একগুচ্ছ শুকতারা
বোনাস-১
শারমিন ইরান
.
যে বধূর চোখ এককালে নিস্পৃহতার কথা বলত, সেই বধূর চোখ যখন সিন্ধু সমান গভীর ভালোবাসার কথা বলে, তখন পার্থিবের হৃদয়টা অপার বিস্ময়ে ছেঁয়ে ওঠে। হৃদয়ের গভীরে কোনো এক গোপন কোণে ব্যথা হয়। সূক্ষ্ম চিনেচিনে ব্যথায় পার্থিব খুঁজে পায় এই দিন-দুনিয়ার সমস্ত সুখ। উন্মত্ত হৃদয় আবেগে বাক-বাকুম হয়ে বলে, এইতো সব পেয়ে গেছি। সুখী হতে তো আর কিছু লাগেনা। পার্থিব প্রশান্তিতে তার চোখ বন্ধ করে চেয়ারে গা এলিয়ে দিল। সময়টাকে টেনে নিয়ে গেল কিছু মাস পেছনে। সময়ের তাড়া দেখে পার্থিব কিছুটা বিরক্ত হলো বৈকি! সময় করে একদিন ‘সময়’ নামক পাখির পাখা কেটে দিতে হবে। বড্ড তারা এই পাখির! কতো দ্রুতই না টেনে নিয়ে যাচ্ছে জীবন নামক ভারী বস্তুকে! এইতো, এই কিছুদিন আগেই শ্রুতি ঝামেলা বাঁধিয়ে চলে গেল, আপার বাবু হলো; আর আজ কি-না শ্রুতি'ই তার সন্তানের মা হবে! পার্থিব তার বুকে একটা ধাক্কা খেল। কী আশ্চর্য সুখময় পৃথিবী! চারদিকের সুখ সুখ গন্ধকে নিজের মাঝে শুষে নিল পার্থিব। সাথে সৃষ্টিকর্তার কাছে তার হৃদয়ের সমস্ত ভালোবাসা দিয়ে আরোও একবার কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করতে ভুলল না।
নাহ! আর চিন্তা করে সময়কে চলে যেতে দেওয়ার মানে হয়না। সুখের দিনের চিন্তায় বর্তমান সময় পেরিয়ে যাচ্ছে। পার্থিব টেবিলের ওপরে রাখা ফাইল খুলল। নিজেকে বুঝ দিয়ে কাজে মন দিতে চেষ্টা করল। কয়েক পাতা উল্টাতেই চোখে পড়ল একটি খাম। পার্থিব খামটি উলটে-পালটে দেখে ভেতরে একটি কাগজ পেল। চিঠি নাকি? কাগজ খুলতেই চোখে পড়ল,
প্রিয় রাগী রাজ্যের শান্ত রাজা,
আপনার এই জিততে চাওয়ার প্রবণতাটা কিন্তু ভীষণ বাজে! সবসময় আমাকে ভালোবাসায় হারিয়ে দিয়ে নিজে জিতে যান। এইবারো নিশ্চয় তেমনই কোনো ফন্দি এঁটেছিলেন? কিন্তু দেখুন, আপনাকে হারিয়ে আজ আমি জিতে গেলাম। চিঠি দিবসে আপনার আগে আমি চিঠি দিয়ে দিলাম। কেমন লাগল? প্রথমবার হেরে গিয়ে আপনার অনুভূতি কেমন তা জানাতে অবশ্যই ভুলবেন না। আপনার চিঠির উত্তরের অপেক্ষায় থাকবে আপনার রাগী-রানি।
পুনশ্চঃ আপনি কী ভেবেছিলেন? আপনি যদি ভেবে থাকেন চিঠিতে আমি আপনাকে তুতু তুতু করব - তবে আপনার জন্য মহাকাশ সমান সমবেদনা জানাই।
পুনশ্চ ২ঃ কাপড় ধুঁতে গেলে হাত, কোমড় ব্যথা করে। আশা করব অফিস থেকে দ্রুত ফিরে কাপড়গুলো ধুয়ে দেবেন। অবশ্যই সন্ধ্যার আগে ফিরবেন। নয়তো কাপড় নষ্ট হয়ে যাবে।
পুনশ্চ ৩ঃ আসার সময় অবশ্যই অবশ্যই দই নিয়ে আসবেন। আপনার বাচ্চা দই খাবে। আর যদি না আনতে পারেন তবে বিকেলের মধ্যে বাসায় ফিরবেন। বিকেলের পরের সরি আপনার বাচ্চার নিকট গ্রহণযোগ্য নয়।
পুনশ্চ ৪ঃ পার্থিব, আমি অনেকবার আকাশের তারা গুনতে চেষ্টা করেছি, পারিনি। আমি অনেকবার আপনার প্রতি নিজের অনুভূতির পরিমাণ জানতে চেষ্টা করেছি, আমিও তাও পারিনি।
পুনশ্চ ৫ঃ উপরের কথায় আবেগে গলে যাওয়ার কিছু নেই। কথাটা দ্বারা এই বুঝাচ্ছে যে, আপনার বউ একটা অকর্মার ঢেকি। আপনি আপনার ঢেকি বউকে একটা চড় লাগানোর জন্যে অবশ্যই অবশ্যই দ্রুত ফিরবেন। মনে থাকবে?
ইতি,
আপনার সীমাহীন ভালোবাসায় মানুষ থেকে বাঁদরে রূপান্তরিত হওয়া
বাঁদর-রানি।
পার্থিব হেসে ফেলল। চিঠিতে লেখা ধমকগুলো যেন পঞ্চমস্বরের আওয়াজ তুলে কানে বেজে চলছে। বুকে বাস করা সমস্ত যত্ন ঢেলে দিয়ে পার্থিব লেখাগুলোর ওপর হাত বুলিয়ে দিল। দিন বাড়ছে, সময় যাচ্ছে। আর তার সাথে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে অনুভূতি, ভালোবাসা। এ কেমন রহস্যময়তা! চোখে ধরা পড়ল চিঠির খামের কোণে লেখা তিনটে শব্দে। ‘তাড়াতাড়ি ফিরবেন। ওকে?’। শ্রুতির মনের সুপ্ত কথাটা একদম স্পষ্ট করে বলা। তবে, বলার প্রয়োজন ছিল না। চিঠির ভেতরকার এতো ধমকাধমকির পেছনে যে পার্থিবের দ্রুত বাড়ি ফেরার অনুরোধ ছিল তা সে বেশ ভালোমতোই বুঝেছে। পার্থিব দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল। ইদানীং মেয়েটার জন্য এতো মায়া হয়! মনে হয় সর্বক্ষণ নিজের চোখের সামনে রাখতে, ভালোবাসতে। এইতো সেদিন যখন পার্থিব বাসায় ফিরল, রুমে ঢোকার সাথে সাথে শ্রুতি এগিয়ে এলো। চক্ষুভরা জল নিয়ে অনুযোগ করে বলল,
‘ কতোবার বললাম বাসায় তাড়াতাড়ি ফিরতে। আপনি তাও দেড়ি করে এলেন।’
কথা শেষ করেই পার্থিবের উত্তর কিংবা প্রতিক্রিয়ার কোনো অপেক্ষা শ্রুতি করল না। গাল ফুলিয়ে চলে গেল। চলে যাওয়ার সাথে সাথে পার্থিবের বুক ভরিয়ে দিয়ে গেল এক অচেনা সুখ, ভীষণ যত্নময় মায়া দিয়ে।
পার্থিব উঠে দাঁড়াল। নিজের প্রাণপ্রিয় বধূর অনুরোধ উপেক্ষা করার ক্ষমতা মহান সৃষ্টিকর্তা তাকে দেয়নি। যখন দেয়'ইনি, তখন শুধু শুধু সময় নষ্ট করার প্রয়োজন হয়না। অফিস থেকে উঠে এক দৌড়ে বাসায় চলে যাওয়া উচিত। গিয়ে ভীষণ শক্ত করে বউকে জড়িয়ে রাখা উচিত। পার্থিব ত্রস্ত পায়ে বেরিয়ে গেল।
____
বিভা,
যার কাছ থেকে তুমি চিঠির প্রত্যাশা করো, সে চিঠিই লিখতে জানে না। তোমার দুর্ভাগ্য! বিভা! শাড়িটা তোমার জন্য কিনেছিলাম। পরে তৈরি থেকো। আজ সবাই মিলে ঘুরতে যাব। শাড়িটা পছন্দ না হলে তোমার পছন্দমতো একটা পরে নিও।
বিভা ঈষৎ হাসল। মাহাথির কী আসলেই চিঠি লিখতে জানে না? শেষে যে একটু ইতি লিখবে, তাও তো দেখি লেখেনি। বিভা ঘড়ির দিকে তাকাল। একদম মধ্য দুপুর। মাহতিমকে গোসল করিয়ে দিয়ে এসেছে দাদা-দাদীর কোলে। রোদের সাথে খেলাধুলা করুক তিনজনে। তাও যদি ঠান্ডাটা কমে! বাপের মত সারাবছর অসুখ-বিসুখ লেগেই থাকে। বিভা ছোট চিঠিটা সযত্নে তুলে রাখতে রাখতে সারাদিনের হিসাব করে নিল। এখন সে গোসলে যাবে। গোসল থেকে এসে খেয়ে নিবে; বাকিদের আগেই খাওয়া-দাওয়ার পর্ব শেষ। ঘর পরিষ্কারের কাজ করতে গিয়েই আজ তার একটু দেড়ি হয়ে গেছে। খাওয়া শেষেই মাহতিমকে একটু ঘুম পাড়িয়ে দিবে। আব্বা-আম্মা একটু বিশ্রাম নেবে। এরপরই বিভা ঘুরতে যাওয়ার কথাটা বলবে। বিভা নিজের জামা-কাপড় নিয়ে গোসলের উদ্দেশ্যে গিয়েও ফিরে এলো। টেবিলে বসে খাতা খুলে লিখতে আরম্ভ করল,
মাহতিমের আব্বু,
আপনি কী সারাজীবন’ই এমন থাকবেন? এমন অপ্রকাশিত? প্রশ্নটা কেন করলাম বুঝতে পারছি না। শুনুন, আপনি আসলেই একটা গাধা, জানোয়ার। গালি শুনে ঘাবড়ে যাবেন না। গালাগালি কেন করছি তাও বুঝতে পারছি না। মনে হলো, গালি দিয়ে শান্তি পাব। তাই দিচ্ছি।
মাহাথির! প্রশ্নটা করার কারণ খুঁজে পেয়েছি। প্রশ্ন করেছি কারণ উত্তর হিসেবে আপনার থেকে ‘হ্যাঁ’ শুনতে চাই। আমি চাই আপনি সারাজীবনই অপ্রকাশিত থাকুন। একদম এখন যেমন আছেন, তেমন। প্রকাশ করলে সবাই আপনাকে পড়ে ফেলবে, মাহাথির। এখন যাকে বিভা ছাড়া কেউ পড়তে পারে না, তাকে যখন সবাই পড়বে - আমার খারাপ লাগবে।
মাহাথির, আপনি অনেক কিছু অনুভব করেন, কিন্তু বলতে পারেন না। আমি জানি সেটা। আমার ধারণা এতে আপনার বুকে যন্ত্রণা হয়, সূক্ষ্ম ব্যথা হয়, মাঝেমধ্যে অনুভূতির চাপে বুক ভার হয়। এই যে আপনার চেয়েও কিছু বলতে না পারা, নিজেকে প্রকাশ করতে না পারা, বুকে ব্যথা নিয়ে আমাকে, আমাদের আগলে রাখা, এই সবকিছুতে আপনার যেমন সুখ সুখ যন্ত্রণা হয়, এই সুখ-যন্ত্রণার মতো গভীরভাবে আপনাকে ভালোবাসি।
কিছুদিন আগে আপনি আমাকে একটা প্রশ্ন করেছিলেন যে, আমি আপনার সাথে সুখী কি-না। উত্তরটা সরাসরি দিতে পারিনি, এখনো পারছি না। উত্তরটা একটু ঘুরিয়ে দেই প্লিজ? উত্তর হিসেবে আমি এখন একটা কবিতা লিখব। কবিতাটা আমার বানানো নয়। রবীন্দ্রনাথের।
আমরা দু’জন একটি গাঁয়ে থাকি,
সেই আমাদের একটিমাত্র সুখ।
তাদের গাছে গায় যে দোয়েল পাখি
তাহার গানে আমার নাচে বুক।
উত্তরটা এইবার স্পষ্টভাবে দেই, আমি এই সংসারে অনেক সুখী, মাহাথির। আমি যতোটা সুখী, ততো সুখী কেউ হয়না, হবেনা।
বিচলিত মন নিয়ে কী লিখলাম বুঝতে পারছি না। অগোছালো সব কথা! তবে বলে হালকা লাগছে। ঠিক করেছি, এখন থেকে কথা জমলেই চিঠি লিখব আপনাকে। আর কথা ফুরিয়ে গেলে উঠে যাব। ঠিকাছে? আমার অগোছালো কথা পড়ার সময় কী আপনার হবে?
ইতি
মাহতিমের আম্মু
বিভা হাপ ছাড়ল। একদৃষ্টিতে চেয়ে রইল সবুজ শাড়িটির দিকে। তাকে একবার সবুজ সুতি শাড়ি পরিহিত দেখে মাহাথির বলেছিল, ‘ সবুজ রঙটা ভীষণ সুন্দর। এখন থেকে এই রঙ পরবে।’ বিভা হেসে ফেলল। বিভার ধারণা মাহাথির তাকে সরাসরি বলতে পারেনি যে সবুজ রঙটায় তাকে মানাচ্ছে। ঘুরিয়ে পেঁচিয়ে রঙকে সুন্দর বলেছে। টেবিলে থাকা ছোট আয়নায় তাকাল বিভা। নিজের প্রতিচ্ছবি নিজের কাছেই হিংসে হলো, ভালো লাগায় বুকের আনাচে-কানাচে ভরে উঠল। এই আসা-যাওয়ার সংসারে তার এতো দাম ছিল বুঝি! ভেবেই মাঝেমধ্যে আশ্চর্য বিস্ময়ে ভরে যায় চারিপাশ। হ্যাঁ, দাম ছিল। অবশ্যই দাম ছিল। এই পৃথিবীর প্রতিটা মানুষ তার নিজের স্থানে দামী।
বিভা উঠতে উঠতে একবার হামিমের বই খাতায় চোখ-বুলিয়ে নিল। এখন সে আছে শ্রুতির বাসায়। কিছুদিন পর আবার এই বাসায় চলে আসবে। ভাইয়ের কথা ভেবে আলাদা ভালো লাগা কাজ করল। যখন প্রথমবার স্কুল-ড্রেস পড়ে আইডি কার্ড গলায় ঝুলিয়ে সামনে এসে বলল, আপো, স্কুলে যাচ্ছি। সেই মূহুর্তে বিভার আকাশ ভেঙে কান্না পেল। ইচ্ছে করল, নিজের ভাইটাকে জড়িয়ে ধরে দিন ভরে কাঁদে। কিন্তু সে তা করেনি। হাসিমুখ নিজের ভাইকে বিদায় জানিয়েছে।
ভাবনার মাঝেই কান্নারস্বর ভেসে এলো। মাহতিমের কান্নার স্বর! বিভা তড়িঘড়ি করে উঠে পড়ল। অনেকবছর পেছনে গিয়ে বিভার কানে একইভাবে বেজে উঠল হামিমের কান্নার স্বর। যেতে যেতে মনে হলো, আচ্ছা শ্রুতির বাচ্চাটাও নিশ্চয় এই রহস্যময় পৃথিবী এসে একইভাবে কাঁদবে। তখন শ্রুতিও নিশ্চয় এমন ব্যকুল হয়ে কাজ ফেলে দৌড়ে যাবে! মহান সৃষ্টিকর্তা এতো সুন্দর সুন্দর সম্পর্ক বানাল কেমন করে?
সমাপ্ত
প্রিয় বন্ধু-পাঠক,
আপনারা সবসময় ভালো থাকুন।
ইতি,
আগডুম-বাগডুম লেখে যে
বিদ্র : সবাইকে চিঠি দিবসে আন্তরিক শুভেচ্ছা এবং আল্লাহর কাছে আপনাদের জন্য দোয়া। চিঠি দিবস উপলক্ষে বোনাস পার্ট দিলাম। কেন জানি মনে হলো আগডুম-বাগডুম দিয়ে দেই, তাই দিলাম। আসলে চিঠি ব্যাপারটা আমার কাছে ভীষণ গভীর। তাই এই দিনের মূল্যও কিঞ্চিৎ গভীর।
বিদ্র ২ : কারো সামনাসামনি কথোপকথন রাখিনি। মনে হলো চিঠিতে চিঠিতে ভালোবাসা হোক।
বিদ্র ৩ : আমার সকল আইডি ডিএক্টিভ করা। তাই যাদের সাথে ইনবক্সে কথা হয়েছে তারা ভাববেন না যে, আমি ব্লক দিয়েছি।
বিদ্র ৪ : বোনাস পার্টের পেছনের সুপ্ত কারণ - মন্তব্য পড়ার লোভ জেগেছে।🥹