#প্রনয়ের_প্রলয়
#কলমে_মেহরিমা_সারা
#পর্বঃ২১
কাল সকালে সবাই Chittagong যাবে। তাই রাত বাড়তেই শান আর অপেক্ষা করতে পারেনি। সকালবেলায় ভার্সিটির প্রোগ্রামের কারণে কিয়ারার সাথে ঠিকমতো দেখা হয়নি, আর সেই অস্থিরতাই ওকে টেনে নিয়ে এসেছে খান বাড়িতে। অবশ্য মুখে সে যতই বলুক নীলের সাথে দেখা করতে এসেছে, আসল উদ্দেশ্যটা যে অন্য কেউ— সেটা বাড়ির সবাই না বুঝলেও নীল ঠিকই বুঝে গেছে।
রুবিনা খান কাজের লোকদের দিয়ে একের পর এক নাস্তা বানিয়ে চলেছে শানের জন্য। ছেলেটা বহুদিন পর এসেছে। ড্রয়িংরুমে বসে আছে শান আর নীল।
নীল সোফার এক কোণে হেলান দিয়ে বসে আছে। এক হাত হাঁটুর উপর রাখা, আঙুলের ডগা দিয়ে ধীরে ধীরে নিজের ধারালো চোয়াল ছুঁয়ে যাচ্ছে। তার তীক্ষ্ণ চোখদুটো স্থির হয়ে আছে শানের দিকে। সেই দৃষ্টিতে বিরক্তি আছে, সন্দেহ আছে, আবার খানিকটা দুষ্টুমি লুকিয়ে আছে।
কিছুক্ষণ চুপচাপ তাকিয়ে থেকে নীল মাথা সামান্য উপর-নিচ করে ধীর গলায় বলে উঠে,
— তো… তুই কার জন্য এসেছিস? আমার জন্য, রাইট?
শান তখন পুরো মনোযোগ দেখছিলো দোতলার রেলিং ধরে দাঁড়িয়ে থাকা কিয়ারার দিকে। চোখে এমন এক মুগ্ধতা, যেন চারপাশে আর কিছুই নেই। নীলের কথায় চমকে দৃষ্টি সরিয়ে নিয়ে ঠোঁটে বোকাসোকা হাসি টেনে বলে,
— দোস্ত, ইয়ার… তোকে দেখতে এসেছি!
নীল সঙ্গে সঙ্গে কটমট করে তাকায়। তার চোয়াল শক্ত হয়ে আসে।
— শালা ভণ্ড! সকালে তো আমার সাথে তোর দেখা হয়েছেই, এটা সবাই জানে। তারপরও মাকে বলছিস আমার সাথে দেখা করতে এসেছিস?
শান এবার অবাক হওয়ার অভিনয় করে বুকের উপর হাত রাখে।
— ওমা! তুই আমার জানে-জিগার নীল। তোকে কিছুক্ষণ না দেখলে আমার শ্বাস নিতেই কষ্ট হয়।
নীল বিরক্ত হয়ে চোখ বন্ধ করে মাথা পেছনে ঠেকায়। এই দুই প্রেমিক-প্রেমিকার নাটক তার সহ্যের সীমা ছাড়িয়ে যাচ্ছে। এরা এমন করে কীভাবে? সামান্য দেখাদেখির জন্যও এমন অস্থিরতা! মনে মনে বিরক্ত হয়ে বলে উঠে,
“ভণ্ড… পুরো ভণ্ড!”
উপরে দাঁড়িয়ে সবকিছু দেখছিল কিয়ারা। ছোট ভাইয়ের বিরক্ত মুখ দেখে তার হাসি পেয়ে যায়। নীলের তীক্ষ্ণ চোখের দিকে তাকিয়ে মুখ বাঁকিয়ে মনে মনে বলে,
“রাহা আপু তো ফিরেও তাকায় না, তাতেই এই অবস্থা! কোনোদিন যদি একটু সাড়া দেয়, তাহলে তো ভাইয়াকে খুঁজেই পাওয়া যাবে না।”
নীল হঠাৎ হাত তুলে আড়মোড়া ভাঙে। চোখেমুখে ক্লান্তি স্পষ্ট। অলস ভঙ্গিতে বলে,
— ঝেড়ে কাশ এবার। আমি ঘুমাবো।
শান সঙ্গে সঙ্গে সোজা হয়ে বসে। মুখে অসহায় ভাব এনে আমতা আমতা করে বলে,
— নীল… তুই তো জানিস আমি কত উইক টাইপের মানুষ। সাতদিন বাইরে থাকলে আমি নিশ্চিত অসুস্থ হয়ে যাবো। মানে… আমি বলতে চাচ্ছিলাম, যদি একটু কিছু করতি যাতে আমার যেতে না হয়…
কথাগুলো বলতে বলতেই সে একবার আড়চোখে কিয়ারার দিকে তাকায়। সেই দৃষ্টিতে লুকিয়ে আছে অনুরোধ, অভিমান আর না যেতে চাওয়ার একরাশ অস্থিরতা।
নীল অবশ্য আগেই বুঝেছিল। এই ছেলে বাড়ি থেকে দূরে কোথাও যাবে না— বিশেষ করে কিয়ারাকে রেখে তো নয়ই।
কিছুক্ষণ নীল কোনো কথা বলে না। উদাস চোখে দেয়ালে ঝোলানো ঘড়িটার দিকে তাকিয়ে থাকে। তারপর নিচের ঠোঁট দাঁতে চেপে যেন কিছু হিসাব করে। অবশেষে ধীরস্বরে বলে,
— উমম… ভেবে দেখবো। এখন যা এখান থেকে। কাল রাতেও ঠিকমতো ঘুমাতে পারিনি।
শান সঙ্গে সঙ্গে চোখ বড় বড় করে বলে উঠে,
— এখনই চলে যাবো!
শানের কথা শেষ হতেই নীল ওর দিকে সিরিয়াস চোখে তাকায়। মুহূর্তেই মুখের হাসিটা মিলিয়ে যায়। গলায় কঠিন সুর এনে ধীরে ধীরে বলে,
— কিয়ারা এখনো অনেক ছোট। আর সাধারণ মেয়েদের থেকে একটু বেশি আবেগী। আশা করি কোনো ভুল করবি না।
কথাটার ভেতরে স্পষ্ট সতর্কতা ছিল। ভাই হিসেবে নিজের বোনকে নিয়ে নীলের ভয়, দুশ্চিন্তা আর দায়িত্ববোধ সবটাই সেই ছোট বাক্যে মিশে ছিল।
শান এবার শান্ত হয়। ঠোঁটের কোণের হাসিটা নরম হয়ে আসে। কিছুটা অভিমান মেশানো গলায় বলে,
— কোনোদিন এমন কিছু করবো না আমি। তুই আমাকে বিশ্বাস করিস না?
নীল কয়েক সেকেন্ড ওর দিকে স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে। তারপর ঠোঁট সামান্য বাঁকিয়ে বলে,
— করি বলেই তো এখনো আমার হাতে মার খাসনি।
শান সঙ্গে সঙ্গে হেসে ফেলে। যেন এই উত্তরটাই আশা করছিল। মাথা নাড়িয়ে মজা করে বলে,
— এই জন্যই তো তোর বোনকে ভালোবাসি। তুই এত ভালো ভাই— বোনকে ভালোবাসি জেনেও কিছু বলিস না।
নীল এবার চোখ সরু করে তাকায়। মুখে বিরক্তির ছাপ ফুটে ওঠে।
— তুই যতটা সহজ-সরল দেখতে, ততটা একদমই না। তাহলে এমন ভোলাভালা ভাব ধরে থাকিস কেন? তোর জন্য শালা আমিই শেষে মার খাই।
শান কথা শুনে আবার সেই নিষ্পাপ মুখ বানিয়ে ফেলে। পরক্ষণেই নাটকীয় ভঙ্গিতে গলা খাঁকারি দিয়ে বলে,
— আমি তোর বড় ভাইয়ের শালা হই, তোর না। তবে তুই চাইলে আমাকে সম্বন্ধী বানাতে পারিস… আমার কিন্তু ছোট দুইটা বোন আছে।
শেষের কথাটা বলার সময় সে কলার উঁচু করে এমন ভাব নেয়, যেন বিরাট কোনো অফার দিয়ে ফেলেছে।
নীল ঠোঁট কুটিলভাবে বাঁকায়। চোখে দুষ্টু ঝিলিক ফুটে ওঠে।
— বাট আমার তোকে “শালা” ডাকতেই বেশি ভালো লাগে। তুই চাইলে আমাকে দুলাভাই বানাতে পারিস। দুলাভাই হিসেবে কিন্তু আমি খারাপ না।
শান সঙ্গে সঙ্গে অসন্তুষ্ট মুখ করে মাথা নাড়ায়।
— উঁহু! আমি আরেকটা বোন পাতালেও তুই পাবি না। তুই বয়সে কত ছোট হবি!
কথাটা শুনেই নীলের মুখের ভাব বদলে যায়। যেন কেউ ওর সবচেয়ে স্পর্শকাতর জায়গায় খোঁচা দিয়েছে।
সবাই কেন তাকে ছোট ভাবে?
সেদিন তো সে ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে মাকেও জিজ্ঞেস করেছিল— সে কি এখন বিয়ের উপযুক্ত হয়েছে? আর মা কী বলেছিল?
“তোর এখনো দুধের দাঁত পড়েনি!”
হোয়াট!
দুধের দাঁত পড়ে, এখন দাঁত বসানোর বয়সও পার হয়ে গেছে, অথচ কেউ সেটা বুঝতেই চায় না!
নীল ঝটকা মেরে সোফা থেকে উঠে দাঁড়ায়। চোয়াল শক্ত হয়ে যায়। দাঁতে দাঁত চেপে রাগী গলায় বলে,
— ফাক দিস ওয়ার্ড! কিসের ছোট আমি? তুই আমার বডি দেখছিস? প্রতিদিন তিন ঘণ্টা জিমে যাই আমি! ছোট বলার জন্য?
শান পুরো অবাক হয়ে যায়। ওরা তো এতক্ষণ মজা করছিল! কিন্তু এই ছেলে সত্যি সত্যিই রেগে গেছে। মনে মনে আবারও নিশ্চিত হয়— নীলের মাথায় হালকা সমস্যা আছেই।
পরিস্থিতি হালকা করার জন্য শান ঠোঁটে দুষ্টু হাসি টেনে নীলের বাহুতে হাত রাখে। বাহুটা উল্টেপাল্টে দেখে মজা করে বলে,
— তোর বডি তো দেখিনি… চাইলে দেখাতে পারিস।
নীল সঙ্গে সঙ্গে কপাল কুঁচকে হাত ঝাড়া মেরে দূরে সরে যায়।
— বডি তোর জন্য না, আমার বউয়ের জন্য বানিয়েছি। ম্যাডাম আমার প্রচুর হিংসুটে। তার জিনিসে অন্য কারো নজর সে একদমই সহ্য করতে পারে না। দূরে সর!
শান এবার চোখ বড় বড় করে নাটকীয় ভঙ্গিতে বলে,
— ওহহ! গার্লফ্রেন্ড আছে, সেটাই তো জানতাম না! এদিকে আপনি ডিরেক্ট “বউ-বউ” করছেন? নীল সাহেব… আপনার মতলব তো ভালো ঠেকছে না। হুমম… হুমম…
শানের কথা শুনে নীলের ঠোঁটের কোণে সূক্ষ্ম হাসি ফুটে ওঠে।
উফ! নীলের বউ হবে সেই কুচুটে মহিলা? উঁহু… কখনোই না।
নীলের বউ হবে তার পিওনি। নরম, কোমল, সতেজ একটা মেয়ে… যাকে দেখলেই মনটা শান্ত হয়ে যায়।
আর ওই কুচুটে মহিলাকে কীভাবে সোজা করতে হয়— সেটা নীল খুব ভালো করেই জানে।
শান আরও কিছু বলতে যাবে, ঠিক তখনই নীলের ফোনটা হঠাৎ বেজে উঠে। ঘরের নিস্তব্ধতার মধ্যে শব্দটা কেমন অস্বস্তিকরভাবে কানে লাগে। নীল ভ্রু কুঁচকে পকেট থেকে ফোন বের করে। স্ক্রিনে বাবার নাম ভেসে উঠে। নীল ভ্রু কুঁচকে ফোন রিসিভ করে কানে তুলতেই ওপাশ থেকে সাজিদ খানের গম্ভীর কণ্ঠ ভেসে আসে,
— নীল, তোমার মা’কে নিয়ে শানের বাড়িতে আসো। আমরা সবাই এখানেই আছি।
কথাটা বলেই তিনি আর এক সেকেন্ডও অপেক্ষা করেন না। কল কেটে যায়।
নীল কিছুক্ষণ ফোনটা কানের পাশে ধরে স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। ভ্রুগুলো আরও কুঁচকে আসে। বাবার গলায় সেই পরিচিত কঠোরতা ছিল, কিন্তু তার সঙ্গে চাপা উৎকণ্ঠাও মিশে ছিল। আর সেই একটা জিনিসই নীলের ভেতরে অস্বস্তি বাড়িয়ে দেয়। নীল একবার শান এর দিকে তাকিয়ে কোনো প্রশ্ন না করেই সে দ্রুত রুবিনার উদ্দেশ্যে ডেকে উঠে,
— মা!! মা!! বাবা শানদের বাড়িতে যেতে বলেছে।
নীল এর ডাকে রুবিনা হন্তদন্ত হয়ে এসে বিস্মিত হয়ে তাকায়।
— এই রাতে? ওখানে কেন যাবো আমরা? আর শানের জন্য এত কিছু রান্না করলাম, ছেলেটা না খেয়েই চলে যাবে?
নীল বিরক্ত অথচ অস্থির গলায় বলে উঠে,
— উফফ মা! বাবা যখন নিজে ফোন করেছে, তখন নিশ্চয়ই জরুরি কিছু হয়েছে। প্লিজ, তুমি চলো।
শেষের কথাগুলোতে স্পষ্ট উৎকণ্ঠা ছিল। সাজিদ খান খুব কম ক্ষেত্রেই এভাবে কথা বলে। তার মানে কিছু একটা হয়েছে— বড় কিছু।
আর ওখানে রাহা আছে।
এই একটা চিন্তাই নীলের বুকের ভেতর অদ্ভুত টান তৈরি করে। কী হয়েছে না হয়েছে, কিছুই না জেনে বসে থাকতে পারবে না সে। সামান্য কিছু মিস করা যাবে না।
শান নিজেও পুরো হতবাক। এত রাতে হঠাৎ সবাইকে ডাকার মানে কী? কিন্তু পরিস্থিতি দেখে সেও আর কিছু বলে না।
রুবিনাকে প্রায় তাড়াহুড়ো করেই নিয়ে বেরিয়ে পড়ে নীল। কিয়ারা জেদ ধরে বসে সেও যাবে। শেষ পর্যন্ত তাকেও সঙ্গে নিতে হয়।
বাড়ি থেকে সবাই যখন বের হচ্ছে, ঠিক তখনই গেটের সামনে এসে থামে শিরিন। কিছুক্ষণ আগেই সে নিজের পার্লার থেকে ফিরেছে। কয়েক মাস আগে অনেক স্বপ্ন নিয়ে নিজের পার্লার খুলেছে সে, আর এখন সেটা নিয়েই ব্যস্ত থাকে দিনের বেশিরভাগ সময়।
গাড়ির সামনে সবাইকে দল বেঁধে বের হতে দেখে শিরিন সন্দেহভরা চোখে তাকায়।
— কী হয়েছে? সবাই কোথায় যাচ্ছো?
কেউ ঠিকঠাক উত্তর দেওয়ার আগেই সে নিজেই গাড়ির দরজা খুলে উঠে বসে। মুখে স্বাভাবিক ভাব ধরে রাখলেও চোখেমুখে কৌতূহল স্পষ্ট।
কারণ ওই বাড়ির কাউকেই শিরিন সহ্য করতে পারে না।
আর যদি সত্যিই কোনো কাহিনী ঘটে থাকে… তাহলে সেটা মিস করার প্রশ্নই আসে না। পরে অন্যের মুখ থেকে শুনে আফসোস করার চেয়ে সামনে বসে নাটক দেখা অনেক ভালো!
____________________________
রাহা সেই কখন থেকে অস্থির হয়ে পুরো রুম জুড়ে পায়চারি করে যাচ্ছে। তার কপাল ভাঁজ হয়ে আছে, চোখেমুখে স্পষ্ট দুশ্চিন্তার ছাপ। অন্যদিকে সামিন সম্পূর্ণ উল্টো— ড্রয়িংরুমের কাউচে আরাম করে বসে ল্যাপটপে দ্রুত আঙুল চালিয়ে যাচ্ছে। স্ক্রিনে একের পর এক কোড ভেসে উঠছে, আর রাহা প্রতি কয়েক সেকেন্ড পর পর ঝুঁকে দেখে নিচ্ছে কাজ কতদূর এগোল।
কিন্তু অপেক্ষা যেন আজ তাকে আরও বেশি অধৈর্য করে তুলেছে।
হঠাৎই বিরক্ত কণ্ঠে বলে উঠল,
— একজন প্রফেশনাল হ্যাকার হয়ে সামান্য একটা ফুটেজ ডিলিট করতে এতো সময় লাগে তোমার?
সামিন টাইপ করতে থাকা হাত থামিয়ে ধীর চোখে রাহার দিকে তাকাল। তারপর ঠোঁট বাঁকিয়ে শান্ত স্বরে বলল,
— মাত্র ছয় মিনিট হয়েছে আমি কাজটা শুরু করেছি। কাম অন, এতো অস্থির হচ্ছিস কেন?
রাহা এবার থেমে গেল। চোখেমুখ শক্ত হয়ে উঠল তার। গলায় চাপা রাগ আর উদ্বেগ মিশিয়ে ধীরে ধীরে বলল,
— ওই ফুটেজ যদি একটা মানুষও দেখে… আই সোয়্যার, সামিন, আমি তোমাকে খুন করে ফেলবো। এই মুহূর্তে আমি কোনো ঝামেলায় জড়াতে চাই না। গট ইট?
রাহার কণ্ঠের তীব্রতা বুঝিয়ে দিচ্ছিল, কথাগুলো সে মজা করে বলেনি।
সামিন আর কিছু না বলে আবার দ্রুত টাইপ করতে শুরু করল। কয়েক মুহূর্ত পর স্ক্রিনের দিকে তাকিয়েই বলল,
— হুমম…হয়ে গেছে।
রাহা সঙ্গে সঙ্গে এগিয়ে এলো।
— সবগুলো?
সামিন এবার বিরক্ত হয়ে মাথা তুলে তাকাল।
— আর ইউ ম্যাড? একটা করেছি। বাকি গুলোর পাসওয়ার্ড আলাদা। টাইম লাগবে। অনেক বেশি সিকিউরিটি।
তারপর কিছুক্ষণ চুপ থেকে কৌতূহলী দৃষ্টিতে রাহার দিকে তাকিয়ে বলল,
— বাই দ্যা ওয়ে… তুই এতো অস্থির হয়ে আছিস কেন? আর ওটা কে… যাকে তুই এতো মরিয়া হয়ে সেফ করতে চাচ্ছিস?
প্রশ্নটা শুনে রাহার চোখ সরু হয়ে এলো। সে ধীরে ধীরে সামিনের দিকে তাকাল, তারপর রাশভারী কণ্ঠে বলল,
— আই থিংক তুমি ভুলে গেছো… তোমার সাথে রিলেশনে যাওয়ার একটা শর্ত ছিল। তুমি আমার কাজ করে দিবে— উইদাউট কোয়েশ্চন।
সামিন হালকা হেসে মাথা নাড়ল। তবে সেই হাসিতে বিরক্তি ছিল স্পষ্ট।
— তুই একটা সেলফিশ মেয়ে। সিরিয়াসলি, তোর সাথে রিলেশন করে আমার কোনো লাভ হয়েছে বলে মনে হয় না।
রাহা ভ্রু উঁচিয়ে তাকাল। ঠোঁটের কোণে ক্ষীণ হাসি টেনে ধীর স্বরে বলল,
— তুমি আমার আশেপাশে থাকার সুযোগ পেয়েছো… এটাই অনেক বড় ব্যাপার।
সামিন কিছু বলতে গিয়েও থেমে গেল। ঠিক তখনই দরজায় টোকা পড়ল।
— আপু… চাচ্চু ডাকছে।
তৃধার কণ্ঠ ভেসে এলো বাইরে থেকে।
রাহা বিরক্ত মুখে দরজার দিকে তাকিয়ে বলল,
— একটু পর আসছি। যাও।
কিন্তু তৃধা এবার আরও তাড়াহুড়ো করে বলল,
— আপু, চাচ্চু বলেছে আর্জেন্ট।
রাহা কয়েক সেকেন্ড নিশ্চুপ দাঁড়িয়ে রইল। তারপর ধীরে ধীরে ঘুরে সামিনের দিকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকাল। সেই চোখে স্পষ্ট হুমকি।
— কাজ শেষ করে উঠবে।
কথাটা বলেই সে দরজার দিকে এগিয়ে গেল। আর সামিন দীর্ঘশ্বাস ফেলে আবার ল্যাপটপের স্ক্রিনে চোখ নামাল। তবে এবার তার চোখে কৌতূহলের পাশাপাশি অদ্ভুত এক চিন্তাও স্পষ্ট— রাহা আসলে কাকে বাঁচানোর চেষ্টা করছে?
________________________________
রাহা দ্রুত পায়ে সিঁড়ি বেয়ে নিচে নামতে নামতে বুঝতে পারছিল, বাড়ির পরিবেশটা অস্বাভাবিক রকমের ভারী। নিচে নামতেই তার চোখ আটকে গেল লিভিং রুমের মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকা আদির উপর।
আদি শক্ত করে ইরানীর হাত ধরে আছে। এতোটাই শক্ত করে যে মনে হচ্ছে কেউ চাইলে জোর করেও তাকে আলাদা করতে পারবে না। মুখটা অদ্ভুত রকম গম্ভীর, বুক টান টান করে দাঁড়িয়ে আছে সে— যেন বড় কোনো যুদ্ধের সামনে দাঁড়িয়ে আছে।
আর ঠিক তাদের সামনেই দাঁড়িয়ে সাজিদ খান। দুই হাত পকেটে ঢোকানো, মুখভর্তি নীরবতা। তার সেই শান্ত চোখ দুটো আজ ভয়ংকর ঠান্ডা লাগছে। পাশে আরমানের মুখও থমথমে। পুরো রুমে এমন একটা নিস্তব্ধতা ছড়িয়ে আছে, কেউ নিঃশ্বাস নিতেও সাহস পাচ্ছে না।
নওরিন, শান, নীল, রুবিনা— সবাই উপস্থিত। কিন্তু কারও মুখে একটা শব্দও নেই।
রাহা নিচে নেমে বাবার দিকে তাকিয়ে কিছু বলবে, ঠিক তখনই রুবিনা খানের কণ্ঠ ভেসে এলো,
— কি হয়েছে? এতো জরুরি তলব কেন?
তার কণ্ঠে বিরক্তির চেয়ে উদ্বেগটাই বেশি ছিল। কারণ তিনি স্পষ্ট বুঝতে পারছিলেন, এখানে কিছু একটা হয়েছে… এবং সেটা ভালো কিছু নয়।
নীল, শান আর রুবিনা সবাই চারপাশের অস্বাভাবিক নীরবতা দেখে চুপ করে থাকে। কিন্তু কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই সবার দৃষ্টি গিয়ে স্থির হয় আদির উপর।
আদি এখনো ইরার হাত শক্ত করে ধরে আছে।
মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে থাকা ইরাকে দেখে মনে হচ্ছে মেয়েটা যেন মাটির সাথে মিশে যেতে চাইছে। তার কাঁধ কাঁপছে হালকা করে। চোখ তুলে কারও দিকে তাকানোর সাহস পর্যন্ত নেই।
রাহা একবার পুরো পরিস্থিতিটা চোখ বুলিয়ে নেয়। তারপর বুকে হাত ভাঁজ করে দাঁড়িয়ে থাকা নীলের দিকে ভ্রু উঁচিয়ে তাকায়। নীলও আজ অদ্ভুতভাবে চোখ সরায় না। বরং ধীরে ধীরে এগিয়ে এসে রাহার ঠিক পাশে দাঁড়ায়। রুবিনা খান ধীরে ধীরে ইরার দিকে এগিয়ে গেলেন। মুখে স্পষ্ট হতবিহ্বলতা।
— তুমি… ইরানী সিদ্দিকী না? রাহার বেস্ট ফ্রেন্ড? আমি তোমাকে পার্টিতে দেখেছিলাম…
ইরা মাথা আরও নিচু করে ফেলল।
রুবিনা এবার চারপাশে তাকালেন। কিন্তু কাউকে স্বাভাবিক লাগছে না। কেউ কিছু বলছে না। সাজিদ খান চুপ। আরমান চুপ। এমনকি রাহাও নিরব।
এই নীরবতাই যেন রুবিনার ভেতরের অস্থিরতাকে আরও বাড়িয়ে দিচ্ছিল।
উনার বুকের ভেতর ধুকপুক শব্দ বাড়তে লাগল।
কারণ উনি ধীরে ধীরে একটা ভয়ংকর সম্ভাবনা বুঝতে পারছেন।
কিন্তু সেটাকে বিশ্বাস করতে চাইছেন না।
না… এটা হতে পারে না।
আদি তো…
আদি তো রাহাকে ভালোবাসে।
তাহলে এখন সে কেন অন্য একটা মেয়ের হাত এমনভাবে ধরে দাঁড়িয়ে আছে? কেন মনে হচ্ছে, পুরো পৃথিবীর বিরুদ্ধে গিয়েও সে এই মেয়েটাকে ছাড়বে না?
রুবিনার ঠোঁট শুকিয়ে এলো। কণ্ঠ কেঁপে উঠল।
— কেউ… কেউ আমাকে কিছু বলবে?
তার প্রশ্নের পরও কয়েক মুহূর্ত কেউ উত্তর দিল না। শুধু আদির হাতটা আরও শক্ত হয়ে জড়িয়ে ধরল ইরার হাত।
হঠাৎ আদি মাথা তুলে দৃঢ় কন্ঠে বলল,
— আমি ইরাকে ভালোবাসি।
কিন্তু সেই কণ্ঠের দৃঢ়তা পুরো রুমকে আরও স্তব্ধ করে দিল।
রাহা ধীরে ধীরে চোখ বন্ধ করল। কারণ সে বুঝে গেছে— ঝড়টা এখন শুরু হতে যাচ্ছে।
চলবে...