সূর্যের আলো এখনো পুরোপুরি জেগে ওঠেনি। জানালার ফাঁক দিয়ে আসা স্নিগ্ধ হাওয়া মাহির মুখে এসে লাগছে। মাহির ঘুম এখনো তাজা সে যেন অনেক ক্লান্ত তার আরও ঘুম দরকার।
ইতিমধ্যে শ্রাবণীর কল আসে।
ঘুমজড়ানো চোখে ফোনটা হাতে নিয়ে স্ক্রিনের দিকে তাকাতেই মেজাজ চটে গেল। শ্রাবণীর সকাল সকাল কল দিয়ে তার ঘুমের ১৩ টা বাজালো কেন?
— শ্রাবণী কলিং...
কলটা রিসিভ করতেই ওপাশ থেকে কোনো সালাম-দোয়া ছাড়াই চিৎকার ভেসে এলো—
— এই মাহি! উঠছিস নাকি এখনো ঘুমাচ্ছিস?
মাহি চোখ বন্ধ রেখেই বিরক্ত গলায় বলল,
— এত সকালে মানুষকে ফোন দিয়ে চিৎকার করিস কেন? কানের পর্দা ফাটাইবি নাকি?
— সকাল? আজকে কি জানিস না বলদ?
— জানি না। জানতেও চাই না।
— আজকে আমাদের কলেজে যাওয়ার দিন!
মাহি হঠাৎ চোখ মেলে বিছানায় উঠে বসল।
— ওহ্ শিট! আজকেই তো!
শ্রাবণী হেসে বলল,
— হ্যাঁ, মহারানী। একই কলেজে ভর্তি হয়েছি—এই আনন্দে তোর ঘুমই ভাঙছে না!
— আরে, একই কলেজে ভর্তি হয়েছি বলেই তো শান্তিতে ঘুমাচ্ছিলাম। জানি, তুই আছিস। আমার আর ভয় কী?
— বেশি পাকনামি করিস না। মনে আছে তো, এবার কিন্তু আগের মতো সাইন্স নিইনি।
মাহি হেসে বলল,
— হ্যাঁ রে। আগেরবারের মতো পাকনামি করে সাইন্স নিয়ে জীবনটাকে জাহান্নাম বানানোর কোনো ইচ্ছা নেই।
— ঠিক! এবার শান্তিতে কলেজ জীবন কাটাব। পড়াশোনা করব, ঘুরব, ফুচকা খাব...
— আর প্রেম করবি না?
— চুপ! তোর মাথায় শুধু প্রেম আর প্রেম।
মাহি খিলখিল করে হেসে উঠল।
— আচ্ছা, তুই তৈরি হয়ে নে। আব্বু তোকেও নিয়ে যাবে। আমাদের কলেজে দিয়ে আসবে, তারপর প্রিন্সিপাল স্যারের সঙ্গে পরিচিত করে দিয়ে আসবে।
শ্রাবণী একটু থেমে বলল,
— তোর আব্বু নিজে নিয়ে যাবে?
— হুম। এলাকার চেয়ারম্যান সাহেবের মেয়ে বলে কথা। আমাদের প্রথম দিনটা একটু রাজকীয় না হলে চলে?
— ঠিক আছে। আমি রেডি হয়ে নিচ্ছি
— আচ্ছা ।
দুইজনই খুব এক্সাইটেড
ফোন রাখার আগে শ্রাবণী বলল,
— তাড়াতাড়ি তৈরি হয়ে আয়। আজ থেকে আমাদের নতুন জীবন শুরু।
মাহি ফোনটা বিছানায় রেখে কিছুক্ষণ চুপ করে বসে থাকে।
এটা তার অভ্যাস ঘুম থেকে উঠে পাঁচ - ছয় মিনিট বসে থাকা।
বসা থেকে উঠে দাড়াতেই দরজায় টোকা পড়ল।
— মাহি? উঠেছিস মা?
আম্মুর গলা শুনে মাহি তাড়াতাড়ি উত্তর দিল,
— হ্যাঁ আব্বু, উঠেছি।
— তাহলে তাড়াতাড়ি ফ্রেশ হয়ে নে। আমি নাস্তার ব্যবস্থা করি।
— আচ্ছা আম্মু।
মাহি আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে চুলগুলো ঠিক করতে করতে নিজের প্রতিবিম্বের দিকে তাকাল। কত বড় হয়ে গেলাম!
কিছুক্ষণ পর নিচে নামতেই তার আব্বু বসার ঘরে অপেক্ষা করছিলেন। এলাকার চেয়ারম্যান হিসেবে বাইরে যতটা গম্ভীর, মেয়ের সামনে ঠিক ততটাই নরম মানুষ তিনি।
মাহিকে দেখে বললেন,
— এত দেরি হলো কেন?
মাহি মুচকি হেসে বলল,
— মেয়ে মানুষ তৈরি হতে একটু সময় লাগে আব্বু।
— তা বুঝলাম। কিন্তু কলেজে গিয়ে প্রথম দিনেই যেন কোনো ঝামেলায় জড়িও না।
— আমি কখন ঝামেলা করি?
চেয়ারম্যান সাহেব ভ্রু কুঁচকে মেয়ের দিকে তাকালেন।
— তুমি ঝামেলা কর না? বাহ্ কবে থেকে আমার মেয়ে এত শান্ত হয়ে গেলো? আমি তো জানতাম আমার তিন মেয়ের ভিতরে সবচেয়ে চঞ্চল আর দুষ্টামির রানি আমার মেঝো কন্যা।
মাহি মুখ বাঁকিয়ে বলল,
— উহ্! আমি একটুও দুষ্টামি করি না।
ঠিক তখনই বাইরে একটা অটোরিকশা এসে থামল। শ্রাবণী নেমে বাড়ির ভেতরে ঢুকতে ঢুকতে বলল,
— চাচা, আসসালামু আলাইকুম।
— ওয়ালাইকুম সালাম। এসো মা। তোমাদের দুজনকেই আজ আমি কলেজে দিয়ে আসব।
শ্রাবণী হেসে মাহির দিকে তাকাল।
— বুঝলি? চেয়ারম্যান সাহেবের মেয়ের সঙ্গে চললে সুবিধা অনেক!
মাহি চোখ রাঙিয়ে বলল,
— বেশি কথা বলিস না। তোর কিন্তু এখনো আমার গাড়িতে ওঠার অনুমতি আছে কি না, সেটা ভাবছি।
— আহা! চেয়ারম্যানের মেয়ে বলে এত ভাব!
— তো কী? তুই কি চেয়ারম্যানের মেয়ে?
— না, কিন্তু চেয়ারম্যানের মেয়ের বেস্ট ফ্রেন্ড।
দুজন আবার হেসে উঠল।
কিছুক্ষণ পর গাড়ি বাড়ি থেকে বেরিয়ে গেল।
রাস্তার দুপাশে পরিচিত মুখগুলো মাহির আব্বুকে দেখে সালাম দিচ্ছিল। মাহি জানালার পাশে বসে বাইরে তাকিয়ে ছিল। তার মনে হচ্ছিল, পরিচিত সবকিছু পেছনে পড়ে যাচ্ছে।
শ্রাবণী হঠাৎ তার কানে কানে বলল,
— এই মাহি...
— কী?
— শুনেছি আমাদের কলেজের ছেলেরা নাকি অনেক হ্যান্ডসাম!
মাহি বিরক্ত মুখে বলল,
— তুই কলেজে পড়তে যাচ্ছিস, নাকি ছেলে দেখতে?
— দুটোই করা যায়।
— তোর মতো মেয়ের জন্যই কলেজের বদনাম হয়।
— আর তোর মতো মেয়ের জন্য কলেজে কবিতা লেখা হয়।
মাহি হেসে মাথা নাড়ল।
গাড়িটা ধীরে ধীরে কলেজের বিশাল গেটের সামনে এসে থামলো।
#চলবে।
#লেখনিতে : নাবিলা আফরিন ইভা
# প্রোফেসর আদনান আহমেদ
#মাহিরা আফরিন ইরান