ফন্ট সাইজ:
থিম:
প্রনয়ের প্রলয়

২৪তম পর্ব

লেখক: মেহরিমা সারা

#প্রনয়ের_প্রলয় 

#কলমে_মেহরিমা_সারা 
#পর্বঃ২৪ 
কালো আঁধারে নিমজ্জিত বেলকনিতে নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে আছে রাহা। দূরের ফাঁকা রাস্তায় দাঁড়িয়ে থাকা অবয়বটার দিকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে সে। কতক্ষণ ধরে এভাবে দাঁড়িয়ে আছে তা তার নিজেরও জানা নেই—হয়তো এক ঘণ্টা, হয়তো তারও বেশি। সময় যেন আজ থমকে গেছে। বুকের ভেতর অদ্ভুত এক শঙ্কা কাজ করছে আজ সব কিছু এতো দ্রুত হলো যে রাহা সেগুলো ভাবার সময়ই পায়নি। রাহা পুনরায় অবয়বের দিকে তাকিয়ে ভাবে, সে যদি ভেতরে চলে যায়, তাহলে কি ওই অবয়বটাও মিলিয়ে যাবে অন্ধকারের সাথে? হয়তো যাবে… হয়তো যাবে না। আজ রাহার নিজেকে এলোমেলো লাগছে। 
চারপাশে প্রকৃতি ধীরে ধীরে উত্তাল হয়ে উঠছে। আকাশের বুক চিরে মাঝে মাঝে বিদ্যুতের ঝলকানি দেখা দিচ্ছে। বাতাসে কাঁচা মাটির গন্ধ ভেসে বেড়াচ্ছে, যেন প্রকৃতি নিজেই জানিয়ে দিচ্ছে—ঝড় আসছে। যেকোনো মুহূর্তে নেমে আসতে পারে প্রবল বৃষ্টি।
রাহা স্থির চোখে আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকে। সে যেন অপেক্ষা করছিল এই বৃষ্টিটার জন্যই।
অবশেষে প্রতীক্ষার অবসান ঘটে। টুপটাপ শব্দ তুলে বৃষ্টি নেমে আসে ধরনীর বুকে। মুহূর্তেই চারপাশ ঝাপসা হয়ে যায়। রাহা দ্রুত কয়েক কদম পিছিয়ে যায়, যেন অসময়ের এই বৃষ্টি তাকে স্পর্শ করতে না পারে। তার ভেতরে জমে থাকা অস্থিরতাগুলো হয়তো এই বৃষ্টির মতোই, আচমকা নেমে এসে সব ভাসিয়ে দিতে চায়।
কিছুক্ষণ পর দেয়ালে ঝোলানো ঘড়ির কাঁটা আরেকটি ঘণ্টা পেরোনোর সংকেত দিতেই রাহা ধীরে বেলকনির দরজা বন্ধ করে। নিস্তব্ধ পায়ে ঘর থেকে বেরিয়ে ডানপাশের কক্ষের সামনে এসে দাঁড়ায়। কিছুক্ষণ দরজার দিকে তাকিয়ে থাকে সে। তারপর ধীরে হাত তুলে নক করে।
প্রথমবার কোনো সাড়া মেলে না।
দ্বিতীয়বার নক করতেই দরজাটা আস্তে খুলে যায়।
এলোমেলো চুল, ফ্যাকাশে মুখ আর বিধ্বস্ত দৃষ্টির এক মেয়ে দাঁড়িয়ে আছে ওপাশে। 
রাহা কয়েক মুহূর্ত নিশ্চুপ চোখে তাকিয়ে থাকে বোনটার দিকে। তারপর ধীরে তাকে পাশ কাটিয়ে ঘরে ঢুকে দরজা বন্ধ করে দেয়। ঘরের ভেতর ভারী নীরবতা। বাতাসেও যেন চাপা কান্নার গন্ধ।
রাহা শান্ত স্বরে বলে ওঠে, 
— ভুল করছিস… নিজেকে এভাবে কষ্ট দিয়ে। শুরু থেকেই তো জানতি এটা অসম্ভব। তাহলে অনুভূতিটাকে এতদূর বাড়তে দিলি কেন?
নিশা থমকে যায়। বিস্ময়ে বড় হয়ে ওঠে তার চোখ। আপু… আপু কি সব বুঝে ফেলেছে? যদি না বুঝত, তাহলে এমন কথা বলছে কীভাবে?
সে তাড়াতাড়ি দৃষ্টি সরিয়ে নিয়ে কাঁপা গলায় বলে, — তেমন কিছু না আপু…
রাহা নিঃশ্বাস ফেলে ধীরে বলে, 
— কেমন “কিছু” সেটা আমি জানি, নিশা। তাই বলছি… ভুলে যা।
এতক্ষণ পর্যন্ত নিশা নিজেকে সামলে রেখেছিল। সে কাঁদেনি। শুধু অস্থিরের মতো ঘরময় পায়চারি করেছে, নিজের চুল টেনে আবেগ চেপে রাখার চেষ্টা করেছে। শেষ পর্যন্ত নিজেকে শান্ত করার জন্য স্লিপিং পিল পর্যন্ত খেয়েছে। তবুও ভেতরের ঝড় থামেনি।
রাহা নরম স্বরে ডাকে, 
— নিশু…
শব্দটা কানে আসতেই নিশার বুকটা হুহু করে ওঠে। কত বছর পর আপু তাকে এভাবে “নিশু” বলে ডাকলো!
মুহূর্তেই টলমল করে ওঠে তার চোখ। ঠোঁট কামড়ে ধরে হঠাৎই রাহাকে জড়িয়ে ধরে সে। বুকের ভেতর জমে থাকা সব কষ্ট যেন একসাথে বেরিয়ে আসছে 
রাহা প্রথমে কিছুটা অপ্রস্তুত হয়ে যায়। ছোটবেলা ছাড়া এভাবে কোনোদিন ভাই বোনদের এভাবে আগলে ধরা হয়নি তার। তবুও ইতস্তত ভেঙে ধীরে এক হাত নিশার মাথায় রাখে সে।
নিশা কাঁপা কণ্ঠে বলতে থাকে, 
— আপু বিশ্বাস করো… আমি নিজে থেকে কিছু করিনি। আমি চাইনি এমন হোক। কখন, কীভাবে যে হয়ে গেল আমি সত্যিই বুঝতে পারিনি। আমি ইচ্ছে করে তোমার সাথে এমন করিনি আপু… বিশ্বাস করো…
রাহা চোখ বন্ধ করে নিশার মাথায় হাত বুলিয়ে দেয়। বড় হওয়ার দরুন মা সব সময় বলতো ভাই বোনদের দায়িত্ব তার, সে যেন সবাইকে আগলে রাখে, আজ রাহার মনে হচ্ছে সে পারেনি ওদের আগলে রাখতে। রাহা ক্লান্ত কোমল স্বরে বলে, 
— আই নো… কিছু অনুভূতি না চাইতেও হয়ে যায়।
নিশা হঠাৎ মাথা তুলে ভেজা চোখে তাকায়, 
— তুমি… তুমি আমাকে খারাপ ভাবছো না তো আপু? তোমার কি মনে হচ্ছে আমি নিজের বড় বোনের ফিয়ন্সির দিকে…
কথা শেষ করতে দেয় না রাহা। আস্তে করে নিশার ঠোঁটে আঙুল ছুঁইয়ে থামিয়ে দেয়।
— হুঁশ… আমি জানি তুই কেমন বলতে হবে না।
রাহা ধীরে নিঃশ্বাস নেয়।সে যেদিন দেশে ফিরেছিল, সেদিনই হসপিটালে নিশার চোখের ভাষা বুঝে গিয়েছিল। প্রথম বারেই টের পেয়েছিল—তার ছোট বোনটা ভীষণভাবে আটকে গেছে এমন এক অনুভূতিতে, যেখান থেকে বের হওয়া সহজ নয়। এরপর সময়ের সাথে সাথে সেই সন্দেহ নিশ্চিত হয়েছে।
কিন্তু রাহার নিজেরও কিছু করার ছিল না।
কারণ আদি ইরাকে ভালোবাসে।এক পার্সেন্ট চান্স ও যদি থাকতো তাহলে রাহা নিশাকে কষ্ট পেতে দিতো না। কিন্তু যেখানে আদি স্বয়ং অন্য কাউকে চায় সেখানে রাহার কিছুই করার নেই। আদি আর ইরা একে অপরকে আট বছর যাবত দূরে থেকে ভালোবেসেছে, ওদের অনুভূতি যে ঠুংকো না।
আর এটাই নিশার জন্য সবচেয়ে নির্মম।
সেদিন পার্টি থেকে নিশা যে ইচ্ছে করেই পালিয়েছিলো সেটাও রাহা বুঝেছিলো, মেয়েটা নিজেকে আটকানোর অনেক চেষ্টায় করেছে। কোনো বন্ধুর জন্মদিন ছিল না। সবটাই ছিল একটা অজুহাত। মেয়েটা শুধু পালাতে চেয়েছিল নিজের অনুভূতি থেকে…
রাহা আজ স্বভাব বিরোধী কথা অনেক কিছুই করে,কোমল কন্ঠে ধীরে ধীরে বলে, 
— যেটা থেকে পালাতে চাইবি, সেটাই তোকে আরও শক্ত করে আঁকড়ে ধরবে। তাই পালিয়ে নয়… মুখোমুখি হয়ে শেষ করতে হবে সবকিছু। নিজের অনুভূতির সামনে দাঁড়া। নিজেকে বোঝা শিখ। তারপর সিদ্ধান্ত নে।
কিছুক্ষণ থেমে সে মৃদু স্বরে যোগ করে, — আমি এক সপ্তাহ পর এসে তোর সিদ্ধান্ত শুনবো।
কথাটা বলেই রাহা ধীরে নিশার হাত ছেড়ে দেয়।
বাইরে তখনও বৃষ্টি পড়ছে। 
রাহা নিজের কথাগুলো শেষ করেই ঘর থেকে বেরিয়ে যায়। মুহূর্তেই পুরো ঘরটা আরও বেশি নিস্তব্ধ হয়ে ওঠে। সেই নীরবতার মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকে নিশা—নিষিদ্ধ এক অনুভূতির ভারে সম্পূর্ণ ভেঙে পড়া একজন মানুষ।
কয়েক সেকেন্ড স্থির দাঁড়িয়ে থাকার পর ধীরে দরজার সাথে পিঠ ঠেকিয়ে নিচে বসে পড়ে। মনে হচ্ছে শরীরের সমস্ত শক্তি যেন মুহূর্তেই শেষ হয়ে গেছে। বুকের ভেতরটা অদ্ভুতভাবে ধকধক করছে। নিঃশ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে।
কাঁপা হাতে ফোনটা বের করে গ্যালারি ওপেন করে নিশা।
অসংখ্য ছবির ভিড়ে থেমে যায় একটা পুরোনো ছবিতে।
প্রায় পাঁচ বছর আগের ছবি।
সাদা পাঞ্জাবি পরা এক তরুণ দাঁড়িয়ে আছে হালকা হাসি নিয়ে। চোখেমুখে অদ্ভুত এক প্রশান্তি। ছবিটার দিকে তাকাতেই নিশার বুকের ভেতর মোচড় দিয়ে ওঠে।
আদি।
নিশা ধীরে আঙুল বাড়িয়ে ফোনের স্ক্রিনে ছুঁয়ে দেয় আদির মুখ। কাঁচের ওপাশে থাকা মানুষটাকে শেষবারের মতো অনুভব করতে চাইছে।
হঠাৎ টুপ করে কয়েক ফোঁটা জল পড়ে স্ক্রিনের ওপর।
সে বুঝতেই পারেনি কখন চোখ বেয়ে পানি গড়িয়ে পড়েছে।
দম আটকে আসা কণ্ঠে ফিসফিস করে বলে ওঠে, — আপনি ভালো তো বাসলেন… তবে ভালোবাসার মানুষ আমি কেন হলাম না?
কথাটা বলতেই বুকের ভেতরটা আরও মোচড় দিয়ে ওঠে। নিশা দ্রুত ঠোঁট কামড়ে কান্না থামানোর চেষ্টা করে। কিন্তু গলায় আটকে থাকা ব্যথাগুলো তা মানতে চায় না।
ভাঙা কণ্ঠে আবারও বলে,
— আমি তো আপনাকে ভালোবাসতে চাইনি তবুও কীভাবে ভালোবাসলাম? আমি তো ভাগ্যকে মেনে নিয়েছিলাম তবুও আপনার মুখে অন্য কারো জন্য ভালোবাসা শব্দটা শুনে আমার এতো কষ্ট হচ্ছে কেন??
নিশা চোখ বন্ধ করে মাথা নিচু করে ফেলে।
তার কণ্ঠে তখন অসহায়তা ছাড়া আর কিছু নেই।
— রাহা আপুর সাথে বিয়েটা পরিবারের সিদ্ধান্ত ছিল। আমি নিজেকে বুঝিয়েছিলাম… জোর করে মেনে নিয়েছিলাম। কারণ সেখানে ভালোবাসা ছিল না। কিন্তু এখন… এখন তো আপনি কাউকে সত্যি সত্যি ভালোবেসে বিয়ে করবেন। আমি সেটা কীভাবে দেখবো? কীভাবে সহ্য করবো বলুন?
ফোনের স্ক্রিনে একের পর এক আদির ছবিগুলো খুলতে থাকে সে। প্রতিটা ছবিতে জুম করে আদির মুখ ছুঁয়ে দেয়। যেন স্পর্শের মাধ্যমে বুকের ভেতরের শূন্যতা একটু কমাতে চাইছে।
কাঁপা ঠোঁটে বিড়বিড় করে বলে, 
— আদি ভাই… আমি তো এটা ভেবেই ভালো ছিলাম যে আপনার মনে আমি নেই, তেমনিভাবে অন্য কেউও নেই। কিন্তু আপনি তো আমাকে ভুল প্রমাণ করে দিলেন। আপনি কাউকে এতটা ভালোবাসেন… আর সেই জায়গায় আমি কোনোদিনই ছিলাম না।
নিশার চোখ ঝাপসা হয়ে আসে।
— এই দহন আমি কীভাবে সহ্য করবো? বলেন… কীভাবে?
একসময় আর নিজেকে সামলাতে পারে না সে।
চাপা কান্নাগুলো হঠাৎ করেই উচ্চস্বরে বেরিয়ে আসে। গলা ভেঙে হাহাকার করে কেঁদে ওঠে নিশা। যেন বহু বছর ধরে জমে থাকা সমস্ত অনুভূতি আজ একসাথে ভেঙে পড়েছে।
রাহার সাথে আদির পারিবারিক বিয়ের সিদ্ধান্তটা সে কোনোভাবে মেনে নিয়েছিল। নিজেকে বুঝিয়েছিল—এটাই বাস্তব। কিন্তু আজ যখন জানলো আদি অন্য কাউকে ভালোবাসে, তখন সেই বাস্তবতাই তার জন্য অসহনীয় হয়ে উঠেছে।
কারণ এখন সে বুঝতে পারছে, এটা নিছক কোনো কিশোরীসুলভ আবেগ ছিল না।
এটা ছিল তার প্রথম ভালোবাসা।
গভীর… তীব্র… নিঃশব্দ একটা ভালোবাসা।
এতদিন সে নিজের অনুভূতিকে বয়ঃসন্ধির সাময়িক মোহ ভেবে এড়িয়ে গেছে। ভেবেছে সময়ের সাথে সব ঠিক হয়ে যাবে। কিন্তু আজ আদির মুখে বলা সেই একটা বাক্য— “আমি ইরাকে ভালোবাসি।”
কথাটা যেন তার সমস্ত অস্তিত্ব থামিয়ে দিয়েছিল।
সেদিন কয়েক মুহূর্তের জন্য নিশার নিঃশ্বাস পর্যন্ত বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। আর এখন প্রতিটা মুহূর্তে সে বুঝতে পারছে, ওই অনুভূতিটা কতটা গভীর ছিল।
নিশা হাঁসফাঁস করে উঠে।
মনে হচ্ছে বুকের ভেতরটা কেউ ছিঁড়ে ফেলছে ধীরে ধীরে।
সারাজীবন গা-ছাড়া ভাব নিয়ে চলা, উদাসীন সেই মেয়েটা যে কারো মায়ায় এত ভয়ংকরভাবে জড়িয়ে গেছে—এটা কি কেউ কোনোদিন জানবে?
কেউ কি বুঝবে, একটা মানুষকে নিঃশব্দে ভালোবেসে যাওয়া কতটা কষ্টের?
আদি কি কোনোদিন জানবে, তার অজান্তে কেউ একজন তার জন্য আকাশ-পাতাল এক করে কেঁদেছে?
ইরাকে নিয়ে নিজের পৃথিবীতে ডুবে থাকা আদি কি কোনোদিন অনুভব করতে পারবে নিশার ভালোবাসার তীব্রতা?
নাকি এই অনুভূতিগুলো চিরকাল নিশার বুকের ভেতরই বন্দী থেকে যাবে—অপ্রকাশিত, অসমাপ্ত আর নিষিদ্ধ এক ভালোবাসা হয়ে?
তেইশ বছরের একটা ছেলে সিঁড়ি থেকে পড়ে গেছে! ঘটনাটা এতটাই অদ্ভুত যে বিশ্বাস করতে কষ্ট হয়। কিন্তু আজ ঠিক সেই আজব ঘটনাটাই ঘটেছে চৌধুরী বাড়ির সবার আদরের দুলাল শানের সাথে।
সকালের ব্যস্ততা তখন পুরো বাড়িজুড়ে। রাহা আর শান দু’জনই রেডি হয়ে সিঁড়ি বেয়ে নিচে নামছিল। রাহার চোখ তখন ফোনের স্ক্রিনে আটকে, কোনো এক মেসেজে এতটাই ডুবে ছিল যে আশপাশে কী হচ্ছে সেদিকে খেয়াল ছিল না। তখনই সবকিছু এক মুহূর্তে ঘটে গেল।
পা পিছলে হঠাৎ করেই সিঁড়িতে ধপাস করে পড়ে যায় শান। শব্দটা এত আকস্মিক ছিল যে রাহা চমকে মাথা তুলে তাকাতেই দেখে ছেলেটা সিঁড়ির মাঝখানে বসে পা চেপে ধরে মুখ বিকৃত করে চেঁচিয়ে যাচ্ছে।
রাহা দ্রুত ফোনটা সরিয়ে রেখে এগিয়ে গেল। হাঁটু গেড়ে বসে শানের পায়ের দিকে তাকাতেই শান কাতর গলায় বলে উঠল,
— আপুনি… আমার পা মনে হয় ভেঙে গেছে। এখন আমি কীভাবে যাবো?
কথাটা শুনে রাহার ভ্রু ধীরে ধীরে কুঁচকে গেল। চোখ সরু করে কয়েক সেকেন্ড চুপচাপ তাকিয়ে রইল শানের দিকে। তার সেই শান্ত অথচ সন্দিহান দৃষ্টি দেখে বোঝাই যাচ্ছিল, পুরো নাটকটাতে সে একটুও বিশ্বাস করছে না।
তারপর ঠান্ডা গলায় বলল,
— তোমরা এখনো ছোটই রয়ে গেছো। এটা ওই লাফাঙ্গাকে মনে করিয়ে দিবে।
শানের বুঝতে একটুও দেরি হলো না রাহা কাকে উদ্দেশ্য করে বলছে। তবুও সে মুখে আরও বেশি ব্যথার ছাপ এনে হঠাৎ জোরে চিৎকার করে উঠল,
— মামুনি! মামুনি! চাচিমনি!!
ওদিকে নওরিন তখন কিচেনে দাঁড়িয়ে নিজ হাতে সকালের নাস্তা তৈরি করছিলেন। বাড়ির বাচ্চাগুলো না খেয়ে বের হবে—এই ব্যাপারটা তিনি কোনোভাবেই মেনে নিতে পারেন না। তাই সকাল থেকেই ব্যস্ত হয়ে পড়েছিলেন রান্নাঘরে।
হঠাৎ শানের আতঙ্কিত চিৎকার শুনে তার হাত থেমে যায়। বুকের ভেতর ধক করে ওঠে। আর এক মুহূর্ত দেরি না করে তিনি তড়িঘড়ি করে কিচেন থেকে বেরিয়ে আসেন।
সিঁড়ির কাছে এসে দেখেন শান এক পা গুটিয়ে বসে আছে, মুখে কষ্টের ছাপ স্পষ্ট। আর পাশে শান্ত ভঙ্গিতে রাহা দাঁড়িয়ে আছে।
দ্রুত শানের কাছে গিয়ে নওরিন উদ্বিগ্ন গলায় জিজ্ঞেস করলেন,
— কী হয়েছে?
রাহা শান্ত স্বরে উত্তর দিল,
— পড়ে গেছে। আমি ডক্টরকে ফোন করে দিচ্ছি, এসে দেখে যাবে।
তার কণ্ঠে বাড়তি কোনো আতঙ্ক ছিল না, কিন্তু চোখের গভীরে হালকা বিরক্তি।
কথা শেষ করেই রাহা ধীর পায়ে বাইরে চলে যায়। বাইরে একপাশে দাঁড়িয়ে আরমান চৌধুরী গম্ভীর মুখে আদির পি.এ রুদ্রকে একের পর এক নির্দেশনা দিয়ে যাচ্ছেন—কোথায় যেতে হবে, কার সাথে যোগাযোগ করতে হবে, কোন পরিস্থিতিতে কী সিদ্ধান্ত নিতে হবে, সবকিছু খুব সতর্কভাবে বুঝিয়ে দিচ্ছেন।
রাহা আর আদি এর আগে কখনো চট্টগ্রামের ওই প্রজেক্টে যায়নি। কিন্তু রুদ্র আগেরবার আরমান চৌধুরীর সাথেই সেখানে ছিল, তাই জায়গাটা সম্পর্কে তার বেশ ভালো ধারণা আছে। সে মনোযোগ দিয়ে সব শুনছে, মাঝেমধ্যে মাথা নেড়ে বুঝিয়ে দিচ্ছে যে কথাগুলো সে মনে রাখছে।
তবুও আরমান চৌধুরীর মুখের উদ্বেগ একটুও কমছে না। বরং সময়ের সাথে সাথে সেটা আরও স্পষ্ট হয়ে উঠছে।
চট্টগ্রামের নামটা শুনলেই কেন যেন তার বুকের ভেতর অজানা আতঙ্ক জমে ওঠে। যেন শহরটার সাথে কোনো অদৃশ্য অশুভ স্মৃতি জড়িয়ে আছে। তিনি বারবার নিজেকে বোঝানোর চেষ্টা করেছেন এটা শুধুই মনের ভয়, কিন্তু তারপরও প্রশ্নটা মাথা থেকে সরাতে পারেন না—সব বিপদই কেন বারবার চট্টগ্রামেই ঘটে?
সাজিদ খান অবশ্য এসবকে নিছক অযথা দুশ্চিন্তা বলেই উড়িয়ে দেন। বহুবার তিনি রাহাকে বুঝিয়েছেন, নিজে যাওয়ার কোনো দরকার নেই। লোক পাঠালেই সব সামলে নেওয়া যাবে। কিন্তু রাহা নিজের সিদ্ধান্তে অটল। চট্টগ্রামের প্রজেক্টটা সে নিজে হ্যান্ডেল করবে বলেই জেদ ধরে বসে আছে। আর শেষ পর্যন্ত রাহার একরোখা সিদ্ধান্তের কাছে হার মেনে আদিও তার সাথে যেতে রাজি হতে হয়েছে।
ঠিক তখনই আরমান চৌধুরীর দৃষ্টি পড়ে সামনের দিকে। রাহা ফোনে কারও সাথে কথা বলতে বলতে তাদের দিকে এগিয়ে আসছে। মুখটা শান্ত, কিন্তু চোখেমুখে চাপা ক্লান্তি আর চিন্তার ছাপ স্পষ্ট।
আরমান চৌধুরী ইশারায় জিজ্ঞেস করলেন,
— কে?
রাহা ফোনটা কেটে ছোট করে উত্তর দিল,
— এস পি মাহিনের ডক্টর।
কথাটা শুনেই আরমান চৌধুরীর মুখ আরও গম্ভীর হয়ে ওঠে। কয়েক সেকেন্ড চুপ থেকে ধীর গলায় জিজ্ঞেস করলেন,
— এখন কেমন আছে?
রাহা এক মুহূর্ত চুপ রইল। যেন কীভাবে কথাটা বলবে ভাবছিল। তারপর নিচু স্বরে বলল,
— বললো, কয়েক মাস বেড রেস্টে থাকলে হয়তো হাত নাড়াতে পারবে… কিন্তু কোনোদিন ওই হাত দিয়ে ভারি কাজ করতে পারবে না।
আরমান চৌধুরীর চোখেমুখে গভীর চিন্তার ছাপ ফুটে উঠেছে। কিছুক্ষণ নীরব থাকার পর বিষণ্ন গলায় বললেন,
— ছেলেটা যথেষ্ট ভদ্র। ওইদিনও দেখা হলো… কত সুন্দর করে কথা বললো। কার কী ক্ষতি করেছিল যে এভাবে এত নির্মমভাবে আঘাত করলো ওকে?
তিনি বুঝতেই পারছেন না, মানুষ কীভাবে এত নিষ্ঠুর হতে পারে। আর রাহা চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইল। কারণ কিছু প্রশ্নের উত্তর সত্যিই কারও কাছে থাকে না।
— হয়তো নিষিদ্ধ জিনিসে হাত দিতে গিয়েছিল।
গভীর, স্থির কণ্ঠটা হঠাৎ করেই চারপাশের নীরবতা চিরে ভেসে আসতেই আরমান চৌধুরী আর রাহা একসাথে ঘুরে তাকায়।
কালো গাড়িটার গায়ে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে নীল। পড়নে গাঢ় নেভি ব্লু শার্ট, হাতা দুটো কনুই পর্যন্ত ভাঁজ করা। উপরের তিনটে বোতাম খোলা থাকায় ফর্সা, লোমহীন বুকের একাংশ স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। ব্ল্যাক প্যান্ট আর কালো বেল্টের সাথে পুরো লুকটা তাকে অদ্ভুত রকম পরিপাটি অথচ বিপজ্জনক আকর্ষণীয় করে তুলেছে। চোখে কালো সানগ্লাস, হাতে চকচকে রোলেক্সের ঘড়ি, আর এক হাত নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে প্যান্টের পকেটে ঢোকানো।
ঠিক তখনই গাড়ির ড্রাইভিং সিট থেকে নেমে আসে আদি তার পড়নে ব্ল্যাক প্যান্ট হোয়াইট শার্ট যা শক্ত পোক্ত বাহুতে জড়িয়ে আছে। চোখে সানগ্লাস কিন্তু নীলের উপস্থিতির কারণে তার উপস্থিতিটা যেন মুহূর্তেই আড়ালে পড়ে যায়।
আরমান চৌধুরী ভ্রু কুঁচকে নীলের দিকে তাকিয়ে বলেন,
— নিষিদ্ধ জিনিস মানে?
নীল ধীর পায়ে তাদের দিকে এগিয়ে আসে। তার ঠোঁটের কোণে অস্পষ্ট এক হাসি ফুটে উঠেছে, কিন্তু সেই হাসিতে উষ্ণতার চেয়ে রহস্যই বেশি ছিল।
রাহার পাশ ঘেঁষে দাঁড়িয়ে শান্ত স্বরে বলল,
— নিষিদ্ধ জিনিস মানে… নিষিদ্ধ কেস নিয়ে কাজ করে। তাই শত্রুও বাড়ে।
কথাটা বলার সময় নীল এর কণ্ঠে অদ্ভুত স্থিরতা ছিল।
আরমান চৌধুরী ধীরে মাথা নাড়লেন। মুখে চিন্তার রেখা আরও গাঢ় হয়ে উঠল।
— হুমম…
তারপর হঠাৎ আশেপাশে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলেন,
— শান কোথায়?
রাহা ছোট করে উত্তর দিল,
— শান পায়ে ব্যথা পেয়েছে। যাবে না।
আরমান চৌধুরীর ভ্রু সামান্য কুঁচকে যায়।
— হঠাৎ?
রাহা এবার একটু থেমে মাথা নাড়ল।
— হুমম। জোর করার প্রয়োজন নেই।
পুরো সময়টা আদি মাথা নিচু করেই দাঁড়িয়ে ছিল। তার অস্বাভাবিক চুপচাপ ভাবটা চোখ এড়ালো না আরমান চৌধুরীর। তিনি ধীরে আদির দিকে তাকিয়ে বললেন,
— সাজিদের সাথে দেখা করে এসেছো?
প্রশ্নটা শুনে আদি স্পষ্ট চমকে ওঠে। মাথা তুলে তাকায় তার দিকে। চোখেমুখে মুহূর্তের জন্য অস্বস্তি আর বিস্ময় একসাথে ফুটে ওঠে।
কিন্তু আশ্চর্যের বিষয়, আরমান চৌধুরীর মুখ একদম স্বাভাবিক। যেন কিছুই হয়নি। যেন বাড়ির ভেতরে কোনো অশান্তি নেই, কোনো দ্বন্দ্ব নেই।
আদিকে এভাবে থমকে যেতে দেখে তিনি ধীরে এগিয়ে এসে তার কাঁধে হাত রাখলেন। কণ্ঠটা এবার আগের চেয়ে অনেক শান্ত, কিন্তু ভেতরে অদ্ভুত ভার ছিল।
— ফ্যামিলি ম্যাটার ফ্যামিলির মধ্যেই থাকবে। কাজের ওপর যেন এর কোনো প্রভাব না পড়ে।
কয়েক সেকেন্ড থেমে তিনি গভীর নিঃশ্বাস ফেললেন। তারপর নিচু গলায় বললেন,
— এটা শুধু একটা প্রজেক্ট না, আদি। এটা আমার আর সাজিদের বহু বছরের সাধনার জিনিস।
কথাগুলো শুনে আদি ধীরে মাথা নাড়ল। মুখে কোনো শব্দ এলো না, শুধু নীরব সম্মতি জানাল।
আর দূরে দাঁড়িয়ে থাকা রাহা চুপচাপ সব দেখছিল। 
হালকা বেবি ব্লু রঙের ঢিলেঢালা টপ কলারের চারপাশে থাকা ছোট ছোট ফ্রিল আর সামনের মুক্তার মতো বোতাম, ফুল হাতা পোশাকটার নরম ভাঁজগুলো বাতাসে হালকা দুলছিল, যার মাঝে নিরব সৌন্দর্য লুকিয়ে আছে। নিচের গাঢ় ব্লু রঙের ফরমাল প্যান্ট। খোলা ঢেউ খেলানো চুল, ফ্যাকাশে শান্ত মুখ, ঘন পল্লব বিশিষ্ট চোখ বিশেষ করে চোখের ডার্ক ব্রাউন মনিগুলো কেমন উজ্জ্বলতা ছড়াচ্ছে। বাড়তি চাকচিক্য সাজ সজ্জা না থাকা সত্ত্বেও মনে হচ্ছে আস্ত একটা সতেজ পিওনি দাঁড়িয়ে আছে। 
নীল কিছুক্ষণ দূর থেকে তাকিয়ে ছিল রাহার দিকে। তারপর খুব আস্তে করে এসে দাঁড়ায় তার ঠিক পিছনে। দুজনের শরীরের দূরত্ব এতটাই কম ছিল যে রাহা চাইলে নীলের নিশ্বাসের উষ্ণতা পর্যন্ত অনুভব করতে পারতো।
ওদিকে আরমান চৌধুরী আর আদি নিজেদের কথায় ব্যস্ত। রুদ্র ফোনে কারও সাথে কথা বলছে। কেউ তাদের দিকে খেয়াল করছে না।
নীল ধীরে ঝুঁকে আসে। তার মুখটা রাহার কানের এত কাছে যে গলার ভারী স্বরটা সরাসরি গিয়ে লাগে রাহার ত্বকে।
ফিসফিস করে বলল,
— ইউ আর লুকিং গর্জিয়াস… লাইক পিওনি।
রাহা আগেই লক্ষ্য করেছিল নীলের মতিগতি। সে ইচ্ছে করেই চুপ ছিল—দেখতে চেয়েছিল ছেলেটা কী করে।
কিন্তু “পিওনি” শব্দটা কানে আসতেই তার চোখের ভেতর মুহূর্তের জন্য অন্যরকম একটা ঝলক খেলে গেল।
পিওনি…
হঠাৎ করেই বহু বছর আগের একটা দৃশ্য স্পষ্ট হয়ে উঠল তার মনে। তখন তার বয়স মাত্র আট। নওরিন সেবার তার স্বামী লং ফাইয়ের সাথে ইউ এস থেকে ফিরেছিলেন। আর ফেরার সময় সাথে করে এনেছিলেন একগুচ্ছ পিওনি ফুল—নীলিমার জন্য। কারণ পিওনি ছিল নীলিমার সবচেয়ে পছন্দের ফুল, অথচ বাংলাদেশে তখন খুব একটা পাওয়া যেত না।
সেদিন নওরিনের আসা উপলক্ষে পুরো বাড়িতে ছোটখাটো আয়োজন হয়েছিল। নীলিমা, সাজিদ, রুবিনা—সবাই এসেছিল একসাথে। বাড়ি জুড়ে হাসির শব্দ, মানুষের কোলাহল আর ফুলের মিষ্টি গন্ধ মিশে ছিল।
ছোট রাহা মায়ের হাত থেকে অর্ধেক পিওনি ফুল নিজের কাছে নিয়ে গিয়েছিল। খুব যত্ন করে পড়ার টেবিলের উপর সাজিয়ে রেখেছিল ফুলগুলো। সে এখনো মনে করতে পারে—পাপড়িগুলো কত নরম আর কোমল ছিল। হাত দিয়ে ছুঁলেই মনে হতো ভেঙে যাবে।
আর তখনই নওরিন তাকে বলেছিলেন,
পিওনি সম্মান আর প্রেমের প্রতীক।
রাহা বাস্তবে ফিরে আসে রুদ্রের কণ্ঠে।
— রাহা ম্যাম, চলুন। দেরি হয়ে যাচ্ছে।
রাহা ধীরে চোখ তুলে তাকায়। মুখটা আগের মতোই শান্ত। কিন্তু বুকের ভেতর কোথাও যেন পুরোনো কোনো অনুভূতির দরজা নিঃশব্দে খুলে গেছে,,,,,,,
চলবে...

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ২৪তম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন