#নিস্তব্ধ_রাতের_কাব্য
#লেখনীতে_মিথিলা_ইসলাম
#পর্ব_২২
.
.
.
বিকেল ৪ টার সময় আবার বৃষ্টি নেমেছিল। এখন বৃষ্টি থেমে গেছে বেশ কিছুক্ষণ আগেই। তবুও তার উপস্থিতি যেন এখনো চারপাশে ছড়িয়ে আছে। আকাশে আর সেই আগের মতো ঘন কালো মেঘ নেই, তবে হালকা ধূসর মেঘগুলো ভেসে আছে অলসভাবে। মেঘের ফাঁক গলে নরম আলো বেরিয়ে আসছে।
বাতাসে এখন আর কোনো গুমোট ভাব নেই বরং একদম ঠান্ডা, সতেজ। গভীর করে শ্বাস নিলেই ভেজা মাটির সোঁদা গন্ধ মন ভরে দেয়। রাস্তাঘাটে এখনো জমে আছে বৃষ্টির পানি। ছোট ছোট পানির স্তরগুলো আয়নার মতো ঝিলমিল করছে। কোনো গাড়ি গেলে সেই পানিতে ঢেউ উঠে চারপাশে ছিটকে পড়ে। কোথাও আবার জমে থাকা পানিতে আকাশের মেঘের প্রতিচ্ছবি ভেসে উঠেছে, দেখতে সুন্দর লাগে।তেহরিদের বিল্ডিংয়ের সামনে থাকা গাছগুলো একদম ধুয়ে-মুছে পরিষ্কার। পাতার ডগা থেকে এখনো টুপটাপ করে পানি পড়ছে। ভেজা সবুজ রংটা যেন আরও গাঢ় হয়ে উঠেছে। হালকা বাতাসে পাতাগুলো দুলে উঠলে জমে থাকা ফোঁটাগুলো ঝরে পড়ে নিচে। চারপাশে একদম নীরবতা, তবে সেটা নির্জন না বরং প্রশান্ত।
ইশার বাড়ির লোকজন যাওয়ার জন্য তোরজোড় শুরু করেছে। বৃষ্টি থেমেছে এখন বের না হলে আবার কখন বৃষ্টি শুরু হয় তার ঠিক নেই। এত দূরের রাস্তা, তাড়াতাড়ি বের হওয়াই ভালো। সবাই রেডি এখন শুধু বের হবে। ইশা মাকে জড়িয়ে ধরে বসে আছে। মুনিরা শেখ এটা সেটা বলে বুঝাচ্ছেন মেয়েকে।
" আজকের দিনটা থেকে যাও।"
" নারে মা থাকা যাবে না। এখান থেকে গিয়ে আয়রার বাসায় যাবো। "
" সেখানে তো কালপরশুও যাওয়া যাবে।"
" কাল ভোর ৫ টায় রাকিনের ফ্লাইট। কাল গেলে তো হবে না মা।"
" কিসের ফ্লাইট?"
" ওহ তোকে তো বলা হয়নি। রাকিন মালয়েশিয়া চলে যাচ্ছে। "
" হঠাৎ? "
" জানিনা মাথায় কি ভূত চেপেছে। ২ মাস আগে থেকেই বাসায় অনেক চাপ দিচ্ছিল। যে দেশে আর থাকবে না যত তাড়াতাড়ি সম্ভব দেশের বাইরে যেতে চায়। অবশেষে রাকিনের পাগলামির সাথে না পেরে তোর ফুপা লাইন দিয়েছিল।তারই ফ্লাইট আগামীকাল। "
" ওহ "
" হুম আমরা যাই তাহলে। ভালোভাবে থাকবি, ঠিক মতো খাওয়া-দাওয়া করবি। মন খারাপ করিস না আর কিছুদিন পরেই তো আমাদের কাছে যাবি। আজ তাহলে আসি?"
" আচ্ছা। "
সবাইকে এগিয়ে দিতে গেট পর্যন্ত আসে ইশাসহ বাড়ির সকলে। এরপর বিদায় নিয়ে সবাই গাড়িতে উঠে বসে। গাড়িটা বের হয়ে যায়, যতক্ষণ পর্যন্ত দেখা যায় ইশা ততক্ষণ তাকিয়ে থাকে। গ্রামে যাবে ৫ তারিখে। এ'কদিনে অফিসের কাজ, রিলেটিভদের দাওয়াত দেওয়া, বিয়ের কার্ড ছাপানো এইসব গুছিয়ে ফেলবে। অন্যদিকে তেহরিদের মামারা বাজার-সদাই, বাড়ি-ঘর সাজানো সব করবে গ্রামে। তাই তেমন টেনশন নেই দুদিন আগে গেলেই হবে। এরমধ্যে আবার মিসবাহর বিয়ে আছে।
তাছাড়া তেহরিদ আর ইশার বিয়ের জন্য তো কেনাকাটাও করতে হবে। একটা বিয়ের দায়িত্ব তো আর কম না। শপিংয়ে ২-৩ দিন চলে যাবে। এখন থেকেই সব কাজ শুরু করতে হবে। হাতে আর মাত্র ১৫ দিন সময় আছে। ২৬ তারিখ মিসবাহর বিয়ে। আয়োজন খুব বড়োও না আবার খুব ছোটও না।
★
দুদিন পর
আজকে শপিংয়ের প্রথম দিন। আজকে ইশার মেহেন্দি, হলুদ, বিয়ে এবং রিসিপশনের কাপড় কেনা হবে। সাথে ম্যাচিং করে তেহরিদের জন্য কেনা কাটা করতে হবে। আগামীকাল আসবে গহনা কিনতে আর পরশু আসবে বাড়ির অন্যদের আর বিয়েতেও তো অনেক কাপড় দেওয়া লাগবে সেসব কিনতে। একদিনে সব কেনা যাবেনা। ইশা আর তানভী এই অবস্থায় বেশিক্ষণ ঘুরতেও পারবেনা। তাদের কথা ভেবেই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। লাগলে সময় আরো ২ দিন বাড়াবে। তবে রিস্ক নেওয়া যাবে না আর নাতো ইশা আর আর তানভীকে ছাড়া কোনো শপিং হবে। কারো যেনো কোনো আফসোস না থাকে। সবারই তো বিয়ে নিয়ে স্বপ্ন থাকে। ইশার খুব ইচ্ছে ছিলো তার বিয়ের ড্রেস সে Anzara থেকে কিনবে। বিয়ের শাড়ি এবং লেহেঙ্গা আর তেহরিদের শেরওয়ানি নেওয়া হবে এখান থেকে। হলুদ, মেহেন্দি এবং আর যা যা আছে সেগুলো Bashundhara City Shopping Complex থেকে নেওয়া হবে। প্রথমে সবাই যাবে Anzara তে। Banani 11 নাম্বার রোড এর এরিয়াতেই Anzara।
তেহরিদ ইশাকে বলে সে যেনো আগে নিজের জন্য শাড়ি আর লেহেঙ্গা দেখে। ইশা বিয়েতে শাড়ি এবং রিসিপশনে লেহেঙ্গা পড়বে। অনেক গুলো শাড়ি দেখার পর ইশা একটা শাড়ি পছন্দ করে। একদম কালো খয়েরী রঙের একটি শাড়ি। তারউপর সুক্ষ্ম হাতের কাজ করা। শাড়ির কাপড়টাও বেশ ভালো এবং আরামদায়ক। এই শাড়িটাই নেওয়া হয় বিয়ের জন্য । আর বিয়ের লেহেঙ্গা তেহরিদ পছন্দ করে। সোনালী রঙের লেহেঙ্গা খুব একটা ভারি কাজ না তবে অনেক সুন্দর। ইশারও খুব পছন্দ হয়। এরপর তেহরিদের জন্য ম্যাচিং শেরওয়ানি কিনে বিল মিটিয়ে বেরিয়ে আসে সবাই।
Bashundhara City Shopping Complex___
বাকিসব কেনাকাটা এখান থেকেই করবে এখন। ইশার মেহেন্দি এবং হলুদের শাড়ি খুব দ্রুতই কেনা হয়ে যায়। এক দোকানেই পছন্দ হয়ে গেছে তাই দেরি না করে কিনে ফেলেছে। তেহরিদের হলুদের পাঞ্জাবি এবং রিসিপশনের জন্য ফরমাল শার্ট-প্যান্টও কেনা হয়। শাড়ির সাথে দোপাট্টা থাকলেও এক্সট্রা আরেকটা অর্ডার করে তেহরিদ। যেটায় লেখা থাকবে Tehrid's Bride Esha। এছাড়াও ইশার অগোচরে অনলাইনে নিকাহ নামা এবং আয়না অর্ডার করেছে। আর একটা জিনিসও অর্ডার করা হয়েছে ইশাকে গিফট করবে বলে।
তেহরিদ-ইশা আর রিফাত-তানভী Food Court এ আসে (Level 8-এ)। বাকিদের বললেও তারা আসেনি। আজকেই কাপড়ের ঝামেলা শেষ করে ফেলবে। প্রায় শেষের পথে। হলুদের ড্রেস কোর্ট ঠিক করা হয়েছে। সেগুলোর অর্ডার দেওয়া + আরো কি কি যেনো কিনতে হবে। রিফাত ৪ জনের জন্য খাবার অর্ডার করে। ঘুরে ঘুরে সবাই ক্লান্ত।
___________
রাত ৮ টায় সকলে বাসায় ফিরে। বেরিয়েছিল সকাল ১০ টায়। আসার সময় সবার জন্য খাবার কিনে আনা হয়েছে। সারাদিন এতো ঘুরাঘুরি করার পর রান্না করার মতো এনার্জি কারোরই নেই। তাই তেহরিদ কাচ্চি আর বোরহানি কিনেছে। যার যার ব্যাগ নিয়ে রুমে চলে যায়। ফ্রেশ হয়ে একটু রেস্ট করবে। এমনিতেই বেশ গরম তার মধ্যে রাস্তায় প্রচুর ধুলোবালি ছিল। গোসল না করে থাকা সম্ভব না।
তেহরিদ আর ইশার মধ্যে ঝগড়া লেগে যায়, কে আগে গোসলে যাবে এটা নিয়ে। বেশ অনেকক্ষণ কথা কাটাকাটি চলে। শেষমেশ ইশাকে কোলে করে নিয়ে ওয়াশরুমে ঢুকে যায় তেহরিদ। এতো আগে পরের চেয়ে একসাথে করুক তাই ভালো।
গোসল শেষ হলে তেহরিদ ইশাকে আগে রুমে পাঠিয়ে দেয়। আর নিজে দুজনের কাপড় ধুয়ে বারান্দায় নেড়ে দেয়। ড্রেসিং টেবিলের সামনে বসে হাত-পায়ে লোশন মেখে চুল গুলো আঁচড়ায়। এরপর বিছানায় গা এলিয়ে চোখ বন্ধ করে। তেহরিদ রুমে এসে নিজেও ইশার পাশে শুয়ে পরে।
খুব ক্লান্ত লাগছে, মনে হচ্ছে কত জনম ধরে ঘুমায় না।
রাত ১১:০০
একে একে সবাইকে ঘুম থেকে জাগিয়েছে সাবিনা সিকদার। এখন সবাই খেতে বসেছে। সব কিছু সামনে বেরে রাখা যার যার মতো নিয়ে খাচ্ছে। আজকে আর বেরে খাওয়ানোর মতো এনার্জি নেই। অল্প করে খেয়ে নেয় সবাই। কারোরই ভালো লাগছে না খেতে, চোখে প্রচুর ঘুম। প্লেট-বাটি গুলো সিঙ্কে রেখে সবাই আবার নিজ রুমে চলে আসে। চুলগুলো এলোমেলো করে বেড়ে উপর বসে আছে ইশা
" এমন পাগলের বেশে বসে আছো কেনো?"
" ভাবছি"
" কি?"
" আগে জানলে কখনোই আর বিয়ের অনুষ্ঠান করতে চাইতাম না। এত্তো ঝামেলা বাবা গো! আর কি গরম! "
" এখনই এই অবস্থা! অনুষ্ঠানের সময় কি করবে?"
" আপনাকে সব কিছু পড়িয়ে বসিয়ে রাখবো। "
" এ্যাহ! কী বলো এইসব?"
" সত্যি বলছি বেশি খারাপ লাগলে আপনার সব কিছু আমি পড়বো। আর আমার শাড়ি গহনা আপনাকে পড়াবো। "
" বুঝেছি তোমার মাথা ঠিক নেই। ঘুমাও এখন। "
"আগে আমার চুলে একটা বিনুনি গেঁথে দিন।"
" আচ্ছা তুমি বসো এখানে আমি হেয়ার ব্রাশ আর তুলি নিয়ে আসি।
ইশার চুলে খুব সুন্দর করে একটা গেঁথে দেয়। লম্বা চুল হওয়ায় হাত ব্যথা হয়ে যায়। তবুও হাসি মুখে করে দেয়। এরপর লাইট অফ করে তেহরিদও শুয়ে পরে। আর ভাবতে থাকে এই মেয়ে না সত্যি আবার তাকে এইসব পড়িয়ে দেয়। আল্লাহ ইজ্জত রক্ষা করিও। একসময় একে অপরকে জড়িয়ে ঘুমিয়ে পরে তারা।
#চলবে