#প্রনয়ের_প্রলয়
#কলমে_মেহরিমা_সারা
#পর্বঃ১৬
ধরনীর বুকে মায়েদের সবচেয়ে বড় সুখ বোধহয় তাদের সন্তানদের মাঝেই লুকিয়ে থাকে। সন্তানের মুখের একটুখানি হাসি, একটুখানি নড়াচড়া—এই ছোট ছোট জিনিসগুলোই যেন এক একজন মায়ের জীবনের সমস্ত ক্লান্তি ভুলিয়ে দেয়। তাই তো মায়েরা নিজেদের সুখ, স্বাচ্ছন্দ্য, এমনকি জীবন পর্যন্ত উৎসর্গ করে দেয় শুধুমাত্র সন্তানদের নিরাপদ রাখার জন্য।
মা হওয়া যেমন কষ্টের, তেমনি তা অপরিসীম আনন্দেরও। দীর্ঘ নয় মাস নিজের শরীরের প্রতিটি পরিবর্তন সহ্য করে, অজানা ভয় আর ব্যথা বুকে নিয়ে যখন একটি মা তার সন্তানকে পৃথিবীর আলোয় নিয়ে আসে—সেই মুহূর্তে যেন সব কষ্ট এক নিমিষেই মুছে যায়। সন্তানের প্রথম কান্না, প্রথম স্পর্শ—সবকিছুই যেন এক অলৌকিক শান্তি এনে দেয় তার অন্তরে।
তেমনি এক কনকনে শীতের রাতে হাসপাতালের কেবিনের নিঃশব্দ পরিবেশে শুয়ে আছে রুবিনা। ক্লান্ত, অবসন্ন শরীর নিয়ে বেডে শুয়ে থেকেও তার চোখে-মুখে এক অদ্ভুত প্রশান্তি। তার বুকের ওপর শুয়ে আছে তার অপেক্ষার ফসল—তার ছোট্ট ছেলে।
দুচোখ ভরে ছেলের মুখের দিকে তাকিয়ে আছে সে। যেন এই ছোট্ট মুখখানাই তার জীবনের সব কষ্টের প্রতিদান। অজান্তেই তার চোখ থেকে ফোঁটায় ফোঁটায় জল গড়িয়ে পড়ছে, কিন্তু সে তাড়াতাড়ি হাত দিয়ে মুছে নিচ্ছে—যেন তার এই কান্না কোনোভাবে তার সন্তানের অশান্তির কারণ না হয়।
বেডের পাশে বসে আছে সাজিদ খান। তার চোখেও আনন্দ, বিস্ময় আর এক অদ্ভুত আবেগের মিশ্রণ। মায়ের পর আল্লাহর দেওয়া তার জীবনের সবচেয়ে প্রিয় দুই নারীর একজন—তার অর্ধাঙ্গিনী।
এই মেয়েটি—যে একদিন হঠাৎ করেই তার জীবনে এসেছিল, অনাকাঙ্ক্ষিতভাবে—আজ সে-ই তার সন্তানের মা, তার স্ত্রী, তার জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। হয়তো প্রথমে সে এই সম্পর্ককে মেনে নিতে পারেনি, কিন্তু সময়ের সাথে সাথে অজান্তেই ভালোবেসে ফেলেছে তাকে।
ঠিক তখনই কেবিনের দরজা ধীরে খুলে ভিতরে ঢোকে নীলিমা। তার হাতে একটা রিপোর্ট। মুখে হালকা ক্লান্তি থাকলেও চোখে স্পষ্ট দায়িত্ববোধ।
সে ধীরে ধীরে রুবিনার বেডের দিকে এগিয়ে গেলে সাজিদ সোজা হয়ে বসে তার দিকে তাকিয়ে বলে ওঠে—
—"রিপোর্টে কী আছে? কোনো সমস্যা হয়েছে?"
নীলিমা একবার রুবিনার দিকে, তারপর তার কোলে থাকা নবজাতক শিশুটির দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসলো।
—"বাচ্চার কোনো সমস্যা নেই। তবে রুবিনাকে আরেকবার চেকআপ করতে হবে। সিঁড়ি থেকে পড়ে যাওয়ার কারণে শরীরে কিছু সমস্যা হয়েছে।"
রুবিনা লজ্জা আর অপরাধবোধে মাথা নিচু করে ফেলে। ছেলের কপালে আলতো করে চুমু খেয়ে সাজিদের দিকে তাকিয়ে কাঁপা গলায় বলে—
—"আমি ইচ্ছে করে করিনি... বিশ্বাস করো। নীলিমা আপার খবর শুনে এত খুশি হয়েছিলাম যে তাড়াহুড়ো করে নামতে গিয়ে পা পিছলে পড়ে যাই।"
সাজিদ তার কথা শেষ করতে না দিতেই নরম গলায় বলে—
—"সাফাই দিচ্ছো কেন রুবি? তুমি সুস্থ আছো, এটাই আমার জন্য অনেক।"
ঠিক তখনই কেবিনে ঢুকে পড়ে আরমান, তার সাথে সাজিদ এর খালা মার্জিনা খাতুন। একা একা চলতে পারে না তাই আরমান মহিলা কে ধরে রুবিনার সামনে এনে দাঁড় করায়।
মার্জিনা কপাল কুঁচকে একটু বিরক্তির সুরে বলে—
—"ওরে বউ, একটু সাবধানে চলবি না? তোর আম্মা যাইবার আগে কতবার তোর কথা কইছে, যেন তোরে চোখে চোখে রাখি। তুই যে একেবারে দস্যি মাইয়া! কইলেও কিছু শোনস না। এহন দেখ, কেমন ঝামেলা হইলো!"
রুবিনা চুপসে যায়। মুখ নিচু করে থাকে। আজ তার শাশুড়ি বেচে থাকলে তাকে নিয়ে মাতামাতি করতো নাতি জন্ম হয়েছে বলে কথা।
তার মনে পড়ে যায় ছোটবেলার কথা—গ্রামে যখন কারো ছেলে সন্তান হতো, তখন তাকে মাথায় করে রাখা হতো। অথচ আজ সে নিজে ছেলে সন্তানের মা হয়েও বকা খাচ্ছে।
তবে সে জানে—এই কথাগুলোর আড়ালেও ভালোবাসা আছে, চিন্তা আছে।
সাজিদ তখন হালকা কড়া গলায় বলে—
—"খালা, এখন এসব বলার সময় না। রুবি এমনিতেই দুর্বল আছে।"
মার্জিনা মুখ বাঁকিয়ে ব্যাগ থেকে একটা মোটা সোনার চেইন বের করে রুবিনার হাতে গুঁজে দেয়—
—"এইডা বাড়ির বড় পোলার জন্য। হে না পড়লে তুই পড়িস!"
তারপর বাচ্চাটাকে নিজের কোলে নিয়ে কিছুক্ষণ দেখে মুখ কুঁচকে বলে—
—"পোলাডার মইধ্যে নয়া কিছু নাই!"
নীলিমা এতক্ষণ চুপ থাকলেও এবার আর থাকতে পারলো না। সে তাড়াতাড়ি বাচ্চাটাকে নিজের কোলে নিয়ে বলে—
—"খালাম্মা, বাচ্চাটাকে একটু পরীক্ষা করতে হবে। আমি নিয়ে যাচ্ছি।"
তার কণ্ঠে এক অদ্ভুত তাড়াহুড়ো, যা সবাইকে কিছুটা অবাক করে।
মার্জিনা বিরক্তি নিয়ে বলে—
—"এইডার লেগাই মাইয়াগো বেশি পড়ালেহা ভালা না!"
শিরিন তখন কেবিনে ঢুকে বলে—
—"ঠিকই বলেছেন খালাম্মা!"
সাজিদ বিরক্ত হয়ে শিরিনকে চুপ করিয়ে দেয়।
এরপর রুবিনা কে বলে বাইরে চলে যায়। আরমান ও বন্ধুর পিছু পিছু যায়।
পাশের কেবিনে দাঁড়িয়ে নীলিমা বাচ্চাটাকে কোলে নিয়ে দোলাচ্ছে। তার চোখে অদ্ভুত এক মায়া।
সাজিদ ভিতরে ঢুকে একবার নীলিমার দিকে তাকায়, তারপর নিজের ছেলেকে কোলে নিয়ে চুপচাপ তাকিয়ে থাকে তার দিকে।
হঠাৎ করেই তার চোখ বেয়ে জল গড়িয়ে পড়ে।
নীলিমা ধীমি স্বরে বলে—
—"সাজিদ! রুবিনা ঠিক আছে, তোমার ছেলে ঠিক আছে… তাহলে কাঁদছো কেন?"
সাজিদ চোখে পানি নিয়ে সামনে দাঁড়ানো নীলাম্বরীর টলটলে চোখে চেয়ে ম্লান হেসে কাঁপা গলায় বলে—
—"আমার সাত মাসের ছেলে, নীলিমা…"
এই কথাটা শুনে মুহূর্তের জন্য স্তব্ধ হয়ে যায় নীলিমা। তার চোখের কোণেও জল জমে ওঠে, কিন্তু সে নিজেকে সামলে নেয়।
ঠিক তখনই আরমান এসে সাজিদের কাঁধে হাত রাখে—
—"স্ট্রং থাক, সব ঠিক হয়ে যাবে।আর নীলিমা রুবিনা কে তাড়াতাড়ি বাড়িতে নেওয়ার ব্যবস্থা করো"
নীলিমা ধীরে বলে—
—"আমরা কি ঠিক করছি?"
সাজিদ কিছুক্ষণ চুপ থেকে ছেলের দিকে তাকিয়ে বলে,—"আমার ছেলের নাম শাহরিয়ার খান আদি… খান বংশের বড় ছেলে।"
তার কণ্ঠে ছিল দৃঢ়তা, আবার লুকানো কষ্টও।
এরপর সবকিছু খুব দ্রুত এগোতে থাকে। তিন দিনের মধ্যেই রুবিনাকে বাসায় নিয়ে যাওয়া হয়।
রুবিনা ধীরে ধীরে সুস্থ হয়ে উঠলেও আদির যত্ন নেওয়া সহজ ছিল না। সাজিদ আর আরমানের নতুন কোম্পানি, দায়িত্ব—সব মিলিয়ে তাদের সময় খুবই কম।
তাই নীলিমাই থেকে যায় পাশে।
নিজে পাঁচ সপ্তাহের প্রেগন্যান্ট হওয়া সত্ত্বেও, শরীরের কথা না ভেবে প্রতিদিন আদিকে দেখতে আসে সে।
এই ছোট্ট বাচ্চাটার প্রতি তার টানটা যেন স্বাভাবিকের চেয়েও বেশি।
_______________________________
সময় গড়ায় সময়ের তালে, আর সেই সাথে মানুষের জীবনধারাও এগিয়ে চলে নিজের ছন্দে। দেখতে দেখতে কেটে গেল দীর্ঘ আট মাসের অপেক্ষা। নীলিমা এখন পূর্ণ মাতৃত্বের ভারে আবদ্ধ। মাতৃত্বকাল শুরু হতেই সে ইতি টেনেছে নিজের কর্মজীবনের। এখন তার দিনগুলো কাটে ঘরে—শাশুড়ির সঙ্গ আর মাঝেমধ্যে রুবিনার আসা-যাওয়ায় ছোট্ট আদিকে নিয়ে হাসি-খেলায়।
আদি এখন আদো আদো কথা বলতে শিখেছে। রুবিনার পর যদি কেউ তাকে সবচেয়ে বেশি আদর-যত্ন করে থাকে, তবে সে নীলিমাই। তাই রুবিনা চাইত, আদি যেন নীলিমাকে তার জীবনের দ্বিতীয় মায়ের আসনে বসায়। ছোটবেলা থেকেই সে আদিকে দেখিয়ে দেখিয়ে “আম্মি” বলা শিখিয়েছে। ছোট আদি এখনো তার মিষ্টি বুলিতে “আম্মি” বলে ডাকে, আর সেই ডাক নীলিমার হৃদয় ভরে দেয় অদ্ভুত এক তৃপ্তিতে।
নিজের ছোট বোন নওরিনকে ছোটবেলা থেকেই মায়ের মতো আগলে রেখেছিল নীলিমা। মা মারা যাওয়ার পর সে-ই ছিল নওরিনের আশ্রয়। তবুও নওরিন কখনো নীলিমার বাসায় আসে না—শুধু হাসপাতালে গিয়েই দেখা করে। অনেকবার ডাকলেও আসেনি। নীলিমা ভেবেছে, হয়তো তার বাবা নিষেধ করেছেন, তাই আর জোর করেনি।
এই একাকিত্বের সময়ে আদিকে পেয়ে তার প্রতি ভালোবাসা যেন আরও দ্বিগুণ হয়ে উঠেছে।
বর্তমানে নীলিমা বসে আছে তাদের নতুন বাড়ির সোফায়। বাড়ির নিচতলা শেষ হলেও দোতলার কাজ এখনো শুরু হয়নি। ঢাকা শহরে বাড়ি করা সহজ নয়, কিন্তু তবুও পেরেছে তারা—কারণ এই জমিটা ছিল নীলিমার মায়ের, যা সে জন্মের সময়ই মেয়ের নামে লিখে দিয়েছিল। নীলিমা ছিল তাদের বংশের একমাত্র অদ্ভুত নীলাভ চোখের অধিকারী, যা বয়সের সাথে সাথে আরও গাঢ় হয়েছে।
নীলিমার পাশেই বসে আছে আদি। টুকটুক করে তাকিয়ে আছে তার ফোলা পেটের দিকে। এখন সে অনেক কিছুই বুঝতে শিখছে, তাই কৌতূহলও বেশি। হঠাৎ করেই ছোট ছোট হাত দিয়ে নীলিমার পেটে চাপড় দিতে শুরু করল। নীলিমা চমকে উঠে তার হাত ধরে ফেলল। আদির মুখের হাসিটা মিলিয়ে গেল।
নীলিমা আলতো করে তার হাত দুটো নিজের মুখের কাছে এনে চুমু খেয়ে বলল, — “বাবা, এমন করে না। আম্মির এখানে একটা ছোট বাবু আছে, সে এখন অনেক নাজুক। ওর কষ্ট হবে তো।”
হাত ছেড়ে দিতেই আদি আবার একইভাবে চাপড় দিতে শুরু করল। রুবিনা তাড়াতাড়ি করে তাকে কোলে তুলে নিল। কারণ এখন সামান্য চাপড়ও নীলিমার জন্য ক্ষতিকর হতে পারে—তার গর্ভকাল ইতিমধ্যে দশ মাস চার দিন ছাড়িয়েছে, তবুও বাচ্চার আসার কোনো লক্ষণ নেই।
সবাই সিজারিয়ান করার কথা বললেও নীলিমা রাজি হয়নি। একজন ডাক্তার হয়েও তার এই সিদ্ধান্তে অনেকেই ক্ষুব্ধ, কিন্তু সে নির্লিপ্ত। তার বিশ্বাস—আল্লাহ যেদিন ঠিক করবেন, সেদিনই তার সন্তান পৃথিবীর আলো দেখবে। তাই কোনো কিছুর জন্য সে জোর করতে চায় না। শাশুড়ির কথাও সে এড়িয়ে গেছে।
সন্ধ্যার আগেই রুবিনা আদিকে নিয়ে চলে যায়। নীলিমা সারা সন্ধ্যা বই পড়েই কাটায়। পড়তে পড়তে কখন যে রাত দশটা বেজে গেছে, সে খেয়ালই করেনি। সময়টা বুঝতে পেরে কপালে ভাঁজ পড়ে—কারণ ডেলিভারির সময় পার হওয়ার পর থেকে আরমান সবসময় আটটার মধ্যেই বাড়ি ফেরার চেষ্টা করে। নয়টা পর্যন্তও কখনো হয়নি। আজ এত দেরি কেন?
উদ্বিগ্ন হয়ে সে বারবার ফোন করতে করতে লাইব্রেরি থেকে বেরিয়ে আসে। ডাইনিং এরিয়ার আলো ছাড়া চারপাশ অন্ধকারে ঢাকা। শীতের রাতে এই অন্ধকারটা আজ যেন তাকে অস্থির করে তুলছে। শরীর ঘেমে উঠছে, তৃষ্ণায় গলা শুকিয়ে যাচ্ছে।
ঠিক তখনই কলিং বেল বেজে ওঠে।
চারপাশে তাকিয়ে দেখে, কোনো সাহায্যকারীও নেই—হয়তো সবাই ঘুমিয়ে পড়েছে। বাধ্য হয়ে দরজা খুলতেই সামনে দাঁড়িয়ে থাকা সাজিদকে দেখে একটু অবাক হয়। সে কখনোই এই বাড়িতে আসেনি।
নিজেকে সামলে নীলিমা বলে,
— “আরে সাজিদ, ভেতরে আসো।”
সাজিদ মৃদু হেসে বলে,
— “যাবো, তবে নতুন অতিথি আসার পর। এখন তুমি একটু বাইরে আসো, আরমান অপেক্ষা করছে।”
নীলিমা কিছুটা ভড়কে গেলেও ধীরে ধীরে বাইরে এগোয়। হঠাৎ কেউ পিছন থেকে তার চোখ বেঁধে দেয়। সে বুঝে যায়, কে এটা করেছে।
সাজিদ এবার প্রথমবারের মতো বলে,
— “ভাবি, আপনার জন্য একটা সারপ্রাইজ আছে। আমি কি আপনার হাত ধরে নিয়ে যেতে পারি?”
নীলিমা অবাক হয়ে যায় সম্বোধনে পরমুহূর্তেই হালকা হেসে বলে,
— “ভাবির কাছে অনুমতি নিচ্ছো কেন, দেবরজী?”
সাজিদও হেসে আলতো করে তার হাত ধরে এগিয়ে নিয়ে যায়। কিছুদূর গিয়ে হাত ছেড়ে দেয়। ঠিক তখনই পেছন থেকে কারো উষ্ণ নিশ্বাস ঘাড়ে লাগতেই নীলিমা মুচকি হাসে—সে বুঝে গেছে, এ তার আরমান।
চোখের বাঁধন খুলতেই সামনে যা দেখে, তাতে সে বিস্ময়ে স্তব্ধ হয়ে যায়—একটি গাড়ি।
হতবাক কণ্ঠে বলে,
— “এই গাড়ি! আরমান, এটা কার? এখানে কেন?”
আরমান পেছন থেকে তাকে জড়িয়ে ধরে কানে কানে বলে,
— “এটা আমার রাজকন্যা আর আমার রানীর জন্য।”
— “মানে? কীভাবে সম্ভব?”
আরমান এবার সরল স্বরে বলে,
— “আমি আর সাজিদ মিলে কিনেছি। আমাদের সব সেভিংস লেগে গেছে এতে।”
— “কিন্তু কেন?”
আরমান তার মুখ দুহাতে তুলে আলতো করে ঠোঁটে স্পর্শ রেখে বলে,
— “যেন আমার রাজকন্যা তার জীবনের শুরুটা রাজকীয়ভাবে করতে পারে।”
নীলিমা বিরক্ত হয়ে বলে,
— “উফফ আরমান! সাজিদের টাকা দিয়ে এসব কেন কিনলে? আমি কি কখনো তোমার কাছে এসব চেয়েছি?”
— “রাগ করছো কেন? সাজিদ আর আমি আলাদা নই। আমরা তো সবই ভাগাভাগি করেছি। আর টাকাটা আমি পরে দিয়ে দেবো। নিজেকে ঋণী ভেবো না।”
নীলিমা ধীর স্বরে বলে,
— “ঋণের বোঝা তো সাজিদ আগেই ভারি করে দিয়েছে… সেটা এখনো কমাতে পারিনি। আবার বাড়াচ্ছো তুমি। যদি জানতে…”
সাজিদ নীলিমা কে পছন্দ করতো আর নীলিমার বাবাও সাজিদ কে পছন্দ করতো। কারন সাজিদ নীলিমার আগে ওর বাবা কে মানিয়েছিলো। কিন্তু ভাগ্যবশত নীলিমা আরমান কে পছন্দ করে আর আরমান ও নীলিমা কে ভালোবাসে বুঝতে পেরে সাজিদ নিজ থেকেই সরে গিয়েছিলো। তাই আজ ও নীলিমার বাবা ওদের মেনে নেয়নি। যে ব্যাপারে আরমান অবগত নয়। আরমানের ডাকে নীলিমা পুরনো কথা থেকে ফিরে আসে।
— “কি বলছো?”
— “কিছু না… গাড়িটা সত্যিই অনেক সুন্দর।”
অপ্রস্তুত হেসে বলে উঠলো।
ঘুমের মধ্যে খানিকটা নড়াচড়া করে উঠে নীলিমা। রাত প্রায় শেষ ভোর হতে চললো বলে। ব্যাথায় চোখ খুলে যায় নীলিমার। হঠাৎ করেই কেমন যেন অসহনীয়তা হয়ে উঠছে ব্যাথা টা। প্রায় সময় এমন হয় তবে আজকের টা যেন ভিন্ন। নীলিমা পাশে শুয়ে থাকা আরমান কে দুর্বল হাতে ঝাঁকায়। সর্বক্ষণ স্ত্রীর জন্য তৎপর থাকা আরমান মৃদু স্পর্শেই তড়াক করে উঠে জিজ্ঞেস করে কোনো সমস্যা হচ্ছে কি না। নীলিমা দাঁতে দাঁত চেপে ব্যাথা নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করে বলে ওকে হাসপাতালে নিয়ে যেতে। আরমান তার নীলুর গলার কাপনেই টের পেয়েছে যে হয়তো তার রাজকন্যার এখনই আসার তাড়া উঠেছে। বাবা মাকে হয়তো আর অপেক্ষা করতে হবে না। আরমান দ্রুত সাজিদ কে কল করে হসপিটালের সব কিছু আগেই ঠিক করে রাখতে বলে। সাজিদ বাসায় না থাকায় আরমান মাকে ডেকে একাই নীলিমাকে কোলে নিয়ে বেরিয়ে পড়ে। তার রাজকন্যা হয়তো আসতে চলেছে। আল্লাহ তার কোল আলো করুক বিনা বিপদ দিয়ে নীলিমা শুধু এই দোয়াই করে যাচ্ছে।
⬇️
ফজরের আজানের আগ মুহূর্তে হঠাৎই এক নবজাতকের কান্নায় মুখরিত হয়ে উঠল পুরো হাসপাতাল। সেই কান্নার শব্দ যেন একসাথে স্বস্তি আর আনন্দের বার্তা নিয়ে এলো। আরমান, সাজিদ—সবার ঠোঁটে তখন একটাই বাক্য, আল্লাহর দরবারে শুকরিয়া। শেষ সময়টাতে নীলিমার অবস্থা এতটাই সংকটজনক হয়ে উঠেছিল যে, মুহূর্তের জন্য সবাই ভয় পেয়ে গিয়েছিল। কিন্তু আল্লাহর অশেষ রহমতে সবকিছু ঠিকঠাকভাবে সম্পন্ন হলো।
এক এক করে বাড়ির সবাই হাসপাতালে এসে পৌঁছাল। রুবিনা সকাল সকাল ছেলেকে নিয়ে চলে এসেছে, আর সাজিদ তো আগের রাত থেকেই ছিল। নরমাল ডেলিভারি হওয়ায় নীলিমা এখন অনেকটাই সুস্থ। ছোট্ট রাহাকে কোলে নিয়ে রুবিনা মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে থাকে, তারপর একে একে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে মিল খুঁজতে শুরু করে—কোথায় কার ছাপ আছে।
তারপর একটু আফসোস মেশানো কণ্ঠে বলে ওঠে, —"আপা, আপনার মেয়ের সবকিছুই তো আপনার মতো হয়েছে, কিন্তু চোখের রংটা পেল না কেন? আমি তো শুনেছি বাচ্চারা বাবা-মায়ের মতোই হয়! দেখেন না, আপনার মেয়ে চোখ বাদে সব পেয়েছে, আর আমার ছেলে তো আমাদের কারো কিছুই পায়নি!"
নীলিমা তখন আদিকে পাশে বসিয়ে মৃদু হেসে বলে, —"সব সন্তান যে বাবা-মায়ের মতোই হবে, এমন তো কোনো নিয়ম নেই। প্রত্যেকটা মানুষ আল্লাহর আলাদা সৃষ্টি। কেউ পুরোটা পায়, কেউ আংশিক। আর চোখের রঙের কথা যদি বলো—আমাদের বংশে তো কারো নীল চোখ নেই, শুধু আমারই ছিল। এজন্য কেউ আমাকে বেশি ভালোবাসত, আবার কেউ একটু ভিন্ন চোখে দেখত। তবে আমার মেয়ে শুধু আমার না, ওর খালার বৈশিষ্ট্যও পেয়েছে। নওরিনের চোখের রংও তো ডার্ক ব্রাউন।"
রুবিনা হেসে বলে,
—"হুমম, সুন্দর তো বটেই… তবে আপনার চোখের রংটাই আমার কাছে সবচেয়ে সুন্দর লাগে।"
নীলিমা চারপাশে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করে, —"আরমান কোথায়? আর মা? উনি তো একটু আগেও এখানে ছিলেন!"
—"আরমান ভাই খালাম্মাকে নিয়ে বাসায় গেছে, বেবির জন্য কিছু জিনিস আনতে,"
রুবিনা উত্তর দেয়।এদিকে আদি কৌতূহলী চোখে ছোট্ট রাহার দিকে তাকিয়ে আছে, অদ্ভুত সব শব্দ করে নিজের মতো করে কথা বলতে চাইছে। ছেলের এই অবস্থা দেখে রুবিনা একটু দূরে সরে বসে—যদি না আবার হাত বাড়িয়ে কিছু করে ফেলে! কিন্তু মা সরে যেতেই আদি কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে হঠাৎ করে কেঁদে ওঠে।
হঠাৎ এই কান্নায় সবাই চমকে যায়। নীলিমা আদির মাথায় হাত বুলিয়ে শান্ত করার চেষ্টা করে, কিছুতেই শান্ত না হওয়ায় রুবিনা শেষমেশ বাচ্চাকে পাশে রেখে আদিকে কোলে তুলে নেয়। মায়ের কোলে যেতেই আদি চুপ হয়ে যায়, যেন তার পৃথিবী আবার ঠিক হয়ে গেছে।
রুবিনা মুচকি হেসে মজার ছলে বলে,
—"আপা, আপনার মেয়েকে কিন্তু আমার ছেলেই দুনিয়ায় আহ্বান করেছে! কালকের ওই চাপর না মারলে তো আপনার মেয়ে আসতেই চাইছিল না! তাই বলছি, মেয়ে বড় হলে কিন্তু আমার ছেলেকে ভুলে যাবেন না!"
নীলিমা তার ইঙ্গিত বুঝে নরম হেসে বলে,
—"আদি তো আমারও ছেলে। ওরা যদি চায়, আমি ভুলব কেন?"
এ যেন প্রতিটি মায়ের চিরচেনা এক মিষ্টি রসিকতা। কিন্তু এই মজার কথাগুলো ধীরে ধীরে বাস্তবে রূপ নিতে থাকে ছোট্ট আদির কর্মে। দিন যত গড়ায়, আদির টান ততই বাড়তে থাকে রাহার প্রতি।
প্রথম দিকে রুবিনা সপ্তাহে দুই-তিন দিন যেত, কিন্তু আদির একটু বুঝ হওয়ার পর থেকে যেন প্রতিদিনই যাওয়া বাধ্যতামূলক হয়ে দাঁড়ায়।
কোনোদিন রুবিনা যেতে না চাইলে, আদি কান্নায় ভেঙে পড়ে—আদো আদো বুলিতে বাবু বাবু করে মোটকথা সে “বাবু”কে দেখতে যাবে।
রাহার নামটি রেখেছিল নওরিন নিজেই। ভাগনির চোখে নিজের মতো সেই ডার্ক ব্রাউন আভা খুঁজে পেয়ে তার আনন্দ যেন আর ধরে না—একটু পরপরই সে রাহাকে কোলে তুলে নিয়ে মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে থাকে, যেন নিজেরই ছোট্ট প্রতিচ্ছবি। যে মেয়েটা আগে বাবার অজুহাতে আপুর বাসায় আসতো না, সেই নওরিন এখন সুযোগ পেলেই সারাদিন বোনের বাসায় পড়ে থাকতে চায়।
কিন্তু সামনে এস.এস.সি পরীক্ষা। নীলিমা কড়া গলায় বলে দিয়েছে—পরীক্ষার আগে আর আসা চলবে না। এতে নওরিন ভীষণ অভিমান করে, নিজের “বুড়ি আপুনি”-র উপর রাগ দেখিয়ে কয়েকদিন আর আসেই না। তবুও মন তো পড়ে থাকে ওই ছোট্ট রাহার কাছেই।
নীলিমার বাবা এখনো সরাসরি তার সাথে যোগাযোগ করেননি, তবে নওরিনের মাধ্যমেই নাতনিকে একদিন নিজের বাসায় নিয়ে গিয়েছেন—নীরব ভালোবাসার মতো এক টুকরো টান রয়ে গেছে এখনও। এদিকে নীলিমার বড় ভাই জেভান, তার স্ত্রী রানসিয়া আর তাদের এক বছরের ছেলে সামিনও কয়েকবার এসেছে ছোট্ট ভাগনিকে দেখতে। সামিন তো যেন বোনকে দেখার জন্য অস্থির হয়ে থাকে—না আনলে কান্নাকাটি শুরু করে দেয়। আগে নওরিনই তাকে নিয়ে আসত, কিন্তু এখন পরীক্ষার জন্য সেটা আর সম্ভব নয়। তাই নীলিমা আরমানকে বলেছে, যেন সামিনকে একটু নিয়ে আসে। ঠিক হয়েছে, রানসিয়া গেটের সামনে সামিনকে নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকবে—আরমানকে ভেতরে যেতে হবে না।
অফিস শেষে আরমান একটি ক্যাব নিয়ে নীলিমাদের বাড়ির সামনে এসে দাঁড়ায়। গেটের পাশে নওরিন সামিনকে নিয়ে অপেক্ষা করছিল। রানসিয়া ব্যস্ত রান্নায়, তাই নওরিনই তাকে নিয়ে এসেছে। আরমানকে একপলক দেখেই নওরিন চোখ নামিয়ে নেয়—এই মানুষটা যেন তার জন্য নিষিদ্ধ এক অনুভূতির নাম। কোনো কথা না বাড়িয়ে সামিনকে এগিয়ে দিয়ে নরম গলায় বলে,
—"গাড়ি নিয়ে যান, ক্যাবে যাওয়ার দরকার নেই।"
আরমান মাথা নেড়ে না করে দেয়। —"যেখানে শ্বশুরই মেনে নেননি, সেখানে তার জিনিস ব্যবহার করাটা ভালো দেখায় না।"
উপরের বারান্দায় দাঁড়িয়ে জায়েদ জামান সবকিছু নীরবে দেখছিলেন। কোনো কথা না বলে ধীরে ঘরে ফিরে যান। কিছুক্ষণ পর নওরিন ঘরে ঢুকতেই তিনি মেয়ের দিকে তাকিয়ে নরম অথচ ভারী কণ্ঠে বলেন, —"এমন কাজ করো কেন, যেটাতে শেষমেশ তুমি নিজেই কষ্ট পাও?"
নওরিন থমকে দাঁড়ায়। বাবার কণ্ঠে এক অদ্ভুত ক্লান্তি, যা সে আগে খুব একটা শুনেনি।
জায়েদ আবার বলেন,
—"পরীক্ষা শেষ হলে পাকিস্তান চলে যেও। তোমার চাচ্চু অনেকবার করে বলেছে যেতে।"
ধীরে ধীরে বাবার পাশে গিয়ে বসে নওরিন। তার চোখে-মুখে দ্বিধা, কিন্তু কণ্ঠে দৃঢ়তা,
—"বাবা, আমরা সবাই জানি চাচ্চু কেন ডাকে। কিন্তু এখন তো আমরা ভালো আছি। আমাদের আর কারো প্রয়োজন নেই। যদি কখনো দেশ ছাড়তেই হয়, তাহলে আমরা একেবারে ইউ.এস-এই যাব—আমাদের নিজের নীড়ে।"
জায়েদ জামান মেয়ের দিকে তাকান—চোখে একরাশ ক্লান্তি আর জমে থাকা না বলা কথা। ভারী নিঃশ্বাস ফেলে বলেন,
—"হয়তো কোনোদিন তোমাদের কাউকে ঠিকমতো বুকে আগলে রাখতে পারিনি। কিন্তু তার মানে এই না যে আমি তোমাদের ভালোবাসি না। আমি আমার সন্তানদের বুঝি বলেই নীলুকে বিয়ে দিতে চেয়েছিলাম… যেন কারো জীবন না থেমে যায়, কেউ না কষ্ট পায়।"
নওরিন বিস্ময়ে বাবার দিকে তাকিয়ে থাকে। এতদিনের কঠোর মানুষটার কণ্ঠে আজ যেন অন্যরকম ভাঙন।
জায়েদ জামান মেয়ের মাথায় হাত রেখে ম্লান হেসে বলেন,
—"আমি একজন সাইন্টিস ছিলা... আমি তোমাদের সব খবরই রাখতাম।"
নওরিন তাড়াতাড়ি মাথা নেড়ে বলে,
—"বাবা, এসব কথা বলো না… এখন এগুলো বলা পাপের মতো লাগে। আমি ঠিক আছি। ওটা আমার একটুখানি আবেগ ছিল। ওইদিন লোকটা…না মানে দুলাভাই আমাকে বখাটেদের হাত থেকে বাঁচিয়েছিল, তাই মনে একটু প্রভাব পড়েছিল। এর বাইরে কিছু না। আমার আপুনি ভালো আছে—এটাই আমার জন্য যথেষ্ট।"
তার কণ্ঠে দৃঢ়তা থাকলেও, ভেতরের কাঁপনটা লুকিয়ে থাকে না।
জায়েদ জামান দীর্ঘশ্বাস ফেলেন। বড় মেয়েকে এখনো পুরোপুরি মেনে নিতে পারেননি—অভিমান, অহংকার, না বলা কষ্ট সব মিলিয়ে এক জটিল দেয়াল দাঁড়িয়ে আছে। কিন্তু সেই দেয়ালের আড়ালে যে তিনি দু’মেয়েকেই সমান ভালোবাসেন, সেটাই হয়তো তিনি কখনো ঠিকভাবে বলতে পারেননি। আর আজও সেই না বলা কথাগুলোই তাদের মাঝখানে নীরব দূরত্ব হয়ে রয়ে যায়।
_______________________________________
সাত বছরের সামিন আজ যেন মাটিতে পা ফেলেই না—আকাশে ভাসছে। এতদিন ওর বন্ধুদের সবারই ভাই-বোন ছিল, শুধু ও একাই ছিল একা। সেই অভাবটা আজ পূরণ হয়েছে। ওর ছোট্ট একটা বোন হয়েছে—এই আনন্দেই ওর মুখের হাসি থামছেই না , চোখে চিকচিক করছে অদ্ভুত এক উচ্ছ্বাস।
এদিকে রুবিনা আদির বাবু বাবু বুলিয়ে টিকতে না পেরে ওকে নিয়ে এসেছে। আদি পেয়ে গেছে নতুন এক খেলাধুলার সঙ্গী। একের পর এক খেলনা এনে রাহার সামনে মেলে ধরছে—রঙিন গাড়ি, ছোট ছোট পুতুল, ঝুনঝুনি। রাহা সেগুলো এক এক করে হাতে নিচ্ছে, আর নিজের অজান্তেই মুখে দিয়ে দিচ্ছে। আদি মুগ্ধ হয়ে নিজের নতুন গাড়িগুলো চালিয়ে দেখায়, আর রাহা ছোট্ট ছোট্ট হাত-পা নেড়ে গাড়ির পেছনে ছুটে যেতে চায়—শিশুসুলভ সেই মুহূর্তে ঘরটা ভরে ওঠে নির্মল আনন্দে।
খেলতে খেলতে কখন যে রাহা সিঁড়ির দিকে চলে গেছে, কেউ খেয়ালই করেনি। ছোট্ট হাত দিয়ে রেলিং আঁকড়ে ধরে ধীরে ধীরে এক, দুই, তিন ধাপ উঠে যায়। আদি অবুঝ চোখে কৌতূহল নিয়ে তাকিয়ে ছিল, হঠাৎই ছুটে এসে রাহার হাত ধরে টান দেয়—হয়তো নামাতে চেয়েছিল। কিন্তু সেই টানেই ভারসাম্য হারিয়ে রাহা সিঁড়ি থেকে হুমড়ি খেয়ে পড়ে যায়। মুহূর্তেই দম ফাটা চিৎকার করে উঠে।
ঠিক তখনই পেছন থেকে কেউ ধাক্কা দেওয়ায় আদি নিজেও সিঁড়ির মাথায় পড়ে যায়। সবকিছু এত দ্রুত ঘটে যে সোফায় বসে গল্প করা নীলিমা, রুবিনা আর বাড়ির অন্যরা কয়েক সেকেন্ডের জন্য স্তব্ধ হয়ে যায়।
ফুঁসতে ফুঁসতে দৌড়ে গিয়ে রাহাকে কোলে তুলে নেয়—তার ছোট্ট “ললিপপ” যে ব্যথা পেয়েছে! তার চোখেমুখে তখন রাগ, কষ্ট আর অসহায়ত্ব।
নীলিমা আর রুবিনা দৌড়ে এসে বাচ্চাদের সামলে নেয়। রাহার ঠোঁট কেটে গেছে, আর আদির থুতনিতেও লেগেছে আঘাত। দুজনেই কাঁদছে বুক ফাটানো কষ্টে। নীলিমা তাড়াতাড়ি রাহাকে বুকে জড়িয়ে নিয়ে শাড়ির আঁচল দিয়ে রক্ত থামানোর চেষ্টা করে। কাজের লোকেরা ছুটে আসে পানি আর ফার্স্ট এইড বক্স নিয়ে। এক হাতে রাহাকে আগলে রেখে অন্য হাতে নীলিমা এন্টিসেপটিক বাড়িয়ে দেয় রুবিনার দিকে।
রুবিনা ছেলের কান্না দেখে নিজেও আর নিজেকে সামলাতে পারে না—ফুঁপিয়ে কেঁদে ওঠে। কিছুক্ষণ পর ধীরে ধীরে পরিস্থিতি শান্ত হয়, কিন্তু ঘরের ভেতর একটা চাপা অস্থিরতা থেকেই যায়।
নীলিমা তখন রাগে লাল চোখে তাকায় সামিনের দিকে—ছোট্ট ভাতিজা, যে কিনা এখন চুপচাপ বসে কোলে ঘুমিয়ে পড়া রাহার দিকে গভীর মনোযোগে তাকিয়ে আছে। সামিন ঠিক তার বাবার মতোই—ছোটবেলা থেকেই অন্যায় সহ্য করতে পারে না। কেউ তার আপনজনকে আঘাত করলে সে চুপ করে থাকার ছেলে নয়।
নীলিমার কিছু বলার মতো অবস্থাও নেই। সবাই তো শিশু—অবুঝ, অজান্তেই ভুল করে ফেলে।
রুবিনা চুপচাপ আদিকে নিয়ে সরে যায়। আদি আর একবারও “বাবু”র দিকে তাকায় না—ভয়ে তার ছোট্ট মনটা যেন গুটিয়ে গেছে। ঘরের ভেতর নেমে আসে এক অদ্ভুত নীরবতা।
নীলিমার দ্বিতীয়বার মা হওয়াটা ছিল ভীষণ কষ্টের। সারাক্ষণ বমি বমি ভাব, কিছুই খেতে পারতো না সে। ঠিক সেই সময়েই এমন এক সংবাদ আসে, যাতে পুরো পরিবার অবাক হয়ে যায়— রুবিনা তিন মাসের প্রেগন্যান্ট। অবাক করার বিষয়, রুবিনা নিজেও সেটা জানতো না।
আদির জন্মের সময় এত জটিলতা হয়েছিল যে ডাক্তাররা কঠোরভাবে নিষেধ করেছিলেন অন্তত দশ বছর দ্বিতীয় সন্তানের কথা না ভাবতে। তারাও ভাবেনি। কিন্তু ভাগ্যে হয়তো অন্য কিছুই লেখা ছিল। সব নিষেধাজ্ঞার পরেও নতুন প্রাণ চলে এলো।
রুবিনা অবশ্য ভীষণ খুশি ছিল। তার প্রেগন্যান্সি ছিল একদম সহজ। না বমি, না মাথা ঘোরা, না খারাপ লাগা— কিছুই অনুভব হয়নি। কিন্তু সমস্যা শুরু হয় সাত মাসের দিকে। হঠাৎ হঠাৎ পেটে চিনচিনে ব্যথা উঠতো। তবুও রুবিনা কাউকে কিছু বলেনি। ভয় ছিল, যদি সবাই মিলে তার বাচ্চাটাকে নষ্ট করে দিতে চায়! সে মরেও নিজের সন্তানকে কিছু হতে দেবে না।
দিনের পর দিন চুপচাপ সহ্য করলেও সাড়ে আট মাসে এসে আর পারলো না। অবশেষে নীলিমাকে সব জানায়।
এই সময়ে আদি আর রাহা বেশিরভাগ সময় অভয়ের স্ত্রী ইয়াসমিনের কাছেই থাকতো। আদিকে প্রতিদিন সাজিদ ওদের বাসায় দিয়ে যায়। ইয়াসমিন খুব মিশুক হওয়ায় বাচ্চারাও তাদের চাচি মনির সঙ্গেই বেশি স্বচ্ছন্দ ছিল।
রুবিনার কথা শুনেই নীলিমা সেদিন তাকে হাসপাতালে নিয়ে যায়। কিন্তু সময়ের সাথে সাথে পরিস্থিতি ভয়াবহ হয়ে ওঠে। ডাক্তাররা জানিয়ে দেয়— মা আর বাচ্চার মধ্যে যেকোনো একজনকে বাঁচানো সম্ভব হতে পারে।
কথাটা শুনে সাজিদের বুকটা যেন পাথর হয়ে যায়। তবুও কষ্ট চেপে বলে,
— মা'কে বাঁচান… আল্লাহ চাইলে সন্তান আবার হবে। কিন্তু মা ছাড়া সন্তান ভালো থাকবে না।
হাসপাতালের বাইরে আদি আর রাহাকে নিয়ে বসে আছে নীলিমা। চার বছরের আদি এখন অনেক কিছুই বুঝতে শেখেছে। মা অসুস্থ বুঝার পর থেকেই কাঁদছে সে। আদিকে কাঁদতে দেখে রাহাও ঠোঁট উল্টে ছলছল চোখে কখনো আদির দিকে, কখনো মায়ের দিকে তাকাচ্ছে।
নীলিমার নিজের অবস্থাও অস্থির। মনে মনে শুধু আল্লাহকে ডাকছে— যেন মা আর সন্তান দুজনেই সুস্থ থাকে। আগেরবারের স্মৃতি এখনো তাকে তাড়া করে বেড়ায়।
— মাম্মা!
রাহার মৃদু ডাকে চিন্তায় ডুবে থাকা নীলিমা সাড়া দেয় না। ছোট্ট মেয়েটা আবার ডাক দেয়,
— মাম্মা!
চমকে তাকিয়ে নীলিমা মৃদু হেসে বলে,
— হ্যাঁ মা, বলো।
“মা” শব্দটা শুনে রাহা কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকে। সামিন বলে “মাম্মা”, আদি বলে “মা”… তাহলে সে কী বলবে?
ছোট্ট গলায় প্রশ্ন করে,
— আন্টিল কি হয়েসে? আদি কাদসে কিনো?
নীলিমা মেয়ের সিল্কি চুলে হাত বুলিয়ে নরম স্বরে বলে,
— আন্টির একটা বেবি হবে তো, তাই আন্টি অসুস্থ। আদি ওর ভাই আর মায়ের জন্য কাঁদছে। তুমি প্রে করো, যেন বেবিটা তাড়াতাড়ি এসে পড়ে। বেবি আর আন্টি দুজনেই ভালো থাকে।
নীলিমার কথায় এখনো হালকা বিদেশি টান রয়ে গেছে। রাহাও সেটা রপ্ত করে ফেলেছে। বিষয়টা নিয়ে নীলিমা চিন্তিত। সে চায় তার ছেলে-মেয়েরা পুরোপুরি বাঙালি সংস্কৃতিতেই বড় হোক। তাই ইচ্ছে করেই ওদের সঙ্গে বেশি বাংলা বলে।
অবশেষে অসংখ্য দোয়া আর উৎকণ্ঠার পর গভীর রাতে খবর আসে— বাচ্চা সুস্থ আছে, তবে রুবিনার অবস্থা এখনো আশঙ্কাজনক।
সাদা তোয়ালে জড়ানো ছোট্ট শিশুটিকে নার্স যখন বাবার হাতে তুলে দিতে যায়, সাজিদ প্রথমে হাত বাড়ায় না।
কারণ… বাচ্চাটার চোখ।
অপরিপক্ক, ছোট্ট মুখে জ্বলজ্বল করছে সেই নীল চোখ। ঠিক সেই চোখ, যে চোখ একসময় তার অস্তিত্ব ভেঙে চুরমার করে দিয়েছিল। এখন কি সেই একই চোখ আবার তার দ্বিতীয় অস্তিত্বও কেড়ে নেবে?
নীলকে পৃথিবীতে আনা সেই মহিলা ডাক্তার সাজিদের মুখ দেখে যেন কিছুটা আন্দাজ করতে পারেন। মৃদু হেসে বলেন,
— মা তার সন্তানকে চেয়েছে। আপনার স্ত্রী সুস্থ হয়ে যাবে, ইনশাআল্লাহ। তবে বাচ্চাটা খুব নাজুক। অবজারভেশনে রাখতে হবে। একবার দেখে নিন।
সবাইকে সরিয়ে ছয় মাসের সন্তানসম্ভবা শরীর নিয়ে ধীরে এগিয়ে যায় নীলিমা। আরমানও পাশে এসে দাঁড়ায়। নার্স খুব সাবধানে বাচ্চাটাকে নীলিমার কোলে তুলে দেয়।
আর ঠিক তখনই…
নীলিমার ঠোঁট দুটো বিস্ময়ে সামান্য ফাঁক হয়ে যায়।
ছোট্ট শিশুটি আধখোলা চোখে তাকিয়ে আছে তার দিকে। আর সেই চোখ— গভীর নীল। শান্ত সমুদ্রের ভেতর জমে থাকা অজস্র না বলা গল্প।
আরমানও স্তব্ধ হয়ে তাকিয়ে থাকে।
কয়েক সেকেন্ডের নীরব বিস্ময় কাটিয়ে নীলিমা আস্তে করে বলে,
— আলহামদুলিল্লাহ…
তারপর আলতো করে শিশুটার কপালে চুমু খায়।
[গল্প শেষে অবশ্যই নোট গুলো পড়বেন]
________________________
রুবিনার ছয় ঘণ্টা পর জ্ঞান ফিরতেই সবাই একে একে তাকে দেখতে আসে। কিন্তু ছেলে কোলে নিয়েই রুবিনা মুখ ফুলিয়ে বসে থাকে। এত কষ্ট করে গর্ভে রাখলো, অথচ ছেলে পেয়েছে অন্য কারও মতো অদ্ভুত চোখ! নীলিমা হেসে মেডিক্যালের ভাষায় বুঝিয়ে বলে, সব সন্তান যে বাবা-মায়ের মতো হবেই এমন নয়, প্রত্যেকের নিজস্ব বৈশিষ্ট্য থাকে।
নীলিমা বারবার বলেছিল ছেলেটার নাম “নীল” রাখতে। রুবিনাও খুশিমনে রাজি হয়ে যায়। কারণ সেদিন নীলিমা জোর না করলে তার ছেলের কী হতো ভাবতেই সে আতকে ওঠে। আল্লাহ যেন নীলিমা আপার মাধ্যম বানিয়ে তার সন্তানকে সুস্থ রেখেছেন।
মেহতাব খান নীল শুধু পরিবারের একটা শিশু নয়, সবার মুখে মুখে এখন একটাই নাম— নীল। ভারী শরীরের জন্য নীলিমা যেতে না পারলেও প্রতিদিন ভিডিও কলে কোলের শিশুটাকে দেখে চোখ জুড়ায়। তার পাশে পাল্লা দিয়ে ছোট্ট রাহাও ড্যাবড্যাব করে তাকিয়ে থাকে। নীলিমা ভুলে গেলেও রাহা প্রতিদিন নিয়ম করে মাকে ছোট বেবির কথা মনে করিয়ে দেয়।
এরই মধ্যে রাহার সামিন ভাই পরিবার নিয়ে দূর দেশে চলে গেছে। প্রতিদিনের খেলার সাথী আদিও এখন ছোট ভাইকে পেয়ে আগের মতো আর আসে না। এতে রাহা সবসময় মনমরা হয়ে থাকে।
দেখতে দেখতে নীলের বয়স দুই মাস হলে রুবিনা আদি আর নীলকে নিয়ে আসে নীলিমাদের বাড়িতে। কারণ রাহা প্রতিদিন ছোট বেবিকে কোলে নেওয়ার বায়না করে। আদি সারাদিন ভাইকে কোলে নেয়, রাহারও তো ইচ্ছে করে!
প্রায় এক ঘণ্টা ধরে রুবিনা আলতো করে রাহার হাতে নীলকে দিয়ে পাশে বসে আছে। অথচ রাহার কোনো নড়াচড়া নেই। সে শুধু ঘুমন্ত নীলের দিকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। মাঝেমধ্যে ছোট ছোট হাত দিয়ে নীলের মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছে। মাকে দেখেই এসব শিখেছে মেয়েটা।
এতক্ষণ নিজের নতুন খেলনা নিয়ে ব্যস্ত থাকা আদি ভাইকে দেখতে এসে হঠাৎ হাত ধরে টান দেয়। সঙ্গে সঙ্গে নীল চোখ বন্ধ রেখেই কেঁদে ওঠে। আচমকা রাহা কপাল কুঁচকে আদির বুকে ধাক্কা মেরে বলে,
— বাবু ব্যাথা পাছসে, তুমি ধোরো না।
রুবিনা দ্রুত নীলকে বুকে তুলে দোল দিয়ে শান্ত করতে থাকে। তারপর আদির এক হাত ধরে রাহার পাশে বসিয়ে ঠোঁটে আঙুল ছুঁইয়ে “শশহ” শব্দ করে চুপ থাকতে বলে। আদি আর রাহা দু’জনেই বাধ্য বাচ্চার মতো চুপ হয়ে যায়। কিছুক্ষণ পর আবার নীল ঘুমিয়ে পড়ে।
সময় গড়িয়ে নীলের বয়স যখন সাড়ে তিন মাস, তখন শানের জন্ম হয়। নীল এখন টুকটুক চোখে চারপাশ দেখে। রাহারও তিন বছর হয়ে গেছে। সারাদিন মায়ের আশেপাশে ঘুরে নিজের ভাইকে দেখেই সময় কাটে তার।
অন্যদিকে অভয়ের স্ত্রী ইয়াসমিনের পেটও ফুলে উঠেছে। ইয়াসমিন রাতে রাহাকে নিজের কাছে রাখতে চাইলে আরমান রাজি হয় না। কারণ তার বখে যাওয়া ভাই প্রায়ই গভীর রাতে নেশা করে বাড়ি ফেরে, আর তা নিয়েই সংসারে লেগে থাকে অশান্তি।
______________________
রাহা নিজের ভাইকে পেলেও তার মন যেন সবসময় খুঁজে বেড়ায় সেই সুন্দর বাবুটাকে— নীলকে। রুবিনা প্রায়ই আদি আর নীলকে নিয়ে আসে নীলিমাদের বাড়িতে। নীলিমা নিজে খুব একটা যেতে পারে না। কারণ ইয়াসমিনের আবার মেয়ে হয়েছে। মেয়েটার বয়সই তো মাত্র ষোল! এত অল্প বয়সে মা হওয়ায় শরীরটাও ভালো নেই, তার উপর সংসার-সন্তান কিছুই ঠিকমতো বুঝে উঠতে পারে না। এসব ভেবে নীলিমার ভীষণ রাগ হয় ওই কুলাঙ্গার ছেলেটার উপর। সে আর আরমান কত বুঝিয়েছে— এখন একটা মেয়ে হয়েছে, অন্তত এবার যেন মানুষ হয়। কিন্তু শুনলে তো! মাঝে মাঝে নীলিমার মনে হয়, ছোট্ট ইয়াসমিনটার ভাগ্যটা হয়তো আরও একটু ভালো হতে পারতো।
রাহা যখনই নীলকে কাছে পায়, তখন যেন দুনিয়ার সবকিছু ভুলে যায়। বাবুটাকে এত সুন্দর লাগে তার! চোখ দুটো একদম মায়াভরা, ঠিক যেন ওর মায়ের মতো। রাহার সবচেয়ে বেশি ভালো লাগে নীলের চোখ।
দেখতে দেখতে নীল আর শানের বয়স দুই পার হয়ে গেছে। নীল শানের থেকে বড় হওয়ায় সবার আগেই কথা বলতে শিখেছে। সাধারণ বাচ্চারা দুই বছর বয়সে টুকটাক কথা বললেও নীল যেন কথার পাখি। বুঝুক আর না বুঝুক, সারাদিন এলোমেলো বকবক করেই যায়। আর নীলের সেই আধো আধো কথাগুলো শুনে সবসময় চুপচাপ থাকা রাহাও মুখে হাত চেপে হেসে ওঠে। আদির তো ভাইকে নিয়ে আহ্লাদের শেষই নেই।
আজ সকালে নীলিমা রাহা আর শানকে নিয়ে খান বাড়িতে এসেছে। আজ সাজিদের বোন শিরিনকে দেখতে আসবে পাত্রপক্ষ। অবশ্য শিরিন নিজেই ছেলেটাকে পছন্দ করেছে। ছেলে একজন ডাক্তার, নীলিমারই জুনিয়র ছিল একই হাসপাতালে।
এদিকে আদিকে স্কুলে ভর্তি করানো হয়েছে। সকাল থেকে রাহা নীল আর শানকে নিয়ে ব্যস্ত। খেলছে বলতে— নীল আর শান সারাবাড়ি দৌড়ে বেড়াচ্ছে, আর রাহা ওদের পেছনে পেছনে পাহারা দিচ্ছে।
নীল এখন পুরো দমে দৌড়াতে পারে। রাহা বারবার বলছে,
— সুন্দর বেবি, যেও না! পড়ে যাবে!
কিন্তু নীল কি আর শোনে! দৌড়াতে দৌড়াতে হঠাৎ টেবিলের সাথে পা লেগে মুখ থুবড়ে পড়ে যায়। সঙ্গে সঙ্গে কান্না জুড়ে দেয়। রাহা তাড়াতাড়ি মেঝেতে বসে নীলের পা ডলতে ডলতে ঠোঁট উল্টিয়ে বলে,
— আপু আদর করে দিচ্ছি তো, নীল বেবি কাদে না। নীল তো ভালো, তাই না?
শান পড়ে গেলে নীলিমা ঠিক এভাবেই আদর করে থামায়। তাই রাহাও মায়ের মতো করেই নীলকে শান্ত করার চেষ্টা করছে।
নীল ফোঁপাতে ফোঁপাতে কান্না থামিয়ে আধো গলায় বলে,
— আমি অয়েক বালো লাহামুনি... (আমি অনেক ভালো রাহামনি)
রাহা হেসে গালে হাত বুলিয়ে দেয়। — হুম, ব্লু বেবি অনেক ভালো।
এতক্ষণ নীলের কান্না দেখে শান শুধু ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে ছিল। কিন্তু যখন দেখলো তার আপুনি নীলকে এত আদর করছে, তখন ছোট্ট মনটা যেন সেটা মানতে পারলো না। দৌড়ে এসে রাহার গলা জড়িয়ে ধরে মুখে এলোমেলো শব্দ করে বূঝায় সে অনেক ভালো...
রাহা মুচকি হেসে দু’জনকেই কাছে টেনে নেয়।
— হুম, তুমিও অনেক ভালো। আমরাই সবাই ভালো।
শানের দেখাদেখি নীলও রাহার গলা জড়িয়ে ধরে।
ঠিক তখনই পেছন থেকে আদি অভিমানী গলায় বলে ওঠে,
— রাহামনি, তুমি আমাকে ছাড়া একাই খেলছো!
রাহা তড়াক করে ফিরে তাকিয়ে দেখে আদি স্কুল ড্রেস পরেই দাঁড়িয়ে আছে। সঙ্গে সঙ্গে মুখভরা হাসি ফুটে ওঠে তার।
— আমি তো খেলিইনা তোমাকে ছাড়া!
আদির হাতে ছোট্ট একটা বক্স। সে এগিয়ে এসে কোনোমতে নীলকে কোলে তুলে গালে চুমু দিয়ে বলে,
— ভাইয়া, তোমাকে অনেক মিস করেছি ব্লু বেবি।
নীলও গর্বিত গলায় বলে,
— আমি অয়েক বালো!
আদি হেসে মাথা নাড়ে।
— হ্যাঁ, আমাদের ব্লু বেবি অনেক ভালো।
তারপর হাতে থাকা বক্সটা রাহার দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বলে,
— আমার আজ একটা বন্ধু হয়েছে। ও ওর বোনের জন্য এটা কিনেছিল। তাই আমিও ড্রাইভার আংকেল থেকে টাকা নিয়ে তোমার জন্য কিনেছি।
রাহা অবাক হয়ে পুতুল আকৃতির বক্সটা খুলে দেখে— ভেতরে রঙিন ছোট ছোট ক্লিপ। চোখ দুটো আনন্দে চকচক করে ওঠে। রাহা খুশি হয়ে বলে,
— থ্যাংক ইউ আদি!
এদিকে সকাল থেকেই রুবিনা রান্নাঘরে ব্যস্ত। একের পর এক পদ রান্না করছে, নীলিমাও পাশে থেকে সাহায্য করছে। বাচ্চাদের খোঁজ নিতে গিয়ে নীলিমা যখন আদির ঘরের সামনে দাঁড়ায়, তখন ভেতরের দৃশ্য দেখে তার মনটা ভরে যায়।
ছোটবেলা থেকেই আদি আর রাহা একসাথে বড় হচ্ছে। দু’জনের বোঝাপড়া, ভালোবাসা— সবকিছুই অদ্ভুত সুন্দর। এমন দৃশ্য দেখলে যে কারও মন ভালো হয়ে যাবে।
সব ঠিকই ছিল। কিন্তু নীলিমাকে দেখামাত্রই নীল হাত বাড়িয়ে বলে ওঠে, — আম্মিই!
নীলিমা হেসে তাকে কোলে তুলে নেয়। আর সেটাই রাহার একদম ভালো লাগে না। তার ব্লু বেবি সবসময় মায়ের সাথেই লেগে থাকে!
নীলিমা রাহার সিল্কি চুলে হাত বুলিয়ে নরম গলায় জিজ্ঞেস করে, — কী হয়েছে আমার মায়ের? আমার রাহামনি এমন গম্ভীর হয়ে আছে কেন?
রাহা মুখ ফুলিয়ে অকপটে বলে ফেলে,
— তুমি ব্লু বেবিকে কোলে নিও না মা। আমার একটুও ভালো লাগে না।
রাহার কথা শুনে নীলিমা একটু থমকে যায়। এর আগেও বহুবার রাহা বলেছে, “আমার ভাইয়ের থেকেও ব্লু বেবি বেশি সুন্দর। ওকে আদর করতে আমার অনেক ভালো লাগে। কিন্তু যখন ব্লু বেবি তোমার সাথে থাকে, তখন ওকে আর ভালো লাগে না... মারতে ইচ্ছে করে।”
তখন নীলিমা হেসে উড়িয়ে দিলেও আজ হঠাৎ মনে হলো— মেয়েটা হয়তো সত্যিই কাউকে ভাগ করে নিতে পারে না। এমনকি রাতেও শান বাবার কাছে থাকলেও রাহা সবসময় মাকেই খোঁজে।
নীলিমা নীলকে কোল থেকে নামাতে চাইলেও পারে না। ছেলেটা ছোট ছোট হাত দিয়ে এমন শক্ত করে জড়িয়ে ধরে থাকে যেন ছেড়ে দিলেই হারিয়ে যাবে।
ঠিক তখনই ওয়াশরুম থেকে ড্রেস চেঞ্জ করে আদি বেরিয়ে আসে। এসে শানের হাত ছাড়িয়ে রাহাকে টেনে নিয়ে যায় খেলতে। জোর করে আপুনির কাছ থেকে আলাদা করায় শান ঠোঁট উল্টে কান্না করতে যাবে, তার আগেই নীলিমা অন্য হাত দিয়ে তাকেও কোলে তুলে নেয়।
মুহূর্তেই দুই পাশে দুই বাচ্চা ঝুলে যায় তার গলায়।
_____________________________
শিরিন ছিল একটু কর্কশ স্বভাবের মেয়ে। মানুষকে খোঁচা মেরে কথা বলাতেই যেন তার অদ্ভুত আনন্দ। তবে আজ তাকে বেশ শান্তই লাগছে। রুবিনা নিজের হাতে সুন্দর করে শাড়ি পরিয়ে দিচ্ছে তাকে। পুরো বাড়িজুড়ে আজ সাজসজ্জার আমেজ।
ছোট রাহা ড্যাবড্যাব করে সবার দিকে তাকিয়ে দেখছিল। বাড়ির সব বড়রা আজ শাড়ি পরেছে। কৌতূহলী গলায় সে জিজ্ঞেস করল,
— সবাই শাড়ি পড়েছো কেনো?
রুবিনা হেসে তার গাল টিপে বলল,
— নারী পূর্ণ হয় শাড়িতে। মেয়েদের শাড়িতেই সবচেয়ে সুন্দর লাগে।
রাহা পুরোটা না বুঝলেও এটুকু বুঝেছে— শাড়ি পরলে সুন্দর লাগে। ব্যস! সঙ্গে সঙ্গে বায়না ধরে বসল, — আমিও শাড়ি পড়বো!
এবার সবাই বিপাকে পড়ে গেল। এত ছোট মেয়ের জন্য শাড়ি কোথায় পাওয়া যাবে? নীলিমা আরমান কে ফোন করে বলে দেয় আসার পথে মেয়ের জন্য একটা শাড়ি আনতে। ঘন্টা খানেক পর আরমান শাড়ি হাতে উপস্থিত হয়। সাজিদ বাসার কাজে ছিল তাই আরমান অফিসে গিয়েছিলো। রুবিনা সুন্দর করে শাড়ি পড়িয়ে দেয়।
শাড়ি পরে ছোট্ট রাহার খুশির যেন শেষ নেই। বারবার নিজের আঁচল ঠিক করছে, ঘুরে ঘুরে দেখছে। তবে বিপত্তি বাঁধলো হাঁটতে গিয়ে। বারবার পা জড়িয়ে যাচ্ছে। শেষমেশ আরমান চৌধুরী মেয়েকে কোলে নিয়েই ঘুরে বেড়াতে লাগলেন।
যেহেতু আগে থেকেই পছন্দ করা ছিল, তাই আজকের দেখাদেখিতে মূলত বিয়ের তারিখ ঠিক করা হলো। আগামী মাসেই শিরিনের বিয়ে হবে।
এদিকে আদি আজ রাহার কাছ ছাড়ছেই না। রাহা সোফায় বসে থাকলে সেও হাত ধরে পাশে বসে থাকে।
নীলিমারা এখন বাড়ি ফিরবে। আরমান ঘুমন্ত শানকে কোলে নিয়ে দাঁড়িয়ে সাজিদের সাথে কথা বলছে। মেহমান আসার আগেই নীল আর শানকে ঘুম পাড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল।
নীলিমা এসে রাহার সামনে দাঁড়িয়ে নরম গলায় বলল,
— রাহামনি, চলো শাড়ি খুলে ফেলবে।
কিন্তু তার আগেই আদি তড়াক করে বলে উঠল,
— না! খুলতে হবে না। রাহামনিকে শাড়িতে অনেক সুন্দর লাগছে।
নীলিমা মুচকি হেসে বলল,
— রাহামনি তো এখন ছোট। এভাবে থাকতে পারবে না।
আদি কিছুক্ষণ চুপ থেকে হঠাৎ জিজ্ঞেস করল,
— বড় হলে কি রাহামনি শাড়ি পড়বে?
রুবিনা ফট করে হেসে বলে উঠে,
— উঁহু। যখন রাহামনির বিয়ে হবে, তখন শাড়ি পড়বে। যখন কারো বউ হবে তখন।
কথাটা শুনেই আদি নিষ্পাপ ভঙ্গিতে নীলিমার দিকে তাকিয়ে বলে উঠল,
— আম্মি, রাহাকে আমি বিয়ে করবো। রাহামনিকে আমার বউ বানাবো।
মুহূর্তে পুরো ঘর নিস্তব্ধ হয়ে গেল। সবাই অবাক হয়ে ছোট আদির দিকে তাকিয়ে রইল। সাজিদ কপাল কুঁচকে রুবিনার দিকে তাকাল। কারণ আদিকে এসব কথা মূলত রুবিনাই মজা করে শিখিয়েছে। রাহার কথা উঠলেই বলত, “রাহা তোমার বউ হবে। রাহাকে তোমার সাথে বিয়ে দিবো”
বড়দের মতো করে আদির এমন কথা শুনে সবাই যখন অপ্রস্তুত, তখন নীলিমাই পরিস্থিতি স্বাভাবিক করল। নিচু হয়ে আদির মাথার চুল এলোমেলো করে মুচকি হেসে বলল,
— আল্লাহ চাইলে অবশ্যই হবে। রাহা আর তুমি একদিন একসাথেই থাকবে, ইনশাআল্লাহ।
নীলিমার স্বাভাবিক কথায় ঘরের চাপা অস্বস্তিটা কেটে যায়।
সেদিন রাতেই নীলিমা আরমানের কাছে এক অদ্ভুত আবদার করে বসে। নরম গলায় বলে,
— আরমান… যার আমার কাছে আসার কথা ছিল, আল্লাহ হয়তো তাকে আবার আমার কাছে ফিরিয়ে দেবে বলেই আদি এমন কথা বলেছে… তাই না?
আরমান সেদিন প্রিয় স্ত্রীর হাতে আলতো চুমু খেয়ে বলেছে,
— আদি আর রাহা এখন থেকেই একজন আরেকজনকে চোখে হারায়। বড় হলে আল্লাহ চাইলে সত্যিই একসাথেই থাকবে, দেখে নিও।
সময়ের স্রোতে দিন কেটে যায়।
এক মাস পর শিরিনের বিয়ে হয়ে যায়। তবে বিয়ের পরও সে খান বাড়িতেই থাকে। কারণ তার শ্বশুরবাড়ি কুমিল্লায় হলেও স্বামী লাময়াক ঢাকাতেই চাকরি করে। তাই সাজিদ বলেছে, “অযথা বাড়ি ভাড়া নিয়ে থাকার দরকার কী? এখানেই থাকো।”
ছোট আদির আজ আট বছর পূর্ণ হলো। আরও আগেই তার সুন্নাতে খৎনা করানোর কথা ছিল, কিন্তু কিছু শারীরিক সমস্যার কারণে এতদিন করা হয়নি। তাই আজ খান বাড়িতে আবারও সবাই একত্রিত হয়েছে।
তবে এই দুই বছরে অনেক কিছু বদলে গেছে।
শিরিন এখন নয় মাসের গর্ভবতী। ছোট শান আর নীল এখন দেখা হলেই একসাথে পুরো বাড়ি মাথায় তুলে দৌড়ঝাঁপ করে বেড়ায়। আর নীল! সে ভীষণ দুষ্ট হয়ে উঠেছে। ছোট-বড় কাউকে জ্বালাতে পারলেই যেন তার শান্তি।
আর এই স্বভাবটাই রাহার একদম সহ্য হয় না।
বিশেষ করে যখন নীল তার মায়ের গায়ে গা লাগিয়ে থাকে।
আগে নীলকে দেখে রাহার চোখ জুড়িয়ে যেত। এখন সেই মুগ্ধতা ধীরে ধীরে বিরক্তিতে বদলে যাচ্ছে— যা সবার চোখেই পড়ে। রাহার ছোট্ট মনটা কিছুতেই মানতে পারে না, তার মা কেন নীলকে এত আদর করবে! এমন না যে নীলিমা অন্য কাউকে ভালোবাসে না। কিন্তু নীলকে যেন একটু বেশিই স্নেহ করে। আর সবাই যখন মজা করে বলে, “নীল তো নীলিমার ছেলে!” তখন রাহার একটুও ভালো লাগে না।
এদিকে আদি সকাল থেকেই ভয়ে কুঁকড়ে আছে। বাবা তাকে বলে দিয়েছে, “আজ ওটা কেটে দিবে।”
ছোট্ট মাথায় কথাটার মানে পুরো না বুঝলেও এটুকু বুঝেছে— ভীষণ কষ্ট হবে। তাই সকাল থেকে সবার সাথে থাকলেও মুখটা কেমন আতঙ্কে ছোট হয়ে আছে।
রাহা বাড়িতে এসেই মায়ের পিছু পিছু ঘুরছে। আজ সে ঠিক করেছে, কোনোভাবেই নীলকে মায়ের কোলে উঠতে দেবে না। তার মা শুধু তাকেই আদর করবে।
অন্যদিকে নীলও কম যায় না। সকাল থেকেই সুযোগ খুঁজছে ফুলোমুখো মেয়েটাকে জ্বালানোর।
রাহা একটু ক্লান্ত হয়ে সোফায় বসতেই নীল চুপিচুপি খেলনা সাপটা হাতে নিয়ে সোফার পেছনে গিয়ে দাঁড়ায়। তারপর ধীরে ধীরে সাপটা রাহার মাথার উপর ঝুলিয়ে দেয়।
মাথার উপর কিছু অনুভব করে রাহা হাত বাড়িয়ে ধরতেই কালো-সবুজ রঙের জিনিসটা দেখে জমে যায়। পরক্ষণেই বুঝতে পেরে সেটাকে ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে ভয়ে চিৎকার করে কেঁদে ওঠে।
রাহার চিৎকারে সিঁড়ি দিয়ে নামতে থাকা আদি, নীলিমা, রুবিনা, ইয়াসমিন সবাই দৌড়ে আসে। নীলিমা দ্রুত মেয়েকে বুকে জড়িয়ে ধরে উৎকণ্ঠিত গলায় জিজ্ঞেস করে, — কী হয়েছে মা?
কিন্তু ঠিক তখনই নীল লাফিয়ে লাফিয়ে হেসে ওঠে। সবাই একবার হাসতে থাকা নীলের দিকে, আরেকবার কাঁদতে থাকা রাহার দিকে তাকায়।
রাহাও ফোঁপাতে ফোঁপাতে খেয়াল করে— ওটা আসলে খেলনা সাপ।
নীল এবার নিচে পড়ে থাকা সাপটা তুলে নিয়ে দোলাতে দোলাতে হেসে বলে, — রাহামনি সামান্য একটা সাপ দেখে ভয় পেয়েছে! হা হা!
লজ্জা, অপমান আর রাগে রাহার চোখমুখ লাল হয়ে যায়। ঠোঁট শক্ত করে চেপে ধরে সে কাউকে কিছু না বলে দৌড়ে উপরে চলে যায়।
রুবিনা এবার নীলকে বকা দেয়। আর সবাই দীর্ঘশ্বাস ফেলে।
কারণ নীল বুঝ হওয়ার পর থেকেই রাহাকে জ্বালায়। আর রাহাও ঠিকই রিয়্যাক্ট করে, এতে নীলের দুষ্টুমি যেন আরও বাড়তেই থাকে।
আদি ধীরে ধীরে ভাইয়ের কাছে এসে বলে, — নীল, এটা ঠিক হয়নি। রাহামনি কষ্ট পেয়েছে তো।
মায়ের বকা খেয়ে এমনিতেই চুপ হয়ে ছিল নীল। এবার আদির কথায় তার মুখটা আরও ছোট হয়ে যায়। কেমন অপরাধী গলায় জিজ্ঞেস করে, — রাহামনি কি বেশি কষ্ট পেয়েছে?
ওদিকে রাহা আদির ঘরে এসে একটা পুতুল বুকে জড়িয়ে চুপচাপ চোখের পানি মুছছে।
ঠিক তখনই নীল পা টিপে টিপে খুব সাবধানে তার পেছনে এসে দাঁড়ায়।
রাহা পাশ ফিরে নীলকে দেখেই বিরক্ত গলায় কিছু বলতে যাবে, তার আগেই নীল হঠাৎ ঝুঁকে কান্নায় ফুলে থাকা ঠোঁটে আলতো করে চুমু খায়।
রাহা হতভম্ব হয়ে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকে। — তুমি এটা কী করলে?
নীল নিষ্পাপ হাসি দিয়ে বলে, — কেনো? কিসি দিয়েছি! মা যখন কষ্ট পায়, বাবা মাকে কিসি দেয়। তখন মা আর কষ্ট পায় না। আমিও তোমাকে কিসি দিলাম… তুমি কিন্তু কষ্ট পেও না।
ওদিকে নীলিমা মেয়ের পেছনে যেতে চাইলে রুবিনা হাত ধরে থামিয়ে দিয়ে বলে,
— নীল তো ছোট মানুষ, বুঝে না। তাই রাহাকে জ্বালায়। তুমি কিছু মনে কোরো না।
নীলিমা একটু অবাক হয়ে ধীর গলায় বলে,
— নীল আর রাহা… দুজনেই তো বাচ্চা। বাচ্চা রা করবে না তো কে করবে?
নীলিমার কথার ফাঁকে নীল ছোট ছোট পায়ে সিড়ি দিয়ে রাহার কাছে চলে যায়।
দু’জনকে একসাথে দেখে হঠাৎ নীলিমার মুখটা ফ্যাকাশে হয়ে যায়।
মনে হয়— পুরনো কোনো দৃশ্য যেন আবার ফিরে আসছে…
যদি আবারও এমন কিছু হয়…!
পরক্ষণেই নিজেকে ধমক দেয় সে।
ধুর! এরা তো নিতান্তই বাচ্চা। এসবের কী-ই বা বোঝে ওরা?
ভুল তো আসলে বড়দের। বাচ্চাদের সামনে না বুঝে কত কিছুই না করে, বলে… আর শিশুরা নিষ্পাপ মনে সেসবই শিখে রাখে।
চলবে..