ফন্ট সাইজ:
থিম:
একগুচ্ছ শুকতারা

৪৪তম পর্ব

লেখক: শারমিন ইরান

একগুচ্ছ শুকতারা

শারমিন ইরান

৪৪.

দরজায় দাঁড়িয়ে মৃদু আওয়াজ তুলল সিদ্দীক সাহেব। বিভা সেদিকে তাকিয়ে হাসিমুখে উত্তর দিল, ‘ আসুন, আব্বা।’

সিদ্দীক সাহেবের পরনে লুঙ্গি এবং ফতুয়া ধরনের পোশাক। বিভা নিজের শ্বশুর এর দিকে তাকিয়ে হাসার চেষ্টা করল। এতোক্ষণ যাবত রুম জুড়ে হাঁটছিল সে। শ্বশুরকে বসতে বলে নিজে দাঁড়িয়ে রইল। সিদ্দীক সাহেবের নিজের পুত্রবধূর কথা মেনে বসলেন। সরল কণ্ঠে বলল, ‘ নিচে যাইতেসি। তোমার কিছু লাগব? কিছু খাইতে মন চায়? বলো! নিয়া আসমুনে।’

বিভা হাসল। এই মানুষটা সুস্থ হওয়ার পর প্রায়দিনই হাঁটতে বাহিরে যায়। অযথাই রাস্তা দিয়ে হাঁটে। বাজারে গিয়ে ঘুরে আসে। বিভা বুঝতে পারে যে এই শহরে মানাতে তার অসুবিধা হচ্ছে। গ্রামের মানুষ শহরে এসে সহজে মানিয়ে নিতে পারেনা। গ্রামে এখানে ওখানে যাওয়া যায় এক নিমিষেই, শহরে তার ব্যবস্থা নেই। তাই তো এক ফ্ল্যাটে বন্দি থাকতে ভালো লাগেনা বলেই বাইরে বাইরে ঘুরে আসে। সে নিয়ে তার শাশুড়ীর সে কী রাগ! বিভা প্রেগন্যান্ট হওয়ার পর থেকে যখনই বাইরে যায় এক প্রশ্ন করে। বিভা কিছু না বললেও এটা সেটা নিয়ে আসে। বিভা সেগুলো তৃপ্তি করে খায়। সে নিয়ে আবার মাহাথিরের রাগারাগি শুরু হয়। তবে নিজের অবচেতনেই ব্যাপারটা বেশ উপভোগ করে বিভা। বিভা হাসিমুখে বলল, ‘ কিছু খাব না, আব্বা।’

সিদ্দীক সাহেব বিভার কথাটা শুনলেন। সে শুনল - কিছু খাব না, আব্বা। অথচ বুঝল - আপনার যা মনে চায় নিয়ে আইসেন। সিদ্দীক সাহেবের সামনে দাঁড়ানো মেয়েটার প্রতি অসম্ভব মায়া হলো। মেয়েটা অতিরিক্ত শান্ত প্রকৃতির। শান্ত হয়েও যথেষ্ট মিশুক। কী সুন্দর করে তার সাথে কথা বলে, গল্প করে। কী সুন্দরকরে তৃপ্তি নিয়ে তার আনা খাবার খায়। বড্ড মায়া হয়! আগে ছেলের প্রতি মায়া হতো, এখন ছেলেরবউ সেই মায়া নিয়ে গেল, কিছুদিন পর নাতি এসে নিয়ে যাবে। সিদ্দীক সাহেব উঠে দাঁড়ালেন। হাসিমুখে বলল, ‘ তোমার আম্মা ঘুমায়। আমি তাইলে যাই?’

বিভা মাথা নাড়ল। সিদ্দীক সাহেব বেরিয়ে গেল। মানুষটা বেশ সহজ সরল। বিভার সাথে অতো বেশি কথা না হলেও, হয়। তবে মানুষটা বেশিরভাগ সময় অসুস্থ থাকে। বিভা মনে মনে দোয়া করে, এই মানুষটা যেন সবসময় সুস্থ থাকে, তাদের মাঝে বেঁচে থাকে। মানুষটাকে ‘ আব্বা’ ডাকে বিভা। মন থেকে, ভালোবেসে, সম্মান নিয়েই ডাকে। বিভা জানে মাহাথিরও তার আব্বা-আম্মাকে অসম্ভব ভালোবাসে। এমনিতেই মাহথির নিজেকে একা ভাবে। আল্লাহ না করুক আব্বার যদি কিছু হয় তবে আরোও ভেঙে পড়বে। বিভাকে নিজেকে বুঝাতে চাইল। এরকম কিছুই হবেনা।

সুস্থ থাকলে সিদ্দীক সাহেব বেশিরভাগ সময় নিজের মতো ঘুরাঘুরি করেই কাটায়। বিভা হাসল। এই সংসারের প্রতিটা মানুষ, প্রতিটা জিনিসের প্রতি তার কেমন যেন মায়া। বিভার মনে হয়, মাহাথির যদি তাকে কোনোদিন ভালো নাও বাসে তবুও সে এই সংসারের প্রতি মায়া থেকেই কাটিয়ে দিতে পারবে এক জনম। এই মায়া বুঝি তার মায়েরও ছিল? প্রতি মেয়েরই হয়?

.

শ্রুতি বসে বসে হামিমকে মুড়ি খাওয়াচ্ছে। আল্লাহর রহমতে তার ভাই এখন অনেকটাই সুস্থ। ধরে ধরে হাঁটতে পারে। বুকের ঘাও শুকানোর পথে। শ্রুতির মন মেজার বেশ ফুরফুরে। তার পাশেই বসে আছে প্রভা আর প্রত্যাশা। মেয়ে দু'টো সবসময় একসাথে থাকে। কিছুক্ষণ আগেই এসেছে দু'জনে। শ্রুতি হামিমকে খাইয়ে দিয়ে প্রভা-প্রত্যাশার দিকে তাকাল। বলল,

‘ মুড়ি খাবে তোমরা? খাইয়ে দেই?’

‘ কী দিয়ে খাব?’ প্রভা বলল।

‘ দুপুরবেলা তো শুধু গরুই রান্না হয়েছে। তাই এটা ছাড়া অন্য তরকারি নেই। খাবে?’

‘ না। খাবনা।’ প্রভা বলল।

প্রত্যাশা প্রভার কথা মানল না। শ্রুতিকে বলল, ‘ আমি খাব ভাবি। প্রভাও খাবে। শুধুশুধু ঢঙ করে ও।’

শ্রুতি হেসে মুড়ি মাখল। খাইয়ে দিতে লাগল নিজের দুই ননদকে। বাইরে থেকে পার্থিবের কাছে দৃশ্যটা ভীষণ সুন্দর লাগল। তাই ঝটপট কিছু ছবি তুলে নিল। সুন্দর মূহুর্তের ছবি থাকা আবশ্যক।

পার্থিব খাটে বসে আছে অর্ধশোয়া অবস্থায়। শ্রুতি গিয়ে পাশে বসল। কাঁধে মাথা রেখে বাহু জড়িয়ে ধরল। পার্থিবের ভালো লাগল। তবে হুটহাট শ্রুতির এমন কাজে ভীষণ অবাক হয় সে। শ্রুতি বলল,

‘ ব্যস্ত ভীষণ?’

‘ উঁহু! তেমন নয়। কিছু বলবেন?’

‘ না।’

শ্রুতি কাঁধে মাথা রেখে নিজের ফোন টিপতে লাগল। বিভার সাথে মাত্র কথা বলে এসেছে। কাল একবার যাবে। মাঝেমধ্যে শ্রুতির একদম ভালো লাগেনা। শ্রুতি শুনেছিল, মেয়েদের প্রথমবার প্রেগন্যান্সির সময়ে মায়ের বাড়িতে থাকে। তার মা বেঁচে থাকলে নিশ্চয়ই বিভাও থাকতো। যদিও এটা একটা কথার কথা। স্বামী-শাশুড়ী ভালো হলে শ্বশুরবাড়ি থেকেই যত্ন পাওয়া যায়। তাই আবার মন খারাপ করতে গিয়েও করেনা শ্রুতি। কারণ সে দেখেছে মাহাথিরসহ সবার যত্ন। কতো ভালোবাসে তার আপাকে! মাহাথির ভালোবাসে কিনা তা শ্রুতি জানেনা। তবে নিজের আপার প্রতি যত্ন দেখেই মুগ্ধ হয় শ্রুতি। মনে হয় অতোটাও খারাপ নয় তার মাহাথির ভাইয়া। এই তো শান্তি।

শ্রুতির মনে হলো শুধু বিভা নয়। সেও যথেষ্ট সুখী। শুধু সুখী নয়, বাড়াবাড়ি রকমের সুখী। তার স্বামী ভালো, শ্বশুরবাড়ি ভালো। সবাই ভালো। সবাই তাকে ভালোবাসে। এইটা কী কম? শ্রুতির মনটা ধেইই ধেইই করে নেচে উঠল। তার আপা এবং সে এতো ভালো বাড়িতে এলো কীভাবে? তার আপা তো ভালো তাই নাহয় সে ভালো একটা শ্বশুরবাড়ি পেয়েছে। কিন্তু সে! সে তো তেমন ভালো নয়। তাহলে পেল কী করে?

বেশ কিছুক্ষণ পর শ্রুতি হুট করে প্রশ্ন করল,

‘ পার্থিব, আমি বিয়ের পর আপনার সাথে অনেক খারাপ আচরণ করেছি। আপনার রাগ হয়নি?’

পার্থিব কাজ করতে করতেই বলল,

‘ না, হয়নি।’

‘ কেন?’

‘ রাগ হইনি। রাগের কারণ জানার জন্য আগ্রহী হয়েছি। আপনি এমন কেন প্রতিনয়ত সেটাই ঘুরতো মাথায়। এছাড়া ধীরে ধীরে যখন আপনার প্রতি অতিরিক্ত দুর্বল হচ্ছিলাম, তখন শুধু মনে হতো আপনি আমার প্রতি কবে দুর্বল হবেন। এতোকিছুর ভীড়ে রাগের সময় হয়ে ওঠেনি।’

শ্রুতি পার্থিবের কাঁধে নিজের মাথা ঘষে বলল, ‘ আচ্ছা মানলাম। কিন্তু আমি যখন আপনার প্রতি দুর্বল হলাম, বললাম যে আমিও আপনাকে ভালোবাসি। তখন কেন আপনি রাগ দেখালেন না? তখন তো চাইলেও আমাকে শাস্তি দিতে পারতেন। তাইনা?’

প্রশ্নটা করেই শ্রুতি ঘাড় উঠিয়ে পার্থিবের দিকে চাইল। পার্থিব ল্যাপটপ কোলে রেখেই কপাল চুলকে হাসল। বলল,

‘ আপনার ওপর রাগ করার ক্ষমতা আমার নেই শ্রুতি। রাগ উঠলেও তা দীর্ঘ সময় ধরে রাখার ক্ষমতা আল্লাহ আমাকে দেয়নি। এদিকে আমি ভীষণ রকমের দুর্বল। আর শাস্তি? শাস্তি দিলে আপনি ভীষণ দুঃখ পেতেন। এমনিতেই একরাত বাড়ির বাইরে থেকে যে শাস্তি হয়েছিল সেটাই আমার জন্য অনেক যন্ত্রনার ছিল। এর বেশি আমিও দিতে পারতাম না। আর দিলেও আপনি সহ্য করতে পারতেন না। আপনি এতো সবল নন।’

‘ কে বলেছে আমি সবল নই? আপনি জানেন সবাই বলে আমি অনেক শক্ত মনের অধিকারী।’ কিছুটা আত্মবিশ্বাস নিয়ে বলল শ্রুতি।

‘ ভুল বলে শ্রুতি। আমিতো বলব, কেউ আপনাকে জানেই না। কারণ আপনি উপরে উপরে যাই বলেন না কেন আপনি ভীষণ রকমের দুর্বল একটা মেয়ে। শুধু চিৎকার চেঁচামেচি করলেই কী শক্ত মনের হয়ে যায়?’

শ্রুতি চোখ পাকিয়ে বলল, ‘ আমি শুধু চিৎকার চেঁচামেচি করি?’

‘ অবশ্যই। আপনি শুধু পারেন তিড়িংবিড়িং করে ঘেটে দিতে। কিন্তু ভিতরে ভিতরে প্রচন্ড রকমের দুর্বল আপনি।’ হাসিমুখে বলল পার্থিব।

‘ আপনাকে এতোকিছু কে বলেছে?’

‘ আমি বুঝতে পারি।’

‘ এতো বুঝা ভালো নয়।’

‘ ওকে বুঝব না বেশি। তাহলে আসেন প্রেম করি।’ বলেই ল্যাপটপ রেখে হাত উঠিয়ে জড়িয়ে ধরল শ্রুতিকে।

.

মাহাথির বিরসমুখে শুয়ে আছে। ভেতরে ভেতরে সে বেশ চিন্তিত। বিভার আটমাস পড়ল। এই নিয়ে মাহাথির দু'বার ছুটির আবেদন করেছে। দেওয়া হয়নি। শেষবার যখন নিজেই গেল কথা বলতে তখন ম্যানেজার গম্ভীরমুখে বলল, ‘ এখন অফিসে অনেক কাজ মিস্টার মাহাব। এই সময়ে ছুটি মোটেও গ্রাহ্য হবেনা। অফিসের কাজ কমলে আপনি টানা দু'মাসও ছুটি পেতে পারেন কোনো রকম অতিরিক্ত সেবা ছাড়াই। তবে এই মূহুর্তে তা সম্ভব নয়।’

অতিরিক্ত সেবা বলতে বুঝিয়েছে ঘুষ। ম্যানেজার সাহেব কোনো কথা রাখ-ঢাক রেখে বলে না। যা বলে সরাসরি বলে। মাহাথির ব্যাপারটা পছন্দ করে। তবে এখন তাও পছন্দ হচ্ছেনা। বিরক্তিতে মুখ তেঁতো হয়ে গেল। তার চারপাশের সবাই তারসাথে এমন বেঈমানী কেন করছে?

সামনেই বিভা হাঁটাহাঁটি করছে। সেদিকে ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে রইল মাহাথির। বলল,

‘ সেই কখন থেকে হাঁটছো তুমি! এতো হাঁটার কী প্রয়োজন? এসে বসো পাশে।’

বিভা মুখ কুঁচকে বলল, ‘ কতোক্ষণ বসে থাকা যায় শুনি? অতিরিক্ত বসে থাকা ভালো নয়। বাচ্চা পেটে বড় হয়ে যায়।’

মাহাথিরের কাছে ভীষণ আজব লাগল কথাটা। সন্দিহান কণ্ঠে বলল, ‘ আম্মা বলেছে?’

বিভা নিজের কাজকে ঠিক প্রমাণ করতে হালকা ধমকে বলল, ‘ কারোর বলার প্রয়োজন নেই। জানি আমি। আপনি চুপ থাকেন।’

মাহাথির চোখ বন্ধ করল। বিভা এখন প্রায়ই তাকে ধমক দেয়। মাহাথিরও গম্ভীরমুখে ধমক হজম করে নেয়। বিভার ধমক গুলাও বিভার মতোই শান্ত, মাহাথিরের বেশ মজা লাগে ধমকগুলো। মজার ধমক সবসময় খাওয়া যায়। ঘড়িতে সন্ধ্যা সাতটা। মাহাথির কী ঘুমাবে একটু? গতকাল মা তাকে একটা আশ্চর্যজনক কথা বলেছে। বিভা নাকি মাঝরাতে প্রায়ই উঠে। উঠে রান্নাঘরে গিয়ে খাবার রান্না করে। এরপর খায়। গত পরশু তা হাসিনা দেখেছেন। এরপর কালই বলেছে মাহাথিরকে। মাহাথির ভেবেছিল কাল রাতে না ঘুমিয়ে বসে থাকবে। কিন্তু সম্ভব হয়নি। তার ঘুমই আসে মাঝরাতে। সারাদিনের ক্লান্তিতে কিছুই টের পায়না সে। এখন ঘুমালে আজ রাতে বসে থাকতে পারার সম্ভাবনা থাকবে। মাহাথির চোখ বন্ধ করল।

বিভা দেখল মাহাথির চোখ বন্ধ করে আছে। ঘুমাচ্ছে নাকি? ঘুমাক একটু। বিভা বারান্দায় যেতে নিল। ওমনি মাহাথির তড়াক করে উঠে বসল। বড় বড় পা ফেলে চলে গেল বাইরে। মাহাথির যখন ফিরল বিভা তখন বারান্দায়। এগিয়ে গেল সে। বিভার সামনে ফলের রস, স্যুপ, ফলের প্লেট রেখে বলল, ‘ দুপুরে নাকি খেতে পারোনি। এখন একটু কষ্ট করে খাও এগুলো। অল্প খাও সমস্যা নেই, কিন্তু খাও।’

স্যুপ দেখেই বিভার নাড়িভুড়ি উলটে এলো। মুখ কুঁচকে তাকিয়ে রইল মাহাথিরের দিকে।

রাত এগোরাটা। বিভা বসে আছে। পাশেই শুয়ে আছে মাহাথির। মাহাথিরের মনে হলো তার দু'চোখে সারা দুনিয়ার ঘুম জড়ো হয়েছে। নয়তো এতো ঘুম আসবে কেন? ঘুমাতেও ইচ্ছে করছে না। তার কাছে না ঘুমিয়ে থাকার কোনো ঐশ্বরিক ক্ষমতা থাকলে হতো। তাহলে সে সারাক্ষণ না ঘুমিয়ে বসে থাকতো।

বিভা নিজের পেটের দিকে তাকিয়ে আছে। হাত দিয়ে নিজের সন্তানকে অনুভব করতে চাইছে। আজ-কাল প্রায়ই বাচ্চাটা নড়চড় করে নিজের জানান দেয়, ব্যাপারটা এতো ভালো লাগে বিভার! মনে চায় বাচ্চাটাকে কোলে তুলে আদরে আদরে ভরিয়ে তুলতে। কিন্তু তা সম্ভব নয়। আবার মাঝেমধ্যে এমনভাবে নড়চড় করে বিভার দুনিয়া অন্ধকার হয়ে আসে যন্ত্রণায়। বিভা মলিন হাসল। অযথা ভীষণ মন খারাপ হচ্ছে। আগের কথা মনে পড়ছে। তার মাও এমন সুখকর যন্ত্রণার মধ্য দিয়ে গেছে। কতো কষ্টই না সহ্য করেছে! আগে না বুঝলেও এখন ভালোভাবেই বুঝে বিভা। তবে তার পাশে তো সবাই আছে। কিন্তু তার মায়ের পাশে কেউ ছিলনা ভরসা দেওয়ার। বিভার মনে পড়ল আমিন শিকদারের বলা একটি বাক্য - কালো মানুষ দেখলে আমার ঘেন্না লাগে। সে, শ্রুতি কালো না হলেও শ্যামবর্ণের। তবুও আমিন শিকদার তাদের সেভাবে আদর করতো না। অবশ্য আদরের ভান করতো। শ্রুতি কতো ছুটতো আমিন শিকদারের পিছে পিছে কোলে ওঠার জন্য। কিন্তু সে তেমনভাবে আদর দিয়ে কোলে নিত না। বিভা আগেই বুঝতে পেরেছিল আমিন শিকদারকে। তাই তো নিজেই দূরত্ব তৈরি করেছিল তার সাথে। আচ্ছা, মাহাথিরও কী এমন হবে?

বিভার মন খারাপের মধ্যে কেউ যেন ভীষণ যত্ন নিয়ে ঢেলে দিল যন্ত্রণা, চিনচিনে ব্যথা; যে ব্যথা বয়ে গেল শরীরের প্রতিটা শিরা-উপশিরা দিয়ে। সে মাহাথিরের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘ মাহথির! আমার বাচ্চাটা যদি কালো হয় আপনি কী ভালোবাসবেন না?’

মাহাথির সবেই ভাবছিল কিছুক্ষণ ঘুমাবে। তবে বিভার এমন প্রশ্নে তার চোখ থেকে ঘুমেরা উড়াল দিল। বিভার দিকে তাকিয়ে রইল তার ভাব বুঝার আশায়।

বিভা নিজমনেই বলল,

‘ জানেন তো মাহথির, আপনি আমিন শিকদারের থেকে অনেক ভালো একজন হাসবেন্ড। তার থেকে ভালো বাবাও হবেন। কেমন?’

মাহাথির কিছু বলল না। সে জানেই না কী বলা উচিত। বিভা বলল, ‘ আপনি আমাকে ভালোবাসেননি। আপনি বলেছিলেন আমি আশেপাশে থাকলে আপনার ভালো লাগেনা। তাই দূরে থাকেন। আমাদের ছেলে হলে তাকেও কী দূরে রাখবেন? সে যদি কালো হয় তাকে ভালোবাসবেন না? কিন্তু কালো-সাদা তো আমার হাতে নেই মাহথির। আমার ছেলের হাতেও নেই। তাহলে তাকে দূরে রাখবেন কেন?’

‘ তুমি আদৌও বুঝতে পারছো কী বলছো তুমি? এতোদিনেও কী আমার প্রতি এতোটুকু বিশ্বাস তৈরি হয়নি? আর কী তোমার তোমার লাগিয়েছো? বাচ্চাটা আমারো বিভা। এতো খারাপ মনে হয় আমাকে? এতো নিচু মনে হয়?’

রেগে উঠেছে মাহাথির। তার মুখের আকার শক্ত। কপালের রক্তনালি স্পষ্ট বুঝা যাচ্ছে। সব দেখেও বিভা ভয় পেল না। নিজের মতো নির্বিকার কণ্ঠে বলল,

‘ আমার ধারণা, আমিও আমার মায়ের মতো মারা যাব মাহথির। আমি মারা গেলে আপনি আমার বাচ্চাটাকে দেখে রাখবেন। কেমন? আগলে রাখবেন। আর যদি না পারেন…… যদি না পারেন, তবে শ্রুতিকে দিয়ে দিবেন। মোটেও কষ্ট দিবেন না আমার বাবাকে। ঠিকাছে?’

মাহাথির ব্যথিত, ক্রোধান্বিত হয়ে চেয়ে রইল। বিভার গালে হাত গলিয়ে শান্তকণ্ঠে বলল, ‘ তোমাকে ভালোবেসেছি, এরমানে এইনা রাগতে ভুলে গেছি। আমাকে রাগিওনা বিভা। কষ্ট পাবে। বাজে বকা বন্ধ করো।’

বিভা তাচ্ছিল্যের মলিন হাসল। চোখ তার ছলছল। মাহাথির চুমু খেল বিভার কপালে। আদর করে শান্তকণ্ঠে বলল, ‘ তোমার কিছু হবেনা, বিভা। অযথা চিন্তা করোনা। আমি আছি তোমার পাশে। তোমার কিছু হবেনা।’’

বিভার নির্লিপ্ত ভাবে রইলেও, মাহাথির নিজের কপাল ঠেকাল বিভার কপালে। আবিষ্ট হয়ে বলতে লাগল,

‘ এখনো আমাদের দুজন দুজনকে উজাড় করে ভালোবাসা বাকি। এখনো আমাদের মাহতিমকে পৃথিবীর আলো দেখানো বাকি। এখনো আমাদের দুষ্টু-মিষ্টি সংসার করা বাকি। এখনো আমাদের মেহেরিমার মা-বাবা হওয়া বাকি। এখনো আমাদের অনেক পথ একসাথে পাড়ি দেওয়া বাকি বিভা। এখনো আমার তোমাকে তোমার মতো করে পাওয়া বাকি। এতোকিছু বাকি রেখে তুমি কোথাও যেতে পারবেনা। আমি দিব না।’

______

চলবে~

শব্দসংখ্যা - ১৮৪৫

#একগুচ্ছ_শুকতারা

#শারমিন_ইরান

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ৪৪তম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন