ফন্ট সাইজ:
থিম:
প্রনয়ের প্রলয়

২৫তম পর্ব

লেখক: মেহরিমা সারা

#প্রনয়ের_প্রলয় 

#কলমে_মেহরিমা_সারা 
#পর্বঃ২৫ 
গাড়িটা নিজের গতিতে ছুটে চলেছে দীর্ঘ ফাঁকা রাস্তায়। স্টিয়ারিংয়ে নীল, তার পাশের সিটে রুদ্র আর পেছনে জানালার পাশে বসে রাহা— কোলে খোলা ল্যাপটপ, আঙুলগুলো দ্রুত ছুটছে কিবোর্ডে।
মূলত যাওয়ার কথা ছিল দুইটা গাড়িতে। একটা আদির, আরেকটা রাহার। কিন্তু পরিস্থিতি একটু জটিল হতেই নীল সুযোগটা লুফে নিয়েছে। ইরা আর আদিকে এক গাড়িতে পাঠিয়ে নিজে রাহাদের সঙ্গে চলে এসেছে।
গাড়ির ভেতরের নীরবতা ভাঙতে নীল হালকা গলা খাঁকারি দিল। রাহার কোনো প্রতিক্রিয়া না পেয়ে নিজেই বলতে শুরু করল—
— বলছিলাম, আমরা তো চাইলে ফ্লাইটেই যেতে পারতাম। তাহলে গাড়িতে যাওয়ার সিদ্ধান্ত কেন?
আসলে শান প্লেনে যাতায়াত করতে পারে না। অনেক সমস্যা হয় তার। তাই ঠিক হয়েছে সবাই গাড়ি করেই যাবে। তাছাড়া সেখানে নিজেদের গাড়ির দরকারও পড়বে। ড্রাইভার নেওয়ার কথাও উঠেছিল, কিন্তু রাহা সরাসরি নিষেধ করে দিয়েছে। আগেরবার আরমান চৌধুরীর সঙ্গে গিয়ে একজন আহত হয়েছিল— সেই ঘটনার পুনরাবৃত্তি সে আর চায় না।
কিন্তু নীলের প্রশ্নের উত্তরে রাহা কিছুই বলল না। যেন সে গাড়িতে নেই-ই। পুরো মনোযোগ ল্যাপটপের স্ক্রিনে।
অস্বস্তিকর নীরবতায় শেষমেশ রুদ্রই বলল—
— ম্যাম, নীল কিছু বলছে আপনাকে।
তবুও কোনো উত্তর এলো না।
রুদ্র সঙ্গে সঙ্গে চুপ মেরে গেল। রাহাকে বেশি বিরক্ত করার ফল সে আগেও পেয়েছে। বিনা দাওয়াতে একবার থাপ্পড় খেয়ে শিক্ষা হয়েছে তার। নিজের ভালোর জন্য এবার আর ঝুঁকি নিল না।
অন্যদিকে নীল যেন এসবের কিছুই পরোয়া করছে না। মনের আনন্দে গাড়ি চালাতে চালাতেই বলে উঠল—
— মিস রাহা, আমি আপনাদের সঙ্গে গিয়ে কী কাজ করব?
রাহা এবারও চোখ তুলল না। নীল পুনরায় নির্লিপ্ত গলায় বলল,
— নিজেদের অফিসে আমরা ইন্টারভিউ দিয়ে ঢুকব, ব্যাপারটা কেমন দেখায় বলুন তো? আপনি চাইলে ওদের বোঝাতে পারেন।
নীল নাটকীয় মুখ করে বলল—
— মানে বাকিদের মতো আমাকেও কাজ করতে হবে?
কথা বলতে বলতেই সে মাঝেমধ্যে পানির বোতল থেকে চুমুক দিচ্ছিল।
রুদ্র বিরক্ত হয়ে বলল—
— নীল, হয় গাড়ি চালাও, না হয় পানি খাও। আমাদের উপরে পাঠানোর প্ল্যান আছে নাকি?
নীল শুনেও শুনল না। নিজের মতো স্টিয়ারিং ঘুরিয়ে চলল।
বেচারা রুদ্র ঠোঁট চেপে চুপ করে বসে রইল।
কিন্তু নীল থামার পাত্র নয়। পুনরায় বলে,
— রাহা, আমি যদি ভুল করি তাহলে কি বকুনি খাব?
— আচ্ছা, আমি কার আন্ডারে কাজ করব?
— তবে একটা কথা বলে রাখি, আমি কিন্তু আপনার আন্ডারে কাজ করব না।
একটার পর একটা আজগুবি কথা বলেই যাচ্ছে সে।
রুদ্র শুনতে শুনতে একসময় ঘুমিয়ে পড়ল।
রাহা তখনও ল্যাপটপে মুখ গুঁজে বসে আছে। তবে নীল খেয়াল করেছে— আজ ওর মুখটা অস্বাভাবিক রকম গম্ভীর। কপালের ভাঁজগুলো ভেতরের কোনো অস্থিরতার ইঙ্গিত দিচ্ছে। কিছু কি হয়েছে?
হঠাৎ গাড়ি থেমে যেতেই রুদ্র ধড়ফড় করে জেগে উঠল। পাশ ফিরে দেখে নীল দরজা খুলে নামছে।
দুই ঘণ্টা পেরিয়ে গেলেও তারা মাত্র এক ঘণ্টার রাস্তা এসেছে।
রুদ্র বিরক্ত গলায় বলল—
— কোথায় যাচ্ছ? এই গতিতে গেলে রাতে মিটিংয়ে সময়মতো পৌঁছাতে পারব না।
নীল শুধু কনিষ্ঠ আঙুল দেখিয়ে হেঁটে চলে গেল।
প্রায় দশ মিনিট পরে ফিরে এসে আবার গাড়ি স্টার্ট করল।
এরপরই আচমকা তীব্র ঝাঁকুনিতে রাহা সামনের দিকে পড়ে যেতে নিয়েও নিজেকে সামলে নিল।
নীল এবার অস্বাভাবিক গতিতে গাড়ি চালাচ্ছে।
রাহা ধীরে ল্যাপটপ বন্ধ করল। তার মেজাজ এমনিতেই খারাপ ছিল, এখন সেটা চোখেমুখে স্পষ্ট।
রুদ্র ভয় মেশানো গলায় বলল—
— নীল, গাড়ি আস্তে চালাও। আবহাওয়াও ভালো না। যে কোনো সময় এক্সিডেন্ট হতে পারে।
কিন্তু নীল যেন কারো কথাই শুনছে না। তার চোখে-মুখে অদ্ভুত এক দুষ্টুমি।
আরও এক ঘণ্টা পর আবার গাড়ি থামাল সে। এবার রুদ্রর দিকে তাকিয়ে বলল—
— পানি নিয়ে আসুন। পানি শেষ।
রুদ্র চারপাশে তাকিয়ে বিরক্ত গলায় বলল—
— এই জায়গায় এখন পানি কোথায় পাব?
— সামনে গেলেই পাবেন।
রুদ্র একবার রাহার দিকে তাকাল। তারপর বিরক্ত মুখে গাড়ি থেকে নেমে গেল।
এতক্ষণ পর রাহা দাঁতে দাঁত চেপে বলল—
— নীল, এবার কিন্তু বাড়াবাড়ি হচ্ছে।
নীল তার দিকে তাকিয়ে ঠোঁট বাঁকিয়ে দুষ্টু একটা হাসি দিল।
রাহা বিরক্তিতে চোখ সরিয়ে নিল। এই মানুষটাকে কিছু বলা আর দেয়ালের সাথে কথা বলা— দুটোই সমান।
রুদ্র চোখের আড়াল হতেই নীল ধীরে ধীরে গাড়ি স্টার্ট দিল।
রাহা হকচকিয়ে একবার পেছনে তাকাল, তারপর সামনে।
গাড়িটা সামনে এগোতে শুরু করেছে।
আর নীল জানালা দিয়ে মুখ বের করে দুই হাত কপালে ঠেকিয়ে দূরে দাঁড়িয়ে থাকা রুদ্রকে উদ্দেশ্য করে চিৎকার দিল—
— গুডবাই!
______________
হালকা ঠান্ডা বাতাস জানালা দিয়ে ভেতরে ঢুকে ইরার খোলা চুলগুলো এলোমেলো করে দিচ্ছে।
ইরা জানালার পাশে মাথা ঠেকিয়ে বাইরে তাকিয়ে আছে। চোখ দুটো স্থির, অথচ দৃষ্টির ভেতরে অদ্ভুত শূন্যতা। যেন রাস্তা দেখছে না— নিজের ভেতরের কোনো অদৃশ্য অন্ধকারে হারিয়ে গেছে।
আদি এক হাত দিয়ে স্টিয়ারিং ঘুরাচ্ছিল, অন্য হাতটা জানালার ধারে রাখা। বেশ কিছুক্ষণ ধরেই সে খেয়াল করছে ইরা অস্বাভাবিক চুপচাপ। সাধারণত এমন নীরবতা ওর স্বভাবে নেই। যদিও পরিস্থিতি ভিন্ন তবুও।
একবার তাকিয়ে নরম গলায় বলল—
— কী হয়েছে? মন কোথায় পড়ে আছে?
ইরা কোনো উত্তর দিল না।
বাতাসে ওর চুলগুলো উড়ে এসে বারবার মুখ ঢেকে দিচ্ছে, কিন্তু সেগুলো সরানোর দিকেও কোনো খেয়াল নেই।
আদি এবার একটু গম্ভীর গলায় আবার ডাকল—
— ইরা… কিছু বলছো না কেন?
আদির ডাকে ইরা যেন ধ্যান ভাঙার মতো চমকে তাকাল।
আদি ওর মুখের দিকে তাকিয়ে থমকে গেল। মুখটা ভীষণ মলিন। চোখের নিচে ক্লান্তির ছাপ, ঠোঁট শুকিয়ে আছে।
আদি ভ্রু কুঁচকে ধীরে বলল—
— ইরা, কী হয়েছে?
ইরা কিছুক্ষণ চুপ থেকে মলিন হেসে বলে,
— কিছু হওয়া কি বাকি আছে আদি?
কথাটা শুনে আদি নিঃশব্দে দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
তারপর শান্ত গলায় বলল,
— নেই… তবে আমাদের উচিত স্বাভাবিক হওয়া। আর বাকিদেরও স্বাভাবিক রাখা।
ইরা ধীরে চোখ নামিয়ে ফিসফিস করে বলল—
— আদি… আমি যদি কোনোদিন হারিয়ে যাই, তুমি আমাকে ভুলে যাবে?
প্রশ্নটা শুনে আদি অবাক হয়ে তাকাল।
এমন প্রশ্ন হঠাৎ কেন?
সে বুঝতে পারল না। তবে ইরার চোখের ভেতরের ভাঙাচোরা অনুভূতি দেখে মজা করার সাহসও হলো না।
আদি ঠোঁটে হালকা হাসি এনে বলল—
— শেষ নিঃশ্বাস পর্যন্ত এই হৃদয়ে ইরানী সিদ্দিকী থাকবে।
ইরা সাথে সাথেই তাকাল ওর দিকে।
চোখদুটো কেমন ভিজে উঠেছে।
ধীরে বলল,
— হৃদয়ে কেন বললে? বলতে পারতে… এই জীবনে ইরা ছাড়া আর কেউ আসবে না।
আদি মুহূর্তেই চুপ হয়ে গেল।
সে আসলে এত ভেবে বলেনি। স্বাভাবিকভাবেই কথাটা বেরিয়ে গিয়েছিল। কিন্তু ইরার গলায় এমন আতঙ্ক ছিল, যেন সে সত্যিই কোনো ভয়ংকর ভবিষ্যৎ কল্পনা করে বসে আছে।
আদি কিছুক্ষণ ওর দিকে তাকিয়ে থেকে নরম গলায় বলল,
— ইরা, কী হয়েছে বলবে? এমন কথা কেন বলছো?
ইরা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। তারপর ধীরে ধীরে বলতে শুরু করল,
— আমাদের পাশের ফ্ল্যাটে একটা ছেলে পরিবার নিয়ে থাকে। বয়স বিশ-একুশ হবে। একটা ষোল বছরের মেয়েকে ভালোবেসে বিয়ে করেছিল। পরিবারের বিরুদ্ধে গিয়ে।
বলতে বলতে ইরার চোখের দৃষ্টি ঝাপসা হয়ে এলো।
— ছেলেটা মেয়েটাকে পাগলের মতো ভালোবাসত। সবাই বলত ওদের দেখে মনে হয় পৃথিবীতে এদের মতো সুখী কেউ নেই। কিন্তু বিয়ের তিন বছর পরও যখন বাচ্চা হলো না, তখন মেয়েটা ভেঙে পড়তে শুরু করল। নিজেকে দোষ দিত সবসময়। অথচ ছেলেটা ওকে বুঝাত… বলত, “আল্লাহ চাইলে একদিন ঠিকই হবে।”
ইরা থামে গলাটা কেঁপে উঠছে।
— কয়েক মাস আগে মেয়েটা জানতে পারে সে দুই মাসের প্রেগন্যান্ট। খবরটা শুনে ছেলেটা নাকি আনন্দে পুরো এলাকায় মিষ্টি বিলিয়েছে। সবাইকে বলছিল সে বাবা হবে…
আদি নিরবে শুনছিল।
গাড়ির ভেতরটা আরও নিস্তব্ধ হয়ে উঠল।
ইরা আবার বলতে শুরু করল—
— তারপর তিন মাসের সময়… মেয়েটা হঠাৎ পা পিছলে পড়ে যায়। বাচ্চাটা বাঁচেনি।
কথাটা বলেই ইরা চোখ বন্ধ করে ঘটনাটা মনে করলেই বুকের ভেতর মোচড় দিয়ে উঠছে।
— এরপর থেকেই মেয়েটা বদলে যেতে থাকে। সারাদিন শুধু বাচ্চার কথা বলত। ধীরে ধীরে মানসিকভাবে ভেঙে পড়ে। সবাই বলত ওর আচরণ অস্বাভাবিক হয়ে যাচ্ছে। তারপর একদিন কোথায় যেন চলে যায়।
আদি এবার ধীরে গাড়ির গতি কমিয়ে দিল।
ইরা ফিসফিস করে বলে চলল—
— ছেলেটা নাকি পাগলের মতো খুঁজেছিল ওকে। পুরো শহর খুঁজেও পায়নি। সাত মাস কেটে যায়। পরে ছেলেটার বাবা-মা আবার বিয়ের জন্য চাপ দিতে থাকে। ছেলেটা রাজি হয়নি প্রথমে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত মায়ের কান্না, ইমোশনাল ব্ল্যাকমেইল… সবকিছুর কাছে হার মেনে বিয়ে করে ফেলে।
ইরা থামে তারপর নিচু গলায় বলল,
— বিয়ের পাঁচ মাস পর হঠাৎ কাল একটা লোক মেয়েটাকে নিয়ে আসে। বলে, মেয়েটা বাসে করে কোথায় যেন যাচ্ছিল লোকেরা জিজ্ঞেস করলে কিছু বলতে পারেনি হঠাৎ ঢলে পড়ে যায় পরে বাসের লোকেরা ধরে সামনের হসপিটাল নিয়ে যায়। এতদিন গাজীপুরের একটা হাসপাতালে ছিল। মানসিক ভারসাম্য ঠিক ছিল না বলে কিছু বলতে পারেনি। পরে সুস্থ হলে ঠিকানা বলেছে, তাই ওরা বাড়ি নিয়ে এসেছে।
গাড়ির ভেতর হঠাৎ ভারী নীরবতা নেমে এলো।
ইরা জানালার বাইরে তাকিয়ে বলল,
— জানো আদি… মেয়েটাকে দেখলে ভীষণ মায়া লাগে। একদম বাচ্চা একটা মেয়ে। সুন্দর, শান্ত… অথচ চোখদুটো পুরো মৃত মানুষের মতো।
ইরার গলা কেঁপে উঠল।
— প্রথমে নাকি ও বিশ্বাসই করতে পারেনি যে ছেলেটা ওকে ছাড়া অন্য কাউকে বিয়ে করেছে। কাল রাতে বাবা ওদের বাড়ি গিয়েছিল সমাধান করতে। পরে মা সব বলল আমাকে। সারারাত ঘুমাতে পারিনি আমি।
আদি চুপচাপ শুনে যাচ্ছিল। ইরা এবার চোখ মুছে বলল,
— আজ সকালে বাবা বলল, মেয়েটা আবার পুরো চুপ হয়ে গেছে। একদম নিশ্চুপ। কারো সাথে একটা কথাও বলেনি। ছেলেটাকে জিজ্ঞেস করলে সে বলেছে, এখন তার সংসার পূর্ণ। চাইলে আর আগের স্ত্রীকে রাখতে পারবে না। তবে ওর সব খরচ দিবে।
আদির বুকের ভেতর কেমন ভারী হয়ে উঠল। ইরা কাঁপা গলায় বলে,
— তারপর মেয়েটার বাবা-মাকে ডাকা হয়। মেয়েটার মা অসুস্থ মেয়েকে দেখে জড়িয়ে ধরে কাঁদছিলেন। আর মেয়েটা…
ইরা চোখ মুছে ফিসফিস করে বলে,
— মেয়েটা চুপচাপ নিজের হাতের চুড়ি খুলে ছেলেটার নতুন বউয়ের হাতে দিয়ে দিল। তারপর নিজের বাবা-মায়ের হাত ধরে বেরিয়ে গেল।
— আর ছেলেটা? সে শুধু দুই ফোঁটা চোখের পানি ফেলেছে… তারপর আর কিছুই করেনি।
কথা শেষ করেই ইরা কেঁদে ফেলল। আদি এক মুহূর্ত কিছু বলল না। শুধু নিঃশব্দে শুনে গেল।
কিছু কান্না থাকে, যেগুলোর সামনে কোনো সান্ত্বনাই যথেষ্ট মনে হয় না।
ইরা চোখ মুছে কাঁপা গলায় বলল—
— আদি… আমাদের সাথেও যদি কোনোদিন এমন হয়? তুমি কী করবে?
আদি গভীর দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
তারপর এক হাতে স্টিয়ারিং ধরে অন্য হাতটা বাড়িয়ে ইরার হাতের উপর রাখল।
গলাটা শান্ত, কিন্তু ভীষণ দৃঢ়—
— ইরা, লিসেন… ওদের সাথে যা হয়েছে সেটা ভাগ্য। সেখানে কারো হাত ছিল না। তুমি ওদের গল্পের সাথে আমাদের কেন মিলাচ্ছো?
সে একটু থেমে আবার বলল—
— আর তুমি ওই মেয়েটার মতো দুর্বল না। আর আমার পরিবারও এমন না যে আমার মনের বিরুদ্ধে আমাকে জোর করবে। মা এখন রাগ করছে, মানতে পারছে না— ঠিক আছে। কিন্তু আমি আমার মাকে চিনি। ঠান্ডা মাথায় ভাবলে একদিন ঠিকই মেনে নেবে।
আদি ইরার হাত শক্ত করে ধরল।
— তারপর আমরা তোমাদের বাসায় যাব। তোমার বাবার সামনে দাঁড়িয়ে তোমাকে চাইব। তাই এসব নিয়ে এত ভয় পেও না।
ইরা চুপচাপ ওর দিকে তাকিয়ে রইল।
আদি ধীরে ওর চোখের কোণে জমে থাকা পানি মুছে দিয়ে বলল,
— সব গল্পের শেষ একরকম হয় না, ইরা। কিছু গল্প মানুষ লড়ে নিজের মতো করে সুন্দরও করে নিতে পারে।
________
ইরা ধীরে মাথা নেড়ে সম্মতি জানাল। চোখের কোণে জমে থাকা পানিগুলো এখনও পুরোপুরি শুকায়নি, তবুও আদির কথায় বুকের ভেতরের চাপা অস্থিরতা খানিকটা নরম হয়েছে।
আদি এক হাত স্টিয়ারিংয়ে রেখেই অন্য হাতটা বাড়িয়ে ইরার হাত নিজের মুঠোয় নিল। তারপর খুব স্বাভাবিক ভঙ্গিতে ওর হাতের পিঠে ঠোঁট ছুঁইয়ে দিল।
ইরা হকচকিয়ে আদির দিকে তাকাল। তারপর ভেজা চোখেই মাঝেই লাজুক হাসে।
গাড়ির ভেতরের ভারী পরিবেশটা যেন মুহূর্তের জন্য একটু নরম হয়ে এলো। বাইরে মেঘলা আকাশ, দূরে জমে থাকা বৃষ্টির গন্ধ আর ভেতরে দুজন মানুষের নিঃশব্দ আশ্বাস— সবকিছু মিলিয়ে এক অদ্ভুত শান্ত মুহূর্ত তৈরি হলো।
কিছুক্ষণ চুপচাপ থাকার পর ইরা হঠাৎ চারপাশে তাকিয়ে বলে,
— রাহাদের গাড়ি কোথায়? আমাদের আগেই তো ছিল।
আদি হালকা হেসে স্টিয়ারিং ঘুরিয়ে বলে,
— গাড়ি নীল ড্রাইভ করছে। আমরা ওদের আগে ছিলাম। এখন ওরা আমাদের আগে। তারপর আবার কিছুক্ষণ পর আমাদের পেছনে পড়ে থাকবে।
ইরা অবাক হয়ে তাকাল।
— কী বলো! তুমিই তো এত দ্রুত গাড়ি চালাচ্ছো। নীল এর থেকেও স্পিডে ড্রাইভ করছে নাকি?
আদি এবার হেসে ফেলল।
— নীলকে তুমি এখনও ঠিকমতো চেনো না। ওর আলসেমি লাগলে এমন ধীরে গাড়ি চালাবে যে মনে হবে রাস্তা মেপে মেপে যাচ্ছে। আবার মাথায় ভূত চাপলে একদম সর্বোচ্চ গতিতে উড়িয়ে নিয়ে যাবে।
ইরা ভ্রু কুঁচকে বাইরে তাকাল। আকাশ আরও কালো হয়ে এসেছে চিন্তিত স্বরে বলে,
— আবহাওয়া কিন্তু ভালো না। সমস্যা হতে পারে।
আদি নির্ভার গলায় বলে,
— সমস্যা হবে না। রাহা আছে না?
ইরা প্রশ্নবোধক দৃষ্টিতে তাকাতেই আদি মুচকি হেসে বলল,
— রাহার হাতের থাপ্পড়ে সোজা হয়ে যাবে। নীল রাহাকে ভীষণ ভয় পায়।
কথাটা শুনেই ইরার মুখ অদ্ভুতভাবে কুঁচকে গেল।
সে নিচু গলায় বিরবির করে বলল—
— ভয় না কচু… তোমার ওইটুকু ভাই ভয়কেও ভয় পাইয়ে দেয়।
আদি ভ্রু তুলে তাকাল।
— কিছু বললে?
ইরা সাথে সাথে মাথা নাড়ল।
— না… কিছু না।
তারপর জানালার বাইরে তাকিয়ে রইল।
কিন্তু ভেতরে ভেতরে চিন্তাগুলো আবার মাথা তুলতে শুরু করেছে। এখন কিছু বলা ঠিক হবে না।
রাহার বিষয় রাহাই সামলাবে। তবুও ইরার বুকের ভেতর থেকে অস্বস্তিটা কিছুতেই যাচ্ছে না।
সেদিন নীল যা করেছে… তারপর আর সন্দেহের কোনো জায়গাই নেই। ছেলেটার চোখে, আচরণে, রাহাকে ঘিরে অদ্ভুত এক পাগলামি আছে। সেটা সাধারণ আকর্ষণ না।
আর রাহা? ওর আচরণটাই বরং বেশি অদ্ভুত।
এই মেয়েটাকে ইরা ছোটবেলা থেকে দেখছে। রাহার আশেপাশে কেউ একটু বাড়াবাড়ি করলে পরদিন সে মানুষটার ছায়াও রাহার কাছে ঘেঁষতে পারত না। রাহা এমন মানুষ, যে নিজের সীমারেখা খুব স্পষ্ট করে টেনে রাখে।
সেই রাহার সাথে এতো কিছু করেছে....অথচ রাহা বুঝতেই পারেনি— এটা বিশ্বাস করা অসম্ভব। আর যদি বুঝেই থাকে…
তাহলে চুপ কেন?
এই প্রশ্নটাই ইরাকে সবচেয়ে বেশি ভাবাচ্ছে।
রাহা কখনো অকারণে কাউকে সুযোগ দেয় না।
তাহলে নীলের ক্ষেত্রে এত নীরব কেন?
ইরা ঠোঁট কামড়ে চোখ নামিয়ে ফেলল।
মাথার ভেতর আরও একটা নাম ঘুরপাক খেতে লাগল— সামিন।
শুরু থেকেই ছেলেটা রাহার উপর পুরো লাড্ডু ছিল। এতদিন নিজের ঝামেলা, নিজের চিন্তায় ডুবে থাকার কারণে বিষয়টা নিয়ে আলাদা করে ভাবেনি ইরা। কিন্তু এখন সবকিছু একসাথে জোড়া লাগাতে গিয়ে ব্যাপারগুলো অদ্ভুত লাগছে।
পুরো নিউইয়র্ক জানত সামিন রাহাকে ভালোবাসে। অনেকে তো সরাসরি রাহাকে সামিনের গার্লফ্রেন্ড বলেই চিনত। সামিনও কখনো সেটা অস্বীকার করেনি। বরং সুযোগ পেলেই রাহার আশেপাশে ঘুরঘুর করত। কিন্তু এখন? এতকিছুর পরও সামিন অস্বাভাবিক শান্ত।
এই শান্ত থাকাটাই যেন আরও বেশি ভয়ের।
কারণ সামিনকে ইরা চেনে।
সে এত সহজে পিছু ছাড়ার মানুষ না।
তাহলে সে চুপ কেন?
রাহা কী চায়? আসলে কী করছে ও?
চলবে...

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ২৫তম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন