#নিস্তব্ধ_রাতের_কাব্য
#লেখনীতে_মিথিলা_ইসলাম
#পর্ব_২৪ (হলুদ স্পেশাল)
.
.
.
" কেমন আছো মা আমার?"
" আলহামদুলিল্লাহ ভালো। কিন্তু আপনারা কারা?"
হঠাৎ করে ফরহাদ শেখ বলে উঠেন...
"ওনারা তোমার নানা বাড়ির লোকজন। বড় মামা, ছোট মামা, মামি, খালা আর ভাইবোন। "
" নানা বাড়ির?"
"হ্যাঁ।"
মহিলাদের থেকে একজন এগিয়ে এসে ইশার মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে থাকে। ইশা মুখ ঘুরিয়ে সবাইকে দেখে। ওনাদের আগে কখনো দেখেনি। কারণ ইশার মা পরিবারের বিরুদ্ধে গিয়ে ফরহাদ শেখ কে বিয়ে করেছিলেন। বাড়ির কেউ রাজি ছিল না এই বিয়েতে। কোনো উপায় না পেয়ে চলে এসেছেন। এরপর থেকে কারো সাথে কোনো যোগাযোগ ছিলো না। যদিও বিয়ের পর অনেকবার চেষ্টা করেছেন সবার মন গলানোর কিন্তু পারেননি। তারপর হাল ছেড়ে দিয়েছিলেন। মা-বাবার মৃতদেহ দেখতে হয়েছে আড়ালে যদি ভাইয়েরা চিনে ফেলে! তাহলে তো দূর দূর করে তাড়িয়ে দিবে। মা-বাবার মৃত্যুর পর আর কারো সাথে দেখা-সাক্ষাৎ হয়নি। বহু বছর পর সেদিন ফরহাদ শেখ জোর করে নিয়ে গেছে বিয়ের দাওয়াত দেওয়ার জন্য। ভয়ে ভয়ে গিয়েছিলেন। সবার সাথে কথা হলেও তাদের মুখ ছিল গম্ভীর, দাওয়াত রেখেছে কিনা তাও বলেনি। মুনিরা শেখ তো ভেবেই নিয়েছিলেন তারা কেউই হয়তো আসবে না। তবে তাকে অবাক করে আজকে সকলে এসেছে। ইশা সবার সাথে টুকটাক কথা বলে। আগে তো কখনো দেখেনি হঠাৎ করে তো আর সহজ হওয়া সম্ভব নয়। সময় লাগবে মিশতে।
এখন সময়টা বিকেল ০৫:০০
ইশা ঠিক করেছে বাইরে গিয়ে কিছু সুন্দর ছবি তুলে আসবে। ছোট একটা পার্ক আছে, তাদের বাড়ি থেকে ২০-২৫ মিনিট লাগে যেতে। জায়গাটা খুব সুন্দর। আর ঈদের সময় ছাড়া তেমন একটা ভিড় থাকে না। আদনানকে রাজি করিয়েছে, সে নিয়ে যাবে। বেশি মানুষ না, ইশা, আদনান, তাসনিম, ক্যামেরাম্যান আর একজন যাবে আদনানের বন্ধু। সবাই বাইকে করে রওনা দেয়।
কালকে এখান থেকে যাওয়ার পর তেহরিদ আর কল দেয়নি। হয়তো রাগ করেছে খুব। ইশা দিয়েছিল দুইবার কিন্তু ধরেনি। মেহজাবিন সিকদার এসে দেখা করে গেছেন। বাকি সবার সাথে ফোনে কথা হয়েছে। তারাও বিভিন্ন কাজে ব্যস্ত। একটা বিয়ে বাড়িতে কাজের অভাব থাকে না।
আজকাল সূর্য মামার তেজ খুব বেশি। গরমে টিকে থাকা দায়। কিন্তু আজকে আগের দিনের তুলনায় গরম তুলনামূলক কম। তারমধ্যে বাইকে প্রচুর বাতাস লাগছে। আদনানের বাইকে ইশা আর তাসনিম। বড়ো হওয়ায় বসতে কোনো অসুবিধা হয়নি। স্পটে পৌঁছানোর পর দেখে আসলেই ভিড় খুব কম। অনেকেই ঘুরে ফিরে নতুন বউকে দেখে।ইশা বিভিন্ন পোজে অনেক গুলো ছবি তুলে। এখন তাসনিম তুলছে, ইশা নিজের ফোনে সেলফি তুলে।একবার ভাবে তেহরিদকে সেন্ড করবে। কিন্তু পরবর্তীতে আর দেয় না। যেই মানুষ রাগ করে অর কল ধরেনি। তাকে কোনো ছবি টবি দিবে না।
★
ইশা ঘরে বসে আছে, নানা বাড়ির কাজিনগুলোও আছে। ফরহাদ শেখ এসে সবাইকে বলে ছেলের বাড়ির লোক আসছে সবাই যেনো গেটে দাঁড়ায়। গ্রামের বিয়েতে যারা হলুদে আসে তাদের ছোট ছোট কিছু গিফট দেওয়া হয়। তার মধ্যে থাকে, চকলেট, শ্যাম্পু, কলম, ছোট্ট চিরুনি, ফুল, হলুদ সন্ধ্যা লেখা ব্যাজ আরো অনেক কিছু।
গেটের দুই সাইডে সবাই সিরিয়াল ভাবে দাঁড়িয়ে আছে। প্রত্যেকের হাতেই কিছু না কিছু আছে। ২ মিনিট পরেই তেহরিদের বাড়ির লোকজন ঢোকে। সবাইকে গিফট দেওয়া হয়। সবাই ভিতরে এসে চেয়ারে বসে। চেয়ার গুলো আগে থেকেই সুন্দর করে সাজানো ছিলো।
অনেকেই ভেবেছিল সবার সাথে জামাইও আসবে। কিন্তু তেহরিদ আসেনি। ফরহাদ শেখ ভেবেছিলেন আসলে শ্বশুরবাড়ির আত্নীয়দের সাথে পরিচয় করিয়ে দিবেন। আজকে স্টেজটা কাঁচা ফুল দিয়ে খুব সুন্দর করে সাজানো হয়েছে। সিমরান নাবিলা এসে আগেই স্টেজে উঠেছে ছবি তুলতে।
সময় ০৭:৩০ মিনিট
এখন ইশাকে স্টেজে নেওয়া হবে। তাসনিমসহ আরো ৫জন মেয়ে মিলে ইশার মাথার উপর একটা ওড়না মেলে ধরে। ওদিকে ফুল সাউন্ডে গান বাজছে।ক্যামেরাম্যান ভিডিও নিতে শুরু করে। সবাই ইশাকে নিয়ে নাচতে নাচতে ঘর থেকে বের হয়ে স্টেজে উঠে। উঠার পর কিছু সময় ফটোশুট চলে। সবার আগে মা-বাবাকে বলায় হলুদ লাগানোর জন্য। নীলকে নিয়ে মুনিরা শেখ এবং ফরহাদ শেখ স্টেজে উঠেন। প্রথমে গাদাঁফুলে একটু হলুদ নিয়ে হাতের উপরের পিঠে লাগিয়ে দেন। কেক,পুডিং, মিষ্টি, ফল আরো অনেক কিছু খুব সুন্দর করে ডেকোরেশন করে ইশার সামনে একটা টেবিলে রাখা হয়েছে।
ছেলের বাড়ির লোকজনের হলুদ দেওয়া শেষ। এখন সবাই বিরিয়ানি খাচ্ছে। ইশা স্টেজে সোফায় বসা আর সিমরান, নাবিলা তার দুইপাশে বসে নিজেরাও খাচ্ছে ইশাকেও খাইয়ে দিচ্ছে। খাওয়া হলেই সবাই আবার ফিরে যাবে তারপর আবার মেয়ের বাড়ির লোকজন যাবে হলুদ দেওয়ার জন্য।
খাওয়া শেষ হতে হতে আরো কয়েকজন মানুষ আসে তেহরিদদের বাসা থেকে। সাথে একজন বোরকা পরা লম্বা মহিলাও এসেছে। এখন এসেছে তেহরিদের বন্ধুরা আর তাদের বউ বাচ্চা। তখন একসাথে আসেনি দুইজন ঢাকা ছিল, তাদের আসতে দেরি হয়েছে। ইশার কেনো যেনো বোরখা পরা মহিলাটাকে সন্দেহ হচ্ছে। হাত-পা, চোখ সব ঢেকে রেখেছে। কিন্তু একটু পর পর দেখা যাচ্ছে তেহরিদের বন্ধরা তার ঘাড়ে হাত রেখে কথা বলছে, হাত ধরছে। আর তাদের বউরা কিচ্ছু বলছে না।সিমরান নাবিলা নেমে যায় খাওয়া শেষ করে।
তেহরিদের বন্ধু রিয়াজ আর তার বউ বাচ্চা স্টেজে উঠে হলুদ দিতে। একে একে মুশফিক, সারোয়ার, মেহরাজ সবাই তাদের বউ নিয়ে এসে হলুদ লাগিয়ে যায়। এবার বোরকা পরা মহিলাটা একাই আসে।এসে ইশার পাশ ঘেঁষে বসে। আলতো করে হাতের উপর হলুদ লাগিয়ে দেয়। বডি স্মেল নাকে আসার পরেই ইশা শিউর হয়ে যায় এটা তেহরিদ।
স্টেজের সামনেই তাসনিম আর কিছু মেয়ে কাজিন দাঁড়িয়ে আছে। ইশা তাসনিমকে ইশারা করে তাসনিম বুঝতে পারে না। ইশা আবার ইশারা করে এবার বুঝতে পেরে সকল নিয়ে স্টেজে উঠে তেহরিদকে ঘিরে ধরে তার বোরখা খুলে ফেলে। সবাই তেহরিদকে দেখে অবাক হয়, জামাই আজ এভাবে এসেছে! সবার তাকানো দেখে তেহরিদ লজ্জা পায়।
" তা স্যার আজ আসলো যে? সবার সামনে মুখ খুলে আসতে লজ্জা পায় নাকি?"
তেহরিদ ফোস করে দম ফেলে বলে...
" আমার কোনো দোষ নেই আমি এভাবেই আসতে চেয়েছিলাম।কিন্তু ওই শয়তান গুলোই জোর করে এসব পরিয়ে নিয়ে এসেছে। ইসসস সবাই কি ভাবছে!"
" আমার প্রথম থেকেই সন্দেহ হচ্ছিল। "
" আজকে সব ক'টাকে বউ ছাড়া রাখবো। ভেবেছিলাম রাতে আলাদা আলাদা রুম দিবো কিন্তু এখন আর দিবো না। আমিও যেমন বউ ছাড়া থাকবো তেমন ওদেরও বউ ছাড়া রাখবো। "
" আপনি দিন ঠোঁট কাটা হয়ে যাচ্ছেন। আগে তো এমন ছিলেন না!''
" তখন তো তোমার আমার মাঝে প্রেম ছিল না বউ।"
" এখন আছে?"
"হ্যাঁ"
ফরহাদ শেখ মেয়ে জামাইকে শশুর বাড়ির আত্নীয়দের সাথে পরিচয় করিয়ে দেন। তেহরিদও সবার সাথে পরিচিত হয়, কথা বলে। মামা-মামিরা, খালা সবাই জোর করে হাতে সালামি গুঁজে দেন। ঘরে নিয়ে একদফা জামাই আপ্যায়ন করা হয়। তেহরিদ সবাইকে জানায় সে ইশাকে সাথে করে নিয়ে যেতে যায়। হলুদ শেষ হলেই আবার দিয়ে যাবে। কেউই আপত্তি করেনা নিয়ে যেতে বলে। তেহরিদ ইশার হাত ধরে ঘর থেকে বের হয়, তাদের বাড়ির অনেকেই চলে গেছে। একটা প্রস্তুতি তো নিতে হবে। তবে এখনো কয়েকজন আছে। তেহরিদ ইশা বিদায় হাঁটতে শুরু করে। ৫ মিনিট পরেই ইশার বাড়ির লোকজন বের হবে।
তেহরিদের বন্ধু মুশফিক তেহরিদকে বলে…
" খচ্চর বউটাকে কি হাঁটিয়ে নিয়ে যাবি?"
" তো কি করবো? আর বাড়ি তো সামনেই।"
" ছিহ এই তোর ভালোবাসার স্রি? এমন বডি বানিয়ে কি লাভ যদি বউকেই কোলে নিতে না পারিস?"
" তোর কি মনে হয়, আমি আমার বউকে কোলে নিতে পারি না?"
" না পারিস না।"
" ওকে ওয়েট।"
এই বলে তেহরিদ ইশাকে কোলে নিয়ে হাঁটতে শুরু করে। ইশা অনেকবার বলে তাকে নামিয়ে দিতে কিন্তু তেহরিদ কোল থেকে নামায় না। কোলে করে নিয়েই বাড়ির গেটের সামনে এসে নামিয়ে দেয়। ইশাকে দেখে সবাই খুব খুশি হয়। মেহজাবিন সিকদার কাঁধ জড়িয়ে ধরে ঘরে নিয়ে যান। তেহরিদও যায় পিছু পিছু।
ইশা মেহজাবিন সিকদারের পাশে বসে আছে। অনেকের সাথে পরিচয় করিয়েছেন। ইশার মেহজাবিন সিকদারের একটা কথা হৃদয় ছুঁয়ে গেছে। তিনি ইশাকে দেখিয়ে সবাইকে বলেছেন
" সবাই জানে ও আমার ছেলের বউ। কিন্তু আমি জানি ও আমার মেয়ে, আমার বন্ধু। "
এমন ক'জন শাশুড়ি আছে? যে ছেলের বউকে মেয়ে বলে পরিচয় করিয়ে দেয়। আর ইশা খুব ভালো করেই জানে মেহজাবিন সিকদার অকে ঠিক কতটা ভালোবাসে।
হলুদ দেওয়া শুরু হবে। তেহরিদ আর ইশা একই ওড়নার নিচে হাত ধরে পাশাপাশি দাঁড়িয়ে আছে। সবাই দুজনকে হলুদ লাগিয়ে দেয়। খুব মজা হয় সেখানে। তেহরিদের দুজন বন্ধু কালো বোরখা পরেছে।মুখ পাউডার সাদা করে ঠোঁটে লাল লিপস্টিক দিয়েছে। তারপর " Fevicol Se" গানে নাচে। সবার নাচ দেখে হাসতে হাসতে গড়াগড়ি খাওয়ার মতো অবস্থা।আবার একজন শাড়ি পরে আর একজন শার্ট আর হাফ প্যান্ট পরে "chuttamalle" গানে নাচে। অনেক ছবি তোলা হয়, ভিডিও করা হয়। রাত সাড়ে ১২ টায় তেহরিদ ইশাকে তার বাড়িতে দিয়ে আসে। এতক্ষণ দুইজন খুব ভালো সময় কাটিয়েছে। দুই বাড়িতেই রাত ২ টা পর্যন্ত গান-বাজনা হয়। এরপর সব নীরব।
#চলবে