ফন্ট সাইজ:
থিম:
প্রেমসন্ধিক্ষন

৫৩তম পর্ব

লেখক: সাইদা মুন
মেহরীন বসে আছে কাচুমাচু হয়ে। অল্প কিছুক্ষণ আগে ঘটে যাওয়া মুহূর্তটার কথা মনে পড়তেই তার বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠছে বারবার। লজ্জায় গাল দু’টো টকটকে লাল হয়ে আছে, যেন কেউ লাল রঙে রাঙিয়ে দিয়েছে। মাথা তুলে তাকানোর সাহসটুকুও যেন লজ্জার পর্দায় ঢেকে গেছে। চোখ নিচু, দৃষ্টি মেঝের দিকে নিবদ্ধ, মেঝের নকশাগুলোই যেন এখন তার কাছে দেখার মতো কিছু। সামনে তাকানোর সাহস নেই, যদিও তালহা এখন তার সামনে নেই। তবুও তার উপস্থিতির আবেশ রয়ে গেছে।
কিছুক্ষণ আগেই তালহা সরে গেছে সামনে থেকে। আলমারি খুলে কী যেন করছে, কাপড়ের খসখস শব্দ, ড্রয়ার সরে যাওয়ার আওয়াজ সবই কানে আসছে মেহরীনের। 
আলমারির সামনে থেকে সরে গিয়ে এবার বুকশেলফের কাছে গেল তালহা। সেখান থেকে একটি সাদা কাগজ আর কলম নিয়ে এসে সোফায় বসল। টি-টেবিলের ওপর কাগজটি রেখে মনোযোগ দিয়ে কিছু লিখতে লাগল। তার মুখে সেই চিরচেনা গম্ভীর ভাব, চোখে স্থিরতা। লেখা শেষ হতেই কাগজটি যত্ন করে ভাঁজ করল। তারপর পাশে রাখা বড় ভ্যানিটি ব্যাগটি হাতে তুলে নিয়ে এগিয়ে এল মেহরীনের দিকে।
হঠাৎ চোখের সামনে একুটা ব্যাগ এগিয়ে আসতেই মেহরীনের কপালে বিস্ময়ের ভাঁজ পড়ল। সে অবাক দৃষ্টিতে মাথা তুলে তাকাল তালহার দিকে। তালহা ইশারায় ব্যাগটি নিতে বলতেই সে চুপচাপ হাত বাড়াল। ব্যাগটি হাতে নিয়ে এদিক-ওদিক ঘুরিয়ে দেখতে লাগল, ভেতরে কী আছে বোঝার চেষ্টা করল। কৌতূহল তার চোখে-মুখে স্পষ্ট।
সে নরম স্বরে জিজ্ঞেস করল,
—এটা কার জন্য?
তালহা মৃদু গলায় বলল,
—তোমার জন্য।
মেহরীন অবাক হয়ে গেল,
—আমার জন্য? এতে কী আছে?
তালহা ঠোঁটে সামান্য হাসি টেনে বলল,
—খুলে দেখো।
আর দেরি করল না সে। কাপড়ের ব্যাগটিতে লাগানো স্ট্যাপলার পিনগুলো খুলতে গিয়ে তার হাত সামান্য কাঁপছিল। তবে ভেতরে কি আছে জানার কৌতুহল। পিন খুলতেই ব্যাগের ভেতর দেখতে পেল দুটি প্যাকেট। বড় প্যাকেটটি আগে বের করল সে। একবার তালহার দিকে তাকাল, সে আবারও ইশারায় খুলতে বলল। মেহরীন ধীরে ধীরে মোড়ক খুলল।
প্যাকেটের ভাঁজ সরাতেই বেরিয়ে এল একটি গাঢ় নীল রঙের শাড়ি। মুহূর্তে মেহরীনের চোখ বিস্ময়ে বড় হয়ে উঠল, ঠোঁট সামান্য ফাঁক হয়ে গেল। প্যাকেটটি পাশে রেখে শাড়িটি পুরো খুলে দেখতে লাগল। কাপড়টি মসৃণ, হালকা ঝলমলে, সম্ভবত সিল্কজাতীয়। পুরো শরীরজুড়ে সোনালি জরির ছোট ছোট বুটির কাজ ছড়িয়ে আছে, যেন নীল আকাশে ছিটিয়ে থাকা তারার ঝিকিমিকি। পাড়টি চওড়া, ভারী সোনালি ও হালকা ব্রোঞ্জ আভাযুক্ত সূক্ষ্ম কারুকাজে ভরপুর। নিখুঁত, মার্জিত ডিজাইনের শাড়িটি।
মেহরীন মুগ্ধ হয়ে আঙুল বুলিয়ে দেখতে লাগল। পাড়টা তুলে আলোয় ধরতেই সোনালি কাজগুলো ঝলসে উঠল। তার চোখে বিস্ময়ের দীপ্তি আরও গাঢ় হলো। ঠোঁটের কোণে অজান্তেই একরাশ হাসি ফুটে উঠল। চোখেমুখে খুশির ঝলক নিয়ে সে তাকাল তালহার দিকে।
—এটা.. আমার জন্য?
তালহা শাড়িটি আলতো করে মেহরীনের এক কাঁধে ফেলে দিল। তাকে শাড়িতে কেমন লাগবে তাই দেখতে চাইছে সে। তারপর হালকা হাসি নিয়ে বলল,
—হ্যাঁ ম্যাডাম আপনারই। ভালো লেগেছে?
মেহরীন যেন আনন্দে ভেসে উঠল। পুরো মুখজুড়ে প্রশস্ত হাসি ফুটে উঠল তার। উৎফুল্ল স্বরে বলল,
—ভীষণ সুন্দর! আমার অনেক পছন্দ হয়েছে।
মেয়েটার সেই নির্মল হাসিটা চোখে পড়ল তালহার। কয়েক মুহূর্ত তাকিয়ে রইল তার মুখের পানেই। সে যদি জানত, এই সামান্য একটা শাড়ি এমন মূল্যবান হাসি এনে দিতে পারে, তাহলে তো সে প্রতিদিনই একটি করে শাড়ি এনে দিত, অন্তত প্রিয়তমার মুখের এই অমায়িক হাসিটা দেখতে পেত সবসময়। 
মেহরীন এবার শাড়িটি যত্ন করে ভাঁজ করে রেখে অন্য প্যাকেটটি খুলল। সেখান থেকে বেরিয়ে এল দুই ডজন নীল ও এক ডজন কালো কাঁচের চুড়ি, ঝকঝক করছে আলোয়, মনোমুগ্ধকর লাগল তার কাছে। তা নেড়ে চেড়ে দেখে আরেকটি ছোট কাগজের প্যাকেট হাতে নিল। তা ছিঁড়তেই পাওয়া গেল একজোড়া সুন্দর দুল। সবকিছুই যেন তার চোখে মুখে অপরিসীম আনন্দের ছাপ ফুটিয়ে তুলল। খুশি মনে সব দেখে যাচ্ছে সে।
চুড়িগুলো হাতে নিয়ে কয়েকটা পড়তে গিয়ে সে অবাক হয়ে বলল,
—একদম পারফেক্ট সাইজের! এই আপনি আমার হাতের মাপ জানলেন কীভাবে? আমি তো বলিনি।
তালহা পাশে বসল। চুড়িগুলো নিজের হাতে নিয়ে যত্ন করে পরিয়ে দিতে দিতে বলল,
—হাতের সাইজ না জানলেও, তোমার মাপ আমার অজানা নয়।
—বাহ! আপনি হাত দেখেই মাপ বুঝে যান?
তালহা মাথা নেড়ে বলল,
—হুম। 
একটু থেমে হালকা স্বরে আবার বলল,
—তবে শুধু তোমারটাই জানি। এছাড়া আর কারও হাতের মাপ জানার ইন্টারেস্ট ও নেই।
চুড়িগুলো সুন্দর করে পরিয়ে দিতেই মেহরীন হাত নাড়াতে লাগল। ঝনঝন শব্দে ঘর ভরে উঠল। সেই শব্দের সঙ্গে তার হাসি মিশে এক অপার্থিব আবহ তৈরি করল। তালহা অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। উপভোগ করছে এই মুহুর্তটা।
এরমাঝেই মেহরীন প্রশ্ন করল,
—এগুলো কিনেছেন কখন? আজ তো আমাকে নিয়ে বের হওয়া ছাড়া আর বের হননি।
তালহা নির্লিপ্ত গলায় বলল,
—অনেক আগেই কিনেছিলাম। দেওয়ার সুযোগ হয়নি।
মেহরীন আড়চোখে তাকাল,
—কবে?
তালহা আলতো করে তার গাল ছুঁয়ে শীতল কণ্ঠে বলল,
—যে রাতে প্রথম আপনার মনের খবর পড়েছিলাম, তার পরদিনই।
মেহরীনের চোখ বিস্ময়ে ভরে উঠল,
—তখন..? তাহলে এতদিন দেননি কেন?
—বললাম তো, সুযোগ হয়ে ওঠেনি।
মেহরীন উঠে দাঁড়াল,
—আচ্ছা, আমি তাহিয়াকে দেখিয়ে আসি।
সে বেরোতে যেতেই তালহা তাকে থামাল। ওয়ার্ডরোবের শেষের খালি ড্রয়ার খুলে একটি মাঝারি আকারের ফুলের তোড়া বের করল। এগিয়ে এসে মেহরীনের হাতে দিল তা। মেহরীন যেন সারপ্রাইজ এর উপর সারপ্রাইজ পাচ্ছে। তোরাটা হাতে নিয়ে দেখতে লাগল, গোলাপগুলো আসল না নকল, তাও ভীষণ সুন্দর লাগছে।
তালহা খানিক অপ্রস্তুত ভঙ্গিতে বলল,
—ফুলের তোড়া আগে কাউকে দিইনি। তেমন ধারণা নেই। পথে দেখে ভালো লেগেছিল, তাই নিয়ে নিয়েছিলাম। হয়তো পছন্দ হয়নি, আপাতত নকল ফুল দিয়েই চালিয়ে নাও। পরে নাহয় আসলটা এনে দেব।
কথা শেষ হওয়ার আগেই মেহরীন এগিয়ে এসে তাকে জড়িয়ে ধরল। তার চোখ ভিজে উঠেছে। কণ্ঠ কাঁপছে। খুশিতে আত্মহারা মেয়েটি।
—একদম খারাপ না, আমার ভীষণ পছন্দ হয়েছে। ধন্যবাদ ধন্যবাদ...
তালহা তার মুখ দু'হাতে তুলে নিল। চোখের কোণের জল আলতো করে মুছে কপালে গভীর চুম্বন এঁকে দিল। মুহূর্তটা নীরব অথচ পূর্ণ। তারপর সবকিছু নিয়ে মেহরীন বেরিয়ে গেল তাহিয়ার ঘরের দিকে। যাওয়ার আগে তালহা নিঃশব্দে ভাঁজ করা কাগজটি তার হাতে গুঁজে দিল।
———
রুমে ঢুকতেই তাহিয়া উৎসাহ নিয়ে সব খুলে দেখতে লাগল। আর মেহরীন এক কোণে বসে আগে কাগজটি খুলল। তাতে লেখা,
"ঠিক রাত একটায় শাড়ি পরে ছাদে আসবে। আর সাবধানে শাড়ি উঁচু করে প্রতিটা পা ফেলবে, হুচট যেন না খাও।"
লেখাটি পড়তেই মুখে মুচকি হাসি ফুটলেও পরক্ষণেই তার মুখে চিন্তার ছাপ ফুটে উঠল। নখ কামড়াচ্ছে আর ভাবছে যদি কেউ দেখে। বাড়িতে এখন মানুষের অভাব নেই। চিন্তিত গলায় তাহিয়াকে বলল,
—এখন কি করব? যদি কেউ দেখে ফেলে?
তাহিয়া ভ্রু কুঁচকে বলল,
—সবাই জানে তোরা স্বামী-স্ত্রী। এত অভারথিংক কেন করছিস।
—তবু, বাড়িতে এত মানুষ। বড়রা কেউ দেখলে বিষয়টা খারাপ দেখাবে না?
—লোকের কথা ভাবলে নিজের জীবন এঞ্জয় করতে পারবি না। এখন তোদের সময়, সো এঞ্জয় কর, চিল কর ইয়ার। ভবিষ্যতে বাচ্চা কাচ্চা হলে এসময় আর ফিরে পাবি না।
তাহিয়ার কথায় লজ্জায় পড়ল মেহরীন। তবে নিচ থেকে ডাক আসার সব জিনিসপত্র আলমারিতে রেখে মেহরীনকে নিয়ে নিচে নামল। ড্রয়িংরুমে পা রাখতেই থমথমে পরিবেশ টের পেল তারা। সবাই উপস্থিত, কিন্তু তালহার বড় মামি, তাহসান আর ফারাহ নেই। তারা নেমে বাকিদের সঙ্গে চুপচাপ খেয়ে নিল।
———
—নিজেদের মধ্যে ঝামেলা করে লাভ আছে...?
চলবে...
[রামাদান মোবারাক প্রিয় পাঠকগণ, প্রথম রমজান কেমন কাটল অবশ্যই বলবেন।🤍]

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ৫৩তম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন