ফন্ট সাইজ:
থিম:
একগুচ্ছ শুকতারা

১০ম পর্ব

লেখক: শারমিন ইরান

একগুচ্ছ শুকতারা

শারমিন ইরান

১০.

সোফায় বসে আছে প্রভা-প্রত্যাশা। উদ্দেশ্য নেটফ্লিক্সে মুভি দেখা৷ সেই সাথে মুড়ি খাওয়া৷ সামনের সোফাতেই আছেন তানহা৷ সামনের দুটো মেলামাইন এর প্লেটে মাংস বেড়ে দিচ্ছেন৷ মেয়ে দুটো হয়েছে অকর্মার ঢেকি। একটা কাজ পর্যন্ত নিজে করে না৷ ক্লাস ১০ এ পড়ে৷ এখন করবে না তো করবে কখন? মাংস দিয়ে মুড়ি খাবে তো নিজে বেড়ে খা, নাহহ৷ তা করবে না৷ যদি বলে ‘নিজে বেড়ে খা’ উল্টো বলবে, ‘থাক এখন খাব না৷ পরে খাব৷’ সেই পরে টা আর আসে না৷ বাধ্য হয়ে সেই বেড়ে দিচ্ছেন৷

কলিংবেল বাজলো। পার্থিব ঢুকছে সদর দরজা দিয়ে৷ তানহার কী যেন মনে হলো হটাৎ৷ ছুটে গেলেন পার্থিবের কাছে৷

মাকে এইভাবে ছুটে আসতে দেখে মসৃণ হাসলো পার্থিব৷ বাসায় ঢুকে মাকে দেখলে তার ভালো লাগে৷ ভীষণ ভালো লাগে৷

‘এইভাবে ছুটে আসলে যে! কিছু বলবে মা?’

‘হ্যাঁ রে বাবা৷ বলবো তো৷ তার আগে আয় একটু বস৷’

‘না মা আগে বলো তুমি৷ যেভাবে আসলে হয়তো জরুরি কিছু৷’

‘আমি তাড়াতাড়ি এসেছি না রে? আচ্ছা বাবা শোন না, আমার না খুব চিন্তা হচ্ছে রে।’ নিজের কাজ সম্পর্কে নিজেই জ্ঞানহীন হয়ে পড়লেন তানহা৷ এইভাবে তার ছুটে আসা উচিত হয়নি৷ ছেলেটাকে বসিয়ে ধীরে সুস্থেও বলা যেত৷

‘বলো মা কী বলবে?’

‘বাবা। শ্রুতির সাথে একটু কথা বলিস তো বাবা৷ মেয়েটার মনটা বেজার হয়ে আছে৷ হয়তো বাড়ির কথা মনে পড়ছে৷ তুই একটু ওর সাথে মেশার চেষ্টা কর বুঝলি?

নিজের বাড়িঘর ছেড়ে অপরিচিত জায়গায় কতোই আর ভালো লাগবে বল? সকাল বেলা মুখটা এইটুকুন হয়ে ছিল৷ আমার বড্ড মায়া হলো, জানিস৷ তুই একটু দেখ না বাবা৷’

পার্থিবের মনটা ভালোবাসায় ছেয়ে গেল নিজের মায়ের এমন সরলতায়৷ তার মা কী একটু বেশি সরল? পার্থিব একটা কাজ করে বসলো৷ তানহার কপালে চুমু দিয়ে বলল ‘চিন্তা করোনা৷ দেখছি তোমার বউমার কী হলো…..’

পার্থিব মিষ্টি হেসে চলে গেল৷ পার্থিবের কাজে তানহা মোটেও অবাক হলেন না৷ এটা পার্থিবের স্বভাব৷ সে তার ভালোবাসা প্রকাশ করতে ভালোবাসে৷ এর আগেও এমন ঘটনা অহরহ ঘটেছে৷ এমনকি তার নিজের কাছেও তার ছেলের ভালোবাসাগুলো ভালো লাগে৷

প্রত্যাশা ড্যাবড্যাব করে তাকিয়ে ছিল৷ সে পার্থিব-প্রভার চেয়ে আলাদা৷ একটু রাগী৷ রাগী বলতে ছোট ছোট কারণেই সে রেগে যায়৷ যেমন এখন৷ তার চোখে রাগের হালকা আভাস৷ তবুও তা মুখে প্রকাশ পাচ্ছে না৷ তবে মনে মনে সে ইতিমধ্যে শ'খানেক গালি শ্রুতিকে দিয়ে দিয়েছে। প্রত্যাশার একটা স্বভাব আছে। সে কল্পনা করে তার ভিতরে একটা ডায়েরি আছে৷ সে যা বলে তা সেই ডায়েরিতে লেখা হয়ে যায়৷ মনে মনে সে বলল, ‘আমার আম্মুকে যারা কষ্ট দেয় তাদের আমি কখনো ক্ষমা করিনা৷ তোমাকেও করবো না ভাবি।’ প্রত্যাশা কল্পনা করছে তার বলা কথাটা ধীরে ধীরে তার মনের ডায়েরীর পাতায় লেখা হয়ে যাচ্ছে৷

.

ফেসবুকিং করছে মাহাথির৷ আজকাল ভালো লাগে না কিছুই৷ সে তো একাই ভালো ছিল। কী দরকার ছিল আরেকটা মেয়ের জীবন নষ্ট করার? সে তার আম্মা আব্বা কে বলেওছিল বিয়ে করালেও সে সংসার করবে না৷ আম্মা আব্বা তার কথার কোনো গুরুত্বই দেয়নি৷ আব্বা বলেছিল, ‘যা হবে পরে দেখা যাবে৷’

হলো তো এখন৷ বিয়ে করালো৷ সংসার? সেটা কী করে করাবে? যা ইচ্ছে হোক, তার কী! সে সেটাই করবে যেটা সে চায়৷

‘মাহাথির!’

মাহাথির তাকাল। মেয়েটা কফি হাতে দাঁড়িয়ে আছে৷ মাহাথির লক্ষ্য করল, মেয়েটা অন্যদের তুলনায় খুব সুন্দর করে মাহাথির উচ্চারণ করে৷ তার আব্বা,আম্মা,বন্ধু-বান্ধবদের তুলনায় নামটায় খানিকটা মায়া মিশিয়ে উচ্চারণ করে৷ অন্য সবাই উচ্চারণ করে ‘মাহাতির’। অথচ সে! মাহাথির নামটিকে খানিকটা সময় নিয়ে বড্ড যত্ন করে উচ্চারণ করে ‘মাহ্ থিইইর’। মাঝের আ-কার টা হালকা শোনা যায়৷

বিভা কফি দিতে আসায় রাগ করলো না৷ কারণ সে নিজেই চেয়েছে৷ কফিতে চুমুক দিয়ে মাহাথির বলল, ‘আমাকে মাহাথির বলে নিজেকে আমার আপনজনদের তালিকায় ফেলার চেষ্টা করো না৷ লাভ হবেনা।’

বিভা হাসে লোকটার পাগলামি দেখে৷ নাম নিয়ে কী কাহিনীটাই না করছে বেচারা৷ আচ্ছা সে যতোবার নাম তার উচ্চারণ করবে ততোবারই কী মাহাথির তাকে নানান কথা শুনাবে? কিন্তু কেন? শুধুমাত্র কালো হওয়ার কারণে?

বিভা আয়নার সামনে গেল৷ আয়নাটা ছোট৷ শুধু তার মুখ দেখা যাচ্ছে৷ মাহাথির তার অন্য কোনো দোষ ধরলে সে তা জানপ্রাণ দিয়ে শুধরানোর চেষ্ট করতো। কিন্তু গায়ের রঙ কী করে বদলাবে? বিভা ঠিক করলো সে মাহাথিরকে অনুধাবন করাবে, কালো মানেই খারাপ মানুষ নয়৷ কালো মেয়েরাও পারফেক্ট বউ হতে পারে৷ অবশ্যই পারে৷

বিভা নিজের হাতের দিকে তাকাল৷ দাগ খুঁজতে চেষ্টা করল৷ পেল না৷ শ্যামলা হাতে দাগ পরে না৷ তবে হাতটা এখনো খানিকটা জ্বলছে। আজ সে তার হাত পাথর জাতীয় ছোট একটা টুকরো দিয়ে ইচ্ছেমতো ঘষেছে৷ যদি ফর্সা হয় সেই আশায়….সুন্দর হতে কে না চায়!

.

বিছানার একপাশে কাত হয়ে শুয়ে আছে শ্রুতি৷ হাত দুটো সামনে থাকায় তার নজর হাতের দিকে৷ হাতে তার সুন্দর দুটো চুড়ি৷ ছোট ছোট গোল গোল বৃত্ত দিয়ে বানানো পুরো চুড়িটা৷ বউ বউ চুড়ি৷ অথচ শ্রুতির মনে হচ্ছে চুড়ি দুটো ফর্সা কারোর হাতে থাকলে যতোটা মানাতো তার হাতে একদমই মানাচ্ছে না৷ তবে তার চুড়ি দুটোর কারণে তার নিজের হাত নিজের কাছেই বউ বউ লাগছে৷ আসলে চুড়ি দুটো তার ভীষণ পছন্দ হয়েছে৷

শ্রুতি জানে চুড়িটা পার্থিবই দিয়েছে৷ কয়েকদিন আগেই সে ঘুম থেকে উঠে সকাল বেলা মুখ মোছার সময় চুড়ি দু'টো নিজের হাতে দেখেছে৷ পার্থিবকে কিছু বলেনি শ্রুতি৷ অযথাই তর্ক হবে৷ মানুষটার সাথে তর্কে পেরে ওঠা মুশকিল।

‘শ্রুতি,শরীর খারাপ লাগছে?’ বলার সাথে সাথে নিজের হাতটা এগিয়ে শ্রুতির কপালে ঠেকাল পার্থিব৷ গা হালকা গরম৷ তবে স্বাভাবিক তাপমাত্রা। তবুও জিজ্ঞেস করল, ‘আপনার কী গায়ে জ্বর?’

শ্রুতি উঠে বসল৷ নির্লিপ্ত কন্ঠে বলল, ‘আমার গা সবসময় এমনই থাকে৷ জ্বর না৷’

‘ও আচ্ছা বুঝতে পেরেছি৷ আপনার মাথার সাথে সাথে শরীরটাও সবসময় গরম হয়েই থাকে৷ হটে হটে হট স্কয়ার। না মানে গরম স্কয়ার৷’

শ্রুতির ভ্রু কুঁচকে চেয়ে রইল৷ পার্থিব হেসে দিয়ে শ্রুতির সামনে বসল। সরল,নির্লিপ্ত কন্ঠে আদর মিশিয়ে বলল, ‘সকালবেলা মন খারাপ কেন ছিল আপনার? কোনো সমস্যা? সমস্যা থাকলে আমায় বলতে পারেন৷’

পার্থিবের কথা বুঝেও যেন বুঝল না শ্রুতি৷ মন খারাপ তো তার প্রায় সবসময়ই থাকে৷ শ্রুতি না বুঝে বলল, ‘মানে?’

‘মা বলল আপনার নাকি সকালবেলা মন খারাপ ছিল৷ আপনি নাকি মুখটা একদম ছোট্ট করে বসে ছিলেন৷ আপনার মুখ দেখেই মা বুঝে ফেলেছে আপনার মন খারাপ। তাইতো আমি বাসায় ফেরার সাথে সাথেই আমাকে রুমে পাঠিয়ে দিল আপনার মন খারাপের কারণ শোনার জন্যে৷ এবার বলুন তো কী কারণে আমার বউয়ের মন খারাপ ছিল?’

শ্রুতি চুপচাপ পার্থিবের দিক থেকে চোখ ফেরাল৷ পার্থিবের কথাটা ভুল৷ সে সকালবেলা মন খারাপ করে ছিল না৷ রেগে ছিল৷ আমিন সাহেবের সাথে কথা বলার কারণে সেই সময় তার রাগ ছিল আকাশচুম্বী। ঠিক সেই সময়েই তানহা তার পাশে বসে কিছু জিজ্ঞেস করছিল৷ সামনেই ছিল প্রত্যাশা৷ সে তানহাকে উত্তর তো দেয়'ইনি উলটো ধমকের স্বরে কিছু বলে উঠে এসেছিল৷ রুমে এসে নিজের কাজের জন্য নিজেই ভীষণ অনুতপ্ত ছিল শ্রুতি৷ কিন্তু এই বাড়ি থেকে চলে যেতে হলে এভাবেই সবাইকে নিজের প্রতি বিষিয়ে তুলতে হবে৷

কিন্তু মা! তার তো উলটো পার্থিবের কাছে নালিশ করা উচিত ছিল৷ উলটো সে আমার মন খারাপের কারণ জানতে চেয়েছে৷

‘আপনাকে কিছু প্রশ্ন করলে আপনি অন্য জগতে চলে যান কেন শ্রুতি? উত্তর কী অন্য জগতে আছে?’

শ্রুতি মাথানিচু করে বসে আছে৷ পার্থিব বলল, ‘বললেন না তো মন খারাপের কারণ?’

‘ভা..ভাই এর জন্য মন খারাপ ছিল আমার৷’ কন্ঠ কাঁপা শুনালো শ্রুতির৷ ভাইয়ের জন্য মন খারাপ নয়৷ তার এখন মন খারাপ তার এই মায়ের জন্য। এই মা হয়তো তাকে সত্যিই ভালোবাসে! এই যে তার মাথায় তেল দেওয়া, এটা তো তার এই মায়েরই কাজ৷ শুধু তাই নয়৷ যত্ন করে তেল দিয়ে বেনীও পাকিয়ে দিয়েছে৷ এইসব তো আর নাটক নয়। ভালোবাসা। কিন্তু শ্রুতি তো এই ভালোবাসার যোগ্য নয়৷ বড্ড অযোগ্য পাত্রী!

পার্থিব হেসে দিয়ে, ‘শ্রুতি, আপনি পারফেক্ট একজন মানুষ৷ পারফেক্ট একজন মেয়ে৷ পারফেক্ট একজন বোন৷ পারফেক্ট একজন বাড়ির বউ৷ এইবার বলুন তো, আপনি আমার জন্য পারফেক্ট বউ কবে হবেন?’

‘কোনোদিনও না৷’ মাথা নিচু করে বলে ফেলল শ্রুতি৷ কথাটা সে মনে মনে বলতে চেয়েছিল৷ কিন্তু মুখ ফসকে বেরিয়ে গেল৷

‘হবেন, হবেন৷ আমার আদর্শ বউও হবেন৷ সেদিন অবশ্যই আসবে৷ আপনার মুখের আমার জন্য চিন্তা থাকবে৷ ভালোবাসা থাকবে৷ জানেন শ্রুতি, আমি স্বপ্ন দেখি, আপনি একদিন আমাকে খুব খুব খুব বেশি ভালোবাসবেন৷ ভালোবাসবেন না?’

পার্থিবের আকুতিভরা কন্ঠে শ্রুতির বুকটা ধ্বক করে উঠল৷ মানুষটা কেমন করে যেন কথা বলে। তার কথার মাঝে হারিয়ে যায় শ্রুতি৷ আচ্ছা এই পরিবার এর মানুষগুলো কী সত্যিই আলাদা? পার্থিব! সে কী আলাদা? নাকি কোনো একদিন পার্থিবও বদলে যাবে অন্যদের মতো৷ অন্যদিকে মুখ ফিরিয়ে নিল শ্রুতি৷ মানুষটার সামনে কেন যেন শ্রুতির নিজেকে মেলে ধরতে ইচ্ছে করে। শ্রুতি তো এমন নয়। সে তো ছিল আর পাঁচটা স্বাভাবিক মানুষের মতোই৷ ধীরে ধীরে কেমন করে যেন বদলে গেল সব৷ শ্রুতির কেন জানি পার্থিবের সামনে নিজেকে অসহায় লাগে৷ পার্থিবকে নিজের মনের সব কথা বলতে ইচ্ছে করে৷ কিন্তু শ্রুতি নিজের কঠোর খোলস থেকে বেরিয়ে আসতে পারে না৷ আসলে বেরিয়ে আসে না৷ কারণ সে জানে পৃথিবীতে সবাই এক৷ স্বার্থপর,লোভী,অকৃতজ্ঞ! আচ্ছা পৃথিবীতে একটাও খারাপ মানুষ না থাকলে পৃথিবীটা কেমন হতো?

_________

চলবে~

#একগুচ্ছ_শুকতারা

#শারমিন_ইরান

শব্দসংখ্যা - ১৩২০

[ক্ষুদ্র থেকে ক্ষুদ্রতর ভুলও ধরিয়ে দেবেন৷ মানুষ মাত্রই ভুল৷ আমি নিজের ভুল শুধরে শিখতে চাই৷]

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ১০ম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন