#সে_ছিল_আমার_কল্পনায়(সিনিয়র-জুনিয়র)
#পর্ব_৩
#লেখিকা_নাবিলা_আহমেদ সেহরিশ
<কেমন আছো, পিচ্চি?>
কাউয়া কাদের আইডি থেকে আজ মেসেজ এসেছে। মোবাইলের স্ক্রিনে সময় দেখল অভ্যুদয়। রাত ১০টা ২০ বাজে।
<এই তো খালাম্মা, ভালো। আপনি?>
< :/ >
<হা হা হা>
<এত বড়োও না যে খালাম্মা ডাকবে :/ >
<আচ্ছা ঠিক আছে, আর খালাম্মা ডাকব না>
<কী করো?>
<ম্যাথ করি। আপনি কী করেন?>
<শুয়ে আছি। এই রাতে ম্যাথ?>
<হুম, কাল পরীক্ষা আছে>
<তুমি কি আসলেই ইন্টারে পড়ো? মানে, তোমার গিটার বাজানো দেখে মনে হলো ভালোই বড় তুমি। ইন্টার-পড়ুয়া বাচ্চা মনে হলো না>
অভ্যুদয় মেসেজটার দিকে একনজর চোখ বুলাল। নিজের হাঁটুর ওপর থাকা ম্যাথের খাতাটা বিছানায় রাখল পরমুহূর্তেই। ক্যামেরা অন করে ছবি তুলল একটা। সঙ্গে সঙ্গে সেন্ড করে দিল তা নওশীনকে।
<এটা যে তোমার পিক, তা কীভাবে বুঝব? :/> কয়েক মিনিট পরেই মেসেজ এল নওশীনের।
<এই সময়ে আমি ম্যাথের খাতাসহ পিক অন্য কোথাও কীভাবে পাব?> প্রশ্ন করল অভ্যুদয়। আগে মনে হয়েছিল মেয়েটা ভালোই চালাক, এখন মনে হচ্ছে বোকা।
<অনলাইন?> হতাশ হলো অভ্যুদয়।
<এটা যে আমি তুলেছি, তা কীভাবে প্রমাণ করব? সেলফি দেব?> মেসেজ পাঠিয়েই মোবাইল রাখল সে। বইখাতা গুছিয়ে রেখে দিল টেবিলের ওপর। রুমের লাইট বন্ধ করে শুয়ে মোবাইল নিতেই লক্ষ করল মেসেজ দিয়েছে নওশীন।
<নিজের ছবি দেবে?> ভ্রু কুঁচকাল অভ্যুদয়। মেসেজটা দেখে এমন মনে হচ্ছে যেন মেয়েটা তা বিশ্বাসই করতে পারছে না।
<না দেওয়ার কী আছে?>
<এই অ্যাপে?>
<হ্যাঁ>
<তুমি একটা বোকা।> একটু হাসল অভ্যুদয়। সে আবার বোকা? বোকা তো মেয়েটা নিজেই।
<আচ্ছা তাই নাকি?>
<হ্যাঁ, তাই।>
<আপনার কেন মনে হলো এই কথা, খালাম্মা?>
<কারণ বাবাজি, তুমি কীভাবে শিয়র হলে আমি মেয়ে? আমি যদি ছেলে হই? তোমার দেওয়া ছবি দিয়ে যদি বলি এই ছেলে বাজে কথা বলে, বাজে মেসেজ দেয়, আমাকে ডিস্টার্ব করে, তাহলে?>
আহাম্মকের মতো হা করে রইল অভ্যুদয়। হুট করেই শোয়া থেকে উঠে বসল। আসলেই তো, এই মেয়েটা যে সত্যি সত্যিই মেয়ে, তা সে কীভাবে বুঝবে? মিথ্যাও তো হতে পারে। আর সত্যি সত্যি যদি তার ছবির কেউ অপব্যবহার করে, তাহলে? যদি তার ভাই বা ভাইয়ের কোনো বন্ধু এই গ্রুপ থেকে তার ছবি পায়, তাহলে? তার মা-বাবা যদি সবটা জেনে যায়, তাহলে?
না, না, এসব আর ভাবতে পারল না অভ্যুদয়। দ্রুত বিছানা থেকে নামল। এই গরমের মধ্যে তার হাত-পা ঠান্ডা হয়ে এসেছে ভয়ে। উত্তর দিল না নওশীনকে।
<চিল, আমি মেয়েই।> নওশীনের মেসেজটা দেখতেই হাঁফ ছাড়ল অভ্যুদয়।
<আমাকে একদম ভয় দেখিয়ে ফেলেছিলে, আপু!>
<আহারে... হা হা হা!>
<হাসবে না।>
<বিষয়টা কিন্তু সিরিয়াস। এমন একটা অ্যাপে তুমি যাকে-তাকে বিশ্বাস করবে? এতটা বোকা তুমি?>
<আমি বোকা না। আমি শুধু সবাইকে বিশ্বাস করি।>
<আহারে, পিচ্চি!>
< :/ > চুপ করে রইল অভ্যুদয়।
<বোবা হয়ে গেলে নাকি?> একটু পরেই মেসেজ এল নওশীনের। শুয়ে থাকা অভ্যুদয় পায়ের ওপর পা তুলে কিছু ভাবতে ব্যস্ত।
<বোবা নয়, তবে একটা জিনিস ভাবছি।>
<কী?>
<বলা যাবে না।>
<ওকে। তাহলে অন্য টপিকে কথা বলি। এখানে কী করছ? বন্ধুবান্ধব নেই তোমার?>
<তুমি এখানে কী করছ? বয়ফ্রেন্ড নেই?> পাল্টা প্রশ্ন করল অভ্যুদয়। পরক্ষণেই জিভে কামড় দিল। এ কোন ধরনের প্রশ্ন করে বসেছে সে? চিপ মার্কা!
<বয়ফ্রেন্ডের ভেজালে যাচ্ছি না। এভাবেই ভালো আছি। আর বেস্টফ্রেন্ডগুলো নিজের সংসার নিয়ে ব্যস্ত। মাঝেমধ্যে কথা হয়, তাই এখানে আসি সময় কাটাতে। এবার তুমি বলো!>
<আমার একটাই ফ্রেন্ড। সেও এই অ্যাপ নিয়ে ব্যস্ত। তাছাড়া তেমন একটা ফ্রি টাইম পাওয়া হয় না, তাই বন্ধুবান্ধবের প্রয়োজন পড়ে না।>
<আর গার্লফ্রেন্ড?> সঙ্গে সঙ্গেই রিপ্লাই এল।
<গার্লফ্রেন্ড নেই।>
<মিথ্যুক! এত সুন্দর গিটার বাজানো ছেলের গার্লফ্রেন্ড নেই? এই কথাও বিশ্বাস করতে হবে?>
অভ্যুদয় মৃদু হাসল। গার্লফ্রেন্ড বানানোর সময় কোথায়? পড়ার চাপে বাথরুমেই তো যেতে পারে না!
<সত্যি বলছি, খালাম্মা।>
<আহা, বিশ্বাস করতে পারলাম না।>
<আরে ভাই, আমার কোনো মেয়ে বন্ধুও নেই, গার্লফ্রেন্ড তো দূরের কথা।>
<লল!>
<ওকে, বিশ্বাস করতে পারছ না তো? ফেসবুকে আমার আইডি দেখো, তাহলেই বুঝবে। তোমার ফেসবুক আইডির নাম বলো, আমি অ্যাড দিচ্ছি।>
অভ্যুদয়ের মেসেজটা সাথে সাথে সিন হলেও রিপ্লাই এল না। ভ্রু কুঁচকাল সে। কয়েকবার চেক করল ইনবক্স। বারবার রিফ্রেশ করলেও নতুন কোনো মেসেজ এল না। ক্ষণিক পরেই দেখা গেল অফলাইন হয়ে গেছে নওশীন।
দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল অভ্যুদয়। টাইম দেখতে মোবাইলে তাকাতেই থমকে গেল। ঘড়িতে ১১টা ৩০ বাজে। এত রাত হয়ে গেল, আর সে টেরই পেল না? কত দিন পর অন্য কারও সাথে কথা বলেছে সে? জানা নেই। তবে মেয়েটাকে সে একটি কথাও মিথ্যে বলেনি। হামিদ ছাড়া তার আসলেই কোনো বন্ধু নেই। ফারজানার কথা আর কী বলবে, মেয়েটা বন্ধু কম আর শত্রু বেশি। প্রতিটা পরীক্ষায় তার সাথে পাল্লা দিয়ে নম্বর আনবে, বিনিময়ে অভ্যুদয়ের মা-বাবা তার জীবনটা হেল বানিয়ে দিচ্ছে।
মোবাইল রাখল বিছানার পাশে। কাল সকালে আবারও ভোরে ভোরে উঠতে হবে ভেবেই যত দ্রুত সম্ভব ঘুমানোর চেষ্টা করল সে।
-------
“রুমি আপু, আমার ঠান্ডা পানি।" বিছানার উপর ব্যাগ রেখেই বিছানায় গা এলিয়ে দেয় অভ্যুদয়। মাত্রই কলেজ থেকে ফিরেছে।
একটু পরেই রুমে প্রবেশ করল রুমি। হাতে একটা ঠান্ডা পানির বোতল।
“এই নেও।”
“থ্যাংকস।” কথাটা বলেই বসে অভ্যুদয়। পানির বোতল নিয়েই ঢকঢক করে পান করে নিল কয়েক মিনিটে। ইদানীং যেই গরমটাই না পড়ছে! মনে হয় সে একাই এক ট্যাংকি পানি গিলে ফেলতে পারবে।
“আস্তে খাও।”
“পানি খায় না, পান করে।” শার্ট দিয়ে মুখ মুছতে মুছতে বোতল এগিয়ে দিল অভ্যুদয়। রুমি হাসল একটু।
“একই কথা। এখন তাড়াতাড়ি গোসল করে খেয়ে নেও। তোমার স্যার আবার চলে আসবে।”
“হুম।” রুমি বোতল নিয়ে বেরিয়ে যেতে যেতে রুমের দরজা চাপিয়ে গেল। ব্যাগ খুলে মোবাইল নিল অভ্যুদয়। নওশীন আদৌ কোনো রিপ্লাই দিয়েছে নাকি, তা দেখতে ইচ্ছা করছে।
অ্যাপটায় লগইন করল সে। সঙ্গে সঙ্গেই নোটিফিকেশন এল নওশীনের মেসেজের। ১৩ ঘণ্টা আগে মেসেজ পাঠিয়েছে নওশীন। বিদ্যুতের গতিতে টাইমটা বের করল সে—প্রায় রাত ৩টার দিকে মেসেজ দিয়েছে। অবাক হলো সময়টা দেখে।
এত রাতেও মেয়েরা অনলাইনে থাকে? তাদের মা-বাবা কি কিছু বলে না? বয়ফ্রেন্ড না থাকলে কার সাথে এত রাত অবধি কথা বলে সে? এসব ভাবতে ভাবতেই ইনবক্সে প্রবেশ করল সে।
<ফেসবুক আইডি দিতে পারব না।>
<কেন? বিশ্বাস করতে পারছ না?> কিছু ভাবার আগেই মেসেজ পাঠিয়ে দিল সে। সে যদি নিজের আইডি দিতে পারে, তাহলে নওশীন কেন পারবে না? নওশীনের কী মনে হয়, সে কি খারাপ ছেলে?
মোবাইল রাখে অভ্যুদয়। গোসল করতে চলে গেল দ্রুত।
ঘড়িতে এখন রাত ১১টা। এখন পর্যন্ত মেসেজ সিন হয়নি অভ্যুদয়ের। কেমন যেন মনে সন্দেহ জাগছে তার, আসলেই কি আইডিটা মেয়ের? দিনে থাকে না, কিন্তু রাত হলে হাজির হয়। অদ্ভুত!
<বিশ্বাসের জন্য না। আমি পরিচয় গোপন রাখতে চাইছি।> একটু পরেই মেসেজ এল নওশীনের।
<ওহ। ঠিক আছে। বাই দ্য ওয়ে, তুমি দিনে থাকো না কেন?>
<ব্যস্ততা অনেক, তাই। তুমি কেন রাতে থাকো না?>
<কারণ খুব সকালে উঠতে হয় আমার। পড়তে হয়। সামনে পরীক্ষা তো, তাই।>
<তো কোন ডিপার্টমেন্টের স্টুডেন্ট তুমি?> জিজ্ঞেস করল অভ্যুদয়।
<সমাজবিজ্ঞান।>
<ভালো।>
<তো তুমি কি সব সময় এখানে আসো?> আবারও প্রশ্ন করল অভ্যুদয়।
<নাহ। মাঝেমধ্যে হতাশ লাগলে আসি।>
<একই নামে?>
<মনে থাকলে একই নামে, আর না হয় অন্য নামে।>
<তো তুমি কি এখানে আসা বন্ধ করে দেবে কখনো?>
<হ্যাঁ। এসব অ্যাপে কি সব সময় আসা যায়? যে পরিমাণে হ্যারাজমেন্টের শিকার হতে হয়, কী আর বলব! মেয়ে হলে বুঝতে পারতে।>
<অসভ্য লোকেরা যখন এতই ডিস্টার্ব করে, তখন কী দরকার এখানে আসার?> কেন যেন খারাপ লাগল অভ্যুদয়ের। মেয়েদের কেমন হ্যারাজমেন্টের শিকার হতে হয়, তার নমুনা তো একদিন দেখেইছে।
<এই কথাগুলো ওই অসভ্য লোকদের বলতে পারো না? নাকি নিজের জাতের বলে বলতে কষ্ট হয়?> মেসেজটা দেখতেই শরীরে জ্বালা ধরল অভ্যুদয়ের। মেয়েটা চটাং চটাং কথা বলে ফেলে। তার জাতের মানে? লোকগুলো কি তার বাপ-চাচা লাগে?
<ওরা কি আমার বাপ-ভাই যে আমার জাতের হবে?>
<পুরুষ তো।>
< :/ >
<সেন্টি মা'রো কেন, পিচ্চি?>
<ঘুমাবো, যাই।>
<এতো তাড়াতাড়ি? কাল না শুক্রবার!> মেসেজটার দিকে তাকিয়ে থাকলো সে। মনে হচ্ছে মোবাইলের ওই পাশে থাকা মেয়েটা তার দিকে তাকিয়ে মজা নিচ্ছে। তার জন্য আবার কিসের শুক্রবার?
<ওহ, তাই তো!> নিজের অবস্থাটা বলতে মন চাইল না অভ্যুদয়ের। তাই মনে না থাকার ভান করলো।
<ভালো লাগছে না। ২০/২৫ মিনিট থাকো, এরপর চলে যেয়ো।>
<কেন ভালো লাগছে না, আপু?>
<মনটা খারাপ খুব। একা একা লাগে খুব। ভাবছি কাল থেকে এখানে আর আসব না। মানুষের এসব কুরুচিপূর্ণ মেসেজ আর নিতে পারছি না। ভেবেছিলাম অপরিচিত মানুষের সাথে কথা বললে মনটা হালকা হবে, কিন্তু হচ্ছে পুরো উলটো।>
<আর আসবে না?> মনটা খারাপ হলো অভ্যুদয়ের।
<নাহ।>
<ফেসবুকে অ্যাড হবে? আসলে আমার তো কোনো বন্ধু নেই, তোমার সাথে কথা বলে খুব ভালো লেগেছিল, তাই।> দ্রুত মেসেজ পাঠাল অভ্যুদয়।
<না।>
<অ্যাড হলে কী সমস্যা? আমি তো তোমাকে ডিস্টার্ব করি না।>
<ব্যাপারটা ডিস্টার্ব করার নয়, অভ্যুদয়। তুমি বুঝবে না। এখানে বেশিরভাগ মানুষ আসে নিজেদের মধ্যকার থাকা চাহিদা মেটাতে। তুমি ভাবতে পারো আমিও হয়তো তাদের মতো।>
<আমি সেরকম ভাবছি না। তুমি সেরকম নও, আমি জানি আপু। তোমার সাথে কথা বলে আসলেই ভালো লেগেছে। একটা বন্ধু পেয়েছি মনে হয়েছে।>
<সরি।>
<ওকে। তবে যদি কখনো কথা বলতে ইচ্ছা করে, তবে 'অভ্যুদয় চৌধুরী' আইডিতে নক কোরো। প্রোফাইলে একটা বাইকে বসা আমার ছবি, হেলমেট পরা, কালো রঙের।> শুয়ে থাকা অভ্যুদয় উঠে বসেছে।
এই প্রথম তার কারও সাথে কথা বলে ভালো লেগেছে, আর সে-ই নাকি আর থাকবে না! সে কেন তাকে খারাপ ভাববে? সে নিজেও তো এই অ্যাপে আছে। তাহলে কি নওশীনও তাকে অসভ্য লোকদের মতো ভাবছে? তাই কি নিজের আইডি দিতে চাইছে না নওশীন? চিন্তায় পড়ে গেল অভ্যুদয়।
<সরি, কিন্তু অ্যাড হওয়া হবে না। তবে খুব ভালো থাকো, সেটা দোয়া করি। আর কাউকে চোখ বন্ধ করে বিশ্বাস করবে না।> নওশীন মেসেজটা দিতেই সিন করল অভ্যুদয়। এভাবে নওশীনের তাকে না বলাটা গায়ে লেগেছে খুব। রাগ হচ্ছে, হয়তো মেসেজ দিলে ভাববে গায়ে পড়ে কথা বলছে কোনো কারণে, তাই আর মেসেজ দিল না সে। অনলাইনের অপরিচিত কারও সাথে যে কথা বলতেই হবে, তেমন কোনো নিয়ম নেই। হয়তো তার কপালটাই এমন ফুটা কপাল—কোনো বন্ধু থাকবে না।
“শুক্কুরে শুক্কুরে আষ্টদিন, আমার জীবনটাই ঘোড়ার ডিম!” কথাটা বিড়বিড় করেই বালিশে মুখ গুজল অভ্যুদয়।
চলবে...