ফন্ট সাইজ:
থিম:
নিশীথের ওপারে তুমি

১৯তম পর্ব

লেখক: Adiba

রায়ানের ফোনটা এখনও তার হাতে।

ওপাশের কণ্ঠটা যেন বারবার কানে বাজছে—

“মেহরিনকে বাঁচাতে চাইলে আজ রাতেই তোমার বাবাকে খুঁজে বের করো।”

রায়ানের মুখ গম্ভীর।

মায়া কিছুক্ষণ তার দিকে তাকিয়ে থেকে বলল,

—“কে ফোন করেছিল?”

রায়ান উত্তর দিল না।

—“রায়ান?”

—“কেউ না।”

মায়া চোখ সরু করল।

—“কেউ না আবার ফোন করে?”

—“ভুল নম্বর।”

মায়া কয়েক সেকেন্ড চুপ করে থেকে বলল,

—“তুমি আমাকে মিথ্যা বলছ।”

রায়ান দীর্ঘশ্বাস ফেলল।

—“হ্যাঁ।”

—“তাহলে সত্যিটা বলো।”

রায়ান তার দিকে তাকাল।

—“ওরা বলেছে, আমাকে আমার বাবাকে খুঁজে বের করতে হবে।”

মায়ার মুখ ফ্যাকাশে হয়ে গেল।

—“কেন?”

—“তোর জন্য।”

—“আমার জন্য আবার কী?”

রায়ান উত্তর দেওয়ার আগেই আরমান এসে দাঁড়াল।

—“কার ফোন?”

রায়ান ফোনটা তাকে দিল।

আরমান নম্বরটা দেখে বলল,

—“এই নম্বরটা...”

—“চেনো?”

—“না। কিন্তু এটা সাধারণ নম্বর নয়।”

সামির ফোনটা নিয়ে কয়েক সেকেন্ড দেখে বলল,

—“লোকেশন লুকানো।”

মায়া বলল,

—“মানে?”

সামির খুব গম্ভীর মুখে বলল,

—“মানে লোকটা আমাদের থেকে বেশি চালাক।”

মায়া বলল,

—“আপনি কি একটু সহজ বাংলায় কথা বলতে পারেন?”

সামির বলল,

—“মানে লোকটা পাকা ধুরন্ধর।”

মায়া মাথা নাড়ল।

—“এটা বুঝেছি।”

রায়ান হেসে ফেলল।

মায়া তার দিকে তাকিয়ে বলল,

—“তুমি হাসছ কেন?”

—“তুমি যখন রাগ করো তখন তোমাকে খুব সুন্দর লাগে।”

মায়া থমকে গেল।

তারপর চোখ বড় করে বলল,

—“এই পরিস্থিতিতে এসব বলার দরকার আছে?”

রায়ান কাঁধ ঝাঁকাল।

—“আমার তো মনে হলো দরকার আছে।”

মায়া মুখ ঘুরিয়ে নিল।

কিন্তু তার ঠোঁটের কোণে অজান্তেই ছোট্ট একটা হাসি ফুটে উঠল।

রাত প্রায় বারোটা।

চারপাশ নিস্তব্ধ।

পুরোনো মসজিদের পেছনের জায়গাটা অন্ধকারে ঢাকা।

মায়া একা আসার কথা ছিল।

কিন্তু স্বাভাবিকভাবেই—

সে একা আসেনি।

রায়ান একটু দূরে দাঁড়িয়ে।

আরমান গাছের আড়ালে।

সামির আরও দূরে।

মায়া চারদিকে তাকিয়ে বিরক্ত হয়ে বলল,

—“আমি বলেছিলাম কেউ আসবে না!”

রায়ান গাছের আড়াল থেকে বেরিয়ে বলল,

—“আমি তো আসিনি।”

মায়া ভ্রু কুঁচকে বলল,

—“তুমি দাঁড়িয়ে আছ কেন?”

—“হাঁটতে হাঁটতে এখানে চলে এসেছি।”

—“মিথ্যাবাদী।”

—“তুমি তো বলেছিলে আমাকে বিশ্বাস করো না।”

—“তাই বলে তুমি আমার পেছনে গোয়েন্দাগিরি করবে?”

রায়ান মৃদু হাসল।

—“তুমি বিপদে পড়লে আমি কীভাবে বাড়িতে বসে থাকি?”

মায়া কিছু বলতে পারল না।

তখন আরমান গাছের আড়াল থেকে বেরিয়ে এল।

—“তোদের ঝগড়া শেষ হয়েছে?”

মায়া মাথায় হাত দিল।

—“আপনারাও?”

সামির দূর থেকে বলল,

—“আমাকেও গুনে নিও।”

মায়া চিৎকার করে বলল,

—“আমি একা থাকতে বলেছিলাম!”

সামির বলল,

—“আমরা তোকে একা থাকতে দিইনি।”

—“কেন?”

—“কারণ তুই একা থাকলে পাঁচ মিনিটের মধ্যে বিপদ খুঁজে বের করিস।”

রায়ান বলল,

—“এটা সত্যি।”

মায়া হাত কোমরে দিয়ে দাঁড়াল।

—“তোমরা সবাই মিলে আমাকে পাগল বানিয়ে ছাড়বে।”

আরমান মুচকি হেসে বলল,

—“আমাদের পরিবারে এটাই নিয়ম।”

মায়া বিড়বিড় করল,

—“নিয়মটা বাতিল করা দরকার।”

হঠাৎ দূর থেকে পায়ের শব্দ।

সবাই চুপ।

কুয়াশার ভেতর একটা ছায়া দেখা গেল।

মায়ার দাদা।

তিনি ধীরে ধীরে এগিয়ে এলেন।

—“আমি বলেছিলাম একা আসতে।”

মায়া বলল,

—“আমি একা এসেছিলাম।”

রায়ান ফিসফিস করে বলল,

—“ওটা প্রযুক্তিগতভাবে মিথ্যা।”

মায়া পিছনে তাকিয়ে চোখ রাঙাল।

—“চুপ।”

দাদা রায়ানের দিকে তাকালেন।

তার চোখ কঠিন হয়ে গেল।

—“তুই এখানে কেন?”

রায়ান বলল,

—“মায়াকে একা ছাড়তে পারিনি।”

—“তুই জানিস না, তোর উপস্থিতি ওর জন্য কতটা বিপজ্জনক।”

রায়ান বলল,

—“জানি।”

—“তবুও এসেছিস?”

—“হ্যাঁ।”

দাদা কিছুক্ষণ তার দিকে তাকিয়ে রইলেন।

তারপর মায়ার দিকে তাকালেন।

—“তুই ওকে বিশ্বাস করিস?”

মায়া থেমে গেল।

তারপর বলল,

—“পুরোপুরি না।”

রায়ানের চোখে হালকা কষ্ট ফুটে উঠল।

মায়া সেটা লক্ষ্য করল।

—“কিন্তু...”

দাদা বললেন,

—“কিন্তু?”

মায়া ধীরে বলল,

—“ওর ওপর আমার বিশ্বাস না থাকলেও... ওর পাশে থাকলে আমি নিরাপদ বোধ করি।”

রায়ান তার দিকে তাকিয়ে রইল।

দাদার মুখ গম্ভীর হয়ে গেল।

—“এই অনুভূতিটাই সবচেয়ে বিপজ্জনক।”

মায়া অবাক।

—“কেন?”

—“কারণ তোর মা-ও একসময় এই মানুষটার পরিবারের ওপর বিশ্বাস করেছিল।”

রায়ান বলল,

—“আমার পরিবারের ওপর?”

দাদা মাথা নাড়লেন।

—“হ্যাঁ।”

দাদা একটা পুরোনো বেঞ্চে বসলেন।

—“আজ থেকে প্রায় পঁচিশ বছর আগে, তোর মা আর রায়ানের বাবা খুব কাছের বন্ধু ছিল।”

রায়ান অবাক।

—“আমার বাবা আর মায়ার মা?”

—“হ্যাঁ।”

মায়া তাকিয়ে রইল।

—“তাহলে?”

দাদা বললেন,

—“তোর মা জানত, নিশীথের সম্পত্তির আসল উত্তরাধিকারী কে।”

—“আমি?”

—“হ্যাঁ।”

মায়া স্তব্ধ।

দাদা বললেন,

—“কিন্তু সে জানত আরও একটা বিষয়।”

—“কী?”

—“তোর জন্মের আগেই কেউ তোর জীবন শেষ করার পরিকল্পনা করেছিল।”

মায়ার শরীর ঠান্ডা হয়ে গেল।

—“কে?”

দাদা এবার রায়ানের দিকে তাকালেন।

রায়ান চমকে উঠল।

—“আমার বাবা?”

দাদা বললেন,

—“আমি নাম বলিনি।”

রায়ান উঠে দাঁড়াল।

—“তাহলে সরাসরি বলুন।”

দাদা কিছুক্ষণ চুপ থেকে বললেন,

—“তোর বাবা তখন কারও আদেশ পালন করছিল।”

—“কার?”

দাদা উত্তর দিলেন না।

মায়া এবার বলল,

—“আমার জন্মের আগে থেকেই আমাকে মারার পরিকল্পনা ছিল?”

—“হ্যাঁ।”

—“কেন?”

—“কারণ তুই বড় হলে এমন একটা সত্য জানতে পারতি, যেটা কয়েকটা শক্তিশালী পরিবারের জন্য বিপজ্জনক ছিল।”

মায়া হতভম্ব।

—“আমি কী জানতাম?”

দাদা বললেন,

—“তুই কিছুই জানতি না।”

—“তাহলে?”

—“তোর জন্মের সঙ্গে একটা নথি তৈরি হয়েছিল।”

মায়া বলল,

—“কী নথি?”

দাদা ধীরে বললেন,

“একটা উত্তরাধিকার নথি, যেখানে লেখা ছিল—তুই প্রাপ্তবয়স্ক হলে নিশীথের পুরো সাম্রাজ্যের মালিক হবি।”

মায়া স্তব্ধ।

রায়ান ধীরে বলল,

—“আর সেই কারণেই?”

দাদা মাথা নাড়লেন।

—“হ্যাঁ।”

হঠাৎ দাদা পকেট থেকে একটা পুরোনো চাবি বের করলেন।

মায়ার হাতে দিলেন।

—“এটা রাখ।”

মায়া অবাক।

—“এটা কী?”

—“নিশীথের পুরোনো লাইব্রেরির চাবি।”

আরমান বলল,

—“লাইব্রেরি তো বহু বছর ধরে বন্ধ।”

দাদা বললেন,

—“সেখানে তোর মায়ের লেখা শেষ চিঠিটা আছে।”

মায়ার চোখ বড় হয়ে গেল।

—“মায়ের?”

—“হ্যাঁ।”

—“চিঠিতে কী আছে?”

দাদা মায়ার চোখের দিকে তাকিয়ে বললেন,

—“তোর জন্মের আসল সত্য।”

মায়া চাবিটা শক্ত করে ধরল।

—“আমাকে সেখানে নিয়ে চলো।”

দাদা মাথা নাড়লেন।

—“আমি যাব না।”

—“কেন?”

—“কারণ আমাকে দেখলে যারা তোকে অনুসরণ করছে, তারা বুঝে যাবে তুই কোথায় যাচ্ছিস।”

রায়ান বলল,

—“আমি ওকে নিয়ে যাব।”

দাদা তীক্ষ্ণ চোখে তাকালেন।

—“তুই?”

—“হ্যাঁ।”

—“তোর বাবা জানতে পারলে?”

রায়ান বলল,

—“আমার বাবার সঙ্গে আমার সম্পর্কের হিসাব পরে হবে।”

মায়া তার দিকে তাকাল।

রায়ান ধীরে বলল,

—“এখন শুধু মায়াকে নিরাপদ রাখতে চাই।”

দাদা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।

—“তাহলে একটা কথা মনে রাখিস।”

—“কী?”

—“লাইব্রেরির দরজা খুললে তুই যা দেখবি, তার পর থেকে তোর জীবন আর আগের মতো থাকবে না।”

সবাই চলে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে।

মায়া একটু দূরে দাঁড়িয়ে।

রায়ান তার কাছে এসে বলল,

—“ভয় লাগছে?”

—“হ্যাঁ।”

—“চাইলে যেও না।”

মায়া মাথা নাড়ল।

—“না। এবার যাব।”

—“আমি থাকব।”

মায়া তার দিকে তাকাল।

—“তুমি থাকলে আমার ভয় একটু কম লাগে।”

রায়ান মুচকি হাসল।

—“তাহলে একটা কথা বলি?”

—“কী?”

—“আজ প্রথমবার তুমি স্বীকার করলে যে আমার ওপর একটু ভরসা করো।”

মায়া মুখ গম্ভীর করে বলল,

—“একটু।”

—“একটু মানে কত?”

—“এক ফোঁটা।”

—“এক ফোঁটা?”

—“হ্যাঁ।”

রায়ান বলল,

—“আমি সেই এক ফোঁটা দিয়েই সমুদ্র বানিয়ে ফেলব।”

মায়া হেসে ফেলল।

—“তুমি অসম্ভব।”

রায়ান বলল,

—“তোমার জন্য।”

মায়া কিছু বলার আগেই—

দূরে একটা গাড়ির হেডলাইট জ্বলে উঠল।

আরমান চিৎকার করল—

—“সবাই নিচু হও!”

গাড়িটা থামল।

দরজা খুলল।

একজন লোক নামল।

তার হাতে একটা খাম।

সে দূর থেকেই খামটা মাটিতে ছুড়ে দিল।

তারপর গাড়িতে উঠে চলে গেল।

রায়ান খামটা তুলে নিল।

ভেতরে একটা ছবি।

ছবিতে—

রায়ানের বাবা।

তার পাশে—

মায়ার মা।

আর তাদের সামনে দাঁড়িয়ে আছে—

মায়ার দাদা।

ছবির পেছনে মাত্র একটা লাইন লেখা—

“তোমরা যাকে খুঁজছ, সে তোমাদের সবার কাছেই আছে।”

মায়া ছবিটা হাতে নিয়ে কাঁপতে কাঁপতে বলল,

—“কাছেই আছে মানে?”

আরমান ছবির দিকে তাকিয়ে হঠাৎ স্থির হয়ে গেল।

—“না...”

রায়ান বলল,

—“কী হয়েছে?”

আরমান ধীরে ধীরে ছবির এক কোণ দেখাল।

সেখানে দাঁড়িয়ে থাকা একজন মানুষকে দেখে তার মুখ ফ্যাকাশে হয়ে গেল।

—“এই লোকটা...”

মায়া তাকাল।

—“কে?”

আরমান খুব নিচু গলায় বলল—

“সামির।”

সবাই একসঙ্গে সামিরের দিকে তাকাল।

সামির স্থির দাঁড়িয়ে।

তার মুখে কোনো ভাব নেই।

মায়া ধীরে বলল—

—“সামির... তুমি এই ছবিতে কেন?”

সামির কোনো উত্তর দিল না।

শুধু পকেট থেকে একটা পুরোনো লকেট বের করল।

লকেটটা ছবির পেছনে থাকা চিহ্নের সঙ্গে হুবহু মিলে যায়।

তারপর সামির ধীরে বলল—

“কারণ তোমরা যেটাকে আমার নাম ভাবছ... সেটা আমার আসল নাম নয়।”

মায়ার চোখ বড় হয়ে গেল।

রায়ান এক পা পিছিয়ে গেল।

আরমান ফিসফিস করে বলল—

“তাহলে তুই কে?”

সামির ধীরে মাথা তুলল।

আর তার উত্তর—

“আমি সেই মানুষ, যাকে তোমরা সাত বছর ধরে মৃত ভেবেছ।”

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ১৯তম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন