একগুচ্ছ শুকতারা
শারমিন ইরান
২৩.
‘হামিমকে নিয়ে একা যাওয়ার কী খুব প্রয়োজন ছিল, শ্রুতি?’
‘হ্যাঁ ছিল। কেন? এখন কী আমার বাড়ির বাইরে নিজের ইচ্ছেতে যাওয়ার-ও অনুমতি নেই? বন্দি আমি?’
‘আমি সেটা বুঝাইনি। তিলকে তাল বানানো বন্ধ করুন। আমি শুধু বলতে চেয়েছি, আমি নিয়ে যেতাম আপনাদের। একটু অপেক্ষা করতে পারলেন না আমার জন্য?’
শ্রুতির মনে হলো সত্যি অপেক্ষা করলেই পারতো। সে কী বাড়াবাড়ি করে ফেলছে? তবুও নিজের ঠাঁট বজায় রাখল, ‘আমি আগেও নিয়ে গিয়েছি। এখানে সমস্যা কোথায়?’
পার্থিব হতাশ হলো। এই মেয়ে বুঝার নয়। সে শুধু বলতে চেয়েছিল, রাস্তায় আপদ বিপদও হতে পারত। সে যেহেতু ফ্রী ছিল তাহলে সে অফিস থেকে ফিরেই নিয়ে যেত। এছাড়া ডাক্তারের সাথে ভালোভাবে কথাও বলে নিত।
‘বাদ দিন। বলুন ডাক্তার কী বলল? হামিমের কী ঔষধ’ই চলবে? অপারেশন এর ব্যাপারে কিছু বলেছে?’
‘ঔষধ’ই চলবে। আর কিছু বলেনি।’
পার্থিবের বিশ্বাস হলোনা কথাটা। ছেলেটার দিনে দিনে অবনতি হচ্ছে, আর ডাক্তার কিনা ঔষধ দিয়ে বসিয়ে রাখছে?
.
পেরিয়ে গেছে আরোও কিছুদিন। বিভার জীবন সহজ হয়েছে নাকি জটিল তা বিভা ভেবে পায়না। মাহাথিরের প্রতি তার দুর্বলতা দিনকে দিন বাড়ছেই। আচ্ছা এমন কী হওয়ার ছিল? আজ বিভা বুঝতে পারে, ভালোবাসা কী। আজ বিভা নিজের মায়ের ভালোবাসার গভীরতা মাপতে পারে, যন্ত্রণা অনুভব করতে পারে। আমিন সাহেবের অন্যায়ের পরেও তার মা তার বাবাকে কতো ভালোবাসতো, অথচ লোকটা তার মূল্য দেয়নি। সব ভালোবাসাই কী এমন কষ্টের, যন্ত্রণার হয়?
ভাবতে ভাবতেই টিফিন বক্স খাবার ভরে দিল বিভা। মাহাথিরকে কতো বলেছে বাসা থেকে খাবার নিতে, অথচ লোকটা নেয়'ইনা। দুপুরের খাবারই আসল, অথচ দুপুরে কিনা ক্যান্টিন থেকে আজেবাজে খাবার খায়! মানে হয় এইসবের?
বিভা টিফিন নিয়ে সোফার ওপরে রাখা মাহাথিরের ব্যাগে ভরে রাখল। পেছনে তাকিয়েই দেখল মাহাথির তাড়াতাড়ি করে আসছে। নিচু হয়ে জুতা পড়া শুরু করল। বিভা বরাবরের মতোই আয়তুল কুরসি পড়ে ফুঁ দিয়ে দিল মাথায়। বাতাস পেয়েই মাহাথির বুঝল বিভার কাজ। মাথা উঁচু করে কেবল ভ্রুঁ কুচকে একবার তাকাল, ‘আমি এতোটাও বিশেষ কেউ নই। আমার সুরক্ষার জন্য এতো চিন্তা না করলেও চলবে।’
বলেই সোফার ব্যাগ নিয়ে বেরিয়ে গেল।
সব মানুষের মন সবসময় এক থাকেনা। কখনো অতিরিক্ত রাগ, দুঃখ, খুশি, দুষ্টুমি অনুভব হয়, অকারণেই। বিভার ক্ষেত্রেও হয়তো তাই হলো।
বিভা তার স্বভাবের বিপরীতে গিয়ে একটা কাজ করে বসল। অদ্ভুত মুখভঙ্গি করে মাহাথিরকে ভেঙ্গাল। বিরবির করল, ‘পা/গল লোক কোথাকার! পাগলের থেকেও নি র্বোধ। গা/ধা। মাঝেমধ্যে ইচ্ছে করে মাথাকে দুইভাগ করে দিতে; তাও যদি মানুষ হয়। খাবার যে দিলাম, খাবে? নাকি ফেলে দিবে রাগ দেখাতে? ফেলে দিলে উনাকে আজকে আমি খু/ন করব।’
নিজের কথার মানে বিভা নিজেই খুঁজে পেল না। হঠাৎ এতো রাগ করছে কেন সে? বিভা চুপচাপ চলে গেল ঘরে।
.
মাহাথির মুখ কুঁচকে বসে আছে। তার মুখভঙ্গির অর্থ - এইসবের মানে কী? আসার পর থেকেই দেখছিল তার ব্যাগ অন্যদিনের তুলনায় ভারি, ফোলা। ব্যাগ খুলেই দেখতে পেল টিফিন বক্স। বুঝল বিভার কাজ। ভীষণ রাগ হলো। মেয়েটা অতিরিক্ত করছে না? মাহাথির টিফিন বক্স রেখে কাজে মন দিল।
টিফিন টাইমে বাইরে গিয়ে খাওয়ার জন্য উঠতে গেল। তখনই মনে পড়ল, আজ তো বিভা খাবার দিয়ে দিয়েছে। বাইরে গিয়ে খাওয়ার কী দরকার?
টিফিন বক্স বের করতে করতে মাহাথিরের মনটা শান্ত হলো। কোথাও একটা ভালো লাগল। বাহিরের খাবার সে খেতে পারেনা, হজম হয়না, শরীর অসুস্থ হয়ে পড়ে। এর আগে সে প্রতিদিন নিজেই বাসার খাবার রান্না করে নিয়ে আসত। যা পারত তাই। বিয়ের পর বিভাকে কিছু বলা হয়নি, ইচ্ছে করেই বলেনি। অফিসের খাবার বলতে প্যাকেটের রুটি, জুস খেত; ক্যান্টিনে রান্না করা খাবার তার গলা দিয়ে নামেনা। কিন্তু দুপুরবেলা কী রুটি, জুস খেয়ে ক্ষিদে মেটে…..তবুও নিজের জেদের কারণেই মূলত বিভাকে নিজে থেকে কিছু বলেনি। বিভা কয়েকদিন বললেও মানা করে দিয়েছে।
মাহাথির টিফিন বক্স খুলল। ভুনা খিচুড়ি, আচার। খাবার দেখে মাহাথিরের মন অনেকটাই ভালো হয়ে গেল। খিচুড়ি তার পছন্দের। খিচুড়ি টা বিভা রান্না করেছে। কিন্তু আচার দেখে বুঝল আগেই বাসায় আচার ছিল, সেটাই দিয়েছে। খিচুড়ি টা দেখতেও সুন্দর হয়েছে। বিভার রান্নার হাত ভালো। অন্যরকম একটা স্বাদ থাকে। এর আগে নিজে যা পারতো তাই রান্না করে খেত মাহাথির, বুয়া শুধু ঘর ঝাড়ুমোছা করে দিত। বিয়ের পর বিভা বুয়াকেও না করে দিল। রান্না থেকে সবকিছু নিজে নিজে করে। কেন করে? তাকে ভালোবাসে বলে? আচ্ছা মেয়েটা এমন কেন? এতো নিঃস্বার্থভাবে কেউ কারোর জন্য ভাবে? এমনও আছে দুনিয়ায়?
মাহাথির খাবার মুখে তুলল।
‘ভাবি রান্না করেছে, বুঝি?’ দাঁত সবগুলো বের করে হাসল আনাস। কণ্ঠে দুষ্টুমি ভরপুর। মাহাথির তাকাল একপলক, ‘হুম।’
‘আমাকেও দিয়েছে দেখ, দেখ।’ বলেই নিজের বক্স দেখাল আনাস। উৎসাহের সাথে বলল, ‘দুজনকেই খিচুড়ি দিয়েছে। ব্যাপারটা জোস না? এরথেকে কী বোঝা যায় জানিস?’
মাহাথির মুখে খাবার নিয়ে তাকিয়ে রইল আনাসের দিকে। যার অর্থ - সে জানে না, জানতে চায়। আনাস অর্থ বুঝে বলল, ‘বোঝা যায় যে আমাদের দু'জনের বউ আমাদের ভীষণ ভালোবাসে। একদম ইনফিনিটি লেভেলের।’
‘নিজের টেবিলে গিয়ে ফালতু বকবক কর।’ বলেই মাহাথির নিজের মতো খাচ্ছে। আনাস মাহাথিরের স্বভাব সম্পর্কে জানে। নিজেও খুশিমনে খাওয়া শুরু করল।
আনাস, মাহাথিরের খাওয়া শেষ। কিছুক্ষণ পরে আনাস বলল, ‘তোদের মধ্যে সব ঠিক হয়ে গেছে বন্ধু?’ উৎসাহ ভরা কণ্ঠ আনাসের।
‘ঠিক হয়েছে মানে? কী ঠিক হবে?’
‘তোদের সম্পর্ক। তুই, ভাবি হ্যাপি আছিস? আই মিন তোর ধারণা বদলেছে? ভাবিকে ভালোবাসিস?’
‘ভালোবাসব কেন?’
‘মানে? আমি আরোও ভাবলাম তুই সংসারে মনোযোগ দিয়েছিস।’ কণ্ঠে হতাশা, দ্বিধা।
‘সংসার করতে ভালোবাসা লাগে – জানতাম না তো। আমি তো জানতাম স্বামী-স্ত্রী থাকলেই সংসার করা যায়।’
‘এরমানে কী তুই এখনো ডিভোর্স এর চিন্তায় আছিস? মানিসনি ভাবিকে?’
‘ডিভোর্স কেন দিব? অনেকেই তো অমতে বিয়ে করে সংসার করছে। ডিভোর্স দিচ্ছে? আমি কেন দিব? ভালোবাসা ছাড়া সব হবে আমাদের মধ্যে। সংসার, বাচ্চা সব।’
আনাস হয়তো বুঝল মাহাথিরের কথা। ভীষণ রাগ হলো। মাথা নিচু করে হেসে দিল, ‘জানিস, এখন সবাই সবাইকে জানো/য়ার বলে গালি দেয়। কিন্তু কিছুদিন পর থেকে একে অন্যকে মাহা/থির বলে গালি দিবে।’
‘কী বলতে চাচ্ছিস?’ কন্ঠে বিরক্তি।
‘জাস্ট এইটাই বন্ধু যে, তুমি জানো/য়ার এর থেকেও নিকৃষ্ট। সরি, তোমাকে ডিস্টার্ব করার জন্য।’
আনাস চলে গেল। মাহাথির নির্লিপ্তভাবে বক্স ঢুকিয়ে পানি পান করতে লাগল।
.
বিভার মুখটা হাসি হাসি। না চাইলেও গালগুলো হেসে যাচ্ছে। বিভা দুই হাত দিয়ে থামানোর চেষ্টা করল। অল্প বিষয়েই সে এতো খুশি কেন হয় - জানে না।
মাহাথির রাতের খাবারের পরে রান্নাঘর থেকে হাত ধুয়ে ডাইনিং টেবিলে পানি খেতে এলো। সে আসতেই বিভা জিগ্যেস করল, ‘আপনার কাছে খিচুড়ি কেমন লেগেছে?’
মাহাথির তাকিয়ে রইল বিভার দিকে। বিভা কী জানে যে ও খিচুড়ি খেয়েছে? যদি জানে তবে এইটা প্রেস্টিজের ব্যাপার হয়ে যাবে। বিভাকে সে পছন্দ করেনা, বিভা খাবার নিতে বললেও নেয়নি, অথচ বিভা খাবার দিয়েছে আর ও খেয়েছে — এটা তো ভীষণ লজ্জার ব্যাপার। মাহাথির কী বলবে ভেবে পেল না। গ্লাসে পানি ঢালতে ঢালতে কেবল বলল, ‘কে বলেছে আমি খেয়েছি? খিচুড়ি তো আমি ডাস্টবিনে ফেলে দিয়ে এসেছি। এতোবার না করার পরেও কেন কথা শুনোনা তুমি? কী দরকার ছিল খাবার দেওয়ার?’
বলেই গ্লাস নিয়ে চলে গেল। বিভা তাকিয়ে রইল আহামক্কের মতো। মিথ্যা কথা সে আশা করেনি।
বিভা নিজের ফোনের হোয়াটসঅ্যাপে ‘আনাস ভাইয়া’ নামক ইনবক্সে ঢুকল। যেখানে একটি ছবি - মাহাথির হা করে খিচুড়ি মুখে ঢোকাচ্ছে, বক্সের খিচুড়ি অর্ধেক দেখা যাচ্ছে। তার নিচেই একটা ম্যাসেজ - “Vabi, Mahatir toh khub moja kore khichuri khelo. Amari lov lege gelo. Apnader bashay ekdin ashtesi bouke niye. Oboshhoi khichuri ranna korben. Shobai eksathe khabo. Kicchu mone korben na, daowat cheyei nilam.’’
বিভা হেসে ফেলল। রুমের দিকে তাকিয়ে ভ্রুতে ভাঁজ ফেলল, ‘মানুষের ঘাড় একটু বাঁকা থাকে। আর ওনার ঘাড় পুরোটাই বাঁকা। মাথার সামনের অংশ পিছে, পিছের অংশ সামনে নিয়ে চলাফেরা করে। ত্যাড়া কোথাকার! সাথে মিথ্যাবাদীও….’
.
রাত ১ টা ৪৫ মিনিট। বিভা, মাহাথির ঘুমে বিভোর। হঠাৎ ফোন বাজতেই ঘুমে ভাঁটা পড়ল। মাহাথির ফোন উঁচু করে নাম দেখল না, কেটে দিল। সেকেন্ড পার হতে না হতেই আবার ফোন। মাহাথির বিরক্তি নিয়ে উঠে বসল। কল রিসিভ করে কানে দিয়ে কোনোরকমে বলল,
‘হ্যালো কে?’
ঠিক তখনি শুষ্ক কণ্ঠের কান্নার আওয়াজ ভেসে এলো। মাহাথির ভ্রু কুঁচকে ফোন নামিয়ে নাম্বার দেখল। ভ্রু থেকে ভাঁজ সরে গেল। ভীষণ অবাক হয়ে ফোন কানে নিয়ে ডাকল,
‘আব্বা?’
_______
চলবে~
শব্দসংখ্যা - ১২২৪
#একগুচ্ছ_শুকতারা
#শারমিন_ইরান
প্রথমে ভাবলাম শ্রুতি-পার্থিবের কাহিনী হয়তো গল্পে অনেক হবে, এখন দেখি ওদের কাহিনীই খুঁজে পাইনা। ওদের কাহিনী প্রায় শেষ, অথচ এদের কাহিনী শুরুই হলোনা। 😒