ফন্ট সাইজ:
থিম:
প্রনয়ের প্রলয়

৪র্থ পর্ব

লেখক: মেহরিমা সারা

#প্রনয়ের_প্রলয় 

#কলমে_মেহরিমা_সারা 
পর্বঃ৪
— "এই তুই আবার শাওনদের সঙ্গে ঝামেলায় জড়িয়েছিস কেন?"
শানের কণ্ঠে বিরক্তির সঙ্গে মিশে ছিল স্পষ্ট উদ্বেগ। এতক্ষণ ধরে নীল নিজের ভাবনার জগতে ডুবে ছিল। পুরনো ঘটনাগুলো বারবার মাথার ভেতর ঘুরপাক খাচ্ছিল। সেই মুহূর্ত, সেই কথাগুলো, বিশেষ করে রাহার রাগে লাল হয়ে যাওয়া মুখটা যেন চোখের সামনেই ভেসে উঠছিল।
"আমি শুধু ভারী বলেছিলাম... এতটুকু কথায় মানুষ এতটা রেগে যেতে পারে?" এখনও ব্যাপারটা ঠিক বিশ্বাস করতে পারছে না সে। মেয়েটা যেন সুযোগ পেলেই ওকে খোঁচা দেয়। এমনভাবে বকাঝকা করে, যেন পৃথিবীর যত অন্যায়-অবিচার সব নীলই করেছে। যেন ওর জীবনের একমাত্র কাজই হলো নীলকে শাসন করা। শানের ডাকে ভাবনার জাল ছিঁড়ে বাস্তবে ফিরে এল নীল।
রাহার কেবিনের নরম সোফায় আধশোয়া হয়ে বসেছিল সে। সদ্য ব্যাথা পাওয়া হাত, মুখে স্পষ্ট অভিমানের ছাপ। শানকে কেবিনে ঢুকতে দেখেই ইচ্ছে করেই মুখটা অন্যদিকে ঘুরিয়ে নিল।
হাতে একটা ফার্স্ট এইড বক্স নিয়ে ধীরে ধীরে এগিয়ে এল শান।
আসলে অনেক আগেই সে অফিসে পৌঁছে গেছে।
সকালে পায়ে চোট পাওয়ায় রাহা তাকে জোর করেই ভার্সিটিতে যেতে দেয়নি। অনেক বুঝিয়েও লাভ হয়নি। বাধ্য হয়ে বাড়িতেই থাকতে হয়েছিল।
ঘুম থেকে উঠেই একজনের কাছ থেকে শুনতে পারে, ভার্সিটিতে নীলের সঙ্গে শাওনদের দলের আবারও ঝামেলা হয়েছে। আর ঘটনাস্থলে উপস্থিত ছিল স্বয়ং রাহা। শুধু উপস্থিতই নয়, নীলকে নিজের সঙ্গে নিয়েও চলে এসেছে।
এই খবর শোনার পর আর ঘরে বসে থাকার প্রশ্নই ওঠে না। ঘটনার শুরু থেকে শেষ না জানা পর্যন্ত শানের শান্তি নেই। বাড়ি থেকে বের হওয়ার সময় আন্দাজ করে অফিসে ফোন করেছিল। সেখান থেকেই নিশ্চিত হয়— নীল সত্যিই রাহার সঙ্গে অফিসে এসেছে। কেবিনে ঢুকেই বন্ধুর মুখ ঘুরিয়ে নেওয়া দেখে শানের আর বুঝতে বাকি রইল না— আজও নিশ্চিত রাহার কাছে ভালোসড় ঝাড়ি খেয়েছে নীল। অবশ্য এটা নতুন কিছু নয়। এমন ঘটনা এর আগেও বহুবার ঘটেছে। আর প্রতিবারই রাগে গজগজ করতে থাকা নীলকে শান্ত করার গুরুদায়িত্ব এসে পড়েছে শানের ওপর। আজও ব্যতিক্রম হলো না। শান নরম করে নীলের পাশে গিয়ে বসল। বন্ধুর হাতটা নিজের দিকে টেনে নিয়ে ব্যান্ডেজ ঠিক করতে করতে স্বাভাবিক গলায় বলল,
— বলছিলাম... আজ আবার কী নিয়ে ঝামেলা হলো?
নীল কোনো উত্তর দিল না। মুখ শক্ত করে সামনের দিকে তাকিয়ে রইল। শান যেন কিছুই টের পায়নি, এমন ভান করে আবার বলল,
— ইস! আজ আপুনি যেতে নিষেধ না করলে আমিও ভার্সিটিতে থাকতাম। তাহলে ওই শাওনদের এমন শিক্ষা দিতাম, সারাজীবন মনে রাখত। বুঝিয়ে দিতাম— আমরা কী জিনিস!
এবার নীল ধীরে ধীরে মুখ ফিরিয়ে তাকাল। ঠোঁট বেঁকিয়ে তাচ্ছিল্যের হাসি হেসে ব্যঙ্গাত্মক গলায় বলল,
— হ্যাঁ, তুই তো খুবই বীরপুরুষ! নিজের ইচ্ছেমতো ফাতরামি করবি, আর শেষে ওই কুঁচুটে মহিলা এসে আমাকে বলবে—
তারপর গলাটা হুবহু রাহার মতো গম্ভীর করে নকল করতে শুরু করল।
— "নীল, আমার ভাইয়ের থেকে দূরে থাকবে। এসব ঝামেলায় ওকে জড়াবে না।"
— "ছোট মানুষ তোমরা। ছোটদের মতোই থাকবে। বড়দের মতো ঝামেলা করার দরকার নেই।"
রাহার গলা, মুখভঙ্গি, এমনকি চোখ রাঙানোর স্টাইল পর্যন্ত এমন নিখুঁতভাবে নকল করল যে শানের হাসি চেপে রাখা দায় হয়ে গেল। পেটের ভেতর হাসি মোচড় দিচ্ছে। কিন্তু সামনে বসে থাকা রাগে ফুঁসতে থাকা বন্ধুটার দিকে তাকিয়ে প্রাণপণ নিজেকে সামলে নিল। কোনোমতে কাশি দিয়ে মুখটা স্বাভাবিক করে বলল,
— আরে, আপুনি আমাকে নিয়ে অনেক চিন্তা করে। আমার যেন কোনো ক্ষতি না হয়, আমি যেন কষ্ট না পাই— এটাই তো চায়।
কথাটা শেষ হতেই নীল চোখ কুঁচকে এমনভাবে তাকাল, যেন চোখ দিয়েই মানুষ পুড়িয়ে ফেলতে পারে। 
— আমার সঙ্গে থাকলে তোর ক্ষতি হয়?
প্রশ্নটা শুনে শান আঁতকে উঠল। দ্রুত মাথা নেড়ে বলল,
— আরে না না! আমি সেটা বলিনি। বলতে চেয়েছি, আপুনি ভাবে— তোর সঙ্গে থাকলে আমিও তোর মতো দুষ্ট হয়ে যাব।
নীল ভ্রু উঁচু করল।
— আমি দুষ্ট?
— আমি কই বললাম? আমি বলছি— আপুনি তোকে দুষ্ট ভাবে।
নীল এবার ঠোঁট বাঁকিয়ে মুচকি হাসল।
— আমি এমন কী দুষ্টুমি করেছি, যে তোর বোন আমাকে দেখলেই দুষ্ট বলে?
শান অসহায় ভঙ্গিতে কাঁধ ঝাঁকাল।
— আমি কী করে জানব? আপুনিই ভালো বলতে পারবে, তুই এমন কী করেছিস যে তোকে এত সন্দেহ করে।
এই উত্তর শুনে নীলের মুখে রহস্যময় হাসি ফুটে উঠল। ব্যান্ডেজ বাঁধা হাতটা তুলে আলতো করে শানের কাঁধে জড়িয়ে নিল। ধীরে ধীরে শান্ত গলায় বলল,
— তোর বোন তো কোনো কারণ ছাড়াই আমাকে দুষ্ট বলে... যদি একদিন সত্যিই দুষ্ট বলার মতো একটা কারণ ধরিয়ে দিই... তখন কী বলবে?
শানের বুকের ভেতর হালকা কাঁপন বয়ে গেল।নীলের এই অতি ভদ্র গলায় বলা কথাগুলোই সবচেয়ে বেশি ভয়ের। কারণ এমন গলায় কথা বললেই বুঝতে হবে— ব্যাটা নিশ্চিত কোনো বড়সড় ঘোল পাকানোর পরিকল্পনা করছে। সে সঙ্গে সঙ্গে নীলের হাতটা নিজের কাঁধ থেকে সরিয়ে দিয়ে বলল,
— আমি কীভাবে জানব? সেটা আপুনিকেই জিজ্ঞেস করতে হবে।
নীল এবার আর হাসল না। সোজা হয়ে বসে গম্ভীর গলায় বলল,
— তোর বোন যদি জানত, যাকে সে পৃথিবীর সবচেয়ে শান্ত, ভদ্র আর সরল ভাই মনে করে... সেই ভাইটা আসলে আমার থেকেও অনেক বেশি ধুরন্ধর আর চালাক...
ওদের কথার মাঝেই কেবিনের দরজাটা খুলে গেল। গলার স্কার্ফ খুলতে খুলতেই ভেতরে প্রবেশ করল রাহা। কারও দিকে একবারও না তাকিয়ে সোজা নিজের চেয়ারের দিকে এগিয়ে গিয়ে ক্লান্ত শরীরটা হেলিয়ে চোখ বন্ধ করে বসল। মনে হচ্ছিল টানা কাজের চাপে বেশ পরিশ্রান্ত হয়ে পড়েছে সে।
রাহার ঠিক পেছনেই হাতে কয়েকটি ফাইল নিয়ে কেবিনে ঢুকল ইরানী সিদ্দিকী। সোফায় পাশাপাশি বসে থাকা নীল আর শানকে দেখে ওর মুখে সঙ্গে সঙ্গে হাসি ফুটে উঠল। ওদের দিকে এগিয়ে যেতে যেতে উচ্ছ্বসিত কণ্ঠে বলে উঠল,
— কী ব্যাপার! আজ জুনিয়ররা অফিসে?
রাহা শুধু মাথাটা সামান্য কাত করে একবার ওদের দিকে তাকাল। তারপর আবার আগের মতোই চোখ বন্ধ করে চুপচাপ বসে রইল। নীল আড়চোখে একবার রাহার দিকে তাকিয়ে ঠোঁটের কোণে দুষ্টু হাসি টেনে ইরানীর দিকে ফিরে বলল,
— ইরা বেবি, আজ মনে হচ্ছে একটু বেশিই খাটাখাটনি হয়েছে?
ইরানী হালকা হেসে মাথা নাড়ল।
— না, আজ তেমন কোনো গুরুত্বপূর্ণ কাজ ছিল না। কালই রাহা প্রায় সব কাজ শেষ করে ফেলেছে। আজ শুধু কয়েকটা ছোটখাটো বিষয় দেখেছি।
হঠাৎ যেন কিছু মনে পড়তেই কপালে আলতো চাপড় দিয়ে বলল,
— আরে হ্যাঁ! তোমাকে বলতেই ভুলে গেছি। স্যার আর ম্যাম এসে গেছেন। আদি স্যার তোমাকে তাঁর কেবিনে যেতে বলেছেন।
সাজিদ খান আর রুবিনা খান বছরে ছয় মাস এখন বাইরেই থাকে বিভিন্ন দেশ বিদেশে ঘুরে বেড়ান আদি অফিস জয়েন করার পর থেকে। কথাটা বলে ইরানী শানের দিকে ফিরল। স্নেহভরে ওর চুলগুলো এলোমেলো করে দিয়ে বলল,
— পিচ্চি, শুনলাম পায়ে ব্যথা পেয়েছিস? এখন কেমন আছিস?
শান বিরক্ত মুখে নিজের চুল ঠিক করতে করতে বলল,
— উফফ, ইরাপি! কতবার বলেছি, এভাবে চুল এলোমেলো করবে না। আমি এখন আর ছোট নেই।
ইরানীও ওর মুখভঙ্গি নকল করে চোখ-মুখ কুঁচকে বলল,
— তোর বিয়ে না হওয়া পর্যন্ত তুই আমার কাছে পিচ্চিই থাকবে।
শান আড়চোখে একবার রাহার দিকে তাকিয়ে নিচু স্বরে বিড়বিড় করল,
— তাহলে আমাকে তাড়াতাড়ি বিয়ে দিয়েই না হয় বড় করে দাও।
কথাটা শুনে ইরানী চোখ ছোট ছোট করে তাকাল।
— আগে ভালো ছেলে হয়ে যা। রাহা যদি একবার তোর এই বেখেয়ালি কথাবার্তা শুনে ফেলে, নিশ্চিত বুঝে যাবে তুই কোনো না কোনো ঘোল পাকানোর ফন্দি আঁটছিস।
শান সঙ্গে সঙ্গে দু'হাত কানে দিয়ে আত্মসমর্পণের ভঙ্গিতে বলল,
— ছেড়ে দে মেরি মা... আপুনি কে কিছু বলতে হবে না।
শানের অসহায় মুখ দেখে ইরানী হেসে ফেলল।এরপর আর দেরি না করে দুই বন্ধু উঠে দাঁড়াল। নীল আদির কেবিনের দিকে চলে গেল, আর শান গেল আরমান চৌধুরীর কেবিনে। ওরা বেরিয়ে যেতেই কেবিনে আবার নীরবতা নেমে এল।
চোখ বন্ধ রেখেই রাহা শান্ত গলায় জিজ্ঞেস করল,
— বাবা খেয়েছেন?
ইরানী ফাইলগুলো টেবিলের ওপর রাখতে রাখতে উত্তর দিল,
— হ্যাঁ। একটু আগেই মিস্টার ক্যাভেলকে খাবার নিয়ে ওনার কেবিনে যেতে দেখেছি। মনে হয় খাওয়া শেষও হয়ে গেছে।
______________________________
— উমম... অনেক ভালো হয়েছে!
শান আঙুলের ডগায় লেগে থাকা সসটুকুও চেটে নিয়ে চোখ বন্ধ করে তৃপ্তির হাসি হাসল। কণ্ঠে ছিল নিখাদ প্রশংসার উচ্ছ্বাস। শানের মুখে নিজের হাতে বানানো মোমোর এমন প্রশংসা শুনে কিয়ারা আনন্দে দু'হাত উপরে তুলে বলে উঠল,
— ইয়েয়! অবশেষে আমি একটা রেসিপি একদম পারফেক্ট বানাতে পেরেছি!
মেয়েটার শিশুসুলভ উচ্ছ্বাস আর হাসিমাখা গোলগাল মুখটা দেখে শানের ঠোঁটের কোণেও অজান্তেই হাসি ফুটে উঠল। ঠোঁট কামড়ে কিছুক্ষণ শুধু তাকিয়েই রইল সে। এই নিষ্পাপ আনন্দটাই যেন বারবার তাকে কিয়ারার প্রেমে নতুন করে ডুবিয়ে দেয়। 
আজ কিয়ারা শানের ভার্সিটিতে এসেছে। দু'জনে লাইব্রেরির এক কোণে পাশাপাশি বসে আছে। দুপুর গড়িয়ে যাওয়ায় লাইব্রেরিটা প্রায় ফাঁকা। মাঝে মাঝে দু-একজন ছাত্রছাত্রী বই হাতে নীরবে এদিক-ওদিক যাতায়াত করছে। চারপাশের শান্ত পরিবেশ যেন তাদের ছোট্ট মুহূর্তটাকে আরও আপন করে তুলেছে। কিয়ারা আলতো করে নিজের হাতটা শানের হাতের ওপর রেখে ওর চোখের দিকে তাকিয়ে নরম স্বরে বলল,
— আর কী খেতে ইচ্ছে করে বলো? আমি বানিয়ে দেব। এবার কিন্তু আরও ভালো করে বানানোর চেষ্টা করব।
শানও গভীর দৃষ্টিতে ওর চোখের দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর নিচু, মৃদু কর্কশ স্বরে ঠোঁটের কোণে দুষ্টু হাসি টেনে বলল,
— আপাতত... আমার সবচেয়ে প্রিয় ডেজার্টটাই খেতে ইচ্ছে করছে। যদি অনুমতি পাওয়া যায়...
শান বাকিটুকু বলার আগেই কিয়ারা যেন কথার অর্থ বুঝে ফেলল। লজ্জায় তড়িঘড়ি করে নিজের হাত সরিয়ে নিয়ে মুখ ফিরিয়ে ফেলল। গাল দুটো মুহূর্তেই লাল হয়ে উঠল। অসভ্য ছেলেটার ইঙ্গিত বুঝতে তার আর বাকি রইল না। কিয়ারার লজ্জা দেখে শানের মুখে আরও দুষ্টু হাসি ফুটে উঠল।
হঠাৎ করেই সে বুকের ওপর হাত রেখে কাতর গলায় বলে উঠল,
— উফ... আবার মনে হচ্ছে বুকে ব্যথা করছে।
কথাটা শুনেই কিয়ারার মুখের হাসি মিলিয়ে গেল। মুহূর্তের মধ্যে উদ্বেগে ভরে উঠল তার চোখ। সে দ্রুত শানের আরও কাছে সরে এসে কাঁপা গলায় বলল,
— কী বলছ? অনেক বেশি ব্যথা করছে? কোথায়?
উদ্বিগ্ন হয়ে আলতো করে শানের বুকে হাত রাখতেই শান মৃদু হেসে ওর হাতটা নিজের মুঠোয় নিল। তারপর একটু কাছে টেনে এনে নিচু স্বরে বলল,
— হ্যাঁ... ব্যথা তো করছেই। তবে এই ব্যথাটা সাধারণ না... একদম পার্সোনাল হার্টের ব্যথা, সুইটহার্ট। এই ব্যথার একটাই ওষুধ... আমার প্রিয় ডেজার্টের অনুমতি।
কথাটা শেষ করেই দুষ্টুমিভরা চোখে কিয়ারার দিকে তাকিয়ে রইল সে। কিয়ারা সঙ্গে সঙ্গে বুঝে গেল— আবারও বোকা বানানো হয়েছে তাকে।
এক বছর আগে হঠাৎ বুকের ব্যথা নিয়ে শানকে হাসপাতালে ভর্তি হতে হয়েছিল। সেই ঘটনার পর থেকেই "বুকে ব্যথা" কথাটা কিয়ারার সবচেয়ে বড় দুর্বলতা হয়ে গেছে। আর শান সুযোগ পেলেই সেই ভয়টাকেই অস্ত্র বানিয়ে মজা করে। তবু প্রতিবারই কিয়ারা একইভাবে ধরা দেয়। কারণ ভালোবাসার মানুষটাকে নিয়ে তার উদ্বেগ কখনো অভিনয় হতে পারে না। লজ্জায় কিয়ারা আর শানের চোখের দিকে তাকাতে পারছিল না। ছেলেটার গভীর, তীক্ষ্ণ অথচ অদ্ভুত মায়াভরা চোখ দুটো যেন প্রতিবারই তার সমস্ত সাহস কেড়ে নেয়। এই চোখ দুটোর দিকেই তাকিয়ে চৌদ্দ বছরের কিশোরী কিয়ারা প্রথম নিজের হৃদয়ের অস্থিরতা চিনেছিল। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বয়স বেড়েছে, অনুভূতি পরিণত হয়েছে, কিন্তু সেই চোখের মায়া একটুও কমেনি। বরং আজ অষ্টাদশী কিয়ারা আগের চেয়েও বেশি ডুবে আছে সেই পরিচিত দৃষ্টির গভীরতায়।
শেষ পর্যন্ত নিজের সমস্ত সংকোচ, লজ্জা আর দ্বিধার সঙ্গে নীরব লড়াই করে সে ধীরে ধীরে চোখ তুলে শানের দিকে তাকাল। ভালোবাসায় ভরা সেই দৃষ্টিতেই ছিল তার নীরব সম্মতি। আর সেই একটুকরো সম্মতিই অধীর অপেক্ষায় থাকা প্রেমিকের মুখে তৃপ্তির উজ্জ্বল হাসি ফুটিয়ে তুলল।
শান কিয়ারার ইশারা বুঝে আর একটুও দেরি করে না, ঝটাপট দীর্ঘ দুই মাসের জমানো উন্মাদনা, ভালোবাসা, প্রেম উজাড় করে নিজের একান্ত অতিসাধনার প্রেয়সীর রক্ত লাল টসটসে অধর নিজের ডার্ক রেড অধর দিয়ে আঁকড়ে ধরে। কিয়ারা নিজের শখের পুরুষের ছোঁয়ায় প্রতিবারের মতন এবারো কেঁপে উঠে চোখ খিচে হাত দ্বারা শান এর শার্টের কলার মুঠি পাকায়। শান কিয়ারার রেসপন্স না পেয়ে কিছুপল এর জন্য অধর থেকে অধর আলাদা করে "সুইটহার্ট রেসপন্স কর নয়তো আমি তোকে হার্ট করে ফেলবো " বলেই পুনরায় নিজের বাসনা পূরনে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। কিয়ারা এর পরেও রেসপন্স না করায় শান হালকা করে দাত বসিয়ে দেয়,
ব্যাথায় কিয়ারা আহ শব্দ করে ওঠে রেসপন্স করার চেষ্টা করে নয়তো দেখা যাবে প্রথমবারের মতো এবারো কিয়ারাকে রক্তাক্ত করবে।
শান হচ্ছে সুবিধা বাদী লোক, কিয়ারার রেসপন্স পেয়ে তো আরো উন্মাদ হয়ে যায়। এতক্ষন কিয়ারার বাহুতে থাকা শান এর ডান হাত এবার ওর কোমরে নেমে যায় যা আলগোছে পেঁচিয়ে কিয়ারাকে নিজের সাথে মিশিয়ে নেয় আর বাম হাত কিয়ারার মসৃণ চুল গলিয়ে ঘাড়ে গিয়ে পৌঁছায়।
নিজের কোমরে শীতল স্পর্শ পেয়ে কিয়ারাও এবার আবেশে শান এর গলা জরিয়ে ধরে। দুই প্রেমিক প্রেমিকা যখন নিজেদের দুনিয়ায় ব্যস্ত তখন কিয়ারা ফোন সশব্দে বেজে ওঠে। ফোনের আওয়াজে কিয়ারার হুঁশ ফিরে যে, ওরা পাবলিক প্লেসে আছে যে কোন সময় যে কেউ আসতে পারে তাই জোর করে এবার নিজেকে শান এর থেকে সামান্য দূর করে ফোন হাতে নেওয়ার উদ্দেশ্যে হাত বাড়ালে শান হাত টেনে কিয়ারার গলায় মুখ গুজে দেয়।
কিয়ারা শান এর কাজে আতকে উঠে শান এর চুল আঁকড়ে ধরে। শান তো এবার শেষ যখনই নিজেকে সামলাতে চায় শান্ত হতে চায় তখনই এই বোকা মেয়েটা নিজের অজান্তে এমন কাজ করে যে শান পুনরায় হুঁশ খুইয়ে বসে। এবারো তাই হলো, শান নিজেকে দমাতে কিয়ারার গলার থেকে একটু নিচে নরম জায়গায় শক্ত পোক্ত একটা কামড় বসিয়ে দেয়।
কিয়ারা হঠাৎ আক্রমণে নিজেকে সামলাতে না পেরে চিৎকার করে উঠে, শান ওর চিৎকারে থতমত খেয়ে মুখ উঠিয়ে হাত দিয়ে কিয়ারার মুখ চেপে ধরে নিচু স্বরে বলে,
— " চুপ! কি করছো? কেউ চলে আসবে তো"
কিয়ারার চোখের কোণে চিকচিক করে উঠল জল। শানের হাতটা সরিয়ে দিয়ে হালকা ধাক্কা দিল সে। তারপর অস্বস্তিভরা মুখে নিজের ব্যথা পাওয়া জায়গায় আলতো করে হাত বুলাতে বুলাতে কাঁদো-কাঁদো গলায় বলে উঠল,
— উফফ! রাক্ষস একটা! কেউ এভাবে কামড়ায় নাকি?
শান বিন্দুমাত্র অপরাধবোধ না দেখিয়ে বরং কলারটা একটু উঁচু করে ভীষণ ভাব নিয়ে বলল,
— আমি করি। তোমাকে তো আগেই বলেছিলাম, আমি মোটেও ভদ্র-সভ্য মানুষ নই।
কিয়ারা ঠোঁট ফুলিয়ে চোখ রাঙিয়ে বলল,
— হুম, সেটা তো শুধু আমার ক্ষেত্রেই। দুনিয়ার মানুষ কি আর তোমার আসল রূপ জানে? তাদের সামনে তো এমন ভাব ধরে থাকো, যেন তুমি পৃথিবীর সবচেয়ে নিরীহ আর ভদ্র ছেলে।
শান মৃদু হেসে ভ্রু নাচিয়ে বলল,
— সেটাই তো সমস্যা। তুমি আর দুনিয়ার সবাই এক নও। তবে একটা কথা ভাবছি... এত ভদ্র হয়ে থাকলে চলবে না। নইলে আমার সবচেয়ে প্রিয় মানুষটাকে সারাজীবনের জন্য নিজের করে নিতে দেরি হয়ে যাবে।
কিয়ারা দীর্ঘশ্বাস ফেলে আবারও ব্যথা পাওয়া জায়গাটায় হাত বুলিয়ে বিড়বিড় করে বলল,
— ধ্যাত! এখন আমি বাসায় কীভাবে যাব? এমনিতেই মা আজকাল আমাকে নিয়ে একটু বেশিই সন্দেহ করেন।
শান আলতো করে ওর হাতটা সরিয়ে দিয়ে নরম গলায় বলল,
— বারবার হাত দিও না। এতে জায়গাটা আরও জ্বালা করতে পারে। আর দোষটা কিন্তু পুরোপুরি আমারও না। তুমি এমনভাবে আমার দিকে তাকাও যে, নিজের ওপর নিয়ন্ত্রণ রাখা কঠিন হয়ে যায়। তারপর আবার সব দোষ আমার ঘাড়েই চাপিয়ে দাও।
কিয়ারা সঙ্গে সঙ্গে ভ্রু কুঁচকে বলল,
— আচ্ছা, এসব আজেবাজে কথা বাদ দাও। আগে বলো, আমি এখন বাইরে যাব কীভাবে?
শান উঠে দাঁড়াতে দাঁড়াতে দুষ্টু হেসে বলল,
— এত চিন্তার কিছু নেই। এমন আত্মবিশ্বাস নিয়ে হাঁটবে, যেন সবাই বুঝতে পারে— তুমি আরিয়ান চৌধুরী শানের একান্ত ব্যক্তিগত।
কিয়ারা মুখ ফুলিয়ে প্রতিবাদ করল,
— আমার ক্লোজ ফ্রেন্ডরা সবাই জানে, আমার জীবনে একজন বিশেষ মানুষ আছে। তাই ওরা কাউকে আমার আশেপাশে ঘেঁষতেও দেয় না। কিন্তু তোমার আশেপাশে তো রোজই কত মেয়েকে দেখা যায়!
কথাটা শুনে শান হেসে ফেলল। তারপর ধৈর্য নিয়ে বোঝানোর ভঙ্গিতে বলল,
— ওসব নিয়ে এত ভাবার কিছু নেই। অনেকেই বিভিন্ন প্রয়োজনে আসে, কথা বলে। কিন্তু সেগুলোর সঙ্গে আমার ব্যক্তিগত জীবনের কোনো সম্পর্ক নেই। আমি যখন আমার জীবনের সবচেয়ে সুন্দর মানুষটাকে পেয়েছি, তখন অকারণে অন্য কারও দিকে তাকানোর প্রশ্নই আসে না।
শানের কণ্ঠে ছিল নিঃসংকোচ আত্মবিশ্বাস।
কিয়ারাও শান্ত হয়ে গেল। সে জানে, বাইরে শান সবার সঙ্গে ভদ্র, সংযত আর মার্জিত আচরণ করলেও, নিজের সমস্ত দুষ্টুমি, অভিমান আর খুনসুটির অধিকার সে শুধু কিয়ারাকেই দিয়েছে।
আর এই কারণেই হয়তো রাহা আজও দৃঢ় বিশ্বাস করে— তার ভাই পৃথিবীর সবচেয়ে শান্ত, ভদ্র আর নম্র ছেলে। নীলকে নিয়েই যত অভিযোগ, যত দোষারোপ। 
— ভাবি, নীল কোথায়?
পার্সের ভেতর কী যেন খুঁজতে খুঁজতেই কথাটা বললেন শিরিন। এদিকে রুবিনা খান রান্নাঘরে দাঁড়িয়ে সাজিদ খানের জন্য কফি বানাচ্ছিলেন। ননদের প্রশ্ন শুনে একবারও পেছনে না তাকিয়ে শান্ত, গম্ভীর কণ্ঠে উত্তর দিলেন,
— ঘরেই আছে হয়তো।
আর এক মুহূর্তও দেরি না করে শিরিন সিঁড়ি বেয়ে সোজা নীলের ঘরের দিকে উঠে গেলেন।
ঘরের দরজা আধখোলা ছিল। ভেতরে ঢুকেই দেখলেন, নীল বিছানায় উপুড় হয়ে শুয়ে মোবাইলে কী যেন খুব মনোযোগ দিয়ে করছে। আশপাশে কী হচ্ছে, সেদিকে যেন তার কোনো খেয়ালই নেই। শিরিন এগিয়ে গিয়ে বিছানার একপাশে বসে হালকা ধমকের সুরে বললেন,
— এই নীল! সারাদিন এমন কী করিস তুই?
ফুপির কণ্ঠ শুনে নীল চমকে মাথা তুলে বসল। কপাল কুঁচকে অবাক চোখে তাকিয়ে বলল,
— কেন? কী হয়েছে?
শিরিন ব্যাগ থেকে কয়েকটি সুন্দর প্রিন্ট করা কার্ড বের করে ওর দিকে বাড়িয়ে দিলেন।
— তোর ভার্সিটির মেয়েদের কাছে এগুলো দিয়ে দিবি। আমার নতুন সেলুনের ডিসকাউন্ট কার্ড। একটু প্রচার হবে।
নীল কার্ডগুলোর দিকে একবার তাকিয়ে চোখ সরু করে দুষ্টু হাসি হেসে বলল,
— ফুপি, ফ্রিতে কিন্তু আমি কোনো কাজ করি না। সেটা তো জানোই।
ভাতিজার কথায় শিরিন হেসে ফেললেন।
— ঠিক আছে, কাজের পারিশ্রমিক পাবি। তোর প্রিয় মুভির চারটা টিকিট দেব। এবার খুশি?
কথাটা শুনেই নীলের মুখে চওড়া হাসি ফুটে উঠল।
কার্ডগুলো গুনে গুনে হাতে নিল। তারপর চুপিসারে একটা বাড়তি কার্ডও নিজের কাছে রেখে দিয়ে বলল,
— চারটা টিকিটে হবে না। পাঁচটা লাগবে। অনেকদিন হলো বন্ধুদের ট্রিট দেওয়া হয় না। আজ সবাইকে নিয়ে ঘুরে আসব।
শিরিন মাথা নেড়ে অসহায় ভঙ্গিতে হেসে বললেন,
— তুই কোনোদিন মানুষ হবি না।
এ কথা বলেই তিনি ঘর থেকে বেরিয়ে গেলেন।
শিরিন চলে যেতেই নীলও বিছানা থেকে নেমে হেলেদুলে সিঁড়ি বেয়ে নিচে নেমে এল।
ডাইনিং টেবিলের একটি চেয়ারে গিয়ে ধপ করে বসে পড়ল। তারপর রান্নাঘরে ব্যস্ত মায়ের দিকে বড় বড় অসহায় চোখে তাকিয়ে এমন এক মুখ বানাল, যেন পৃথিবীর সবচেয়ে বড় অবিচারটা তার সঙ্গেই হয়েছে।
— মা... আমি তো বড় হয়ে যাচ্ছি! আমার বিয়ে দিচ্ছ না কেন?
হঠাৎ ছেলের মুখে এমন কথা শুনে রুবিনা খান থমকে গেলেন। হাতে ধরা কফির মগটাও প্রায় পড়ে যাওয়ার উপক্রম। কয়েক মুহূর্ত বিস্মিত চোখে ছেলের দিকে তাকিয়ে রইলেন।
গত কয়েক মাস ধরে ছেলেটার একটাই রাগ, একটাই আবদার— "আমার বিয়ে দাও।" এমন বিয়েপাগল ছেলে তিনি জীবনে দেখেননি।
ছোটবেলা থেকেই নীলের স্বভাব ছিল ঠোঁটকাটা। মনে যা আসে, কোনো রাখঢাক না করেই মুখের ওপর বলে দেয়। আর এখন তো মনে হচ্ছে বিয়ের ভূতই মাথায় চেপে বসেছে। রুবিনা খান শেষ পর্যন্ত আর কোনো উত্তর দিলেন না। শুধু অসহায় ভঙ্গিতে মাথা নেড়ে আবার নিজের কাজে মন দিলেন। মনে মনে একটাই কথা ঘুরপাক খেতে লাগল—
"এই ছেলেটার মাথায় আসলেই একটু সমস্যা আছে। নাহলে এই বয়সে কেউ সারাক্ষণ বিয়ের জন্য এমন পাগলামি করে?"
চলবে...
( বি দ্রঃ রিচেক দেইনি ভুল ত্রুটি ক্ষমার দৃষ্টিতে দেখবেন আর আমাকে জানাবেন ঠিক করে দিবো) 

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ৪র্থ পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন