ফন্ট সাইজ:
থিম:
মহাপ্রয়াণ

৪৬তম পর্ব

লেখক: নাফিসা তাবাসসুম খান

মহাপ্রয়াণ

লেখনীতে : নাফিসা তাবাসসুম খান

৪৬.

ঘুম ভাঙতেই আড়মোড়া ভেঙে উঠে বসে ক্যাথরিন। আনমনেই পেটের উপর হাত রেখে ধীর স্বরে আহ বলে উঠে। আরোণ সাথে সাথে উঠে বসে ক্যাথরিনকে প্রশ্ন করে,

" খারাপ লাগছে বেশি? "

ক্যাথরিন অস্পষ্ট স্বরে বলে,

" রাতে পেট কেমন ব্যথা করে উঠছিলো। এখনো সামান্য করছে। হান্নাহ না এসেছিলো? ও কি বলেছে? "

আরোণ বলে উঠে,

" পরে বলছি। তুমি আগে তৈরি হয়ে নাস্তা করে নাও। "

ক্যাথরিন আর কিছু বলে না। তার প্রচন্ড খিদে পেয়েছে। মনে মনে কিছুটা অবাকও হয় সে। সাধারণ তার কখনো এতো সহজে খিদে পায় না। অথচ আজ মনে হচ্ছে খিদে একদম মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে। ক্যাথরিন চুপচাপ বিছানা ছেড়ে নেমে তৈরি হতে চলে যায়। আর এদিকে আরোণ সুযোগ বুঝে চুপচাপ কক্ষ ছেড়ে বেরিয়ে পড়ে।

__________

গতরাত থেকে সকাল হয়ে গিয়েছে। রিকার্ডো আড়ালে থেকে সারা রাত প্রাসাদের মূল ফটকের দিকে নজর রাখছে। তাকে কারো দেখার সুযোগ নেই এমনভাবেই অবস্থান নিয়েছে। নিজের প্রাসাদকে মন ভরে দেখছে রিকার্ডো।

সাদা এবং নীল রঙের বিশাল প্রাসাদ। সুউচ্চ বিশাল প্রাসাদের চারিদিক ঘিরে রয়েছে কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা। সেনা এবং প্রহরীদের আনাগোনা ভেদ করে একটি পাখির ও ভেতরে যাওয়ার সুযোগ নেই। যাওয়ার চেষ্টা করলেই প্রহরীদের তীর নাহয় তলোয়ারের আঘাতে সাথে সাথে মৃত্যু নিশ্চিত। কিন্তু রিকার্ডোর বেলায় সেই পন্থা কাজে লাগবে না৷ সামান্য তীর এবং তলোয়ারের ক্ষমতা নেই রিকার্ডোকে ছোঁয়ার। কিন্তু সকলের দৃষ্টিগোচরে প্রবেশ করতে হলে রিকার্ডোকে আজকে রাতের অপেক্ষা করতে হবে। রাতের মধ্য প্রহরে অন্ধকারের সুযোগ নিয়েই প্রবেশ করতে হবে। কিন্তু কাল রাত থেকে এই পর্যন্ত রিকার্ডো একবারও প্রিন্স ড্রাগোসকে বের হতে দেখে নি। হয়তো সে প্রাসাদেই অবস্থান করছে। এসব ভাবতে ভাবতেই প্রাসাদের দিকে আবার দৃষ্টি ফেলে রিকার্ডো।

__________

নাস্তা শেষেই ক্যাথরিনকে নিয়ে বের হয় আরোণ। ভ্যালেন্টাইনের পিঠে চড়ে তাকে নিয়ে যাচ্ছে অজানা গন্তব্যে। ক্যাথরিন বার কয়েক প্রশ্ন করলেও আরোণ তাকে গন্তব্য সম্পর্কে জানাতে নারাজ। তাই ক্যাথরিন আর কিছু প্রশ্ন না করে চুপচাপ বসে রয় ঘোড়ার পিঠে আরোণের বাহুডোরে। গন্তব্যের কাছাকাছি যেতেই ক্যাথরিনের চোখমুখ খুশিতে উজ্জ্বল হয়ে উঠে। তার সবথেকে প্রিয় জায়গায় আরোণ তাকে নিয়ে এসেছে। আরোণের ভাষ্যমতে যার নাম বরফ খামে ক্যামেলিয়ার লাজ। নামটা বেশ অদ্ভুত লেগেছিলো প্রথমে ক্যাথরিনের কাছে। কিন্তু এখন তার মনে হয় এই নামটা এই জায়গার সাথে অদ্ভুত হলেও মানানসই।

আরোণ প্রথমে নিজে নেমে তারপর খুব স্বযত্নে ক্যাথরিনকে নামায়। ক্যাথরিন খুশি হয়ে আরোণকে প্রশ্ন করে,

" আজকে কি বিশেষ কিছু? "

আরোণ মৃদু হেসে বলে,

" এমন কেন মনে হলো? "

" কারণ আগে যে দুইবার এখানে এসেছি সেই দুইবারই এখানে বিশেষ কিছু ঘটেছে। প্রথমবার যখন তুমি আমাকে এখানে নিয়ে আসো সেদিন প্রথম মনের অজান্তে তোমার প্রতি অনুভূতি হানা দেয় আমার হৃদয়ে এবং দ্বিতীয়বার যখন নিয়ে এসেছিলে তখন আমাকে বিয়ের জন্য প্রস্তাব দিয়েছো তুমি। তাই আমার মনে হচ্ছে আজও বিশেষ কিছু হতে চলেছে। "

আরোণ হেসে কোনো কথা না বলে সামনে এগিয়ে যায়। ক্যামেলিয়া গাছ থেকে একটি ডালা ভেঙে ক্যাথরিনের সামনে এসে দাঁড়ায়। ক্যাথরিন সেই ফুলের ডালাটি হাতে নিয়ে প্রশ্নবোধক দৃষ্টিতে তাকালে আরোণ তাকে কাছে টেনে পিছন থেকে জড়িয়ে ধরে। তারপর প্রশ্ন করে,

" এই ডালে কয়টি ফুল আছে ক্যাথ? "

ক্যাথরিন হঠাৎ এমন প্রশ্ন শুনে অবাক হয়। তবুও হাতে থাকা লাল ক্যামেলিয়া ফুলের ডালটিকে একবার দেখে নিয়ে উত্তর দেয় তিনটি। আরোণ হাতের ছোঁয়া আরেকটু গভীর করে প্রশ্ন করে,

" এখানে এই মুহুর্তে কয়জন উপস্থিত আছি? "

ক্যাথরিন ভ্রু কুচকায়। আরোণের এমন প্রশ্নের মানে খুঁজে পায় না সে। তবুও জবাব দেয়,

" দুজন। "

আরোণ এবার ক্যাথরিনের পেটের উপর গভীর স্পর্শ করে উত্তর দেয়,

" ভুল উত্তর ক্যাথ। দুজন নয় তিনজন। আমাদের সাথে আরেকজন উপস্থিত আছে এখানে। "

ক্যাথরিনের এক মুহূর্ত সময় লাগে আরোণের কথার মানে বুঝতে। বুঝতে পেরে সে সাথে সাথে জমে যায়। আপনাআপনি তার হাত চলে যায় আরোণের হাতের উপর যা এই মুহুর্তে তার পেটে বিচরণ করছে। অন্য একটা প্রাণের উপস্থিতি টের পায় নিজের শরীরের ভেতর। টের পেতেই অস্পষ্ট স্বরে বলে উঠে,

" আরোণ আমাদের সন্তান? "

আরোণ হ্যাঁ জানাতেই ক্যাথরিনের চোখ বেয়ে পানি গড়িয়ে পড়ে। অতি খুশিতে বাকরুদ্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রয় সে। এখনো তার বিশ্বাস হচ্ছে না যে ঈশ্বর এতো বড় খুশি তার ভাগ্যে বর্ষণ করে দিয়েছে। ক্যাথরিন আরোণের দিকে ঘুরে তাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে। কাপা কাপা স্বরে বলে উঠে,

" আমাদের পরিবার পরিপূর্ণ হয়ে গিয়েছে। আমরা আর একা থাকবো না। "

আরোণ হেসে ক্যাথরিনকে জড়িয়ে ধরে রাখা অবস্থায়ই মুখ নামিয়ে তার কপালে ভালোবাসার পরশ এঁকে দেয়। তার নিজেরও অসম্ভব প্রশান্তি অনুভব হচ্ছে। সে কখনো ভাবে নি এতো বছর এই একাকিত্বের জীবন পার করার পর ঈশ্বর তার জীবনে ক্যাথরিন নামক খুশির খোরাক পাঠাবে যে কিনা তার জীবনের সকল অসম্পূর্ণতা পূরণ করে দিবে। আরোণ ফিসফিসিয়ে বলে,

" আমাকে পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ অনুভূতির সাথে পরিচয় করানোর জন্য অসংখ্য ধন্যবাদ ক্যাথ। "

এটুকু বলেই আরোণ ক্যাথরিনের কোমর জড়িয়ে তাকে সামান্য উঁচুতে তুলে ঘুরতে শুরু করে। ক্যাথরিনের হাসির শব্দ এবং জলপ্রপাতের পানির ধারার শব্দে প্রকৃতি খুশির গান গেয়ে উঠে।

__________

বারান্দায় বসে বিভিন্ন শীত মরসুমের ফুল দিয়ে মালা বানাচ্ছে আনাস্তাসিয়া। প্রথমে গোলাপি এবং বেগুনি রঙের ফুল দিয়ে মালা এবং মাথার তাজ বানিয়ে জুন এবং জেনিকে পড়িয়ে দেয় সে। বাচ্চারা খুশি হয়ে দৌঁড়ে বাসার ভেতরে চলে যায় মা বাবাকে দেখানোর জন্য। আনাস্তাসিয়া নিজের জন্য তৈরি করা জেসমিন ফুলের গয়না গলায়,মাথায় এবং হাতে পড়ে নেয়। ফুলের মালা পড়তেই তার রিকার্ডোর কথা মনে পড়ে যায়। আজকাল রিকার্ডোর সাথে এই বিচ্ছেদ তাকে বড্ড পীড়া দিচ্ছে। একবার আসুক আনাস্তাসিয়া সুদে আসলে সব শোধবোধ করবে। কিন্তু আপাতত নিজের বিরহ কমানোর জন্য সে চলে যায় গোরস্থানের পিছনের সেই জঙ্গলে। সেখানে গিয়েই আনাস্তাসিয়া সেদিন যেখানে বসে ছিলো সেই একই জায়গায় বসে পড়ে। থমথমে গলায় বলে উঠে,

" শত্রু নিধন করতে গিয়ে নিজের ভালোবাসাকে পিছনে ফেলে গিয়েছো সে কথা কি স্মরণে আছে মহামান্য কাউন্ট? দু'দিন তোমাকে ছাড়া দুই শতাব্দী সম অনুভব হচ্ছে। আর কত অপেক্ষা করাবে? ফিরে আসো এবার। "

মলিন চেহারা নিয়ে বসে থাকে আনাস্তাসিয়া। হঠাৎ লক্ষ্য করে তার থেকে অনেকটা দূরে ম্যাথিউ দাঁড়িয়ে তার দিকেই তাকিয়ে আছে। ম্যাথিউকে হঠাৎ দেখে আনাস্তাসিয়া কিছুটা ভড়কে যায়। মনে পড়ে যায় গতবারের কথা। ম্যাথিউর সেই হিংস্র দৃষ্টি তার চোখের সামনে ভেসে উঠে। আনাস্তাসিয়া উঠে দাঁড়িয়ে জোরে প্রশ্ন করে,

" তুমি এখানে কি করছো? "

ম্যাথিউ কোনো জবাব দেয় না। সে আনাস্তাসিয়ার গলার ক্রুশের হারটির দিকে ক্ষিপ্ত দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে। আনাস্তাসিয়া ম্যাথিউর দৃষ্টি অনুসরণ করে নিজের গলার ক্রুশের হারটির দিকে তাকায়। তারপর বলে উঠে,

" দেখো ম্যাথিউ তোমাকে একটা বুদ্ধি দেই। আমি জানি তোমাদের খাদ্য হচ্ছে রক্ত। তাই তোমার খিদে পেলে তুমি কোনো বিশাল হাতির রক্ত পান করতে পারো। তোমার খিদাও মিটবে আমার জানও বাঁচবে। আর যদি তোমার আমার রক্ত খাওয়ার শখ জেগে থাকে তাহলে যেখানে আছো সেখানেই থাকো। আমি কিন্তু আত্মরক্ষা করতে জানি। একদম মেরে তক্তা বানিয়ে তোমাকে কৃষ্ণ সাগরে ভাসিয়ে দিবো বলে দিলাম। "

ক্রুশের হার থেকে দৃষ্টি সড়িয়ে আনাস্তাসিয়ার দিকে তাকায় ম্যাথিউ। মৃদু হেসে বলে উঠে,

" আমি অন্য কারণে তোমার সাথে কথা বলতে এসেছি। "

আনাস্তাসিয়া দু হাত কোমরে রেখে ভ্রু কুচকে প্রশ্নবোধক দৃষ্টিতে তাকায়। ম্যাথিউ বলে,

" সেদিনের জন্য অনুতপ্ত আমি। ইচ্ছে করে আমি তোমার ক্ষতি করতে চাই নি। আমার কেবল নিজের উপর নিয়ন্ত্রণ ছিলো না। বেহুশের মতো তোমায় আঘাত করে বসি। এজন্য আমি লজ্জিত। তোমার কাছে ক্ষমা চাইছি। "

আনাস্তাসিয়া সন্দিহান গলায় প্রশ্ন করে,

" তুমি নিশ্চিত তো আমার রক্ত পান করার জন্য আসো নি তো? "

" হ্যাঁ আনাস্তাসিয়া। "

আনাস্তাসিয়ার মনে পড়ে যায় রিকার্ডোর বলা সেদিন সকল ঘটনা। ড্যানিয়েল কিভাবে ম্যাথিউর মনে হিংসার বীজ রোপণ করে। সব মনে পড়তেই আনাস্তাসিয়া সামনে তাকায়। দেখে ম্যাথিউ চলে যাওয়ার জন্য অগ্রসর হচ্ছে। আনাস্তাসিয়া পিছু ডাকতেই ম্যাথিউ ফিরে তাকিয়ে প্রশ্ন করে,

" কিছু বলবে? "

আনাস্তাসিয়া কথা না বলে নিজের গলার ক্রুশের হারটি খুলে নিচে রাখে। ম্যাথিউর ভ্রু জোড়ার মাঝে সূক্ষ্ম ভাজ পড়ে। হারটি রেখে আনাস্তাসিয়া ম্যাথিউর দিকে এগিয়ে যায়। ম্যাথিউ প্রশ্ন করে,

" ক্রুশের হারটি খুলে ফেললে কেন? "

" কারণ আমার মনে হচ্ছে তুমি আমার ক্ষতি করবে না। "

অবাক হয় ম্যাথিউ। প্রশ্ন করে,

" এমন কেন মনে হলো তোমার? "

" কারণ তুমি নিষ্ঠুর নও। "

ম্যাথিউ বাকরুদ্ধ হয়ে তাকিয়ে থাকে। আনাস্তাসিয়া নিজ থেকেই বলে উঠে,

" সকলেই এই পৃথিবীতে নিষ্পাপ হয়ে জন্মায় ম্যাথিউ। পরিস্থিতি মানুষকে কঠিন বানিয়ে তুলে। কিন্তু কঠিন আর খারাপ হওয়ার মাঝে পার্থক্য আছে। তুমি কঠিন হতে পারো তবে খারাপ নও। আর কঠিন মানুষরা পানির মতো হয়। কখনো এরা কঠিন অবস্থায় বরফের রূপে সেজে থাকে। কখনো এরা তরল অবস্থায় পানির মতো হয়ে যায়। আর কখনো এরা একদম বাষ্পীয় রূপে ধোঁয়াশা হয়ে রয়। "

ম্যাথিউ থমথমে গলায় প্রশ্ন করে,

" তুমি আমাকে এসব কেন বলছো? "

" কারণ আমার মনে হচ্ছে তুমি এখন তরল অবস্থায় আছো। "

" মানুষ পড়তে পারো তুমি? "

" উহু। তবে মানুষের মনে কি থাকে তা চোখে স্পষ্ট প্রকাশ পায়। সেটা দেখতে পারি। "

ম্যাথিউ শান্ত এবং ভাবলেশহীন ভঙ্গিতে প্রশ্ন করে,

" আমার চোখে কি দেখতে পাচ্ছো? "

আনাস্তাসিয়া ঝটপট নিঃসংকোচ উত্তর দেয়,

" নম্রতা। আকুলতা। আড়ষ্টতা। "

ম্যাথিউ আনাস্তাসিয়ার চোখ থেকে চোখ ফিরিয়ে নেয়। ধরা পড়ার ভয়ে নিজের নীরব অনুভূতি মনের গহীনে লুকিয়ে সেখান থেকে প্রস্থান করতে করতে বলে উঠে,

" এক্ষুনি গিয়ে নিজের ক্রুশের হারটি পড়ে নাও আর বাসায় ফিরে যাও। একা জঙ্গলে ঘুরাফেরা বন্ধ করো। ক্রুশের হার কেবল তোমায় ভ্যাম্পায়ারদের থেকে রক্ষা করতে পারবে, জন্তু জানোয়ারদের থেকে নয়। "

এটুকু বলেই চোখের পলকেই দৃষ্টি সীমানা রেখার বাহিরে চলে যায় সে। আনাস্তাসিয়া ম্যাথিউর যাওয়ার দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে ফিরে যাওয়ার জন্য পা বাড়ায়। নিচ থেকে ক্রুশের হারটি তুলে গলায় পড়ে নেয়। হয়তো আরেকটু খেয়াল করলেই দেখতে পেত দূর হতে একজোড়া দৃষ্টি আড়াল হতে তার নিরাপদে ফেরার পাহাড়া দিচ্ছে।

__________

বাসকোভ প্রাসাদে ফেরার পর থেকেও এক মুহূর্তের জন্য একা ছাড়া হচ্ছে না ক্যাথরিনকে। আরোণ প্রাসাদে ফিরেই সকলের সামনে ঘোষণা করে ক্যাথরিন এবং তার অনাগত সন্তান সম্পর্কে। সকল নেকড়ে পাল বেশ খুশি৷ প্রথমবারের মতো এই প্রাসাদে কোনো শিশুর কান্নার ধ্বনি বাজবে ভাবতেই সকলে বেশ খুশি হয়ে পড়ে। আরোণ সেই যে হান্নাহর সাথে কথা বলতে গেলো এখনো ফিরে নি। ক্যাথরিনের সাথে কক্ষে ক্রিনা এবং ক্রিয়াস আছে। ক্রিয়াসের চোখে উপচে পড়া খুশি। সে নিজেও কাউকে নিয়ে এমনই স্বপ্ন সাজিয়েছিলো যা কখনো পুরো হয় নি। কিন্তু সে খুব করে চেয়েছিলো আরোণ যেন তার ভালোবাসার মানুষটাকে পায়। চোখের সামনে প্রথম কোনো নেকড়ে মানবের সফল প্রণয়গাথা দেখে মনে মনে সে সিদ্ধান্ত নেয় আরোণের সন্তানকে সে নিজে তার মা বাবার গল্প শুনাবে। এক মানবী এবং নেকড়ে মানবের গল্প। ঘৃণা থেকে ভালোবাসার যাত্রা। প্রণয় থেকে পরিণতির গল্প।

ক্রিনা ক্যাথরিনের সামনে বসে আপনমনে বলতে থাকে,

" আমি কখনো কোন বাচ্চা কোলে নেই নি জানো? ইশ ছোট্ট বাচ্চাকে কোলে নিবো ভাবতেই আমার খুব খুশি লাগছে। এই তিনমাস বেশ দীর্ঘ হবে। "

ক্রিয়াস হেসে বলে উঠে,

" এই সম্পূর্ণ অবদান আমার। বিয়েটা কিন্তু আমিই করিয়েছি। "

ক্রিয়াসের কথা শুনে ক্যাথরিন হেসে দেয়। তখনই আরোণ কক্ষে প্রবেশ করে। আরোণ প্রবেশ করতেই ক্রিনা উঠে দাঁড়িয়ে বলে উঠে,

" ক্রিয়াস আমাদের তো গুরুত্বপূর্ণ কাজ ছিলো। চলো এখন যেতে হবে। "

ক্রিয়াস মনে করার ভঙ্গিতে বলে উঠে,

" তাই নাকি? আমার তো মনে পড়ছে না। "

আরোণ হালকা ভারী স্বরে প্রশ্ন করে,

" আমি মনে করাবো? "

সাথে সাথে ক্রিয়াস কক্ষ ছেড়ে হাওয়ার গতিতে বেরিয়ে যায়। ক্রিনাও হেসে পিছন পিছন বেরিয়ে পড়ে। আরোণ এসে ক্যাথরিনের পাশে বসতেই ক্যাথরিন বলে উঠে,

" আমি ভাবছিলাম অ্যানাকে এখানে নিয়ে এসে যদি জানাতে পারতাম। ও খুব খুশি হবে শুনলে। "

আরোণ হেসে ক্যাথরিনের গালে হাত রেখে বলে,

" আমি ইতিমধ্যে ফিটনসহ দুজনকে পাঠিয়ে দিয়েছি অ্যানাকে নিয়ে আসার জন্য। ও আসলে তুমি নিজে ওকে এই খুশির সংবাদ জানিয়ো। "

ক্যাথরিন খুশিতে আত্মহারা হয়ে আরোণকে জড়িয়ে ধরে। আরোণও জড়িয়ে ধরতে নিবে সাথে সাথে ক্যাথরিন আহ বলে উঠে। আরোণ চিন্তিত সুরে প্রশ্ন করে,

" কি হয়েছে ক্যাথ? "

ক্যাথরিন আরোণের হাত নিজের পেটের উপর নিয়ে রাখতেই ভেতর থেকে আবার আরেকটা লাথি অনুভব করে। ক্যাথরিন ভীত স্বরে প্রশ্ন করে,

" এটা কিভাবে সম্ভব? এতো তাড়াতাড়ি বাচ্চা কিভাবে লাথি মারবে? "

আরোণ হেসে জবাব দেয়,

" এটা আমার সন্তান ক্যাথ। ওর মধ্যে নেকড়ের রক্ত এবং শক্তি বিদ্যমান। তাই ওর বৃদ্ধিও খুব তাড়াতাড়ি হচ্ছে। "

ক্যাথরিন প্রশ্ন করে,

" আসলেই ভয় পাওয়ার কিছু নেই তো? "

" আমার উপর বিশ্বাস রাখো। কিছু হবে না। আর তাছাড়া আমার মনে হয় আমার ছোট জান অ্যানার নাম শুনে খুশি হয়ে গিয়েছে। হয়তো ওর অ্যানাকে পছন্দ। "

আরোণ এতটুকু বলতেই আবার পেটে একটা লাথি অনুভব করে তারা। এবার দুজনেই একসাথে হেসে দেয়।

__________

রাত গভীর হয়েছে। সুযোগ বুঝে প্রহরী এবং সৈন্যদের চোখ ফাকি দিয়ে রিকার্ডো প্রাসাদে প্রবেশ করে। প্রাসাদে পা রাখতেই ওর শরীর শীতল হয়ে আসে। অদ্ভুত অনুভূতি কাজ করে। কিছুটা আবেগের বসে এসে সে প্রাসাদের দেয়াল ছুঁয়ে দেখতে থাকে। চোখ বুজে মনে মনে বলে উঠে,

" আমার কখনো তোমাকে বা বাবাকে দেখার সুযোগ হয়নি মা। কিন্তু এই প্রাসাদে আসার সৌভাগ্য হয়েছে আমার। এখানের প্রতিটা কোণে আমি তোমাদের অনুভব করতে পারছি। এই প্রাসাদে নিশ্চয়ই তোমাদের অসংখ্য স্মৃতি জড়িয়ে আছে? আফসোস আমি তা কখনোই জানতে পারবো না। "

এটুকু বলেই চোখ খুলে রিকার্ডো। দূর হতে কিছু দাসীকে আসতে দেখে সাথে সাথে সে লুকিয়ে পড়ে। দাসীগুলো চলে যেতেই সে আড়াল হতে বেরিয়ে চারিদিক দেখতে থাকে। রাতের বেলা হলেও সম্পূর্ণ প্রাসাদ মোমবাতি এবং আগুনের মশালের আলোয় জ্বলজ্বল করছে। রিকার্ডো খুবই সাবধানে প্রধান হলঘর পেরিয়ে সিঁড়ি বেয়ে উপরে এসে পৌঁছায়। এত কক্ষের মাঝে কোথায় সে ড্রাগোসকে খুঁজবে এবং কোথায় ড্যানিয়েল আর জ্যাকসনকে পাবে ভেবে চিন্তিত হয় সে। আরো অবাক করার বিষয় হলো একটি কক্ষের সামনেও কোনো প্রহরী নেই। চারিদিকে পিনপতন নীরবতা। অথচ বাহিরে কি কড়া নিরাপত্তা ব্যবস্থা ছিলো। সামান্য খটকা লাগে রিকার্ডোর। তবুও সে এক এক করে সবগুলো কক্ষ খুঁজতে থাকে।

একটি কক্ষের সামনে এসে রিকার্ডো থেমে যায়। তার মনে হয় এই কক্ষে কেউ আছে৷ রিকার্ডো সাবধানে সন্তর্পণে কক্ষের দরজা খুলে প্রবেশ করে। দরজা খুলতেই রিকার্ডো দেখে এই কক্ষ বাকি সব কক্ষের তুলনায় অধিক বড়, সুন্দর এবং আকর্ষণীয়। রিকার্ডোর চোখ যায় কক্ষের সাথে লাগোয়া বিশাল বারান্দার দিকে। বারান্দায় থাকা ডিভানে একজন বসে আছে। তার অবয়ব দেখে রিকার্ডো বুঝার চেষ্টা করে কে। কিন্তু রিকার্ডোকে অবাক করে দিয়ে সেই অবয়বটা বলে উঠে,

" স্বাগতম প্রিন্স রিকার্ডো। তোমার অপেক্ষাতেই ছিলাম। "

কণ্ঠ অপরিচিত লাগছে রিকার্ডোর কাছে। আরও অবাক হয় সে তাকে প্রিন্স হিসেবে সম্বোধন করায়। রিকার্ডো প্রশ্ন করে,

" কে তুমি? "

অবয়বটি বসা ছেড়ে উঠে দাঁড়ায়। ধীর পায়ে রিকার্ডোর দিকে ঘুরে কক্ষের ভেতর এগিয়ে আসে সে। কক্ষের ভেতর পা রাখতেই কক্ষের মোমবাতির আলোয় তার চেহারা স্পষ্ট হয়ে উঠে। ভরাট কণ্ঠে জবাব দেয়,

" প্রিন্স ড্রাগোস। তোর জীবনের কাল। "

সম্পূর্ণ বিষয় বুঝতে রিকার্ডোর এক মুহুর্ত সময় লাগে। জ্যাকসন এবং ড্যানিয়েলের সাথে ড্রাগোসও যুক্ত বুঝতে পেরে ওর চেহারা হিংস্র রূপ ধারণ করে। চোয়ালের সূক্ষ্ম ধারালো দাঁত দুটি বেরিয়ে আসে। ড্রাগোস বলে উঠে,

" এই কক্ষেই এক সময় তোর মা বাপ থাকতো। আজ এই কক্ষেই তোর সমাধি গড়ে তুলবো আমি। "

এটুকু বলেই ড্রাগোস লুকিয়ে রাখা একটা ক্রুশ বের করে রিকার্ডোর দিকে তাক করে ধরে। ওটি ধরে রেখেই সে কক্ষের দু দিকের দেয়ালের পর্দা টান দেয়। সাথে সাথে পর্দা সড়ে গিয়ে দেয়াল বেরিয়ে আসে। দু দেয়ালে অসংখ্য ছোট বড় আকারের ক্রুশ ঝুলানো। রিকার্ডো জোরে আর্তনাদ করে মেঝেতে ধপ করে বসে পড়ে। হিংস্র স্বরে হুংকার দিয়ে উঠে সে। সকল ক্রুশ দৃশ্যমান হয়ে উঠতেই ড্রাগোস নিজের পিঠের পিছন হতে একহাতে একটি ধারালো তলোয়ার বের করে। আজ এই সাম্রাজ্যকে সে কেবল নিজের করে নিবে। এই সিংহাসনের উত্তরাধিকারীকে মেরে সিংহাসনে নিজে আরোহন করবে ভেবেই তার ঠোঁটের কোণে ক্রুর হাসি ফুটে উঠে।

চলবে…

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ৪৬তম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন