একগুচ্ছ শুকতারা
শারমিন ইরান
২২.
বিভা-মাহাথির সবেমাত্র বাসায় পৌঁছাল। ইতোমধ্যে ঝড় শুরু হয়ে গেছে। বৃষ্টির ছাঁটে দুজনেই হালকা পাতলা ভিজে গেছে।
মাহাথির বের হতেই বিভা গিয়ে ভেজা জামাকাপড় ছেড়ে নিল। রান্না করতে হবে রাতের। বাসায় তো কিছুই নেই। তাড়াতাড়ি রান্নাঘরে গেল।
বেশ কিছুক্ষণ পর গামছা শুকাতে ঘরে ঢুকল বিভা। বারান্দায় মেলে দিয়ে ঘরে এলো। মুখে ক্রিম মাখল হালকা। এরই মধ্যে মাহাথিরের কাঁশির শব্দ শুনতে পেল। ভ্রু কুঁচকে পেছন ফিরল। বিছানায় আধশোয়া হয়ে ফোন টিপতে টিপতে খুঁক খুঁক করে কাঁশছে মাহাথির।
হালকা অবাক হলো বিভা। বৃষ্টিতে ভিজতে না ভিজতেই ঠান্ডা লেগে গেল? অবশ্য কম সময়ই ভিজে নি। আনাস ভাইয়ের বাসা তাদের বাসা থেকে ভালোই দূরত্বে। চল্লিশ মিনিট লাগে আসতে-যেতে। বাসায় থেকে নামার পর পরই বৃষ্টি শুরু হলো। তাহলে তো ভালোই ভেজা হয়েছে। তাছাড়া এর আগেও একদিন অফিস থেকে ভিজে ভিজে বাড়ি এলো। অসময়ের বৃষ্টি মানেই খারাপ। বিভা ঘর থেকে নিশ্চুপে বেরিয়ে গেল।
.
ড্রইংরুমে বসে আছে সবাই। খাওয়া-দাওয়া শেষ। এখন ঘুমাতে যাওয়ার পালা। সবাই বসে আছে একসাথে। দিনের এই সময়ই তো সবাই একটু একসাথে সময় কাটাতে পারে।
আসাদ সাহেব একটা প্যাকেট নিয়ে এক গদির সোফায় বসল। প্রভা-প্রত্যাশা দুজনেই তার কিছু দূরে বসা। প্যাকেট থেকে বের করল শ্যাম্পু, তেল। তেল গুলো নিজের দুই মেয়ের দিকে ঠেলে দিয়ে বলল, ‘এই উঠতি বয়সে তেল লাগাতে হবে চুলে। নয়তো চুল ভালো হবেনা। তেল হলো চুলের খাবার। আজ রুমে গিয়ে দেখলাম তেল নাই। তাই নিয়ে আসছি দুজনের জন্য। তেল নাই যে বলবে না?’
প্রভা মুখ কুঁচকে ফেলল তেল দেখে। তেল নিয়ে তার যত বিরক্তি! প্রত্যাশা ঠোঁটে ভাসা ভাসা হাসি ঝুলিয়ে তেল নিজের দু'হাতে তুলে নিল। তার বাবা কত্তো ভালো! কত্তো খেয়াল রাখে - ভাবতেই তার ভীষণ খুশি লাগে। নিজেকে প্রিন্সেস মনে হয়। শুধু বাবা না, পার্থিব ভাইয়া, হিমেল ভাইয়া, চাচ্চু সবাই তাদের দু'বোনকে অনেক ভালোবাসে। একারণে প্রায়ই প্রত্যাশা আল্লাহকে থ্যাংকিউ দেয় তাদের মেয়ে করে পাঠানোর জন্য। মেয়ে না হলে, এতো ভালোবাসা পেত কোথায়?
ঘটনাটা চুপচাপ বসে দেখল শ্রুতি। মনে পড়ল বিভার কথা। তার আপা বলেছিল - এই পৃথিবীতে যদি সবচেয়ে নিকৃষ্ট বাবা থেকে থাকে, তাহলে সবচেয়ে ভালো, পবিত্র বাবাও আছে।
তার বাবা তার আপা, তাকে, ভাইকে – কাউকে ভালোবাসে না। উনার নাকি কালো মানুষ দেখলে বমি আসে। মা মারা যাওয়ার পর যখন তার বাবা নতুন বিয়ে করে ঘরে তুলল। তখন শ্রুতি কিছুতেই ব্যাপারটা মানত না। প্রায়ই আমিন শিকদারকে এটা সেটা বলত, কোলে উঠতে চাইতো, আগের মতো ভালোবাসতে বলত। এক পর্যায়ে আমিন সাহেব তাদের সাথে অতিরিক্ত খারাপ ব্যবহার করতে শুরু করল। তখন অতোকিছু না বুঝতেও বড় হতে হতে আমিন সাহেবের কথার গভীরতা শ্রুতি মাপতে শিখেছে। আচ্ছা তার বাবা ভালো হলো না কেন? তার বাবাও তো তাদের দুই বোনের জন্য তেল নিয়ে আসতে পারতো। একজন ভালো বাবা হতে পারতো।
হঠাৎ দাদিকে দেখতে ভীষণ ইচ্ছা করল শ্রুতির। এই মানুষটাকেও সে অসম্ভব ভালোবাসে। এই মানুষটা না থাকলে তাদের তিন ভাই-বোনকে বাড়ি থেকে বের করে দিতেও হয়তো দু'বার ভাবতো না কেউ। অথচ এখন শুধু ফোনে কথা হয়। তবুও, ৫ দিন হলো শ্রুতি ফোনটোন দিচ্ছে না। শ্রুতি ভাবল ফোন দিবে। কিন্তু মুখ দেখবে কীভাবে? দাদির তো বাটন ফোন। থাক, আপাতত কথা বলে নিক। ছোট্ট মুখ করে ধীরে উঠে গেল শ্রুতি।
.
বিভা ঘরে ঢুকল। দেখল মাহাথির অন্যদিক ঘুরে শুয়ে আছে। শরীর হালকা নড়ায় বুঝল এখনো কাঁশি হচ্ছে। অবশ্য খাওয়ার সময়ও কাঁশছিল।
বিভা বিছানায় উঠে বলল, ‘এদিকে ফিরুন।’
মাহাথির একবার পিছন ফিরে বিভার দিকে আর বিভার হাতে থাকা জিনিসের দিকে তাকাল। এরপর আবার আগের মতো হয়ে গেল। বিভা মাহাথিরের বাহুতে হাত রাখল, ‘এদিকে ফিরুন। ঠান্ডা লেগেছে। সেই কখন থেকে কাঁশছেন। এটা লাগালে আর কাঁশি হবে না।’
মাহাথির ভীষণ বিরক্তি নিয়ে ফিরল, ‘কী সমস্যা? ঘুমাতে দাও বিরক্ত করোনা।’
বিভা নিজের হাতে থাকা চামচের দিকে তাকাল। স্টিলের চামচে সরষের তেলের সাথে রসুন গরম করে এনেছে। আগে তার মা এরকম করত। এরপর বুকে, পায়ে, নাকে লাগিয়ে দিত। ঠান্ডা কমে যেত। অথচ মানুষটা কিনা লাগাতেই চাইছে না…
‘মাহাথির, ফিরুন। এইটা লাগিয়ে দিই। এরপর ঘুমান।’
মাহাথির ফিরল না। বিভা আবার ডাকতেই মাহাথির আকাশসমান বিরক্তি নিয়ে বলল, ‘তুমি কী চাচ্ছো আমি এখন এখান থেকে উঠে যাই? না চাইলে এখান থেকে যাও।’
বিভা ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে রইল। ঠান্ডায় কাঁশছে, আবার ভাবও দেখাচ্ছে। সে কী নিজের জন্য বলেছে নাকি?
কিছু সময় পার হলো। বিভা দুই হাতে মাহাথিরের বাহু ধরে নিজের দিকে ফিরাল। নিজের হাতেই অস্বস্তি, লজ্জা ঠেলে দিয়ে গেঞ্জি ঘুচিয়ে উপড়ে জমা করল। মাহাথির ঘটনার আকস্মিকতায় হতভম্ব হয়ে চেয়ে রইল কেবল। বিভা চামচ থেকে তেল নিয়ে বুকে ডলতে লাগল। সাথে তার শান্তস্বর,
‘এতো জেদ ভালো নয় মাহ্থির। পা/গলেও নিজের ভালো বোঝে। অথচ আপনি বোঝেন না। আমি কী ধরে নিব আপনি পাগলের থেকেও অবুঝ?’
বলেই মাহাথিরের চেহারার দিকে তাকাল। মাহাথির আগের মতোই গম্ভীর ভাবে তাকিয়ে আছে।
বিভা হাতে তেল মালিশ করে, পায়ের কাছে গেল। পায়ের তালুতে ধীরে ধীরে গরম তেল মালিশ করে দিল। মাহাথির যখন বুঝল যে বিভার কাজ শেষ, তখন মাহাথির এক লাফে উঠে বসল। বিদ্রুপের কণ্ঠে বলল,
‘তুমি একজন আদর্শ বউ, বিভা। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত তুমি আমার বউ।’
.
মাহাথির ঘুমিয়ে পড়েছে অনেকক্ষণ। বিভার ঘুম আসছে না। মাহাথির আজ অনেক আগেই ঘুমিয়েছে। অন্যদিন ১২ টা, ১ টায় ঘুমায়। আজ ১০ টার দিকেই ঘুমিয়ে পড়েছে।
বিভা সারা বাড়ি একা একা হাঁটল, নিজের মায়ের ডায়েরি পড়ল, বারান্দায় থাকা মাহাথিরের শার্ট এনে সুন্দর করে ভাঁজ করল।
আবারো বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে। বৃষ্টি নামবে, ঝড়ও কী আসবে? বিভা গিয়ে বারান্দায় দাঁড়াল। ঠান্ডা হাওয়ায় দাঁড়িয়ে থাকতে ভালো লাগছে। বিভা দাঁড়িয়ে রইল আর নিজের জীবনের হিসাব কষল।
রাত ১ টারও বেশি বাজে।
মাহাথিরের হঠাৎ করে ঘুম ভেঙে গেল। পাশে তাকিয়ে বিছানা খালি দেখে ভীষণ অবাক হলো। উঠে বসার পর লক্ষ্য করল ঘুমানোর আগে ভীষণ মাথা ব্যথা ছিল। এখন নেই।
মাহাথির বারান্দায় তাকিয়ে দেখল বিভা দাঁড়িয়ে আছে। ঢিলেঢালা কামিজ, একপাশে ওরনা ঝুলানো, চুলগুলোও খোলা।
মাহাথিরের ভীষণ গরম লাগল। উঠে পড়ল। বাথরুম থেকে ফ্রেশ হয়ে বারান্দায় গিয়ে দাঁড়াল। বিভা মাহাথিরের উপস্থিতি বুঝে বেশ চমকে গেল। মাহাথিরের দিকে তাকিয়ে কিছু বলল না। চুপচাপ চেয়ে রইল বাহিরের দিকে। মাহাথিরের গায়ে জামা নেই। ভীষণ লজ্জা করছে বিভার। মনে হলো, আগে ঘুমিয়ে গেলেই হয়তো ভালো হতো।
বাতাসে এখন ভীষণ আরাম লাগছে। একটা শীত শীত ভাব চলে আসছে। মাহাথির বিভার দিকে তাকাল। মেয়েটা হালকা ভিজে আছে জামা। বৃষ্টি পড়েছিল নাকি? এখন তো নেই। এখন তো সুন্দর বাতাস। কতোক্ষণ ধরে দাঁড়িয়ে আছে এই মেয়ে? মাহাথির অনুভব করল বারান্দায় পানি। এরমানে ভালোই বৃষ্টি হয়েছে।
মাহাথির না চাইতেও আবারো বিভার দিকে তাকাল। বিভাকে ভালোভাবে লক্ষ্য করতেই
মাহাথিরের আবারো ভীষণ গরম লাগতে শুরু করল। বিভা তার স্ত্রী, সে মানুক আর নাই মানুক তাদের সম্পর্ক মিথ্যা নয়, আর না মিথ্যা বিভার প্রতি তার অধিকার। মাহাথির গিয়ে একদম বিভার পেছনে দাঁড়াল। বিভা চমকে উঠল। ঠিক করল ঘরে চলে যাবে।
বিভা ঘুরে যেতে নিতেই মাহাথির হাতের কবজি ধরে আটকে নিল। বিভা ধীরে ধীরে পেছনে ফিরল। মাহাথির বিভার হাত ধরেই আছে। বিভা মাথা উঁচিয়ে দেখল মাহাথিরের ভ্রু কুঁচকানো দুটো চোখ সাথে গম্ভীর, গভীর দৃষ্টি। এই দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকার সাহস বিভার নেই। সে ভয়ংকর দৃষ্টির ভাষা বুঝে মাথা নামিয়ে ফেলল।
কেটে গেল ভালোবাসাবিহীন, অধিকার আর দায়িত্বের একটি রাত।
.
শ্রুতি দ্রুত রেডি হচ্ছে। হামিমকে নিয়ে আজ সে ডাক্তারের কাছে যাবে। পার্থিব বলেছে, পার্থিবের অপেক্ষা করতে। কিন্তু শ্রুতি পার্থিবের অপেক্ষা করবে না। সে একাই পারবে। আগে আপার সাথে যেত। আজ একাই যাবে।
সে তার শাশুড়িকে বলে নিয়েছে। তবে মিথ্যা বলেছে। বলেছে যে, পার্থিবই তাকে একা যেতে বলেছে, তাই তার শাশুড়ি তেমন কিছু বলেনি। শুধু বলেছে সাবধানে যেতে আর সাবধানে ফিরে আসতে, সাথে বাড়ির গাড়ি নিয়ে যেতে। শ্রুতি তাই মেনে নিয়েছে। নিজের কাছে যা টাকা ছিল সব নিয়ে বেরিয়ে পড়ল।
গন্তব্য - হাসপাতাল। শ্রুতি তাকাল তার ভাইয়ের দিকে। হামিম জানালা দিয়ে বাহিরে তাকিয়ে আছে। শ্রুতি হামিমের মাথায় হাত বুলিয়ে দিল। তার ভাই একদিন সুস্থ হবে। হতেই হবে। তার ভাইয়ের হার্টের ছিদ্রের অপারেশন হবে, পায়ের অপারেশন হবে। তার ভাই বাঁচবে। অনেকদিন বাঁচবে। তাদের সাথে আনন্দে বাঁচবে। ভাবতেই শ্রুতির চোখ ভরে উঠল।
______
চলবে~
শব্দসংখ্যা - ১২০৩
#একগুচ্ছ_শুকতারা
#শারমিন_ইরান
আজ অনেকক্ষণ ভরে লিখলাম, তাও পার্ট ছোটো হয়ে গেল।
বিঃদ্রঃ- এই গল্পকে রোমান্টিক গল্প ভেবে থাকলে পড়বেন না, এটা সাধারণ সামাজিক গল্প।