“তোর দাদা তোকে সবচেয়ে বেশি যে মানুষটার কাছ থেকে লুকিয়েছিল... সেই মানুষটাই এখন তোর পাশে দাঁড়িয়ে আছে।”
কথাটা শুনে মায়ার চোখ স্থির হয়ে গেল।
তার দৃষ্টি ধীরে ধীরে রায়ানের দিকে গেল।
রায়ানও তাকিয়ে আছে তার দিকে।
কয়েক সেকেন্ড কেউ কোনো কথা বলল না।
তারপর মায়া খুব ধীরে বলল,
—“রায়ান... তুমি?”
রায়ান মাথা নাড়ল।
—“আমি কিছু করিনি।”
মায়া ঠান্ডা গলায় বলল,
—“কিন্তু লোকটা বলল—”
—“লোকটা মিথ্যা বলছে।”
লোকটা হেসে উঠল।
—“মিথ্যা?”
সে পকেট থেকে একটা পুরোনো ছবি বের করল।
ছবিটা মাটিতে ছুড়ে দিল।
আরমান ছবিটা তুলে নিল।
ছবিতে—
একজন তরুণ রায়ানের বাবা।
তার পাশে মায়ার দাদা।
আর তাদের মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে আরও একজন মানুষ।
আরমান ছবিটা দেখে থমকে গেল।
—“এই লোকটা...”
মায়া জিজ্ঞেস করল,
—“কে?”
আরমান ধীরে বলল,
—“জাহিদ রহমান।”
মায়ার বুক ধক করে উঠল।
—“যার ছবি আমরা নিশীথের বাড়িতে পেয়েছিলাম?”
—“হ্যাঁ।”
রায়ান ছবিটার দিকে তাকিয়ে রইল।
—“আমি এই ছবিটা আগে কখনো দেখিনি।”
লোকটা হেসে বলল,
—“কারণ তোকে দেখানো হয়নি।”
রায়ান এগিয়ে গেল।
—“আমার বাবার সঙ্গে জাহিদ রহমানের সম্পর্ক কী ছিল?”
লোকটা উত্তর দিল না।
আরমান তার কলার চেপে ধরল।
—“বল!”
লোকটা হেসে বলল,
—“তোমরা সত্যিই কিছুই জানো না।”
মায়া ধীরে ধীরে রায়ানের কাছে গেল।
—“তুমি আমাকে একটা কথা বলবে?”
—“বল।”
—“তোমার বাবা কি আমার দাদাকে চিনতেন?”
রায়ান কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল,
—“হ্যাঁ।”
—“আর জাহিদ রহমানকে?”
—“হ্যাঁ।”
—“আর আমার পরিবারের সবকিছু?”
রায়ান দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
—“কিছুটা।”
মায়ার চোখে কষ্ট ফুটে উঠল।
—“তুমি কতটা জানো?”
—“সব না।”
—“কিন্তু আমার চেয়ে বেশি।”
রায়ান মাথা নিচু করল।
—“হ্যাঁ।”
মায়া একটু দূরে সরে গেল।
—“তাহলে এতদিন আমাকে বোকা বানিয়েছ।”
—“না।”
—“তাহলে কী?”
রায়ান তার দিকে তাকিয়ে বলল,
—“আমি শুধু চাইনি তুই ভয় পাস।”
মায়া তিক্ত হেসে বলল,
—“তুমি কি জানো, সত্যিটা না জানার ভয়টা কেমন?”
রায়ান চুপ।
মায়া বলল,
—“প্রতিদিন মনে হয়েছে আমার জীবনের কোথাও একটা বিশাল ফাঁক আছে। সবাই কিছু জানে, শুধু আমি জানি না।”
রায়ান ধীরে বলল,
—“আমি জানি।”
—“না। তুমি জানো না।”
—“জানি।”
তার কণ্ঠ এবার কেঁপে উঠল।
—“কারণ আমিও একইভাবে বড় হয়েছি।”
মায়া থেমে গেল।
—“মানে?”
রায়ান চোখ নামিয়ে বলল,
—“আমার বাবাও আমাকে সব বলেনি।”
এমন সময় সামির হঠাৎ বলল,
—“সবাই একটু থামবে?”
সবাই তার দিকে তাকাল।
সামির নিজের পেট চেপে ধরে বলল,
—“আমার একটা গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা হয়েছে।”
আরমান বিরক্ত হয়ে বলল,
—“এখন কী সমস্যা?”
—“ক্ষুধা পেয়েছে।”
মায়া চোখ বড় করে বলল,
—“এই অবস্থায় তোমার ক্ষুধা পেয়েছে?”
সামির খুব স্বাভাবিকভাবে বলল,
—“রহস্য সমাধান করতে গেলেও পেট তো রহস্য বোঝে না।”
রায়ান হেসে ফেলল।
মায়া মাথায় হাত দিয়ে বলল,
—“আমার চারপাশের সবাই পাগল।”
সামির বলল,
—“আমাদের সঙ্গে থাকলে তুমিও হয়ে যাবে।”
মায়া বলল,
—“আমি আগে থেকেই একটু ছিলাম।”
আরমান মুচকি হেসে বলল,
—“সেটা ঠিক।”
মায়া চোখ রাঙাল।
—“ভাই!”
—“ঠিক আছে, চুপ।”
এই ছোট্ট হাসির মুহূর্তটা কয়েক সেকেন্ডের জন্য পরিবেশটা হালকা করে দিল।
কিন্তু পরের মুহূর্তেই—
ঠাস!
বাইরে গুলির শব্দ।
সবাই আবার সতর্ক হয়ে গেল।
আরমান জানালার পাশে গিয়ে তাকাল।
—“আরও লোক এসেছে।”
রায়ান মায়ার সামনে দাঁড়াল।
—“পেছনে যাও।”
মায়া বলল,
—“আমি এবার আর লুকাব না।”
—“এটা সাহস দেখানোর সময় না।”
—“তুমি আহত।”
—“আমি সামলাতে পারব।”
—“সবসময় নিজের কথা ভাবো না।”
রায়ান একটু থেমে মৃদু হেসে বলল,
—“তুমি আমার জন্য চিন্তা করছ?”
মায়া সঙ্গে সঙ্গে মুখ ঘুরিয়ে বলল,
—“না। তুমি মরলে ঝামেলা বাড়বে।”
রায়ান হাসল।
—“ঠিক আছে।”
মায়া মনে মনে বলল,
“মিথ্যাবাদী...”
কিন্তু তার নিজের হৃদয়ও যেন তাকে মিথ্যা বলতে পারল না।
আক্রমণকারীরা বাড়ির দরজার কাছে চলে এসেছে।
আরমান বলল,
—“পেছনের দরজা দিয়ে বের হতে হবে।”
মায়ার মা তার হাত ধরে বললেন,
—“চল মা।”
মায়া হঠাৎ থেমে গেল।
—“মা।”
—“হুম?”
—“তুমি কি জানো আমার দাদা কোথায়?”
তার মা কিছুক্ষণ চুপ করে থাকলেন।
তারপর বললেন,
—“হ্যাঁ।”
মায়ার চোখ বড় হয়ে গেল।
—“কোথায়?”
মা ধীরে বললেন,
—“তুই যাকে সবচেয়ে বেশি খুঁজছিস... সে তোর কাছেই আছে।”
মায়া হতভম্ব।
—“মানে?”
মা উত্তর দেওয়ার আগেই বাইরে থেকে কারও চিৎকার—
“ওদের বের হতে দিও না!”
রায়ান বলল,
—“এখন কথা বলার সময় নেই।”
সবাই পেছনের দরজার দিকে ছুটল।
বাড়ির পেছন দিয়ে বের হয়ে তারা নদীর ধারে এসে পৌঁছাল।
কুয়াশা আরও ঘন হয়েছে।
মায়া হাঁপাতে হাঁপাতে দাঁড়াল।
রায়ান তার পাশে।
—“ঠিক আছ?”
—“হ্যাঁ।”
—“মিথ্যা।”
—“তুমি এতবার এই কথা বলো কেন?”
—“কারণ তুমি বারবার মিথ্যা বলো।”
মায়া কিছু বলার আগেই তার চোখ নদীর ওপারে আটকে গেল।
ওপারে একজন মানুষ দাঁড়িয়ে।
কালো চাদর গায়ে।
মুখ দেখা যাচ্ছে না।
কিন্তু হাতে একটা লাঠি।
মায়ার বুক কেঁপে উঠল।
—“ওই লোকটা...”
আরমান তাকাল।
তার মুখ মুহূর্তেই বদলে গেল।
—“অসম্ভব...”
রায়ান বলল,
—“কী হয়েছে?”
আরমান উত্তর দিল না।
লোকটা ধীরে ধীরে নদীর ধারে এগিয়ে এল।
তারপর কুয়াশার ভেতর থেকে মুখটা দেখা গেল।
মায়ার চোখ বড় হয়ে গেল।
সে ফিসফিস করে বলল—
“দাদা...”
লোকটা মৃদু হাসল।
—“অনেক বড় হয়ে গেছিস, মেহরিন।”
মায়ার চোখ দিয়ে পানি গড়িয়ে পড়ল।
—“আপনি সত্যিই আমার দাদা?”
লোকটা মাথা নাড়ল।
—“হ্যাঁ।”
মায়া এক পা এগিয়ে গেল।
কিন্তু রায়ান আবার তার হাত ধরে ফেলল।
—“থামো।”
মায়া রাগে বলল,
—“এবার কেন?”
রায়ান বৃদ্ধটির দিকে তাকিয়ে বলল,
—“কারণ উনি আমাদের কাছে আসছেন না।”
মায়া তাকাল।
সত্যিই—
বৃদ্ধটি নদীর ওপারে দাঁড়িয়ে।
তাদের মাঝখানে নদী।
আর তার পেছনে আরও কয়েকজন মানুষ।
মায়ার দাদা ধীরে বললেন,
—“মেহরিন, তুই আমার কাছে আসবি না।”
—“কেন?”
—“কারণ তোর পাশে যে দাঁড়িয়ে আছে...”
তিনি রায়ানের দিকে তাকালেন।
—“তার বাবাকে আমি বিশ্বাস করি না।”
রায়ানের চোখ শক্ত হয়ে গেল।
—“আমার বাবা কী করেছে?”
বৃদ্ধটি বললেন,
—“তুই কি সত্যিই জানতে চাস?”
—“হ্যাঁ।”
—“তাহলে কাল রাতে পুরোনো মসজিদের পেছনে আয়।”
আরমান চিৎকার করল,
—“দাদা! আপনি কোথায় যাচ্ছেন?”
বৃদ্ধটি ঘুরে দাঁড়ালেন।
তারপর শেষবারের মতো মায়ার দিকে তাকিয়ে বললেন—
“আর কাউকে সঙ্গে আনবি না। বিশেষ করে রায়ানকে নয়।”
মায়া হতভম্ব।
—“কিন্তু কেন?”
বৃদ্ধটি কোনো উত্তর দিলেন না।
কুয়াশার ভেতর ধীরে ধীরে অদৃশ্য হয়ে গেলেন।
মায়া স্থির দাঁড়িয়ে রইল।
রায়ান তার হাত ছেড়ে দিল।
কিছুক্ষণ পর মায়া ধীরে বলল,
—“তুমি আমার সঙ্গে যাবে না।”
রায়ান তাকাল।
—“যদি তুই না চাস, যাব না।”
মায়া মাথা নাড়ল।
—“না।”
তার চোখে অদ্ভুত দৃঢ়তা।
—“আমি এবার একাই যাব।”
রায়ান কিছু বলতে যাচ্ছিল।
মায়া তাকে থামিয়ে দিল।
—“কারণ আমার জীবনের সবচেয়ে বড় সত্যিটা আমাকে নিজেকেই জানতে হবে।”
সে নদীর দিকে তাকিয়ে বলল—
“কিন্তু একটা কথা মনে রেখো, রায়ান...”
রায়ান তাকাল।
—“আমি তোমাকে এখনও বিশ্বাস করি না।”
একটু থেমে মায়া খুব নিচু স্বরে বলল—
“তবুও কেন জানি, তোমাকে ছেড়ে যেতে পারছি না।”
রায়ানের চোখে অদ্ভুত এক হাসি ফুটে উঠল।
কিন্তু ঠিক তখনই—
তার ফোন বেজে উঠল।
স্ক্রিনে একটা অচেনা নম্বর।
রায়ান কল রিসিভ করল।
ওপাশ থেকে শুধু একটা কণ্ঠ—
“রায়ান, মেহরিনকে বাঁচাতে চাইলে আজ রাতেই তোমার বাবাকে খুঁজে বের করো।”
রায়ানের মুখের হাসি মুহূর্তেই মিলিয়ে গেল।
—“কে বলছেন?”
ওপাশ থেকে উত্তর এলো—
“যে মানুষটা তোমার বাবার সত্যিটা জানে।”
কল কেটে গেল।
রায়ান ফোনের দিকে তাকিয়ে রইল।
আর মায়া তার মুখ দেখে বুঝতে পারল—
নতুন কোনো বিপদ শুরু হয়েছে।