একগুচ্ছ শুকতারা
বোনাস - ২
শারমিন ইরান
.
বাথরুম থেকে বেরিয়ে ভীষণ নিস্তেজ ভঙ্গিতে খাটে এসে বসে পড়ল শ্রুতি। বসা অবস্থাতেই ধীরে ধীরে পুরো শরীরের বোধশক্তি হারিয়ে যেতে শুরু করল। অসহ্য যন্ত্রণায় মাথা হেলিয়ে গড়িয়ে পড়ল বিছানায়। দুর্বল শরীরে চোখে কিছুই স্থির হচ্ছে না। রুমের সবকিছু ভীষণ অস্থির ভঙ্গিতে দুলছে। চারপাশের সকল কিছুই কেমন যেন ঝাপসা হয়ে ঘুরে যাচ্ছে। আর সহ্য হলো না; তীব্র ব্যথায় দু'চোখ ফেটে গড়িয়ে গেল উত্তপ্ত কান্নাজল।
চার গিয়ে সবে পাঁচমাস হলো। শুরুর দিকে তেমন অসুবিধা হয়নি। খাওয়া-দাওয়া বেশ ভালোমতোই করা গেছে। বিপত্তি বেঁধেছে এই দু'মাস ধরে। পেটে কিছু থাকছেই না। যা খাওয়া হয়, সব'ই বমি করে ফেলে দিতে হয়। বমির সময় পেটের শেষ দানাটা বেরিয়ে গিয়েও শরীর ক্ষান্ত হয়না। মনে হয় এবার যেন পেট থেকে রক্তনালি গুলো উগড়ে আসবে। সমস্যা কেবল বমি নয়; বমির সাথে সাথে ক্ষুধাভাব বেড়েছে আগের তুলনায় দশগুণ। এখন এক দিনে শ্রুতি আটবার করে কেবল ভারী খাবার'ই খায়। কোনো কোনো দিন সংখ্যা দশের ঘরেও চলে যায়। আট/ দশবারের খাওয়ায় যদি পাঁচ/ছয় বার বমি'ই হয়, কেমন লাগে তখন! শ্রুতি মাথাটা সরল ভঙ্গিতে দিয়ে ফ্যানের দিকে তাকিয়ে রইল। বর্তমানে কেউ যদি শ্রুতির নিকট পশুপাখির খাদ্যশৃঙ্খলের মতো তার নিয়মশৃঙ্খল জানতে চায় তবে শ্রুতি ভীষণ সুন্দর করে এঁকে দিবে একটি চিত্র। চিত্রের মূল বিষয় থাকবে তিনটি। অর্থাৎ -
ক্ষুধা পায়⇨ ক্ষুধা পেলে খাবার খাই ⇨ খাবার খেয়ে বমি করি
‘ ছোট মাম, তুমি আবার বমি করিছোও?’
শ্রুতি ধীরেগতিতে মাথা উঠিয়ে বালিশে ঠেকাল। ভেজা কান্নাচোখে চেয়ে দেখল তার বাবাকে। মাহতিমের বয়স দুই বছর দেড়মাস। সৃষ্টিকর্তার অকল্পনীয় নেয়ামতে মাহতিম তার হাঁটার, কথা বলার প্রাথমিক পর্যায়ে আছে। দু’ বছরেই সে বেশ সুপষ্টভাবে নিজের আদর আদর কথা সবাইকে শুনিয়ে থাকে; ঠিক যেমন করে এখন শ্রুতিকে শোনাচ্ছে। বাড়িতে শ্রুতি একা। বাকি সবাই গ্রামে। পার্থিব অফিসের একটি কাজে নারায়ণগঞ্জ গেছে; আজই ফিরবে। বিভা ভার্সিটিতে। তার ফাইনাল ইয়ারের পরীক্ষা চলছে। অভিভাবক হিসেবে শ্রুতির জন্য রেখে দিয়ে গেছে মাহতিমকে। সকলের অদৃশ্য এক দৃঢ় ধারণা, মাহতিম ছোট হলেও ঠিক শ্রুতিকে দেখে রাখবে।
ঘরের আবহটা কেমন যেন থমকে আছে; ঝিম ধরা সবকিছু। এই ঝিম ঝিম ভাবকে কিছুটা চঞ্চল পর্যায়ে নিতে মাহতিম তার অনভিজ্ঞ নরম এক পা খাটে তুলে দিয়ে খাটে ওঠার চেষ্টা চালাল। সে সকল কাজের সফল পর্যায়ে থাকলেও এই খাটে ওঠার ক্ষেত্রে শূণ্য পর্যায়েই রয়েছে। শ্রুতি তা দেখে এক হাতে টেনে তুলল ছোট দেহটি। মাহতিম খাটে উঠেই শ্রুতির কোল ডিঙিয়ে অপরপাশে চলে যায়। অপর পাশে গিয়ে শ্রুতির মাথার কাছে দাঁড়িয়ে পড়ল। নরম এক হাত শ্রুতির কাঁধে দিয়ে অন্য হাত কপালে নিল। খুচরো চুলগুলো সরিয়ে দিয়ে ভীষণ যত্ন নিয়ে শ্রুতির নাকের মাথায় আদুরে চুমু দিল। মাহতিমের এমন আদরে শ্রুতি মোটেও চমকাল না। তার চারিপাশের মানুষই এমন; ভালোবাসায় পূর্ণ। তাই এখন আর শ্রুতি মোটেও চমকায় না। তবে মাঝেমধ্যেই বিস্মিত হয়ে ভাবে, একসময় তার ধারণা ছিল তাকে কেউ ভালোবাসে না, আর এখন সে ভালোবাসা ছাড়া আর কিছুই পায় না। মাহতিম চুমু উপহার দিয়ে সোজা হয়ে শ্রুতিকে তার সমস্যার সমাধান দিতে বলল,
‘ মাম, তুমি বেশি খাও বলেই তো বমি করো। আর খেও না। বেশি না খেলে বমি ওবে না।’
মাহতিমের এমন গম্ভীর কথায় শ্রুতি মলিন হাসে। দুর্বল হাত উঠিয়ে মাহতিমের মাথায় দিয়ে বলে,
‘ আর বেশি খাব না, বাবা। তোমার সব কথা মেনে চলব।’
শ্রুতির কথা বুঝে মাহতিম মুখ ভরে হাসে। পাশ থেকেই এক প্লেট খাবার তুলে বলল, ‘ বিল্লুমা, আমার খাবার নেও। এটায় খেলে বমি আসবে না।’
শ্রুতি মাহতিমের প্লেটে তাকাল খাবার দেখার আশায়। দেখতে পেল দু'টো কৃত্রিম টমেটো টুকরো আর একটি শসা রাখা। মাহতিমের রান্না-বান্নার বেজায় শখ। একারণে পার্থিব মাহতিমকে কৃত্রিম রান্না বিষয়ক খেলনা কিনে দিয়েছে। সেই খেলনাই মাহতিম রান্না করে প্লেটে সাজিয়েছে। সে দিনের চব্বিশ ঘণ্টায় ছাব্বিশবার রান্না করে, এরপর সবাইকে তার তৈরি খাবার পরিবেশন করে খাওয়ায়।
‘ আ আম্মা, খাওও।’
শ্রুতি ভদ্র মেয়ের মতো হা করে। মাহতিম ভীষণ যত্ন নিয়ে শ্রুতিকে খাওয়ায়। শ্রুতিকে খাওয়ানো শেষ হতেই শ্রুতি দুর্বল হাতে মাহতিমকে কোলে বসাল। ধীর কণ্ঠে বলল,
‘ আব্বু! সেই সকালে দুধ খেলা তুমি। আর তো কিছুই খাচ্ছো না। কী খাবা, মাম্মা কে বলো। কেক দেই বাবা?’
‘ নাহ। কেক ইচ্ছে নাহ। পার্থিব বাবা এলে খাবনিইই।’
‘ পার্থিব বাবা আসতে দেড়ি হবে, মা।’
‘ না, আমি তো ফোন দিয়ে বলে দিছি তুমি কান্না কলছো। বাবা বলিছে আসতিছে। এখন বাবা ভুমে আছে।’
‘ মাহতিম! তুমি ফোনও করতে পারো মা?’
মাহতিম কোনোপ্রকার জবাব না দিয়েই কোল থেকে নেমে পড়ল। পাশ থেকে শ্রুতির ফোন উঠিয়ে মুহূর্তেই পার্থিবকে কল করে ফেলল। শ্রুতি মাহতিমের এমন কাজে ভীষণ পরিমাণে হতাশ হলো। মাহতিমকে মাঝে মাঝেই শ্রুতির ভীষণ জেদি বলে মনে হয়। উত্তর টা সে মুখেই দিতে পারত, অথচ কাজে করে দেখাল। করবে নাই বা কেন! শ্রুতি মাহতিমের যোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। একারণে মাহতিমও নিজের যোগ্যতা দেখিয়ে দিল। শ্রুতি মুচকি হেসে প্রশ্ন করল,
‘ তুমি সবাইকে ফোন দিতে পারো?’
‘ হ্যাঁ, পারি। ছোট বাবাকে দিছি। আম্মু কে দিছি, আব্বুউ কে দিছি। সবাইকে দিছি। দিয়ে বলছি তুমি অনেক কানছো।’
শ্রুতি এবার হেসে ফেলল। এমন আদর আদর ভালোবাসা পেয়ে মন ভালো না হয়ে পারে না।
মাহতিম এতোক্ষণ যাবত পেছন ঘুরে ছিল। এ পর্যায়ে সে ঘাড় ঘুরিয়ে এক অন্য প্রসঙ্গ তুলল,
‘ মাম!’
শ্রুতি এই ভুবনের সমস্ত আদর চোখে মিশিয়ে মাহতিমের দিকে তাকাল। মাহতিম কখনো শ্রুতিকে এক নামে সম্বোধন করে না। যখন যা মন চায়, তাই বলে। কখনো বলে আম্মি, মাম, ছোট মাম, বিল্লু, বিল্লাহ; যখন যা মনে হয় বলে। আর এই ব্যাপার শ্রুতি বেশ উপভোগও করে। শ্রুতি বলল,
‘ বলো, মা।’
‘ মাম, আমার বোন চাই না। তুমি কিন্তু বোন পেট থেকে বের করবে না। ওকে?’
শ্রুতি হেসে ফেলল। মাহতিম অজানা কারণবশত শ্রুতির পেটে যে আছে, তাকে তীব্রভাবে হিংসা করে। যখনই কেউ বলে, মাহতিমের বোন আসবে, তখনই মাহতিম তার সর্বশক্তি দিয়ে কান্না জুড়ে দেয়। সে কান্না আর থামানো যায় না। মাহতিম আবারো আবদার করে বসল,
‘ আম্মাহ…বের করো না কিন্তু। ও খুব খারাপ। ওর জন্য তুমি কানছো। ওকে বের করো না। আমার বোন চাইইই না।’
প্রথমদিকে নরম সুরে বলে শেষের কথাটা বেশ জেদ নিয়ে বলে মাহতিম। শ্রুতিও সায় দিল,
‘ বের করব না তো, বাবা। ওকে পেটেই আটকে রাখব। ও বেজায় দুষ্ট।’
এতোক্ষণের গম্ভীর মুখটায় এবার হাসি ফুটল। মাহতিম সুন্দর হেসে গড়িয়ে পড়ল শ্রুতির বাহুতে। মুখ ভরে ডেকে আবদার করল,
‘ মাম, আমি এখন ঘুম আসব। উঠে তোমায় রান্না করে দিবনি। তুমি খেয়ো।’
মাহতিমের এমন কথায় শ্রুতি শব্দ করে হেসে ফেলল।
_____
সূর্যের আলোর তীব্রতায় ক্রমশই গা ভিজে উঠছে মাহাথিরের। সেই সাথে রাগের তীব্রতা বাড়ছে সমানুপাতিক হারে। তার সামনেই কিছু দূরে বিভা দাঁড়িয়ে আছে একটি ছেলের সাথে। কথোপকথনের বিষয়বস্তু মাহাথির ধরতে পারছে না। ধরার আশায় মাহাথির কিছুটা এগিয়ে গেল। এবার কথোপকথন পূর্বের তুলনায় কিছুটা স্পষ্ট হয়ে এলো -
‘ আমার এক্সাম খুব বেশি একটা সুবিধার হয়নি। সারা বছর ঘুরে ফিরে এক্সামের ডেট দেওয়ায় বই কিনতে গেছি। বই কিনতে গিয়ে বইয়ের দাম শুনে তো আমি হার্টফেল করার অবস্থা। পরে আর বই কেনার সাহসই করিনি। বন্ধুকে বললাম, ছবি দিতে। দিল। সেই ছবি পড়েই কোনোমতে এক্সাম দিলাম, তাহলে বুঝো কেমন হয়েছে!’
ছেলেটার প্রত্যুত্তরে বিভা কিছু বলার মতো পেল না। কেবল হাসল। ছেলেটা নিজ উদ্যোগেই আবারো শুরু করল,
‘ তোমাকে দেখলাম অনেক লিখছো। প্রিপারেশন খুব ভালো ছিল বোঝাই গেল।’
বিভা সাবলীল ভাবে বলল,
‘ লিখেছি যতোটুকু পেরেছি। আচ্ছা, এমনিতেই দেরি হয়ে গেছে। আমি গেলাম।’
ছেলেটা বাঁধা দিয়ে বলল,
‘ তুমি চাইলে আমি গাড়িতে ড্রপ করে দিতে পারি।’
এবার বিভার মুখের বিরক্তিটা বেশ ভালোভাবে ফুটে উঠল। কিঞ্চিত কপাল কুঁচকে দৃঢ়তার সঙ্গে বলল,
‘ আমাকে আমার হাসবেন্ড নিতে আসবে। আমি তার সাথে তার বাইকে যাব।’
বিভার দৃঢ়তায় ছেলেটিকে হয়তো তেমন কান দেওয়ার প্রয়োজনবোধ করল না। নিজের মতো করেই আবার শুরু করল,
‘ হুমমমম! তোমরা মিঙ্গেল রা আমার মতো সিঙ্গেলদের কষ্ট কি'ইবা বুঝবে। তাহলে আমি একাই চলে….’
‘ বিভা! মাহতিম কাঁদছে। বাইকে বসিয়ে রেখে এসেছি। কতোক্ষণ যাবত তোমাকে দেখছে না। ছোটবাচ্চা! কথা হলে তাড়াতাড়ি আসো একটু।’
মাহাথিরের আওয়াজে বিভা পাশে তাকাল। মাহাথিরকে দাঁড়ানো দেখে বিভার মুখের দৃঢ়তা মুছে গেল। পরমুহূর্তেই মাহাথিরের কথা বুঝে ভ্রু কুঁচকে নিল। মাহতিমকে বাইকে বসিয়ে এসেছে মানে! মাহতিম তো শ্রুতির কাছে। তবুও কিছু না ভেবে এগিয়ে এলো বিভা। মাহাথিরের কথায় সায় জানিয়ে বলল,
‘ হ্যাঁ, হ্যাঁ চলুন। দেড়ি হয়ে গেছে অনেক।’
পেছন থেকে ছেলেটি বলল,
‘ বায়!’
বিভা পেছন ফিরে একবার তাকিয়ে চলে গেল। এমন আলকাতরা ধরনের পীরিত বিভার পছন্দ নয়। ছেলেটি খারাপ নয় তবে অত্যধিক পরিমাণে মিশুক যার হেতুসাপেক্ষে মানুষকে কখনো কখনো বিরক্তির চূড়ান্তে গিয়ে ঘাটি গাড়তে বাধ্য করে। এমনিতে এই ছেলে ডিপার্টমেন্টের সবার সঙ্গেই খুব ভাব জমিয়ে চলে।
‘ আপনি তখন কী সব বলছিলেন যে মাহতিমকে গাড়িতে বসিয়ে এসেছেন, কাঁদছে। মাহতিম তো শ্রুতির কাছে।’
‘ আর কী বলতাম! যেভাবে আলাপ জুড়েছিল ছেলেটা। ওকে জানানো প্রয়োজন ছিল তুমি এক বাচ্চার মা। আমার ভুল। মাহতিমকে নিয়ে আসা উচিত ছিল। মাহতিমকে দিয়ে তোমাকে আম্মু ডাকালে আরোও ভালোভাবে বুঝতে পারতো যে তুমি এক বাচ্চার মা..আ।’
বিভা মাহাথিরের এমন শিশুসুলভ জেদের অর্থ পেল না। বিভ্রান্তি নিয়ে বলল,
‘ আরেহ…ক্লাস বলুন, ডিপার্টমেন্ট বলুন যারা আমাকে চেনে সবাই জানে আমি বিবাহিত। আমি নিজেই সবাইকে বলেছি।’
মাহাথিরের কুঞ্চিত ভ্রু'জোড়া সরল হলো না। সে তার অসরল কপাল নিয়েই বাইকে উঠে বসে। বিভা উঠেছে বুঝেই মাহাথির তার নিয়মিত স্বরে বলল,
‘ ওড়না, জামা গুছিয়ে বসো, বিভা।’
বিভা বসে বলল,
‘ শ্রুতি ফোন করেছিল?’
‘ সকালে একবার করেছিল। এরপর মাহতিম নিজেই ফোন করে বলল শ্রুতি কাঁদছে ব্যথায়।’
বিভার মন খারাপ হলো। মলিন কণ্ঠে বলল,
‘ মেয়েটা বেশি অসুস্থ হয়ে যাচ্ছে।’
‘ হচ্ছেই তো। তোমার তাড়াতাড়ি যাওয়া উচিত। আর তুমি গল্প জুড়ে দিসিলা।’
‘ আপনি শুধু শুধু রাগ করছেন। ছেলেটা অমনই। কেমন পাগলাটে! আমি কী সেধে কথা বলেছি নাকি! দেখলেন না আমি চলে আসলাম তাও নিজে থেকেই ডেকে বায় বলল।’
মাহাথির বুঝতে পারছিল সে অকারণেই রাগ করছে। তবে তার এসব পছন্দ নয়। মাহাথির জানে এখানে বিভার দোষ নেই, ছেলেটিরও দোষ নেই। সে কেবল সাধারণ কথাবার্তাই বলছিল। তবুও…পছন্দ না তো। না চাইতেও অসহ্য রাগে, বিরক্তিতে মন খারাপ হলো মাহাথিরের। তার উপর বিভার এমন কথা। মাহাথির অহেতুক জেদে বলল,
‘ ছেলেটা যে পাগলাটে এটাও জানো?’
বিভা মাহাথিরের পিঠে মৃদু চাপড় মেরে বলল,
‘ মাহাথির! অযথাই এমন পাগলামি করছেন। গাড়ি চালান চুপচাপ। ছেলেটা তো বাড়ি পৌঁছে দিতেও চেয়েছিল। আমি মানা করেছি। কারণ আমি মাহাথিরকে এবং মাহাথিরের বাইককে অসম্ভব পরিমাণে ভালোবাসি। তার বাইকে না আসলে আমার ভালোই লাগে না।’
মাহাথির শান্ত হলো কি-না বোঝা গেল না। নিজের মতো চালিয়ে গেল। বেশ কিছুক্ষণ পর বাড়ির সামনে পৌঁছতেই মাহাথির বলে উঠল,
‘ প্রাইভেট কার নিয়ে ঘোরাফেরা করে আর বইয়ের দাম শুনে নাকি আত্মা কাঁপে! ভাওতাবাজির ধান্দা সব। হ্যাহ…’
এ পর্যায়ে মাহাথিরের এমন রাগে বিভা শব্দ করে হেসে ফেলল।
_____
শ্রুতি অসহ্য এক বিস্ময় নিয়ে তাকিয়ে আছে পার্থিবের হাতের প্লেটে। অসহ্য বিস্ময় কারণ এমন বিস্মিত শ্রুতি হতে চাইছে না। মন বলছে মিথ্যা হোক, মিথ্যা হোক। কিন্তু নাহ, পার্থিবের হাতে সত্যই ক্ষীর দেখা যাচ্ছে।
শ্রুতি বিস্মিত কণ্ঠে স্থিরভাবে বলল,
‘ পার্থিববব! আমি বলেছিলাম আমার ক্ষীর খেতে মন চেয়েছে। কিন্তু এখনি খাব এটা বলিনি।’
পার্থিব হাত বারিয়ে গাল ধরে বলল,
‘ আজ ইচ্ছে করেছে, কাল তো ইচ্ছে নাও থাকতে পারে। খেয়ে নিন। খেয়ে বলুন কেমন হয়েছে খেতে।’
শ্রুতি থমকে তাকানো অবস্থাতেই আচানক কেঁদে ফেলল। ফুঁপিয়ে উঠে বলল,
‘ এটাকে আমার সামনে থেকে সরান। সরান প্লিজ।’
পার্থিব বিচলিত হয়ে শুধাল,
‘ সেকি কেন! খাবার থেকে কী কোনো দুর্গন্ধ আসছে নাকি? আমি তো ইউটুব দেখেও মায়ের কাছ থেকে রেসিপি নিয়ে রান্না করলাম।’
শ্রুতি নিজের কান্না থামাল না। কেঁদেই গেল,
‘ আমি খাব না, পার্থিব। এটা খাওয়ার পরে আবারো বমি হবে। আমার ভালো লাগে না বমি করতে। খুব কষ্ট হয় আমার।’
শ্রুতির এমন কান্নায় পার্থিব বিমূঢ় হয়ে পড়ল। এমন অনুরোধের বিপরীতে বলার মতো কিছু পার্থিব প্রস্তুত করতে পারল না। জীবনের এ পর্যায়ে ভীষণরকম অপারগতায়, আফসোসে পার্থিবের শরীর অবশ এলো। দুনিয়া যেন ক্রমশই সুংকুচিত হয়ে এলো। আচ্ছা, সে কী কোনোভাবে পারে না শ্রুতির এই মাতৃত্বের যন্ত্রণাকে ভাগ করে নিতে? সন্তান তো তার’ও। অথচ সকল বেদনা কেবল শ্রুতির একার! পার্থিব শ্রুতিকে টেনে বুকে নিয়ে ভীষণ দরদ মেখে বলল,
‘ এভাবে কাঁদে না, শ্রুতি। আপনি বললেন আপনার গুড়ের তৈরি ক্ষীর খেতে ইচ্ছে হয়েছে। একারণেই তো আমি বানালাম। আর এখন বলছেন খাবেন না! বমি হোক, যাই হোক খাওয়া তো চলমান রাখতে হবে, তাই না। নয়তো শরীরে শক্তি আসবে কেমন করে! মেয়েজাতি এমনিতেই দুর্বল। আরোও দুর্বল হতে চান?’
‘ পার্থিব, আপনি কতো কষ্ট করে বানালেন এতো জার্নি করে এসেও। আমি এইগুলা নষ্ট করতে চাই না। আমি খাব না। আমার বমি হলে খুব কষ্ট হয়। মনে হয় যেন গলা দিয়ে রক্ত বেরিয়ে আসবে। আমি এগুলা নষ্ট করব না।’
‘ হাপপপপ! নষ্ট হবে কেন! খেলে কি নষ্ট হয় নাকি? অল্প খান। মন চেয়েছে, খান। দেখবেন, বমি আসবে না। আমাকে বিশ্বাস করুন। অল্প একটু খান। একটুউউ….খেয়ে বলেন কেমন বানিয়েছি। এমনিতে আমি আবার রান্নায় এক্সপার্ট। হা করুন…’
শ্রুতি পার্থিবের হাতে সম্পূর্ণ ক্ষীর’ই খেয়ে নিল। পার্থিব শেষ চামচ খাওয়াতে খাওয়াতে জানতে চাইল,
‘ মাহতিমের সাথে কেমন কাটল দিন?’
‘ ভালো কেটেছে। তবে ছেলেটা দিনে দিনে তারছিড়া হয়ে যাচ্ছে আপনার মতো। যাওয়ার সময়ও বলে গেছে, পেট থেকে বাবু যেন না বের করি।’
পার্থিব হেসে ফেলল। সে এই বিষয়ে আগে থেকেই অবগত। শ্রুতির মুখ মুছে দিতে দিতে বলল,
‘ কে সহ্য করবে তার আদরের ভাগ অন্য কেউ নিতে আসলে? মাহতিমও সহ্য করতে পারছে না।’
রাত বারোটা বেজে চল্লিশ মিনিট। পার্থিব বিছানায় বসেই কিছু কাজ করছে। কাজ প্রায় শেষের পথে। তার পাশেই শ্রুতি বসে আছে মন খারাপ করে। মন কেন খারাপ তা শ্রুতি বুঝতে পারছে না, তবে মন খারাপ। শ্রুতি অধৈর্য কণ্ঠে বলল,
‘ মায়ের কাছে যাব। কবে আসবে সবাই?’
পার্থিব হাত বাড়িয়ে শ্রুতির মাথায় বুলিয়ে দিল। আদর স্বরে বলল,
‘ এসে যাবে, শ্রুতি। কাল-পরশুই এসে যাবে। মন খারাপ করে না।’
বেশ অনেক সময় পরেই পার্থিব তার কাজ শেষ করে শ্রুতির পাশে শুয়ে পড়ল। রুমের আধো আলোয় শ্রুতির টলটলে চোখ পার্থিবের চোখে এড়ালো না। শ্রুতিকে জড়িয়ে নিয়ে বলল,
‘ আমার বাচ্চার মায়ের কীসের এতো দুঃখ, শুনি?’
শ্রুতি মলিন কণ্ঠে বলল,
‘ আমার অনেক মন খারাপ।’
‘ বেশি মন খারাপ? তাহলে এখন কী উপায়ে আমি আমার বেগমের মন ভালো করতে পারি? আমার বেগমের কী কোনো সুপ্ত ইচ্ছে আছে?’
শ্রুতি সহাস্য কণ্ঠে বলল,
‘ না নেই, চলুন ঘুমাই। সারাদিন অনেক কষ্ট করেছেন আপনি।’
বলেই পার্থিবের চুলে হাত গলিয়ে দিল শ্রুতি। পার্থিব উদ্বেগ নিয়ে বলল,
‘ ঘুমাবেন মানে! মন খারাপ কেন সেটাই তো জানা হলো না।’
শ্রুতি শিশুদের মতো ডানা ঝাপটানো খুশি নিয়ে বলল,
‘ মন খারাপ নেই তো।’
‘ আরেহ! এইমাত্র বললেন মন খারাপ।’
‘ ছিল। ভীষণ মন খারাপ ছিল অজানা কারণে। কিন্তু যেই আপনি আমাকে জিগ্যেস করলেন মন খারাপ কেন, ওমনি আমার মন ভালো হয়ে গেল। আপনার আমার প্রতি যত্ন, চিন্তা সব আমি ভীষণ ভালোবাসি। তাই আপনি যে আমার মন খারাপকে এতো গুরুত্ব দিয়েছেন, আমার জন্য চিন্তা করেছেন - এটা ভেবেই আমি এখন অনেক অনেক খুশি, পার্থিব।’
শ্রুতির এমন উচ্ছ্বসিত কণ্ঠ পার্থিবের বুক ভরিয়ে তুলল। তবুও কৃত্রিম হতাশা মুখে ছেপে বলল,
‘ এই কথা এখন বলছেন। সকাল হলেই তো আবার কাঁদতে শুরু করে বলবেন, আপনাকে কেউ ভালোবাসে না। কেউ না।’
বলেই দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল পার্থিব। পার্থিবের এমন ভঙ্গিতে শ্রুতি শব্দ করে হেসে উঠল। মুখ ভর্তি আনন্দ, বুক ভর্তি প্রাপ্তি নিয়ে শ্রুতি সত্যিই বলল, ‘ পার্থিব! আমাকে কেউ ভালোবাসে না।’
সাধারণ একটি কথা তবুও শ্রুতি কথাটি বলে নিজের হাসি থামাতে পারছে না। হাসতে হাসতে মেয়েটার চোখ ভরে উঠল, তবুও থামার কোনো লক্ষণ দেখা গেল না। পার্থিব নিজের কপাল দিয়ে শ্রুতির কপাল ঠুকে দিল,
‘ আপনি আমাকে তারছিঁড়া বলেন। অথচ আপনার নিজের মাথার তারই যে ধীরে ধীরে সব ছিঁড়ে পড়ছে সে খেয়াল আছে?’
পার্থিবের কথায় শ্রুতি হাসিমুখেই তাকাল। শ্রুতির এমন দৃষ্টিতে থমকে গেল পার্থিব। টলটলে চোখের সাথে মৃদু হাসির আভা! কী ভয়ংকর সৌন্দর্য! পার্থিব দ্বিধায় আটকে গেল। আচ্ছা, শ্রুতি যে এতো সুন্দর, তা কী শ্রুতি কখনো জানবে? না জানলেও পার্থিব কী কখনো প্রকাশ করতে পারবে এই সৌন্দর্যের অসহ্য তীব্রতাকে?
| সমাপ্ত |
_____