একগুচ্ছ শুকতারা
শারমিন ইরান
১১.
পেরিয়ে গেছে ৭ দিন৷ কেমন যেন চোখের পলকে পেরিয়ে গেল৷ শ্রুতি বসে আছে। চোখের চাঞ্চল্যতা দেখেই বোঝা যাচ্ছে কারো অপেক্ষায় আছে সে৷ আজ সকালে সে বসে ছিল ছাদে। রোদের মধ্যে৷ তখনই পার্থিবের আগমন৷ এসেই বলা শুরু করল,
‘শ্রুতি, আপনার মনটা কী সবসময় খারাপই থাকে? একটা সময়ও আমি আপনাকে হাসতে দেখিনা৷ কিন্তু কেন? মাঝেমধ্যে তো একটু হাসতেও পারেন৷ তাই না?’
শ্রুতি তাকাল৷ কিছু বলল না৷ এমনিতেও পার্থিব শ্রুতির উত্তরের আশা করে না৷ পার্থিব শ্রুতির আরেকটা নাম দিয়ে দিল - ‘বোবা বউ’। ছোটবেলায় থাকতে রাতে তাকে প্রচুর বোবা ভূতে ধরতো৷ শরীরে কেমন চেপে বসতো! অসাড় অসাড় লাগতো শরীর। তখন বিভিন্ন সূরা, আয়তুল কুরসি পড়ে ভূত ছাড়াতে হতো৷ ভাবলেই কেমন গা শিউরে ওঠে! যদিও পার্থিব ভূতে ভয় পায় না তবে তার ‘বোবা ভূত’ ব্যাপারটা হজম হয় না ঠিক৷ আর এখন সেই বোবায়'ই তার বউকে ধরেছে৷ আচ্ছা আয়তুল কুরসি পড়ে ফু দিলে কী তার বউও ‘বোবা’ থেকে নিস্তার পাবে? কে জানে! যত্তোসব আজগুবি চিন্তাভাবনা!
হটাৎ করেই পার্থিব বলল, ‘শ্রুতি, আপনি তো আমার জন্য কখনো অপেক্ষা করেন না৷ আজকে করবেন? দেখবেন আজকে আমি আপনাকে চমকে দিব৷’
শ্রুতির কী হলো সে জানে না৷ পার্থিবকে দেখে মায়া হলো৷ ছেলেটা কেমন যেন! কই শ্রুতি তো ভালো করে কথাও বলে না৷ অথচ সে! কেমন করে একা একাই কথা বলে৷ শ্রুতির মন ভালো করতে চেষ্টা করে৷ মলিন হাসল শ্রুতি৷ বলল,
‘আমি আপনার জন্যে অপেক্ষা করব৷’
ছোট্ট একটা কথায় যে পার্থিব কী পরিমাণ খুশি হলো তা হয়তো কেউ জানবে না৷ পার্থিব আচমকা একটা কাজ করে বসল৷ শ্রুতি অবাক হয়ে পার্থিবের হাসিমুখের দিকে তাকিয়ে রইল৷ পার্থিব তার ঠোঁটের হাসি বজায় রেখেই দরজার কাছে যাচ্ছে। পার্থিবের পিঠের দিকে বসে থাকা সত্ত্বেও শ্রুতি ঘাড় বাঁকা করে পার্থিবের হাসিমুখ দেখার চেষ্টা করছে৷ পার্থিব চলে গেছে৷ শ্রুতি নিজের হাতের দিকে তাকাল৷ পার্থিবের ঠোঁটের ছোঁয়া যেন হাতে এখনো লেগে আছে৷ শ্রুতি অনুভব করতে পারছে৷ মনে হচ্ছে এইতো হাতের এইখানে ঠোঁটের ছাপ৷
শ্রুতির ঘোর কাটল৷ অন্যদিন রেগে থাকে৷ অথচ আজকে সকাল থেকেই তার মনটা খারাপ৷ দুপুরবেলা দাদীকে কল দিল৷ হামিম কথা বলেনি তার সাথে। সেখানে তো মন খারাপ হলোই সাথে যখন সন্ধ্যা বেলা বিভাকে কল দিয়েও পেল না তখন আরোও মন খারাপ হলো৷
অন্যদিন আটটা, সাড়ে আটটায় চলে আসে আজকে নয়টা দশ বাজে৷ এখনো এলো না৷ শ্রুতি আজকে পার্থিবের জন্য শরবত বানিয়ে অপেক্ষা করছে। অপেক্ষা যেহেতু করবেই ভালোভাবেই নাহয় করুক৷
কলিংবেল বাজল৷ শ্রুতি সুন্দরমতো উঠে রান্নাঘরে গিয়ে ফ্রিজ থেকে শরবত নিয়ে এসে নিজের রুমের টেবিলে রাখল। এতোক্ষণে কেউ না কেউ দরজা খুলেছেই৷ হালকা চেঁচামেচির আওয়াজ পাওয়া যাচ্ছে। শ্রুতি সেদিকে নিজের খেয়াল দিল না৷ এই বাড়িতে চিৎকার-চেঁচামেচি নিত্যদিনই হয়৷ সারাদিন হৈ-হুল্লোড় লেগে থাকে বৈকি।
‘শ্রুতি!’
