ফন্ট সাইজ:
থিম:
অন্তহীন প্রেম আমার

৮৩তম পর্ব

লেখক: Afifa Afnan

#অন্তহীন_প্রেম_আমার

#আফীফা_আফনান

#পর্ব_৬০ [খ]

[প্রপোজাল স্পেশাল ]

[কপি করা নিষিদ্ধ]

​“আপনি এখানে আসবেন আমাকে বলেননি কেন? আর এসেছেন তো এসেছেন, এভাবে এত বড় রিস্ক নিয়ে কেন এলেন?”

​অভিমানী সুর স্পষ্ট রুহির কণ্ঠে। নাক আর গাল দুটো ফুলিয়ে, ঠোঁট উল্টে শাহাজের দিকে তাকিয়ে নিজের মনের জমানো সবটুকু ক্ষোভ উগরে দিল সে। অথচ শাহাজ যেন সম্পূর্ণ ভাবলেশহীন। সে পকেটে হাত গুঁজে রুহির ঠিক পাশে দাঁড়িয়ে শান্ত মনে সমুদ্রের আদিগন্ত বিস্তৃত সৌন্দর্য উপভোগ করছে।

​সকাল ফুরিয়ে দুপুর গড়ানোর এই প্রহরে তারা দুজনে এখন দাঁড়িয়ে আছে সেন্টমার্টিনের একদম নির্জন এক বালুময় সৈকতে। ধবধবে সাদা নরম বালুর ওপর এসে আছড়ে পড়ছে সাগরের নীল জলরাশি। সেই সাথে রুহির চোখ-মুখে এখন পর্বতপ্রমাণ অভিমান খেলা করলেও, তার মনের ভেতরটা যে শাহাজের উপস্থিতিতে খুশির জোয়ারে ভাসছে, তা শাহাজ তাকে না দেখেই খুব ভালো করে বুঝতে পারছে। রুহির চঞ্চল মনের প্রতিটা স্পন্দন যে শাহাজের নখদর্পণে!

​হঠাৎই শাহাজ সমুদ্র থেকে দৃষ্টি সরিয়ে রুহির দিকে তাকাল। তার চিরচেনা সেই গম্ভীর অথচ শীতল কণ্ঠে বলে উঠল, “আমার আসাতে তুই খুশি হসনি রুহি? তাহলে কি আমি এখনই চলে যাব?”

​শাহাজের এই আচমকা আর সোজাসাপ্টা কথায় রুহি যেন একটা বড়সড় ধাক্কা খেল! মনের ভেতরের সবটুকু রাগ এক নিমেষেই যেন উধাও হয়ে গেল। সে তড়িঘড়ি দুই হাত নেড়ে জোর গলায় শাহাজের কথা অস্বীকার করে বলে উঠল, “না না! যাবেন কেন? আমি কি আপনাকে যেতে বলেছি নাকি? আমি... আমি তো শুধু বলছি এভাবে এত রাতে, এত বড় রিস্ক নিয়ে কেন এলেন! সকালের জাহাজে করেও তো অনায়াসেই আসা যেত তাইনা।”

​শাহাজ এবার আবারও সমুদ্রের পানে তাকাল। সাগরের বুকে তখন দুপুরের কড়া রোদ হিরের কুচির মতো জ্বলজ্বল করছে। সে ভীষণ শান্ত ও নিচু স্বরে উত্তর দিল, “জীবনে মাঝে মাঝে একটু-আধটু রিস্ক নেওয়া দরকার রুহি। আর কাল রাতে এত বড় রিস্কটা নিয়ে যদি না-ই আসতাম, তবে জীবনের সবচেয়ে অসম্ভব সুন্দর একটা দৃশ্য দেখা থেকে বোধ-হয় বঞ্চিত রয়ে যেতাম।”

​শাহাজের মুখে এমন রহস্যময় কথা শুনে রুহি এবার বেশ সংকুচিত বোধ করল। তার মনের ভেতর কৌতূহলের পারদ যেন চড়চড় করে বেড়ে গেল। অতঃপর সে অবাক হয়ে চোখ বড় বড় করে প্রশ্ন করল, “কী! কী বলছেন আপনি এসব? আর এমন কোন দৃশ্য আপনি দেখেছেন, যেটা না দেখলে আপনার জীবন অপূর্ণ থেকে যেত, শুনি?”

​শাহাজ এবার ধীরপায়ে রুহির একদম মুখোমুখি এসে দাঁড়াল। তার সেই চেনা গভীর, ঠাণ্ডা চোখ জোড়া সরাসরি রুহির চোখের ওপর নিবদ্ধ করল। বরাবরের মতোই শান্ত আর শীতল স্বরে বলে উঠলো, “তোর সেই ঘুমন্ত মায়াবী মুখখানা রুহি... যার দিকে চেয়ে থাকলে পৃথিবীর সব ক্লান্তি ভুলে যাওয়া যায়। কাল রাতে না আসলে এই সৌভাগ্যটা আমার হতো না।”

​শাহাজের মুখের এই একটি বাক্য যেন রুহির পুরো দুনিয়াটাকে স্তব্ধ করে দিল! সে বাকরুদ্ধ হয়ে গেল। সাথে সাথে তার কান দুটো গরম হয়ে উঠল, বুকের ভেতরটা যেন ড্রামের মতো বাজতে লাগল। ফ্যালফ্যাল করে সে শুধু তাকিয়ে রইল শাহাজের দিকে। এই কঠোর, গম্ভীর লোকটার মুখে এমন ভালোবাসার স্বীকারোক্তি! কী বলছে এই লোক আজ!

​রুহি নিজের ভেতরের এই তীব্র লাজুকতা আর ভালো লাগা লুকাতে এবার কৃত্রিম রাগ দেখাল। ঝট করে উল্টো দিকে ঘুরে সমুদ্রের কিনারা ধরে হনহন করে হাঁটতে শুরু করল। হাঁটতে হাঁটতেই মুখ বাঁকিয়ে বলে উঠল, “আপনি একটা যাচ্ছেতাই শাহাজ ভাই! সবসময় আমাকে কথার জালে ভাসিয়ে এভাবে চুপ করিয়ে দেন!”

​রুহির এই মিষ্টি অভিযোগ আর চলে যাওয়ার ভঙ্গি দেখে শাহাজ এবার নিঃশব্দে হাসল। ঠোঁটের কোণে ফুটে ওঠা সেই হাসিতে যেন এক অদ্ভুত তৃপ্তি মিশে রইল। অতঃপর এবার সে নিজের দীর্ঘ কদমে ধীরপায়ে হেঁটে রুহির সাথে হাটার তাল মিলাল।

এদিকে ​দিনের বেলার সেন্টমার্টিনের রূপ যেন এক মায়াবী ক্যানভাস। চারদিকে দুপুরের কড়া রোদের মাঝেও সাগরের উত্তাল গর্জন বাতাসে এক রোমাঞ্চকর সুর ছড়িয়ে দিচ্ছে। একের পর এক নীল ঢেউ ফেনা তুলে তীব্র বেগে আছড়ে পড়ছে তীরে। সেই সাথে সমুদ্রের সেই চঞ্চল নোনা বাতাস এসে রুহির ওড়না আর চুলগুলোকে অবাধ্যের মতো উড়িয়ে নিয়ে যাচ্ছে। এই অপরূপ প্রকৃতির মাঝে, বিশাল সমুদ্রের পাড় ঘেঁষে মাইলের পর মাইল বিস্তৃত সেই বালুকা বেলায় পাশাপাশি হেঁটে চলেছে দুটি মন।

​হাঁটতে হাঁটতেই হুট করে শাহাজ নিজের শক্ত, উষ্ণ হাতটা বাড়িয়ে দিয়ে রুহির নরম হাতটি আলতো করে নিজের মুঠোয় পুরে নিল। শাহাজের হাতের সেই পরিচিত ও নিরাপদ স্পর্শ পেতেই রুহির সমস্ত রাগ, অভিমান আর লজ্জা এক নিমেষে যেন হাওয়া হয়ে উড়ে গেল। এবার সে হাঁটা থামিয়ে শাহাজের দিকে তাকাল। তার ঠোঁটের কোণে তখন এক অনাবিল, মিষ্টি ও তৃপ্তির হাসি।

এতক্ষণের মনের ভেতরে থাকা সকল রাগ আর অভিমান সমুদ্রের ওই বিশাল ঢেউয়ের গর্জন আর মাতাল বাতাসের তালে তালে যেন কোন সুদূরে মিলিয়ে গেল। রয়ে গেল শুধু হাত ধরাধরি করে হেঁটে চলা দুটি মানুষের এক অন্তহীন প্রেমের গল্প।

এদিকে হাত ধরাধরি করে সমুদ্রের কিনারা ধরে হাঁটতে হাঁটতে তারা দুজন একসময় রিসোর্ট থেকে বেশ অনেকটা দূরে চলে এল। সেন্টমার্টিনের মূল সৈকত থেকে এই জায়গাটা যেন একটু আলাদা, এক অদ্ভুত মায়াবী নির্জনতা ঘিরে রেখেছে চারপাশ। এখান থেকে সমুদ্রের রূপ যেন আরও হাজার গুণ বেশি সুন্দর আর জীবন্ত হয়ে উঠেছে। নীল জলের বিশাল বিশাল ঢেউগুলো যখন তীরের খাঁজকাটা পাথরের গায়ে আছড়ে পড়ছে, তখন চারদিকে ধবধবে সাদা ফেনার এক অপূর্ব চাদর তৈরি হচ্ছে। মাথার ওপর সুনীল আকাশ আর পায়ের নিচে চকচকে বালুচর—সব মিলিয়ে জায়গাটা যেন কোনো দক্ষ শিল্পীর আঁকা জীবন্ত ক্যানভাস।

​প্রকৃতির এই রূপ দেখে রুহির ভেতরের চঞ্চলা মনটা আর ঘরে আটকে থাকতে চাইল না। সে হুট করেই শাহাজের হাতটা ছেড়ে দিয়ে তার সামনে গিয়ে দাঁড়াল। দুই হাত কোমরে রেখে মিষ্টি করে আবদার ধরে বসল, “শাহাজ ভাই, জায়গাটা কত সুন্দর দেখেছ? প্লিজ, আমার কয়েকটা ছবি তুলে দিন না!”

​শাহাজ প্রথমে একটু গম্ভীর মুখে তাকাল, কিন্তু রুহির চোখের ওই আকুলতা দেখে না করতে পারল না। সে পকেট থেকে নিজের আইফোনটা বের করল। রুহি একেকবার একেক রকম পোজ দিয়ে দাঁড়াচ্ছে, আর শাহাজ পরম ধৈর্য নিয়ে বিভিন্ন অ্যাঙ্গেল থেকে তার চমৎকার সব ছবি তুলে দিচ্ছে। কয়েকটা সিঙ্গেল ছবি তোলার পর রুহির মন যেন কিছুতেই ভরছিল না। সে এবার একটু ইতস্তত করে, লাজুক হেসে বলল, “আচ্ছা... আমাদের একটা কাপল পিকচার হলে কেমন হয়? দুজনে একসাথে একটা ছবি তুলি? প্লিজ শাহাজ ভাই।”

অতঃপর রুহির আবদারে ​শাহাজ ফোনটা নিজের দিকে ঘুরিয়ে ক্যামেরা অন করল। কিন্তু তাদের সাথে অন্য কেউ না থাকায় সেলফি ক্যামেরা দিয়েই দুজনের ছবি তোলা ছাড়া আর কোনো উপায় ছিল না। তাই শাহাজ ফোনটা উঁচিয়ে ধরে কয়েকটা সেলফি ক্লিক করল। রুহিও শাহাজের কাঁধের পাশে মাথা রেখে স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে হাসল।

​ছবিগুলো তোলা শেষ হলে রুহি শাহাজের হাত থেকে মোবাইলটা নিয়ে সেলফিগুলো দেখতে দেখতে একটু মন খারাপ করল। সে মৃদু দীর্ঘশ্বাস ফেলে আপনমনেই বিড়বিড় করে বলতে লাগল, “ইস! বিন্তির কথা মতো টাইটানিক মুভিতে রোজ আর জ্যাক যেভাবে হাত ধরাধরি করে জাহাজের রেলিংয়ে দাঁড়িয়ে ছবি তুলেছিল... অমন পোজ দিয়ে যদি আমাদের একটা সুন্দর ফুল ছবি তোলা যেত! কিন্তু এই দ্বীপে আমাদের ওভাবে ছবি তুলে দেওয়ার তো কেউ নেই। তা কি আর সম্ভব হবে নাকি!”

​যদিও রুহি এই সাধারণ সেলফিগুলোতেও মনে মনে অনেক খুশি ছিল। কিন্তু মনের ভেতর একটি সুপ্ত ইচ্ছে বাসা বাঁধছিলো তার। এদিকে রোদের তিব্রতা নামার এই সময়ে সেন্টমার্টিনের কড়া রোদে রুহির ভীষণ পানির পিপাসা পেয়ে বসল। সে গলা শুকিয়ে আসায় এদিক-ওদিক তাকাল। একসময় শাহাজকে জানালো, শাহাজও আশেপাশে নজর বুলাল, কিন্তু কাছাকাছি কোনো পানির দোকান চোখে পড়ল না। পানি না পেয়ে এবার রুহি মুখ ছোট করে বলল, “এমনিতেও এখানকার সাধারণ পানি আমার একদম পছন্দ না। খেয়ে কেমন যেন একটা অদ্ভুত স্বাদ লাগে, তৃষ্ণা মেটে না।”

​ঠিক তখনই শাহাজ খেয়াল করল, তাদের থেকে কিছুটা দূরে সমুদ্রের পাড়ে নারিকেল গাছের ছায়ায় কয়েকজন লোক বসে কচি ডাব বিক্রি করছে। শাহাজ রুহির হাত ধরে বলল, “চল ওদিকে।”

​সে রুহিকে নিয়ে ডাব বিক্রেতার কাছে গেল। লোকটা একটা বড় সাইজের কচি ডাব কেটে স্ট্র দিয়ে রুহির হাতে দিতেই রুহির চোখে-মুখে স্বস্তির ছোঁয়া লাগল। সে ডাবটা হাতে নিয়ে পাশে থাকা একটা কাঠের পুরোনো মাচার ওপর গিয়ে আরাম করে বসল। রুহি যখন মাচায় বসে চুপচাপ ডাবের মিষ্টি পানি খাচ্ছিল, তখন সে দূর থেকে লক্ষ্য করল—শাহাজ ডাব বিক্রেতা লোকটার সাথে বেশ কিছুক্ষণ ধরে নিচু স্বরে কী যেন কথা বলছে। এত দূর থেকে সমুদ্রের বাতাসের গর্জনে রুহি কিছুই শুনতে পাচ্ছিল না। তবে সে দেখল, কথা বলা শেষে শাহাজ নিজের পকেট থেকে মানিব্যাগ বের করে লোকটাকে বেশ কিছু টাকা ধরিয়ে দিল।

​পরক্ষণেই শাহাজ সেই লোকটিকে সাথে নিয়ে রুহির দিকে এগিয়ে এল। এসেই মাচার সামনে দাঁড়িয়ে শাহাজ রুহির চোখের দিকে তাকিয়ে শান্ত স্বরে বলে উঠল, “চল, আমাদের কাপল পিকচার তুলি।”

​শাহাজের মুখে এই কথা শুনে রুহি তো এক নিমেষে ভীষণ খুশি হয়ে মাচা থেকে ঝটপট দাঁড়িয়ে গেল। তবে সে শাহাজের পিছু পিছু হাঁটতে হাঁটতে কৌতূহল নিয়ে বলল, “কিন্তু শাহাজ ভাই, মাত্রই না আমরা কাপল পিকচার তুললাম? কাপল পিকচার মানেই তো সেই সেলফি, তাই না?”

​বলতে বলতে শাহাজ যখন রুহিকে নিয়ে একদম সমুদ্রের পানির সীমানার কাছাকাছি গিয়ে দাঁড়াল, তখনই ঘটল সেই জাদুকরী কাণ্ড! শাহাজ হঠাৎই রুহির হাতটা টেনে তাকে একদম সমুদ্রের হালকা নীল পানির মধ্যে নামিয়ে আনল। রুহি কিছু বুঝে ওঠার আগেই শাহাজ এক ঝটকায় রুহিকে নিজের খুব কাছে টেনে নিল। ঠিক টাইটানিক মুভির সেই বিখ্যাত দৃশ্যটার মতো—শাহাজ রুহির কোমরে এক হাত জড়িয়ে ধরে, অন্য হাতে রুহির হাতটা ধরে আকাশের দিকে প্রসারিত করে এক রাজকীয় আর অসম্ভব রোমান্টিক স্টাইলে তাকে আগলে ধরল।

​আর ঠিক সেই মুহূর্তেই, ওপাশে দাঁড়িয়ে থাকা সেই ডাব বিক্রেতা শাহাজের আইফোনটা হাতে নিয়ে একের পর এক ক্লিকে তাদের এই অপার্থিব সুন্দর মুহূর্তগুলো ক্যামেরাবন্দি করতে শুরু করল!

এদিকে ​রুহি তখন একদম অবাক, হতবাক! তার পুরো পৃথিবী যেন এক জায়গায় থমকে গেছে। নিজের সাথে কী ঘটে চলেছে, সে প্রথম কয়েক সেকেন্ড তা মাথাতেই ঢোকাতে পারছিল না। বুকের ভেতর হৃদস্পন্দন যেন হাজার গুণ বেড়ে গিয়েছে। ঠিক তখনই শাহাজ রুহির কোমর ধরে তাকে আলতো করে বালু থেকে একটু ওপরের দিকে তুলে নিল। রুহির কপাল আর শাহাজের কপাল একে অপরের সাথে পরম ভালোবাসায় ঠেকে গেল। দুই জোড়া চোখ তখন একদম কাছাকাছি।

​শাহাজের এই আচমকা গভীর স্পর্শে রুহি নিজের চোখ দুটো বড় বড় করে ফেলল। এ যেন তার সমস্ত কল্পনা আর স্বপ্নেরও বাইরে! সে নিজের কাঁপতে থাকা ঠোঁট দুটো জোড়া লাগিয়ে আস্তে আস্তে ফিসফিস করে বলে উঠল, “আপনি... আপনি কীভাবে জানলেন যে আমি ঠিক এই পোজগুলোতে আপনার সাথে ছবি তুলতে ইচ্ছুক ছিলাম?”

রুহি যেন হতবিহ্বল সে তো মনে মনে শাহাজের সাথে ঠিক এভাবেই ছবি তুলতে চেয়েছিল, কিন্তু সে শাহাজকে একবারের জন্যও মুখে এই ইচ্ছার কথা বলেনি। কিন্তু এই গম্ভীর, শান্ত মানুষটা কীভাবে যেন তার মনের ভেতরের সেই গোপন সুপ্ত ইচ্ছাটা এক নিমেষে বুঝে গেল!

এদিকে ​বেশ কিছু চমৎকার ছবি তোলা শেষ হলে, শাহাজ সেই ডাব বিক্রেতা লোকটির হাত থেকে নিজের মোবাইলটা ফেরত নিল। লোকটিকে তার এই সুন্দর সাহায্যের জন্য মুখে ধন্যবাদ জানাতেই সে হাসিমুখে সেখান থেকে বিদায় নিল।

​এদিকে রুহি তখনো সেই সমুদ্রের পানির মাঝে দাঁড়িয়ে এক গভীর ঘোরের মধ্যে ডুবে আছে। তার গালে তখন লাজুকতার এক লালচে আভা। এবার শাহাজ তকর দিকে তাকালো, রুহিকে এভাবে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে আলতো হেসে নিজের লক খোলা মোবাইল স্ক্রিনটা রুহির দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বলল, “নে দেখ। যেগুলো যেগুলো পছন্দ হয় সেগুলো রেখে বাকিগুলো ডিলিট করে দিস।”

অথচ ​রুহি তখনই শাহাজের বাড়িয়ে দেওয়া সেই মোবাইলের দিকে তো আরেকবার তার চোখের দিকে বোকার মতো তাকিয়ে রইল। অতঃপর রুহি আবারও শাহজের দিকে তাকাতেই সে চোখের ইশারায় তাগিদ দিতেই সে মোবাইলটি নিজের হাতে লুফে নিল। এরপর রুহি ধীরপায়ে হেঁটে আবারও সেই কাঠের মাচার ওপর গিয়ে বসল এবং পরম আগ্রহে একে একে ছবিগুলো দেখতে লাগল।

​ক্যামেরার ফ্রেমে বন্দি হওয়া প্রতিটা ছবি দেখার সাথে সাথেই এক অন্যরকম, অবর্ণনীয় শিহরণ রুহির শরীরের অঙ্গে অঙ্গে বয়ে যেতে লাগল। প্রতিটা ছবিতে তাদের দুজনের কেমিস্ট্রি যেন উপচে পড়ছে! বিশেষ করে শাহাজের ওই গভীর চাউনি আর তাকে আগলে রাখার ভঙ্গিটা দেখে রুহির ঠোঁটের কোণে মায়াবী এক মুচকি হাসি ফুটে উঠল।

​কিছুক্ষণ ছবিগুলো স্ক্রল করার পর, রুহি নিজের মনেই খুব নিচু স্বরে বিড়বিড় করে আওড়ে উঠল, “একটা ছবিও আমি ডিলিট করব না! ভালো হোক কি খারাপ হোক... সবগুলো ছবি আমি সযত্নে রেখে দেব। এগুলো আপনার সাথে আমার জীবনের সেরা স্মৃতি বলে কথা!

একদিকে ​সমুদ্রের উত্তাল হাওয়া যখন রুহির চুলে দোলা দিয়ে যাচ্ছিল, আর অন্যদিকে সে নিজের ফোনের স্ক্রিনে বন্দি হওয়া তাদের ভালোবাসার সেই ফ্রেমগুলোর মাঝে এক অনাবিল সুখ খুঁজে পাচ্ছিল।

অতঃপর এক সময় তারা আবার রিসোর্টের কাছাকাছি এসে পড়ল। তারা ঠিক এখন সৈকতের সেই জায়গাটাতে এসে দাঁড়িয়েছে, যেখানে গতকাল রুহি একা একা বসে ছিল। দুপুর প্রায় শেষের দিকে। তাই সময়ের সাথে সাথে সেন্টমার্টিনের আবহাওয়াতেও এক দারুণ পরিবর্তন লক্ষ্য করা যাচ্ছে। চারপাশের কড়া রোদ এখন সমুদ্রের সবুজাভ নীল পানিতে প্রতিফলিত হয়ে হিরের কুচির মতো জ্বলজ্বল করছে। জোয়ারের কারণে বিশাল বিশাল ঢেউগুলো আরও বেশি গর্জন করে তীরের দিকে ধেয়ে আসছে, আর সেই সাথে লোনা বাতাস যেন আরও বেগবান আর শীতল হয়ে উপচে পড়ছে তাদের ওপর।

​রুহির হাতে তখনও শাহাজের দেওয়া সেই মোবাইল। সে এখনো মোহাচ্ছন্ন হয়ে শাহাজের সাথে তোলা নিজের কাপল ছবিগুলো খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখছে। প্রতিটা ছবি একদম চোখে পড়ার মতো। এদিকে শাহাজ এক নজর এই চঞ্চলা মেয়েটার দিকে তাকাল। ছবির মাঝে রুহির এই মগ্নতা দেখে তার ঠোঁটের কোণে এক চিলতে প্রশ্রয়ের হাসি ফুটে উঠল।

ঠিক ​পরক্ষণেই শাহাজ সমুদ্রের উত্তাল ঢেউয়ের দিকে নিজের দৃষ্টি ফিরিয়ে নিল। পকেটে হাত গুঁজে, এক গভীর ও ঠান্ডা কণ্ঠে হঠাৎ রুহিকে উদ্দেশ্য করে বলে উঠল, “ডিড ইউ মিস মি, রুহি?”

​রুহি এতক্ষণ মোবাইলে পুরোপুরি ডুবে থাকলেও, শাহাজের মুখ থেকে আচমকা এমন প্রশ্ন শুনে সে চমকে উঠল। চট করে স্ক্রিন থেকে চোখ তুলে সে শাহাজের সুঠাম চেহারার দিকে তাকাল। নিজের ভেতরের ধরা পড়ে যাওয়া চোর চোর ভাবটা লুকাতে সে শাহাজের কথাকে পুরোপুরি অগ্রাহ্য করে, মুখের ওপর এক কৃত্রিম উদাসীনতা ফুটিয়ে বলে উঠল, “কখন! নাতো! কই? আমি কেন আপনাকে মিস করতে যাব? আমি মোটেও আপনাকে মিস করিনি।”

​রুহির এই চাতুরি দেখে শাহাজ এবার এক সূক্ষ্ম, রহস্যময় হাসি হাসল। অতঃপর সে ধীরস্বরে বলে উঠল, “কিন্তু আমি তো জানি, গতকাল ঠিক এই জায়গায় বসে কেউ একজন আমাকে বড্ড বেশি মিস করছিল।”

​শাহাজের মুখে এমন নিশ্চিত কথা শুনে রুহি এবার চূড়ান্ত রকমের অবাক হলো! তার চোখ দুটো বিস্ময়ে বড় বড় হয়ে গেল। সে নিজের ভেতরের লাজুকতা ভুলে গিয়ে হুট করেই প্রশ্ন করে বসল, “আপনি... আপনি কীভাবে জানলেন?”

রুহির কথায় ​শাহাজ এবার ঘাড় ঘুরিয়ে রুহির দিকে চাইল। তার ঠোঁটের কোণে সেই সূক্ষ্ম হাসির রেখাটা আরও একটু চওড়া হলো। সে শান্ত স্বরে বলল, “তার মানে তুই সত্যিই আমাকে মিস করছিলি, রুহি?”

​শাহাজের এই পাল্টা চালের জালে পা দিয়ে রুহি এবার ভীষণ লজ্জায় পড়ে গেল। সে আমতা আমতা করে নিজের লজ্জা ভাবটা কাটানোর জন্য তাড়াহুড়ো করে বলল, “উফফ! ওসব বাদ দিন তো! আপনি আগে বলুন আপনি কীভাবে জানলেন?”

​শাহাজ নিজের দাবিতে অনড় থেকে বলল, “আগে বল, মিস করছিলি কি না। তারপর বলব।”

​রুহি এবার আর না পেরে লজ্জায় লাল হয়ে নিজের মাথাটা নাড়ল, অর্থাৎ সে জেদ ধরে নিঃশব্দে স্বীকার করে নিল যে সে সত্যিই শাহাজকে মিস করছিল। মাথা নেড়ে সম্মতি জানিয়েই রুহি কিছুটা চপল আর কৌতূহলী গলায় একনাগাড়ে জিজ্ঞেস করতে লাগল, “বলুন না শাহাজ ভাই, কীভাবে জানলেন? আর শুধু এই কথাই নয়, একটু আগে সমুদ্রের পানিতে আমরা যেভাবে ওই পোজগুলোতে ছবি তুললাম... ওসব তো আমি মনে মনে বলছিলাম আর ওসব তো আমাকে বিন্তি বলেছিলো! তাও রিকশাতে বসে যাওয়ার সময়! তখন তো আমি জানতামও না যে আপনি এখানে আসবেন। তাহলে আপনি এই ছবি তোলার সুপ্ত ইচ্ছার কথা কীভাবে জানলেন? বলুন না, প্লিজ!”

রুহির কথা শেষ হলো কিন্তু ​শাহাজ বিপরীতে কিছুই বললো না যেন সে গভীর এক নীরবতা অবলম্বন করল। সেই সাথে তার ঠাণ্ডা চোখ দুটো দিয়ে রুহির দিকে এক দৃষ্টিতে চেয়ে রইল, যেন এই নীরবতার মাঝেই সব উত্তর লুকিয়ে আছে।

​ঠিক তখন তাদের এই একান্ত মুহূর্তের জাল ছিন্ন করে দূর থেকে মেজ চাচ্চু শাহাবুদ্দিন সাহেবের চড়া আওয়াজ বাতাসে ভেসে এল, “এই রুহি! শাহাজ! কোথায় ছিলি তোরা এতক্ষণ? সময় কতো হয়েছে দেখেছিস।আয়, দুপুরের খাবার টেবিলে সার্ভ করা হয়ে গিয়েছে। সবাই একসাথে খেতে বসব। জলদি আয় তোরা!”

আকস্মিক ​শাহাবুদ্দিন সাহেবের সেই ডাক শোনা মাত্রই শাহাজ রুহির দিক থেকে দৃষ্টি সরিয়ে নিল এবং কোনো কথা না বাড়িয়ে সোজা ওখান থেকে রিসোর্টের ডাইনিং হলের দিকে পা বাড়াল।

​এদিকে রুহি তখনো তার গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের উত্তর পায়নি। সেই সাথে শাহাজের হুট করে চলে যাওয়া দেখে নিজের হাতের মোবাইলটা শক্ত করে ধরে তার শাহাজ ভাইয়ের পেছনে পেছনে হাঁটতে শুরু করল। সে শাহাজের পিছু পিছু হাঁটতে হাঁটতে অনবরত পিছন থেকে ফিসফিস করে জিজ্ঞেস করে গেল, “বলুন না শাহাজ ভাই! এভাবে চলে যাচ্ছেন কেন? উত্তরটা দিয়ে যান...”

কিন্তু শাহাজ কেবল নিজের স্বভাবসুলভ চওড়া পিঠ দেখিয়ে গটগট করে হেঁটে গেল, আর এদিকে রুহি তার অবুঝ মনে করা প্রশ্নের মনমতো কোনো উত্তরই তার কাছ থেকে আদায় করতে পারল না।

অতঃপর খাবার টেবিলে পৌঁছাতেই রুহির চোখ জোড়া এক পরম তৃপ্তিতে চকচক করে উঠল। সেখানে এলাহি আয়োজন! হরেক পদের সামুদ্রিক মাছের সুস্বাদু পদের পাশাপাশি টেবিলের ঠিক মাঝখানে শোভা পাচ্ছে একটি বিশাল সাইজের ভ্যানিলা কেক, যার ওপরে রঙিন ক্রিম দিয়ে খুব সুন্দর করে লেখা—‘শুভ জন্মদিন রুহি’।

সকাল থেকে তার সব ইচ্ছাই একে একে পূরণ হয়েছে; বড়দের কাছ থেকে দোয়া ও গিফট পাওয়া, শাহাজের সাথে সমুদ্রের পাড়ে ঘুরে ইচ্ছেমতো ছবি তোলা। শুধু কেক কাটার পর্বটুকুই বাকি ছিল, এবার সেটাও পূর্ণ হতে চলল।

অবশেষে ​দুপুরের ভরপেট খাওয়া-দাওয়া শেষ করে পুরো পরিবার আর বন্ধুমহল মেতে উঠল কেক কাটার আনন্দে। সবাই মিলে গোল হয়ে দাঁড়িয়ে হাততালি দিয়ে বার্থডে সং গাইতেই রুহি হাসিমুখে কেক কাটল। এরপর সে একে একে নিজ হাতে কেকের টুকরো সবাইকে খাইয়ে দিতে লাগল। একপর্যায়ে সে এক টুকরো কেক নিয়ে শাহাজের ঠোঁটের কাছে ধরল। শাহাজ আলতো করে কামড় দিতেই রুহি সুযোগ বুঝে আবারও ওনার কানের কাছে মুখ এনে ফিসফিস করে একই কথা বলল, “আপনি কিন্তু আমার প্রশ্নের উত্তর দিলেন না শাহাজ ভাই। কীভাবে জানলেন আমার মনের কথা?”

​শাহাজ এবারও কোনো কথা বলল না। রুহির ওই উৎসুক চাউনি দেখেও সে শুধু এক চিলতে রহস্যময় হাসি উপহার দিয়ে চুপচাপ ওখান থেকে সরে গিয়ে তাকে এড়িয়ে গেল।

​এরপর সময় তার নিজস্ব গতিতে অতিবাহিত হতে লাগল। দুপুর গড়িয়ে বিকেল, আর বিকেল ম্লান হয়ে চারদিকে ধীরে ধীরে সন্ধ্যা নেমে এল। সেন্টমার্টিনের বুকে সন্ধ্যার অন্ধকার নামার সাথে সাথে রিসোর্টের চারপাশের লাইটগুলো জ্বলে উঠল। সবকিছু ঠিকঠাক চললেও, রুহি কিন্তু দুপুরের পর থেকে শাহাজের আর কোনো দেখাই পেল না। সেই যে কেক কাটার পর মানুষটা ডাইনিং থেকে বের হয়ে গেল, তারপর যেন একবারে হাওয়া! রুহি ব্যাকুল হয়ে কয়েকবার চাচ্চু শাহাবুদ্দিন সাহেবের কাছেও শাহাজের কথা জিজ্ঞেস করেছিল, কিন্তু তিনিও শুধু মাথা নেড়ে বলেছেন, “আমি তো জানি না রে মা, বোধহয় আশেপাশে আছে।”এদিকে সবদিকে খুঁজেও শাহাজকে না পেয়ে রুহির মনে যেন একরাশ মেঘ জমে উঠল।

​এদিকে কাব্যের অলস বসে থাকার বান্দা নয়। সে রুবির আরও কয়েকজন ক্লাসমেট মিলে রিসোর্টের বাইরে সমুদ্রের ঠিক কাছাকাছি বালুচরে এক জমজমাট বারবিকিউ পার্টির প্ল্যান করে ফেলেছে। যার জন্য রিসোর্টের ম্যানেজারের সাথে ভালো সখ্যতা তৈরি করে, তার মাধ্যমে টেকনাফ থেকে আসা একদম তাজা কোরাল, রূপচাঁদা আর গলদা চিংড়ি আনিয়ে নিয়েছে। সেন্টমার্টিনের স্পেশাল মশলা মাখিয়ে সেই মাছগুলো শিকলবন্দি করার কাজে বিকেল থেকেই তারা প্রচণ্ড ব্যস্ত। পুরো বারবিকিউর তদারকির দায়িত্ব কাব্য একাই নিজের কাঁধে তুলে নিয়েছে।

★★★

এক-প্রকার ​বিকেলের শেষ প্রহর থেকে শুরু করে সন্ধ্যা পর্যন্ত পুরো রিসোর্ট চষে ফেলে শাহাজকে কোনো দিকে না পেয়ে অবশেষে ক্লান্ত আর চরম বিরক্ত হয়ে রুহি যখন নিজের রুমে ফিরে এল, তখন ঘরের ভেতরের দৃশ্য দেখে সে থমকে গেল। সে দেখল—রুবি, রিমু আর তাদের কয়েকজন বান্ধবী মিলে খাট জুড়ে বেশ কিছু চমৎকার শাড়ি বিছিয়ে রেখেছে। হঠাৎ ঘরে এত শাড়ির মেলা দেখে রুহি অবাক হয়ে রুবিকে জিজ্ঞেস করল, “কী রে আপু, এত শাড়ি দিয়ে তোমরা কী করবে?”

​রুবি আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের চুল বাঁধতে বাঁধতে বলল, “আজ রাতে বাইরে যে বারবিকিউ আর ক্যাম্প ফায়ার পার্টি হবে, সেখানে আমরা সব মেয়েরা ঠিক করেছি শাড়ি পরব। সেন্টমার্টিনের চাঁদের আলোয় শাড়ি পরে ছবি তোলার মজাই আলাদা!”

তখনই ​রুবির এক বান্ধবী পাশ থেকে রসিকতা করে বলল, “হ্যাঁ রুহি, তুমিও জলদি একটা শাড়ি পছন্দ করে পরে নাও। রাতে কিন্তু হেব্বি আড্ডা হবে!”

​কথাটা শুনেই রুহির মুখটা কালো হয়ে গেল। সে কটমট চোখে দুই বোনের দিকে তাকিয়ে ক্ষোভের সুরে বলল, “তোমরা কি আমাকে একবারও বলেছিলি যে এখানে এসে শাড়ি পরার কোনো প্ল্যান আছে? আমি তো একটা শাড়িও সাথে করে আনিনি! এখন আমি কী করব?”

​রুহির কথা শুনে রুবি আর রিমু একে অপরের দিকে তাকাল। সত্যিই তো! তারা এখানে আশার তাড়াহুড়োয় রুহিকে এই শাড়ি পরার থিমের কথাটা জানাতে বেমালুম ভুলে গিয়েছিল। তাই এবার রুবি অপরাধী মুখে এগিয়ে এসে রুহির হাত ধরে বলল, “ইশ রে রুহি! সত্যি সরি রে বোন। মাথা থেকে একদম বেরিয়ে গিয়েছিল তোকে বলার কথা।”

রুবির কথা শুনে ​রুহি এবার অভিমানী গলায় বলল, “তাহলে আমি কি ওই পার্টিতে যাব না? রুমে বসে থাকব?”

​ঠিক তখনই পেছন থেকে রিমু চট করে বলে উঠল, “ধুর পাগলি! রুমে কেন বসবি? ছোট মা তো তোর জন্য ব্লু স্কার্ট সেটটা এনেছিলো। ওটাই পর, ওটাতে তোকে অনেক সুন্দর লাগবে।”

এবার ​রিমুর কথায় রুহি কিছুটা শান্ত হয়ে নিজের ট্রাভেল ব্যাগের কাছে এগিয়ে গেল। স্কার্ট সেটটা বের করার জন্য সে যখন ব্যাগের চেইনটা খুলল, ঠিক তখনই তার নজর পড়ল ব্যাগের এককোণে থাকা সেই রিবন বাঁধা ধবধবে সাদা লাক্সারি বক্সটার ওপর। বক্সটা দেখামাত্রই রুহির মনে পড়ল—আরে! কাসাফাদ্দৌজা আশিক নামধারী শাহাজের দেওয়া বার্থডে গিফটের বক্সটি খোলার কথা তো সে ঝামেলার চক্করে বেমালুম ভুলেই গিয়েছিল!

রুহি চটপট ব্যাগ থেকে বক্সটি বের করে খাটের ওপর রাখল। রুহির হাতে সাদা বক্স দেখেই রিমু কৌতুহলী হয়ে এগিয়ে এসে জিজ্ঞেস করল, “তোর হাতে ওটা কী রে রুহি?”

রুহি আমতা আমতা করে বলল, “এটা... এটা একটা গিফট।”

তখন রুবিও পাশ থেকে এগিয়ে এসে চোখ সরু করে জিজ্ঞেস করল, “কে দিয়েছে এই গিফট? কই তখন তো সবাই আমাদের সামনেই তোকে গিফট দিলো এটা তো দেখি নি?”

​রুহি প্রথমে ভুলবশত আসল পরিচয় অর্থাৎ ‘কাসাফাদ্দৌজা আশিক’ নামটা মুখ দিয়ে বের করতে গিয়েও অল্প উচ্চারণ করেই থমকে গেল। এর পরেই নিজেকে সামলে নিয়ে সে বলল, “আরে... শাহাজ ভাই দিয়েছিল। ঢাকা থেকে রওনা হওয়ার আগে বার্থডে গিফট হিসেবে দিয়েছিল, বলেছিল সেন্টমার্টিন এসে খুলতে।”

​শাহাজ ভাইয়ের দেওয়া গিফটের কথা শুনে এবার রুবি, রিমু আর তাদের বান্ধবীরা হাতের শাড়িগুলো খাটের ওপর রেখে এক লাফে রুহির পাশে এসে দাঁড়াল। গম্ভীর শাহাজ ভাই রুহিকে কী গিফট দিয়েছেন, তা দেখার জন্য সবার কৌতূহল তখন তুঙ্গে! রিমু তাড়া দিয়ে বলে উঠল, “কী দেখছিস হাঁ করে? খোল না বনু! দেখি ভেতরে কী আছে!”

​রুহি ধকধক করতে থাকা বুক নিয়ে আস্তে আস্তে বক্সের ফিতেটা খুলল। ঢাকনাটা সরাতেই ঘরের ভেতরের সবার চোখ যেন ধাঁধিয়ে গেল! বক্সের ভেতরে মখমলের কাপড়ের ওপর খুব সুন্দর করে ভাঁজ করে রাখা একটি ডার্ক মেরুন কালারের খাটি সিল্কের শাড়ি। তার সাথে ম্যাচিং করা এক ডজন কাঁচের চুড়ি, চমৎকার ঝুমকো দুল আর একটা ছোট্ট মেরুন কালারের প্যান্ডেন্ট যুক্ত সরু চেইন।

​পুরো সেটটা এতটাই আভিজাত্যপূর্ণ যে রুবি শাড়িটি হাতে তুলে নিয়ে কালারের প্রশংসায় মেতে উঠল, “ও মাই গড রুহি! শাড়ির কালারটা জাস্ট জোস! ভাইয়ার চয়েস এত ক্লাসি, ভাবাই যায় না!”

এদিকে রিমুও চোখ বড় বড় করে বলে উঠলো, “এই ডার্ক মেরুন কালার সচরাচর শাড়িতে পাওয়াই যায় না। ভাইয়া এটা কোত্থেকে ম্যানেজ করল! তার ওপর এতো সুন্দর সিল্ক শাড়ি।”

​এদিকে রুহি তখন বিস্ময়ের চরম শিখরে দাঁড়িয়ে! কারণ এই ডার্ক মেরুন বা ওয়াইন কালারটি তার ভীষণ প্রিয়। তার ওয়ার্ড্রোবে এই কালারের একটা গাউন আছে, যা সে খুব পছন্দ করে। কিন্তু শাহাজ ভাই কীভাবে জানলো যে এই কালারটাই রুহির সবচেয়ে দুর্বলতার জায়গা?

​রিমু রুহির পিঠে একটা মৃদু ধাক্কা দিয়ে হেসে বলল, “কীরে, এতক্ষণ শাড়ি নেই বলে কান্না করছিলি না? এই দেখ, তোর জন্য শাড়ি ম্যানেজ হয়ে গেছে। এখন এটাই পরবি তুই।”

রিমুর কথাতে রুহি এবার কিছুটা ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে বলল, “কিন্তু আমি কি শাড়ি পরতে পারি নাকি? কুচি ধরতেই তো পারি না!”

​ঠিক তখনই দরজার ওপাশ থেকে এক রাশভারী অথচ মিষ্টি কণ্ঠস্বর ভেসে এল, “তুমি পারো না তো কী হয়েছে? আমি পরিয়ে দেব।”

​কথাটা শুনেই ঘরের সবাই দরজার দিকে তাকাতেই দেখল—সেখানে হাসিমুখে দাঁড়িয়ে আছেন ছোট মা রুপাঞ্জলি।

​রুহি খুশিতে গদগদ হয়ে বলল, “তুমি সত্যি আমাকে শাড়ি পরিয়ে দেবে ছোট মা?”

রুপাঞ্জলি হেসে ঘরে প্রবেশ করে রুহির গাল টেনে দিয়ে বললেন, “কেন দেব না ? আমার মা মণি আজ শাড়ি পরবে, আর আমি তা গুছিয়ে দেব না, তা কি হয়?”

রুপাঞ্জলির এমন কথা শুনে ​এবার রুবি আর রিমু আর ওদের বান্ধবীরাও রুপাঞ্জলিকে ঘিরে ধরল তাদেরও শাড়ি কুঁচি করে পরিয়ে দেওয়ার জন্য। রুপাঞ্জলি প্রথমে রুহিকে খুব যত্ন করে, নিখুঁত কুচি দিয়ে শাড়িটি পরিয়ে দিলেন। মেরুন সিল্কের শাড়িটি রুহিকে পড়ানোর পর একে একে বাকি মেয়েদেরও তিনি শাড়ি পরতে সাহায্য করলেন। একসময় সব মেয়েরা রেডি হওয়ার পর সবাই মিলে রুপাঞ্জলিকেও অনুরোধ করল শাড়ি পরার জন্য। সবার আবদারে বাধ্য হয়ে তিনিও নিজের রুমের দিকে চলে গেলেন রেডি হতে।

​ছোট মা শাড়ি পরিয়ে দেওয়ার পর রুহি আয়নার সামনে বসল। চোখে হালকা কাজল, ঠোঁটে শাড়ির সাথে ম্যাচিং করা মেরুন লিপস্টিক আর কপালে একটা ছোট্ট টিপ পরে সে নিজেকে সাজিয়ে নিল। দুহাতে কাঁচের চুড়িগুলো পরতেই রিনিঝিনি শব্দে যেন পুরো রুম মুখরিত হয়ে উঠল। আয়নায় নিজেকে দেখে রুহির নিজেরই বিশ্বাস হচ্ছিল না—ঠিক যেন এক অপ্সরী!

​একসময় সবাই মিলে রুম থেকে বেরিয়ে বারবিকিউ পার্টির দিকে চলল। কিন্তু বাইরে এসেও রুহির চোখ দুটো অনবরত কেবল শাহাজকেই খুঁজে গেলো। বেশ অনেকক্ষণ সে এদিক-সেদিক ঘোরাঘুরি করল। কাব্যদের বারবিকিউর ধোঁয়া ওঠা সুবাস, বন্ধুদের হাসাহাসি, গিটারের সুরে গান-বাজনা আর আনন্দের উল্লাস—সবকিছুই তার ভালো লাগছিল, কিন্তু তাও তার মনটা এক অদ্ভুত শূন্যতায় ভুগছিল। কারণ যার দেওয়া শাড়ি পরে সে আজ এত রূপবতী সেজেছে, সেই মানুষটাই এই উৎসবের আমেজ থেকে গায়েব!

​মন খারাপ করে রুহি একপর্যায়ে ওই কোলাহলপূর্ণ রিসোর্ট পেরিয়ে কিছুটা দূরে নির্জন সমুদ্রের তীরের দিকে চলে গেল। সমুদ্রের মৃদু জলের শব্দে সে একা দাঁড়িয়ে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। ঠিক তখনই হঠাৎ সে অনুভব করল, তার ঠিক পেছনে কেউ একজন এসে দাঁড়িয়েছে। বাতাসে চেনা পারফিউমের সুবাস পেতেই রুহির বুকটা কেঁপে উঠল। সে ঝট করে পেছনে ঘুরতেই দেখল—ধবধবে সাদা ক্যাজুয়াল শার্টের হাতা গোটানো অবস্থায় দাঁড়িয়ে আছেন শাহাজ! তার চোখে গভীর যেন এক মুগ্ধতা।

এদিকে ​রুহি অভিমানী গলায় তড়িঘড়ি করে বলে উঠল, “কোথায় ছিলেন আপনি এতক্ষণ? আমি সারা রিসোর্টে আপনাকে খুঁজে হয়রান, কোথাও পাচ্ছিলাম না, কোথায় ছিলেন এতোক্ষণ!”

রুহি বললো আর ​শাহাজও শুনলো কিন্তু সে রুহির কথার কোনো উত্তর দিল না। বরং নিস্পৃহ অথচ গভীর দৃষ্টিতে আপাদমস্তক রুহিকে দেখছিল। মেরুন সিল্কের শাড়িতে রুহিকে আজ এতটাই মোহনীয় লাগছিল যে শাহাজের মতো পাথরের মনও যেন গলে জল হয়ে যাচ্ছিল। এরপরেই সে গলা ঝেড়ে শান্ত স্বরে জিজ্ঞেস করল, “শাড়ি কে পরিয়েছে তোকে?”

রুহি ঠোঁট ফুলিয়ে বলল, “ছোট মা পরিয়ে দিয়েছে।”

“তুই নিজে পরতে পারিস না?” শাহাজের পাল্টা প্রশ্ন।

“উঁহু, পারি না। শাড়ির কুচি তুলতে পারি না আমি।” রুহি মাথা নিচু করে বলল।

শাহাজ রুহির দিকে এক কদম এগিয়ে এসে নিচু স্বরে জিজ্ঞেস করল, “শাড়ি পছন্দ হয়েছে?”

রুহি এবার শাহাজের চোখের দিকে তাকিয়ে এক গাল হেসে বলল, “খুবববব্ পছন্দ হয়েছে! থ্যাংক ইউ শাহাজ ভাই!”

​অতঃপর রুহি এবার নিজের লজ্জা আর জড়তা ঝেড়ে একটু ন্যাকামি মেশানো স্বরে প্রশ্ন করল, “আচ্ছা... আমাকে কেমন লাগছে শাহাজ ভাই?”

​রুহির এমন সরাসরি প্রশ্নে শাহাজ ওর চোখের দিকে চেয়ে রইল। অতঃপর একদম কাছে এসে কপাল থেকে টিপটা নিয়ে তারপর খুব নিচু, মাদকতাভরা কণ্ঠে বলল, “অসাধারণ লাগছে... ঠিক যেন একটা মায়াবী রূপকথা।”

​শাহাজের মুখে এমন সরাসরি প্রশংসা শুনে রুহির লজ্জা রাঙা মুখটা যেন আরও লাল হয়ে উঠল। সে লজ্জায় চোখ নামিয়ে নখ দিয়ে শাড়ির আঁচল খুঁটতে লাগল। তার এই লাজুক রূপ দেখে শাহাজের ঠোঁটের কোণে মৃদু হাসি ফুটে উঠল, "আর কখনো টিপ পড়বি না, আমার পছন্দ না।"

রুহি শাহাজের কথা শুনে বলে উঠে, "মেঝ মা বলে কালো টিপ পড়লে নজর লাগে না তাই আমি....।"

অতঃপর শাহাজ রুহির দিকে সোজা হয়ে দাড়ালো, এরপরেই রুহির চোখের নিচে আঙ্গুল দিয়ে হালকা কাজল নিয়ে তার কানের পিছনে দিয়ে বললো, "আর নজর লাগবেনা, আর যদি কারো নজর ভুল করেও পড়ে তার চোখই আমি তুলে নি। "

রুহি শাহাজের এমন কথাতে হা হয়ে তার দিকে তাকিয়ে রইলো। হঠাৎ শাহাজ এরপরেই হাত বাড়িয়ে রুহিকে উদ্দেশ্য করে বলল, “চল, আমার সাথে একটু হাঁটবি?”

​রুহিও কোনো দ্বিধা বা প্রশ্ন না করে এক নিমেষে শাহাজের সাথে হাঁটতে শুরু করে দিল। দুপুরের সেই রাগ, উত্তর না পাওয়ার ক্ষোভ—সবকিছু যেন এই একটি মানুষের সান্নিধ্যে এসে মাথা থেকে এক পলকে ধুয়ে-মুছে সাফ হয়ে গেল।

এদিকে ​হাঁটতে হাঁটতে শাহাজ রুহিকে নিয়ে রিসোর্টের পেছনের দিকের একটা একদম নির্জন কোণায় এসে দাঁড়াল। জায়গাটাতে আসতেই রুহির চোখ দুটো বিস্ময়ে বড় বড় হয়ে গেল। পুরো জায়গাটা খুব সুন্দর ও নান্দনিকভাবে ডেকোরেশন করা হয়েছে। বালুর ওপর ছোট ছোট কাঠের খুঁটি দিয়ে কৃত্রিম আলোর টুনি লাইটের আলোকসজ্জা করা হয়েছে, যা মৃদু আলো-আঁধারির এক রোমান্টিক আবহ তৈরি করেছে।

​একপাশে কৃত্রিম আলোর এই রোশনাই, আর অন্যপাশে আকাশের পূর্ণ চাঁদের স্নিগ্ধ রুপালি আলো সরাসরি এসে আছড়ে পড়ছে সমুদ্রের কালো জলের বুকে। এদিকে সাগরের গম্ভীর গর্জন আর লোনা বাতাসের হালকা ঝাপটা এসে রুহির শাড়ির আঁচল উড়িয়ে নিয়ে যাচ্ছে। সব মিলিয়ে পুরো পরিবেশটা এতটাই মোহনীয়, অপার্থিব আর রোমান্টিক রূপ ধারণ করেছে যে রুহির মনে হলো সে কোনো স্বপ্নের রাজ্যে দাঁড়িয়ে আছে।

★★★

সেন্টমার্টিন দ্বীপের নিস্তব্ধ সৈকতে আছড়ে পড়ছে শীতের রাতের উত্তাল ঢেউ। সাজানো সেই নির্জন কর্নারটির কৃত্রিম আলো ছাপিয়ে আকাশের জ্যোৎস্নার আলো নোনাজলের বুকে প্রতিফলিত হয়ে এক মায়াবী রূপ ধারণ করেছে। বাতাসের হিমেল পরশ আর সমুদ্রের গর্জনে চারদিকে এক অদ্ভুত গম্ভীর অথচ সুন্দর পরিবেশ সৃষ্টি, আর সেই সমুদ্রতীরের ভেজা বালুকাবেলায় ধীর পায়ে হেঁটে চলেছে শাহাজ ও রুহি। আঁচলটা অবাধ্য ভাবে বাতাসের তোড়ে উড়ছে, তাই নিজের পড়নের মেরুন শাড়ির আঁচলটা রুহি এক হাতে চেপে ধরে রাখার আপ্রান চেষ্টা করে চলেছে।

​রুহির মুগ্ধ চোখ জোড়া তখন নিবদ্ধ সমুদ্রের ওই উত্তাল তরঙ্গমালার ওপর। প্রকৃতির এই বিশালতা, রূপালী চাঁদের আলো আর সাগরের গর্জন যেন তাকে পুরোপুরি গ্রাস করে নিয়েছে। অথচ শাহাজের পৃথিবীটা তখন অনেক ছোট হয়ে এসেছে। তার মুগ্ধ চোখের সমস্তটা জুড়ে কেবল রুহি। ডার্ক মেরুন শাড়িতে ভোরের সেই চঞ্চলা মেয়েটা এখন যেন এক স্নিগ্ধ মায়াবিনী। সমুদ্রের এই আদিগন্ত সৌন্দর্যও যেন শাহাজের কাছে ফিকে হয়ে গেছে রুহির এই রূপের কাছে। শাহাজের বুকের ভেতর তখন এক প্রবল অনুভূতির ঝড় বইছে, যা সামনের ওই সমুদ্রের ঢেউয়ের চেয়েও হাজার গুণ তীব্র।

​হাঁটতে হাঁটতেই হঠাৎ শাহাজ রুহির খুব কাছাকাছি এসে আলতো স্বরে জিজ্ঞেস করল, “শীত করছে?”

​রুহি এতক্ষণ যেন এক অপার্থিব ঘোরের মধ্যে ডুবে ছিল। কিন্তু শাহাজের চেনা কণ্ঠের সুধা কানে পৌঁছানো মাত্রই সে চট করে মাথা নেড়ে বলল, “উঁহু! শীত করছে না। বরং এমন সৌন্দর্যের মাঝে আপনার সাথে হাঁটতে ভালোই লাগছে!”

​বলতে বলতেই রুহি তার পার্স থেকে মোবাইলটা বের করে শাহাজের দিকে বাড়িয়ে দিল। চোখে একরাশ চপল আবদার ফুটিয়ে বলে উঠল, “শাহাজ ভাই, আমি একটু পানির কিনারে গিয়ে হাঁটি? আপনি প্লিজ আপনার এই সুন্দর চয়েসের শাড়ি পরা আমার একটা ভিডিও করে দেবেন?”

​শাহাজ কোনো কথা বলল না। শুধু শান্ত চোখে রুহির দিকে তাকিয়ে হাত বাড়িয়ে মোবাইলটা নিল। রুহি একরাশ আনন্দ আর উচ্ছ্বাস নিয়ে পা ভেজাতে এগিয়ে গেল সমুদ্রের নোনাজলে। তীরে আছড়ে পড়া ফেনিল ঢেউগুলো যখন রুহির পা ছুঁয়ে যাচ্ছিল, শাহাজ তখন ক্যামেরার লেন্স দিয়ে নয়, বরং নিজের হৃদয়ের মণিকোঠায় সেই দৃশ্যগুলো আজীবনের জন্য বন্দি করে রাখছিল। মেরুন শাড়ির কুচি বাঁচিয়ে রুহির এই প্রতিটি চঞ্চলতা শাহাজের বুকে তখন যেন প্রেমের হিল্লোল তুলছিল।

​খানিকটা সময় পর পানির ভেতর থেকেই রুহি দুই হাত মেলে ধরে পরম উচ্ছ্বাস নিয়ে বলে উঠল, “শাহাজ ভাই, চলেন একটু দৌড়াই!”

​বলেই সে পানির মধ্য থেকে ছুটে এসে শাহাজের হাত ধরে এক প্রকার জোর করেই বালুচরের ওপর দৌড়াতে শুরু করল। শাহাজ হঠাৎ এই টাল সামলে রুহির সাথে তাল মিলিয়ে ছুটল। বেশ কিছুটা পথ দৌড়ানোর পর রুহি হঠাত শাহাজের হাত ছেড়ে দিল। নিজের গতি বাড়িয়ে দিয়ে খানিকটা দূরত্ব বজায় রেখে পেছনের দিকে তাকিয়ে চিল্লিয়ে বলল, “আমাকে ধরে দেখান দেখি শাহাজ ভাই!”

​শুরু হলো এক প্রাণবন্ত, মায়াবী লুকোচুরি। রুহি শাড়ি সামলে আগে আগে দৌড়াচ্ছে, আর তার পেছনে দীর্ঘ কদমে এগিয়ে চলেছে শাহাজ। দৌড়াতে দৌড়াতে একপর্যায়ে রুহির চুলের বাঁধন আলগা হয়ে একদম খুলে গেল। বাতাসের তীব্র ঝাপটায় সেই মুক্ত কালো কেশরাশি উড়তে লাগল রুহির মুখ আর কাঁধ জুড়ে। সেই সাথে তার খিলখিল হাসির শব্দ যেন সমুদ্রের গর্জনের সাথে মিশে এক অপার্থিব সুর তৈরি করল। রুহিকে দেখে মনে হচ্ছে সে যেন আজ পৃথিবীর সব নিয়ম আর বাধা ভুলে যাওয়া এক মুক্ত পাখি, যার আনন্দ ধরে রাখার মতো কোনো পাত্র এই মুহূর্তে এই দ্বীপে নেই।

এদিকে ​শাহাজ বারবার তাকে থামানোর চেষ্টা করে গম্ভীর কণ্ঠে বলছে, “রুহি, থাম! শাড়িতে প্যাঁচ খেয়ে পড়ে যাবি তো। হাঁপিয়ে যাবি তুই, থাম বলছি।” কিন্তু রুহি যেন আজ কোনো নিয়ম শোনার পাত্রীই নয়। সে নিজের আনন্দের রাজ্যে হারিয়ে গিয়ে আপন মনে দৌড়েই চলেছে।

​রুহির এমন বাঁধভাঙা খুশি দেখে হঠাৎ শাহাজ বালুর ওপর স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে পড়ল। তার বুকের ভেতর জমে থাকা দীর্ঘদিনের, দীর্ঘ বছরের অব্যক্ত আবেগ আর ভালোবাসাগুলো যেন আজ মাঝরাতের এই জোয়ারের মতো বাঁধ ভেঙে বেরিয়ে আসতে চাইল। সে আর পারল না নিজের ভেতরের পুরুষটাকে আটকে রাখতে। এবার সে তার সমস্ত সত্তা, সমস্ত ভালোবাসা উজাড় করে মাঝসমুদ্রে চিৎকার করে বলে উঠল, “রুহি! আমার অর্ধজীবনের পূর্ণতা হবি?”

​শাহাজের সেই বজ্র গম্ভীর অথচ আকুল কণ্ঠস্বরে রুহি আচমকা থমকে দাঁড়াল।

শাহাজের কণ্ঠের এমন তীব্রতা আর কথাটার গভীরতা তাকে ভেতর থেকে কাঁপিয়ে দিল। সে কিছুটা অবাক এবং স্তব্ধ হয়ে ধীরপায়ে পেছন ফিরল।

​রুহি পেছন ফিরতেই শাহাজ আর দাঁড়িয়ে রইল না। সে নিজের পকেট থেকে হাত দুটো বের করে এক কদম, এক কদম করে রুহির দিকে এগিয়ে আসতে লাগল। তার দুই চোখে তখন জলজ্বলে আকুতি, গভীর প্রেম আর এক তীব্র অধিকারবোধের ছোঁয়া।

একসময় শাহাজ রুহির সামনে এসে থামলো,​রুহির চোখের দিকে সোজা তাকিয়ে শাহাজ আবার বলে উঠল, “আমার ব্যক্তিগত সম্পত্তি হবি রুহি? যে সম্পত্তিতে এই শাহজাদা মোস্তাফা ছাড়া অন্য কারো একবিন্দু অধিকার থাকবে না!”

​রুহিএকদম শান্ত হয়ে স্তব্ধ দাঁড়িয়ে রইল। তার ঠোঁটের কোণের চঞ্চল হাসি উধাও হয়ে সেখানে যেন এক পিনপতন নীরবতা নেমে এল।কিন্তু শাহাজ থামল না, তার কণ্ঠস্বর আরও গভীর, ভারী ও আবেগঘন হয়ে উঠল। যেন বহুদিনের জমানো কথাগুলো বুক চিরে বলার এই একমাত্র আর শেষ সুযোগ— “আমার হৃদয়ের রানী, আমার চঞ্চলা, আমার ভালোবাসা.... মিসেস শাহজাদা মোস্তাফা হবি? সব মিলিয়ে আমার এই ছোট্ট জীবনের বেঁচে থাকার একমাত্র কারণ... এই শাহজাদা মোস্তাফার বউ হবি?”

​সেন্টমার্টিনের সেই নিঝুম রাতে ফুঁসে ওঠা সমুদ্রের ঢেউগুলো যেন সাক্ষী হয়ে রইল এক চিরন্তন, পবিত্র প্রেমের আবেদনের।অন্যদিকে রুহির চিরকালের চঞ্চলতা তখন এক পরম স্থিরতায় রূপ নিয়েছে, আর শাহাজের চোখে তখন উত্তাল বঙ্গোপসাগরের চেয়েও গভীর ভালোবাসার তীব্র তরঙ্গমালা।

চলবে.......

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ৮৩তম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন