ফন্ট সাইজ:
থিম:
একগুচ্ছ শুকতারা

৯ম পর্ব

লেখক: শারমিন ইরান

একগুচ্ছ শুকতারা

শারমিন ইরান

৯.

রাত আটটা। মাহাথির এখনো ফিরেনি৷ বিভা বসে আছে মাহাথির এর অপেক্ষায়৷ আজকে সে ঠিক করেছে মাহাথিরের সাথে কথা বলবে৷ তাকে অপছন্দ করার কারণ জিজ্ঞেস করবে। কালো হওয়ার জন্য অপছন্দ করে এটা বিভার মন মানে না৷ বিভার কেন যেন মনে হয় মাহাথির এর মনে অনেক দুঃখ। সেই দুঃখ জানার চেষ্টা করবে৷ মাহাথিরের প্রতি কীসের এতো টান তার?

মাহাথির কী আহামরি সুন্দর? না তো৷ তবে হ্যাঁ মুখের গড়ন টা বেশ। আসলে বেশ বলা যায় না৷ মাহাথির এর মুখের গড়ন সুন্দর নাকি শুধুমাত্র তার কাছেই সুন্দর লাগে তা বিভা জানে না৷ মাহাথিরকে যতোবারই বিভা দেখে মনে মনে বলে, ‘মাশ-আল্লাহ।’

বিভা কী মাহাথিরের সৌন্দর্য দেখে মুগ্ধ? না তো। বিভা তো মাহাথিরের মায়ায় পড়ে গেছে। মাহাথির অবশ্য মায়ায় পড়ার মতো কিছু করেনি৷ তবুও বিভার মায়া লাগে৷ ভীষণ মায়া লাগে৷ লোকটা তো রাগী৷ সেই রাগের মাঝেও বিভা মায়া খুঁজে পায়৷ তার বলতে ইচ্ছে করে, ‘আহারে! লোকটা কতো রাগী!’

কলিংবেলের আওয়াজে দরজা খুলল বিভা৷ ঘরে ঢুকল মাহাথির৷ মুখে ক্লান্তির রেশ৷ সামনের কাঠের সোফায় বসে পড়ল৷ বিভা জলদি করে ফ্রিজ থেকে শরবত বের করে দিল৷ মাহাথির উঠে গিয়ে ফ্রিজ থেকে পানির বোতল বের করে গ্লাসে ঢেলে নিল৷ এরপর সোফায় বসে ধীরে ধীরে চুমুক দিল৷ বিভার অপমানিত বোধ হওয়ার কথা। হলো না৷ বরঞ্চ উলটে মায়া হলো৷ মনে হলো, লোকটা অযথাই রাগ করে৷ একটু রাগ না করলে কী হয়? শরবত টা খেলে তো তারই ভালো লাগতো৷ খেল না৷ খারাপ লোক…..

বিভা সামনের সোফায় বসে ঢকঢক করে পুরো শরবত টা খেয়ে নিল৷ এমন একটা কান্ড করে বিভা নিজেই কান্ডজ্ঞানহীন হয়ে পড়ল৷ মাহাথির ভ্রু কুঁচকে চেয়ে রইল৷ এতোদিন জানতো মেয়েটা হাবাগোবা৷ আজ জানল মেয়েটা গরুগাধা৷ বাসায় ফিরেও শান্তি নেই৷

হাত মুখ ধুয়ে গামছায় মুখ মুচছে মাহাথির৷ সামনে তাকিয়ে দেখল একটা বাটিতে মোগলাই রাখা আছে৷ পাশেই পানির গ্লাস৷ কে বানিয়েছে? ওই মেয়েটা? ভাবলো খাবে না৷ কিন্তু এরপরই তার মনে পড়লো, তার ভীষণ ক্ষুধা লেগেছে৷ যদিও দুপুরে ক্যান্টিন থেকে পেটপুরে খেয়েছে৷

মাহাথির বসে বসে খেতে লাগলো।

‘মাহাথির, আপনি চা খাবেন নাকি কফি খাবেন?’

মাহাথির তাকালো। বিভা দাঁড়িয়ে৷ আজ পড়েছে খয়েরী রঙের একটা কামিজ৷ চুলগুলো বেসামাল ভাবে খোলা৷ সুন্দর লাগছে দেখতে৷ আচ্ছা, বিভা কী আজ চুলে শ্যাম্পু করেছে? এজন্যই কী এতো সুন্দর লাগছে তার চুল এবং তাকে?

এতোক্ষণের ভাবনাকে নিমিষেই পালটে ফেললো মাহাথির৷ ভরাট কন্ঠে বলল, ‘তোমার জন্য আমার নাম মাহাব।’

বিভার মুখটা ছোট হলো৷ বুঝা গেল মন খারাপ হয়েছে। মাহাথিরের মাঝে ভাবান্তর হলো না৷ নিজের মতো করে বলল,

‘মাহাথির শুধুমাত্র আমার কাছের মানুষদের জন্যে৷ আর কাছের মানুষের তালিকায় তুমি পড়ো না৷ সুতরাং, মাহাব বললে খুশি হতাম৷ কিছু না বললে আরোও বেশি খুশি হতাম৷’

বলেই গটগট করে বেরিয়ে গেল ফ্ল্যাট থেকে৷ কোথায় গেল? ছাদে?

.

শ্রুতি বসে আছে খাটের মাঝখানে৷ হাটুর ওপর মুখ রেখে ভাবছে সে৷ আজ দুপুরবেলা সে খেতে চাচ্ছিল না৷ ইচ্ছে করছিল না৷ রুমে এসে ঘুমিয়ে ছিল৷ প্রভা-প্রত্যাশা এসে অনেকবার ডেকে গেছে৷ সে উঠেনি৷ এরপর এলো তানহা৷ এসে আদুরে হাত মাথায় বুলিয়ে ডাকল শ্রুতিকে৷ মন খারাপের কথা জিজ্ঞেস করলো৷ শ্রুতি অবাক হলো৷ মহিলাটা এমন কেন? এতো মমতাময়ী কেন তিনি! শ্রুতি আশ্চর্য হয়ে নিজের প্রতি নিজের শ্বাশুড়ির ভালোবাসা দেখল৷ তানহা শ্রুতিকে খাইয়ে দিয়ে তবেই গেলেন রুম থেকে৷ শ্রুতি লক্ষ্য করল, মহিলাটি শুধুমাত্র মমতাময়ী নয়, তিনি ভীষণ সরল, দয়ালু, উদার মনের৷ শ্রুতি নিজের মায়ের সাথে মিল খুঁজল৷ পেল না৷ তার মা দুষ্টু প্রকৃতির ছিল৷ কথা তূলনামূলক বেশি বলতো৷ চিৎকার চেঁচামেচিও করতো৷ তবে হ্যাঁ একটা বিষয়ে মিল আছে, দু'জনই মমতাময়ী, স্নেহময়ী। শ্রুতির হটাৎ আজব একটা ইচ্ছে হলো৷ ইচ্ছে হলো রাস্তায় গিয়ে জনে জনে মানুষ ডেকে বলতে, ‘শুনুন! আমার দুইটা মা আছে। আমার দুইটা মা-ই মমতাময়ী। তাদের চোখ ভরা শুধু ভালোবাসা আর ভালোবাসা।’

পার্থিব রুমে ঢুকেই দেখল তার রাগী রাণী এক দৃষ্টিতে ফ্লোরে তাকিয়ে আছে৷ পার্থিব হাসলো৷ তার বউটা বড্ড বেসামাল৷ শ্রুতিকে আজব লাগছে৷ কারণটা বুঝা যাচ্ছে না৷ হটাৎ পার্থিব লক্ষ্য করলো, শ্রুতি চুলে তেল লাগিয়েছে৷ তেল লাগিয়ে দুই বেনী পাকিয়ে বসে আছে খাটে৷ মেয়েটাকে বাচ্চা লাগছে৷ তার চেয়েও বেশি লাগছে নিষ্পাপ। আচ্ছা কী নিয়ে চিন্তিত এতো সে? সেকেন্ডের ব্যবধানেই পার্থিব তার বউয়ের আরেকটা নাম রাখল, ‘চিন্তার রাণী।’

‘আমার সাম্রাজ্য নিয়ে বুঝি চিন্তা করছেন?’

‘মানে?’

‘সেকি! আপনি না আমার রাণী৷ তাই তো আপনার চিন্তার কারণ জিজ্ঞেস করছি৷ নিশ্চিত আমার সাম্রাজ্য নিয়েই চিন্তা করছেন৷ করুন করুন। চিন্তা করুন৷ রাণীদের চিন্তা করতে হয়৷ নয়তো সাম্রাজ্য লাটে উঠবে৷ তবে হ্যাঁ, বেশি চিন্তাও আবার করবেন না। কারণ আপনার রাজা আপনার পাশেই আছে৷’

বলেই মুচকি হাসল পার্থিব৷ শ্রুতি পার্থিবের দিকেই তাকিয়ে রইল৷ লোকটা এমন পাগল কেন? আবোল-তাবোল কী বললো কী ছাতার মাথা? শ্রুতির বিরক্তি আকাশসম৷ সামনের মানুষটিকে এই মূহুর্তে কোনো কড়া কথা শুনাবার ইচ্ছে নেই৷ তাই চুপ থাকাই শ্রেয়৷

পার্থিব তাকিয়ে আছে শ্রুতির দিকে৷ মেয়েটাকে তার ভীষণ ভালো লাগে৷ ভীষণ!

‘শ্রুতি শুনুন, আপনাকে না আমার বউ বউ লাগে৷ আপনাকে দেখলেই মনে হয় যেন আপনার মুখে লেখা ‘পার্থিবের বউ’। আপনার দিকে চেয়ে আলাদা শান্তি পাই আমি৷’

শ্রুতি বিরক্তিতে শব্দ করল৷ ভ্রু কুঁচকে বলল, ‘আপনি একটা পাগল তা কী জানেন? আরে বাবা! আমাকে বউ বউ লাগবে কেন? আমি তো আপনার বউ'ই তাই না?’

কথাটায় কী ছিল জানা নেই৷ অথচ পার্থিবের সারা শরীরে যেন শিরশিরে অনুভূতি হলো৷ তার ভীষণ ঠান্ডা ঠান্ডা লাগল৷ আচ্ছন্ন কন্ঠে সে বলল,’হ্যাঁ৷ আমার বউ৷ আপনি আমারই বউ।’

শ্রুতি তাকিয়ে রইল সামনের মানুষটির দিকে৷

.

‘সকাল বেলাতেও খেলেন না৷ এখনও কী খাবেন না?’

মাহাথির জানে পেছনে বিভা দাঁড়িয়ে৷ ঘুরে দাঁড়ানোর ইচ্ছে হলো না৷ তার দিকে পিঠ ঠেকিয়েই দাঁড়িয়ে রইল মাহাথির৷ সকাল বেলা সে খায়নি কথাটা ভুল৷ সে তো খেয়েছে৷ অফিস যাওয়ার পথেই খেয়ে নিয়েছে৷

‘কী হলো?’

‘তুমি আমাকে এতো বিরক্ত করো কেনো বলো তো? বাসায় থাকলেও মাহাথির মাহাথির বলে বলে কানের পোকা খাও৷ এখন একটু ছাদে এলাম৷ এখানেও দেখছি রেহাই নেই৷ কোথায় যাব আমি? বুঝতে পারো না যে তোমার উপস্থিতি আমি পছন্দ করিনা? আর কতো এভোয়েড করলে বুঝবে?’

‘আপনার কী গার্লফ্রেন্ড আছে?’

মাহাথির ঘুরে দাঁড়ালো। তার কথার পিঠে এমন প্রশ্ন আসা করেনি সে৷

‘তা দিয়ে তোমার কাজ?’

‘আমার কোনো কাজ নেই৷ শুধুমাত্র আপনার আমাকে অপছন্দ করার কারণ জানতে চাইছি৷’ বিভাকে যদিও বলা হয়েছে সে কালো তাই মাহাথির তাকে পছন্দ করে না৷ তবুও সে শুনতে চাইছে। যদি এই কয়েকদিনে মত পালটে, তাই৷

বিভার গলায় অধিকার প্রকাশ পেল যা মাহাথিরের পছন্দ হলো না৷ একদমই না৷ মাহাথিরের ইচ্ছে হলো কড়া কিছু কথা বিভাকে শুনিয়ে দিতে৷ মেয়েটা বারবার একই প্রশ্ন করে৷ এর আগেও করেছে৷ সে সত্য উত্তর দিয়েছে৷ আজ আবারো করছে৷ আজকেও সে সত্য উত্তরই দিবে৷ সে আবার বিভার দিকে পিঠ তাক করে সামনে ঘুরলো। আকাশের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘আমি কালো মানুষদের ঘৃণা করি৷ কতোবার বলব? আজ প্রথম এবং শেষ বার বলছি, কালো মানুষ আমি সহ্য করতে পারি না৷ শেষবার বললাম, আর কখনো বলব না।’

বিভা স্তব্ধ হয়ে মাহাথিরের কথা শুনলো৷ মাহাথির বিভার দিকে তাকিয়ে বলল, ‘তোমাকে আমি অনেক কারণেই অপছন্দ করি৷ এরমধ্যে অন্যতম কারণ হলো তুমি কালো। রাত হয়েছে অনেক। চলো খাবে চলো৷ সকালে খেয়েছিলে? নাকি নিজেকে সতী-সাবিত্রী প্রমাণ করতে কিংবা আমার প্রতি ভালোবাসার প্রমাণ দিতে না খেয়ে ছিলে?’

মাহাথিরের চোখে নিবদ্ধ চোখজোড়া নিচে নেমে গেল৷ মাহাথির কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল বিভার নতমুখের দিকে। বিভাকে কথাগুলো বলে তার শান্তি লাগছে৷ মনের ভিতর কথা জমিয়ে রাখতে নেই৷ তা জমে জমে বিষের পাহাড়ে পরিণত হয়৷ এই যে সামনের মেয়েটার নতজানু মুখ তাকে বড্ড প্রশান্তি দিচ্ছে। পৈশাচিক প্রশান্তি। মেয়েটা তার পিছে পিছে ঘুরে অথচ সে পাত্তাই দেয়না, এর থেকে সুন্দর জিনিস আর কী হতে পারে?

বিভা জড় বস্তুর মতো একই জায়গায় দাঁড়িয়ে আছে৷ অবাক লাগছে নিজের কাজে৷ সে তো কারোর সাথে তেমন কথা বলে না৷ তাহলে মাহাথিরের প্রতি এতোটা ব্যাকুল কী করে হয়ে গেল? সে কী তবে ভালোবেসে ফেলল?

কল্পনায় কিছুক্ষণ আগে গিয়ে বারবার মাহাথিরের বলা কথাগুলো কল্পনা করল বিভা৷ অপমানিত বোধ হচ্ছে৷ নিজেকে ছোট লাগছে নিজের কাছে৷ সে কালো। এটা কী তার দোষ?

ছোটবেলায় শ্রুতি ভীষণ মন খারাপ করতো তার কালো হওয়া নিয়ে৷ এমনকি এখনো করে৷ নিজেকে ছোট করে সে কালো বলে৷ নিজেকে নিচু চোখে দেখে। অথচ বিভা! সে কখনো নিজের গায়ের রঙ নিয়ে অসন্তুষ্ট ছিল না৷ বরং সর্বদা সে শুকরিয়া আদায় করতো নিজের গড়ন নিয়ে৷ আজ প্রথমবার তার খারাপ লাগছে। মনে হচ্ছে, সে ফর্সা হলেও পারত!

বিভা হাসলো৷ কি বাচ্চাদের মতো চিন্তা করছে সে? উনি নাহয় উনার অপছন্দের একটি দিক বলেছে। তাই বলে মন খারাপ করতে হবে? যা সত্যি তা বলবে না? অবশ্যই বলবে৷ সে কালো তাই তাকে কালো বলেছে৷ এতে কষ্ট পাওয়ার কী আছে? লোকটা বড্ড খাপছাড়া। কখন রেগে থাকে, কখন খুশি থাকে বোঝাই যায় না৷ কিছুক্ষণ রেগে রেগে কথা বলল আবার কি সুন্দর যাওয়ার আগে তাকে খেতে যেতে বলল। বিভা তো ভেবেছিল সকালের মতো রাতেও রাগ করে খাবে না৷ একি! চোখ থেকে কী গড়িয়ে পড়ছে? অশ্রু?

________

চলবে~

#শারমিন_ইরান

#একগুচ্ছ_শুকতারা

শব্দসংখ্যা - ১২০২

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ৯ম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন