#প্রনয়ের_প্রলয়
#কলমে_মেহরিমা_সারা
#পর্ব১৩
📌(গল্প শেষে অবশ্যই নোট গুলো পড়বেন)
শান আর কিয়ারা হাসপাতালের উত্তর দিকের রাস্তার অপর পাশে মাঠের একটি বেঞ্চে বসে আছে। মাঠজুড়ে হালকা ব্যস্ততা—কেউ হাঁটাচলা করছে, কেউ আবার বসে বাচ্চাদের খেলা দেখছে।
শান আর কিয়ারা যখন মেডিসিন নিয়ে হাসপাতালে পৌঁছায়, তখন একজন নার্স জানায়।
নীল ঘুমাচ্ছে। ডাক্তার তাকে দেখে স্লিপিং পিল দিয়েছেন, তাই এখন কেবিনে ঢোকা যাবে না।
অগত্যা, মেডিসিনের তীব্র গন্ধে ভরা হাসপাতালের ভেতরে না থেকে ওরা দুজন বাইরে এসে বসেছে, একটু ফ্রেশ হাওয়ার জন্য। সকাল থেকে নীলকে নিয়ে প্রায় সবাই এতটাই চিন্তিত ছিল যে কারও মন স্থির ছিল না।
শান কিয়ারার দিকে তাকিয়ে দেখে, মেয়েটা অস্বাভাবিকভাবে চুপ করে আছে। যদিও কিয়ারা স্বভাবে শান্ত-শিষ্ট, তবে সেটা অপরিচিত মানুষ বা বড়দের সামনে। কাছের মানুষদের সামনে সে বরাবরই দুষ্টু, চঞ্চল আর অধৈর্য।
শান ধীরে নিজের বাম হাতটা কিয়ারার কোলের ওপর রাখা হাতের ওপর রাখে। হঠাৎ স্পর্শ পেয়ে কিয়ারা চমকে উঠে শানের দিকে তাকায়।
শান ভ্রু কুঁচকে জিজ্ঞেস করে,
—“কি হয়েছে?”
কিয়ারা অন্যমনস্ক ভঙ্গিতে বলে ওঠে,
—“আমি যা ভাবছি যদি তা-ই হয়, তাহলে ছোট ভাইয়ার কপালে শনি আছে…”
শান কিছুই বুঝতে না পেরে কিয়ারার হাতটা ধরে নিজের দিকে ফিরিয়ে আনে। হতভম্ব কণ্ঠে বলে,
—“কি ভাবছো তুমি? আর নীলের কপালে শনি মানে?”
কিয়ারা তখনই বুঝতে পারে—সে বড় একটা ভুল করে ফেলেছে। তাড়াহুড়ো করে কথাটা সামলাতে গিয়ে বলে ওঠে,
—“আসলে… আমার মনে হচ্ছে ছোট ভাইয়া কাউকে পছন্দ করে। বাড়ির কেউ এটা জানতে পারলে ভাইয়ার কপালে শনি আছে।”
শানের চোখ বিস্ময়ে বড় হয়ে যায়। কিয়ারার দিকে হা করে তাকিয়ে থাকে। আর কিয়ারা বুঝতে পারে—ভাইকে বাঁচাতে গিয়ে সে উল্টো আরও ফাঁসিয়ে ফেলেছে।
শান অবাক হয়ে বলে,
—“নীল কাউকে পছন্দ করে? কে সে মেয়ে? কোথায় থাকে? দেখতে কেমন?”
সে একটার পর একটা প্রশ্ন করতেই থাকে, যেন হঠাৎ করেই বিষয়টা তাকে ভীষণ উত্তেজিত করে তুলেছে।
কিয়ারা চুপচাপ শানের আনন্দময় মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে। তারপর মনে মনে ভাবে—
শান যদি জানে আমি কাকে মিন করছি, তাহলে ও নিশ্চিত শকে পড়ে যাবে…
সে নিজেও ভীষণ শকড—
ছোট ভাইয়া কিনা রাহা আপুকে… না না, এটা কি করে সম্ভব!
মাথার ভেতর একের পর এক প্রশ্ন ঘুরতে থাকে—
রাহা আপু কি জানে? নাকি সবটাই আমার ভুল ধারণা?
না, ছোট ভাইয়ার কাছ থেকে নিশ্চিত না হয়ে কিছু বলা যাবে না।
—“এই! তোমার কি হয়েছে? বলো তো—নীল যাকে পছন্দ করে, তুমি কি তাকে চেনো? দেখেছো?”
শানের প্রশ্নে কিয়ারা বিরক্ত হয়ে বলে ওঠে,
—“উফ! থামবে তুমি? আমি কীভাবে জানবো? আমি শুধু সন্দেহ করেছি। আমার সন্দেহ ভুলও হতে পারে।”
কিয়ারার বিরক্ত কণ্ঠ শুনে শান বেচারা আহাম্মকের মতো তাকিয়ে থাকে।
মনে মনে ভাবে—
আজব ভাই-বোন! কখন কী বলে, নিজেরাও বুঝে না…
___________________________
আদি ক্লান্ত শরীরে বাসায় ফিরে প্রথমেই শাওয়ার নেয়। সারারাত না ঘুমিয়ে থাকার কারণে বেডে শোয়া মাত্রই গভীর ঘুমে তলিয়ে যায়।
আসরের সময় তার পিএর ফোনে ঘুম ভাঙে। কিছুক্ষণ অফিসিয়াল আলাপ করে ফোন রেখে দেয়। এরপর হঠাৎই ফোনের ওয়ালপেপারে থাকা চারজন বাচ্চার একটি গ্রুপ ফটো চোখে পড়ে।
নীলিমা চৌধুরী আর আরমান চৌধুরীর সাথে ওরা যখন ঘুরতে গিয়েছিল, তখন নীলিমা চৌধুরী ওদের চারজনকে একসাথে দাঁড় করিয়ে ছবি তুলেছিলেন।
আদি আর রাহা বড় ছিল বলে ওদের দুজনকে একসাথে দাঁড় করানো হয়েছিল, আর সামনে রাখা হয়েছিল নীল আর শানকে। কিন্তু ওই নীল বিচ্ছু কি আর চুপ করে থাকে! রাহাকে জ্বালাতে তার হাত ধরে ঝুলে পড়ে। শানও নীলের দেখাদেখি আদির হাত ধরে।
শেষমেশ নীলিমা চৌধুরী বাধ্য হয়ে সেই অবস্থাতেই ছবি তুলে নেন।
স্মৃতিটা মনে পড়তেই আদির ঠোঁটের কোণে মুচকি হাসি ফুটে ওঠে।
গ্যালারি খুলে সে আরেকটা ছবি বের করে—একটা হাস্যোজ্জ্বল অষ্টাদশীর ছবি।
ছবিটা দেখা মাত্রই তার ঠোঁটের কোণে আরও গভীর হাসি ফুটে ওঠে।
এই সেই অষ্টাদশী—যে তার জীবনে প্রথম বসন্ত নিয়ে এসেছিল।
যে তার রসকষহীন জীবনে রঙিন ফানুস উড়িয়েছিল।
আজও তার কানে বেজে ওঠে সেই খিলখিল হাসি
যে হাসি একজন গম্ভীর মানুষের ঠোঁটেও অজান্তেই হাসি ফুটিয়ে তুলতে পারে।
আদির চোখে ভেসে ওঠে সেই সব সোনালী মুহূর্ত, যেদিন সে প্রথম ইরাকে দেখেছিল।
ছোটবেলায় প্রায় প্রতিদিনই নীলিমা ভিলায় ওদের যাতায়াত ছিল। বড় হওয়ার পর পড়াশোনার ব্যস্ততায় প্রয়োজন ছাড়া তেমন যাওয়া হতো না।
একদিন বিকেলের শেষ প্রহরে ভার্সিটি থেকে বাড়ি ফিরেই সাজিদ খানের কাছ থেকে শুনেছিল—রাহা এ্যাবরোড যাবে।
ব্যস! আদিকে আর কে আটকায়! ঘামে ভেজা শরীর নিয়েই সে ছুটে যায় নীলিমা ভিলায়।
ক্লান্ত শরীরে সদর দরজায় পা রাখা মাত্রই শীতল বাতাসের মতো এক দমকা হাওয়া তার শরীর ছুঁয়ে যায়।
লিভিং রুমে বসে কেউ উচ্চস্বরে হেসে যাচ্ছে, আর আরমান চৌধুরীও সেই হাসিতে সঙ্গ দিচ্ছেন। এমনকি গম্ভীর স্বভাবের রাহাও সেদিন হেসেছিল।
আদি যেন সব ভুলে মন্ত্রমুগ্ধের মতো সেই হাসির শব্দ শুনতে থাকে।
আরমান চৌধুরী আদিকে খেয়াল করে হেসে ডেকে উঠলে তার হুঁশ ফিরে আসে।
ধীরে ধীরে এগিয়ে গিয়ে সোফায় বসে থাকা রাহার সামনে দাঁড়ায়। রাহা তাকে দেখে উঠে দাঁড়ায়।
ততক্ষণে ইরাও হাসি থামিয়ে সদ্য যৌবনে পা রাখা শাহরিয়ার খান আদির দিকে তাকিয়ে থাকে।
আদি একপলক ইরার দিকে তাকিয়ে আবার রাহার দিকে ফিরে জিজ্ঞেস করে,
—“তুই কি সত্যিই এ্যাবরোড যাবি?”
রাহা স্পষ্ট ভাষায় জানায়—সে যাবে।
আরমান চৌধুরীর দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলে তিনি জানান—তিনি অনুমতি দিয়েছেন।
রাহা তাকে রাজি করাতে পেরেছে, আর তিনি আদরের মেয়েকে নিষেধ করতে পারেননি।
সেদিন আদি কি যে রেগে ছিল!
আম্মি মারা যাওয়ার পর থেকে সে রাহাকে কখনোই চোখের আড়াল হতে দেয়নি। দূরে থেকেও সবসময় ওর পাশে থেকেছে, সবসময় সাপোর্ট করেছে। রাহা যে তার দায়িত্ব—সব পরিস্থিতিতে তাকে প্রটেক্ট করতে হবে—এই কথাটাই তো সে নিজের আম্মিকে কথা দিয়েছিল।
আর রাহাও সবকিছু করার আগে, নিজের ফ্রেন্ডসম আদিকে জানিয়ে তবেই করত। অথচ এত বড় একটা সিদ্ধান্ত—বিদেশে যাওয়া—ওকে না জানিয়ে নেওয়ায় আদির ভীষণ রাগ হয়েছিল।
আদি রাহার কলেজেও যেত। রাহাকে কেউ বিরক্ত করেছে শুনলেই সেই ছেলেকে গিয়ে শাসিয়ে আসত। এরপর সেই ছেলেগুলো আর কোনোদিন রাহার ধারে কাছেও ঘেঁষেনি।
ইরাকে প্রথম দেখাতেই পছন্দ করার পর তো আদি প্রায় প্রতিদিনই কলেজে যাওয়ার অজুহাত খুঁজে নিত। কখনো কখনো তো ভার্সিটিই মিস দিত—শুধু ইরাকে একপলক দেখার জন্য।
নিজের অনুভূতি নিয়ে নিশ্চিত না থাকায়, রাহার কাছ থেকে সরাসরি নাম্বার না নিয়ে বহু কসরত করে, এমনকি টাকা খরচ করেও ভার্সিটি থেকে ইরার নাম্বার জোগাড় করেছিল—শুধু মেয়েটার কণ্ঠ শোনার জন্য।
প্রথম যেদিন ইরার নাম্বারে ডায়াল করেছিল, সেদিনই আদি বুঝেছিল—সে ভীষণ ভীতু। তার হাত অস্বাভাবিকভাবে কেঁপে উঠছিল।
প্রথম কলটায় সে কিছুই বলতে পারেনি। বরং ইরার কর্কশ গলায় বুঝে গিয়েছিল—এই মেয়েটা রাহারই বেস্ট ফ্রেন্ড। রাহার সেই কঠিন ভাষার প্রভাব ইরার মাঝেও স্পষ্ট ছিল।
একদিন কলেজে খোঁজ নিয়ে সে জানতে পেরেছিল—এক ছেলে সরাসরি রাহাকে প্রপোজ করেছিল। প্রথমে রাহার হাতে অগণিত চড় খেয়েছিল, তারপর দ্বিতীয় দফায় ইরার লাথি খেয়ে এমন শিক্ষা পেয়েছিল যে, আর কোনোদিন তাকে কলেজে দেখা যায়নি।
এমন ঘটনা একবার নয়, বহুবার ঘটেছে।
যে-ই সাহস করে এগিয়ে এসেছে, সবাই রাহার চড় আর ইরার লাথি খেয়ে পালিয়েছে।
রাহা অত্যন্ত সুন্দর ছিল—বিশেষ করে তার ডার্ক ব্রাউন চোখের জন্য। স্কুল-কলেজে অসংখ্য লাভ লেটার পেয়েছে সে। কেউ দূর থেকে চোখ মেরেছে, কেউ সাহস করে এগিয়ে এসেছে।
কেউ আদির ভয়ে সরে গেছে, আর কেউ দুই বান্ধবীর কড়া ডোজ খেয়ে।
সেদিন এসব মনে করে আদি কি যে হেসেছিল!
তার জীবনের সবচেয়ে প্রিয় দুই মানুষই ছিল বেশ রগচটা স্বভাবের—
একজন তার দায়িত্ব, আর অন্যজন তার প্রিয়বতী।
প্রথমে রাহার বাইরে যাওয়া নিয়ে আদি ভীষণ দুশ্চিন্তায় থাকলেও শেষমেশ রাজি হয়—যখন জানতে পারে ইরাও তার সঙ্গে যাবে।
ইরা যে রাহাকে কতটা ভালোবাসে, সেটা এই কয়েকদিনেই সে বুঝে গিয়েছিল। আর যাই হোক, ইরা থাকলে রাহাকে নিয়ে কোনো ভয় নেই—মায়ের মতো করে ঠিক সামলে নেবে।
স্কুল জীবনে রাহা অতি প্রয়োজন ছাড়া একটা কথাও বলত না। কিন্তু কলেজে ইরাকে পাওয়ার পর সে অনেকটাই বদলে গিয়েছিল।
তাই শেষমেশ নিজের রাগ ঝেড়ে ফেলে আদি নিজেই রাহার সব কাগজপত্র গুছিয়ে দিয়েছিল।
এর মাঝেই ঘটে এক অদ্ভুত মিরাকেল—
আদি ফেসবুকে ইরাকে যে ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট পাঠিয়েছিল, সেটা ইরা এক্সেপ্ট করে।
অনেক সাহস জুগিয়ে আদি সেদিন মেসেজ করেছিল। ইরা প্রথমে তার পরিচয় জানতে চাইলে, আদি সরাসরি নিজের পরিচয় দিয়ে জানায়—
ইরা যেহেতু রাহার ফ্রেন্ড, তাই রাহার কলেজে কোনো সমস্যা হচ্ছে কি না জানার জন্যই সে কথা বলতে চায়।
রাহাকে অজুহাত বানিয়ে আদি প্রায় প্রতিদিনই ইরাকে মেসেজ দিত।
ইরাও রাহার সব আপডেট তাকে জানাত।
ধীরে ধীরে কথোপকথনের কেন্দ্রবিন্দু রাহা থেকে সরে এসে ইরাতে গিয়ে ঠেকে।
ওদের কথাগুলোও ধীরে ধীরে বদলাতে থাকে—
স্বাভাবিক আলাপচারিতা থেকে একসময় তা প্রেমময় হয়ে ওঠে।
মাঝে মাঝে তারা বাইরে ঘুরতেও যেত।
ইরা আর রাহার ইউএস যাওয়ার এক সপ্তাহ আগে, আদি অবশেষে সাহস করে ইরাকে প্রপোজ করে।
ইরাও কোনো ভনিতা না করে, লাজুক হাসি নিয়ে সেই প্রপোজাল এক্সেপ্ট করে নেয়।
পরবর্তীতে, ইরা ইউএস যাওয়ার দু’বছর পর আদি জানতে পারে—
ইরাও তাকে পছন্দ করত, তাও আদির আগে থেকেই।
আদি যখন কলেজে যেত, ইরা তার অগোচরেই তাকে দেখত।
আদির ফেসবুক আনলক থাকায় প্রতিদিন তার আপডেটও দেখত।
—“ভাইজান, ম্যাডাম আপনাকে ডেকেছে।”
শর্মিলার ডাকে আদির ধ্যান ভেঙে যায়।
এতক্ষণ অতীতের স্মৃতিতে ডুবে থেকে সে একা একাই মৃদু হাসছিল।
আদি ধীরে একটি দীর্ঘশ্বাস ফেলে শর্মিলাকে বলে,
—“দশ মিনিটের মধ্যে রেডি হয়ে আসছি।”
_____________________________
ঠক ঠক শব্দে দরজায় নক পড়তেই নীলের কপাল কুঁচকে যায়। বিরক্তি মাখা চোখে সে ধীরে ধীরে রাহার ঘাড় থেকে মুখ তোলে, এক ঝলক ঘড়ির দিকে তাকায়—পাঁচটা বাজতে আর বেশি দেরি নেই। যেকোনো সময় বড় বাড়ির লোকজন এসে পড়তে পারে। হয়তো নার্সই সতর্ক করতে এমন করে নক দিচ্ছে।
একটা গভীর, অলস নিঃশ্বাস ফেলে নীল আবার রাহাকে আরও শক্ত করে জড়িয়ে ধরে। মুখটা গুঁজে দেয় ওর ঘাড়ের কাছে, বড় বড় করে কয়েকটা শ্বাস নেয়—মনে হয় যেন এই গন্ধ, এই উষ্ণতা বুকভরে জমিয়ে রাখতে চায়। উফ! কতদিন পর সে মেয়েটাকে এভাবে ছুঁতে পারলো… এখনই ছেড়ে দিতে ইচ্ছে করছে না একটুও। তবুও বাস্তবতা তো মানতেই হবে।
নিজেকে জোর করে সামলে নিয়ে নীল আলতো করে রাহার ঘাড়ে একটা চুমু খায়, তারপর ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়ায়। রাহার হাতটা নিজের গলায় জড়িয়ে নিয়ে ওকে পাঁজাকোলা করে তুলে নেয়, যেন ভীষণ যত্নে রাখা কোনো মূল্যবান কিছু। দরজা খুলে নার্সকে ইশারায় ডাকতেই সে ভেতরে উঁকি দিয়ে ফিসফিসিয়ে জানায়,
—আরও একটু পর বের হওয়া নিরাপদ হবে।
দুই মিনিট অপেক্ষা করার পর নার্স তাড়াতাড়ি ইশারা দেয়—এখন আশেপাশে কেউ নেই। নীল সতর্ক দৃষ্টিতে চারপাশ দেখে নিয়ে দ্রুত পা ফেলে রাহাকে নিয়ে পাশের আরেকটা কেবিনে ঢুকে পড়ে।
খুব আস্তে করে রাহাকে বেডে শুইয়ে দেয় সে, যেন একটু অসাবধান হলেই মেয়েটা ভেঙে যাবে। চাদরটা টেনে দিয়ে কিছুক্ষণ স্থির হয়ে তাকিয়ে থাকে ওর দিকে। সেই চেনা মুখ, সেই নির্ভার ঘুম—সবকিছু যেন নীলের ভেতরে ঝড় তুলছে।
হঠাৎ বাতাসে উড়ে আসা কয়েকটা চুল রাহার মুখ ঢেকে দেয়। বিরক্তি নিয়ে নীল ফুঁ দিয়ে চুলগুলো সরিয়ে দিয়ে নরম গলায় বলে,
— “বেয়াদব চুল… সব সময় তোমার আর আমার মাঝে আসে।”
তারপর আঙুল তুলে শাসানোর ভঙ্গিতে ফিসফিস করে,
— “একবার রাহামনি পুরোপুরি আমার হয়ে যাক… তখন তোকে সিমেন্ট দিয়ে আটকে রাখবো, বুঝেছিস?”
একটা বড় নিঃশ্বাস নিয়ে মুখটা একটু ফুলিয়ে আবার বলে,
— “দেখলে? তুমি আমার সবচেয়ে বড় মেডিসিন… কয়েক ঘণ্টায়ই কেমন আমাকে ঠিক করে দিলে।”
চোখের কোণে অদ্ভুত এক মায়া আর কষ্টের ছাপ নিয়ে মৃদু হেসে ফিসফিস করে,
— “আমার অসুস্থতার কারণও তুমি… আবার সুস্থতার কারণও তুমি।”
একটু থেমে, গলায় হালকা কঠোরতা এনে বলে,
— “তুমি আজ আবারও একটা ভুল করেছো… উঁহু, প্রায়ই করো। এই ভুলের শাস্তি কিন্তু তোমাকে পেতেই হবে। শাস্তি পেলে পরের বার স্কার্ফ নিতে ভুলবে না—আমি জানি। খুব তাড়াতাড়িই শাস্তি পাবে তুমি…”
ধীরে ধীরে রাহার হাতটা তুলে নিয়ে ওর আঙুলে থাকা রিংটা খুলে নেয়। এক মুহূর্ত সেটার দিকে তাকিয়ে থেকে পকেটে রেখে দেয়। ঠোঁট চেপে ধরে নিচু গলায় বলে,
— “এটার কথা তো একদম ভুলেই গিয়েছিলাম… অনেক আগেই খুলে ফেলা উচিত ছিল।”
এরপর নীল নিচে নেমে বসে রাহার পায়ের কাছে। খুব যত্ন করে ওর বাম পা’টা নিজের দিকে টেনে নিয়ে সেই লাল ছোট্ট তিলটার উপর প্রতিবারের মতোই নিজের আলতো করে ঠোঁট ছুঁইয়ে দেয়। সেই স্পর্শে যেন অগণিত না বলা কথা মিশে থাকে।
তারপর ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়ায় সে। আর একবার তাকায় রাহার দিকে—চোখভরা আবেগ, অপ্রকাশিত ভালোবাসা আর এক অদ্ভুত অধিকার নিয়ে।
এরপর নিঃশব্দে দরজা খুলে, সব অনুভূতি বুকের ভেতর লুকিয়ে রেখে, নীল বেরিয়ে যায়… যেন কিছুই ঘটেনি।
চলবে...