ফন্ট সাইজ:
থিম:
নিস্তব্ধ রাতের কাব্য

৮ম পর্ব

লেখক: মিথিলা ইসলাম

#নিস্তব্ধ_রাতের_কাব্য

#লেখনীতে_মিথিলা_ইসলাম

#পর্ব_৮

.

.

.

সকাল তখন ৮:০০ টা বাজে। চারদিক ঘন কুয়াশায় ঘেরা, সূর্য মামার দেখা নেই আজ।সবাই মিলে সকালের নাস্তা করতে বসেছে। পরোটা, চা, সাথে হাসের মাংস ভুনা, ছোট ছোট লুচিও আছে। মুনিরা এবং নাসরিন শেখ গরম গরম ভেজে এনে সবাইকে দিচ্ছে। তেহরিদের নানু বাড়ি থেকে তার কয়েকটা কাজিন এসেছে দেখা করতে। বড়রা দেখা করে চলে গেছে এবং সবাইকে তাদের বাড়িতে যেতে বলেছে। আজকে তুলনামূলক অনেক শীত সবাই হাতে, পায়ে মোজা, গায়ের সোয়েটার, শাল সব পরে দুয়ারে বের হয়। নাবিলা আর সিমরান বলে এখন হাটতে বের হবে। পুরো গ্রাম ঘুরে দেখবে এবং খেজুরের রস পেলে খাবে। বাকিরাও বলে ঘুরতে যাবে তাই সবাই মিলে ঘুরতে বের হয়।

রাস্তার উপর শিশিরবিন্দু জমে আছে। সাবধানে না হাঁটলে পরে যাওয়ার সম্ভাবনা অনেক বেশি। রাস্তার দুইধারে বড় বড় লম্বা কাঠ গাছ। সবাই হাঁটতে হাঁটতে একসময় চকের সাইডে চলে আসে। মাঝ দিয়ে মাটির রাস্তা আর দুই দিকে সারিবদ্ধ খেজুর গাছ।দূরদূরান্ত যতটুকু চোখে পরে সব ফসলি জমি। অনেক কৃষক জমিতে কাজ করছে। অনেক দূর চলে এসেছে তারা। হঠাৎ একজন লোক কে চোখে পরে যিনি, একটা বাঁশের চটির দুই কোনায় দড়ির সাহায্যে মাঝারি আকারের মাটির কলস বেঁধে নিয়ে যাচ্ছে কোথাও। নাবিলা বলে...

"ভাবি এগুলো কি নিয়ে যাচ্ছে এভাবে? "

"খেজুরের রস। "

"আমরা খাবো। তুমি তাকে দিতে বলো। "

লোকটা কাছাকাছি আসলে ইশা তাকে থামিয়ে বলে সবাইকে যেনো খেজুরের রস দেয়। তার কাছে গ্লাস ছিলো, সবাইকে এক গ্লাস করে দেয়। ইশা সবাইকে জিজ্ঞেস করে আরো খাবে কি না। না করলে তেহরিদ টাকা পরিশোধ করে। আবার হাঁটতে হাঁটতে গল্প করতে থাকে। নাবিলা, তাসনিম, সিমরান, ইমতিয়াজ, নীল এরা সবাই সামনে হাটছে। তেহরিদ আর ইশা পিছনে হাটছে। বেচারার ভালোই ঠান্ডা লেগেছে বাবাকে বলে সকালে ঔষধ আনিয়েছে ইশা। সবাই কিছু জিজ্ঞেস করলে তাসনিম উত্তর দিচ্ছে।

সামনে বিশাল বড় একটা বট গাছ। গাছের গোড়ায় বসার জন্য গোল করে ইট, সিমেন্ট দিয়ে জায়গা করেছে। সেখানে বসে কিছুসময় আড্ডা দিয়ে সবাই আবার বাড়িতে চলে আসে।

★

বেলা সাড়ে ১১ টা বাজে। বাড়িতে অনেক গুলো মানুষ ওয়াশরুম মোট ৪ টা। গোসল করতে অনেক সময় লাগবে। তাই ইশা একেকজন কে একেকটায় পাঠায় আর বলে সে গরম পানি নিয়ে আসছে। এতো শীতে ঠান্ডা পানি দিয়ে গোসল করা কোনো ভাবেই সম্ভব নয়। নাবিলা তাসনিমের রুমে, সিমরান দাদির রুমে, আদনান তার রুমে আর ইমতিয়াজকে কমন ওয়াশরুম দেওয়া হয়েছে। সবাইকে গরম পানি দেওয়া শেষ শুধু তেহরিদ বাকি আছে। ইশা তেহরিদের জন্য গরম পানি নিয়ে যাবে তখন দেখে ইমতিয়াজ সোফার উপর বসে আছে গোসলে না গিয়ে।

" ভাইয়া আপনি গোসল করতে না গিয়ে এখানে বসে আছেন কেনো?"

"আমি গোসল করবো না ভাবি। "

"এই জন্যই তো বলি এতো দুর্গন্ধ কোথা থেকে আসছে। ছিহ! "

পিছন থেকে তাসনিম কথাটা বলে উঠে। ইমতিয়াজ উত্তরে বলে...

"এহহ আসছে দুর্গন্ধ! সুঘ্রাণ বের হচ্ছে, আপনার তো মনে হয় নাক নেই তাই বুঝতে পারছেন না। "

" আমার নাক আপনার নাকের থেকে যথেষ্ট খাড়া। খচ্চর লোক কোথাকার। পুরো ঘরটা গন্ধে ভরে গেছে, তাড়াতাড়ি গোসল করতে যান নাহলে ঠান্ডা পানি এনে ঢেলে দিবো। "

"থাক আর ঝগড়া করতে হবে না। ভাইয়া আপনি গোসল করতে যান গরম পানি তো আছেই। আর তাসনিম তুই তোর কাজে যা। "

দুইজনকে থামিয়ে ইশা গরম পানির বালতি নিয়ে ঘরে আসে। তেহরিদ তখন ল্যাগেজ থেকে নিজের কাপড় বের করছে। ইশা বালতি নিয়ে ওয়াশরুমে রাখে। এরপর বড় বালতিতে পানি ভরে গরম পানি মিক্স গোসল করার উপযোগী করে। বের হয়ে তেহরিদকে বলে...

"আমি পানি মিক্স করে দিয়েছি। আর গোসলের পর আপনার কাপড় ধোঁয়ার দরকার নেই। রেখে দিয়েন আমি ধুয়ে দিবো। বেশি সময় নিয়েন না আপনার কিন্তু প্রচুর ঠান্ডা লেগেছে। "

"আচ্ছা। আমাকে শরীর মোছার জন্য কিছু দাও। আমি বাসায় থেকে আনিনি ভুলে গিয়েছিলাম। "

ইশা নিজের একটা তোয়ালে দেয়। তেহরিদ গেলে ইশা বিছানা, রুম সব গোছগাছ করে ঝাড়ু দেয়। নিজের একসেট জামা বের করে সুতোর কাজ করা। আজকে বিকেলে হয়তো তেহরিদের নানা বাড়ি যাবে সবার সাথে দেখা করতে। যদিও মানুষ গুলো পরিচিত কিন্তু এখন সম্পর্ক বদলেছে।

প্রায় ১৫ মিনিট পর তেহরিদ গোসল করে বের হয়।

ঠান্ডায় কাঁপতে শুরু করে ইশা তাড়াতাড়ি করে হুডি এগিয়ে দেয়।

ইশা জামা-কাপড় নিয়ে গোসল করতে ঢুকে। তেহরিদ অনুভব করে তার শরীর অনেক কাঁপছে আর শরীর আগুনের মতো গরম হচ্ছে ধীরে ধীরে। কম্বল মুড়িয়ে তাড়াতাড়ি শুয়ে পরে তাও কাঁপা বন্ধ হয়না। ইশাকে ডাক দিবে কিংবা উঠে আরেকটা কম্বল বের করবে সেই শক্তি নেই শরীরে। গোসল, নিজের কাপড়, তেহরিদের কাপড় ধুয়ে বের হতে ইশার ২০ মিনিট লেগে যায়। প্রথমে খাটের দিকে খেয়াল করেনা কাপড়ের বালতি নিয়ে যেতে যেতে হঠাৎ পিছন ফিরে তাকায়। তেহরিদ তখনো ঠান্ডায় কাঁপছিল ইশা বালতি রেখে দৌড়ে খাটের কাছে যায়।কপালে হাত রাখলে বুঝতে পারে জ্বর অনেক বেশি। আরেকটা কম্বল এনে শরীরে জড়িয়ে দেয়। শিয়রের কাছে বসে তেহরিদ ডাকতে শুরু করে…

"শুনছেন, একটু চোখ খোলে তাকান আমার দিকে।"

ইশার কথা শুনে তেহরিদ খুব কষ্ট করে চোখ মেলে তাকায়। জ্বরের কারণে চোখ দুটো লাল হয়ে আছে। ইশা ফের বলে...

"আরো কিছু দিবো, ঠান্ডা লাগছে?"

"উহু।"

"আমি বাবাকে বলে ডাক্তার কাকাকে ডেকে আনি। আপনি একটু কষ্ট করে এখানে থাকেন। "

"তুমি এখানেই থাকো। "

এইকথা বলে ইশার একটা হাত ধরে চোখ বন্ধ করে। কোনো উপায় না পেয়ে বাবাকে কল করে। ২ বার রিং হওয়ার পরই কলটা রিসিভ করে।

"কি মা রুমে থেকে কল দিলে যে? "

"উনার অনেক জ্বর বাবা। তুমি একটু ডাক্তার কাকাকে ডেকে নিয়ে আসো। এখন তো খাওয়ার সময় কাকা নিশ্চয়ই বাসায় এসেছে। "

" তুমি মাথায় পানি পট্টি দাও। আমি আমজাদ ভাইকে ডেকে নিয়ে আসছি এখনি।"

ফরহাদ শেখ যাওয়ার সময় সবাইকে বলে যায় তেহরিদের জ্বরের কথা। সবাই তেহরিদকে দেখতে ইশার রুমে চলে আসে। কিছুসময় পর ইশার বাবাও ডাক্তার ডেকে নিয়ে আসে। জ্বর মাপার পর দেখে ১০৪°। আরো অনেক কিছু জিজ্ঞেস করে কিছু ঔষধের নাম লিখে দেয়।

" জামাইকে আগে খাবার খাওয়াও।আর আপাতত জ্বরের জন্য প্যারাসিটামল থাকলে খাইয়ে দাও। এইসময় সব ফার্মেসী বন্ধ ২ টার পর খুলবে তখন গিয়ে এই ঔষধ গুলো নিয়ে আসবে। শীতের দিন আর যেহেতু ঠান্ডাও লেগেছে তাই মাথায় পানি ঢালবে না। "

ডক্টর আরো কিছু পরামর্শ দিয়ে বের হয়ে যান। মুনিরা শেখ ইশা এবং তেহরিদের খাবারটা ঘরে দিয়ে বাকিদের নিয়ে বের হয়ে যান। সবাইকে টেবিলে বসিয়ে খাবার বেড়ে দেয়। তাসনিমও বসে না থেকে মা-চাচির হাতে হাতে সাহায্য করতে থাকে। আজকে পোলাও, রোস্ট, গরুর মাংস, ইলিশ ভাজা, চিংড়ি ভাজা, ডিম, কাবাবসহ আরো কয়েকটা আইটেম রান্না করা হয়েছে। তেহরিদ অসুস্থ হওয়ায় কারোরই মনটা ভালো নেই। ইমতিয়াজ বাসায় কল করে জানাতে চেয়েছিল কিন্তু তেহরিদ না করেছে। সবাই আস্তে ধীরে খেতে শুরু করে।

তেহরিদের মতো স্বাস্থ্যবান একজন কে খাটের সাথে হেলিয়ে বসাতে ইশার অনেক বেগ পোহাতে হয়েছে। নিজে উঠে বসার মতো শক্তি নেই শরীরে। চোখ বন্ধ করে বসে আছে আর চোখের কোনা বেয়ে পানি পরছে।

"আপনার খুব কষ্ট হচ্ছে? "

ইশার করুন কন্ঠস্বরের কথা শুনে তেহরিদ বলে..

"নাহ। আর চিন্তা করো না জ্বর হলেই আমার চোখ থেকে এমন পানি পরে। "

"আপনি খেতে পারবেন নাকি আমি খাইয়ে দিবো?"

"প্লেটটা আমার কাছে দাও আর তুমি তোমার খাবার খাও।"

ইশা তেহরিদের কোলের বালিশ রেখে তার উপর প্লেট রাখে। এরপর নিজে প্লেট নিয়ে দুজন খাওয়া শুরু করে। তেহরিদ এর খেতে খুব কষ্ট হচ্ছে অল্প অল্প করে লোকমা মুখে দিতে থাকে, ইশাকে বুঝতে দেয় না। কিন্তু ইশা পুরো ব্যাপারটা খেয়াল করে। তেহরিদের প্লেট সরিয়ে নিজের থেকে খাইয়ে দিতে থাকে।

" শুধু আমাকে দিচ্ছো কেনো তুমিও খাও। "

দুজনের খাওয়া শেষ করে ইশা ঔষধ খাইয়ে দেয়। তেহরিদ শুয়ে পরে কপাল চেপে। প্রচন্ড মাথা ব্যথা করছে। প্লেট গুলো রান্না ঘরে রেখে এসে খাটে বসে ইশা। মাথা এভাবে ধরে রাখায় আন্দাজ করে মাথা ব্যথা করছে। বিনাবাক্যে আস্তে আস্তে মালিশ করতে থাকে। কিছুটা আরাম বোধ হওয়া তেহরিদও এক সময় ঘুমিয়ে পরে।

#চলবে.....?

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ৮ম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন