একগুচ্ছ শুকতারা
শারমিন ইরান
৪৫.
মাহাথির হঠাৎ করে চোখ খুলে উঠে বসল। হাত বাড়িয়ে ফোনের আলো জ্বেলে দেখল ৩ টা ৫৬ মিনিট। এই সময়ে নিজের ঘুম ভাঙার কোনো অর্থ মাহাথির বের করতে পারল না। তবে লুকায়িত একটি অর্থ বের করা যায়। সে ঘুমের আগে অনেকবার চেষ্টা করেছিল না ঘুমোতে। চেয়েছিল, আজ সে জেগে থাকবে। বিভাকে খাবার তৈরি করে দিবে। মাহাথিরের ধারণা তার নিয়তের কারণেই সৃষ্টিকর্তা তার ঘুম ভাঙিয়ে দিয়েছে। নিয়ত খুব মূল্যবান একটি বস্তু। নিয়তের ওপর কিছুই নেই। মাহাথির তাকিয়ে দেখল পাশে বিভা নেই। যার অর্থ আম্মার বলা কথা সত্য। বিভা আসলেই রাতে উঠে পড়ে। মাহাথির নেমে পড়ল খাট থেকে।
বিভার সামনে সাতটা তেলের পিঠা। আরোও তিনটা ছিল। সে তা সাবাড় করে দিয়েছে। আটমাসে পড়ার পর থেকেই ক্ষুধা বেড়ে গেছে তার। যখন তখন খেতে ইচ্ছে হয়। অসময়ে প্রচন্ড ক্ষুধায় পেট চোঁ চোঁ করে। রাতে ঘুম হয়না। মাঝরাতে ক্ষুধায় পেটে ইঁদুরেরা মারামারি করে। এই মারামারি বিভা সহ্য করতে পারেনা। তাই তো নিজেই উঠে পড়ে। মাহাথির, আম্মা কাউকে ডাকেনা। সে মানুক বা নাই মানুক মানুষগুলো কষ্ট করে। তার জন্যই মানুষগুলো সারাদিন কষ্ট করে। আর সে এতোটুকু করে নিতে পারবেনা বুঝি? তাই তো প্রতিদিন উঠে উঠে সে রান্না করে খাবার খায়। প্রতিদিন অবশ্য রান্না করতে হয়না। যেদিন ঘরে রান্না করা তরকারি থাকে সেদিন তাই দিয়ে সে পেট ভরে ভাত খায়। আবার না থাকলে নিজেই রান্না করে। আজ ভীষণ পিঠা খেতে ইচ্ছে করছিল। তাই তো বানিয়ে ফেলল। মানিকগঞ্জে এই পিঠাকে বলা হয় ‘তেলের পিঠা’। বিভা আরেকটা মুখে নিয়ে খেতে লাগল। মনে হলো এই খাবারটা ভীষণ ভদ্র একটা খাবার। কী সুন্দর মিষ্টি, মজা! অভদ্র খাবার অবশ্য হয়না, তবুও যে খাবার খেতে কষ্ট সেটাকে বিভা অভদ্র খাবার বলে গণ্য করে। অভদ্র খাবারের তালিকায় ‘টক’ জাতীয় খাবার রাখা যেতে পারে। মিষ্টি খাবার খাওয়ায় কোনো কষ্ট নেই। মুখে পুরো আর খাও। আগে বিভা এতো মিষ্টি পছন্দ করতো না, তবে ইদানীং বেশি খাওয়া হচ্ছে। আম্মা বলেছে, মেয়ে হলে নাকি টক খেতে ইচ্ছে করে। ছেলে হলে নাকি মিষ্টি খেতে ইচ্ছে করে। কথাটা হয়তোবা সত্য। তার প্রমাণ জলজ্যান্ত বিভা।
বিভা একটা আস্ত পিঠা নিজের দু’গালে ঢুকিয়ে আরামে চিবুচ্ছে। কিন্তু আরাম টা আর রইল না। তার টেবিলের সামনেই মাহাথির দাঁড়ানো। দৃষ্টির ভাষা - বিভাকে এখানে এইভাবে মাহাথির তাকে আশা করেনি। কিছুটা অবাক হয়েছে সে।
বিভা মাহাথিরের থেকে চোখ সরিয়ে নিল। তখন তার মনে হলো তার দু'গাল ভর্তি পিঠা। শুধু তাই নয়। তার হাতেও একটা আধখাওয়া পিঠা। বিভা একবার মাহাথিরের দিকে তাকিয়ে হাতের পিঠা প্লেটে রেখে দিল। এরপর মাথা নিচু করে ভীষণ লজ্জার সাথে পিঠা চিবুতে লাগল। তার অঙ্গভঙ্গি তার সাথে বেঈমানী করে প্রকাশ করে দিল যে, সে ভীষণ লজ্জা পাচ্ছে। অঙ্গভঙ্গির সাথে বন্ধুত্ব করে নিল মুখভঙ্গিও। মাহাথির ততোক্ষণে চেয়ার টেনে বিভার সামনে বসেছে। মাহাথির তার ভেতরের সবটুকু আদর ঢেলে বলল,
‘ আমাকে ডাকতে পারতে পাগলী। আমি বানিয়ে দিতাম।’
বিভার মুখের পিঠা তখনো শেষ হয়নি। দাঁতগুলোও তার সাথে দুষ্টুমি করে পিঠা চিবুচ্ছে না। বিভা কিছু বলল না। মাহাথির বলল,
‘ পায়ে পানি এসেছে তোমার। শরীর তেমন ভালো না। এই সময়ে রান্নার ধোঁয়া গায়ে লাগানো ঠিক? আমাকে বললেই হতো। হয়তো পারফেক্ট হতোনা। কিন্তু তুমি ইন্সট্রাকশন দিতে, সে অনুযায়ী নাহয় বানাতাম।’
বিভা এবারেও নিরুত্তর। বিভার পিঠাভর্তি ফুলো গাল টিপে দিল মাহাথির। মুচকি হেসে বলল,
‘ ক্ষুধা মিটেছে?’
বিভা দুপাশে মাথা নাড়ল। যার অর্থ মিটেনি। মাহাথির মাথায় হাত বুলিয়ে দিল। প্লেটের দিকে তাকিয়ে বিভার দিকে তাকাল। বিভার মুখের পিঠা ততোক্ষণে শেষ। মাহাথির হাত বাড়িয়ে পানি ভরে গ্লাস এগিয়ে দিল বিভার দিকে। বিভা পানি খেয়ে সরলকণ্ঠে বলল,
‘ আরেকটা খাব আমি।’
বলেই হাতে তুলে নিল একটা পিঠা। কামড় বসিয়ে চোখ তুলে মাহাথিরকে দেখে বিভা একটা অভাবনীয় কাজ করে বসল। নিজের অর্ধ-খাওয়া পিঠা এগিয়ে দিল মাহাথিরের দিকে। বলল, ‘ খাবেন?’
উষ্কখুষ্ক চুলের অগোছালো মাহাথিরের লালাভ চোখ দুটো জ্বলজ্বল করে উঠল। তবে সম্মতির আগেই বিভা বলল, ‘ সরি।’
বলেই তার হাতের পিঠা রেখে নতুন আরেকটা পিঠা তুলে নিল। মাহাথিরের দিকে এগিয়ে দিলে মাহাথির শান্তভাবে বিভার হাতের পিঠা আগের জায়গায় রেখে অর্ধশেষ পিঠাটা বিভার হাতে তুলে দিল। এরপর মাথা নিচু করে কামড় বসালো। কামড় বসিয়েই চোখ তুলে তাকাল বিভার দিকে। কী গভীর চোখ! বিভা তাকাতে পারল না। নাম না জানা ভালোলাগায়, লজ্জায় চোখ নামিয়ে নিল।
.
শ্রুতির নিজের উচ্ছ্বাস চেপে রাখতে পারছেনা। ফোন করে বিভাকে জানিয়েছে, পার্থিবকে জানিয়েছে, বাড়ির সবাইকে বলেছে। হামিম আজ নিজ পায়ে হেঁটে তার ঘরে এসেছে। হালকা কষ্ট হয়েছে, তবে পেরেছে। ব্যাপারটা সাধারণ হলেও শ্রুতি, বিভার কাছে ভীষণ খুশির একটা মূহুর্ত। বিভা শুনেও অনেক খুশি হয়েছে। শ্রুতি নিজেও বেশ খুশি। ঘটনাটা ঘটেছে সকালে, অথচ তার খুশি রাতেও কমেনি। উলটো দ্বিগুণ বেড়েছে। পার্থিবও শ্রুতির খুশিটা বেশ উপভোগ করছে। মেয়েটার হাসিমুখ দেখলে আলাদা প্রশান্তি কাজ করে বুকে।
শ্রুতি পার্থিবের দিকে তাকাল। পার্থিব তার পাশেই শুয়ে আছে। দৃষ্টি শ্রুতির মতোই উপরে। শ্রুতি এগিয়ে পার্থিবের হাত মেলে বাহুতে নিজের মাথা রাখল। ভালোলাগায় আপ্লূত হয়ে বলল, ‘ আমাদের জীবনে কী সুন্দর সব ভালো ঘটছে তাইনা, পার্থিব?’
‘ হুম, সব ভালো হচ্ছে আল্লাহর রহমতে।’
‘ আল্লাহ আমাদের সব কষ্ট দূর করে নিচ্ছে। আমি চারদিকে তাকালে শুধু খুশি আর খুশি দেখতে পাই।’
‘ আর আপনার খুশি দেখে আমি শান্তি পাই।’
শ্রুতি পার্থিবের কথার বিপরীতে কিছু বলল না। এই মানুষটা এতো সুন্দর করে কথা বলে! এতো ভালোবাসে তাকে! মাঝেমধ্যে ভীষণ লজ্জা লাগে, আফসোস হয়। মনে হয় মানুষটা আরোও বেশি ভালোবাসার যোগ্য যা শ্রুতি দিতে পারছেনা। শ্রুতি এগিয়ে গিয়ে পার্থিবের গালে সময় নিয়ে চুমু খেল। কৃতজ্ঞতার সাথে ভালোবাসার সংমিশ্রণ ঘটিয়ে বলল, ‘ থ্যাংকিউ পার্থিব। থ্যাংকিউ সো মাচ।’
পার্থিব এক হাতে শ্রুতির কোমড় জড়িয়ে বলল, ‘ কেন?’
‘ সবকিছুর জন্য। আমাকে ভালোবাসার জন্য, আমার পাশে থাকার জন্য। আপনি না থাকলে এতোকিছু হতোই না।’
শ্রুতির অজানা কারণেই ভীষণ খুশি লাগছে। চারদিক রঙিন মনে হচ্ছে। ক্যাঙ্গারুর মতো লাফাতে ইচ্ছে করছে। এতো খুশির কারণ শ্রুতি জানেনা। জানতেও চাইছেনা। মাঝেমধ্যে অজানা কারণে খুশি হওয়া ভালো। শ্রুতি তাকিয়ে দেখল পার্থিব ভীষণ মনোযোগ দিয়ে তাকিয়ে আছে তার দিকে। শ্রুতি পার্থিবের কপালে চুমু খেল। বলল, ‘ আমার জীবনে এতো এতো খুশির উছিলা হয়ে আসার জন্য আপনাকে আপনার মহারানির হৃদয়ের অন্তস্থল থেকে ভালোবাসা জানাই মহারাজ। আপনি কী সেই ভালোবাসা গ্রহণ করতে ইচ্ছুক?’
পার্থিব শ্রুতির গলায় নিজের মুখ আড়াল করে বলল, ‘ উঁহু! একদম ইচ্ছুক নই।’
.
আমিন সাহেব নির্লিপ্ত মুখে টিভি দেখছেন। চেহারা দেখে তার মন বোঝার উপায় নেই। সাধারণভাবেই টিভি দেখছেন গত চল্লিশ মিনিট যাবত। তবুও, এখন যদি তাকে জিগ্যেস করা হয় যে, গত চল্লিশ মিনিটে যা দেখলেন তার সারমর্ম বলুন। আমিন সাহেব নিশ্চিত সে কিছুই বলতে পারবেনা। কারণ বলার জন্য শোনার প্রয়োজন। শুধু তাকিয়ে থাকলেই কথা নিজ পায়ে হেঁটে তার মস্তিষ্কে চলে যাবেনা। গত চল্লিশ মিনিটে সে কিছুই শোনেনি। শুধু তাকিয়ে ছিল। কেন ছিল, কেন শোনেনি তা সে নিজেও জানেনা। তবে শুধু শুধু তাকিয়ে থাকার মানে হয়না। আমিন সাহেব উঠে পড়লেন। টিভি বন্ধ করে কী করবেন ভেবে পেলেন না। তাই আবারো এসে সোফায়তেই বসলেন।
দেড়ঘন্টা আগে সে বাড়িতে প্রবেশ করেছে। হাত-মুখ ধুয়ে কিছু নাস্তা সেড়ে এরপর বসেছেন টেলিভিশনের সামনে। তাতেও মন বসছেনা। শাহিনা , তার ছেলেরা কেউ বাড়িতে নেই। আমিন সাহেবের হঠাৎ মনে হলো তার ছেলে? ভেতর থেকে উত্তর এলো, না! তার সৎ ছেলে। আমিন সাহেব সেই উত্তরই মেনে নিলেন। ওরা সবাই কোথায় গেছে তা আমিন সাহেব জানেনা। অবশ্য জিগ্যেসও করেনি। প্রায়ই যায় কোথাও। এ নিয়ে তার কোনোকালেই মাথাব্যথা কিংবা দুঃখ ছিল না। আজও নেই। তবে আজ কেমন যেন লাগছে। সারা বাড়িটা ফাঁকা। শুনশান নিরবতায় ঘেরা। আমিন সাহেব সোফায় বসে পানি খেতে লাগল। তখনি সে দেখতে পেল রান্নাঘরে দু'জন গৃহচারী কাজ করছে। হয়তো রাতের রান্না। আমিন সাহেবের কাছে ব্যাপারটা কিছুটা খারাপ লাগল। তার মস্তিষ্কে অবচেতনে ভেসে উঠল আজব একটি দৃশ্য- বিভা, মা রান্নাঘরে ঘোরাঘুরি করে কাজ করছে, শ্রুতি পিছনে হামিমকে কোলে নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। দৃশ্যটার পরপরই ভেসে উঠল আরোও আজব একটি দৃশ্য - তাহিরা শাড়ি পরে রান্না করছে। পেছনে বিভা দাঁড়ানো। শ্রুতি চারদিকে ছোটাছুটি করছে। আবার ভেসে উঠল - বিভা মায়ের পা জড়িয়ে ধরে আছে অজ্ঞাতকারণে, শ্রুতি হামাগুড়ি দিচ্ছে, মা আর তাহিরা হাসতে হাসতে কাজ করছে। আমিন সাহেবের মাথা ঝাড়া দিয়ে উঠল। হঠাৎ করে সে এইসব কেন ভাবছে? অবশ্য মনে পড়তেই পারে। এ আর এমন কী!
নিজের বিরুদ্ধে গিয়ে আমিন সাহেব আরেক অভাবনীয় ইচ্ছা পোষণ করল। তার মনে হলো আজ একবার তাহিরার ঘরে যাওয়া যেতে পারে। ভাবার পর একটু সময়ও নষ্ট না করে উঠে চলে গেল আমিন সাহেব। নির্মম হলেও সত্য যে এই ঘরে সে ঢুকল সাড়ে নয় বছর পর। তাহিরা সব সত্যি জানতে পেরেছিল হামিম পেটে থাকার তিনমাসে। এরপরই সেদিন আলাদা হয়ে যায় সে। তাহিরা ঝামেলা করে আলাদা হওয়ার পর সে আর আসেনি এই ঘরে। যা কথাহতো তাহিরা যখন বাইরে ড্রইংরুমে, ডাইনিংরুমে থাকতো তখনই হতো। এছাড়া তেমন প্রয়োজনও পড়েনি আসার। তাহিরা থাকতো বিভা, শ্রুতিকে নিয়ে। সে এখানে কী করবে! তবে তার ঘর ছাড়ার আগে সেই ঘরে থাকা তাহিরার সাজানো জিনিসপত্র নিয়েই ছেড়েছিল। সে অফিস থেকে এসেই দেখেছিল তার ঘরের আবহ সম্পূর্ণরূপে পালটে গেছে। সে নিয়ে যখন জিগ্যেস করা হলো, কেন এমন করেছো?
তাহিরা স্বাভাবিকভাবে বলল, ‘ ঘরটাকে নিজের ঘর ভেবে ভীষণ যত্ন নিয়ে সাজিয়েছিলাম। এখন এই ঘরের মানুষটা যেহেতু আর আমার নেই তাই ঘরটাও আমার নেই। তবে এই ঘরের প্রতি আমার করা যত্নগুলো মূল্যবান ছিল। আর আমার অনুভূতিকে আমি সম্মান করি। একারণে ঘর ছাড়ার সাথে সাথে নিজের অনুভূতিও সরিয়ে নিচ্ছি।’
আমিন সাহেব ঘরে ঢুকে দেখলেন তার ঘর যেমনভাবে তাহিরা সাজিয়েছিল, এই ঘরটাও ঠিক তেমনিভাবে সাজানো হয়েছে। তার বাড়ির রুমগুলো একইরকম হওয়ায় তেমন কোনো পার্থক্য চোখে ফুটছেনা। তবে ঘরটা ধুলোয় ভরে আছে। সামনের টেবিলটা দেওয়ালের সাথে অগোছালো হয়ে আছে কিছুটা। আমিন সাহেব ধুলোভর্তি ঘরের আড়ালে সাড়ে নয় বছর আগের তাহিরা থাকা অবস্থায় পরিপাটি, পরিষ্কার, সুন্দর ঘরের কল্পনা করতে লাগলেন। নিজের ঘরের কল্পনার কথা মাথায় খেলতেই তার ঘরের বর্তমান অবস্থা কল্পনা করলেন। তার ঘর এবং ধুলোয় ভর্তি ঘরের পার্থক্য করতে গেলে আমিন সাহেবের অবচেতন মন বলল - এই ঘরটা বেশি সুন্দর। এই ঘরটায় তাহিরা ছিল। আর তাহিরার জন্যই ঘরজুড়ে একটা শান্তি শান্তি ভাব আছে।
আমিন সাহেব নিজের উপর প্রচন্ড বিরক্ত হয়ে বেরিয়ে পড়ল ঘর থেকে। সে এসব ভাবছে কেন? এমন তো নয় সে তার স্ত্রীকে ভীষণ ভালোবাসতো। একসময় বাসতো, তবে এখন তো বাসেনা। তাহলে এমন আদিখ্যেতার মানে কী? আমিন সাহেব নিজের ঘরে চলে গেলেন। খাটে শুয়ে এসি ছেড়ে পাতলা কম্বল গায়ে জড়ালেন। তার হঠাৎ করে মনে হলো, এই আভিজাত্যময় ঘরটা সুন্দর নয়। তবে সুন্দর ছিল একসময়। সাড়ে নয় বছর আগের পার হওয়া প্রতিটা দিন এই ঘরটা সুন্দর ছিল।
.
রাত তিনটা চারমিনিট। বিভা ফোন দেখে হালকা চমকাল। আজ অন্যদিনের তুলনায় আগে ঘুম ভেঙেছে। অন্যান্যদিন প্রায় সাড়ে তিনটায় ঘুম ভাঙে। সে তুলনায় আজ আগেই উঠেছে সে। নিজের এইভাবে উঠে পড়ায় ভীষণ বিরক্ত হয় বিভা। মাঝরাতে উঠে পড়ে, এরপর সারাদিন ঘুমে ঢোলে পরে। আজব ব্যাপার!
বিভা বাইরে বের হতে হতে ভাবল আজ কী খাওয়া যায়। তার তেমন কিছু খেতে ইচ্ছে করল না, মনেও পড়ল না বিশেষ কোনো খাবারের নাম। বিভা বাইরে এসে ঘরজুড়ে আলোয় চমকে গেল। এগিয়ে গিয়ে রান্নাঘরে ঘর্মাক্ত মাহাথিরকে দেখে তার চমকের পারদ বাড়ল আরেকটু। সাথে মনের ভেতর ভয় হলো মাহাথির এখানে, বিছানায় তাহলে কে ছিল! নিজের অজান্তে এমন প্রশ্নে কিছুটা ভয় পেল বিভা। পরমুহূর্তেই মনে হলো, সে তো পাশে তাকিয়ে দেখেনি যে মাহাথির আছে কিনা। হয়তো ছিলনা। খেয়াল করেনি।
বিভা সামনে এগোতেই মাহাথির চোখে হাসল। কড়াই থেকে কিছু উঠাতে উঠাতে বলল, ‘ রান্নাঘরে এসোনা। সোফায় বসো। আমি নিয়ে আসছি খাবার।’
মাহাথিরের ভাবভঙ্গিতে মনে হলো বিভার এখন উঠে খাওয়া ভীষণ স্বাভাবিক একটা ব্যাপার। বিভা হঠাৎ খুশি হয়েও হলোনা। তার মনের অভিমানেরা ঝাপটে ধরল তাকে। বিভার ভাবনার মাঝেই মাহাথির এগিয়ে এসে এক হাতে প্লেট রেখে অন্য হাতে বিভাকে নিয়ে বসাল। মাহাথির নির্লিপ্ত কণ্ঠে বলতে চাইলেও, কণ্ঠে তার উত্তেজনার আভাস পাওয়া গেল। বলল,
‘ এই নাও। খেয়ে প্লিজ রিভিউ দাও তো কেমন হয়েছে?’
বিভা প্লেটে তাকিয়ে দেখল ফ্রেঞ্চ ফ্রাই, চিকেন ফ্রাই, চিকেন চাপ। আয়োজন অতিরিক্ত না হলেও সাধারণও নয়। প্লেটের কোণায় আবার টমেটো সস রাখা। মুরগির পদ দেখে খারাপ লাগছেনা। বরং খেতে ইচ্ছে করছে। কিন্তু এতোদিন যাবত মুরগি দেখেই তার মাথা ঘুরাতো, নাড়িভুড়ি উলটে আসতো।
মাহাথির অপেক্ষা করল বিভার পরবর্তী কাজের। বিভা গত দু'মাস ধরে মুরগি, মাছ খায়’ইনা বলতে গেলে। অন্যদিকে ডাক্তার বলেছে, শরীরে প্রোটিনের ঘাটতি আছে। তাই সব ভেবে মাহাথির ভাবল মুরগির কিছু খাবার বানানো যেতে পারে। তাইতো আজ না ঘুমিয়ে বসে বসে ইউটুব দেখে এইগুলোই করল মাহাথির। তবে সবকিছু সে অল্প তেলে ভেজেছে। এখন আল্লাহ মা'বুদ জানেন কেমন হয়েছে।
বিভা শুকনোমুখে বলল, ‘ খাবনা।’
বিভার এমন কথায় মাহাথিরের মনটা কাচের মতো ভেঙে গেল। বলল, ‘ কেন বিভা? অন্যকিছু খাবে? বলো তাহলে। অন্যকিছুই বানিয়ে দেই?’
মাহাথিরের এমন কথায় বিভার কাছে সামনের মানুষটাকে ভীষণ অপরিচিত লাগল। মনে হলো, এই কী সত্যি মাহাথির? বিভার মন হয়তো মাহাথিরের আদর, ভালোবাসা, আশকারা পেতে চাইল। তাই অভিমানে বলল, ‘ আমি আপনার হাতের কিছু খাবনা, মাহাথির। ঘরে যাব। ঘুম পাচ্ছে।’
বিভা উঠতেই মাহাথির হাত টেনে ধরে বসাল। নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করে শান্তকণ্ঠে বলল,
‘ আমার রাগ খাবারের ওপর দেখাচ্ছো? খেয়ে নাও। ক্ষুধা লাগেনি?’
‘ লাগলেও খাবনা।’
‘ বিভায়া! আমি কিন্তু রাগ করব। খাও। খেয়ে নিয়ে বলো তোমার হাসবেন্ড এর রান্নার হাত কেমন?’ বলেই মাহাথির নিজের হাতে বিভাকে খাইয়ে দিতে গেল। বিভা জড়বস্তুর মতো বসে রইলে। মাহাথির খাবার আরেকটু এগিয়ে ধরল। বিভা একবার মাহাথির, একবার খাবারের দিকে তাকিয়ে মুখে নিল খাবার। মাহাথির নিজের ভালোলাগার সাথে বিভাকে খাওয়াতে লাগল। বিভা আড়চোখে দেখতে লাগল তার সামনের মানুষটাকে। মাহাথির কী এখন ইচ্ছে করেই এমন অগোছালো থাকে নাকি বিভাকে প্রেমে ফেলার জন্য? নির্লিপ্ত মুখভঙ্গিও কী সুন্দর! বিভা চোখ সরিয়ে মাহাথিরের হাতের দিকে নিতেই তার দৃষ্টি সেখানে স্থির হয়ে রইল। মাহাথির আবার খাওয়াতে গেলে বলল, ‘ এখানে কী হয়েছে?’
মাহাথির সেদিকে একবার তাকিয়ে উত্তর দিল, ‘ গরম তেল ছিটকে এসেছিল।’
মাহাথিরের নির্বিকার কণ্ঠের কথা বিভার সহ্য হলোনা। আর তার হাতে থাকা ছোট্ট বলের মতো দুটো দাগও সহ্য হলোনা। চোখ ঝাপিয়ে শুরু হলো অশ্রুপাত।
মাহাথির বিভার চোখে পানি দেখে হঠাৎ করে থমকে গেলেও ভাঙা মনের কাঁচে যেন ভালোলাগারা এসে ফুল ফুটিয়ে দিল। মাহাথিরের মনটা ভালো হয়ে গেলো এক নিমেষেই। নিজের স্ত্রীর কান্না তাকে প্রমাণ দিল সে তার স্ত্রীর কাছে কতোটা মূল্যবান। তার মনে হলো, তার এতোক্ষণের কষ্ট স্বার্থক। মাহাথির প্লেট নামিয়ে ঠোঁটে হাসি ফুটিয়ে এক হাতে জড়িয়ে ধরল তার মাহতিমের আম্মুকে। মাহাথিরকে আরেকধাপ থমকে দিয়ে বিভা মাহাথিরের বুকে পরে, গেঞ্জি আঁকড়ে ফুঁপিয়ে উঠল। পরিস্থিতি কিছুটা বিষণ্ণ হলেও, মাহাথিরের মনে হলো এরচেয়ে সুখকর কিছু হতে পারেনা।
______
চলবে~
শব্দসংখ্যা - ২১৪০
#একগুচ্ছ_শুকতারা
#শারমিন_ইরান
কিরে! গল্প শেষ হয়না কেন? কাহিনী দেখি বেড়েই যাচ্ছে! তবে অতোবেশিও বাকি নেই। সর্বোচ্চ ৪ পর্ব।😍
পর্বটা কী বেশি বাজে হলো?