মহাপ্রয়াণ
লেখনীতে : নাফিসা তাবাসসুম খান
৪৫.
মাত্র বুখারেস্ট পৌঁছালো রিকার্ডো। মনে তার সংশয় কাজ করছে প্রবল। এমন নয় যে সে আগে কখনো বুখারেস্ট শহরে আসে নি৷ অগণিতবার এই শহরে আসা হয়েছে তার। তবে এবার তার বুখারেস্ট আসার উদ্দেশ্য ভিন্ন। এবার তার গন্তব্য কেবল বুখারেস্ট নয় বরং বুখারেস্ট প্রাসাদও। সেই প্রাসাদ যেই প্রাসাদে তার মা বাবা থাকতো। সেই প্রাসাদ যা তার নিজের ঘর হওয়ার কথা ছিলো। যে প্রাসাদে তার বেড়ে উঠার কথা ছিলো। এসব ভাবতেই রিকার্ডোর অন্যরকম অনুভূতি হয়। এক অজানা নামহীন অনুভূতি।
বুখারেস্টে পৌঁছে সর্বপ্রথম বাজারে চলে আসে রিকার্ডো। একটি ভোজনশালায় এসে কিছু খাবার দিতে বলে বসে পড়ে সে। বাজার এবং ভোজনশালা হলো এমন দুটি জায়গা যেখানে সকলেই রাজ্যের খুটিনাটি নিয়ে আলাপ আলোচনা করে। রিকার্ডো চারিপাশে চোখ বুলিয়ে নেয় একবার। আশেপাশে আরো অনেক পুরুষ বসে আছে। সকলেই আড্ডায় মশগুল। হঠাৎ রিকার্ডো খেয়াল করে তার পাশের গদিতে বসা দুজন পুরুষ আলাপ করছে,
" আমার তো মনে হয় আমাদের সাম্রাজ্যে আবার কারো অভিশাপ লেগেছে। "
" আমারও তাই মনে হয়। নাহলে এমন নৃশংস খুন কিভাবে সম্ভব? "
" ঠিক এক শতাব্দী আগে এমনই এক অভিশাপ এই সাম্রাজ্যে এসেছিলো। সেই দূর্যোগে কাউন্ট লিও এবং কাউন্টেস ম্যারি সেই অভিশপ্ত ট্রান্সিলভেনিয়াতে মারা গিয়েছিলেন। লোকমুখে শুনেছি কাউন্টেস ম্যারি তখন অন্তঃসত্ত্বা ছিলেন। উনার সেই সন্তান জীবিত থাকলে তো এই সাম্রাজ্য কখনোই হেনরিকসরা দখল করতে পারতো না। আজও এই সাম্রাজ্যে আলবার্টরা রাজ করতো। "
" ঠিক। হেনরিকসরা ক্ষমতায় আসার পর থেকে রাজ্যে খুন এবং লুটপাট একদম চূড়ান্ত পর্যায়ে চলে গিয়েছে। "
" আচ্ছা যা হওয়ার হয়েছে। অন্তত কাউন্ট লোনেলের ছেলে প্রিন্স ড্রাগোস তো জীবিত আছেন। নাহয় হেনরিকসদেরও বংশ বিলুপ্ত হয়ে আবার নতুন কোনো শাসক আসতো। "
রিকার্ডো এতটুকু কথা শুনেই সেখান থেকে প্রস্থানের সিদ্ধান্ত নেয়। উঠে দাঁড়িয়ে পড়ে সে যাওয়ার জন্য। হঠাৎ পিছন থেকে একটি যুবকের কথা শুনতে পায়,
" আমি গ্রীক হতে যুদ্ধ বন্দী সকল মেয়ে কোন কোন দাস বাজারে বিক্রি হয়েছে জানতে চাই। "
রিকার্ডো ঘাড় ঘুরিয়ে পিছনে ফিরে তাকায় কৌতুহলবসত। দেখে একটি যুবক একজন ত্রিশার্ধো লোকের সাথে কথা বলছে। লোকটা জবাবে বলে,
" কি যে বলেন না সাহেব। এটা কি কোনো সামান্য কথা? গ্রীক থেকে যুদ্ধবন্দী হয়ে কয়েকশো মেয়ে এসেছে। তাদেরকে আলাদা আলাদা বিভিন্ন দাস বাজারে বিক্রি করা হয়েছে। সেখান হতে প্রায় সব মেয়েই বিভিন্ন মনিবের কাছে বিক্রি হয়ে গিয়েছে। আর বাকি মেয়েরা অভুক্ত থেকে দাস বাজারে পড়ে মরেছে। আপনাকে আমি কিভাবে সকল মেয়ের খোঁজ দিবো? "
রিকার্ডো দেখে যুবকটা লুকিয়ে ক্লকের ভেতর হতে একটা ছোট থলি বের করে। সেটা দেখিয়ে ওই লোকটাকে বলে উঠে,
" তোমার যত অর্থ প্রয়োজন আমি দিবো। তবুও আমার কাজ করে দাও। "
স্বর্ণ মুদ্রার থলি দেখে লোকটার চোখ জ্বলজ্বল করে উঠে। হাত বাড়িয়ে দিতে নেয় সেটা নেওয়ার জন্য। তখনই রিকার্ডো সেখানে উপস্থিত হয়ে সেই থলেটি নিজের হাতে নিয়ে বলে উঠে,
" আমি খোঁজ দিতে পারবো। "
মুহূর্তেই লোকটার চেহারায় আধার নামে। যুবকটি রিকার্ডোকে প্রশ্ন করে,
" সত্যি খবর দিতে পারবে তুমি? "
রিকার্ডো মাথা নেড়ে প্রশ্ন করে,
" আপনার নাম? "
" ওরিয়ন বর্গেস। আপনার নাম? "
রিকার্ডো জবাব না দিয়ে বলে,
" আমরা অন্য কোথাও যেয়ে কথা বলতে পারি? "
" অবশ্যই। "
এই বলে ওরা দুজন সেই ভোজনশালা থেকে প্রস্থান করে। পেছনে সেই লোকটার মুখ অন্ধকার হয়ে থাকে। সে ভেবেছিলো খোঁজার নাম করে ওরিয়নের থেকে কিছু মুদ্রা হাতিয়ে নিবে। কিন্তু শেষ মুহুর্তে সেই আগুন্তকঃ এসে তাদের কথার মাঝে বাগড়া দিয়ে তার সকল পরিকল্পনা ভেস্তে দিলো।
__________
" আপনি বসুন, আমি আপনার জন্য কিছু খাওয়ার ব্যবস্থা করছি। "
সাথে সাথে রিকার্ডো নাকোচ করে বলে উঠে,
" শুধু শুধু ব্যস্ত হবেন না। আপনি বসুন। আমি আপনার সাথে কথা বলেই চলে যাবো। আমার আবার তাড়া আছে। "
ওরিয়ন রিকার্ডোর সামনে বসতে বসতে বলে উঠে,
" আপনার নামটা বললেন না যে? "
রিকার্ডো শান্ত স্বরে নিজের নাম জানিয়ে প্রশ্ন করে,
" আপনি কাকে খুঁজে বেড়াচ্ছেন জানতে পারি? "
" আমার বন্ধু। খুব ভালো একজন বন্ধু। সেই যুদ্ধের সময় ওর পরিবারকে মেরে ওকে তুলে আনা হয় রোমানিয়ায়। "
রিকার্ডো এবার গম্ভীর স্বরে বলে উঠে,
" তুমি আমার থেকে বয়সে ছোট তাই তুমি করেই বলছি। তুমি যেভাবে খুঁজে বেড়াচ্ছো তাতে তোমার সকল স্বর্ণ মুদ্রা শেষ হয়ে যাবে তবুও তুমি তাকে খুঁজে পাবে না। কারণ যাদের ভরসায় খুঁজতে চাইছো তারা ওই মেয়েকে খুঁজে দিতে না পারলেও তোমার সব মুদ্রা ঠিকই হাতিয়ে নিবে। আর দাস বাজার হতে বিক্রি হওয়া কোনো মেয়ের ঠিকানা পাওয়া কখনোই সম্ভব নয়। "
ওরিয়নের চেহারায় হতাশা এবং রাগ ফুটে উঠে। সে প্রশ্ন করে,
" তাহলে আমাকে মিথ্যা বললেন কেন যে আপনি খুঁজে দিতে পারবেন? "
" ওই লোকের থেকে পিছু ছাড়ানোর জন্য। "
ওরিয়ন রাগে দাঁড়িয়ে বলে উঠে,
" আপনি তাহলে আসতে পারেন। "
রিকার্ডো কোনো কথা না বলে উঠে দাঁড়ায়। দরজার কাছাকাছি যেতেই সে পিছনে একটা বাচ্চার কণ্ঠ শুনে থেমে যায়।
" ভাই অ্যানাকে আজকেও পাও নি? "
রিকার্ডো ভ্রু কুচকে পিছনে ফিরে তাকায়। একটি বাচ্চা ছেলে সিঁড়ি বেয়ে নামতে নামতে প্রশ্নটি করে। ওরিয়ন চোখে মুখে হতাশা নিয়ে জবাব দেয়,
" পাইনি কিন্তু খুব শীঘ্রই পেয়ে যাবো৷ "
রিকার্ডো সন্দিহান গলায় প্রশ্ন করে,
" তোমরা যাকে খুঁজছো তার সম্পূর্ণ নাম কি? "
নিকোডিমাস উত্তর দিয়ে বলে উঠে,
" আনাস্তাসিয়া অ্যালভেজ। কিন্তু আপনি কে? "
ওরিয়ন বিরক্তির সুরে রিকার্ডোকে বলে উঠে,
" আপনি এখনো যান নি? "
রিকার্ডো আর কথা না বাড়িয়ে চুপচাপ সেখান থেকে চলে আসে মনে হাজারটা ভাবনা এবং প্রশ্ন নিয়ে।
__________
জুন এবং জেনির সাথে উঠানে তলোয়ার প্রশিক্ষণ করছে আনাস্তাসিয়া। তিনজনের হাতেই কাঠের তলোয়ার। বাচ্চা দুটো এখনো ছোট তাই আনাস্তাসিয়া তাদের হাতে কাঠের তলোয়ারই তুলে দিয়েছে প্রশিক্ষণের জন্য। আনাস্তাসিয়া আজকে বেশ অন্যমনস্ক। কোনো গভীর ভাবনায় আচ্ছন্ন হয়ে আছে সে। জুন আর জেনি তা লক্ষ্য করে। নীরবে তারা হাতের তলোয়ার মাটির উপর রেখে দৌঁড়ে গিয়ে আনাস্তাসিয়ার কোমর জড়িয়ে ধরে। আনাস্তাসিয়া চমকে তাকায়। জুন আদুরে স্বরে প্রশ্ন করে,
" তোমার মন খারাপ অ্যানা? "
আনাস্তাসিয়া সামান্য হেসে জুন এবং জেনির সামনে হাঁটু গেড়ে বসে পড়ে। তারপর উত্তর দেয়,
" তোমাদের এমন কেন মনে হলো? "
জেনি পাশ থেকে বলে উঠে,
" কারণ তুমি আজকে অনেক চুপচাপ। "
আনাস্তাসিয়া মলিন হেসে বলে,
" আসলে আমি কিছু একটা নিয়ে ভাবছিলাম। আজকের জন্য এতটুকুই থাক? বাকি প্রশিক্ষণ আমরা কালকে করবো? "
জুন এবং জেনি মাথা নেড়ে সম্মতি জানায়।
বাসার বারান্দায় বসে জোসেফ দেখে সম্পূর্ণ দৃশ্য। সে জানে আনাস্তাসিয়া কি নিয়ে ভাবছে। রিকার্ডো তাকে গতরাতে ডেকে নিজের এবং আনাস্তাসিয়ার সম্পর্ক সমন্ধে জানায়। জোসেফ প্রথমে খানিক অবাক হয়। কিন্তু পরে সে হিসেব কষে দেখে এরকম আভাস তো সে আগেই পেয়েছিলো। কিন্তু তখন সে তেমন একটা গায়ে মাখে নি। রিকার্ডো জোসেফকে সব জানিয়ে তাকে স্পষ্ট করে বলে দেয়,
" আমি যতদিন না ফিরছি তোমার দূর্গে আসার প্রয়োজন নেই। বাসায় থাকবে এবং নিজের পরিবারের খেয়াল রাখবে। আর আনাস্তাসিয়া আমার কাছে কতটা মূল্যবান তা আশা করছি আলাদা করে তোমাকে বলতে হবে না। "
জোসেফ মাথা নেড়ে বলেছিলো,
" আনাস্তাসিয়া আমারও পরিবারের অংশ। কোনো অবহেলা হবে না নিশ্চিত থাকুন কাউন্ট। "
ভাবনার জগৎ থেকে বেরিয়ে আসে জোসেফ। তারপর আবার সামনে দাঁড়িয়ে থাকা আনাস্তাসিয়ার দিকে তাকিয়ে মনে মনে বলে,
" এই জংলী বিড়াল শেষমেশ আমাদের কাউন্টকে কাবু করেই ছাড়লো। কাউন্টকে কৃষ্ণ সাগরে ডুবিয়ে মারার পরিকল্পনা করতে করতে এখন নিজেই কাউন্টকে সহ প্রেমের সাগরে ডুব দিয়েছে। ভালোই হয়েছে। এখন থেকে ও কাউন্টের মাথা খাবে আমি আরামে থাকবো। "
এটুকু বলেই জোসেফ আরাম করে পিছনের দিকে গা এলিয়ে দিয়ে চোখ বুজে রয়। হঠাৎ কানের কাছে জোরে কারো চিল্লানোর শব্দে ধরফরিয়ে চোখ মেলে উঠে বসে সে। তার সামনে আনাস্তাসিয়া, জুন এবং জেনি দাঁড়িয়ে আছে। জোসেফ বিরক্তির সুরে তিনজনকে একবার দেখে নিয়ে আনাস্তাসিয়ার দিকে তাকিয়ে বলে,
" এতো জোরে চেঁচামেচি করছো কেন আমার কানের কাছে এসে? ঈশ্বর আমার কানের পর্দা মনে হয় ফেটে গেলো। "
আনাস্তাসিয়া মুখে ভেংচি কেটে বলে,
" চিল্লিয়েছি বেশ করেছি। "
জোসেফ বিরক্তির সুরে বলে উঠে,
" নিজে তো আস্ত এক জংলী আমার মেয়েদেরকেও নিজের মতো বানিয়ে ফেলছো। "
ওদের চেঁচামেচিতে বাড়ির ভেতর থেকে জোয়ান্দ্রা বেরিয়ে আসে। সে এসে প্রশ্ন করে,
" এখানে কি চলছে? এতো চেঁচামেচি কেন করছো সবাই? "
আনাস্তাসিয়া বলে উঠে,
" আমরা তো কেবল জোসেফকে ডাকছিলাম জোয়ান্দ্রা। "
জোসেফ ভ্রু কুচকে প্রশ্ন করে,
" আমাকে কেন? "
আনাস্তাসিয়া, জুন এবং জেনি মুখটা হাসি হাসি করে বলে উঠে,
" আমরা ঘুরতে যেতে চাই। "
জোসেফ ভ্রু কুচকে বলে উঠে,
" কোথাও যাওয়া চলবে না। চুপচাপ ঘরে বসে থাকো। "
আনাস্তাসিয়া জুন এবং জেনির দিকে তাকিয়ে ইশারা করতেই তারা জোসেফের দুহাত ধরে টানতে থাকে। আনাস্তাসিয়া হেসে বলে,
" আমরা তো যাবোই এবং তুমি আমাদের ঘুরিয়ে নিয়ে আসবে। "
ওদের কাণ্ড দেখে জোয়ান্দ্রা না হেসে পারে না৷ আনাস্তাসিয়া আরো বলে,
" একে তো তুমি সচরাচর বাসায় থাকো না। ফিরো অনেক রাত করে। এখন যেহেতু বাসায় আছো তাই তোমার উচিত পরিবারকে সম্পূর্ণ সময় দেওয়া। "
জোসেফ মাথা নাড়িয়ে না না করতে থাকে। হঠাৎ জোয়ান্দ্রা পাশ থেকে বলে উঠে,
" চলো না আজ সবাই মিলে বের হই। "
ব্যস এতটুকু কথাই যথেষ্ট ছিলো জোসেফকে রাজি করানোর জন্য। সে সাথে সাথে সবাইকে তৈরি হয়ে আসতে বলে। বাচ্চারা হৈ হুল্লোড় করে তাড়াতাড়ি ভেতরে চলে যায় তৈরি হতে। আনাস্তাসিয়াও হাসতে হাসতে তাদের পিছু চলে যায়। বিয়ের এতো বছরেও জোয়ান্দ্রা কখনোই জোসেফের কাছে মুখ ফুটে তেমন কিছুই চায়নি। আর না জোসেফ কখনো এতো আয়োজন করে জোয়ান্দ্রার জন্য কিছু করতে পেরেছে কখনো। উল্টো সে আরো বাসায় কখনো তেমন একটা সময় দিতে পারে না বললেই চলে। বাচ্চা দুটোকে জোয়ান্দ্রা একা হাতেই সামলায় সবসময়৷ তবুও কখনো কোনো অভিযোগ করে নি। তাই আজ জোয়ান্দ্রা নিজ থেকে ঘুরতে যাওয়ার কথা বলায় জোসেফ আর মানা করে নি। সাথে সাথে উল্টো রাজি হয়ে যায়। এই বাহানায় আনাস্তাসিয়ার মনও নাহয় কিছুটা ভালো হয়ে যাবে।
__________
গভীর নীরব রাত। ক্যাথরিন বেঘোরে ঘুমোচ্ছে। আরোণ মুগ্ধ দৃষ্টিতে তার পাশে শুয়ে তাকে দেখছে। কক্ষে জ্বলজ্বল করা কিছুসংখ্যক মোমবাতির আলোয় ক্যাথরিনের আবছা মুখশ্রী বেশ আকর্ষণীয় লাগছে। ঘুমের মাঝে আচমকা ক্যাথরিন আর্তনাদ করে জেগে উঠে বসে। আরোণ চমকে যায়। বিচলিত স্বরে প্রশ্ন করে,
" কি হলো ক্যাথ? "
ক্যাথরিন জবাব দিতে পারে না। পেটে হাত দিয়ে সে আর্তনাদ করতে থাকে। আরোণের কোনো প্রশ্নের জবাব দেয় না। আরোণ আর কোনো উপায়ন্তর না পেয়ে তাড়াতাড়ি কক্ষের দরজা খুলে বেরিয়ে প্রহরীদের আদেশ দেয় নেকড়ে পালের সদস্য হান্নাহকে ডেকে আনতে। আদেশ দিয়েই সে ফিরে এসে ক্যাথরিনের পাশে বসে তাকে আঁকড়ে ধরে। কিছুক্ষণের মধ্যেই হান্নাহ কক্ষে এসে প্রবেশ করে। ক্যাথরিনের পাশে বসে সে আরোণকে বলে,
" কিছু মনে না করলে আলফা আপনি একটু বারান্দায় গিয়ে অপেক্ষা করবেন? "
আরোণ নাকোচ করে না। কেবল যাওয়ার আগে বিচলিত কণ্ঠে বলে যায়,
" কোনো সমস্যা হলে সাথে সাথে আমায় ডাকবে। "
__________
বেশ অনেকক্ষণ ধরে ক্যাথরিনকে বারবার পরীক্ষা করে দেখছে হান্নাহ। আরোণের পর সে হলো দ্বিতীয় নেকড়ে মানবী। নেকড়ে মানবী হওয়ার পাশাপাশি সে একজন চিকিৎসকও। পরীক্ষা শেষে কিছুটা চিন্তিতভাবে তাকায় সে ক্যাথরিনের পানে। আর্তনাদ করতে করতে কিছুক্ষণ আগেই ক্যাথরিন আবার ঘুমিয়ে পড়েছে। চেহারায় ক্লান্তির ছাপ তার। হান্নাহ ক্যাথরিনকে আরেক নজর দেখে নিয়ে উঠে বারান্দায় চলে আসে সোজা। আরোণের সামনে এসে দাঁড়াতেই আরোণ চিন্তিত সুরে প্রশ্ন ছুড়ে বসে একের পর এক। ক্যাথরিনের কি হয়েছে, এখন কেমন আছে ইত্যাদি ইত্যাদি প্রশ্ন করে ক্ষান্ত হয় সে। হান্নাহ জবাবে স্পষ্ট জানায়,
" ক্যাথরিন মা হতে চলেছে আলফা। "
আরোণ থমকায়। বাকহারা হয়ে পড়ে। বারান্দার বিশাল খোলা দরজা দিয়ে কক্ষের ভিতরে তাকায় সে। ক্যাথরিন ঘুমোচ্ছে আবার। অদ্ভুত অনুভূতি হয় আরোণের। কাপা কাপা স্বরে প্রশ্ন করে,
" তুমি নিশ্চিত হান্নাহ? "
" জ্বি আলফা৷ আপনার সন্তান আসতে চলেছে। "
আরোণ বেশ খুশি হয়। অদ্ভুত উত্তেজনা কাজ করছে তার। অতি খুশিতে শরীর ঝিমঝিম করছে। হঠাৎই আরোণ চিন্তিত দৃষ্টিতে তাকায় হান্নাহর দিকে। প্রশ্ন করে,
" ক্যাথরিন? ওর কিছু হবে না তো? "
হান্নাহ জবাব দেয়,
" বাচ্চাটা আর দশটা স্বাভাবিক বাচ্চার মতো হবে না আলফা। সে একজন নেকড়ের সন্তান। আর ক্যাথরিন একজন মানুষ। একজন মানুষের পেটে নেকড়ে বেড়ে উঠার মানে হচ্ছে স্বাভাবিক প্রসবের তুলনায় কয়েক গুন বেশি কষ্ট হবে ক্যাথরিনের। আর নেকড়ে হওয়ার ফলে বাচ্চা পেটে খুব দ্রুত বেড়ে উঠবে। তিনমাস পরই সে পৃথিবীতে এসে পড়বে। কিন্তু ক্যাথরিনের কিছু হতে দিবো না আমি নিশ্চিত থাকুন। একটু বেশি সতর্ক থাকতে হবে কেবল। আর আমি ওর জন্য যা যা প্রয়োজন সব করার ব্যবস্থা করছি। "
আরোণ মাথা নেড়ে বলে,
" তুমি এখন আসতে পারো। আমি কাল তোমার সাথে এ বিষয়ে কথা বলবো। "
হান্নাহ সম্মতি জানিয়ে বেরিয়ে যেতে নেয়। আরোণ পিছু ডাকতেই আবার ফিরে তাকায়। আরোণ বলে,
" আপাতত কাউকে কিছু জানানোর প্রয়োজন নেই। আমি নিজেই সকলকে জানিয়ে দিবো। "
হান্নাহ মাথা নাড়িয়ে কক্ষ থেকে বেরিয়ে যায়। হান্নাহ বেরিয়ে যাওয়ার পরপরই আরোণ কক্ষে প্রবেশ করে। ধীরে ধীরে ক্যাথরিনের পাশে গিয়ে বসে সে। আপনাআপনি তার হাত চলে যায় ক্যাথরিনের পেটের উপর। মসৃণ কাপড় ভেদ করে সে যেন পেটের ভেতর বেড়ে উঠা এক ছোট্ট প্রাণকে অনুভব করতে পারে। আরোণ মাথা ঝুঁকিয়ে সেখানে বেশ অনেকক্ষণ সময় নিয়ে চুমু খায়। ক্যাথরিন সামান্য নড়ে উঠে এতে। আরোণ ফিসফিসিয়ে ক্যাথরিনের পেটের কাছে মুখ নিয়ে বলে উঠে,
" বাবা তোমাকে অনেক ভালোবাসি জান। "
সাথে সাথেই সে উঠে ক্যাথরিনের পাশে শুয়ে তার কপালে পরম আবেশে অধর ছোঁয়ায়। একইভাবে আবার ক্যাথরিনের কানের কাছে গিয়ে ধীর স্বরে আওড়ায়,
" তোমাকেও অসম্ভব ভালোবাসি ক্যাথ৷ আমাকে এতো বড় খুশি দেওয়ার জন্য অসংখ্য ধন্যবাদ তোমাকে "
এটুকু বলেই আরোণ ক্যাথরিনের চুলে বিলি কেটে দিতে থাকে। মনে মনে ভাবতে থাকে কাল ক্যাথরিন এতো বড় খুশির খবর পেয়ে কেমন প্রতিক্রিয়া করবে। আজকের পূর্বে তারা কখনোই এই বিষয়ে কথা বলে নি। না কোনো পরিকল্পনা করেছে। কিন্তু এখন আরোণের মনে অসংখ্য ভাবনা উঁকি দিচ্ছে ক্যাথ আর তার অনাগত সন্তানকে ঘিরে।
চলবে…