শ্রুতি পার্থিবের গলা পেয়ে পিছনে ঘুরল৷ এতোক্ষণে সে নিজের রুমেই ছিল৷ পার্থিবকে দেখে সে মলিন হাসল৷ শরবতের গ্লাস এগিয়ে দিল৷ পার্থিবের মাঝে হটাৎ করেই উৎফুল্লতা দেখা দিল৷ সে শরবতের গ্লাস শ্রুতির হাত থেকে নিয়ে রাখতে রাখতে বলল,
‘শ্রুতি, শরবত রাখুন। আমার সাথে আসুন৷ আপনি চমকে যাওয়া এখনো পাওনা আছেন৷’
মনঃক্ষুণ্ন হয়েও হলোনা শ্রুতির৷ শুধু ভাবল, শরবত টা খেয়ে যেতে পারতো৷ যাই হোক, এই সামান্য ব্যাপারে মন খারাপ করার কিছু নেই৷ শ্রুতি আমলে নিল না৷ পার্থিব শ্রুতির হাত ধরে টেনে নিয়ে যাচ্ছে৷ রুম থেকে বের হওয়া মাত্রই পার্থিব শ্রুতির পিছনে গিয়ে নিজের দুই হাতের মাধ্যমে চোখ বেঁধে দিল। ধীরে ধীরে এগুচ্ছে শ্রুতি৷ সবার কথা কানে আসছে কিন্তু সে বুঝতে পারছে না৷ পার্থিব থেমে গেল শ্রুতিকে নিয়ে৷ অগত্যা শ্রুতিকেও থামতে হলো৷ মোলায়েম কন্ঠে পার্থিব বলল,
‘দেখুন তো এটা কে?’
শ্রুতি চোখ মেলল৷ চোখ মেলা মাত্রই যেন চমকে উঠে দু পা পিছিয়ে গেল৷
তার সামনের সোফাতেই হামিম বসে আছে৷ শ্রুতি একবার পার্থিব, একবার হামিমের দিকে তাকাচ্ছে৷ ঠিক দেখছে তো? হ্যাঁ ঠিকই তো৷ তার সামনেই হুইল চেয়ারে হামিম বসা। না, বসা নয়। মাথাটা হেলে পরছে৷ এরমানে ঘুমানো বা অজ্ঞান৷ অজ্ঞান কেন হবে? শ্রুতি তাকিতুকি করছে চারিদিকে৷ কী হচ্ছে মাথায় ঢুকছে না৷ মাথাটা কেমন হঠাৎ ফাঁকা হয়ে গেল৷
‘ও এখানে কী করছে?’
‘কী আবার করবে? বোনের বাড়িতে এসেছে৷’
শ্রুতি ভ্রু কুঁচকে তাকাল। সামনে তাকিয়ে দেখল তার শ্বশুর পরিবারের সবাই মোটামুটি উপস্থিত আছে৷ তাদের কোনো প্রশ্ন না দেখে শ্রুতির কপালের ভাঁজ দৃঢ় হলো৷ বুঝল হয়তো তারা আগে থেকেই জানতো পার্থিব এমন কিছু করবে৷ কিন্তু এসবের মানে কী?
চাচি শ্বাশুড়ি শ্রুতিকে উদ্দেশ্য করে বললেন, ‘কিছু মনে করোনা নতুন বউ৷ কিন্তু তোমাদের বিয়ে পাকাপাকির সময় তো তোমার বাবা বলেছিলেন তোমরা দুই বোন৷ তাহলে…..’
শ্রুতি চাচি শ্বাশুড়ির কথা অর্ধেক বুঝেই অস্বস্তিতে পড়ে গেল৷ মাথা নিচু করে মেঝেতে তাকিতুকি করতে লাগল৷
পার্থিব বলল, ‘চাচিআম্মু, তুমি ভুল বুঝছো৷ আমার শ্বশুরবাবা কিন্তু বলেছিল যে তার ছেলে আছে কিন্তু অসুস্থ ছিল বলে সামনে আনে নি৷ ভুলে গেছ?’
রুমা বেগম ভ্রু কুঁচকালেন৷ পার্থিবের কথা অনুযায়ী মনে করতে চেষ্টা করল, পারল না৷ তবে কী সে কানে কম শোনা শুরু করেছে? কী ভয়াবহ ব্যাপার!
‘শ্রুতি, ভাইকে ঘরে নিয়ে যাও৷ ও তোমাদের ফ্ল্যাটেই থাকুক৷ কেমন?’ তানহা জিগ্যেস করলেন৷
শ্রুতি হাসল৷ সব ছেলেরা মাত্রই বাড়ি ফিরল৷ তবে আসাদুজ্জামান এখনো ফেরেনি৷ সবাই ধীরে ধীরে নিজেদের ফ্ল্যাটের দিকে চলে গেল৷ পরে এসে দেখা করা যাবে৷ যাওয়ার আগে তানহা বলে গেলেন নিচে চলে যেতে, নাস্তা বানিয়েছেন৷ সবাই একসাথে যেন খায়৷
.
‘এইসবের মানে কী পার্থিব? আপনি এটা কী করেছেন আপনি জানেন? আমার ভাই এখানে কেন?’
পার্থিব তাকিয়ে আছে শ্রুতির দিকে৷ কিছুক্ষণ আগেই হামিমকে পাশের রুমে শুইয়ে দিয়ে এসেছে৷ এরপর নিজে অফিসের কাপড় পালটে ফ্রেশ হয়ে শ্রুতির সামনে এসে বসেছে। সে জানে শ্রুতি যে তান্ডব নাচ শুরু করবে, তাই আগে থেকেই সবকিছুর পরিকল্পনা করা ছিল৷
‘আপনাকে কিছু জিগ্যেস করছি আমি, পার্থিব?’
‘আপনার মুখে আমার নামটা ভীষণ সুন্দর শোনায়৷ আপনি অনেক ক্ষোভ নিয়ে আমাকে ডাকেন৷ শুনতে ভালো লাগে৷’
শ্রুতি তাকিয়ে রইল৷ রাগে, উত্তেজনায় তার হাত,পা কাঁপছে৷ যখন থেকে সে বুঝেছে যে যা ঘটছে সব বাস্তব, তখন থেকেই তার মাথা খারাপ৷ শ্রুতি শীতল স্বরে বলল,
‘আমার ভাই এখানে কেন?’
‘বোনের বাসায় আসতে পারে না?’
‘আমাকে জানান নি কেন?’
‘সারপ্রাইজ ছিল বলেছিলাম না? গত এক সপ্তাহ ধরে আপনাকে মুড অফ দেখতে দেখতে আমি বিরক্ত৷ আর কতো?’
আচমকা চিৎকার করে উঠল শ্রুতি, ‘আমি মরে যাইনা কেন, আপনার কী?’
পার্থিব দরজার দিকে তাকাল৷ সে আসল দরজা বন্ধ তো করেছেই, বেড রুমের দরজাও বন্ধ করে বসেছে৷ ফ্ল্যাটের বাইরে থেকে কী চিৎকার শোনা যাচ্ছে? পার্থিব উঠে দাঁড়াল। বলল, ‘শান্তি, শান্তি, শান্তি৷ আসুন, বসে কথা বলি৷’
হাত ধরে খাটে বসাল৷
‘বলুন, কী জানতে চান?’
‘হামিমকে ওই বাসা থেকে আসতে দিল? আর আপনার পরিবার কোনো প্রশ্ন করল না কেন?’
‘কী আশ্চর্য! গাধার মতো কথা বলছেন শ্রুতি৷ বোনের বাড়িতে ভাই আসতে পারে না? আর আপনার বাবা আমার কথা ফেলেন না আমি যা বুঝেছি।’
‘আর আপনার পরিবার?’
‘আপনার আপনার কী? এইটা আপনারও পরিবার হয়েছে গত ২ সপ্তাহ আগে৷ আর তাদের সব বলেই রেখেছিলাম৷ তারা সবাই ভীষণ খুশি৷’
‘হামিমকে কতোদিনের জন্য আনলেন? ফিরবে কবে ও?’
শ্রুতির কথায় পার্থিব বিরক্ত হলো৷
‘আপনি এমন ভাবে কথা বলছেন যেন হামিম আমার কেউ না৷ ছোট ভাইয়ের মতো আমার ও৷ আমার বড় বোনের ভীষণ শখ ছিল৷ তাই বিভা আপাকে নিজের বড় বোন মনে করি৷ আমার কাছে সে অতি সম্মানের৷ ঠিক একইভাবে হামিম আমার কাছে অতি স্নেহের৷ আর আমার স্নেহ সম্পর্কে আপনি ধারণাও করতে পারছেন না৷’
‘হুম৷ সত্যিই ধারণা করতে পারছি না৷ তবে আপনি যে দয়া করছেন তা বুঝতে পারছি৷’
পার্থিব উঠে দাঁড়াল,
‘আপনি বড্ড বাজে কথা বলেন৷ বাজে কথা থেকে দূরে থাকা স্বাস্থ্যের পক্ষে ভালো৷ আর যদি দূরে না থাকেন তাহলে শাসন করা শুরু করতে হবে৷নিচে আসুন, আম্মা যেতে বলেছে।’
শ্রুতি যেন পার্থিবের কথা শুনতেই পেল না৷ কন্ঠে ক্ষোভ মিশিয়ে বলল,
‘আপনি আমাকে শাসন করবেন?’
‘যদি ভালোবাসতে পারি তবে শাসনও করতে পারব৷ দোষ কোথায়?’
_______
চলবে~
শব্দসংখ্যা - ১০১৫
#শারমিন_ইরান
#একগুচ্ছ_শুকতারা
[এতো বাজে ১ টা পর্বের জন্য দু:খিত।]