মহাপ্রয়াণ
লেখনীতে : নাফিসা তাবাসসুম খান
৬২.
আকাশে মেঘ করেছে খানিকটা। বৃষ্টি নামার আশংকা প্রবল। মুক্ত বাতাসে সোনালী এলোমেলো কেশ দুল খাচ্ছে। কিছু চুল উড়ে চেহারার উপর এসে পড়ছে। তবুও আনাস্তাসিয়ার মনোযোগে কোনো ব্যাঘাত ঘটছে না এতে৷ তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে সে সামনে নিশানার দিকে তাকিয়ে আছে। হাতে থাকা ধনুকে তীর বসিয়ে লক্ষ্য স্থির করে সে। বাগানে দাঁড়িয়ে থাকা কিছু উৎসুক দাসীরা তাকিয়ে আছে তার দিকে। আনাস্তাসিয়া তীর ছুড়তেই তা তীব্র বাতাসের প্রভাবে লক্ষ্যচুত হয়। সাথে সাথে সকল দাসীরা হতাশ মুখ করে ফেলে। আনাস্তাসিয়া বেশ বিরক্ত হয়। সে তীব্র বাতাসে সঠিক নিশানা বরাবর তীর ছোঁড়ার চেষ্টা করছে এতক্ষণ ধরে। কিন্তু একবারো সফল হচ্ছে না।
আবার আরেকটা তীর নিয়ে আনাস্তাসিয়া লক্ষ্য ঠিক করে। তীর ছুঁড়ার ঠিক আগ মুহূর্তে কোমরে কারো স্পর্শ অনুভব করে। আচমকা স্পর্শে আনাস্তাসিয়ার হাত থেকে তীর পড়ে যায়। রিকার্ডো আনাস্তাসিয়ার কানের কাছে ফিসফিসিয়ে বলে উঠে,
" তুমি মনোযোগ হারাচ্ছো নাসিয়া। "
রিকার্ডোকে দেখে ততক্ষণে সকল দাসীরা সেখান থেকে কেটে পড়েছে। আনাস্তাসিয়া বলে উঠে,
" মনযোগ হারানোর কারণ তুমি। "
রিকার্ডো বলে উঠে,
" আমি আবার কি করলাম? "
" ভূতের মতো হুটহাট কানের কাছে এসে ফিসফিস করার স্বভাব গেলো না তোমার? "
" আমি তো কেবল তোমার সাহায্য করতে এলাম। "
এটুকু বলে রিকার্ডো আরেকটা তীর হাতে তুলে নেয়। আনাস্তাসিয়া প্রশ্ন করে,
" কি সাহায্য করতে চাও? "
রিকার্ডো আনাস্তাসিয়ার পিছনে দাঁড়িয়ে থেকেই আনাস্তাসিয়ার হাত ধরে ধনুকে তীর রাখে। তারপর বলে উঠে,
" তীব্র বাতাসে তীর ছুঁড়তে হলে বাতাসের গতিবেগ সম্পর্কে ভালো ধারণা থাকা উচিত। কারণ বাতাসের গতিবেগের সাথে লক্ষ্যকে খাপ খাওয়াতে পারলেই তীর নিশানায় লাগবে। "
কথা বলতে বলতে রিকার্ডো আনাস্তাসিয়ার দু'হাতের ভঙ্গি ঠিক করে দেয়। তারপর বলে উঠে,
" এখন যে হাতে ধনুক ধরে আছো তা তিন আঙুল সমান নিচে নামিয়ে মজবুত করে ধরো এবং তোমার তর্জনী এবং মধ্যমা আঙুলের মাঝে তীর ধরে তা কিছুটা পিছনে টেনে ধরো। "
আনাস্তাসিয়া রিকার্ডোর কথা মতো লক্ষ্য ঠিক করে। দৃষ্টি নিশানার দিকে স্থির। রিকার্ডো আনাস্তাসিয়াকে একবার পরখ করে নিয়ে শান্ত স্বরে বলে,
" ছুঁড়ো। "
রিকার্ডো বলার সাথে সাথেই আনাস্তাসিয়া তীর ছেড়ে দেয়। এবার তীর একদম নিশানার কেন্দ্র বিন্দু ভেদ করে যায়। আনাস্তাসিয়ার মুখে হাসি ফুটে উঠে। রিকার্ডো ভাব নিয়ে বলে উঠে,
" থাক। আমাকে ধন্যবাদ দিতে হবে না। "
রিকার্ডোর কথা শেষ হতেই আকাশ ভেঙে বৃষ্টি নামে ধরণীর বুকে। আনাস্তাসিয়া রিকার্ডোর দিকে তাকিয়ে দুষ্টুমির হাসি হাসে। রিকার্ডো সেই হাসি দেখে ঘাবড়ে যায়। আঁতকে বলে উঠে,
" তুমি যা ভাবছো মাথা থেকে ঝেড়ে ফেলো নাসিয়া। "
আনাস্তাসিয়া মাথা নেড়ে না জানায়। তারপর দুষ্টুমির সুরে বলে উঠে,
" ভয় পেয়ে যাচ্ছো? "
রিকার্ডো আত্মবিশ্বাসের সাথে বলে উঠে,
" আমি তোমাকে ভয় পাবো? হেহ। গতবার আমি প্রায় জিতেই গিয়েছিলাম। কিন্তু শেষ মুহুর্তে তোমার জন্য মায়া হয় তাই তোমাকে জিততে দেই। "
আনাস্তাসিয়া বলে,
" আজ পারলে হারিয়ে দেখাও। "
রিকার্ডো বলে উঠে,
" গন্তব্য? "
" পাইন গাছ পর্যন্ত। "
রিকার্ডো সাথে সাথে স্ব শব্দে প্রহরীকে ডেকে আদেশ দেয় দুটো ঘোড়া নিয়ে আসতে। প্রহরী ঘোড়া নিয়ে আসতেই রিকার্ডো এবং আনাস্তাসিয়া চড়ে বসে তাদের পিঠে। প্রাসাদের পিছনের দরজা দিয়ে বের হতেই পড়ে বিশাল জঙ্গল। সেই জঙ্গলের গভীরে আনাস্তাসিয়া এবং রিকার্ডো ঘোড়া নিয়ে ছুটে চলে। যে সবার আগে পৌঁছাতে পারবে পাইন গাছ পর্যন্ত সে জিতবে। আর যে জিতবে সে চাইলে হার প্রার্থীর কাছ থেকে যা ইচ্ছে তা চাইতে পারবে। রিকার্ডো গত দু'বার নিজ থেকেই আনাস্তাসিয়াকে জিততে দিয়েছে। আজকেও একই কাজ করবে সে। আনাস্তাসিয়ার মুখের বিজয়ের হাসি তার খুব প্রিয়। আর বিজয় শেষে তার অদ্ভুত অদ্ভুত আবদার পূরণ করতেও তার বেশি ভালো লাগে।
বাতাসের তোড়ে জঙ্গলের গাছগুলো দুলছে। ইতিমধ্যে বৃষ্টির পানিতে রিকার্ডো এবং আনাস্তাসিয়া ভিজে জবজবে অবস্থা। তবুও বৃষ্টিকে উপেক্ষা করে তারা ঘোড়ার পিঠে করে ছুটছে। পাইন গাছের কাছাকাছি যেতেই আনাস্তাসিয়া ঘাড় ঘুরিয়ে রিকার্ডোকে উদ্দেশ্য করে বলে উঠে,
" এবারো আমি জিতে গেলাম রিকার্ডো আলবার্ট। "
আনাস্তাসিয়ার কথা শেষ হতেই সে পাইন গাছ পাড় করে ফেলে। সাথে সাথে সে ঘোড়ার লাগাম টেনে নিচে নামে। রিকার্ডোও তার পিছু পিছু এসে ঘোড়া থামিয়ে নিচে নেমে আসে। আনাস্তাসিয়া ততক্ষণে বৃষ্টি উপভোগ করতে ব্যস্ত হয়ে পড়েছে। রিকার্ডো একটি গাছে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে আনাস্তাসিয়াকে দেখছে। তার মুখেও হাসি লেপ্টে আছে। ক্যাথরিন চলে যাওয়ার পর আনাস্তাসিয়ার স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসতে বেশ অনেকদিন সময় লেগেছে। রিকার্ডো চেষ্টা করতো সর্বক্ষণ আনাস্তাসিয়ার পাশে থাকার। যখনই ফুরসত পেত হয় আনাস্তাসিয়াকে নিয়ে এখানে সেখানে ঘুরতে যায় বা বাসকোভ প্রাসাদে নিয়ে ক্যামেলিয়ার সাথে দেখা করিয়ে আনে। ক্যামেলিয়ার সাথে থাকলে আনাস্তাসিয়াও সব ভুলে বসে৷ ক্যামেলিয়াও আনাস্তাসিয়াকে বেশ পছন্দ করে। কিন্তু রিকার্ডোর কোলে আসলেই এই মেয়ে রিকার্ডোকে খামচি দেয় শুধু। রিকার্ডো বুঝে পায় না আনাস্তাসিয়া ক্যামেলিয়ার কাছে কি তার নামে নালিশ করে নাকি? নাহয় কেন ক্যামেলিয়া তার কোলে আসলেই তার হাত খামচে ধরবে?
আনাস্তাসিয়ার ডাকে রিকার্ডো ভাবনার জগৎ থেকে বেরিয়ে আসে। তাকিয়ে দেখে আনাস্তাসিয়া তাকে ডাকছে। রিকার্ডো চোখের ইশারায় আনাস্তাসিয়াকে প্রশ্ন করে কি বলতে চায়। আনাস্তাসিয়া চেঁচিয়ে বলে উঠে,
" তোমার হেরে যাওয়ার শোক শেষ হলে এদিকে আসবে একটু? একা একা বৃষ্টিবিলাস করতে হচ্ছে আমায়। "
রিকার্ডো হেসে আনাস্তাসিয়ার দিকে এগিয়ে যায়। আনাস্তাসিয়া কিছু বুঝে উঠার আগেই রিকার্ডো তাকে পাজাকোলে তুলে নেয়। ভার সামলাতে আনাস্তাসিয়া রিকার্ডোর ঘাড় দু'হাতে আঁকড়ে ধরে। রিকার্ডোর আচমকা এই কান্ডে আনাস্তাসিয়া খিলখিল করে হেসে উঠে। রিকার্ডো ভ্রু কুচকায়। এই মেয়ের মতলব কি? দিন দুপুরে এভাবে হেসে রিকার্ডোর উপর যাদুমন্ত্র করার মানে কি? মাতাল করতে চায় নাকি? রিকার্ডো আনাস্তাসিয়াকে কোলে রেখেই প্রশ্ন করে উঠে,
" জিতে তো গিয়েছো। এখন বলো কি চাও? "
আনাস্তাসিয়া রহস্যময়ী কণ্ঠে বলে উঠে,
" সুসময়ে চেয়ে নিবো। "
কথাটা বলার সময় আনাস্তাসিয়ার চোখে দুষ্টুমি পরিলক্ষিত হয়। রিকার্ডো নতুন করে আরেকবার প্রকৃতি প্রেমী আনাস্তাসিয়ার প্রেমে নিজেকে হারায়। আনাস্তাসিয়ার উচ্ছ্বসিত রূপ দেখার জন্য সে তাকে নিয়ে ঘুরতে শুরু করে। সবুজ ঘাসের ভূমির বুকে বৃষ্টির বিন্দুর সাথে লিখিত হয় এক ভালোবাসার মুহূর্ত।
__________
রাত বিরাতে ক্যামেলিয়ার কান্নার আওয়াজ পেতেই ঘুম ভেঙে যায় ক্যাথরিনের। চোখ মেলে তাকিয়ে দেখে বিছানার সামনে আরোণ ক্যামেলিয়াকে কোলে নিয়ে হাঁটছে। হয়তো কান্না থামানোর চেষ্টা করছে। ক্যাথরিন উঠে বসতে বসতে বলে,
" আমাকে ডাকো নি কেন? "
ক্যাথরিন বিছানার দিকে তাকিয়ে দেখে ক্যাথরিন উঠে গিয়েছে। সে বলে উঠে,
" তুমি ঘুমিয়েছিলে তাই শুধু শুধু ডাকি নি। "
আরোণ কথা বলতে বলতে ক্যাথরিন ততক্ষণে বিছানা ছেড়ে নেমে তার সামনে এসে দাঁড়িয়েছে। আরোণের কোল থেকে ক্যামেলিয়াকে নিয়ে নিজের বুকের সাথে মিশিয়ে নেয়। কিছুক্ষণের মধ্যেই ক্যামেলিয়া শান্ত হয়ে যায়। এখন আর সে কান্না করছে না বরং খেলছে৷ আরোণ কোথায় যেন গিয়েছে। তাই ক্যাথরিন বসে ক্যামেলিয়াকে কোলে নিয়ে খেলছে। একটু পরই আরোণ কক্ষে প্রবেশ করে। হাতে তার একটা ট্রে। ক্যাথরিন প্রশ্ন করে,
" কোথায় গিয়েছিলে? "
আরোণ ক্যাথরিনের পাশে বিছানায় বসে বলে,
" তোমার জন্য তোমার প্রিয় পাপানাসি। "
ক্যাথরিন তাকিয়ে দেখে ট্রে তে একটি পেস্ট্রি এবং তার উপর চেরির জ্যাম ছড়িয়ে দেওয়া। এই খাবারটার নাম পাপানাসি। আরোণ নিজেই আবার বলে উঠে,
" মনে আছে? ক্যামেলিয়া যখন পেটে ছিলো তখন তুমি প্রতি রাতে এটা খেতে চাইতে আর বলতে আমার বাচ্চা তোমাকে শান্তিতে ঘুমাতে দিচ্ছে না? "
ক্যাথরিনের হাসি পায়। সে হেসে বলে উঠে,
" আজকেও ক্যামেলিয়া আমাকে ঘুম থেকে তুলে দিয়েছে তাই তুমি এটা নিয়ে আসলে? "
আরোণ হালকা হেসে মাথা চুলকে বলে,
" হ্যাঁ। "
ক্যাথরিন বলে উঠে,
" কিন্তু ক্যামেলিয়া আমার কোলে। কিভাবে খাবো এখন? "
আরোণ কোনো কথা না বলে নিজেই এবার চামচ দিয়ে তুলে ক্যাথরিনকে খাইয়ে দিতে থাকে। মিষ্টি খাবার ক্যাথরিনের বরাবরই বেশ পছন্দের। আজকেও পাপানাসি মুখে দিয়ে সে তৃপ্তিতে চোখ বুজে ফেলে। আরোণকে উদ্দেশ্য করে বলে উঠে,
" ওসব পশু পাখি ছেড়ে যদি এটা খেতে তবে তুমিও বলতে তুমি মিষ্টি খেতে ভালোবাসো। "
আরোণ ক্যাথরিনের দিকে তাকিয়ে বলে উঠে,
" কে বলেছে ভালোবাসি না? আমি মিষ্টি খেতে সবথেকে ভালোবাসি। "
আরোণের কথা শুনে ক্যাথরিন চোখ মেলে চমকে তাকায়। সন্দিহান গলায় প্রশ্ন করে,
" তুমি আবার কবে থেকে মিষ্টি খাও? "
আরোণ এবার ক্যাথরিনের দিকে এগিয়ে আসে। কিছু বুঝে উঠার আগেই তার অধরে গভীর স্পর্শ করে নিজের অধর মিলিয়ে দেয়। ক্যাথরিন হতবাক হয়ে রয়। কোনো মতে কিছুটা সরে এসে সে বলে উঠে,
" ক্যামেলিয়া দেখছে। "
আরোণ এবার আরো সামান্য এগিয়ে বলে উঠে,
" ক্যামেলিয়া ঘুমের রাজ্যে হারিয়ে গিয়েছে আপাতত। "
ক্যাথরিন তাকিয়ে দেখে আসলেই ক্যামেলিয়া তার কোলে ঘুমিয়ে পড়েছে। এবার আর তাকে কিছু বলার সুযোগ না দিয়ে আরোণ আবার তার ঠোঁটে ঠোঁট মিলিয়ে দেয়। বেশ কিছুক্ষণ পর আরোণ ক্যাথরিনের কানের কাছে মুখ নিয়ে বলে উঠে,
" এই অধরের বিষও আমি অমৃত ভেবে পান করতে দ্বিধাবোধ করবো না। "
তখনই একজোড়া ঠান্ডা বাতাস এসে আরোণকে ছুঁয়ে যায়। আরোণ চোখ মেলে তাকিয়ে দেখে বারান্দার খোলা দরজা দিয়ে শীতল দখিনা বাতাস বইছে। মাথা নামিয়ে নিচের দিকে তাকাতেই দেখে ক্যামেলিয়া তার বুকের সাথে লেপ্টে ঘুমিয়ে আছে। এতক্ষণ সে তারমানে স্বপ্ন দেখছিলো। ক্যামেলিয়াকে ঘুম পাড়ানোর জন্য সে তাকে কোলে নিয়ে আরামকেদারায় বসে ছিলো। কখন চোখ লেগে যায় নিজেও খেয়াল করে নি। এতক্ষণ সব কেবল তার অতিতের স্মৃতিচারণ ছিলো বুঝতে পেরেই তার বুক চিড়ে একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে আসে। বিড়বিড়িয়ে বলে উঠে,
" আমার জন্য ভালোবাসার রঙ লাল থেকে নীল করে দিয়ে না গেলেও পারতে ক্যাথ। এর থেকে ভালো ছিলো এক শিশি বিষ উপহার দিতে আমায়। এক সমুদ্র নীল রঙা বিষে প্রতিনিয়ত ডুবে মরার থেকে এক শিশি বিষ খেয়ে মরে যাওয়া বেশি সহজ। "
চলবে…