#চলমান
পাঠ : 4
উপন্যাস : টালমাটাল মনটা , শুধু তোমায় পেতে চায়
লেখিকা : ঐশী বিশ্বাস
ইসরাত কালো রঙের একটা বোরকা পরে তুর্য'র সামনে এসে দাঁড়ায় । নিকাব দিয়ে মুখটা ঢাকা , শুধু দু’টি চোখই দেখা যাচ্ছে কান্না করার কারণে চোখ দুটো লাল হয়ে উঠেছে ।
ইসরাতের এমনিতেই একটু কান্না করলেই চোখ লাল হয়ে যায় আর যদি বেশি কাঁদে তাহলে সেই চোখের দিকে তাকানোই কঠিন হয়ে পড়ে।
ইসরাত ধীরে বলে_
কেমন লাগছে ?
তুর্য এক নজর তাকিয়ে সংক্ষিপ্ত উত্তর দেয়_
ভালো…
তুর্য'র এই ছোট্ট শব্দটুকুতেই ইসরাতের মনে অদ্ভুত এক আনন্দ ছড়িয়ে পড়ে , তুর্য আজ পুরো কালো পোশাকে কালো শার্ট , কালো প্যান্ট ডান হাতে একটি স্মার্টওয়াচ তার গম্ভীর চেহারার সাথে এই সাজটা যেন আরও বেশি মানিয়ে গেছে ।
তুর্য ইসরাতের দিকে তাকিয়ে বলে_
তোর কী আর কোনো বোরকা নেই ? এটা একটু নোংরা লাগছে ।
ইসরাত অবাক হয়ে নিজের বোরকাটার দিকে ভালো করে তাকায় তার মা কয়েক দিন আগে ধুয়ে দিয়েছিলেন । পুরোনো হওয়ায় রংটা একটু ফিকে হয়ে গেছে তাই হয়তো এমন লাগছে।
অবশ্য তুর্য'র কাছে সবকিছুই নোংরা লাগে এটা আর নতুন কিছু না এখন যদি সে একদম নতুন ঝকঝকে বোরকা পড়েও আসে তবুও তুর্য'র কাছে সেটা নোংরাই লাগবে।
তাই আর বেশি কথা না বাড়িয়ে ইসরাত ছোট করে বলে_
না… আমি বেশি বোরকা পড়ি না তাই কেনা হয়ে ওঠে না।
তুর্য কিছু বলে না হাঁটা ধরে ইসরাতও তার পিছন পিছন যায়।
রাস্তায় এসে তুর্য একটা রিকশা ডাকতে গেলে ইসরাত তাড়াতাড়ি বলে_
তুর্য ভাই রিকশা ডাকতে হবে না চলেন আজ হেঁটেই যাই।
তুর্য বিরক্ত হয়ে বলে_
এখন হেঁটে যাবি পরে বলবি পায়ে ব্যথা করছে।
ইসরাত ঠোঁট ফুলিয়ে বলে_
বলবো না .
তুর্য কড়া গলায় বলে_
চুপ থাক , না হলে এখানেই ফেলে রেখে চলে যাবো তোকে আর যেতে হবে না।
ইসরাত আর কিছু বলে না চুপচাপ রিকশায় উঠে বসে রিকশায় বসার পরও তুর্য ইসরাতের কাছ থেকে দূরত্ব বজায় রেখে বসে কিন্তু সেটা ইসরাতের একদমই পছন্দ হয় না সে একটু এগিয়ে বসে ফলে দুজনের শরীর লাগালাগি হয়ে যায়।
তুর্য বিরক্ত হয়ে বলে_
কী করছিস ? উপরে উঠে যাবি নাকি ?
ইসরাত বিড়বিড় করে বলে_
কোলেই উঠে বসতে পারলে আরও ভালো হতো
তুর্য ভ্রু কুঁচকে ইসরাতের দিকে তাকায় ইসরাত ও তাকাতেই দুজনের চোখাচোখি হয় , ইসরাত তাড়াতাড়ি বলে_
আরে ওইদিকে জায়গা নেই এর চেয়ে বেশি দূরত্ব বজায় রেখে বসলে আমি পড়ে যাবো।
তুর্য বলে_
পড়ে যা...
ইসরাত ঠোঁট বাঁকিয়ে জবাব দেয়_
আপনি পড়ে যান তারপর আমি আপনার উপর পড়ে যাবো।
তুর্য বিরক্ত হয় কিন্তু কিছু বলে না , তুর্য বড় একটা শপিং মলের সামনে রিকশা থামায় দু’জন রিকশা থেকে নেমে শপিং মলের ভেতরে ঢুকে।
ইসরাত কিছুই বুঝতে পারে না চকলেট কিনতে গেলে এখানে আসার কী দরকার বাইরে কোনো দোকান থেকে কিনলেই তো হতো তুর্য কোনো কথা না বলে সোজা একটা কাপড়ের মলে ঢুকে পড়ে।
তুর্য দোকানের এক ছেলেকে বলে_
বোরকা দেখান হাইট ৫'৪ মিডিয়াম সাইজ।
ইসরাত চোখ বড় বড় করে তাকায়। কার জন্য বোরকা কিনছে ? তার জন্যই নাকি ? তার তো উচ্চতাও ৫'৪ মুখ ফুটে কিছু বলতে পারে না যদিও ভীষণ ইচ্ছা করছে জিজ্ঞেস করতে।
এর মাঝেই তুর্য একটা চেয়ার এগিয়ে দিয়ে বলে_
এখানে বস
ইসরাত চুপচাপ বসে তুর্য ও পাশের আরেকটা চেয়ারে বসে দোকানের ছেলেটা একের পর এক বোরকা বের করে দেখাতে থাকে। তুর্য খুব মন দিয়ে সবগুলো দেখে যেগুলো পছন্দ হয় সেগুলো আলাদা করে রাখে । এভাবে প্রায় দশটা বোরকা আলাদা করে রাখে । প্রতিটাই যেন চোখ ধাঁধানো সুন্দর।
তারপর তুর্য তার পছন্দ করা বোরকা গুলো হাতে নিয়ে গম্ভীর সুরে বলে_
একেকটা ডিজাইনের দশটা করে দিন কালো কালার টা মাস্ট বি যেনো থাকে ।
দোকানদার আর ইসরাত দু’জনই অবাক হয়ে তুর্যের দিকে তাকিয়ে থাকে তুর্য আবার বলে_
সব বোরকার সাথে ম্যাচিং করে হিজাবের ওড়নাও দিবেন।
দোকানদার চোখ বড় বড় করে বলে_
ভাইয়া আপনি কি পোশাক বিতরণের অনুষ্ঠান করবেন ?
তুর্য গম্ভীর সুরে বলে_
না…
তার গলার স্বর শুনে দোকানদার আর কিছু জিজ্ঞেস করে না । নিজের কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়ে।
এরপর তুর্য পেমেন্ট কাউন্টারে গিয়ে সবকিছুর দাম পরিশোধ করে বলে_
আমি একটু পরে এসে নিয়ে যাবো সব ঠিক করে রেডি করে রাখবেন।
ইসরাত কিছুই বুঝতে পারে না এতগুলো বোরকা আর ওড়না দিয়ে তুর্য কী করবে , শপিং মল থেকে বের হয়ে তুর্য একটা কসমেটিক্সের দোকানে ঢোকে। সেখান থেকে ভালো ব্র্যান্ডের মেহেদী কিনে এক - দুইটা নয় , পুরো একটা বাক্স।
তারপর ইসরাতের দিকে তাকিয়ে গম্ভীর সুরে বলে_
তোর হাতে যেন আমি সব সময় মেহেদী দেখি না হলে হাত ভেঙে রেখে দিব ।
ইসরাত অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করে_
এগুলো আমার জন্য ?
তুর্য কোনো উত্তর দেয় না , তুর্য আবার আরেকটা দোকানে ঢোকে এটা একটা জুয়েলার্স শপ ভেতরে ঢুকেই সে দোকানদারকে বলে_
যে নূপুর পড়লে শব্দ হয় না , সেগুলো দেখান।
দোকানদার কয়েকটা নূপুর বের করে দেয় তুর্য মন দিয়ে এক এক করে সবগুলো দেখে তারপর একটা নূপুর পছন্দ করে হাতে নেয়।
হঠাৎই সে ইসরাতের সামনে হাঁটু গেড়ে বসে পড়ে
ইসরাত হতভম্ব হয়ে যায় এ কী করছে এই লোক দোকানদারও বিস্মিত চোখে তাদের দিকে তাকিয়ে আছে।
তুর্য কর্কশ কণ্ঠে বলে_
পা দে
ইসরাত স্তব্ধ হয়ে যায় কিন্তু তুর্যের সেই গম্ভীর স্বরের সামনে হার মানে ধীরে ধীরে নিজের পা এগিয়ে দেয়।
তুর্য ইসরাতের বাম পা নিজের হাঁটুর ওপর তুলে নিয়ে খুব যত্ন করে নূপুরটা পরিয়ে দেয় তারপর একইভাবে ডান পায়েও পরিয়ে দেয়।
ইসরাত যেন নিজের ভাষা হারিয়ে ফেলেছে তার সাথে ঠিক কী হচ্ছে সে বুঝতেই পারছে না
নুপুর পরিয়ে তুর্য স্বাভাবিক ভঙ্গিতে উঠে দাঁড়ায় যেন কিছুই হয়নি তারপর সে ইসরাতকে নিয়ে বের হয়ে যায় আর অনেক রকমের চকলেট আর আইসক্রিম কিনে দেয়।
ইসরাত আর তুর্য শপিং মলের করিডোর দিয়ে হাঁটছে । তাদের পিছনে কয়েকজন ছেলে হাতে অনেকগুলো শপিং ব্যাগ । আসলে তুর্য যা যা কিনেছে সবই ওই ব্যাগগুলোতে ভরা।
হঠাৎ তাদের সামনে এসে দাঁড়ায় একটা ছেলে আর একটা মেয়ে , মেয়েটাকে দেখে বেশ মডার্ন লাগে শার্ট আর প্যান্ট পরা , মাঝারি লম্বা চুল খোলা , গায়ের রং শ্যামলা মুখে স্পষ্ট বিরক্তির ছাপ।
ছেলেটা ফর্সা , চোখে চশমা , মুখে সবসময় হাসির আভা হঠাৎই সে এসে তুর্যকে জড়িয়ে ধরে কিন্তু তুর্যের মধ্যে কোনো প্রতিক্রিয়া নেই ছেলেটা হাসতে হাসতেই বলে_
এখানে কী ভাই এত রাতে ?
তুর্য বিরক্ত গলায় বলে_
তোরা কী করতে এসেছিস ?
ছেলেটা হেসে উত্তর দেয়_
কয়েকদিন পর সোহাগের বিয়ে তো , তাই আমি আর অবন্তিকা শপিং করতে এসেছি তোকে বলেছিলাম তুই বললি তোর কাজ আছে।
তুর্য ছোট করে বলে
ও
অবন্তিকা বিরক্ত মুখে ইসরাতের দিকে তাকিয়ে বলে_
তুর্য এই মেয়ে কে ?
তুর্য শান্ত গলায় বলে_
আমার চাচাতো বোন মাহাদিবা খান ইসরাত।
অবন্তিকা এবার বিরক্তির চূড়ান্তে গিয়ে বলে_
এত রাতে চাচাতো বোনকে নিয়ে এখানে কী ?
তুর্যের চোখ - মুখ শক্ত হয়ে যায় সে ঠান্ডা কন্ঠে বলে_
এটা আমার ব্যাপার । তোকে কেন বলব ? ফ্রেন্ড ফ্রেন্ডের মতো থাক আমার বিষয়ে এত নাক গলানোর দরকার নেই , না হলে দেখবি কোনো দিন তোর নাকটাই উধাও হয়ে গেছে।
তুর্যের কথা শুনে ইসরাত হেসে ফেলে শব্দ করে
তুর্য যে এমন মজার কথা বলতে পারে সেটা তার কল্পনারও বাইরে ছিল।
ইসরাতের হাসি শুনে সবাই তার দিকে তাকায়
অবন্তিকা'র চোখে যেন আগুন মনে হচ্ছে গিলে খাবে।
ওদের দৃষ্টি দেখে ইসরাত চুপসে যায় , ধীরে তুর্যের দিকে তাকায় দেখে তুর্য তীক্ষ্ণ চোখে তার দিকেই তাকিয়ে আছে ইসরাত তাড়াতাড়ি চোখ নামিয়ে নেয়।
তুর্য এবার স্বাভাবিক ভঙ্গিতে ছেলেটার দিকে তাকিয়ে বলে_
পরাগ কাল সকালে রেডি থাকিস বড় একটা ক্রিমিনাল ধরতে হবে।
এই বলে সে ইসরাতের ডান হাত ধরে হাঁটা শুরু করে পিছন পিছন ছেলেগুলোও শপিং ব্যাগ নিয়ে হাঁটে।
পরাগ তাদের দিকে তাকিয়ে এত শপিং দেখে হেসে বলে_
তুর্য মনে হয় মেয়েটার জন্যই এত শপিং করেছে চাচাতো ভাই হলে তো এমনই হওয়া উচিত
অবন্তিকা বিরক্ত হয়ে বলে_
তুই থাক আমি একাই চলে যাচ্ছি
পরাগ বলে_
Cool cool এতো রেগে যাচ্ছিস কেনো ?
পরাগ , অবন্তিকা আর তুর্য তারা তিনজনই এক টিমে কাজ করে।
তুর্য সব জিনিসপত্র একটা গাড়িতে করে খান বাড়িতে পাঠিয়ে দেয় ইসরাত একটু জেদি গলায় বলে_
তুর্য ভাই আমরা যাবো না
তুর্য স্বাভাবিক কণ্ঠে বলে_
হেঁটে যাবো
তারপর কোনো দিকে না তাকিয়ে রাস্তার কিনারা ধরে হাঁটা শুরু করে ইসরাতও চুপচাপ তার পিছন পিছন হাঁটতে থাকে।
রাতের শহরটা আজ অদ্ভুত সুন্দর লাগছে
হালকা বাতাস , ফাঁকা রাস্তা , দূরের লাইট গুলো ঝাপসা হয়ে জ্বলছে । এই সময়ে খুব একটা গাড়ি চলাচলও করছে না অনেক রাত হয়ে গেছে তাই হয় তো ।
হঠাৎ ইসরাত এগিয়ে এসে তুর্য’র হাতটা ধরে ফেলে।
তুর্য'র হাঁটা থেমে গেলো রাগী চোখে তাকায় তার দিকে , ইসরাত ঠোঁট ফুলিয়ে নরম গলায় বলে_
আমি কী করব আমার ভয় করছে তাই তো আপনার হাত ধরলাম।
তুর্য কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকে তারপর কিছু না বলে আবার হাঁটা শুরু করে কিন্তু এবার হাতটা ছাড়ায় না।
দুজন পাশাপাশি হাঁটছে , ইসরাতের আসলে ভয় করছে না তার সাথে যদি একটা পুলিশ থাকে তাহলে ভয়ের কোনো প্রশ্নই আসে না সে শুধু তুর্য’র হাত ধরার একটা অজুহাত খুঁজছিল।