ফন্ট সাইজ:
থিম:
অন্তর প্রাঙ্গণ

১ম পর্ব

লেখক: অর্নিবান লেখক সংঘ
শীতের কুয়াশা ভেদ করে সূর্যের মোলায়েম আলো এসে পড়েছে অভির মুখে। বিশাল জানালার পর্দা সরানো থাকায় একফালি রোদ সোজা চোখে এসে পড়তেই বিরক্তিতে কপাল কুঁচকে উঠল তার। বালিশে মুখ গুঁজে কম্বলটা টেনে মাথার ওপর তুলে দিল সে। কিন্তু কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই দম বন্ধ লাগায় আবার তা সরিয়ে ফেলল। আধখোলা চোখে দেয়ালে ঝোলানো ঘড়িটার দিকে তাকাতেই প্রায় লাফিয়ে উঠে বসল অভি। সকাল আটটা!
​— "ধুর! আজও লেট!"
​আর মাত্র দুই ঘণ্টা পরই বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লাস। তড়িঘড়ি করে বিছানা ছেড়ে ওয়াশরুমে ঢুকে পড়ল সে। ফ্রেশ হয়ে বেরিয়ে ফোনটা হাতে নিতেই চোখে পড়ল বন্ধুদের হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে ১২৪টি জমে থাকা মেসেজ! স্ক্রিনের দিকে কয়েক সেকেন্ড তাকিয়ে থেকে হালকা হেসে ফোনটা পকেটে ঢুকিয়ে রাখল সে।
​— "এত সকালে আবার কোন যুদ্ধ লাগল কে জানে!"
​সিঁড়ি বেয়ে নিচে নামতেই নিচতলা থেকে ভেসে এলো এক চেনা চিৎকার—
— "অভি ভাইয়া! তুই আমার পক্ষে, নাকি প্রহেলের পক্ষে?"
​হঠাৎ এমন বজ্রকণ্ঠে চমকে উঠল অভি। আরও দু-ধাপ নেমে ডাইনিংয়ের সামনে এসে দেখল, অনন্যা দুই হাত কোমরে দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। রাগে মুখটা লাল। আর তার ঠিক সামনেই সোফায় আরাম করে বসে আছে প্রহেল। মুখে এমন এক নিষ্পাপ ভাব, যেন পৃথিবীর সবচেয়ে নির্দোষ মানুষটা সে-ই!
​অভি কপালে হাত ঠেকিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
— "সকাল সকাল আবার কী শুরু করলি তোরা?"
​অনন্যা দৌড়ে এসে অভির সামনে দাঁড়াল।
— "আগে বল! তুই কার পক্ষে?"
— "ঘটনা না জেনে বিচার করব কীভাবে?"
​প্রহেল মুখ চেপে হেসে বলল,
— "দেখছিস? আমি বলছিলাম না, অভি ভাইয়া সবসময় ন্যায়বিচার করে!"
— "চুপ কর তুই!" অনন্যা প্রায় চেঁচিয়ে উঠল। "ও আমার ফোনে আমার ছবি বদলে নিজের ছবি দিয়ে লিখে রাখছে— 'আমি প্রহেলের পার্সোনাল ফ্যান।' এখন পুরো কাজিন গ্রুপে সেটার স্ক্রিনশট পাঠিয়ে দিছে!"
​কথাটা শুনে অভি নিজের হাসি আটকে রাখতে পারল না।
— "এইটুকু নিয়েই এত নাটক?"
— "ভাইয়া!"
— "আচ্ছা আচ্ছা..." অভি প্রহেলের কাঁধে হাত রেখে বলল, "এইবার কিন্তু আমি প্রহেলের পক্ষেই আছি, অনু!"
​— "কীইই?" অনন্যা এমনভাবে তাকাল, যেন বিশ্বের সবচেয়ে বড় বিশ্বাসঘাতকতার শিকার হয়েছে সে।
— "ঠিক আছে! আজ থেকে তোর সঙ্গে আমার কথা বলা বন্ধ!" বলেই সে গটগট করে গিয়ে ডাইনিং টেবিলে বসে পড়ল।
​ঠিক তখনই রান্নাঘর থেকে বড় ভাবি ধোঁয়া ওঠা গরম পরোটার ঝুড়ি হাতে বেরিয়ে এলেন।
— "তোমাদের নাটক শেষ হলে সবাই নাস্তা করবে এসো। পরোটা কিন্তু ঠান্ডা হয়ে যাচ্ছে।"
​বাড়ির ছোট বৌ আনিশা  প্লেটটা রাখতে রাখতে মুচকি হেসে বললেন,
— "এই বাড়িতে সকালবেলা ঝগড়া না হলে মনে হয় সূর্যই ওঠে না!"
​প্রহেল ভীষণ গম্ভীর মুখ করে বলল,
— "চাচি, আমি কিন্তু একদম নির্দোষ!"
— "হুম... তুই আর নির্দোষ! এই কথা শুনলে গাছের মুরগিও ডেকে উঠবে।"
​ডাইনিং টেবিলে মুহূর্তেই একচোট হাসির রোল পড়ে গেল।
​ময়মনসিংহ শহরের অদূরে বিস্তীর্ণ জমির ওপর দাঁড়িয়ে থাকা তিনতলা বিশাল বাড়িটাই ছিল এই ঐতিহ্যবাহী ‘চৌধুরী পরিবার’-এর ঠিকানা। পুরোনো লাল ইটের শৈল্পিক নকশার সঙ্গে আধুনিকতার ছোঁয়ায় বাড়িটা যেমন দৃষ্টিনন্দন, তেমনি ভেতরটাও সবসময় প্রাণের স্পন্দনে ভরপুর। বাইরের মানুষের চোখে এই পরিবার ছিল চরম এক ঈর্ষণীয় রূপকথা—এক ছাদের নিচে কয়েক প্রজন্মের বসবাস, একসঙ্গে খাওয়া, খুনসুটি আর অগাধ ভালোবাসার এক স্বর্গরাজ্য।
​এই পরিবারের কর্তা হাজী বসিরউদ্দিন চৌধুরী। বয়স সত্তরের কোঠা ছুঁলেও এখনো পরিবারে তাঁর এক কথাই শেষ কথা। তবে কঠোর ব্যক্তিত্বের আড়ালে লুকিয়ে ছিল সন্তান আর নাতি-নাতনিদের জন্য সীমাহীন মায়া। তাঁর স্ত্রী রওশন আরা চৌধুরী ছিলেন এই বিশাল সংসারের মূল চালিকাশক্তি। সবাই তাঁকে 'বড় আম্মা' বলেই ডাকত। সংসারের প্রতিটি ছোট-বড় সিদ্ধান্তে তাঁর মতামতের গুরুত্ব ছিল অপরিসীম।
​চার ছেলে আর তিন মেয়েকে নিয়েই চৌধুরী পরিবারের এই বিশাল রাজত্ব।
​বড় ছেলে রহমান চৌধুরী স্বভাবে শান্ত ও কম কথার মানুষ। দায়িত্ববোধ প্রবল হলেও ব্যক্তিগত জীবনের একটি ভুল সিদ্ধান্ত আজও তাঁর বড় ছেলে অভির সঙ্গে একটি অদৃশ্য দূরত্ব তৈরি করে রেখেছে। রহমানের প্রথম স্ত্রীর একমাত্র সন্তান ঋত্বিক আরশান অভি। প্রথম স্ত্রীর বিয়োগের পর দ্বিতীয় বিয়ে করেন রহমান চৌধুরী, আর সেই ঘরে জন্ম নেয় অনন্যা। অভি কখনো নিজের আর সৎবোনের মাঝে দেয়াল তুলতে দেয়নি; অনন্যা ছিল তার সবচেয়ে আদরের 'অনু'। নিজের প্লেটের শেষ মাংসের টুকরোটাও সে বোনের মুখে তুলে দিতে পারত। তবে বাবার দ্বিতীয় বিয়েটা অভি আজও মন থেকে মেনে নিতে পারেনি—সেই নীরব অভিমান আজও তাঁদের সম্পর্কের মাঝে এক শক্ত প্রাচীর হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। অনন্যা বাড়ির সবচেয়ে চঞ্চল আর জেদি মেয়ে। রাগ তার নাকের ডগায়! পাঁচ মিনিট আগে যে মানুষের সঙ্গে ঝগড়া করবে, পাঁচ মিনিট পর তার কাছেই আবদার নিয়ে হাজির হবে।
​দ্বিতীয় ছেলে আরফান আহমেদ চৌধুরী স্বভাবে অত্যন্ত হাসিখুশি। তাঁর স্ত্রী নুসরাত চৌধুরী পুরো পরিবারকে আগলে রাখেন। তাঁদের তিন সন্তান—দুই জমজ মেয়ে আর একমাত্র ছেলে প্রহেল। প্রহেল হলো বাড়ির 'অফিসিয়াল ঝামেলাবাজ'! সারাক্ষণ কাউকে খেপানো, ফোন লুকিয়ে রাখা কিংবা এডিট করা ছবি গ্রুপে পাঠানোই তার প্রধান কাজ। তবে ছেলেটার মনটা ছিল একদম শিশুর মতো পরিষ্কার।
​তৃতীয় ছেলে শাহরান শেরনিল চৌধুরী গম্ভীর ও শান্ত প্রকৃতির মানুষ। তাঁর স্ত্রী ঋদ্ধিমা নূর আরশি ভীষণ মায়াবতী একজন নারী। দীর্ঘ বৈবাহিক জীবনেও তাঁদের কোনো সন্তান হয়নি। বিষয়টা আরশির মনে সুপ্ত কষ্ট দিলেও, শাহরান কখনো তাঁকে সেই অভাব বুঝতে দেননি। আর ছোট ছেলে রাকিব চৌধুরী পরিবারের সবার প্রিয়। স্ত্রী আনিশাকে ভালোবেসে বিয়ে করেছিলেন। রাকিবের প্রাণখোলা স্বভাব আর আনিশার মিষ্টি ব্যবহারে বাড়ির পরিবেশ সবসময় চাঙ্গা থাকে। এছাড়া তিন মেয়ের বিয়ে হয়ে গেলেও প্রায়ই তাঁরা বাপের বাড়িতে এসে উঠতেন। তখন পুরো বাড়িটা এক ছোট্ট উৎসবে পরিণত হতো।
​কিন্তু বাইরে থেকে যতটা সুখী মনে হোক না কেন, জীবনের কিছু না-বলা গল্প, অপূর্ণতা আর না-শুকানো ক্ষত এ বাড়ির প্রতিটি মানুষের বুকেই চাপা পড়ে ছিল...
​সকালের নাস্তা আর রাতের খাবার পরিবারের সবাই একসঙ্গে বসে খাবে—এটা চৌধুরী বাড়ির এক অলিখিত নিয়ম। আজও অনন্যা গোমড়া মুখে চেয়ারে বসে আছে। সামনে প্লেট রাখা, কিন্তু সেদিকে তার কোনো নজর নেই। অন্যদিকে প্রহেল দিব্যি আরাম করে পরোটা চিবোচ্ছে।
​বড় ভাবি অনন্যার দিকে তাকিয়ে বললেন,
— "আজকে আবার কী নিয়ে যুদ্ধ লাগল?"
​প্রহেল মুখ তুলে নিরীহ গলায় বলল,
— "চাচি, আমি তো একদম শান্তির মানুষ!"
অনন্যা টেবিল চাপড়ে উঠল, "এই ছেলেটার মুখে এমন কথা শুনলে পাথরও হেসে উঠবে!"
​রাকিব চাচা হেসে ফেলে বললেন,
— "তোরা তো রোজ নতুন নতুন নাটক খাড়া করিস।"
​অভি পানির গ্লাসটা খালি করে বলল,
— "আচ্ছা, এখন আসল ঘটনাটা কে বলবে?"
​অনন্যা এক নিঃশ্বাসে ফোনের ওয়ালপেপার বদলানো থেকে শুরু করে গ্রুপে ছবি পাঠানোর পুরো কাহিনী বলে দিল। সব শুনে অভি কিছুক্ষণ গম্ভীর হয়ে রইল। তারপর প্রহেলের দিকে তাকিয়ে বলল,
— "কাজটা কিন্তু একদম ভালো করিসনি..."
​প্রহেলের মুখটা নিমেষেই মলিন হয়ে গেল।
​পরের মুহূর্তেই অভি হেসে উঠে বলল,
— "...তবে আইডিয়াটা দারুণ ছিল!"
​পুরো ডাইনিং টেবিলে আবারও হাসির তোড় উঠল। অনন্যা হতাশ চোখে তাকিয়ে বলল,
— "ভাইয়া, তুইও ওঁর দলে?"
অভি কাঁধ ঝাঁকাল, "এই রাউন্ডে প্রহেলই বিজয়ী!"
​— "ঠিক আছে! আজ থেকে তুই আর আমার ভাই না!" মুখ ফুলিয়ে উঠে যেতে চাইল অনন্যা।
​অভি হাত বাড়িয়ে বোনের কবজিটা আলতো করে ধরে ফেলল।
— "আহা নাট্যশিল্পী! আগে নাস্তাটা শেষ কর। খালি পেটে রাগ বেশি হয়।"
​অনন্যা মুখ ঘুরিয়ে রাখলেও বাধ্য ছেলের মতো খেয়ে নিল।
​নাস্তা শেষ করে ব্যাগটা কাঁধে তুলে নিল অভি। জুতো পরে দরজার দিকে এগোতেই বড় আম্মা ডাক দিলেন,
— "অভি, দুপুরে কিন্তু বাইরে হাবিজাবি কিছু খাবি না।"
— "ঠিক আছে, বড় আম্মা।"
​গ্যারেজ থেকে বাইক বের করে হেলমেটটা মাথায় পরতেই পেছন থেকে অনন্যার ডাক—
— "ভাইয়া!"
​অভি ঘুরে তাকাতেই অনন্যা ছোট্ট একটা চকলেট বাড়িয়ে দিয়ে বলল,
— "রাগ কিন্তু এখনো কমেনি... এটা তোর জন্য।"
​অভি হেসে চকলেটটা পকেটে রেখে বাইক স্টার্ট দিল। ইঞ্জিনের গর্জনে সকালের স্তব্ধতা ভেঙে গেল। গেট পেরিয়ে একবুক সকালের হাওয়া গায়ে মেখে সে বেরিয়ে পড়ল বিশ্ববিদ্যালয়ের পথে।

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ১ম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন