরজার এ প্রান্তে যতটুকু অন্ধকার ছিল, ও প্রান্তে তার ঠিক উল্টো—উজ্জ্বল আলোয় ঝলমল করছে চারপাশ। ভেতরে যা দৃশ্যমান, তা দেখে রুহির নিজের দুচোখকেও বিশ্বাস করতে কষ্ট হচ্ছে।
একদিকে স্টোর রুমের দেয়ালগুলো যেখানে সাধারণ সাদা রং এ আবৃত, অপরদিকে এই গুপ্ত কক্ষের দেয়ালগুলো ঠিক যেন তার বিপরীত। রুমের চারপাশের দেয়াল কুচকুচে কালো রঙে আবৃত। উপরে ছাদের কোণ থেকে অত্যন্ত শৈল্পিক কায়দায় লাইটিং করা হয়েছে, যার স্নিগ্ধ আলো কালো দেয়ালের ওপর পড়ে এক মায়াবী ও অপার্থিব সৌন্দর্যের সৃষ্টি করেছে।
আকস্মিক দৃষ্টি ঘোরাতেই রুহি দেখলো যেখানে সে দাঁড়িয়ে আছে, ঠিক তার সামনের বিশাল দেয়াল জুড়ে সূক্ষ্ম রঙ-তুলির আঁচড়ে এক জীবন্ত ক্যানভাস ফুটে উঠেছে। সেখানে এক হাস্যোজ্জ্বল তরুণীর প্রতিচ্ছবি—যা আর কেউ নয়, স্বয়ং রুহি। রুহি একটি কাঠের দোলনায় বসে দোল খাচ্ছে, তার কালো চুলগুলো বাতাসের দাপটে এলোমেলো হয়ে উড়ছে আর সে খিলখিল করে হাসছে। ছবিটি এখনো পুরোপুরি শেষ হয়নি, কিছু কিছু জায়গায় তুলির শেষ পরশ বাকি; কিন্তু দেখে মনে হচ্ছে এখনই বুঝি ক্যানভাস থেকে হাসির শব্দ ভেসে আসবে।
এমন তৃশ্য দেখে বিস্ময়ের রেশ কাটতে না কাটতেই রুহি রুমের ভেতরে প্রবেশ করল। সে দেখল, বাকি দেয়ালগুলো জুড়ে ফ্রেমে বন্দি করা হয়েছে তার জীবনের অজস্র মুহূর্ত। রুহি খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে ছবিগুলো দেখতে শুরু করল এবং এক পরম বিস্ময়ে আবিষ্কার করল যে, এখানে তার একদম শৈশবের ছবি থেকে শুরু করে বর্তমান সময় পর্যন্ত প্রতিটি ধাপের ছবি সযত্নে সাজানো।
কোথাও সে ছোট্টবেলায় বায়না ধরছে, কোথাও কিশোরীবেলার চপলতা, আবার কোথাও বর্তমানের পরিণত রুহি। দেখেই মনে হব প্রতিটি ফ্রেম যেন কথা বলছে।
একসময় রুহি অন্যপাশের দেয়ালের দিকে তাকালো। আর সেখানে থাকা ছবিগুলো দেখে রুহি রীতিমতো যেন এক বিশাল ঝটকা খেল। এই ছবিগুলো কেবল শখের তোলা ছবি নয়, বরং এগুলো রুহির বিগত চার বছরের প্রতিদিনকার দিনলিপি! রুহি দেখল, গত চার বছরে সে যখন যে ড্রেস পরে বাইরে বেরিয়েছে, ঠিক সেই পোশাকে তার একেকটি ছবি এখানে ফ্রেমবন্দি। কোনোটিতে সে রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে ফুচকা খাচ্ছে, কোনোটিতে বান্ধবীদের সাথে প্রাণখুলে হাসাহাসি করছে, কোনোটিতে বা একা বিষণ্ণ মনে হেঁটে যাচ্ছে। ছবি গুলো দেখেই মনে হচ্ছে, কেউ যেন দীর্ঘ চারটা বছর ছায়ার মতো অতি যত্নে তাকে নজরে রেখেছে। নিজের এত এত ছবি সম্ভবত রুহির নিজের সংগ্রহেও নেই। একটি বদ্ধ রুমে নিজের জীবনের এত প্রতিচ্ছবি দেখে রুহির মাথা ঘুরে উঠল।
বিস্ময়ের আতিশয্যে রুহি যখন ধীরপায়ে পিছিয়ে যাচ্ছিল, তখনই সে পেছনের একটি টেবিলের সাথে সজোরে ধাক্কা খেল। সেই ধাক্কায় টেবিলের ওপর থাকা বেশ কিছু ফাইল মেঝেতে ছিটকে পড়ল এবং ভেতর থেকে কিছু কাগজপএ এদিক-সেদিক এলোমেলো হয়ে ছড়িয়ে গেল। রুহি ভড়কে গিয়ে দ্রুত বসে পড়ল কাগজগুলো গুছিয়ে নিতে। তখনই তার নজরে এল হাতে আঁকা কিছু স্কেচ আর রঙ-তুলির ছোঁয়ায় প্রাণবন্ত হয়ে ওঠা রুহিরই কিছু পেইন্টিং। প্রতিটি পাতায় আঁকা রুহির সেই প্রতিচ্ছবিগুলো দেখে তার চোখ কপালে উঠল। কারন ছবিগুলো তার ঘুমিয়ে থাকা অবস্থাতে আঁকা।
প্রতিটি ছবি উল্টে পাল্টে রুহি দেখলো, তার কাছে সব যেন স্বপ্নের মতো লাগছে। অতঃপর কাগজগুলো ফাইলের ভেতর পুরে রুহি যেই না টেবিলের ওপর রাখতে গেল, অমনি তার চোখ গেল টেবিলের এক কোণে রাখা একটি সাদা ফাইলের ভেতর। খুব পরিচিত কিছু কাগজ নজরে আসতেই কৌতূহলী হয়ে রুহি ফাইলটি হাতে তুলে নিল। ফাইল খুলে কাগজগুলো বের করতেই রুহির চোখমুখ বিস্ময়ে বড় বড় হয়ে গেল। এ কাগজগুলো যে রুহির অতি পরিচিত! এগুলো সেই ছন্দমাখা চিরকুট, যা তার সেই বেনামী আশিক ‘কাসাফাদ্দৌজা আশিক’ তাকে দিত। বিগত চারবছর ধরে রুহি নিয়ম করে চিঠি পেয়ে এসেছে। আর চিঠি পেয়ে বেশিরভাগই না পড়ে চিঠিগুলো রুহি বিভিন্ন সময় বিরক্তি নিয়ে বিভিন্ন জায়গায় ছুড়ে ফেলে দিয়েছিল, আর আজ সেই প্রতিটি স্মৃতি সযত্নে এই ফাইলের মধ্যে বন্দি।
হাজারটা প্রশ্নের তোলপাড় মনে, কিন্তু উত্তরগুলো কার থেকে খুঁজবে সে? অস্থির হয়ে রুহি ঘন ঘন নিশ্বাস নিচ্ছে, যেন দম বন্ধ হয়ে আসছে তার। এ কোথায় এসে পড়েছে সে? একসময় রুহি নিজেকে শান্ত করে শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত সব মেলাতে শুরু করল। এর আগে সে এই রুমে দুজন ব্যক্তিকে আসতে দেখেছে—একজন পিয়াস, অন্যজন শাহাজ। রুহি এটুকু বুঝতে পারল, পিয়াস এখানে কোনো রহস্যের জন্য নয়, কেবল সিগারেট খাওয়ার আড়ালে আসে। কিন্তু শাহাজ?
রুহির মনে পড়ে গেল সেই দিনটির কথা, যেদিন সে শাহাজকে এই রুমে ঢুকতে দেখে পিছু নিলেও ভেতরে কাউকে পায়নি। অথচ কিছুক্ষণ পরই শাহাজকে সে নিজে এই রুম থেকে বের হতে দেখেছিল। তার ওপর মোনালিসার সেই পেইন্টিং, স্টোর রুমের মেরামত এবং ভেলপুরিওয়ালার সেই কথা—সব হিসাব-নিকাশ তো শাহাজের দিকেই ইঙ্গিত করছে! রুহি এবার অস্ফুট স্বরে কেঁদে উঠে নিজে নিজে বলে উঠল, “শাহাজ ভাই... আ....আপনিই কি তবে সেই কাসাফাদ্দৌজা আশিক? আপনিই সেই স্টকার? শুরু থেকে সবটা আপনিই করছিলেন...?”
রুহির কেন জানি খুব কান্না পাচ্ছে। একসময় সে নিজের বুকের বাঁ পাশে হাত দিয়ে নিথর হয়ে বসে পড়লো । এদিকে তার মস্তিষ্ক তখন নিজের সাথেই যুদ্ধে ব্যস্ত। এক সময় রুহি উঠে দাঁড়িয়ে পুরো রুমটা নতুন করে খুঁজতে শুরু করল। টেবিলের ড্রয়ারগুলো তন্ন তন্ন করে খোঁজার পর, একপাশের একটি ড্রয়ারের তাকে রুহি এক কাঠের বক্স আর একটি লাল রঙের কাপড়ের পুঁটলি খুঁজে পেল।
অতঃপর কৌতুহলী হয়ে সে বক্সটি বের করে আনল। রুহি বক্সটি খুললো এবং দেখল, অনেক পুরোনো কিছু খেলনা সেখানে খুব যত্ন করে রাখা—মনে হচ্ছে কোনো ছোট মেয়ের শখের খেলনা। সেই সাথে কিছু ক্লিপ, হেয়ার ব্যান্ড, একটি সাধারণ ফ্রক আর একজোড়া রুপার ছোট চুড়ি। রুহি চুড়ি জোড়া হাতে তুলে নিলো কিন্তু এগুলো সে চিনল না, তবে দেখে বোঝা যাচ্ছে এগুলো অনেক পুরোনো, কারো স্মৃতি হিসেবে রাখা।
এরপর সে লাল পুঁটলিটি হাতে নিল। সেটা খুলতেই ভেতরে রাখা বস্তু গুলো দেখে এক প্রচণ্ড রকমের ধাক্কা খেল রুহি। কারন পুঁটলির ভরতরে ছিল কিছু আধা-পোড়া উপহার। রুহি ফ্যালফ্যাল করে গিফটগুলোর দিকে তাকিয়ে রইল। কাঠের বক্সের জিনিসগুলো না চিনলেও, এই পুঁটলির প্রতিটি জিনিস রুহি খুব ভালোভাবে চেনে। এক সময় খুব যত্ন করে এগুলো আগলে রেখেছিল সে। নবকিশোরী রুহি যখন পিয়াসের প্রেমে হাবুডুবু খাচ্ছিল, তখন প্রায়ই সে নিজের রুমের বাইরে বেনামী সব ছোটখাটো গিফট পেত—কখনো চুড়ি, কখনো কানের দুল, গল্পের বই, কিংবা নতুন ডিজাইনের পেন্সিল-কলম। রুহি কারো শুনেছিলো প্রেমিকরা নাকি তাদের প্রেমিকাকে ভালোবেসে গিফ্ট করে, তাই রুহি ভাবত এসব পিয়াস দিচ্ছে, তাই সে সব উপহার অতি যত্নে আগলে রাখত। কিন্তু পিয়াসের থেকে আঘাত পাওয়ার পর একদিন ছাদে উঠে সব কিছু পুড়িয়ে দিয়েছিল সে। রুহি এতদিন জেনে এসেছে ওইদিনই ছাদে সব পুড়ে ছাই হয়ে গেছে। কিন্তু না, কিছুই তো পোড়েনি! আজ সেই আধা-পোড়া স্মৃতিগুলোই তার সামনে পাহাড়সম সত্য হয়ে দাঁড়িয়ে। আর কেউ একজন সেই ছাই থেকে এই তুচ্ছ বস্তুগুলোকে উদ্ধার করে অমূল্য সম্পদ হিসেবে আগলে রেখেছে।
গোপন কক্ষের সেই স্তম্ভিত করা সত্যগুলো জানার পর রুহি আর এক মুহূর্ত স্থির থাকতে পারল না। সে হন্যে হয়ে পুরো রুমটা আবার খুঁজতে শুরু করল। তার মন বলছে, কোনো একটা ধ্রুব সত্য এখনও এই চার দেয়ালের মাঝে কোথাও লুকিয়ে আছে। কিন্তু না, তন্নতন্ন করে খুঁজেও নতুন কিছু সে পেল না। অতঃপর বুকে এক অদ্ভুৎ ব্যাথা আর সেই রুপার চুড়ি জোড়া নিয়েই রুহি কক্ষটি থেকে বেরিয়ে এলো।
এদিকে স্টোর রুম থেকে বেরিয়ে সে সোজা রওনা দিল শাহাজের রুমের দিকে। কারন রুহি আজ সবটা সত্যি জানতে চায়। কারন রুহি আর কিছু বুঝুক বা না বুঝুক এতোটুকু তো বুঝেছে যে স্টোর রুমের রহস্যের সাথে শাহাজের যোগসূত্র আছে।
এদিকে রুহি শাহাজের রুমে ঢুকে সেখানে কাউকে পেলো না। তাই সে নিচে নামবে বলে স্থির করলো। কিন্তু ঠিক তখন রুহির ছাদে ঘটে যাওয়া এক ঘটনা মনে পড়লো। সেদিন যখন রুহি তার অতিপরিচিত সুরটির পিছু নিতে নিতে ছাদে পৌঁছেছিলো, সেদিন সে সেখানে শাহাজকে দেখেছিলো। রুহির ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় তাকে ধাক্কা দিচ্ছে। কিছু বোঝার জন্য বারবার সতর্ক সংকেত দিচ্ছে।
রুহি এবার শাহাজের রুমের দরজা বন্ধ করলো এরপরেই পাগলের মতো প্রতিটি কোণা, প্রতিটি ড্রয়ার আর আলমারির ভাঁজ পরীক্ষা করতে লাগল। সে যেন আজ কোনো এক অঘোষিত গোয়েন্দা, যার লক্ষ্য কেবল সত্যকে উন্মোচিত করা।
একদিকে রুহি যখন শাহাজের রুমের ভেতর তখন অন্যদিকে, নিচে অনুষ্ঠানের হইহুল্লোড়ের মাঝে শাহাজ হঠাৎ লক্ষ্য করল রুহি কোথাও নেই। নিজের বোনের শ্বশুরবাড়ি আর মেহমানদের তদারকি করতে করতেও তার মন পড়ে রইল রুহির দিকে। সে একে একে নাসরিন বেগম, ইয়াসমিন বেগম এমনকি মমতাজ বেগমকেও রুহির কথা জিজ্ঞেস করল। কিন্তু সবাই এক উত্তর দিল—ব্যস্ততার মাঝে কেউ তাকে খেয়াল করেনি। হয়তো আশেপাশে আছে। সবার থেকে এক কথা শুনে শাহাজের অস্থিরতা বাড়তে শুরু করল, কিন্তু বন্ধুদের চাপে তাকে বারবার মেহমানদের কাছে ফিরে যেতে হচ্ছে।
এদিকে শাহাজের সাথে এবার রুহিকে খোঁজার মিছিলে যোগ দিলেন তানজিনা বেগম। তাঁর প্রয়োজন রুহির কাছে রাখা তার চাবিটি। হবু জামাইদের সালামি দেওয়ার টাকাগুলো আলমারিতে তোলা, অথচ চাবি রুহির জিম্মায়। নিচে কোথাও রুহিকে না পেয়ে তিনি হন্তদন্ত হয়ে দোতলার দিকে উঠতে শুরু করলেন। ঠিক সেই মুহূর্তে শাহাজকে তার বন্ধুরা একপ্রকার জোর করেই ছাদের দিকে টেনে নিয়ে গেল।
এদিকে শাহাজের রুম তন্নতন্ন করে খুঁজেও রুহি যখন তেমন বিশেষ কিছু পেল না, তখন সে একরাশ বিরক্তি নিয়ে খাটের ওপর বসে পড়লো, বালিশে হাত দিতেই তার কিনারাতে সে আবিষ্কার করলো তার জীবনের এক অন্যতম ও গুরুত্বপূর্ণ বস্তুকে। "লাল মাউথ অর্গান"। হে রুহি এতোক্ষণ এটাই তো খুজে যাচ্ছিলো। রুহির চোখজোড়া টলমল করে উঠলো।
রুহি মাউথ অর্গানটি হাতে নিয়ে যেই না রুম থেকে বেরিয়ে আসতে চাইল। ঠিক দরজার মুখেই তার সাথে তানজিনা বেগমের মুখোমুখি দেখা হলো। আকস্মিক বড় মাকে সামনে দেখে রুহি কিছুটা ভড়কে গেল। এদিকে তানজিনা বেগম রুহিকে দেখেই তড়িঘড়ি করে বলে উঠলেন, “তুই এখানে? আমি আর শাহাজ তোকে পুরো বাড়িতে খুঁজে বেড়াচ্ছি! কোথায় ছিলি এতক্ষণ?”
এবার রুহি নিজেকে সামলে নিয়ে স্বাভাবিক স্বরে বলল, “কেন খুঁজছিলে বড় মা?”
“কেন আবার? আলমারির চাবিটা তোকে দিলাম না? সালামি দিতে হবে, অথচ চাবির খোঁজে আমার জান শেষ! দে চাবিটা জলদি!”
রুহি অবাক হয়ে বলল, “আমি তো চাবি মার কাছে দিয়েছি বড় মা। তুমি কি মাকে জিজ্ঞেস করোনি?”
তানজিনা বেগম কপালে হাত দিয়ে বলে উঠলেন, “হায় আল্লাহ! আমি তো ভেবেছি তোর কাছেই থাকবে।”
বলেই তানজিনা বেগম যখন হন্তদন্ত হয়ে যাওয়ার জন্য পা বাড়ালেন, তখনই রুহি তাঁকে ডেকে থামাল। কাঠের বক্স থেকে আনা সেই পুরোনো রুপার চুড়িগুলো সামনে ধরে জিজ্ঞেস করল, “বড় মা, তুমি এই চুড়িগুলো চেনো? এগুলো কার ছিল বলতে পারো?”
তানজিনা বেগম চুড়িগুলোর দিকে ভালোভাবে তাকিয়ে একগাল হেসে উঠলেন। স্মৃতিকাতর কণ্ঠে বললেন, “তুই এটা কোথায় পেলি রে? এ তো তোরই চুড়ি! তুই যখন খুব ছোট ছিলি, এই চুড়িগুলো তোর খুব পছন্দ ছিল। সব সময় পরে থাকতি। তোর বড় আব্বু আর শাহাজ অনেক খুঁজে তোর জন্য এগুলো পছন্দ করে এনেছিল।”
রুহির বুকের ভেতরটা ধক করে উঠল। এরপর সে সেই লাল মাউথ অর্গানটি বড় মার সামনে মেলে ধরল। “আর এই এটা কার বড় মা?”
তানজিনা বেগম এবার একটু হেসেই বললেন, “এটা তো শাহাজের। ওর খুব পছন্দের জিনিস। ওর ১২তম জন্মদিনে তোর বড় আব্বু ওকে এটা গিফট করেছিল। জানিস, যখন শাহাজের জন্য এটা আনা হলো, পিয়াসের সে কী কান্না! ওরও নাকি সেম জিনিস চাই। পরে পিয়াসের জন্যও ঠিক একই রকম একটা কিনে দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু মজার ব্যাপার কী জানিস? শাহাজ এটা বাজাতে জানলেও পিয়াস কোনোদিন তা শিখতে পারেনি।”
রুহির মাথায় যেন আকাশ ভেঙে পড়ল। সে যে এতদিন এক মরীচিকার পেছনে ছুটেছে, তা বুঝতে আর এক সেকেন্ডও দেরি হলো না। পিয়াসের দেওয়া ভেবে যে উপহারগুলো সে আগলে রেখেছিল, যে মাউথ অর্গানের সুর শুনে সে পিয়াসের প্রেমে মগ্ন হয়েছিল—তার প্রকৃত কারিগর তো ছিল অন্য কেউ! তার শাহাজ ভাই হে রুহির শাহাজ ভাই, শাহাজ নামের সেই গম্ভীর মানুষটি ছায়ার মতো তাকে আগলে রেখেছিল, অথচ রুহি তাকেই ভেবে এসেছিলো শত্রু। কান্নারা গলার কাছে দলা পাকিয়ে আসলেও রুহি নিজেকে সামলে নিয়ে জিজ্ঞেস করল, “শাহাজ ভাই কোথায় বড় মা?”
তানজিনা বেগম নিচে নামতে নামতে বললেন, “দেখলাম ওর বন্ধুদের সাথে ছাদের দিকে গেল। বোধহয় ওখানেই আছে।”
রুহি আর এক মুহূর্ত দেরি করল না। চোখের জল মুছে সে পা বাড়াল ছাদের দিকে। কারন আজ সব লুকোচুরি আর ভুল বোঝাবুঝির অবসান হবে।
চলবে............