ফন্ট সাইজ:
থিম:
নিস্তব্ধ রাতের কাব্য

৭ম পর্ব

লেখক: মিথিলা ইসলাম

#নিস্তব্ধ_রাতের_কাব্য

#লেখনীতে_মিথিলা_ইসলাম

#পর্ব_৭

.

.

.

বড়ও না আবার ছোটও না মাঝারি আকারের একটা রুম। রুমের মধ্যে একটা ছোট বেড, দুইজন শোয়া যায় এমন। একটা ড্রেসিং টেবিল, ২ পার্টের একটা ছোট্ট আলমিরা। জানালার পাশে একটা পড়ার টেবিল একটা চেয়ার রাখা। টেবিলের উপর একাডেমিক বইয়ের পাশাপাশি কিছু উপন্যাসের বইও আছে। ছিমছাম, খুব গোছানো একটা রুম।

এই রুমটা ইশার একান্ত। তবে এখন থেকে তেহরিদ যখনই আসবে সেও এই রুমে থাকবে। ইশার সাথে তেহরিদ রুমে আসে এবং পুরো রুমটা পরখ করে। ইশা তেহরিদকে রুমে রেখে আগে নিজে ফ্রেশ হতে যায়। ইশা ফ্রেশ হয়ে বের হলে তারপর তেহরিদ ফ্রেশ হতে যায়। রুমে এসে বিছানা ঝেড়ে বালিশ গুলো ঠিক করে একটা কোল বালিশ জড়িয়ে ধরে ইশা শুয়ে পরে। শহরে শীত তেমন না হলেও গ্রামে অনেক শীত তাই উঠে আলমিরা থেকে কম্বল বের করে। তেহরিদ বের হয়ে দেখে খাটের উপর কেউ কম্বল মুড়িয়ে গুটিশুটি মেরে শুয়ে আছে। আর এটা ইশা ছাড়া অন্য কেউ যে নয় সেটাও তেহরিদ জানে। এমন ঠান্ডা বাতাসের মধ্যে আসায় তেহরিদের মাথা ব্যাথা করছে। কিন্তু ইশাকে কিছুই বলেনা নিজেও বেডে বসে, পাশে একটা কাঁথা দেখতে পায় তারপর সেটা গায়ে জড়িয়ে শুয়ে পরে। কারণ কম্বল ইশা যেভাবে পেচিয়ে শুয়েছে সেই কম্বলে ঢোকার কোনো উপায় নেই। শুয়ে থাকতে থাকতে তেহরিদও একসময় ঘুমিয়ে পরে।

প্রায় পৌঁনে ৯টায় ইশার ঘুম ভাঙে। নিজেকে কিছুটা ধাতস্থ করে পাশে তাকালে দেখতে পায় তেহরিদ ঠান্ডায় কাঁপছে। ইশা তাড়াতাড়ি করে নিজের কম্বল দিয়ে তেহরিদকে ঢেকে দেয়। আস্তে করে কপালে হাত রাখলে বুঝতে পারে কোনো জ্বর টর নেই। শাল জড়িয়ে রুম থেকে বের হয়ে আগে রান্না ঘরে যায়। সেখানে ইশার মা এবং চাচি মিলে নানান পদ রান্না করছে আর দাদি পাশে একটা চেয়ারে বসে সব কিছু দেখিয়ে দিচ্ছে। নতুন নাত জামাই তাকে সব কিছু সুন্দর করে রেধে খাওয়াতে হবে। ইশা দাদির পাশে আরেকটা চেয়ারে বসে পরে।

" কি রান্না করছো আম্মু? "

" ইলিশ মাছের তরকারি , চিংড়ি মাছ ভাজা, গরুর মাংস ভুনা, ডিম, ডাল, ভাত, পোলাও আর সবজি। এইতো এগুলোই করছি। "

"এত্তো কিছু! "

" জামাইকে এভাবেই আপ্যায়ন করা হয় মা। "

বড়ো চাচি #নাসরিন_শেখ কথাটা বললো। ইশার কাছে বড়ো চাচি মানেই মায়ের মতো আরেকটা মা। ছোট বেলা থেকেই তাদের দু ভাই-বোনকে খুব আদর করে। ইশা তাকে চাচি না বড়ো আম্মু বলে ডাকে।

ইশা মা-চাচির সাথে গল্প করতে থাকে। দাদিও টুকটাক প্রশ্ন করতে থাকে। সংসার কেমন চলছে? ও বাড়ির সবাই কেমন? ইশার সাথে ভালো আচরণ করে কিনা? তেহরিদ ছেলে হিসেবে কেমন? এরকম আরো প্রশ্ন করে। তাদের সব প্রশ্নের উত্তর দিয়ে ইশা তাসনিমের রুমে যায়। সেখানে গিয়ে দেখে তাসনিম, নাবিলা, সিমরান, ইমতিয়াজ মিলে লুডু খেলছে আর হাসাহাসি করছে। রাকিন সেই বাড়ি থেকে এসেই সোজা নিজেদের বাড়ি চলে গেছে। ছেলে চলে যাওয়ায় আয়রা বেগমও ছোট ছেলেকে নিয়ে চলে যান। ইশা তাসনিমের পাশে বসে খেলা দেখতে থাকে সবার মধ্যে তখন হাড্ডাহাড্ডি লড়াই চলছে। নাবিলা আর সিমরানের সব গুটি পাকা করা হয়ে গেছে। নাবিলা প্রথম এবং সিমরান দ্বিতীয় হয়েছে। এখন তাসনিম আর ইমতিয়াজের লড়াই চলছে। নাবিলা, সিমরান ইমতিয়াজের দলে আর ইশা তাসনিমের দলে। দুইজনের ৩ টা করে গুটি পাকা হয়ে গেছে আর ১টা করে কানার জন্য আটকে আছে। শেষ পর্যন্ত তাসনিম জিতে যায় আর এটা নিয়ে উল্লাস করতে থাকে।

★

রাত ১০:০০ টা বাজে। ইশার মা এবং বড়ো আম্মু সব খাবার এনে টেবিলে রাখছে। ইশাকে বলা হয় তেহরিদকে ডেকে নিয়ে আসতে। সেই যে এসে শুয়েছে এখনো ঘুম থেকে উঠেনি, ইশা ডাক দেয়...

"শুনছেন, উঠুন আম্মু খেতে ডাকছে আপনাকে। "

কিন্তু তেহরিদের কোনো সারা শব্দ নেই। ইশার এবার হালকা করে ধাক্কা দিতে থাকে কিছুসময় পর তেহরিদ চোখ মেলে তাকায়। ইশা আবার বলে...

" তাড়াতাড়ি উঠুন, খাবার খাওয়ার সময় হয়েছে। "

"আচ্ছা তুমি বসো। আমি একটু চোখে-মুখে পানি দিয়ে আসি।"

"আচ্ছা। "

তেহরিদ বের হলে ইশা তাকে নিয়ে আসে। সবার সাথে কথা বলে তেহরিদ। কারণ আসার পর কারো সাথেই তার তেমন কথা হয়নি। ইশাকে অনেকবার বলা হয় তেহরিদের সাথে খেতে বসতে তবে সে জানায় পরে খাবে। এখন ইমতিয়াজ, তেহরিদ, নীল, আদনান, ইশার বাবা আর চাচা খেতে বসেছে। ইশা পাশেই দাড়িয়ে নাবিলা, সিমরানের সাথে কথা বলছিলো তখন দাদি বলে ইশা যেনো তেহরিদকে বেড়ে খাওয়ায়। ইশাও কিছু না বলে পাশে দাঁড়িয়ে সব বেড়ে দেয়। মা আর চাচিও মাঝে মাঝে অনেক কিছু তুলে দেয়। তেহরিদ বেচারা মহা ঝামেলায় পরে যায় কারণ তার পেট ভরে গেছে কিন্তু সবাই একটার পর একটা দিতেই আছে। না বললেও কেউ শুনছে না। ইশার দিকে তাকিয়ে চোখের ইশারায় বোঝায় সে আর খেতে পারবেনা। ইশা বলে প্লেট এভাবেই রেখে উঠতে। এরপর হাত ধোঁয়ার জন্য বেসিনে নিয়ে যায়। পুরুষদের খাওয়া হয়ে গেলে সবাই উঠে চলে যায়। এবার ইশা, নাবিলা, সিমরান, তাসনিম, দাদি, মা এবং চাচি খেতে বসে। মুনিরা শেখ আগের প্লেট গুলো তুলছিলো যখন তেহরিদের প্লেট নিবে তখন দাদি বলে...

"এই প্লেট কই নিতাছো ছোট বউ?"

"কেনো আম্মা রান্না ঘরে নিচ্ছি, খাওয়া হলে সব একসাথে ধুয়ে ফেলবো।"

"এইটা রাইখা বাকি সব গুলো নিয়া যাও।"

"এটা এখানে রেখে কি করবো আম্মা?"

"স্বামী-স্ত্রী এক প্লেটে খেইলে মোহাব্বত বারে। তুমি এই প্লেট রাখো এটায় ইশা খাইবো।"

"কিন্তু আম্মা ইশা...."

"ইশা খাইবো তুমি রাখো। "

ইশার মা শাশুড়ীর কথায় তেহরিদ প্লেটটা রেখে বাকি গুলো নিয়ে যায়। দাদি ইশাকে বলে সে যেনো এই প্লেটেই খায় আর প্লেটের কোনো খাবার যেনো না ফেলে।দাদির কথায় আর না করেনা সেই প্লেটেই খাবার খায় ইশা। খাওয়া শেষে তেহরিদ, ইমতিয়াজ আর আদনান মিলে গল্প করছিল। ইশার খাওয়া হয়ে গেলে মায়েদের সাথে সব কিছু হাতে হাতে গুছিয়ে দেয়। এরপর রুমে যেয়ে বিছানা গুছিয়ে তাসনিমের রুমে বসে চার মিলে গল্প করতে থাকে। সাড়ে ১১ টায় তেহরিদ রুমে আসে, পুরো রুমে চোখ বুলিয়ে দেখে ইশা রুমে নেই। ওয়াশরুমের দরজাও খোলা। তেহরিদ শুয়ে পরে কিন্তু আজকে আর মাঝে কোলবালিশ নেই। কারণ ইশার বেডটা ছোট দুজন ঠিক আছে কোলবালিশ নিলে জায়গা সংকট হয়। তখন সন্ধ্যায় কোলবালিশের জন্য দুজনেরই কষ্ট হয়েছে। তাই এবার আর হয়তো ইশা কোলবালিশ নেইনি।

১২:০০ টায় ইশা রুমে আসে। সে তো আসতেই চাচ্ছিল না কিন্তু ওরা তিনজন মিলে জোর করে তাকে পাঠিয়েছে। রুমের মধ্যে ডিমলাইট জ্বালানো তেহরিদ আধ শোয়া হয়ে ফোন দেখছে। তেহরিদ ভিতর সাইডে শুয়েছে আর ইশার জন্য বাইরের দিকে জায়গা রেখেছে। আজকে অনেক অস্বস্তি লাগছে কারণ আগের দুইদিন তো কোলবালিশ ছিলো কিন্তু আজকে নেই। বেডটাও ছোট দু'জন শুলে একদম লেগে লেগে শুতে হবে। ইশা আস্তে করে যেয়ে কম্বল মুড়ি দিয়ে এক সাইড হয়ে শুয়ে পরে। যেভাবে শুয়েছে একটু সোজা হতে গেলেই পরে যাবে। তেহরিদ আরেকটু সাইডে চেপে ইশাকে বলে...

"আরো এইদিকে চাপো নাহলে তো পরে যাবে। আর নাহয় তুমি এই সাইডে আসো।"

"কিছু হবে না। আমি ঠিক আছি।"

*

তখন মাঝরাত, আড়াইটার কাছাকাছি হবে হয়তো। ইশার ঘুম ভেঙে যায় কানের কাছে কারো কাশির শব্দ শুনে। ভালো করে তাকিয়ে দেখে সে বেডের মাঝে শুয়ে আছে তেহরিদ তাকে একহাতে জড়িয়ে আছে। ইশা নিজেও এক হাত দিয়ে ধরে রেখেছে। বুঝার উপায় নেই কে কখন কাছাকাছি এসেছে। ইশা লজ্জা পায় নিজেদের এইভাবে দেখে।এরমধ্যে তেহরিদ আবার কেশে উঠে আর ইশার ধ্যান ভাঙে। ১ মিনিটের বেশি হয়ে যায় কিন্তু কাশি থামেনা চোখ দিয়ে পানি গরিয়ে পরে। ইশা তারাহুরো করে উঠে এক গ্লাস পানি নিয়ে তেহরিদকে ২/৩ বার ডাকার পর চোখ মেলে তাকায়। ইশা পানি এগিয়ে দিলে উঠে বসে পানিটা খায়।

"আপনার এতো ঠান্ডা লাগলো কখন? বাসায় তো ঠিকই ছিলেন। "

"আজকেই লেগেছে ঠান্ডা বাতাসের মধ্যে এসেছি। এসে আবার ঠান্ডা পানি দিয়ে হাত-মুখ ধুয়েছি। এর জন্যই হয়তো এমন হয়েছে। "

"আচ্ছা আপনি একটু বসুন আমি এখনি আসছি।"

"কই যাবে এতো রাতে?"

"রান্না ঘরে। "

ইশা রান্না ঘর থেকে মধু এনে ১ চামচ মধু খাইয়ে দেয়। এরপর জিজ্ঞেস করে চা খাবে কি না।কিন্তু তেহরিদ না করে এতো রাতে আর কিছু খাবেনা। ইশা মধুর কৌটা পাশে রেখে দেয়। দুজনই একসময় ঘুমের দেশে পারি জমায়। এক ঘুমে একদম সকাল।

#চলবে……..?

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ৭ম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন