একগুচ্ছ শুকতারা
শারমিন ইরান
৮.
শ্রুতি আসার পর থেকেই লক্ষ্য করেছে এই বাড়ির বড় মেয়ে জামাইয়ের থেকে ছোট মেয়ে জামাই এর কদর বেশি৷ ব্যাপারটা হজম করার মতো নয়৷ তাই সে তার দাদি আম্মুর ঘরে বসে আছে রহস্য উন্মোচনের আশায়৷ দাদি সেই কখন ছাদে গেছে হাঁটতে৷ এখনো এলো না! একটু পরেই তো সবাই খেয়ে রওনা হবে, তখন জিজ্ঞেস করব কীভাবে?
আমিনা রুমে ঢুকেই শ্রুতিকে দেখে হালকা চমকালেন৷ ছোট শ্রুতি কতো বড় হয়ে গেছে! এই তো তার সামনেই ফিরোজা রঙের জামদানি পরে বসে আছে মেয়েটা৷
‘আইজ এতো বিহানায় আমার ঘরে?’
‘দরকার ছিল দাদিআম্মু।’
‘কী কইবি?’ বলতে বলতে বিছানায় বসলেন৷ শ্রুতি নড়েচড়ে বসল খানিকটা৷
‘দাদিআম্মু যা জিজ্ঞেস করব সত্যি সত্যি বলবে। আচ্ছা আপার স্বামী মানে আসলে তার নাম জানি না তাই এভাবে বলছি। তাকে কী বাবা নিজে পছন্দ করে ঠিক করেনি?’
দাদি অবাক হলেন না৷ শ্রুতির কাছে এমন প্রশ্নের সম্মুখীন হবেন তা তিনি জানতেন৷ শ্রুতি যে খুব বিচক্ষণ মস্তিষ্কের তা নয়৷ সে শুধুমাত্র তার বাবার ক্ষেত্রেই বিচক্ষণ৷ তার বাবার প্রতিটা অঙ্গভঙ্গি সে খেয়াল করে৷ তাই এর ব্যাপারটাও যে খেয়াল করবে তা তিনি জানতেন৷
‘কি হলো দাদিআম্মু?’
‘নাহ রে বু। পছন্দ কইরা আনে নাই৷’
‘এর মানে? আমি যতোদূর জানি বাবা টাকা দেখেই বিয়ে দিয়েছে৷ নিজের লাভ যেখানে আছে সেখানেই তো বাবা থাকে৷’
‘এইডা তর ক্ষেত্রে হইছে৷ আর বউ আর হাসিনা ভালো বন্ধু আছাল৷ হাসিনা হইলো নাত জামাইর মা৷ ওইখান থিকাই বউ ঠিক কইরা রাখছিল হাসিনার পোলার সাথে বিভাডার বিয়া দিব৷’
‘আম্মু ঠিক করে রেখে গেল আপার বিয়ের কার সাথে হবে। আর তার সাথেই বাবা আপার বিয়ে দিল! এতোটা ভালো তো আমার বাবা নয়৷ তাহলে?’
‘যতোদূর বুজছি আমি, তোর লিগা নাত জামাইরে যখন পাইসে তখন তোগো বিয়া দিতে চাইসে৷ কিন্তু বড়ডারে বিয়া না দিয়া তো আর ছোডোডারে দেওন যায় না। বিভার বয়স ২৪ চলতাসে৷ তর ২১ ৷ মাইনষ্যে কী কইব? তার উপর তর বাপের পিয়ারী বউ আবার কানে বিষ ঢালসে। কইসে, বড়ডারে আগে ভাগাইতে৷ নয়তো পরে নিব কেরা? ঘরে বসাই বসাই খাওয়ান লাগব৷ তাই হের কথা হুইনা তর বাপে তর মায়ের পছন্দ অনুযায়ী-ই বিয়া দিসে৷ এর মাঝেই আবার হাসিনায় তার পোলার লিগা প্রেস্তাব নিয়া আইছে৷ তাই যারে পাইসে হের গলায়ই ঝুলাই দিসে৷’
আমিনা নিজ গরজে বললেন, ‘তয় আমি খুশি হইসি৷ বউয়ের ইচ্ছাডা পূরণ হইছে৷ নাত জামাইরে মনে হয় সাধারণ চাকরি৷ কিন্তু শুনসি পোলাডা ভালো৷ তাইলেই হইসে৷ তরা ভালো থাকলেই আমার সুখ।’
শ্রুতি হাসল। দাদি তাকিয়ে রইল৷ শ্রুতির হাসিতে কিছু একটা প্রকাশ পেল৷ কী সেটা? রাগ নাকি তাচ্ছিল্যতা? সাধারণ কোনো মানুষ দেখলে বলবে রাগ৷ কিন্তু দাদীর কেন যেন মনে হলো শ্রুতি কাঁদতে চাইছে তবে পারছে না৷
.
আমিন শিকদারের মাথা লজ্জায় কাটা যাচ্ছে৷ তার সামনেই দাঁড়িয়ে আছে দুই মেয়েসহ মেয়ে জামাই৷ দুই মেয়ে জামাইয়ের হাতেই ছেঁড়া পাঞ্জাবি৷
‘বাবা! এটা কী করেছ তুমি? শেষ পর্যন্ত মেয়ে জামাইদের জন্য ছেঁড়া পাঞ্জাবি এনেছ! ছিহহহহ! লজ্জায় আমার মরে যেতে ইচ্ছে করছে। ওই বাড়ি গিয়ে কী বলব আমি? আমিন শিকদার তার মেয়েদের ছেঁড়া পাঞ্জাবি দিয়ে পাঠিয়েছে? এতে আমার সম্মান কোথায় যাবে ভাবতে পারছো তুমি?’
দুঃখের সাথে বাবার প্রতি রাগ মিশিয়ে কথাগুলো বলল শ্রুতি৷
আমিন সাহেব নিশ্চল, কান্ডজ্ঞানহীন! সে নিজে গিয়ে দুই জামাইয়ের জন্যে ভালো নামকরা পাঞ্জাবির দোকান থেকে দুটো পাঞ্জাবি কিনে এনেছেন৷ মাহাবের জন্যে অতো দামী জিনিস কিনতে না চাইলেও কিনেছেন৷ ভেবেছেন দামী পাঞ্জাবি দিয়ে কিছুটা অপমান করবেন৷ অথচ একি! সে নিজেই তো অপমানিত হচ্ছে৷ পাঞ্জাবি দু'টো তে মাঝ বরাবর দূ'টো বড় বড় ফোঁটা করে ছেঁড়া। বুঝাই যাচ্ছে কেউ ইচ্ছে করে আঁকাবাঁকা বিশ্রীভাবে ছিঁড়েছে। আর সেটা যে তার গুণধর মেয়ে করেছে তাতেও বিন্দুমাত্র সন্দেহ নেই তার৷
শাহিনা এগিয়ে এল৷ রাগ তুঙ্গে তুলে বলল, ‘শ্রুতি! এইসব কোন ধরনের কথা? তোমার বাবা কেন ইচ্ছে করে ছেঁড়া পাঞ্জাবি আনবেন?’
‘হয়তো উনার টাকা নেই ভালো পাঞ্জাবি কেনার তাই৷’ সরল তবে ব্যঙ্গাত্মক ভাবে উত্তর দিল শ্রুতি।
‘উল্টোপাল্টা কথা বলবেনা শ্রুতি।’
‘যা সত্যি তা তো আমি বলবই মা…য়া।’
মাহাথির স্বাভাবিক দৃষ্টিতে সব পর্যবেক্ষণ করছে৷ নাটকটা সুন্দরই হচ্ছে৷ নাটক দেখতে তার ভালো লাগে৷ আর সেটা যদি হয় বাস্তব, তাহলে তো কথাই নেই৷
আমিন সাহেব এগিয়ে এলেন৷ নতজানু হয়ে বললেন, ‘বিশ্বাস করো আমি তোমাদের জন্য ভালো মানের পাঞ্জাবি এনেছিলাম৷ কিন্তু কীভাবে কী যে হলো!’
পার্থিব স্বান্তনামূলক কথা বলল আমিন শিকদারকে৷ শ্রুতির পছন্দ হলো না৷ তবে দুই মেয়ে জামাইয়ের সামনে যে অপদস্ত হলো এতেই সে বেজায় খুশি!
বিভা সব বুঝতে পারছে৷ অথচ কিছু বলছে না৷ মাঝেমধ্যে মনে হয় শ্রুতি যা করে তা ভুল, আবার মাঝেমধ্যে মনে হয় ও যা করে তা ১০০% ঠিক; এমনটাই হওয়া উচিত৷ তবে এখন কী মনে হচ্ছে তা বিভা বুঝতে পারল না৷ আমিন সাহেব আবার কেনাকাটার জন্য বাহিরে বেরুতে নিলে পার্থিব আটকালো৷ শ্রুতি খুশিমনে চলে গেল হামিমের সাথে শেষবারের মতো দেখা করতে৷
.
‘আপনি পাঞ্জাবি দু'টো কেন ছিঁড়েছেন শ্রুতি?’
হটাৎ এমন কথায় ভারি চমকাল শ্রুতি! কিছু সময়ের জন্য বোধজ্ঞানহীন হলো সে৷ তারই প্রমাণ দিতে আমতা আমতা করে বলল, ‘কী যা তা বলছেন! আমি কেন ছিঁড়ব?’
পার্থিব হাসলো। শীতল, ভরাট কন্ঠে বলল, ‘শ্রুতি! আমি ঠান্ডা মস্তিষ্কের শান্তিপ্রিয় মানুষ৷ এরমানে কী এই দাঁড়ায় যে আমি বোকা?’
এরকম প্রশ্নের পরিপ্রেক্ষিতে কী উত্তর দেওয়া যায় শ্রুতি ভেবে পেল না৷ নিজেকে সামনের মানুষটার কাছে ভীষণ ছোট ও বোকা মনে হতে লাগলো। তবুও নিজের কন্ঠের ঠাঁট বজায় রেখে বলল,
‘ছিঁড়েছি বেশ করেছি।’
‘কেন ছিঁড়লেন?’
‘আপনি আমিন শিকদারের কোনো জিনিস নেবেন না৷’
‘আমি তো তার মেয়ে নিয়েছি৷’
শ্রুতি তাকালো পার্থিবের দিকে৷ বিড়বিড় করল, ‘যেভাবে এসেছি সেভাবেই ফেরতও চলে যাব৷’
‘কী বললেন? খেয়াল করিনি৷’
‘কিছুনা। আসলে আমি চাই না আপনি ওই বাড়ির কোনো জিনিস নিন৷’
‘তা না হয় মানা গেল৷ কিন্তু তাহলে মাহাব ভাইয়ার জিনিস কেন ছিঁড়লেন?’
শ্রুতির রাগ হলো৷ বড্ড কথা বলে লোকটা৷ বিরক্তমাখা কন্ঠে বলল, ‘বড্ড বেশি কথা বলেন৷ আমাকে কী মারার প্ল্যান করছেন? কালো বউ বলে পছন্দ হচ্ছে না? গাড়ির নিচে ফেলে বুঝি মারতে চান? সেকারণেই বুঝি বকরবকর করে গাড়ি চালাচ্ছেন?’
পার্থিবের খারাপ লাগলো। খারাপ লাগলো বলতে রাগ হলো৷ মেয়েটা সবসময় এমন কথা বলে৷ কিন্তু কেন বলে? সে কী বলেছে তার বউ কালো কিংবা শ্যামলা বলে তার সমস্যা? বলেনি তো৷ তাহলে? মেয়েটার এমন কথা শুনলে তার নিজেকে ছোট লাগে৷ মনে হয় সে তার স্ত্রীকে ভালোবাসতে পারছে না৷ তবুও বলে৷ কই তার কাছে তো শ্রুতিকে ভীষণ সুন্দর এবং মিষ্টি লাগে৷ পার্থিব ঠিক করলো যে আর একবার কোনোদিন যদি শ্রুতি এমন কথা বলে তাহলে দুই গালে কষে ৩ টা করে থাপ্পড় লাগাবে৷ তাহলে যদি তার বউকে ছাগল থেকে মানুষ বানানো যায়।
.
শ্বশুরবাড়ি থেকে ফিরেই অফিস যাওয়ার ভূত চেপেছে বিভার গুণধর স্বামীর৷ তাই তো বিভা তোড়জোড় করে রান্না করছে৷ তার শ্বশুর-শ্বাশুড়ি চলে গেছেন যেদিন সে নিজের বাড়িতে গেল৷ বাড়িতে নাকি কী কাজ আছে৷ তাই বলে এতো তাড়াহুড়ো! মানুষ দু'টোর সাথে পরিচিত হওয়াই হলো না৷ দু'টো পরোটা, ডিম বাজি আর আলু ভাজি নিয়ে বিভা চললো স্বামীর ঘরের দিকে৷
মাহাথির শার্টের হাতা ঠিক করছে৷ লোকটাকে দেখতে বিভার ভালো লাগে৷ ইচ্ছে করে জড়িয়ে ধরে বসে থাকতে। নিজের দুঃখ প্রকাশ করতে৷ বলতে, জানেন আমার প্রিয়জনের তালিকা সীমিত। আপনি হবেন আমার প্রিয়জন? এমন লাগামহীন চিন্তায় বিভা নিজেকেই অসভ্য বলে গালি দিল। বিভা ডাকল,
‘মাহাথির!’
প্রশ্নের কোনো প্রকার উত্তর না দিয়েই অন্য প্রসঙ্গে উল্টো আদেশ করে বসলো মাহাথির৷ খানিকটা চড়া গলায় বলল,
‘তুমি আর আমাকে মাহাথির বলে ডাকবে না৷’
বিভা কিছু বলল না৷ প্লেট টা টেবিলে রেখে বলল,
‘জলদি জলদি খেয়ে নিন মাহাথির৷ লেট হয়ে যাচ্ছে তো৷’
মাহাথিরের মনে হলো বিভা তার আদেশ অমান্য তো করলোই সাথে ঠ্যাটার মতো আবারো সেই কাজ করে মাহাথিরকে ছোট করল।
মাহাথিরের সহজেই যে কারোর উপর রেগে যেতে পারে। ঠিক যেমন এখন হলো৷ মেয়েটার উপর প্রচন্ড রাগ তার মাথায় এক্কেবারে লাফ মেরে উঠে গেল৷ বেয়াদব একটা মেয়ে! নেহাৎ-ই অফিসে লেট হচ্ছে বলে, নয়তো এই মেয়েকে সোজা করতে দুই সেকেন্ডও লাগত না৷ মাহাথির নিজের রাগকে প্রকাশ করতে এবং প্রাধান্য দিতে বিভার বানানো খাবার না খেয়েই চলে গেল৷ বিভা খাবারগুলোর দিকে চুপচাপ তাকিয়ে রইলো৷
_______
চলবে~
#শারমিন_ইরান
#একগুচ্ছ_শুকতারা
শব্দসংখ্যা - ১২০৯
[আমি যদি একটু রোমান্স লিখি, আপনারা কী রাগ করবেন?😑]