#প্রনয়ের_প্রলয়
#কলমে_মেহরিমা_সারা
#পর্বঃ১৫
" ভার্সিটির গ্যাং সাদমানের ছেলেপেলেরা আবার মা/রা/মা/রি করে এসেছে চিকিৎসা নিতে। আজ অফ ডে হওয়ায় হাসপাতালে তেমন কেউ নেই, আপনি ছাড়া। যদি একটু দেখে যেতেন—"
সারাদিনের ক্লান্তিকর ডিউটি শেষে বাবার ফোন পেয়ে তাড়াহুড়ো করে বাসার উদ্দেশ্যে বের হচ্ছিলো ডক্টর নীলিমা জামান। নার্সের কথায় থেমে যায়। কপাল কুঁচকে বিরক্ত ভঙ্গিতে হাতঘড়ির দিকে তাকিয়ে বলে,
--" রাত এগারোটা বাজে, আর এখন মা/রা/মা/রি করে হাসপাতালে এসেছে! এদের তো পুলিশে দেওয়া উচিত।"
নার্স হালকা হাসি দিয়ে বোঝানোর সুরে বলল,
--" আপনি নতুন বলেই এমনটা বলছেন। পুলিশও এদের ধরতে ধরতে ক্লান্ত। গেঞ্জাম করা এদের নিত্যদিনের অভ্যাস। তবে ওদের দলের দু’টা ছেলে নাকি খুব ভালো—লোকমুখে শুনেছি, ভার্সিটি এলাকা থেকে শুরু করে এই হাসপাতাল পর্যন্ত যত পথভিখারী আছে, সবাইকে সাহায্য করে।"
নীলিমা আর কিছু না বলে ব্যাগটা রেখে স্টেথোস্কোপ হাতে তুলে নেয়। চোখের ইশারায় নার্সকে আগে যেতে বলে, তারপর নিজেও পা বাড়ায়।
ওদিকে জরুরি কক্ষে—
--" এই বাল ডক্টর কি মরেছে নাকি?"
রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে চিৎকার করছিল সাজিদ। এক হাতে বন্ধুর ফেটে যাওয়া কপালে কাপড় চেপে ধরে রেখেছে সে।
ঠিক তখনই পিছন থেকে ঠান্ডা, চিবিয়ে বলা কণ্ঠ—
--" ডক্টররা মরেনি। তবে তুমি চিল্লাচিল্লি করলে তোমাদের মারতে ভুলবে না।"
কথাটা শুনে বেডে বসে থাকা আরমান ভ্রু তুলে তাকাল। হাত তুলে সাজিদকে একটু সরিয়ে দিল, নিজেও সামনে তাকাল। সাজিদও পিছনে ঘুরে কিছু বলতে যাচ্ছিল—কিন্তু দুজনের কথাই যেন হঠাৎ থেমে গেল।
সামনে দাঁড়িয়ে আছে এপ্রোন পরা এক মেয়ে—দুধে আলতা গায়ের রং, আর চোখ দুটো অদ্ভুত নীলাভ গভীর। যেন কোনো বিদেশিনী। মুহূর্তের জন্য চারপাশের সব শব্দ স্তব্ধ হয়ে যায়। সাজিদ আর আরমান দুজনেই মুগ্ধ দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে—নীলিমা যেন বাস্তবের কেউ না, স্বপ্ন থেকে উঠে আসা কোনো নীলাম্বরী।
নীলিমা ওদের চেহারা-চলন দেখেই বুঝে নিয়েছিলো—বখাটে টাইপের ছেলে। তাই অযথা কথা না বাড়িয়ে সরাসরি কাজে লেগে গেলো। আরমানের কপালের ক্ষত পরীক্ষা করে ব্যান্ডেজ করতে করতে কড়া গলায় বলে ওঠে,
--" সামনে থেকে না সরলে কাজ করবো কীভাবে?"
সাজিদ যেন হঠাৎ বাস্তবে ফিরে এসে তাড়াতাড়ি সরে দাঁড়াল।
নীলিমা মনোযোগ দিয়ে ব্যান্ডেজ করতে করতে একপলক আরমানের দিকে তাকায়, যে ড্যাবড্যাব করে ওর দিকেই তাকিয়ে আছে এতে করে নীলিমার খানিকটা অস্বস্তি হয় তবুও শান্ত কিন্তু দৃঢ় কণ্ঠে বললো,
--" ভার্সিটি পড়াশোনার জায়গা, মা/রা/মা/রি/র না। আর ভালো কাজ করে খারাপ কাজ করলে—ভালো কাজগুলোর কোনো মূল্য থাকে না।"
আরমান আর সাজিদ দুজনেই ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইল। যেন কথাগুলো কানে গেলেও মনটা অন্য কোথাও আটকে আছে।
হঠাৎ সাজিদ বলে উঠল,
--" হেই ডক্টর… ইউ আর ফরেইনার?"
আরমান সাথে সাথেই যোগ করল,
--" আর ইউ ম্যারিড?"
নীলিমা এক মুহূর্তের জন্য থমকে যায়। বিস্ময় আর বিরক্তি একসাথে মুখে ফুটে উঠল। তারপর কড়া চোখে তাকিয়ে বলে উঠে ,
--" আমি যা-ই হই, তাতে তোমাদের কী?"
এরপর একে একে সবার ব্যান্ডেজ শেষ করে প্রেসক্রিপশন লিখে দেয়। আরমানের দিকে তাকিয়ে সংক্ষেপে বললেন,
--" কাল এসে একবার চেকআপ করিয়ে নিবে।"
তারপর আর এক মুহূর্তও না থেকে সোজা বেরিয়ে যায়।
আরমান নির্বাক হয়ে তাকিয়ে রইল। মনে হচ্ছিল—কেউ একজন স্বপ্নের দরজা খুলে এসে আবার হঠাৎই হারিয়ে গেল।
এক দেখাতেই কারো প্রতি এতটা মুগ্ধ হওয়া যায়—এ কথা হয়তো আরমান আর সাজিদ কখনোই বিশ্বাস করত না, যদি না তারা ডক্টর নীলিমা জামানকে দেখত।
পরদিন—
চেকআপের অজুহাতে সকাল সকাল হাসপাতালের সামনে হাজির দুই বন্ধু। বাহ্যিকভাবে আলাদা কারণ থাকলেও গন্তব্য কিন্তু একটাই—তাদের নীলাম্বরী।
আরমানকে বসিয়ে রেখে সাজিদ পুরো হাসপাতাল ঘুরে নীলিমার খোঁজ নিতে লাগল।
এরপর শুরু হলো নতুন এক রুটিন—
সামান্য ব্যথার অজুহাতে, কখনো মাথা ঘোরা, কখনো হাত কাটা—এইভাবে টানা এক মাস ধরে তারা হাসপাতালে চক্কর কাটতে লাগল।
নীলিমা অবশ্য নিজের জীবন নিয়েই ব্যস্ত ছিলো যেন এসবে তার ধ্যান নেই। এসব কিছু যেন তার চোখেই পড়েনি।
তবে সাজিদ থেমে থাকার ছেলে না। খোঁজখবর নিয়ে একসময় অনেক কিছুই জেনে ফেলল—
নীলিমার মা নেই। আগে তারা যুক্তরাষ্ট্রে থাকত, প্রায় আট মাস আগে পুরো পরিবার নিয়ে বাংলাদেশে এসেছে। তিন ভাইবোনের মধ্যে নীলিমা মেঝো। বড় ভাই একটি প্রাইভেট কোম্পানিতে চাকরি করে—তার স্ত্রী আর চার বছরের একটি ছেলে আছে। ছোট বোন নওরিন, ক্লাস এইটে পড়ে।
গত বছর বিদেশ থেকে পড়াশোনা শেষ করে দেশে ফিরে মাত্র তিন মাস হলো হাসপাতালে চাকরি শুরু করেছে নীলিমা। ভালো শিক্ষাগত যোগ্যতার কারণে চাকরি পেতে তাদের তেমন কোনো সমস্যা হয়নি।
আর তাদের বাবা—জায়েদ জামান…
ভীষণ রাগী, কঠোর স্বভাবের মানুষ।
সব শুনে সাজিদের ঠোঁটে ধীরে ধীরে এক চতুর হাসি ফুটে উঠল।
মনে মনে ভাবল—
"মেয়েকে পাওয়ার আগে… মেয়ের বাবাকেই পটাতে হবে!"
________________________
নীলিমা বাইরে থেকে কঠোর—অপরিচিতদের সামনে তার কথাবার্তায় একটা রুক্ষতা থাকলেও, নিজের পরিবারে সে একেবারেই অন্য মানুষ; কোমল, শান্ত আর মায়াময়। বড় ভাই জেভান ইদানীং লক্ষ্য করছে, বোনটার মধ্যে অদ্ভুত এক পরিবর্তন এসেছে। যে মেয়েটা এখানে আসার পর বেশ উদাসীন আর নির্লিপ্ত হয়ে থাকত, সে এখন অকারণেই হাসে, নিজের মতো করে খুশি থাকে। বিষয়টা জেভানের চোখ এড়ায়নি।
একদিন আর থাকতে না পেরে সে জিজ্ঞেস করেই ফেলল,
—“কি হয়েছে তোর? ইদানীং তোকে অন্যরকম লাগছে।আগে তো সব সময় চুপচাপ থাকতি কারো সাথে তেমন কথা বলতি না”
নীলিমা হালকা হেসে খুব সহজ ভঙ্গিতে বলল,
—“কিছু না ভাইয়া। আগে সবাই অপরিচিত ছিল, তাই একটু চুপচাপ থাকতাম। এখন তো সবাই পরিচিত, তাই ভালো লাগছে।”
কথাটা বলেই সে আর দাঁড়াল না। দ্রুত নিজের ঘরে ঢুকে দরজা বন্ধ করে দিল। তারপর বিছানায় গা এলিয়ে দিয়ে মোবাইলটা হাতে নিল। স্ক্রিন জুড়ে একের পর এক মেসেজ—অবহেলার ভান করলেও প্রতিটা মেসেজ পড়তে পড়তে তার ঠোঁটে লাজুক হাসি ফুটে উঠল।
সরল দেখতে ছেলেটাকে একটু তড়পাতে দেখে কেন জানি তার ভীষণ শান্তি লাগে। অথচ ছেলেটা মোটেও তেমন সরল নয়—বাহ্যিকভাবে যতটা সোজাসাপ্টা মনে হয়, ভেতরে ততটাই মিচকে শয়তান। এই এক মাসেই নীলিমা সেটা ভালো করেই বুঝে গেছে। আর ঠিক এই অদ্ভুত মিশ্রণটাই তাকে টানে।
নীলিমা নিজে সহজ-সরল, কিন্তু একেবারে বোকা নয়। ছেলেটা যে প্রতিদিন তার পেছনে পেছনে ঘোরে, সুযোগ পেলেই সামনে এসে পড়ে—এসব সে অনেক আগেই টের পেয়েছে। তবুও কিছু বলেনি। হয়তো অবচেতন মনে সে ওচেয়েছে, তার এতদিনের রঙহীন জীবনে কেউ একজন রঙ ছড়িয়ে দিক।
তাদের পরিবারটা একটু আলাদা। ছোট বোন নওরিনের জন্মটা ছিল অনাকাঙ্ক্ষিত, আর সেই জন্মের সময়ই মা পৃথিবী ছেড়ে চলে যান। সেই থেকেই দূরদেশে তিন ভাই বোন বড় হয়েছে বাবার ঠিক করা মানুষের কাছে। কিন্তু বাবা যতই চেষ্টা করুক, মায়ের ভালোবাসার শূন্যতা তো আর পূরণ হয় না।
বাবা একজন বিজ্ঞানী—কাজ নিয়েই বেশিরভাগ সময় ব্যস্ত থাকতেন। ফলে নওরিনকে বড় করার দায়িত্ব অনেকটাই এসে পড়ে নীলিমা আর জেভানের উপর। মা ছিলেন বাংলাদেশি, বাবা আমেরিকান—তাদের ভালোবাসার সংসার ছিল একসময়, কিন্তু ভাগ্য যেন সেই সুখটুকু বেশিদিন থাকতে দেয়নি।
আত্মীয়স্বজন বলতে তেমন কেউ নেই তাদের। তাই বাবা সবসময় চিন্তা করতেন, মেয়েদের যেন একটা বড়, ভালো পরিবারে বিয়ে দিতে পারেন—যেখানে তারা সেই অভাবটা পূরণ করতে পারবে। আর বাবার এই চিন্তাটাই নীলিমার মনে ঝড় তোলে সেদিন থেকে, যেদিন সে প্রথম নিজের মনের মানুষের পরিবার সম্পর্কে জানতে পারে।
নীলিমা নামক মেয়েটি জীবনে আসার পর যেন—সাজিদ আর আরমান—দুজনেই বদলে যেতে শুরু করল।
সাজিদ পড়াশোনার পাশাপাশি বাবার ছোট ব্যবসায় সময় দিত, নিজেকে গুছিয়ে নিচ্ছিল। আর আরমান সারাদিন চাকরির খোঁজে এদিক-ওদিক ছুটে বেড়াত।
পরীক্ষার পর সাজিদ ঠিক করল, সে আরমানকে জানাবে—“মিস ডক্টর”কে নিয়ে তার অনুভূতির কথা। সেই উদ্দেশ্যেই একদিন আরমানকে বলল,
—“আজ তোকে ট্রিট দেব।”
আরমান হেসে বলল,
—“ভালোই হলো! আমিও তোকে আজ একজন স্পেশাল মানুষের সাথে পরিচয় করাবো।আমি নিশ্চিত তুই শকড হয়ে যাবি।”
সাজিদ অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করতে লাগল।
কয়েক মিনিট পর ক্যাফের দরজা দিয়ে এক মেয়ে ঢুকল। মুখে মাস্ক, চোখে অদ্ভুত এক টান। চারপাশে তাকিয়ে ধীরে ধীরে ওদের দিকে এগিয়ে এলো।
মেয়েটা যত কাছে আসছিল, সাজিদের বুকের ধড়ফড় ততই বেড়ে যাচ্ছিল। নিঃশ্বাস যেন আটকে আসছিল তার।
আরমান দাঁড়িয়ে মেয়েটার দিকে হাত বাড়িয়ে দিল। মেয়েটিও হালকা হাসি দিয়ে তার হাত ধরল, তারপর পাশে বসে পড়ল।
সাজিদ একদৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল সেই নীল চোখের দিকে। ভেতরে ভেতরে প্রার্থনা করতে লাগল—
“যা ভাবছি, সেটা যেন সত্যি না হয়…”
কিন্তু ভাগ্য সেদিন তার পক্ষে ছিল না।
মেয়েটি মাস্ক খুলতেই সবকিছু পরিষ্কার হয়ে গেল।
সে-ই… সেই মেয়েটি… চার মাস ধরে যাকে বুকের ভেতর আগলে রেখেছে সাজিদ—তার নীলাম্বরী, তার নীলিমা।
যার জন্য একটা ছন্নছাড়া, মা/রা/মা/রি করা ছেলে নিজেকে বদলাতে শুরু করেছিল, কাজ শিখেছিল—আজ সে-ই দাঁড়িয়ে আছে তার সবচেয়ে কাছের বন্ধুর পাশে।
আরমান সব খুলে বলল—
নীলিমার বাবা তাকে সন্দেহ করছেন, অন্যত্র বিয়ে দিতে চান। কিন্তু নীলিমা নিজেই জানিয়েছে, সে আর কোথাও বিয়ে করবে না… সে আরমানকে ভালোবাসে। এই বিষয়ে ওদের সাজিদের সাহায্য দরকার।
নিজের বুকের ভেতরটা চূর্ণ হতে থাকলেও সাজিদ চেষ্টা করল বোঝাতে—
—“তোদের সম্পর্কের বয়স মাত্র দুই মাস। এত তাড়াতাড়ি ভালোবাসা হয় না। আরেকটু সময় নিলে বুঝতে পারতি…”
কিন্তু নীলিমা আর আরমান দুজনেই দৃঢ় কণ্ঠে বলল,
—“সত্যিকারের ভালোবাসা হতে সময় লাগে না।”
বয়সের প্রসঙ্গ তুলতেই নীলিমা শান্ত গলায় জানাল,
—“আমি যেভাবে বড় হয়েছি, সেখানে বয়স কোনো বিষয় না। আমাদের বয়সের পার্থক্যও তো মাত্র নয় মাস।”
আরমানেরও এসব নিয়ে কোনো মাথাব্যথা ছিল না।
সাজিদ বুঝে গেল—এখানে তার জায়গা নেই।
তবুও… বন্ধুত্বের কাছে নিজের অনুভূতিকে গলা টিপে মেরে ফেলল সে। নিজের ভালোবাসাকে বিসর্জন দিয়ে বন্ধুর ভালোবাসাকে পূর্ণতা দিতে এগিয়ে গেল।
সেদিনের পর সবকিছু যেন খুব দ্রুত ঘটে গেল।
সাজিদ দুই সপ্তাহ হাসপাতালে ছিল—শরীরের চেয়ে মনে আঘাতটাই ছিল গভীর।
আর সেদিনই… আরমান আর নীলিমার বিয়ে হয়ে গেল।
আরমান আর সাজিদ দুজনেই চেষ্টা করেছিল নীলিমাকে বোঝাতে—
—“তোমার বাবাকে আমরা মানিয়ে নেবো…”
কিন্তু নীলিমা রাজি হয়নি।
কারণ সে জানত—
যে মানুষ নিজের সততার জন্য দেশ ছেড়ে যেতে পারে, সে কখনোই মেয়েকে এমন কারও হাতে তুলে দেবে না, যার নেই কোনো স্থায়ী ঠিকানা, নেই কোনো নিশ্চয়তা।
আর সেদিন থেকেই শুরু হলো আরমান আর নীলিমার ছোট্ট সংসার।
আর অন্যদিকে…
সাজিদ ধীরে ধীরে ডুবে যেতে লাগল এক গভীর, নিঃশব্দ যন্ত্রণার অতল গহ্বরে—
যেখানে না আছে অভিযোগ, না আছে কোনো দাবি…
শুধু আছে হারিয়ে যাওয়ার এক অন্তহীন নীরবতা।
____________________________
সৃষ্টিকর্তা কার কপালে কাকে লিখে রেখেছেন—সেটা তো তিনিই ভালো জানেন। মানুষের হিসেব-নিকেশ অনেক সময়ই সেখানে গিয়ে থেমে যায়।
সে বছর আরমান ফাইনাল পরীক্ষা দিলেও সাজিদ দেয়নি। এক বছর গ্যাপ নেওয়ার পরও সে যেন আগের সেই সাজিদ নেই—সবকিছুর প্রতি এক ধরনের নির্লিপ্ততা, উদাসীনতা। যেন কিছুই তাকে স্পর্শ করে না, কিছুতেই তার কিছু যায় আসে না।
অন্যদিকে, আরমান তখন নিজের নতুন সংসার নিয়ে ব্যস্ত হয়ে উঠেছে। নীলিমাই আরমানের মা আর ছোট ভাইকে গ্রাম থেকে ঢাকায় নিয়ে আসে। নিজের চাকরির সামান্য আয়ে সে নিঃশব্দে, নিখুঁতভাবে সংসারটা সামলে নেয়।
বিয়ের পর নীলিমার বাবা কিছুটা ঝামেলা করলেও তেমন কিছু করতে পারেননি। কারণ, মেয়ে নিজের ইচ্ছাতেই বিয়ে করেছে। সেই থেকেই বাবার বাড়ির সাথে তাদের সম্পর্ক প্রায় বিচ্ছিন্ন।
জেভান আর নওরিন লুকিয়ে লুকিয়ে সাহায্য করতে চাইলেও, নীলিমা কখনো তা গ্রহণ করেনি। সে বিশ্বাস করে—
“বাবা যতই রাগ করুক, বিয়ে যেহেতু হয়েছে একদিন না একদিন ঠিকই মেনে নেবেন।”
ছোট বোন নওরিন তো কোনোদিন মায়ের ভালোবাসা পায়নি। নীলিমাই ছিল তার কাছে মা-সমান। তাই তো মাঝেমধ্যেই সে হাসপাতালে চলে আসে—শুধু বড় বোনটার সাথে একটু দেখা করার জন্য, একটু সময় কাটানোর জন্য।
ব্যস্ততার মাঝেও আরমান মাঝেমধ্যে সাজিদের সাথে দেখা করত। বন্ধুর এই হঠাৎ বদলে যাওয়া তাকে ভাবিয়ে তুলত।
—“তুই এমন হয়ে গেলি কেন?”
প্রতিবারই সাজিদ প্রশ্নটা এড়িয়ে যেত। কোনো উত্তর দিত না—হয়তো দিতে পারত না।
কিন্তু হয়তো ভাগ্য চেয়েছিল, সাজিদও বাঁচুক—তার ভাঙা হৃদয় নিয়েই। তাই তো তার জীবনেও একসময় বসন্ত এলো…
সেই বসন্তের নাম—রুবিনা সরদার।
গ্রামের মেয়ে, আচলপাড়া গ্রাম থেকে শহরে এসেছে পড়াশোনার জন্য। চঞ্চল, প্রাণবন্ত, স্বপ্নভরা চোখ।
সাজিদের ক্লাসমেট ছিল সে। সাজিদ যেহেতু টপার, তাই বেশিরভাগ স্টুডেন্টই তার কাছ থেকে নোট নিত। রুবিনাও একদিন সেই সুত্রেই তার কাছে আসে।
তারপর যেন ধীরে ধীরে অভ্যাস হয়ে গেল—
কখনো নোটের জন্য, কখনো কোনো সমস্যা বোঝার জন্য…
প্রতিদিন একসাথে ক্লাস করা, লাইব্রেরিতে পাশাপাশি বসে পড়া, নোট শেয়ার করা—এই ছোট ছোট মুহূর্তগুলো মিলেই তাদের বন্ধুত্বটা অজান্তেই গভীর হয়ে ওঠে।
সাজিদ মাঝে মাঝে বিরক্ত হলেও, রুবিনার পরিবারের অবস্থা জানার পর আর কিছু বলতে পারত না।
আরমান কয়েকবার ওদের একসাথে দেখে সন্দেহ করেছিল। একদিন সরাসরি জিজ্ঞেস করেই ফেলল,
—“তোদের মধ্যে কিছু আছে?”
সাজিদ খুব দৃঢ়ভাবে বলেছিল,
—“জাস্ট ফ্রেন্ড… নাথিং এলস।”
আরমানও আর কিছু ভাবেনি।
কিন্তু জীবন তো সবসময় একই পথে চলে না।
এক বৃষ্টিভেজা রাতে, হঠাৎ করেই সবকিছু বদলে গেল।
সেই রাতে, আরমান আর নীলিমাকে সাক্ষী রেখে—
সাজিদ বিয়ে করে ফেলল রুবিনাকে।
হঠাৎ এমন সিদ্ধান্তে অবাক হয়ে আরমান আর নীলিমা কারণ জানতে চাইলে, সাজিদ শান্ত গলায় বলেছিল—
—“একদিন যেহেতু বিয়েটা করতেই হবে… তাহলে এমন কাউকেই করা উচিত, যাকে ছাড়া থাকা সম্ভব না। রুবিনা আমার বেস্ট ফ্রেন্ড… ওকে ছাড়া থাকা আমার পক্ষে অসম্ভব।”
আসলে এর পেছনে ছিল আরেকটা গল্প।
রুবিনার বাবা ফোন করে জানিয়েছিলেন—তার বিয়ে ঠিক হয়েছে গ্রামের চেয়ারম্যানের ছেলের সাথে।
ছেলেটির আগেই দুটো বিয়ে হয়ে ছিল। আর রুবিনার স্বপ্ন? নিজের পায়ে দাঁড়ানো, একটা চাকরি করা…
কিন্তু সেই সংসারে গেলে সে স্বপ্ন কোনোদিন পূরণ হবে না।
ভয় আর অনিশ্চয়তা নিয়ে পরদিন রুবিনা সব খুলে বলেছিল সাজিদকে।
সব শুনে কিছুক্ষণ চুপ করে থাকল সাজিদ। তারপর হঠাৎই জিজ্ঞেস করল—
—“আমি স্বামী হিসেবে কেমন হবো?”
রুবিনা অবাক হয়ে তার দিকে তাকিয়ে ছিল। তারপর ধীরে বলেছিল—
—“অনেক ভালো একজন স্বামী হবে আমার বন্ধু।”
সেই একটুকু বিশ্বাসের উপর দাঁড়িয়েই সাজিদ প্রস্তাবটা দেয়।
সে নিজে কখনো বিয়ে করতে চায়নি। কিন্তু জানত—একদিন না একদিন পরিবার তাকে বাধ্য করবেই।
তাই ভেবেছিল—
“যেহেতু বিয়ে করতেই হবে, তাহলে এমন কাউকেই করি, যাতে দুজনেরই উপকার হয়।”
তার যুক্তিটা ছিল সহজ—
সে বিয়ে করে পরিবারের চাপ থেকে মুক্ত থাকবে, আর রুবিনা নিজের ইচ্ছামতো পড়াশোনা আর চাকরি করতে পারবে। ভবিষ্যতে সে চাইলে নিজের মতো করে জীবন গড়তে পারবে—সাজিদ কখনো বাধা দেবে না।
কিন্তু জীবনের সব সম্পর্ক কি এত সহজ সমীকরণে বাঁধা থাকে?
সেদিন রুবিনা হতবুদ্ধির মতো তাকিয়ে ছিল—
বন্ধু থেকে হঠাৎ করেই স্বামী হয়ে যাওয়া মানুষটার দিকে।
তবুও সে বিশ্বাস করেছিল সাজিদকে।
আর সেই বিশ্বাস নিয়েই—
একটা নতুন জীবনের পথে পা বাড়িয়েছিল… যেখানে বন্ধুত্ব, দায়িত্ব আর অদৃশ্য অনুভূতিরা একসাথে জড়িয়ে যেতে শুরু করেছে ধীরে ধীরে।
____________________________
ফাইনাল পরীক্ষার পর সাজিদ শেষমেশ আরমান যে অফিসে জব করে সেখানেই যোগ দিল। বাইরে থেকে সবকিছু যেন স্বাভাবিক হয়ে উঠছিল—দুজন বন্ধু আবার পাশাপাশি কাজ করছে, একই ছাদের নিচে সময় কাটাচ্ছে। কিন্তু ভেতরের গল্পটা ছিল ভিন্ন।
আরমান প্রায় প্রতিদিনই সাজিদকে বলত,
—“চল না, একদিন বাসায় যাবি। নীলিমাও অনেকদিন ধরে বলছে তোকে নিয়ে যেতে।”
সাজিদ প্রতিবারই নতুন নতুন অজুহাত বানিয়ে এড়িয়ে যেত।
কেউ না জানুক, সাজিদ নিজে তো জানে—
যে মেয়েটা আজ তার বন্ধুর স্ত্রী, সে এখনো তার হৃদয়ের এক কোণে নিঃশব্দে বেঁচে আছে।
আর সাজিদ এতটাও দুর্বল নয়, এতটাও চরিত্রহীন নয়—
যে বন্ধুর ভালোবাসার দিকে তাকাবে।
তাই দূরত্বটাই তার কাছে নিরাপদ।
অন্যদিকে, সাজিদ আর রুবিনার সংসারও ধীরে ধীরে গুছিয়ে উঠছিল—
একেবারে নিখুঁত না হলেও, টিকে থাকার মতো, মানিয়ে নেওয়ার মতো।
সাজিদের মা-বাবা ছিলেন ভীষণ অমায়িক। একমাত্র ছেলের বউ বলে রুবিনাকে তারা মাথায় করে রাখতেন।
রুবিনাও নিজের মতো করে জীবনটা গড়ার চেষ্টা করছিল। নিজের পছন্দের একটা কোম্পানিতে ইন্টারভিউ দিয়ে চাকরিটা পেয়ে গেল।
তারপর শুরু হলো ব্যস্ততার নতুন অধ্যায়—
সারাদিনের কাজ, দায়িত্ব, ক্লান্তি…
কিন্তু দিন শেষে যখন তারা দুজন একই ছাদের নিচে ফিরত, তখন যেন আবার সব সহজ হয়ে যেত।
বন্ধুর মতো স্বামী-স্ত্রী—
দুজনেই চেষ্টা করত, যেন অপরজনের কোনো কষ্ট না হয়।
রুবিনার ছোটখাটো একটা কষ্ট অবশ্য ছিল—তার ননদিনী।
যখনই রুবিনা বাসায় থাকত, তখনই নানাভাবে তাকে বিরক্ত করত।
মানুষ অভ্যাসের দাস কথাটি সাজিদ আর রুবিনার ক্ষেত্রে যেন ফলে গেল।
ধীরে ধীরে, অজান্তেই—
একজন আরেকজনের অভ্যাস হয়ে উঠল।
প্রথমে বন্ধুত্ব, তারপর দায়িত্ব…
আর সেই দায়িত্বের মাঝেই অদৃশ্যভাবে জন্ম নিতে লাগল ভালোবাসা।
কারণ, স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্কের এই ভালোবাসাটা—
সৃষ্টিকর্তার এক বিশেষ নিয়ামত।
এর মাঝেই হঠাৎ একদিন অদ্ভুত একটা সিদ্ধান্ত নিল আরমান আর সাজিদ—
দুজনেই একসাথে চাকরি থেকে রিজাইন করে দিল।
কেউই বুঝতে পারল না কেন।
এমনকি তাদের স্ত্রীরাও জিজ্ঞেস করলেও, তারা স্পষ্ট করে কিছু বলেনি।
বিশ্বাস থেকেই—আর প্রশ্ন তোলেনি কেউ।
সেদিন অফিস থেকে ফিরে, দুই বন্ধু একসাথে বসে একটা বড় সিদ্ধান্ত নিল—
ওরা নিজেরাই কিছু করবে। নিজেরাই একটা অফিস দাঁড় করাবে।
স্বপ্নটা বড় ছিল, ঝুঁকিটাও কম ছিল না।
সাজিদ নিজের বাবার থেকে পাওয়া অংশটুকু নিয়ে সেটা বিক্রি করে দিল।
আরমানও গ্রামের জমিটুকু বিক্রি করল।
সব মিলিয়েও টাকার অঙ্কটা আশানুরূপ হলো না।
তখন নীলিমা নিজের সঞ্চয়ের টাকা এগিয়ে দিতে চাইল।
প্রথমে আরমান আর সাজিদ—দুজনেই সরাসরি না করে দিল।
কিন্তু নীলিমা থামেনি।
সে জোর দিয়েই বলল,
—“এটা সাহায্য না… এটা আমার বিশ্বাস। তোমাদের ব্যবসা দাঁড়িয়ে গেলে আমি আমার টাকা ফিরিয়ে নেব।”
মতো শেষমেশ তার সেই বিশ্বাসের সামনে হার মানতে হলো।
এইভাবেই শুরু হলো তাদের নতুন পথচলা—
অজানা, অনিশ্চিত, কিন্তু স্বপ্নে ভরা।
দুই বন্ধু কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে এগিয়ে চলল,
আর তাদের পাশে—নিঃশব্দ শক্তি হয়ে রইল তাদের অর্ধাঙ্গিনীরা।
সময়ের সঙ্গে সঙ্গে প্রমাণ হতে লাগল—
একটা স্বপ্ন শুধু দুজন মানুষের নয়,
চারজন মানুষের একসাথে লড়া, বিশ্বাস করা আর এগিয়ে যাওয়ার গল্পও হতে পারে।
চলবে...