#আকস্মিক_আগমন
#সামিয়া
#সূচনা_পর্ব
---তোর কেমন ছেলে পছন্দ? (ঝিল)
ঝালমুড়ি চিবুতে চিবুতে মাহাকে প্রশ্নটা করলো তার বেস্টি ঝিলি। মাহা অবশ্য ঝিলিকে ঝিল বলেই ডাকে।
---হুম? (মাহা)
---মানে তুই কেমন ছেলেকে জীবনসঙ্গী হিসেবে চাস? (ঝিল)
--হঠাৎ এ প্রশ্ন? (মাহা)
--এমনিতেই। শুধু কৌতুহল। (ঝিল)
মাহা মুখটা গম্ভীর করে। তারপর বলে,
--আমি বললে তুই তা ভালোভাবে নিবি না। বলবি আমি অদ্ভুত প্রাণী।
--কেন কেন? আচ্ছা, বলবো না। তুই বল।
--আমার থেকে আমার জামাইকে অন্তত ৫ বছরের বড় হতে হবে। এর বড় হলেও সমস্যা নাই। মধ্যবিত্ত পরিবারের শ্যামবর্ণের ছেলে হতে হবে। আর যেটাতে আমি কম্প্রোমাইজ করবো না তা হলো অন্তত ৫ ফিট ৬ হতেই হবে। পড়ালেখায় মোটামুটি বা ব্যাকবেঞ্চার হলে বেশি সুবিধা হয়।
--বাকিগুলা নাহয় মানা যায়। কিন্তু শ্যামবর্ণ আর ব্যাকবেঞ্চার কেন?
--ফর্সা ছেলেদের আমার কাছে প্লে-বয় মনে হয়। কিন্তু শ্যামবর্ণ আমার প্রিয়। আর ব্যাকবেঞ্চার কারণ আমি মিডলবেঞ্চার। আমার বর আমার থেকে পড়াশুনায় ভালো হলে আমার ইগোতে লাগে।
--ওও। বুঝলাম।
--তোরটা বল।
--আমার কোনো চয়েজ নাই। বাবা মার পছন্দ।
--বুঝলাম। গুড গার্ল।
কলেজ থেকে বাসায় যাবার সময় ঝালমুড়ি খেতে খেতে মাহা আর ঝিলির কথোপকথন।
------ ------ -------- ------ ****** ---- ------ ------ ------ ----
মেহবিশ মাহা। অনার্স চতুর্থ বর্ষের গণিত বিভাগের ছাত্রী। দেখতে ফর্সা। লম্বা ৫ ফিট ১ ইঞ্চি। বয়স ২৪। অতিরিক্ত সুন্দরীদের তালিকায় না ফেললেও অসুন্দরীও বলা যায় না। তবে চুল পিঠ পর্যন্ত। বাবা মায়ের দ্বিতীয় সন্তান। বড়বোন মেহেঞ্জিল রাহা। সে বিবাহিত। ছোট দুইভাই অয়ন ও আয়াশ। অয়ন অনার্স ১ম বর্ষে পড়ছে। আর আয়াশ ক্লাস নাইনে বিজ্ঞান বিভাগে।
বাবা। বাবা আরাফাত হোসাইন একজন দোকানদার আর মা গৃহিণী।
বাসায় আসার পর গোসল করে ঘুমিয়ে যায়। সন্ধ্যায় ঘুম থেকে উঠে দেখে ওর আম্মু ওকে বকাঝকা করছে না খেয়ে ঘুমানোর জন্য। ওও দ্রুত উঠে যায়। চুলটা বেঁধে ফোন নিয়ে ফেসবুকে স্ক্রল করতে থাকে। তখন ই ওর বড় বোন ফোন দেয় আর জানায় আগামী শুক্রবার ওর একটা চাকরির পরিক্ষা আছে।
আমি তো শুনে অবাক হয়ে গেলাম। মাত্র কিছুদিন আগেই তো আবেদন করলাম। এখন ই এক্সাম? আপু যদি জানতে পারে কিছুই পড়িনি আমাকে তো শেষ করে দিবে। এসব ই মাহা মনে মনে ভাবছে। কিন্তু আপুকে বলে,
---তুমি চিন্তা করোনা আমি পরিক্ষা দিবো।
চলবে
---তুমি চিন্তা করোনা আমি পরিক্ষা দিবো।
---পরিক্ষা দিলে তো হবে না চাকরি পেতে হবে। আমরা মধ্যবিত্ত পরিবার। আমাদের বাবা মায়ের অঢেল টাকা নেই যে আমাদের ভবিষ্যৎ তারা গড়ে দিবে। আমাদের ভবিষ্যৎ আমাদের ই গড়তে হবে।
---জানি তো
---তাহলে চেষ্টা করছিস না কেন?
---করছি তো।
---কোথায়?
---এবারের পরিক্ষাটা হোক। ইনশাআল্লাহ মন দিয়ে পড়বো।
---এডমিট কার্ড ডাউনলোড করে নিস। রাখলাম।
---আচ্ছা।
বলেই এডমিট কার্ড ডাউনলোড করে দেখে তেঁজগাও কলেজে সিট পড়েছে। ঠিক হলো যে শুক্রবার সকালের ট্রেনে অয়নের সাথে ঢাকা যাবে।
---অয়ন, শুক্রবারের দুইটা টিকিট দেখতো আছে কিনা?
---কোথা থেকে?
---ঢাকা টু মেথিকান্দা।
---আচ্ছা।
---দুইটা টিকিট আছে। কিন্তু উইন্ডো সাইড কোনো সিট নাই।
---কি বলিস?
---হুম। তাও আবার দুজনের সিট আলাদা হবে।
---আচ্ছা ঠিকাছে। সিট দুইটাই বুক কর।
---ওকে।
--------------*****--------------------
শুক্রবার খুব ভোরে আম্মু মাহেরা ওদের ঘুম থেকে তুলে রেডি হতে বললো। সকালের ট্রেনে অয়নের সাথে মাহা তেঁজগাও নামলো।
---আপু তুমি কলেজ লোকেশন চেনো?
---হুম।
---আচ্ছা চলে কিছু খাওয়া যাক।
---চল।
তারপর পরিক্ষার সময়ে পরিক্ষা হলে মাহা প্রবেশ করলো। ১ ঘন্টা পর বের হলো।
---আপু পরিক্ষা কেমন হলো?
---তেমন ভালো না। কিছু তো পড়িনি।
---তবে পরিক্ষা দিলে কেন?
মাহা হেসে বললো,
---পরিক্ষা কেমন হয় তা জানতে।
---আচ্ছা এখন কি করবো? ট্রেন আসতে তো আরো অনেক সময় আছে। আমরা সন্ধ্যার টিকেট কাটলাম। তবে?
---তাহলে চল ঘুরে আসি।
---কোথা থেকে?
---এখানে মিলিটারি মিউজিয়াম আছে।
---তাই নাকি?
---ঠিকাছে চলো ঘুরে আসা যাক।
বাংলাদেশ মিলিটারি মিউজিয়াম বা বাংলাদেশ সামরিক জাদুঘর। এখানে বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা বাহিনীর সকল ধরনের ডিটেইলস আছে। ৫টি স্তর আছে। প্রত্যেক স্তরেই রয়েছে আমাদের দেশ এবং প্রতিরক্ষা বাহিনীর আশ্চর্য রকমের ইতিহাস। অবাক হয়ে অয়ন সবকিছু দেখছে। মাহা স্বাভাবিক ভাবেই দেখছে কারণ ওও এসব আগেই দেখেছে।
---আপু আসলাম যেহেতু ছবি তুলি চলো
---হুম। আমি তোর ছবি তুলে দিচ্ছি।
---আচ্ছা।
অনেকগুলো ছবি তুলার পর হঠাৎ মাহার মনে হলো এমন সুন্দর একটা স্মৃতি ওর ভাইয়ের সাথে বন্দি না করলেই নয়। কিন্তু সমস্যা হলো কে তুলে দিবে ছবি?
আবার সাথে আছে ব্যাগপত্র। আশেপাশে তাকাতে শুরু করলো। হঠাৎ একজনকে দেখে মনে হলো তাকে বলা যায়।
মাহা ডাক দিলো তাকে।
---এই যে ভাইয়া, শুনছেন?
এক যুবক নিজেকে দেখিয়ে বুঝালো তাকে ডাকছে কি না।
---জ্বি। আপনাকেই। যদি কিছু মনে না করেন আমাদের কি একটা ছবি তুলে দিতে পারবেন?
যুবক বোধহয় বিরক্ত ই হলো। মনে মনে ভাবলো পিচ্চি পিচ্চি মেয়েরা আজকাল বিএফ নিয়ে ঘুরতে চলে আসে। ইতোমধ্যে তার বন্ধুরা তাকে নিয়ে হাসাহাসি শুরু করলো। তবু সে স্বভাব বশত মিষ্টি হাসি দিয়ে বললো,
---আচ্ছা।
তারপর সে কয়েকটা ছবি তুলে দিয়ে তার বন্ধুদের সাথে চলে গেলো।
অয়ন মাহাকে বললো,
---আপু চলো তবে কমলাপুর চলে যাই। বিকেল তো হয়ে এলো। ট্রেন আসতে তো বেশি সময় নেই।
---হুম চল। মেট্রোতে আগে মতিঝিল যাই।
---ঠিকাছে তুমি দাড়াও। আমি টিকেট কাটার লাইনে দাড়ালাম। টিকেট কেটে দুই ভাইবোন যাত্রা শুরু করলো। মতিঝিল এসে অয়ন বললো,
--আপু চলো মমো খাই।
---খাওয়া যেতেই পারে। কিন্তু বাসায় গিয়ে আয়াশ কে বলবি না।
---ঠিকাছে।
---ওরা ঢাকার স্ট্রিটফুড ট্রাই করলো।
অবশেষে তারা পৌছালো স্টেশনে। তাদের নির্ধারিত সিটে বসলো। অয়ন সামনের দিকে বসে। আর মাহা তার দুই সিট পিছনে। মাহা বসেই গুনগুন করে গান গাইছে। ওর ডানপাশের দিকে দুই সিটে দুটো ছেলে মেয়ে বসে আছে। ওও তখন ওর বামপাশে তাকালো। আকস্মিক ওও দেখলো যে ওর সাথের সিটে বসেছে ঐ ছেলেটাই যাকে সে ওদের ছবি তুলে দিতে বলেছিলো। পরে অবাকের রেশ কাটিয়ে ওও চুপ করে বসে রইলো।
চলবে......
ছেলেটাও পাশে তাকায় আর দেখে সেই মিউজিয়ামে পার্পল কালার ড্রেস পরিহিত বিএফ নিয়ে ছবি তুলা মেয়েটাই। এরপর ছেলেটা তার আশেপাশে তাকিয়ে ঐ মেয়ের অর্থাৎ মাহার বিএফ মানে অয়নকে খুঁজে। দেখে অয়ন একটু সামনের সিটে বসে আছে। ছেলেটা মনে মনে একটু হাসে এই ভেবে যে এই পিচ্চি মেয়ে তার বিএফ এর সাথে বসতে পারেনি। তাই বলে,
---বিএফ এর সাথে বসতে না পারায় কষ্ট লাগছে?
---সরি? কে বিএফ?
---ঐ যে সামনের সিটে বসা অফ হুয়াইট কালার শার্ট পড়া ভাইয়াটা।
মাহা বিরক্ত হয়। আজকালের জেনারেশনের একটা সমস্যা। একটু সমবয়সী টাইপ দেখলেই ভাবে প্রেমিক প্রেমিকা। আরে ভাইবোনও তো হতে পারে সেটা কেন বুঝতে চায় না কেউ। এরপর মৃদুস্বরে বলে,
---ওও আমার ভাই।
ছেলেটা ভ্যাবাচেকা খেয়ে যায়। আর একটু অনুতপ্ত হয়।
---মাই মিস্টেক।
---পড়াশোনা করা হয়?
---এমবিবিএস দ্বিতীয় বর্ষ।
এটা শোনার পর মাহা ভাবে এই ছেলে তো আমার ছোট। দেখতে অবশ্য বোঝা যায় না। হাইট মেইবি ৫ ফিট ১০ বা তার বেশি হবে। তবে ধবধবে ফর্সা। তাই মনে মনে বলে প্লে বয় টাইপ হবে। ডার্ক গ্রে কালার পরিহিত শার্ট যা তার গায়ের সাথে মানানসই। তবে চশমা পড়ার জন্য বয়সে বড় বড় মনে হয়। ওও ভাবে ছেলেটা বড়জোর অয়নের থেকে এক বছরের বড় হবে কিন্তু দেখে বোঝা যায় না। এসব ভাবতে ভাবতে ওও আবার গুনগুন করতে করতে আশেপাশে তাকায়। আর কোনো কথা বলে না।
অপরদিকে ছেলেটা আশ্চর্য হয় যে এই প্রথম কোনো মেয়ে সে মেডিকেলে পড়ছে জেনেও দ্বিতীয় আর কোনো প্রশ্ন করছে না। তাই কৌতুহলবশত জিগায়,
---তুমি কোন ক্লাসে পড়ছো?
মাহা এবার হেসে দেয়। ওর হাইট আর বেবি ফেইসের জন্য কেউ বুঝে না ওও যে এত বড়। একটু হেসেই বলে,
---এক্সকিউজ মি? তুমি করে বলছো কেন? আপনি হবে।আমি অনার্স ফাইনাল ইয়ারে পড়ি।
এবার ছেলেটার মুখ দেখার মতো হয়। ওও অবাক হয়ে কয়েক সেকেন্ড মাহার দিকে তাকিয়ে থাকে। ভাবে এই মেয়েটা আমার বড়? বোঝা ই তো যাচ্ছে না চেহারা দেখে। তারপর নিজেকে সামলিয়ে বলে,
---সিরিয়াসলি? আমি ভেবেছি বড়জোর ইন্টারমিডিয়েটের স্টুডেন্ট হবে হয়তো।
---হুম। অনেকেই তাই বলে।
---তাহলে তো তুমি সরি আপনি আমার বড়। কিন্তু আপনার নাম কি?
---আমার নাম মেহবিশ মাহা। সবাই মাহা ডাকে।
যুবক মনে মনে বলে মাহা। তারপর বলে,
---আমি নরসিংদী যাবো। আর ঐ যে আপনার ডানপাশের দুজন দেখছেন তারা আমার বন্ধু।
মাহা পাশে তাকিয়ে বলে,
---হাই।
পাশের মেয়েটা হেসে বলে,
---হ্যালো আমি আনাবিয়া ইশা। আমাকে সবাই ইশা ডাকে।
তারপর ছেলেটা ওর মাথায় একটা চাপড় মেরে বললো,
---হ্যাঁ, ওর নাম ইশা
আর ওর নাই কোনো দিশা। আর আমি পিয়াল।
ইশাও ওর পিঠে চড় মেরে বলে,
---দেখ পেয়ালা ভালো হচ্ছে না কিন্তু।
ওদের এসবের মাঝখানে ছেলেটা ওদের চোখ দিকে রাগী দৃষ্টিতে তাকাতেই ওরা চুপ হয়ে যায়। তখন মাহা বলে,
---আমি মাহা। আমি কিন্তু তোমাদের বড়। সিনিয়র।
ইশা বলে,
---OMA ( ওও এম এ ).....আপনি আমাদের বড়? কীভাবে সম্ভব? তাই তো বলি ঐ বদছেলে (মাহার সাথের ছেলেকে ইঙ্গিত করে) আপনার সাথে এত কথা বলছে কেন? তারমানে আপনি বড় আপু।
---হুম। কথা বলবে না কেন?
---ওও একটা খারুশ। পারলে একলাইনে কথা শেষ করে দেয়।
---তাই? আচ্ছা সেসব বাদ। তোমার নামটাই তো জানা হলো না। তোমাকে কোন নামে ডাকলে সারা দিবে?
---আমি উমায়ের....উমায়ের মায়সাম।
চলবে......