#প্রনয়ের_প্রলয়
#কলমে_মেহরিমা_সারা
#পর্বঃ৩১
— এত রাতে আমরা কোথায় যাবো? এভাবে ফিরিয়ে দিবেন না প্লিজ।
অনুরোধের সুরে কথাটা বলে রুদ্র। পাহাড়ি গ্রামের প্রধান থুইসিং-এর সামনে দাঁড়িয়ে আছে। দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে সবাই অবসন্ন। চারপাশে পাহাড়ি রাত নেমে এসেছে, দূরের জঙ্গলে ঝিঁঝিঁ পোকার শব্দ ছাড়া আর কোনো আওয়াজ নেই। এমন সময় আশ্রয় না পেলে বিপদে পড়তে হবে এমনটাই বুঝাতে হবে।
থুইসিং দুয়ারে দাঁড়িয়েই সবাইকে ফিরিয়ে দিতে চেয়েছিল। তাদের পোশাক-আশাক, শহুরে চালচলন দেখেই সে বুঝে গিয়েছিল— এরা নিশ্চয়ই আবার জমি কিংবা কোনো প্রকল্পের কথা বলতে এসেছে। বিগত কয়েক বছরে এমন অনেক লোক এসেছে, মিষ্টি কথা বলে পাহাড়িদের বিশ্বাস অর্জন করেছে, তারপর নিজেদের স্বার্থ হাসিল করে চলে গেছে। তাই এখন অপরিচিত কাউকে সহজে বিশ্বাস করতে পারে না সে।
রুদ্রের কথায় লোকটার মুখে সামান্য নরম ভাব ফুটলেও সিদ্ধান্তে খুব একটা পরিবর্তন এল না।
নীল সামনে এগিয়ে এল। তার চোয়াল শক্ত হয়ে আছে। সে কিছু একটা বলার জন্য মুখ খুলতেই রাহা দ্রুত তার কব্জি ধরে পিছনে টেনে নিল।
নীল বিস্মিত হয়ে তাকাল।
রাহা মাথা নেড়ে তাকে থামিয়ে দিল।
তারপর নিজেই এক পা সামনে এগিয়ে গেল।
— আংকেল... আমি রাহা।
থুইসিং কপাল কুঁচকে তাকাল।
— রাদা কে?
নিজের নামের এই করুণ পরিণতিতে মুহূর্তের জন্য থমকে গেল রাহা। কিন্তু পরক্ষণেই নিজেকে সামলে নিয়ে নরম গলায় বলল,
— আমি রাহামনি... ডক্টর নীলিমার মেয়ে।
কথাটা বলা মাত্র যেন সময় থমকে গেল।
থুইসিংয়ের চোখ বড় হয়ে উঠল। গোটানো ভ্রু ধীরে ধীরে সোজা হয়ে এল।
অদূরে দাঁড়িয়ে থাকা এক মধ্যবয়সী মহিলা বিস্ময়ে মুখ ঢেকে ছুটে এলেন।
— হায়্যা! ডাক্তার নীলিমা আপার মাইয়া তুমি? আমাদের মনি?
মহিলার কণ্ঠ কেঁপে উঠল। রাহা নিঃশব্দে মাথা নাড়ল।
পরের মুহূর্তেই চিংমে দুই হাত দিয়ে তার মুখ ছুঁয়ে ফেলল।
— আরে বাপরে! সত্যি সত্যি মনি আইছে!
রাহার ভেতরে অদ্ভুত এক অনুভূতিতে ছেয়ে যায়।
‘মনি’ ডাকটা কখনোই ভালো লাগে না। একমাত্র মা ছাড়া আর কারো মুখে মনি শুনে স্বস্তি পায় না।
মায়ের মৃত্যুর পর তো কেউ আর ডাকেওনি। মাঝে মধ্যে বাবা বা অন্য কেউ একটু আধটু বলে ফেলে।
চিংমে আর এক মুহূর্তও সময় নষ্ট না করে বলে উঠে,
— আইসো, আইসো ভিতরে আইসো। সবাই আইসো। বাইরেতে দাঁড়াইয়া থাকবা ক্যান?
এক প্রকার জোর করেই সবাইকে ভেতরে নিয়ে যায়। বাড়িটা গ্রামের অন্যান্য ঘরের তুলনায় বেশ বড়। মাটির উঠান, পাশে আধাপাকা দেয়াল, উপরে টিনের ছাউনি। উঠানের এক কোণে বাঁশের তৈরি রান্নাঘর থেকে হালকা ধোঁয়া উঠছে।
ঘরের আলোয় দাঁড়াতেই চিংমে আবার রাহার দিকে তাকায়। এবার ভালো করে দেখে। তাকিয়েই স্তব্ধ হয়ে গেল। মেয়েটা যেন হুবহু মায়ের মতো ।একই মুখের গড়ন। একই কোমল আদল।
চিংমের চোখ ভিজে উঠলো। ধীরে ধীরে রাহার থুতনিতে হাত রেখে মুখটা ডানে-বামে ঘুরিয়ে দেখতে লাগল।
— একদম... একদম ডাক্তার আপার মতো।
— কী সুন্দর আছিল মানুষডা! সেই চোখ দুইডা... যেন পাহাড়ের সকালের রোদ। এহনও চোখ বন্ধ করলে দেখি।
রাহা চুপ করে থাকে মায়ের কথা উঠলেই বুকের ভেতরটা ভারী হয়ে যায়। তবে আজ অন্যরকম লাগছে। এরা তার মাকে শুধু চিনত তা না, সত্যিকারের ভালোবাসত।
তবুও চিংমের এতটা ঘনিষ্ঠ স্পর্শে রাহা কিছুটা অস্বস্তি বোধ করে। রাহা ব্যক্তিগত দূরত্ব বজায় রাখতে অভ্যস্ত। বিনা অনুমতিতে কেউ হাত ধরুক, সেটাও পছন্দ করে না। ধীরে ধীরে নিজেকে সামান্য সরিয়ে নেয়। চিংমে সেটা বুঝতে পেরে হেসে ফেলে,
— আরে, তুমি তো আগের মতোই আছো। ছোটবেলাতেও এমন লাজুক আছিলা। তবে এখন আরও সুন্দর হইছো। ডাক্তার আপার থেইকাও বেশি সুন্দর।
রাহা বিব্রত হয়, সে কখন লাজুক হলো! আশ্চর্য!
চিংমে এবার স্বামীর দিকে ঘুরে বলল,
— কী দাঁড়াইয়া আছো? যাও, ভালো কিছু আনো। নতুন মানুষ আইছে। রান্না-বান্না করন লাগব।
থমথমে মুখে দাঁড়িয়ে থাকা থুইসিং মাথা নাড়তে গিয়েও হঠাৎ থেমে যায়। তার চোখ গিয়ে আটকে রইল নীলের ওপর। লম্বা, সুঠামদেহী ছেলেটা। কিন্তু ওই চোখ...
ওই চোখ দুটো দেখে থুইসিংয়ের বুক ধক করে উঠল। চিংমেও স্বামীর দৃষ্টি অনুসরণ করে তাকাল।
তারপর সেও স্তব্ধ। নীল এদিকে রাহার দিকে তাকিয়ে ছিল। মায়ের কথা উঠতেই মেয়েটা কীভাবে গুটিয়ে গেল। আম্মির মৃত্যুর পর বহু বছর ধরে পরিবারের সবাই সচেতনভাবে বিষয়টা এড়িয়ে চলেছে। কারণ রাহার প্যানিক হয় মায়ের কথা উঠতেই।
চিংমে ধীরে ধীরে নীলের সামনে এসে দাঁড়ায়।
নীল অবাক হয়ে তাকিয়ে বলে,
— কী হয়েছে?
চিংমে কোনো উত্তর দেয় না শুধু তাকিয়ে থাকে।
তারপর আচমকা নীলের নাকের ডগায় চিমটি কেটে দিল। নীল হতভম্ব হয়ে যায়।
চিংমে হেসে বলে,
— এইডারে তো আগে দেখি নাই! বড় বইন মায়ের চেহারা পাইছে, আর ছোট ভাইডা পাইছে মায়ের চোখ!
এক মুহূর্তে নীলের মুখের অবস্থা দেখার মতো হয়ে যায়। একদিকে তাকে তিন বছরের বাচ্চার মতো নাক টানা হয়েছে। অন্যদিকে তাকে রাহার ছোট ভাই ঘোষণা করা হয়েছে!
সে প্রতিবাদ করার জন্য মুখ খুলতেই রাহা গম্ভীর মুখে বলে উঠল,
— হুম, আমার ছোট ভাই।
একটু থেমে যোগ করল,
— তবে আমার মায়ের ছেলে না। এটা সাজিদ আংকেলের ছেলে।
কথাটা শুনে নীলের মুখ আরও কালো হয়ে যায়।
রাহা মাথা নিচু করে রেখেছে, কিন্তু ঠোঁটের কোণে বিদ্রুপ স্পষ্ট ফুটে ওঠে। সবার অগোচরে সে মজা উপভোগ করছে।
নীল চোখ কুঁচকে রাহার দিকে তাকায়।
মনে মনে বিড়বিড় করে,
"কুচুটে মহিলা একটুও বদলায়নি। আগে যেমন ছিল, এখনো তেমনই আছে। মানুষের স্বভাব কোনোদিন ঠিক হয় না।"
_____________________
বাড়িতে ঢোকার পর প্রথমেই রাহা, নীল আর রুদ্র হাত-মুখ ধুয়ে নিল। সারাদিনের পথচলা, পাহাড়ি আঁকাবাঁকা রাস্তা, চোখে-মুখে ক্লান্তির ছাপ স্পষ্ট। বিশেষ করে রাহার অবস্থা আরও খারাপ। সকাল থেকে একের পর এক ঝামেলা সামলাতে সামলাতে মানসিকভাবেও বেশ বিধ্বস্ত হয়ে আছে।
ঘরের এক কোণে পাটি বিছিয়ে বসতেই নীল গম্ভীর মুখে বলে উঠল,
— কাল এলেও তো হতো। আজই এত তাড়াহুড়োর কী ছিল?
রাহা কিছুক্ষণ চুপ করে থাকে বাইরে তখন পাহাড়ি রাত আরও গাঢ় হয়ে উঠছে। দূরের জঙ্গলে অদ্ভুত সব পোকামাকড়ের ডাক ভেসে আসছে। মাথা তুলে নীলের দিকে তাকিয়ে বলে,
— যত দ্রুত সম্ভব এখানের কাজ শেষ করতে হবে।
কিছুক্ষণ থেমে আবার বলল,
— থুইসিংয়ের অনুমতি ছাড়া কিছুই করা সম্ভব না। পুরো পরিকল্পনার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশই উনি। তাই যত তাড়াতাড়ি কথা বলা যাবে, তত ভালো।
রুদ্র দীর্ঘশ্বাস ফেলল। সে জানে রাহা একবার কোনো সিদ্ধান্ত নিলে ওকে ফেরানো কঠিন।এদিকে চিংমে যেন অতিথি আপ্যায়নে নিজের সমস্ত শক্তি উজাড় করে দিতে বদ্ধপরিকর।একটার পর একটা থালা এসে জমা হচ্ছে ওদের সামনে। ঘরে বানানো নারকেলের নাড়ু, তিলের লাড্ডু, সন্দেশ, চালের গুঁড়ো দিয়ে তৈরি পাহাড়ি পিঠা, বাঁশপাতায় মোড়ানো মিষ্টি খাবার। কী নেই সেখানে! চিংমে বারবার হাসিমুখে এগিয়ে দিয়ে যাচ্ছে।
— খাও খাও। এত দূর থেইকা আইছো। না খাইলে শরীর কেমনে চলব?
রুদ্র ভদ্রতা রক্ষা করার জন্য দুই-একটা মুখে তুলে কিন্তু নীল আর রাহা চুপচাপ বসে আছে। দুজনের কারোরই খাবারের দিকে তাকাতে ইচ্ছে করছে না।
নীলের অবস্থা তো আরও করুণ। সকালে রাহার জন্য নাস্তা বানাতে গিয়ে তাড়াহুড়ো করে মাত্র দুই পিস ব্রেড খেয়েছিল। তারপর সারাদিন আর কিছুই মুখে তোলা হয়নি। দুপুরে খাওয়ার সুযোগ থাকলেও রাহার ড্রেস এর চিন্তায় খাওয়া হয়নি।এখন পেট এতটাই খালি যে ক্ষুধা আর অস্বস্তি মিশে একাকার হয়ে গেছে। উল্টো মিষ্টি খাবারের গন্ধেই গা গুলিয়ে উঠছে।
অন্যদিকে রাহাও ভীষণ অস্বস্তিতে আছে। ছোটবেলা থেকেই পরিচ্ছন্নতা নিয়ে অত্যন্ত সচেতন। বাইরের খাবার তো দূরের কথা, পরিচিত জায়গার বাইরেও খুব একটা খেতে পারে না। কিন্তু এখন পরিস্থিতি ভিন্ন। এত আন্তরিকভাবে আপ্যায়ন করছে যে না খাওয়াটাও অভদ্রতা হবে।মুখে বিব্রত হাসি এনে ধীরে ধীরে একটা পিঠার দিকে হাত বাড়ায় রাহা। ঠিক তখনই চিংমে প্রশ্ন করে,
— রাইতের বেলা কী খাইবা? কও, আমি রান্দন ধরি।
মুহূর্তেই রাহা হাত গুটিয়ে নেয় খাবার থেকে মুক্তির একটা অজুহাত পেয়ে যায়। প্রশ্নের উত্তর দিতে থাকে,
— না না, তেমন কিছু লাগবে না। আপনারা এত কষ্ট করবেন না।
চিংমে চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে বলে,
— কিতা কও? মানুষ আইছে ঘরে, আর রান্দন করুম না?
ঠিক তখনই উঠান থেকে থুইসিংয়ের গম্ভীর কণ্ঠ শোনা গেল। লোকটা ফিরেছে, তার দুই হাতে বিশাল বোঝা, এক ঝুড়ি সুগন্ধি চাল, দুটো মোটা মোরগ, একটা হাঁস, পাহাড়ি শাকসবজি, আর একগুচ্ছ তাজা বাঁশ কুঁড়ি রাতে যা পেয়েছে এনেছে। চিংমে দেখে প্রায় দৌড়ে বাইরে চলে গেল।
— হায়্যা! এত কিতা আনলা?
— মানুষ আইছে। খালি হাতে রাখুম নাকি?
থুইসিং গম্ভীর স্বরে উত্তর দিল। চিংমে আর সময় নষ্ট না করে রান্নার প্রস্তুতিতে লেগে গেল, ওরা চলে যেতেই রাহা যেন বাঁচল। গভীর একটা নিঃশ্বাস ছেড়ে ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়ায়, এত অস্বস্তি শেষ কবে অনুভব করেছে, মনে পড়ছে না। তবু মুখে কিছু প্রকাশ করল না।
কারণ রাহা জানে, এখানে আসার উদ্দেশ্য পূরণ করতে হলে এই সামান্য কষ্ট সহ্য করতেই হবে। নীল পাশের চৌকিতে গিয়ে ধপ করে চিৎ হয়ে শুয়ে পড়ে দুই পা বাইরে ঝুলছে, মনে হচ্ছে এখনই ঘুমিয়ে পড়বে। রুদ্র সামনের টেবিলে কনুই রেখে মাথা এলিয়ে দেয়
কিছুক্ষণ চুপচাপ থাকার পর বলল,
— লোকটার রাগ আর তেজ তো দেখলাম। কী মনে হয়? রাজি হবে?
রাহা জানালার বাইরে অন্ধকার পাহাড়ের দিকে তাকিয়ে কিছু একটা ভাবছে তারপর ধীরে ধীরে বলে,
— রাজি করাতে হবে।
— যদি না হয়?
রাহা এবার রুদ্রর দিকে তাকাল। চোখদুটো অদ্ভুত দৃঢ়।
— তাহলে শেষ পন্থা ব্যবহার করব।
রুদ্র আর নীল দুজনেই চুপচাপ তাকিয়ে রইল ওর দিকে। এই মেয়েটাকে যত দেখা যায়, ততই অবাক হতে হয়। বাইরে থেকে শান্ত। একবার কিছু ঠিক করলে আর পিছিয়ে আসে না। হঠাৎ নীল উঠে বসে। কিছুক্ষণ রাহার দিকে তাকিয়ে থেকে বলল,
— রাহা, খিদে পেয়েছে?
রাহা নীল এর দিকে তাকিয়ে একটু ভেবে উত্তর দেয়,
— খুব বেশি না। তবে সামান্য কিছু খেতে পারলে ভালো লাগত।
নীল যেন সেই উত্তরটার অপেক্ষাতেই ছিল। এক লাফে উঠে দাড়ায়। পরের মুহূর্তেই রাহার কব্জি ধরে,
— এই! কী করছো?
কোনো উত্তর দেয় না নীল শুধু রাহার হাত ধরে দরজার দিকে হাঁটতে শুরু করে । রাহা বিস্ময়ে পেছনে তাকায়। রুদ্রও অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে।
— নীল! কোথায় নিয়ে যাচ্ছো?
এবার নীল পিছনে না তাকিয়েই বলে,
— চলুন আমার সঙ্গে।
রুদ্র ওরা চলে যেতেই চোখ বন্ধ করে মাথা এলিয়ে দেয় সারাদিন অনেক কাজ করেছে।
— আরে! করছো কী?
রাহা বিস্মিত কণ্ঠে বলে। চিংমে তখন বড় একটা পিতলের বাটিতে মসলা মাখানো মোরগের মাংস নিয়ে বসেছিল। রাতের খাবারের প্রস্তুতি পুরোদমে চলছে। উঠানের একপাশে বাঁশের বেড়া ঘেরা রান্নাঘর, মাঝখানে কাদামাটি দিয়ে বানানো চুলা, পাশে স্তূপ করে রাখা শুকনো লাকড়ি। চারদিকে ধোঁয়া আর মসলার মিশ্র গন্ধ ছড়িয়ে আছে। নীল রান্নার সব কিছু নিজের আয়ত্তে নিয়ে জানায় ও রান্না করবে। চিংমে না করলেও নীল শুনেনি রাহাকে পাশে বসিয়ে নিজের মতো করছে। চিংমে কে আশ্বাস দিয়ে বলেছে ও ভালো করে রাঁধবে।একসময় মহিলা দুহাত মাথায় দিয়ে বলে উঠল,
— হায় রে! এই পোলা তো পাজি একটা! একটা কথাও শুনতেছে না!
কয়েক মুহূর্ত দাঁড়িয়ে থেকে অবশেষে হাল ছেড়ে দিল।
— যা ইচ্ছা করুক। আমি আর পারুম না।
বিড়বিড় করতে করতে রান্নাঘর ছেড়ে বেরিয়ে গেল চিংমে। চিংমে চলে যেতেই রাহা বিরক্ত মুখে নীলের সামনে এসে দাঁড়াল।
— নীল, করছো কী তুমি?
নীল মাথা না তুলেই মাংস কাটতে কাটতে বলল,
— রান্না করছি।
— সেটা তো দেখতেই পাচ্ছি! কিন্তু তুমি কেন রান্না করছো?
কথা শেষ হওয়ার আগেই নীল পাশের খালি পিঁড়িটার দিকে ইশারা করল।
— বসুন।
— কেন?
— বসুন আগে।
রাহা ভ্রু কুঁচকে কোনোরকম বসে পড়ে। নীল এবার নিচু স্বরে বলল,
— আমি জানি আপনি চিংমে আন্টির রান্না খেতে পারবেন না।
নীল মাংস কাটতে কাটতেই বলে চলল,
— দুপুরে যা খেয়েছেন, তাও খুব অল্প। তারপর থেকে আর কিছু খাননি।
নীল এবার রাহার দিকে তাকিয়ে বলে,
— তাই ভাবলাম আপনাকে নিয়ে নিজেই রান্না করি। অন্তত নিজের চোখে দেখবেন সবকিছু ফ্রেশ। তাহলে নিশ্চিন্তে খেতে পারবেন।
কথাগুলো শুনে রাহা কিছুক্ষণ স্থির হয়ে রইল।
অদ্ভুত একটা অনুভূতি বুকের ভেতর ছড়িয়ে পড়ছে। এই ছেলেটা ওর এত খেয়াল রাখে কেন?
কখন কী খেয়েছে, কতটুকু খেয়েছে, কী খেতে পারে, কী খেতে পারে না— সবকিছু কীভাবে এত ভালো মনে রাখে? মনের ভেতর প্রশ্নগুলো ঘুরপাক খেলেও মুখে কিছু প্রকাশ করে না।
উল্টো বিরক্তির ভাব এনে বলে,
— টুকটাক খাবার বানানো ছাড়া আমি কিন্তু রান্না করতে পারি না।
— জানি।
— তাহলে আমাকে এখানে বসিয়েছো কেন?
— রান্না করার জন্য না।
নীল হেসে বলে,
— শুধু পাশে বসে দেখার জন্য।
রাহা মুখ বাঁকিয়ে অন্যদিকে তাকাল। নীল তখন দক্ষ হাতে মোরগ দুটো টুকরো টুকরো করছে।
ছুরির ব্যবহার দেখে মনে হচ্ছে বহুদিনের অভ্যাস।
রাহা কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে বলল,
— ছোট হিসেবে তুমি বেশ ভালো রান্না পারো।
— পাহাড়ি রান্না বাদ দিলে চাইনিজ, ইতালিয়ান, থাই— মোটামুটি সব ধরনের রান্নাই পারি।
— এত রান্না শিখেছো কেন?
নীল কয়েক সেকেন্ড চুপ থাকে তারপর মাংসে মসলা মাখাতে মাখাতে বলল,
— কোনো এক রাজকন্যাকে রানীর হালে রাখব বলে।
রাহা হাতের কাছে থাকা পেঁয়াজ তুলে নেয়। কেন যেন উত্তরটা শুনে বুকের ভেতরটা অদ্ভুতভাবে নড়ে উঠে, তবুও স্বাভাবিক গলায় বলল,
— তোমার বউ অনেক লাকি হবে।
— কেন?
— তার কোনো রান্না করতে হবে না। সব তুমি করে দেবে।
নীল এবার কাজ থামিয়ে অদ্ভুত দৃষ্টিতে তাকায়।
— আমার বউ না।
— তাহলে?
— আমি লাকি হবো, তার মতো কেয়ারিং একজন মানুষকে পেলে।
রাহা পেঁয়াজের খোসা ছাড়াতে ছাড়াতে বলল,
— তুমি বিয়ে কয়টা করবে?
নীল থমকে যায়,
— মানে?
রাহা নির্বিকার মুখে বলল,
— এই কয়েক মাসেই তোমাকে অসংখ্য মেয়ের সঙ্গে ঘুরতে দেখেছি। তাই ভাবলাম হয়তো সবাইকেই বিয়ে করার পরিকল্পনা আছে।
কথাটা বলেই রাহা পেঁয়াজের দিকে মন দিল।
কিন্তু নীলের মুখে ধীরে ধীরে রহস্যময় হাসি ফুটে উঠল। ও আচ্ছা! এতক্ষণে ব্যাপারটা বুঝেছে সে।
আজকের এত কথা বলার মূল উদ্দেশ্য আসলে অন্য কিছু। কুচুটে মহিলা তাকে খোঁচা মারছে।
নীল কিছু না বলে লাকড়ি নিয়ে চুলা জ্বালাতে ব্যস্ত হয়ে যায়। কয়েক মিনিট পর হঠাৎ ক্ষীণ একটা শব্দ শুনে পাশ ফিরে তাকায়।
তারপর দৃশ্যটা দেখে হাসি চেপে রাখতে কষ্ট হলো।
একটা পেঁয়াজ কাটতে গিয়ে রাহার অবস্থা করুণ।
চোখ দিয়ে টপটপ করে পানি পড়ছে।
নাকও লাল হয়ে গেছে। মুখটা কুঁচকে আছে। অথচ এই সময়ে নীল পুরো চিকেনে মসলা মাখিয়ে ফেলেছে, পেঁয়াজ কুচিও শেষ। নীল হাত বাড়িয়ে রাহার হাত থেকে পেঁয়াজটা কেড়ে নিল।
— কে বলেছে পাকনামি করে পেঁয়াজ কেটে চোখের পানি আর নাকের পানি এক করতে?
মোটেও না নীল যেমন করে বলছে এমন কিছুই হয়নি। রাহা সঙ্গে সঙ্গে প্রতিবাদ করে বলে
— শুধু চোখ জ্বালা করছে!
— হুম।
রাহা ভ্রু উঁচু করে বলে,
— আর কী বললে? পাকনামি? এসব কি ভাষা?
নীল হাসি চেপে বলে,
— খুব উচ্চস্তরের ভাষা। আপনি বুঝবেন না।
— আমি বুঝব না?
— না।
— বেয়াদব।
নীল আর উত্তর দিল না, চুলার আগুনে ফুঁ দিতে লাগল। রাহা কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে বলে,
— এগুলোও পারো দেখছি। চুলা জ্বালানো, লাকড়ি সাজানো...
— এটা আগে পারতাম না—গত বছর ভার্সিটির পিকনিকে গিয়ে শিখেছি অনেক কষ্টে।
চুলার আগুন তখন ধীরে ধীরে জ্বলে উঠেছে।
আর সেই আলোয় রাহার মুখে ফুটে ওঠা চাপা হাসিটাও স্পষ্ট দেখা যাচ্ছিল। তবে সেটা নীল এর অগোচরে রয়ে যায়।
..............................................
— মা! মা, যেও না!
— আম্মি... যেও না!
— কিছু হবে না আমার। তোমরা এখানে বসে থাকো। আমি দেখে আসছি। কেউ গাড়ি থেকে বের হবে না, ঠিক আছে?
পরক্ষণেই এক বিকট বিস্ফোরণের শব্দে চারপাশ কেঁপে ওঠে।
— মাআআআ!!
— রাহা! রাহা, কী হয়েছে?
হঠাৎ চিৎকার করে উঠে বসে রাহা। বুক ধড়ফড় করছে, কপাল ঘামে ভিজে গেছে। মাথার ভেতর অসংখ্য শব্দ একসাথে বাজছে। অন্ধকার ঘরের দিকে ফাঁকা চোখে তাকিয়ে কিছুক্ষণ বুঝতেই পারল না কোথায় আছে।
নীল দ্রুত এগিয়ে এসে দু'হাতে ওর কাঁধ চেপে ধরে বলে,
— শান্ত হন। কিছু হয়নি।
এক গ্লাস পানি এগিয়ে দেয় নীল। কাঁপা হাতে গ্লাসটা নিয়ে ধীরে ধীরে পানি খায় রাহা।
ঘুমানোর আগে থুইসিংয়ের সঙ্গে কথা বলতে চেয়েছিল, কিন্তু লোকটা স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে— আজ আর কোনো কথা নয়, রাতটা থেকে সকালে চলে যেতে। তাই আর বিষয়টা এগোয়নি।
বাড়ির বড় ঘরটায় রুদ্র আর নীলের জন্য থাকার ব্যবস্থা করা হয়েছিল। পাশের ছোট ঘরটায় ছিল রাহা। কিন্তু বিছানায় শোয়া হয়নি ওর। চিন্তার ভারে ডুবে চেয়ারে বসে থাকতে থাকতে কখন যে ঘুমিয়ে পড়েছিল, মনে নেই।
রাহা ঘুমানোর পরে নীলই ওকে কোলে তুলে বিছানায় শুইয়ে দিয়েছিল। অচেনা জায়গায় রাহাকে একা রেখে যেতে মন সায় দেয়নি তাই নিজেও ঘরে থেকে গিয়েছিল। মাঝেমধ্যে বাইরে গিয়ে রকির সঙ্গে কাজের অগ্রগতি নিয়ে কথা বলেছে। নেটওয়ার্কও ঠিকমতো পাওয়া যাচ্ছিল না। এমন সময় হঠাৎ রাহার আতঙ্কিত চিৎকার শুনে ছুটে এসেছে নীল।
মেয়েটা আবারও কোনো ভয়ংকর স্বপ্ন দেখেছে।
কিছুটা শান্ত হওয়ার পরও রাহার চোখে ঘোর লেগে ছিল। ফিসফিস করে বলল,
— পিল দাও...
নীলের ভ্রু কুঁচকে বলে,
— পিল নেই, রাহা। এখানে থাকার পরিকল্পনা ছিল, তাহলে সঙ্গে আনেননি কেন?
কথাটা শুনে ধীরে ধীরে বাস্তবে ফিরে আসে রাহা। কয়েক সেকেন্ড স্থির দৃষ্টিতে নীলের দিকে তাকিয়ে থেকে শান্ত স্বরে জিজ্ঞেস করে,
— কয়টা বাজে?
— প্রায় চারটা। ভোর হতে বেশি দেরি নেই।
রাহা মনে করার চেষ্টা করল। রাত একটা নাগাদ এই ঘরে এসেছিল। তারপর কত কিছু ভেবেছে, কত প্রশ্নের উত্তর খুঁজেছে— কিছুই মনে নেই। শুধু মনে আছে চেয়ারে বসেছিল।
কিন্তু এখন রাহা বিছানায়।
অবশ্য উত্তরটা আন্দাজ করতে কষ্ট হলো না।
নীল!! গভীর একটা শ্বাস নিয়ে উঠে দাঁড়ায় রাহা।
নীলও সঙ্গে সঙ্গে সোজা হয়ে বসে বলল,
— কোথায় যাচ্ছেন?
— বাইরে।
এক মুহূর্তও না থেমে দরজার দিকে হাঁটা ধরে রাহা। নীলও পিছু নিল।
বাইরে বেরিয়ে উঠোনে দাঁড়াতেই ঠান্ডা ভোরের বাতাস মুখে এসে লাগল। রাহা চোখ বন্ধ করে গভীর শ্বাস নিল। উফ... অনেকটা হালকা লাগছে।
পকেট থেকে ফোন বের করে সময় দেখল— সাড়ে চারটা। আকাশের পূর্ব দিগন্তে ফিকে আলো ফুটতে শুরু করেছে। চারপাশে পাহাড়ি গ্রামের নিস্তব্ধতা, দূরে কোথাও ভোরের পাখির ডাক।
কিছুক্ষণ এদিক-ওদিক হাঁটার পর থুইসিংয়ের ঘরের দরজা খুলে লোকটা বাইরে বেরিয়ে এসে একবার রাহার দিকে তাকায়। তারপর ধীর পায়ে এগিয়ে যায় রাহাও আর দেরি করল না। দু'জনে পাশাপাশি হাঁটতে শুরু করল। কিছুটা দূরে দাঁড়িয়ে সবকিছু দেখছিল নীল। তারপর নীরবে পকেটে দুই হাত গুঁজে তাদের পেছনে হাঁটা ধরল। যথেষ্ট দূরত্ব বজায় রেখে।
তবু চোখের আড়াল হতে দিল না রাহাকে।
— বিদেশ থেকে উচ্চশিক্ষা নিয়ে ফিরেছো। দেশের জন্য কিছু করবে, বাবার আর ভাইয়ের পাশে থাকবে— সেটাই তো আশা ছিল। তা না করে এসবের পেছনে নিজের সময় নষ্ট করছো কেন?
থুইসিংয়ের কথায় রাহা ঠোঁটের কোণে তাচ্ছিল্যের হাসি টেনে বলল,
— আপনিও তো একজন শিক্ষিত মানুষ হয়ে এইখানে পড়ে আছেন, শিক্ষা কিছুই নির্ধারন করে না। আর সময় আমি নষ্ট করিনি, নষ্ট করেছেন আপনারা। আমার শৈশব অন্য বাচ্চাদের মতো হাসি-খেলায় কাটেনি। হাসপাতালের সাদা দেয়াল, ওষুধের গন্ধ আর অসহ্য যন্ত্রণার মাঝেই কেটেছে, আপনারা আরো আগে সব করলে আজ ঘুমের জন্য কোন মাধ্যমের প্রয়োজন হতো না।
কিছুক্ষণ নিরবতার পর থুইসিং দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে,
— ফিরে যাও, মনি। এসবের মধ্যে জড়িয়ে নিজের বাকি জীবনটাও নষ্ট করো না। তোমার মায়ের মতো ভুল করো না।
অনেকটা পথ হেঁটে এসে রাহা থেমে যায়। পাহাড়ি বাতাসে তার চুল উড়ে যাচ্ছে, কিন্তু চোখদুটো অটল।
— আমার মা কোনো ভুল করেননি। তিনি শুধু মানুষের ওপর হওয়া অন্যায়টা ঠিক করতে চেয়েছিলেন।
থুইসিং মৃদু হেসে মাথা নেড়ে বলে,
— চেয়ে কী হয়েছে বলো? কিছুই তো করতে পারেনি। উল্টো অল্প বয়সে ভালোবাসায় ভরা একটা সুন্দর জীবন হারিয়ে ফেলতে হয়েছে তাকে।
রাহার চোখে মুহূর্তেই কঠোরতা নেমে আসে।
— মা পারেননি, কারণ তিনি নিষ্ঠুর হতে পারেননি। কিন্তু আমি পারব। প্রয়োজন হলে ওদের পুরো দলটাকেই ধ্বংস করে দেব।
— একটা ছোট দলকে শেষ করে কী হবে? এর মাথাটা কি শেষ করতে পারবে?
রাহা কয়েক সেকেন্ড চুপ করে রইল। তারপর দৃঢ় কণ্ঠে বলল,
— পৃথিবীর কারও ভাগ্যে কী আছে, কে বাঁচবে আর কে মরবে— তাতে আমার কোনো আগ্রহ নেই। আমি শুধু আমার মায়ের মৃত্যুর বিচার চাই। তার রক্তের হিসাব চাই।
থুইসিংয়ের মুখটা ভারী হয়ে উঠল।
— তোমার মা খুব ভালো মানুষ ছিলেন। আমার মতো সাধারণ একজন মানুষকে শহরে নিয়ে গিয়ে মাথা গোঁজার ঠাঁই দিয়েছিলেন। ভালো চাকরি দিয়েছিলেন। সবকিছু ঠিকই ছিল। কিন্তু মানুষের উপকার করতে গিয়েই শেষ পর্যন্ত নিজের জীবনটা হারালেন। তোমাদের এখানে আসাই উচিত হয়নি। তোমার বাবাকেও আমি নিষেধ করেছিলাম, কিন্তু তিনি শোনেননি।
রাহা কিছুক্ষণ নীরব থেকে বলে,
— বাবা আসতে চাননি। আমি চেয়েছি। কারণ এটা শুধু আমার ইচ্ছা না, আমার মায়ের স্বপ্নও।এখানকার অনেক কিছু বদলেছে, আধুনিক হয়েছে। কিন্তু চিকিৎসা ব্যবস্থা এখনও অনেক পিছিয়ে। আমি সেটা বদলাতে চাই।
— কী করতে চাও?
— প্রথমে একটা ফাইভ-স্টার হোটেল তৈরি করব। তারপর সেই হোটেলের আয় দিয়ে একটা হাসপাতাল চালানো হবে, যেখানে পাহাড়ের বাচ্চারা বিনামূল্যে চিকিৎসা পাবে। আজ আমরা সাহায্য করতে পারি, কিন্তু ভবিষ্যৎ প্রজন্মও করবে— তার কোনো নিশ্চয়তা নেই। তাই আমি আর বাবা এমন একটা ব্যবস্থা করতে চাই, যাতে হাসপাতালটা নিজের খরচ নিজেই বহন করতে পারে। একদিকে মানুষের বিনোদন হবে, অন্যদিকে মানুষের জীবন বাঁচবে।
থুইসিং গভীর দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলে,
— সবই বুঝলাম। কিন্তু তোমার কি মনে হয়, ওরা তোমাকে বাধা দেবে না?
রাহা মৃদু হেসে বলে,
— বাধা অনেক আগেই শুরু হয়েছে। ব্যক্তিগত আক্রমণও করেছে। তবে এবার আমি কঠিন সুরক্ষা ব্যবস্থা করবো যাতে পরবর্তীতে কোন সমস্যা না হয়।
থুইসিং মাথা নাড়ল।
— তুমি ভীষণ জেদী মেয়ে। দেখা যাক, তুমি কতদূর যেতে পারো। আমার অনুমোদন সময়মতো পৌঁছে যাবে।
রাহার মুখে প্রথমবারের মতো হালকা প্রশান্তি ফুটে উঠে।
— ধন্যবাদ। এটুকুই আমার জন্য যথেষ্ট।
— আজই চলে যাবে?
— হ্যাঁ। কিছুক্ষণের মধ্যেই রওনা দেব। ওখানে অনেক কাজ পরে আছে।
থুইসিং আড়চোখে রাহার দিকে তাকায়।
মেয়েটা একটিবারও আবেগে ভাসল না। মায়ের কথা বলল, মৃত্যুর কথা বলল, প্রতিশোধের কথা বলল, স্বপ্নের কথা বলল— তবুও কণ্ঠে কোনো কম্পন নেই।
ভোরের আলো ধীরে ধীরে পাহাড়ের গা বেয়ে ছড়িয়ে পড়ছে। দূরের মেঘগুলো গোলাপি আভা ধারণ করেছে। চারপাশে এক অদ্ভুত প্রশান্তি, অথচ ওদের কথোপকথনের ভেতর জমে আছে বহু বছরের যন্ত্রণা, হারিয়ে যাওয়া মানুষদের স্মৃতি আর অসমাপ্ত লড়াইয়ের ভার।
কিছুদূর এগিয়ে যাওয়ার পর থুইসিং পিছনে তাকায়। নীল এখনো ওদের অনুসরণ করছে।
না খুব কাছে, না খুব দূরে। এতটুকু দূরত্বে, যেখান থেকে প্রয়োজনে এক মুহূর্তে ছুটে আসা যায়।
থুইসিংয়ের চোখে ক্ষীণ হাসি ফুটে উঠে,
— দেখেছো? এতক্ষণ ধরে আমাদের সাথে হেঁটে চলেছে নীরবে।
রাহাও পিছনে তাকায়। নীল মাথা নিচু করে হাঁটছে। দুই হাত পকেটে গোঁজা। দূর থেকেও বোঝা যায় সমস্ত মনোযোগ রাহার ওপর। এক মুহূর্তের জন্যও চোখের আড়াল করতে রাজি নয় ছেলেটা। অকারণেই বুকের ভেতর অদ্ভুত একটা অনুভূতি জেগে উঠে রাহার। তবে পরক্ষণেই সে অনুভূতিটাকে চেপে ফেলে বলে,
— ও এমনই।
— এমনই মানে?
— কাছের মানুষদের নিয়ে বাড়াবাড়ি রকমের চিন্তা করে।
থুইসিং মৃদু হেসে মাথা নেড়ে বলে,
— সব মানুষ সেটা পারে না।
— ও আমার ছোট ভাইয়ের বন্ধু।
থুইসিং আর কিছু বলে না। কিন্তু তার অভিজ্ঞ চোখ বলছে, বিষয়টা এত সহজ নয়।
থুইসিং মাটির দিকে তাকিয়ে ধীর স্বরে বলল,
— ছোট ভাইয়ের বন্ধু বলে কি মানুষকে ছোট করে দেখা যায়, মনি?
রাহা ভ্রু সামান্য কুঁচকে তাকায়।
— আমি ছোট করে দেখছি না। তবে বাস্তবতা তো বাস্তবতাই। ও আমার চেয়ে অনেক ছোট।
থুইসিং মৃদু হেসে বলে,
— বাস্তবতা সব সময় সংখ্যায় মাপা যায় না। বয়স মানুষের পরিপক্কতা নির্ধারণ করে না, দায়িত্ববোধ করে।
রাহা কিছু বলে না, লোকটা আবার বলতে শুরু করল। থুইসিংয়ের গলা একটু ভারী হয়ে আসে,
— তোমাকে দেখে তোমার মায়ের কথাই মনে পড়ে। জেদ, সাহস, চোখের দৃষ্টি... সবই এক। শুধু একটা জিনিস আলাদা।
রাহা চুপ থাকে থুইসিং আবারো বলে,
— তোমার মা মানুষের ভালো দিকটা আগে দেখতেন। আর তুমি মানুষের খারাপ দিকটা আগে দেখো।
কথাটা শুনে রাহা মৃদু হেসে ফেলে, সেই হাসিতে আনন্দ নেই, আছে দীর্ঘ ক্লান্তি।
— কারণ আমি আমার মায়ের পরিণতি দেখেছি।
থুইসিং চুপ হয়ে যায়, রাহা আবার বলে,
— মানুষকে বিশ্বাস করে তিনি কী পেয়েছিলেন? বিশ্বাসঘাতকতা। ভালো করতে গিয়ে কী পেয়েছিলেন? মৃত্যু। আমি সেই ভুল করবো না।
— সবাই এক রকম নয়, মনি।
— আমি সেটা জানি। তবু কাউকে জীবনের কেন্দ্রবিন্দু বানানোর মতো বোকামি করবো না।
থুইসিং এবার আর কিছু বলে না কারণ বুঝতে পারছে এই কথাগুলো কোনো তর্ক না। এগুলো একজন মেয়ের বুকের ভেতরে বহু বছর ধরে জমে থাকা ভয়, যে মেয়ে ছোটবেলায় মাকে হারিয়েছে, হাসপাতালে বড় হয়েছে, প্রতিশোধ আর দায়িত্বের ভার নিয়ে বেঁচে আছে— তার কাছে ভালোবাসা বিলাসিতা মনে হওয়াটাই স্বাভাবিক।
রুদ্র ঘুম থেকে উঠে আড়মোড়া ভেঙে চারপাশে তাকায়। নীলকে কোথাও না দেখে বাইরে বেরিয়ে আসে। উঠানে পা রাখতেই তার চোখ বড় বড় হয়ে যায়। হাই তোলার জন্য খোলা মুখটাও বন্ধ করতে ভুলে গেল সামনে দৃশ্য দেখে।
ফেরার পথে নীল রাহা আর থুইসিংয়ের সাথেই হেঁটেছে। কৌতূহলবশত থুইসিংকে আশপাশের নানা বিষয় জিজ্ঞেস করছিল সে। তবে কথা বলতে বলতে তার নজর বারবার রাহার দিকেই চলে যাচ্ছিল।
আনমনে হাঁটতে গিয়ে হঠাৎ হোঁচট খেয়ে রাহার জুতো ছিঁড়ে যায়। নীল দ্রুত হাত বাড়িয়ে তাকে সামলে নেয়। আগেও কয়েকবার উঁচুনিচু রাস্তায় রাহার পা মচকে যাওয়ার উপক্রম হয়েছিল, এবার জুতোটাই শেষ পর্যন্ত ছিঁড়ে গেল।
রাহা নির্বিকারভাবে নীলের হাত সরিয়ে জুতো খুলে পাশে ছুড়ে ফেলে।
— যে জিনিস দরকারের সময় কাজে আসে না, সেটা রেখে কী হবে?
বলে খালি পায়েই হাঁটতে শুরু করে। কিন্তু দু'পা এগোতেই নীল রাহাকে কোলে তুলে নেয়।
রাহা কিছু বলার আগেই নীল বলে,
— রাতে একটু বৃষ্টি হয়েছে। এখানে অনেক জোঁক থাকে। খালি পায়ে হাঁটা ঠিক হবে না।
রাহা বিরক্ত হলেও আর তর্ক করল না। উঠানে এসে নীল ওকে নামিয়ে দেয়। তারপর রুদ্রর দিকে তাকিয়ে বলে,
— মুখ বন্ধ করেন, পোকা ঢুকে যাবে।
রুদ্র এখনও হতভম্ব। সে কিছুতেই বুঝতে পারে না এই পরিবারের সম্পর্কের হিসাব। যে ভাইয়ের সাথে সেদিন এনগেজমেন্ট হলো, সে অন্য একজনকে ঘিরে থাকে। আর ছোট ভাইটাও সেই ভাইয়ের হবু বউয়ের আশপাশেই ঘোরে। রুদ্র সবই দেখেছে।
মনে মনে শুধু একটাই কথা আসে—
"হোয়াট এ ফ্যামিলি!"
এরপর চিংমের বানানো পিঠা খেয়ে বেশিক্ষণ দেরি না করে রাহা, নীল আর রুদ্র বিদায় নেয়।
যাওয়ার আগে চিংমে নিজের হাতে বানানো একমুঠো চুড়ি রাহার হাতে পরিয়ে দিয়ে বলে,
— ডাক্তার আপাও এমন চুড়ি পছন্দ করতেন।
রাহা আর চুড়ি— দুটোর মধ্যে বিশেষ কোনো সম্পর্ক নেই। তবুও হাসিমুখে চুড়িগুলো পরে নেয়।
রাহা বুঝে ওঠার আগেই নীল তার হাত ধরে একটু উঁচু করে কয়েকটা ছবি তুলে ফেলে। রাহা চোখ রাঙাতেই হাত ছেড়ে দেয়।
ফেরার সময়ও নীলের জেদ কমেনি। সুযোগ পেয়েই রাহাকে কোলে তুলে নিয়েছে। পাহাড়ি রাস্তা পার হয়ে মূল সড়ক পর্যন্ত, তারপর গাড়িতে ওঠা-নামা— সব জায়গাতেই একই অবস্থা।
বাসে সিট পাওয়ার পরও রাহাকে নিয়ে বসতে চেয়েছিল। কিন্তু রাহার মুখের ভাব দেখে আর সাহস করেনি। কারণ নীল জানে, বেশি বাড়াবাড়ি করলে মিস রাহা ম্যাম মান-সম্মানসহ সবকিছুর ব্যবস্থা করে দিতে পারেন।
বাস থেকে নেমে ফার্মহাউসে যাওয়ার জন্য একটা ট্যাক্সি নেয় ওরা। পথে একটি ছোট দোকান থেকে সাধারণ একটা স্লিপার কিনে পরে নেয় রাহা।
দুপুর নাগাদ বাড়ি পৌঁছে যায় সবাই। রাহা বাড়ির ভেতরে ঢুকতেই কেউ তার হাত ধরে টেনে নিজের বুকের কাছে নিয়ে আসে।
আকস্মিক ঘটনায় রাহা থমকে যায়। পরমুহূর্তেই মানুষটাকে চিনতে পেরে রাহার দৃষ্টি গিয়ে থামে একটু দূরে দাঁড়িয়ে থাকা নীলের ওপর।
তারপর ধীরে বলে ওঠে,
— সামিন...
চলবে...