#প্রনয়ের_প্রলয়
#মেহরিমা_সারা
পর্বঃ৩
সেদিন গভীর রাতে আদির ফোনে একটি অপরিচিত নম্বর থেকে কল আসে। এত রাতে অচেনা নম্বর দেখে প্রথমে একটু দ্বিধায় পড়লেও শেষ পর্যন্ত কলটি রিসিভ করে। ওপাশ থেকে ভেসে আসে এমন এক খবর, যা মুহূর্তের মধ্যে তার বুকের ভেতরটা শূন্য করে দেয়।
চট্টগ্রাম থেকে ফেরার পথে আরমান চৌধুরীর ভয়াবহ অ্যাক্সিডেন্ট হয়েছে। স্থানীয় লোকজন দ্রুত তাঁকে কাছাকাছি একটি হাসপাতালে ভর্তি করিয়েছে। দুর্ঘটনার ঠিক আগে শেষবার কাজের বিষয়ে আদির সঙ্গেই কথা হয়েছিল বলে ফোনের ডায়াল লিস্টে প্রথম নম্বর ছিল আদির। সেই সূত্র ধরেই হাসপাতাল থেকে তাকে খবর দেওয়া হয়েছে।
খবরটা শোনার সঙ্গে সঙ্গেই আদি আর এক মুহূর্তও দেরি করেনি। সাজিদ খান, নীল, শান, অভয় চৌধুরী এবং তাঁর মেয়ে নিশাকে সব জানায়। সবাই রাতের মধ্যেই চট্টগ্রামের উদ্দেশ্যে রওনা দেয়।
গাড়িতে পৌঁছাতে অনেকটা সময় লাগবে বুঝেই নীল নিজের বাইক বের করে। দুই ভাই—নীল আর আদি—একসঙ্গে বাইকে রওনা হয়। অন্যদিকে শান বাকিদের সঙ্গে গাড়িতে ওঠে। বাবার দুর্ঘটনার খবর শোনার পর থেকেই ছেলেটার শরীর কাঁপছিল, মাথা ঘুরছিল। মানসিকভাবে এতটাই ভেঙে পড়েছিল যে, এমন অবস্থায় কেউই তাকে বাইক চালাতে দেয়নি।
হাসপাতালে পৌঁছেই তারা জানতে পারে, দুর্ঘটনায় গাড়ি একপাশে হেলে পড়ায় আরমান চৌধুরীর মাথার বাম পাশে রক্ত জমে গেছে। পরিস্থিতি অত্যন্ত সংকটাপন্ন। চিকিৎসকদের ভাষায়, অবিলম্বে অপারেশন করতে হবে। এক মুহূর্ত দেরি হলেও বড় ধরনের বিপদ ঘটতে পারে।
ডাক্তারদের মুখে অপারেশনের কথা শুনেই শান আর নিজেকে সামলাতে পারেনি। চোখের সামনে অন্ধকার নেমে আসতেই সেখানেই জ্ঞান হারিয়ে মেঝেতে লুটিয়ে পড়ে। অভয় চৌধুরীসহ সবাই ছুটে গিয়ে তাকে সামলায়। অন্যদিকে আদির অবস্থাও ভালো ছিল না। কপাল বেয়ে ঘাম গড়িয়ে পড়ছে, বুকের ভেতরটা কেমন হাহাকার করে উঠছে। তার মাথায় তখন একটাই প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে—রাহাকে কীভাবে এই খবর জানাবে? বাড়ি থেকে বের হওয়ার সময় রাহা বারবার বলেছিল,
— "আদি... প্লিজ, আমার বাবার দিকে খেয়াল রেখো।"
সেই কথাগুলো যেন বারবার কানের ভেতর প্রতিধ্বনিত হতে থাকে। অপরাধবোধ আর অসহায়ত্বে আদির বুকটা মোচড় দিয়ে ওঠে।সাজিদ খান আদির মুখের দিকে একবার তাকিয়েই সব বুঝে যান। ধীর পায়ে এগিয়ে এসে ওর কাঁধে আশ্বাসের হাত রেখে শান্ত গলায় বলেন,
— "রাহাকে জানাও। ও আরমানের বড় মেয়ে। ওর অনুমতি ছাড়া এত বড় সিদ্ধান্ত নেওয়া ঠিক হবে না।"
কাঁপতে থাকা হাতে ফোন বের করে আদি রাহার নম্বরে কল দেয়। কয়েকবার রিং হওয়ার পর ওপাশ থেকে কল রিসিভ হয়। আদি গলা সামলে বলতে শুরু করে,
— "রাহা... আঙ্কেলের অ্যাক্সিডেন্ট হয়েছে। ডাক্তার বলছে ইমিডিয়েট অপারেশন করতে হবে। অবস্থা খুব একটা ভালো না... দেরি হলে..."
এরপর আর একটি শব্দও বলতে পারেনি সে। ওপাশ থেকে কোনো উত্তর আসার আগেই কলটি কেটে যায়। তারপর থেকে যতবারই রাহার নম্বরে কল করা হয়েছে, প্রতিবারই একই উত্তর—
"The number you are calling is switched off."
ডাক্তারদের সঙ্গে পরামর্শ করে ঠিক করা হয়, পরদিন সন্ধ্যায় অপারেশন করা হবে। কিন্তু সেই রাত থেকে পরের দিন বিকেল পর্যন্ত আদি, শান—এমনকি হাসপাতালের সবাই প্রায় অবিরাম রাহাকে কল করেই গেছে। প্রতিবারই ফোন বন্ধ।
একদিকে আরমান চৌধুরীর অপারেশন ঘিরে দৌড়ঝাঁপ, কাগজপত্র, চিকিৎসকদের সঙ্গে আলোচনা; অন্যদিকে রাহার কোনো খোঁজ না পাওয়ার অজানা আতঙ্ক। দুশ্চিন্তায় শানের শারীরিক অবস্থার আরও অবনতি হতে থাকে। নওরিন চৌধুরীও মানসিক চাপে অসুস্থ হয়ে পড়েন। অবশেষে অপারেশন শুরু হয়। অপারেশন শুরুর ঠিক এক ঘণ্টা পর আদির ব্যক্তিগত সহকারী ফোন করে জানায়,
— "স্যার... ম্যাম বাংলাদেশে ফিরে এসেছেন।"
এক মুহূর্তের জন্য আদির মনে হলো যেন মাথার ওপর পুরো আকাশটাই ভেঙে পড়েছে। মাত্র সাতাশ ঘণ্টার মধ্যে আমেরিকা থেকে বাংলাদেশে পৌঁছানো কতটা কঠিন, কতটা ক্লান্তিকর আর মানসিকভাবে বিধ্বংসী—যারা সেই দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়েছে, একমাত্র তারাই সেটা বোঝে। রাহা কোনো কিছু না ভেবেই, এক মুহূর্ত দেরি না করে ছুটে এসেছে। এতেই স্পষ্ট হয়ে যায়, এই মুহূর্তে মেয়েটা ঠিক কতটা অসহায়, কতটা ভেঙে পড়েছে, আর বাবাকে একবার দেখার জন্য কতটা মরিয়া হয়ে উঠেছে। আদি নীলের দিকে তাকিয়ে বলে,
— "তুই এখানেই থাক। অপারেশনের সময় কখন কী লাগে বলা যায় না।"
কিন্তু নীল মাথা নেড়ে শান্ত গলায় জবাব দেয়,
— "না ভাই, তুমি এখানেই থাকো। যদি কোনো জরুরি কিছু হয়, আমি সেটা তোমার মতো সামলাতে পারব না। তার চেয়ে আমি এয়ারপোর্টে যাই। রাহামনিকে এই অবস্থায় একা আসতে দেওয়া ঠিক হবে না।"
কথা শেষ করেই আর এক মুহূর্ত দেরি করেনি নীল। নিজের বাইকে উঠে ইঞ্জিন স্টার্ট দিতেই রাতের নিস্তব্ধতা ভেঙে গর্জে ওঠে শব্দটা।
_________________________
এয়ারপোর্টে পৌঁছেই নীল চারপাশে চোখ বুলিয়ে আদির পি.এ. রুদ্রকে দেখতে পায়। গাড়ির পাশে দাঁড়িয়ে থাকা ছেলেটার মুখেও স্পষ্ট উদ্বেগের ছাপ। নীল দ্রুত এগিয়ে গিয়ে জিজ্ঞেস করল,
— "রাহা কোথায়?"
রুদ্র শান্ত গলায় উত্তর দিল,
— "ম্যাম আগে থেকেই আমাকে গাড়ি নিয়ে অপেক্ষা করতে বলেছিলেন। তাই আমি এখানেই আছি।"
দু'জনের কথোপকথনের মাঝেই বেরিয়ে এলো এক তরুণী। মুহূর্তেই আশপাশের কোলাহল যেন নীলের কানে মিলিয়ে গেল। সাদা টপসের সঙ্গে সাদা প্যান্ট, পায়ে হালকা হিল। দীর্ঘ বিমানযাত্রার ক্লান্তিতে চুলগুলো এলোমেলো হয়ে কাঁধ ছুঁয়ে নেমে এসেছে। মুখে নেই একফোঁটা প্রসাধন, তবুও সেই ক্লান্ত মুখশ্রীতে যেন এক অদ্ভুত রাজকীয় সৌন্দর্য লুকিয়ে আছে।
দুধসাদা ত্বকের ওপর ভ্রমণের অবসাদ স্পষ্ট হলেও তা সৌন্দর্যকে ম্লান করতে পারেনি, বরং আরও বাস্তব করে তুলেছে। চোখের নিচে ক্লান্তির হালকা ছাপ, ঠোঁট দুটো নিস্তব্ধ, মুখে কোনো অভিব্যক্তি নেই। কিন্তু সবচেয়ে বেশি আটকে যায় নীলের দৃষ্টি ওর চোখে ডার্ক ব্রাউন দুটি চোখ...
যেন কোনো অনুভূতিই আর অবশিষ্ট নেই। কান্না নেই, রাগ নেই, অস্থিরতা নেই—শুধু নিঃশেষ হয়ে যাওয়া এক গভীর শূন্যতা। এমন শূন্য চোখ নীল আগে কখনো দেখেনি। চৌধুরী বাড়ির বড় মেয়ে... রাইদা চৌধুরী রাহা। মেয়েটাকে দেখে আশপাশের অনেকেই অজান্তেই তাকিয়ে থাকে। কারও বিস্ময়, কারও মুগ্ধতা, কারও কৌতূহল। নীল নিজের অজান্তেই ফিসফিস করে বলে উঠল
— "Gorgeous... Peony..."
রাহা ধীর পায়ে ওদের সামনে এসে দাঁড়ায়। কোনো কথা না বলে রুদ্রের দিকে হাত বাড়িয়ে দেয়। রুদ্রও এক মুহূর্ত দেরি না করে গাড়ির চাবিটা ওর হাতে তুলে দেয়। সে জানে, এই মুহূর্তে অপ্রয়োজনীয় একটি কথাও বলা মানে আগুনে ঘি ঢালা। রাহা ম্যাডাম সাধারণত ভীষণ শান্ত স্বভাবের। কিন্তু একবার ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে গেলে তাঁকে থামানো প্রায় অসম্ভব। আদির কাছ থেকে সে এ ব্যাপারে অনেক গল্পই শুনেছে। রুদ্র শুধু আদির পি এ না রাহারও গোপন খবর চালানকারী সব খবর চলে যায় রাহার কাছে রুদ্রর মাধ্যমে। নীল তখনও রাহার পরিবর্তিত মুখখানি গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করছে। পরের মুহূর্তেই রাহা গাড়ির দরজা খুলে ড্রাইভিং সিটে বসে পড়ে। এবার নীল যেন বাস্তবে ফিরে আসে। দ্রুত এগিয়ে গিয়ে বলে ওঠে,
— "এই! আপনি এই অবস্থায় গাড়ি চালাতে পারবেন না। আমার বাইকে উঠুন। আমরা অনেক দ্রুত হাসপাতালে পৌঁছে যাব।"
কিন্তু রাহা যেন কিছুই শুনল না।পরের মুহূর্তেই প্রচণ্ড গতিতে গাড়ি ছুটে যায়। নীলও আর দেরি না করে বাইক স্টার্ট করে ওর পিছু নেয়। গাড়ির সমান্তরালে এসে চিৎকার করে বলে,
— "হেই, লেডি! গাড়ি থামান!"
কোনো সাড়া নেই। রাহা যেন নিজের চারপাশের পৃথিবী থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন। নির্জন রাস্তা হওয়ায় বড় কোনো যানবাহন ছিল না। না হলে এতক্ষণে ভয়াবহ দুর্ঘটনা ঘটে যেত। হঠাৎ সবকিছু এত দ্রুত ঘটে গেল যে, কেউ কিছু বোঝারও সুযোগ পেল না। সামনাসামনি একটি ট্রাক চলে আসতেই রাহা গাড়ি সাইড করতে যায়। কিন্তু রাস্তার পাশে দাঁড় করিয়ে রাখা একটি গাড়ি চোখ এড়িয়ে যায়। পরের মুহূর্তেই—প্রচণ্ড শব্দে গাড়ির সামনের অংশ গিয়ে ধাক্কা খায়। তাড়াহুড়োয় সিটবেল্ট বাঁধা হয়নি। তাই প্রচণ্ড ধাক্কায় রাহার মাথা সজোরে স্টিয়ারিংয়ে আঘাত করে। সবকিছু যেন এক মুহূর্তে থেমে যায়। নীল শুধু অসহায় চোখে পুরো ঘটনাটা দেখল। এক সেকেন্ডও নষ্ট না করে বাইকটা রাস্তার মাঝেই ফেলে দৌড়ে গেল গাড়ির দিকে। হাত কাঁপতে কাঁপতে দরজা খুলে ফেলে।এক হাতে রাহার কব্জি শক্ত করে ধরে, অন্য হাতে সাবধানে ওকে জড়িয়ে গাড়ি থেকে বাইরে বের করে আনে। রাহা দাঁড়িয়ে থাকলেও শরীরের ভার যেন নিজের ওপর রাখতে পারছিল না।
নীল উদ্বিগ্ন হয়ে তাকিয়েই বলে ওঠে,
— "আপনার... রক্ত থেকে মাথা পড়ছে..."
কথাটা বলেই নিজের ভুল বুঝতে পেরে জিভ কাটল।
— "মানে... মাথা থেকে রক্ত পড়ছে।"
রাহা এমন অবস্থাতেও তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে ওর দিকে তাকায়।ৎসেই দৃষ্টিতে বিরক্তি ছিল, ক্লান্তি ছিল, আবার অদ্ভুত এক ভাঙাচোরা নীরবতাও ছিল। কপালের একপাশ কেটে রক্ত গড়িয়ে পড়ছে।
আঘাতটা বেশ জোরেই লেগেছে, তবে দেখে মনে হচ্ছে সময়মতো হাসপাতালে পৌঁছাতে পারলে বড় কোনো সমস্যা হবে না। নীল নিজের রুমাল বের করে সাবধানে ক্ষতস্থানে চেপে ধরে, যাতে রক্তপাত কিছুটা কমে। এরপর ওকে নিয়ে বাইকের দিকে এগোতে গিয়েই খুব ক্ষীণ স্বরে শুনতে পেল,
— "I... can't..."
দুটি শব্দের ভেতরে যেন বছরের পর বছর জমে থাকা অসহায়ত্ব, ভয় আর ক্লান্তি লুকিয়ে ছিল।নীল বুঝে গেল— পুরোনো কোনো ক্ষত আবার জেগে উঠেছে। যে রাহাকে সবাই বরফের মতো শক্ত বলে জানে, সেই মানুষটিই আজ ভিতর থেকে ভেঙে পড়েছে। এক মুহূর্তও দেরি করলে চলবে না। কিন্তু সমস্যাও কম নয়। এই অবস্থায় বাইকে বসালে যদি ভারসাম্য হারিয়ে পড়ে যায়? হঠাৎ নীলের মাথায় একটি উপায় আসে। রাহার অনুমতি নেওয়ার সুযোগ না থাকলেও পরিস্থিতির প্রয়োজনে খুব সতর্কভাবে ওর গলায় জড়ানো স্কার্ফটি খুলে নেয়। তারপর ধীরে ধীরে রাহাকে বাইকের পেছনের সিটে বসায়।রাহার মাথা যেন দুলে না যায়, সে জন্য ওকে স্থিরভাবে বসতে সাহায্য করে।এরপর স্কার্ফ দিয়ে অত্যন্ত সাবধানে এমনভাবে বেঁধে দেয় যাতে যাত্রাপথে ওর শরীর ভারসাম্য হারিয়ে সামনে বা পাশে হেলে না পড়ে।সবকিছু শেষ করে একবার নিশ্চিত হয় রাহা নিরাপদে বসে আছে। গভীর শ্বাস নিয়ে ইঞ্জিন স্টার্ট করে নীল। যত দ্রুত সম্ভব হাসপাতালে পৌঁছানো।
___________________
হাসপাতালের সামনে বাইক থামাতেই নীল এক মুহূর্তও দেরি করল না। দ্রুত ফোন বের করে শানকে কল দিল। কল রিসিভ হতেই শুধু বলল,
— "নিচে আয়। আমরা এসে গেছি।"
ওপাশে আর কোনো প্রশ্ন করার সুযোগ না দিয়েই কল কেটে দিল। কয়েক মিনিটের মধ্যেই শান আর নিশা দৌড়াতে দৌড়াতে নিচে নেমে আসে। কিন্তু নিচে নেমে যে দৃশ্যটা তাদের চোখে পড়ল, সেটার জন্য তারা কেউই প্রস্তুত ছিল না। বাইকের পেছনে নিস্তেজ হয়ে হেলান দিয়ে বসে আছে রাহা। মাথায় রক্তে ভেজা ব্যান্ডেজের মতো করে নীলের রুমাল চেপে ধরা। শরীর সামনের দিকে হেলে না পড়ে, তাই গলায় থাকা স্কার্ফ দিয়ে সাবধানে বেঁধে রাখা হয়েছে।
এক মুহূর্তের জন্য শানের বুকটা ধক করে উঠল।এত বছর পর নিজের শক্ত, অবিচল, সবার ভরসার আপুনিকে এমন অসহায় অবস্থায় দেখতে হবে—এটা সে কখনো কল্পনাও করেনি। দৌড়ে গিয়ে সাবধানে রাহাকে ধরে নামাতে নামাতে নীলের দিকে তাকিয়ে প্রায় ধমক দিয়েই বলে উঠল,
— "আপুনির কী হয়েছে, নীল? আর তুই কি একদম পাগল হয়ে গেছিস? এই অবস্থায় আপুনিকে এভাবে বাইকে নিয়ে এসেছিস? যদি পথে পড়ে যেত! সামনে বসিয়ে আনতে পারতিস না?"
শানের কণ্ঠে রাগের চেয়ে উদ্বেগই বেশি ছিল। নীল দীর্ঘশ্বাস ফেলল। এই মুহূর্তে কারও সঙ্গে তর্ক করার শক্তিও যেন তার নেই। ঠিক তখনই হাসপাতালের ভেতর থেকে দ্রুত পায়ে বেরিয়ে আসে আদি। দূর থেকেই রাহার মাথার ব্যান্ডেজ দেখে তার মুখের রঙ মুহূর্তেই ফ্যাকাসে হয়ে যায়।উদ্বিগ্ন গলায় জিজ্ঞেস করে,
— "কী হয়েছে রাহার?"
নীল ক্লান্ত মুখে শানের দিকে তাকিয়ে বলে,
— "তোর বোনকে পেছনে বসিয়ে আনতেই আমার অবস্থা খারাপ হয়ে গেছে। এতবার মনে হয়েছে পড়ে যাবে! সামনে বসিয়ে আনলে আমি নিশ্চিত টপকে যেতাম।
আদি এবার হালকা ধমকের সুরে বলে ওঠে,
— "আহ, নীল! এই সময়ও তোর মুখে এসব কথা মানায়?"
নীল আর কোনো উত্তর দিল না। সে শুধু একবার রাহার দিকে তাকাল। রাহার চোখ দুটো আধখোলা। সম্পূর্ণ জ্ঞান হারায়নি। আশপাশের সব কথাই সে শুনতে পাচ্ছে। শুধু শরীরটা আর সাড়া দিচ্ছে না। শান বুঝতে পারল, রাহার পক্ষে এক পা-ও হাঁটা সম্ভব নয়। তাই কোনো দ্বিধা না করে দু'হাতে বোনকে পাঁজাকোলা করে তুলে নিল।রাহা মাথাটা শানের বুকের কাছে এলিয়ে দিল।হাসপাতালের উজ্জ্বল সাদা আলোয় ভাই-বোনের সেই দৃশ্যটা যেন অদ্ভুত এক নীরবতার জন্ম দিল।কয়েক কদম এগোনোর পরই রাহা খুব কষ্ট করে চোখ খুলে ফিসফিসিয়ে ডাকল,
— "শান..."
শান সঙ্গে সঙ্গে নিচে তাকাল।রাহার ঠোঁট কাঁপছে।গলা ভেঙে আসছে।অসংখ্য প্রশ্নের ভিড়েও সে শুধু একটি কথাই বলতে পারল—
— "বাবা...?"
শানের বুকটা মোচড় দিয়ে উঠল। নিজের চোখেও পানি চলে আসছিল। তবু বোনের সামনে নিজেকে শক্ত রাখতেই হবে। ঠোঁটে জোর করে একটুখানি হাসি এনে শান্ত কণ্ঠে বলল,
— "চিন্তা করো না, আপুনি। বাবা আমাদের কাছেই ফিরে আসবে। কিছু হবে না।"
রাহা আর কিছু বলল না। ধীরে ধীরে চোখ দুটো আবার বন্ধ হয়ে এল। শান আরও শক্ত করে বোনকে আগলে নিয়ে হাসপাতালের ভেতরে হাঁটতে লাগল। তার প্রতিটি পদক্ষেপ যেন নীরবে একটাই প্রার্থনা করছিল—
'আল্লাহ... আমার বাবা আর আমার আপুনিকে দু'জনকেই সুস্থ করে দিন।'
দ্রুত রাহাকে জরুরি বিভাগে নিয়ে যাওয়া হয়।ডিউটি ডাক্তার প্রাথমিক পরীক্ষা করেই বুঝতে পারেন, মাথায় বেশ জোরে আঘাত লেগেছে। কপালের একপাশ কেটে রক্তপাত হয়েছে, আর পড়ে যাওয়ার ধাক্কায় পায়েও চোট পেয়েছে।সৌভাগ্যবশত আঘাতগুলো প্রাণঘাতী নয়।
ক্ষতস্থান ভালোভাবে পরিষ্কার করে মাথায় ব্যান্ডেজ করা হয়। এরপর ব্যথা কমানো ও শরীরকে কিছুটা স্থির রাখার জন্য একটি ইনজেকশন দেওয়া হয়। ওষুধের প্রভাবে প্রায় ঘণ্টাখানেকের মধ্যেই রাহা গভীর ঘুমে তলিয়ে যায়। ওদিকে হাসপাতালের করিডোরে সময় যেন এগোতেই চাইছিল না।
সবাই আরমান চৌধুরীর কেবিনের বাইরে উদ্বিগ্ন মুখে অপেক্ষা করছে। কারও মুখে কোনো কথা নেই। চারদিকে শুধু নিস্তব্ধতা আর উৎকণ্ঠার ভারী আবহ। অবশেষে অপারেশন থিয়েটারের দরজা খুলে বেরিয়ে এলেন প্রধান সার্জন। সবার বুক যেন একসঙ্গে কেঁপে উঠল। ডাক্তার মাস্ক খুলে শান্ত গলায় বললেন,
— "অপারেশন সফল হয়েছে। আপাতত বড় বিপদ কেটে গেছে। তবে এখনই নিশ্চিন্ত হওয়ার সুযোগ নেই। রোগীর জ্ঞান ফেরার পর শারীরিক প্রতিক্রিয়া কেমন হয়, সেটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। আগামী কয়েক ঘণ্টা খুবই গুরুত্বপূর্ণ।"
ডাক্তারের কথা শুনে সবাই যেন একসঙ্গে দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলল। কেউ মুখে কিছু বলল না, কিন্তু প্রত্যেকের চোখেমুখে স্পষ্ট হয়ে উঠল সামান্য স্বস্তির ছাপ। এরপর সবাই আল্লাহর কাছে নীরবে শুকরিয়া আদায় করল। এদিকে পুরো সময়টাই নিশা রাহার পাশেই ছিল। প্রায় দেড় ঘণ্টা পর রাহার চোখের পাতা ধীরে ধীরে কেঁপে উঠল।চোখ খুলতেই চারপাশটা কিছুটা ঝাপসা লাগছিল।মাথার ভেতরটা ভারী হয়ে আছে, শরীর অসাড়।
তবু হঠাৎ করেই যেন কিছু মনে পড়তেই তড়িঘড়ি করে উঠে বসার চেষ্টা করল। কিন্তু মাথায় প্রচণ্ড ব্যথা অনুভব করতেই মুখ বিকৃত হয়ে গেল।
গতকাল থেকে না খেয়ে দীর্ঘ বিমানযাত্রা, মানসিক চাপ আর রক্তক্ষরণের কারণে শরীর ভীষণ দুর্বল হয়ে পড়েছে।
হাতে লাগানো স্যালাইনের নলটাও নড়ে উঠল।নিশা তাড়াতাড়ি এগিয়ে এসে ওকে ধরে উদ্বিগ্ন গলায় বলল,
— "আপুনি! উঠো না। প্লিজ! ডাক্তার বলেছে তোমার এখন সম্পূর্ণ বিশ্রাম দরকার।"
রাহা যেন কিছুই শুনল না। দুর্বল হাতে নিশার হাত শক্ত করে চেপে ধরে কাঁপা গলায় বলল,
— "বাবা...? বাবা কেমন আছে এখন?"
নিশা ওর হাতের ওপর আলতো করে নিজের হাত রাখল। তারপর যতটা সম্ভব স্বাভাবিক হাসি এনে বলল,
— "চাচ্চু এখন অনেক ভালো আছে। কিছুক্ষণ আগেই জ্ঞান ফিরেছে। আমরা তোমার কথাও বলেছি। তুমি আর চিন্তা কোরো না।"
কথাটা শোনার সঙ্গে সঙ্গে রাহার নিঃশ্বাস যেন একটু স্বাভাবিক হলো। তবু অস্থিরতা একটুও কমল না। সে আবার উঠে বসার চেষ্টা করে বলল,
— "আমি... আমি বাবার কাছে যাব। আমাকে নিয়ে চল"
নিশা অসহায় মুখে মাথা নাড়ল।
— "কীভাবে নিয়ে যাব, বলো? তুমি তো ঠিকমতো দাঁড়াতেই পারছো না। দাঁড়াও, আমি শান ভাইয়া কিংবা আদি ভাইয়াকে ডেকে আনি।"
এই বলে নিশা দ্রুত কেবিন থেকে বেরিয়ে এল।কিন্তু দরজার মুখেই সজোরে কারও সঙ্গে ধাক্কা খেল।
— "উফ!"
কপালে হাত দিয়ে মুখ তুলে তাকাতেই দেখে নীল দাঁড়িয়ে আছে। নীল ভ্রু কুঁচকে বিরক্তির ভান করে বলল,
— "চোখে দেখিস না নাকি? আমার মতো এত বড় মানুষটাকে দেখলি না?"
নিশা কপাল ডলতে ডলতে মুখ বাঁকিয়ে উত্তর দিল,
— "তোমার মতো খাম্বা যদি সামনে দাঁড়ায়, সেটাকে মানুষ না বৈদ্যুতিক খুঁটি মনে হয় বুঝতেই তো সময় লাগে!"
নীলের ঠোঁটের কোণে হাসি ফুটে উঠল।
— "বেশ হয়েছে। এবার বল, এত তাড়া কিসের?"
নিশা আর সময় নষ্ট না করে বলল,
— "আপুনি চাচ্চুকে দেখতে যেতে চায়। কিন্তু হাঁটতেই পারছে না। তাই শান ভাইয়া বা আদি ভাইয়াকে ডাকতে যাচ্ছিলাম।"
নীল স্বাভাবিক ভঙ্গিতে জিজ্ঞেস করল,
— "তুই নিজেই নিয়ে যেতে পারিস না?"
নিশা এবার চোখ বড় বড় করে তাকাল।
— "আমি? আপুনির মতো এত লম্বা মানুষকে ধরব কীভাবে? উল্টো আমিই পড়ে যাব!"
নীল মাথা নেড়ে এমন ভান করল যেন খুব গুরুত্বপূর্ণ একটা বিষয় মনে পড়েছে।
— "ওহ... ঠিকই তো! তুই তো আবার আমাদের ছোট্ট টেপি! একদম ভুলে গিয়েছিলাম। সরি, বনু!"
"টেপি" কথাটা শুনেই নিশার মুখ আরও গোমড়া হয়ে গেল। এই একটা নাম শুনলেই ওর রাগ চড়ে যায়। কতবার বলেছে, ও মোটেও খাটো নয়।
সমস্যা যদি কারও থেকে থাকে, তবে সেটা নীলের—অস্বাভাবিক রকমের লম্বা হওয়াটাই তার দোষ!
তবু লোকটা সুযোগ পেলেই ওকে "টেপি" বলে খোঁচা দিতে ভোলে না। নীল এবার মুচকি হেসে বলল,
— "আর শান আর আদি ভাইকে খুঁজে লাভ নেই। তারা ডাক্তারের সঙ্গে ফরমালিটিগুলো শেষ করতে গেছে। আঙ্কেলের কাছে এখন বাবা আর চাচ্চু আছেন।"
একটু থেমে আবার বলল,
— "চল, আমি তোর আপুকে নিয়ে যাই।"
কেবিনে একা বসে থাকতে থাকতে রাহার মনে হচ্ছিল সময় যেন ইচ্ছে করেই ধীরে চলছে। বুকের ভেতরটা অদ্ভুত অস্থিরতায় কেঁপে উঠছে। নিশা তো মাত্র একটু আগে গেল, অথচ মনে হচ্ছে অনেকক্ষণ হয়ে গেছে। বাবার কাছে যাওয়ার জন্য মনটা ছটফট করছে। এই মুহূর্তে হাসপাতালের বিছানায় এক সেকেন্ডও বসে থাকা তার পক্ষে সম্ভব নয়। মাথাটা এখনো ভারী লাগছে। উঠে দাঁড়াতেই চোখের সামনে সবকিছু ঝাপসা হয়ে গেল। কানের ভেতর অদ্ভুত শব্দ হতে লাগল। শরীরের ভারসাম্য রাখতে না পেরে সামনে হেলে পড়তেই যাচ্ছিল—
ঠিক তখনই দুটো শক্ত হাত তাকে আগলে নিল।
পরের মুহূর্তেই রাহা বুঝে ওঠার আগেই নিজেকে শূন্যে ভাসতে অনুভব করল। নীল বিন্দুমাত্র সময় নষ্ট না করে তাকে পাঁজাকোলা করে তুলে নিয়েছে।
ভ্রু কুঁচকে বিরক্ত-উদ্বিগ্ন কণ্ঠে বলল,
— "পাকামি করে নিজে নিজে নামতে গিয়েছিলেন কেন? যদি পড়ে যেতেন? মাথায় সেলাই পড়েছে, পায়ে আঘাত লেগেছে, তারপরও নিজের কথা একবারও ভাবলেন না?"
রাহা চোখ তুলে নীলের দিকে তাকাল। একদম আগের মতোই... এই ছেলেটা এত বছরেও বদলায়নি। যেখানে যাবে, সেখানেই উপদেশ। সুযোগ পেলেই বকবক। ছোটবেলা থেকে এমনভাবেই ওর পেছনে ঘুরে বেড়াত। বিরক্তিকর, অসহ্য—তবুও অদ্ভুতভাবে দায়িত্বশীল। নীল মুখ কুঁচকে নাটকীয় ভঙ্গিতে দাঁত দিয়ে নিজের ঠোঁট কামড়ে বলল,
— "উফফ... এত ভারী কেন আপনি?"
রাহা সঙ্গে সঙ্গে চোখ পাকিয়ে গম্ভীর গলায় উত্তর দিল,
— "আমি মাত্র ঊনপঞ্চাশ কেজি। আর যদি তুলতেই না পারো, তাহলে কোলে নিলে কেন? শান বা আদিকে ডাকো।"
কথাটা শুনে নীলের ঠোঁটের কোণে দুষ্টু হাসি ফুটে উঠল। মেয়েদের একটা বিষয় সে খুব ভালো করেই জানে— পৃথিবীর যেকোনো কথা তারা হেসে উড়িয়ে দিতে পারলেও ওজন নিয়ে সামান্য মন্তব্য করলেই রাগে আগুন হয়ে যায়। রাহাও তার ব্যতিক্রম নয়। তবে মজাটা আর বাড়াল না।
কারণ এই মুহূর্তে রাহার চোখের ভেতরে যে অস্থিরতা সে দেখছে, সেটার সামনে সব রসিকতাই তুচ্ছ। সে ধীর পায়ে রাহাকে নিয়ে আরমান চৌধুরীর কেবিনের দিকে এগিয়ে গেল।
............................................
ওদিকে আরমান চৌধুরী আধশোয়া অবস্থায় চোখ বন্ধ করে ছিলেন। শরীর দুর্বল, মাথায় ভারী ব্যান্ডেজ, চারপাশে মনিটরের অবিরাম শব্দ। হঠাৎ কেবিনের দরজা খোলার শব্দে ধীরে ধীরে চোখ মেলে তাকালেন।সময় যেন থেমে গেল। দরজার সামনে দাঁড়িয়ে আছে—তার প্রাণ। তার কলিজার টুকরো। তার বড় আম্মা। তার জীবনের সবচেয়ে বড় গর্ব। তার রাহামণি। দূর থেকেই মেয়েটাকে দেখেই তাঁর বুকটা হুহু করে উঠল। চোখ দুটো মুহূর্তেই ঝাপসা হয়ে গেল। অশ্রু নীরবে গড়িয়ে পড়ল কপোলের পাশ দিয়ে। আজ থেকে ঠিক আট বছর আগে শেষবার নিজের আদরের মেয়েকে বুকের মধ্যে জড়িয়ে ধরেছিলেন তিনি।তারপর দীর্ঘ আটটি বছর... শুধু ভিডিও কল, ফোন, ছবি... কিন্তু স্পর্শ নয়। আজ আবার সেই রাজকন্যা তাঁর সামনে দাঁড়িয়ে। আবার সেই মুখ।আবার সেই চোখ। আবার সেই "বাবা" ডাক শোনার অপেক্ষা।
এদিকে বাবাকে হাসপাতালের সাদা বিছানায়, অসংখ্য তার আর যন্ত্রের মাঝখানে শুয়ে থাকতে দেখে রাহার বুকটাও মোচড় দিয়ে উঠল। যে মানুষটাকে সে সবসময় পাহাড়ের মতো শক্ত দেখেছে... আজ সেই মানুষটাই এতটা অসহায়।এই দৃশ্যটা যেন মেনে নেওয়াই অসম্ভব। নীল খুব সাবধানে রাহাকে বিছানার পাশের চেয়ারে বসিয়ে দিল। একবার দু'জনের মুখের দিকে তাকিয়ে নীরবে কেবিন থেকে বেরিয়ে এল। সে বুঝতে পারছিল— এই মুহূর্তটা শুধু একজন বাবা আর তার মেয়ের। তাদের মাঝখানে তৃতীয় কারও উপস্থিতি অপ্রয়োজনীয়। কেবিনে নেমে এলো গভীর নীরবতা। আরমান চৌধুরী ধীরে ধীরে কাঁপা হাতটা রাহার দিকে বাড়িয়ে দিলেন।
সেই হাতের ভাষা রাহা খুব ভালো করেই বুঝতে পারে। এক মুহূর্তও দেরি না করে বাবার হাত দু'হাতে শক্ত করে জড়িয়ে ধরল। তারপর আলতো করে নিজের গালে চেপে রাখল। চোখ ভিজে এল।কাঁপা গলায় বলল,
— "এখন কেমন লাগছে, বাবা?"
আরমান চৌধুরী মেয়ের মুখে হাত বুলিয়ে হাসার চেষ্টা করলেন।
— "আমার বড় মাকে দেখেই তো একদম ফিট অ্যান্ড ফাইন হয়ে গেছি। এখন আর কিছু হবে না।"
রাহার ঠোঁটেও ক্ষীণ হাসি ফুটল। কিন্তু সেই হাসির আড়ালে জমে থাকা ভয় এখনো স্পষ্ট। ধীরে ধীরে জিজ্ঞেস করল,
— "কীভাবে এমন দুর্ঘটনা ঘটল?"
আরমান চৌধুরী কিছুক্ষণ নিশ্চুপ হয়ে রইলেন। যেন ঘটনাগুলো আবারও চোখের সামনে ভেসে উঠছে। তারপর ধীরে ধীরে বলতে শুরু করলেন,
— "কাল রাতে কনফারেন্স শেষ হতে বেশ দেরি হয়ে গিয়েছিল। কাজের চাপও ছিল অনেক। সবকিছু গুছিয়ে আমরা বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা দিই। রাস্তা তখন মোটামুটি ফাঁকাই ছিল। গাড়িটাও স্বাভাবিক গতিতেই চলছিল। কোনো কিছুই অস্বাভাবিক লাগছিল না।"
একটু থামলেন তিনি। চোখ দুটো অন্যমনস্ক হয়ে উঠল।
— "হঠাৎ কোথা থেকে একটা বড় মালবাহী ট্রাক নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে আমাদের গাড়ির দিকে চলে আসে। ড্রাইভার কিছু বুঝে ওঠার আগেই প্রচণ্ড জোরে ধাক্কা মারে। তারপর কী হয়েছে, আমি ঠিক মনে করতে পারি না। শুধু এতটুকু মনে আছে, আসাদ আমাকে বাঁচানোর চেষ্টা করছিল।"
শেষ কথাটা বলতে গিয়েই তাঁর গলা ভারী হয়ে এল।
— "ও আমাকে গাড়ির ভেতর থেকে সরিয়ে দিতে গিয়ে নিজেই গাড়ির নিচে চাপা পড়ে যায়। ডাক্তার বলেছে ওর হাতটা খুব খারাপভাবে থেঁতলে গেছে। ছেলেটা না থাকলে হয়তো আজ আমি তোমাদের সামনে বসে থাকতে পারতাম না।"
রাহা একদৃষ্টে বাবার দিকে তাকিয়ে রইল। একটি কথাও বলল না। কিন্তু তার চোখের দৃষ্টি ধীরে ধীরে বদলে যেতে লাগল। কিছুক্ষণ আগেও সেখানে ছিল আতঙ্ক। এখন সেখানে জন্ম নিচ্ছে দৃঢ়তা।শান্ত, স্থির, কিন্তু ভীষণ শক্ত এক দৃঢ়তা।সে বাবার হাত আরও শক্ত করে ধরে শান্ত স্বরে বলল,
— "এখন থেকে এসব নিয়ে তোমাকে আর একটুও ভাবতে হবে না, বাবা। এতদিন তুমি আমাদের জন্য সবকিছু সামলেছ। প্রতিটি দায়িত্ব নিজের কাঁধে নিয়েছ। এবার তোমার বিশ্রাম নেওয়ার সময়।"
রাহা সামান্য ঝুঁকে বাবার চোখের দিকে তাকিয়ে বলল,
— "এখন থেকে সব দায়িত্ব আমার। কোম্পানির কাজ, প্রজেক্ট, মিটিং—সব আমি দেখব। তুমি শুধু সুস্থ হয়ে ওঠো।"
— "তোমার মেয়ে পারে না—এমন কাজ এখনো পৃথিবীতে তৈরি হয়নি, বাবা। তোমার রাহা সব সামলে নেবে।"
মেয়ের কথা শুনে আরমান চৌধুরীর বুকটা গর্বে ভরে উঠল। চোখের কোণে আবারও জল চিকচিক করে উঠল। তিনি আলতো করে রাহার মাথায় হাত রেখে বললেন,
— "আমি জানি... আমার রাহামনি সব পারে। আমার মেয়ের ওপর আমার পূর্ণ ভরসা আছে। রাহামনি পাশে থাকলে এই বুড়ো বাবার আর কোনো চিন্তা থাকে না।"
হালকা হেসে আবার বললেন,
— "কিন্তু তাই বলে সবকিছু ফেলে এভাবে ছুটে চলে আসা ঠিক হয়নি। তুমি এসেছো শোনার পর থেকে আমি শুধু এই কথাটাই ভাবছিলাম। এত দূর থেকে একা এত তাড়াহুড়ো করে আসতে তোমার কত কষ্ট হয়েছে!"
বাবার কণ্ঠে লুকিয়ে থাকা উদ্বেগ রাহার অজানা রইল না। সে মৃদু স্বরে উত্তর দিল,
— "চিন্তা করো না। আমি সব গুছিয়েই এসেছি। খুব বেশি কিছু বাকি ছিল না। যেগুলো আছে, সেগুলো অনলাইনেই শেষ করা যাবে।"
একটু হেসে আবার বলল,
— "আর ইরা তো আছেই। ও সামনের সপ্তাহের মধ্যেই সব শেষ করে দেশে ফিরে আসবে।"
'ইরা' নামটা শুনতেই আরমান চৌধুরীর মুখে প্রশান্তির হাসি ফুটে উঠল। তারপর নিজের মনেই সিদ্ধান্ত নিয়ে বললেন,
— "শোনো, ইরানীকে আমি আর অন্য কোথাও যেতে দেব না। ওকে আমাদের কোম্পানিতেই রাখব। এমন দক্ষ আর বিশ্বস্ত মানুষকে অন্য কোনো কোম্পানির হাতে তুলে দেওয়ার প্রশ্নই ওঠে না।"
রাহা মাথা নেড়ে সম্মতি জানাল।
— "আমিও তাই চাই, বাবা। ইরা আমাদের টিমের জন্য অনেক বড় শক্তি হবে।"
দু'জনেই কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। কোনো কথা নেই। শুধু বাবা-মেয়ের হাত দুটো এখনো একে অপরকে শক্ত করে ধরে আছে।সেই নীরবতার ভেতরেও যেন অসংখ্য অপ্রকাশিত কথা বিনিময় হয়ে গেল। সাত বছরের দূরত্ব...
দুই দিন পর ডক্টরের অনুমতি মিলতেই আরমান চৌধুরীকে হাসপাতাল থেকে ডিসচার্জ করিয়ে বাড়িতে নিয়ে আসে রাহা। হাসপাতালের সাদা-নির্জীব পরিবেশ ছেড়ে নিজের পরিচিত বাড়িতে ফিরে আসতেই যেন মানুষটার মনও অনেকটা ভালো হয়ে গেল। এদিকে রাহাও ধীরে ধীরে পুরোপুরি সুস্থ হয়ে উঠেছে। এক সপ্তাহের মধ্যেই আগের মতো স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসে সে। যদিও সবাই এখনও ওকে সাবধানে থাকতে বলে, কিন্তু রাহা বরাবরের মতোই নিজের দুর্বলতা প্রকাশ করতে নারাজ।
আরমান চৌধুরীকে বাড়িতে আনার পর পুরো বাড়ির পরিবেশটাই যেন বদলে গেল। সবাই নিজের নিজের দায়িত্ব ভাগ করে নিল। নওরিন চৌধুরী সময়মতো ওষুধ থেকে শুরু করে খাবারের দিকে খেয়াল রাখছেন। ইয়াসমিন চৌধুরী প্রতিদিন নতুন নতুন পুষ্টিকর রান্না করছেন। নিশা, শান, তৃধা— সবাই যার যার মতো করে আরমান চৌধুরীর পাশে রয়েছে। এতগুলো মানুষের নিঃস্বার্থ যত্ন, ভালোবাসা আর আন্তরিক সেবায় মানুষটা প্রত্যাশার চেয়েও দ্রুত সুস্থ হয়ে উঠলেন।
দেখতে দেখতে কেটে গেল আরও একটি মাস।
শরীর পুরোপুরি সুস্থ হতেই রাহা আবার অফিসে যাওয়া শুরু করল। তবে এবার আর আগের মতো নয়। এই এক মাসে ওর জীবনের দায়িত্ব অনেকটাই বদলে গেছে।
প্রথম দিন থেকেই আদি নিজের সমস্ত কাজের ব্যস্ততার মাঝেও রাহার হাত ধরে ধাপে ধাপে সবকিছু শেখাতে শুরু করল। কোম্পানির প্রতিটি ডিপার্টমেন্ট, প্রতিটি ফাইল, প্রতিটি প্রজেক্ট, মিটিং, ক্লায়েন্ট হ্যান্ডেলিং, সিদ্ধান্ত গ্রহণ— কোনো কিছুই বাদ রাখেনি সে। যতটুকু জানে, যতটুকু শিখেছে, সবকিছু নিঃস্বার্থভাবে রাহাকে শেখাতে থাকে।
দায়িত্ব, শৃঙ্খলা আর কর্মনিষ্ঠার প্রশ্নে শাহরিয়ার খান আদি সেরা।
একদিন পারিবারিক আলোচনার সময় রাহা স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছিল চট্টগ্রামের সব প্রজেক্ট এবার আমি নিজেই হ্যান্ডেল করব। বাবাকে আর সেখানে যেতে হবে না। এতদিন তিনি অনেক পরিশ্রম করেছেন। এবার দায়িত্ব আমাদের নেওয়ার সময় এসেছে।
রাহার দৃঢ় কণ্ঠে উচ্চারিত কথাগুলো শুনে আদি এক মুহূর্তও দেরি করল না। সে শান্ত অথচ আত্মবিশ্বাসী গলায় বলল,
— আমি রাহার সঙ্গে একমত। আমিও ওর সঙ্গে কাজ করব। বাবা আর আঙ্কেল সারাজীবন এই কোম্পানির জন্য নিজেদের সবটুকু দিয়েছেন। এবার তাঁদের একটু বিশ্রাম নেওয়ার সময়। নতুন প্রজন্মকে নিজেদের যোগ্যতা প্রমাণ করার সুযোগ দেওয়া উচিত।
দু'জনের কথা মনোযোগ দিয়ে শুনলেন আরমান চৌধুরী ও সাজিদ খান। একবার একে অপরের দিকে তাকিয়ে দু'জনের মুখেই মৃদু হাসি ফুটে উঠল। আসলে আপত্তি করার কোনো কারণই ছিল না। বরং ছেলেমেয়েদের চোখে যে আত্মবিশ্বাস, দায়িত্ববোধ আর নিজের যোগ্যতা প্রমাণ করার তীব্র ইচ্ছা দেখছিলেন, তা তাঁদের ভেতরে গর্বের অনুভূতি জাগিয়ে তুলেছিল।
আর যাই হোক, আজ না হয় কাল— এই বিশাল ব্যবসায়িক সাম্রাজ্যের সম্পূর্ণ দায়িত্ব তো ওদের হাতেই তুলে দিতে হবে। তাই এখন থেকেই বাস্তব অভিজ্ঞতা অর্জন করাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
তবুও দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞ ব্যবসায়ী হিসেবে তাঁরা কোনো সিদ্ধান্ত আবেগের বশে নিতে রাজি নন।
পরদিন একান্তে আলোচনা করে আরমান চৌধুরী আর সাজিদ খান একটি সিদ্ধান্ত নিলেন।
চট্টগ্রামের মতো বিশাল এবং গুরুত্বপূর্ণ প্রজেক্টের দায়িত্ব সরাসরি না দিয়ে প্রথমে এখানকার একটি তুলনামূলক ছোট কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ প্রজেক্ট তাঁদের হাতে তুলে দেওয়া হবে। এই কাজের মাধ্যমেই বোঝা যাবে— বাস্তব পরিস্থিতিতে সিদ্ধান্ত নেওয়া, চাপ সামলানো এবং নেতৃত্ব দেওয়ার মতো মানসিক ও পেশাগত প্রস্তুতি তারা সত্যিই অর্জন করেছে কি না।
আদিকে নিয়ে অবশ্য কারও কোনো সংশয় ছিল না। গত দুই বছর ধরে সে কোম্পানির প্রতিটি দায়িত্ব নিষ্ঠার সঙ্গে পালন করে এসেছে। নিজের যোগ্যতা সে বহু আগেই প্রমাণ করেছে।
তাই পরীক্ষাটা মূলত রাহা আর ইরানীর জন্যই রাখা হলো। প্রায় দুই মাসের জন্য সেই প্রজেক্টের সম্পূর্ণ দায়িত্ব তাঁদের দু'জনের ওপর ছেড়ে দেওয়া হবে। এই সময়ের মধ্যে যদি তাঁরা নিজেদের দক্ষতা, বিচক্ষণতা আর নেতৃত্বের প্রমাণ দিতে পারে, তাহলে আর কোনো বাধা থাকবে না।
তারপরই তাঁদের হাতে তুলে দেওয়া হবে চট্টগ্রামের বহু প্রতীক্ষিত, বহু গুরুত্বপূর্ণ প্রজেক্ট— যে প্রজেক্ট শুধু ব্যবসার ভবিষ্যৎ নয়, তাঁদের নিজেদের যোগ্যতারও সবচেয়ে বড় পরীক্ষা হয়ে উঠবে।
চলবে...