ফন্ট সাইজ:
থিম:
প্রনয়ের প্রলয়

৫২তম পর্ব

লেখক: মেহরিমা সারা

#প্রনয়ের_প্রলয় 

#মেহরিমা_সারা 
পর্ব ৫১. (প্রথমাংশ)
হঠাৎ নিশার এমন কাণ্ডে উপস্থিত সবাই থমকে গেল। এক মুহূর্তের জন্য কেউ বুঝতেই পারল না কী ঘটল। পরক্ষণেই রাহা আর ইরা দ্রুত এগিয়ে গিয়ে নিশাকে আগলে ধরল। মেয়েটার পুরো শরীর যেন নিস্তেজ হয়ে এসেছে। চোখদুটো আধখোলা, মুখে কোনো রক্তিম আভা নেই।
ইরার দিকে আধো খোলা চোখে একবার তাকিয়েই নিশা নিজের গায়ে রাখা ইরার হাতটা আস্তে করে সরিয়ে দিল। রাহা বুঝতে পারল, তাই নিশাকে নিজের দিকে সামান্য টেনে এনে মাথায় আলতো করে হাত রেখে নিচু স্বরে বলল,
— নিজেকে সামলাতে শিখো, নিশা... এখন ভেঙে পড়ার সময় না।
রাহার কণ্ঠে আদেশের কঠোরতা থাকলেও ভেতরে ছিল গভীর মমতা। এদিকে গ্রামের কয়েকজন মহিলা তাড়াতাড়ি এগিয়ে এলেন। নিশাকে আগলে পাশের ঘরে নিয়ে গিয়ে দু'জন মিলে পরিষ্কার করে পোশাক পরিবর্তন করে দিলেন, যেহেতু এখানের সবাই শাড়ি পেঁচিয়ে পড়ে তাই নিশাকে শাড়িই পড়ানো হলো। নিশা মহিলাদের তুলনায় চিকন হওয়ায় ব্লাউজ প্রায় খুলেই যাচ্ছে। কোনরকম নিশাকে ঠিক করে বিছানায় বসায়। আরেকজন নিজের বিছানাটা ছেড়ে দিয়ে বললেন,
— মা, একটু শুইয়া থাকো। শরীরটা আগে ঠিক করো।
নিশাকে শুইয়ে দিয়ে সবাই ব্যস্ত হয়ে পড়ল।
ওদিকে সামিন নিজের শরীরে লেগে থাকা বমি পরিষ্কার করতে বাইরে চলে গেল। গ্রামেরই একজন লোক গায়ে হাসপাতালের পোশাক দেখে অবাক হয়ে হেসে বলল,
— আরে বাবা! হাসপাতালের পোশাক পইড়াই বিয়া করলা নাকি?
লোকটার কথা শুনে সামিন দীর্ঘশ্বাস ফেলল। তারপর নিজের অবস্থা দেখে নিজেই হেসে বলল,
— আমার মতো ইউনিক বিয়ে বোধহয় পৃথিবীতে আর কেউ করেনি। হাসপাতালের পোশাক পরে বিয়ে করেছি, কবুল বলার কয়েক মিনিটের মধ্যেই বউ আমার গায়ের ওপর বমি করে দিল! এত ইউনিক হয়েছে এখন নিজেরই মরণদশা!
সামিন এর কথা শুনে আশপাশের কয়েকজন হেসে উঠল। সামিনও কাপড় বদলে ঘরের ভেতরে ফিরে এলো। আইয়ুব কাজী তখন সবাইকে উদ্দেশ্য করে বললেন,
— আচ্ছা, এবার সবাই বাইরে যাও। নতুন বর-বউদের একটু একা থাকতে দাও।
তিনি ঘরের মালিকের সঙ্গে কথা বলে ঠিক করলেন, এই ঘরে সামিন নিশা কে থাকতে দেওয়া হবে। আর বাকিদের অন্য ঘরে রাখা হবে। ঠিক তখনই নীল চিল্লিয়ে বলে উঠল,
— মানে এটা কেমন বিচার হলো, কাজী সাহেব? একসাথে তিন-তিনটা বিয়ে পড়ালেন, আর বাসরঘর দিবেন মাত্র এক জোড়াকে? আমরা কী পাবলিক হয়ে থাকব নাকি?
নীলের কথা শুনে মুহূর্তেই চারপাশ নিস্তব্ধ হয়ে গেল। উপস্থিত সবাই একে অপরের মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। গ্রামের মহিলারা লজ্জায় শাড়ির আঁচল দিয়ে মুখ ঢেকে ফেললেন। কেউ হাসি চাপার চেষ্টা করছেন, কেউ আবার মাথা নিচু করে আছেন। রাহা দাঁতে দাঁত চেপে নীলের দিকে তাকিয়ে রইল। এই ছেলেটার লজ্জা-শরম বলে সত্যিই কিছু নেই! এত মানুষের সামনে নির্দ্বিধায় বাসরঘরের কথা বলছে! অন্যদিকে আদি আর সামিনও ড্যাবড্যাব করে নীলের দিকে তাকিয়ে আছে। যেন ওর মুখ থেকে আর কী বের হয়, সেটাই দেখার অপেক্ষা।
আইয়ুব কাজী কপালের ঘাম মুছে কষ্টে হাসি চেপে বললেন,
— বাবা, এই বাড়িতে তো মাত্র দুইটা ঘর। একটাতে তোমরা থাকবা, আরেকটাতে এদের পরিবারের লোকজন। তবে যদি এতই বাসরঘরের চিন্তা থাকে, তাইলে আমার বাড়ি চলো। আলহামদুলিল্লাহ, ওখানে ঘরের অভাব নাই। মন চাইলে দুইটা না, তিনটাই বাসরঘর সাজায়া দিমু!
কাজীর কথা শুনে আশপাশে চাপা হাসির রোল পড়ে গেল। নীল যেন এই সুযোগটারই অপেক্ষায় ছিল। সঙ্গে সঙ্গে দাঁত বের করে হেসে রাহার হাত শক্ত করে চেপে ধরে হাঁটা শুরু করে দিল।
রাহা নীল এর হাতের ভেতর নখ বসিয়ে ফিসফিস করে বলল,
— থামবে?
কিন্তু নীল যেন শুনতেই পেল না। নিজের মতো করেই সামনে এগিয়ে চলল। ওদের দেখাদেখি বাধ্য হয়ে আদিও ইরার হাত ধরল। এই বাড়ি থেকে বেরিয়ে মাত্র সাত-আট কদম এগোলেই আইয়ুব কাজীর বাড়ি। সবাই সেখানেই চলে গেল।
বাড়িতে পৌঁছে কাজী সাহেব দুটি খালি ঘর দেখিয়ে বললেন,
— এই নাও, তোমাদের জন্য দুইটা ঘর। নিজেদের মতো ভাগ করে নাও।
কথা শেষ হতেই নীল আর এক মুহূর্তও দেরি করল না। রাহাকে নিয়ে সোজা একটি ঘরের দিকে হাঁটা ধরল। হঠাৎ পিছন থেকে আদি তার হাত চেপে ধরে থামিয়ে দিল। নীল ভ্রু কুঁচকে তাকাতেই আদি গম্ভীর মুখে বলল,
— সাত কোটি... মনে থাকে যেন?
এক মুহূর্তের জন্য নীলও বিব্রত হয়ে গেল। পরিস্থিতিটা বুঝতে পেরে ঠোঁট কামড়ে হাসি চেপে রাখল। কিন্তু পরের মুহূর্তেই যেন কিছুই হয়নি এমন ভাব করে আদির হাত ছাড়িয়ে দিল। তারপর কোনো কথাই আর কানে তুলল না। এক প্রকার জোর করেই রাহাকে নিয়ে ঘরের ভেতরে ঢুকে দরজাটা ভেতর থেকে টেনে বন্ধ করে দিল।
আদি কিছুতেই ভেবে পায় না—রাহার মতো এতটা গম্ভীর আর ব্যক্তিত্বসম্পন্ন একটা মেয়ে নীলের মতো এমন দুষ্টু, হাস্যরসপ্রিয় ছেলের প্রেমে পড়ল কীভাবে! দুজনকে একসঙ্গে দেখলেই তার মাথায় নতুন করে প্রশ্নের জন্ম হয়। নিজের মনেই বিরবির করে আদি বলল,
— ও আমার ভাই হয়ে এত নির্লজ্জ হলো কীভাবে?
আদির কথাটা কানে যেতেই ইরা ঘাড় বাঁকিয়ে দিকে তাকাল। ঠোঁটের কোণে দুষ্টু হাসি ফুটিয়ে কনুই দিয়ে হালকা একটা গুতো মেরে বলল,
— ওটাকে নির্লজ্জ না, রোমান্টিক বলে। তুমি নীলের ভাই হয়ে এত আনরোমান্টিক হলে কীভাবে?
আদি ভ্রু কুঁচকে চোখ দুটো সরু করে ইরার দিকে তাকিয়ে বলল,
— আমি আনরোমান্টিক?
ইরা একটুও না ভেবে দৃঢ় গলায় জবাব দিল,
— কোনো সন্দেহ নেই!
ইরার নির্ভীক উত্তর শুনে আদি মুখ দিয়ে দীর্ঘ, তপ্ত একটা নিশ্বাস ফেলল। নিজের সম্মান যেন মুহূর্তেই ধুলিসাৎ হয়ে গেল!
ঠিক তখনই পাশে দাঁড়িয়ে ছোট ছোট চোখে সবকিছু নীরবে উপভোগ করতে থাকা আইয়ুব কাজীর দিকে চোখ পড়ল তার। আদি তাকাতেই ভদ্রলোক বিগলিত হেসে মজার সুরে বললেন,
— উহুম! সবাই তো চইলা গেল বাবা। তোমরা দুইজন ক্যান এহনো দাঁড়াইয়া আছো? সকাল হইতে এহনো মেলা সময় বাকি আছে।
কথাটা শুনে আদির অসহায় লাগল। শেষ পর্যন্ত বাবার বয়সী একজন মানুষের কাছ থেকেও এমন খোঁচা শুনতে হবে—এটা সে কল্পনাও করেনি!
আর কোনো কথা না বলে আদি ধীরে ধীরে ইরার দিকে তাকাল। তারপর ঘাড়টা সামান্য কাত করে চোখের ইশারায় সামনের ঘরটার দিকে ইঙ্গিত করল।
_____________________________
ইরা ঘরে পা রাখতেই বুঝতে পারল—এখানে আসাটা বোধহয় ঠিক হয়নি। মুহূর্তের মধ্যেই বুকের ভেতর অদ্ভুত এক চাপা অস্বস্তি জমে উঠল। নিঃশ্বাস নিতেও যেন কষ্ট হচ্ছে। নার্ভাসনেসে নিজের অজান্তেই দু'হাত বারবার কচলাতে লাগল।
আদির সঙ্গে তার সম্পর্ক আজকের নয়। দীর্ঘদিনের পরিচয়, ভালোবাসা—সবই আছে। তবুও এতদিন তারা কখনো এভাবে একে অপরের এতটা কাছাকাছি আসেনি। মাঝে মাঝে একান্তে সময় কাটানোর সুযোগ এলেও তখন তো তারা স্বামী-স্ত্রী ছিল না। তাই দুজনেই অদৃশ্য একটা সীমারেখা কখনো অতিক্রম করেনি। কিন্তু আজ সবকিছু বদলে গেছে। আজ আদি আর শুধুই তার প্রিয় মানুষ নয়, সে তার স্বামী। ধর্মীয দিক থেকে তাদের সম্পর্ক নতুন এক পরিচয় পেয়েছে। ইরার ওপর আদির পূর্ণ অধিকার রয়েছে।
যদিও এই মুহূর্তে তেমন কিছু হওয়ার কোনো সুযোগ নেই, তবুও অজানা এক লজ্জা, এক অচেনা ভয় আর অদ্ভুত এক সংকোচ ইরার পুরো অস্তিত্ব জুড়ে নীরবে বসে গেল। অন্যদিকে আদি আড়চোখে ইরার প্রতিটি অস্থিরতা, প্রতিটি নার্ভাস ভঙ্গি নীরবে লক্ষ্য করছিল। মেয়েটার এই অস্বস্তি দেখে হঠাৎ তার মাথায় দুষ্টুমিভরা একটা বুদ্ধি খেলে গেল। কোনো পূর্বাভাস ছাড়াই আদি ইরার হাতটা ধরে নিজের দিকে টেনে নিল। আকস্মিক টানে ইরা ভারসাম্য হারিয়ে হড়বড় করে গিয়ে আদির প্রশস্ত বুকে আছড়ে পড়ল। হঠাৎ এমন ঘটনায় ইরার বুক ধুকপুক করে উঠল।
এক মুহূর্তের জন্য চোখে চোখ পড়তেই লজ্জায় তার দৃষ্টি কেঁপে উঠল। পরক্ষণেই তাড়াতাড়ি চোখ নামিয়ে মাথা নিচু করে ফেলল। আদি আরও একটু ঝুঁকে এল। দুজনের মাঝের দূরত্ব যেন নিঃশ্বাসের ব্যবধানেও রইল না।
ঠোঁটের কোণে দুষ্টু হাসি ফুটিয়ে আদি ইরার দিকে ঝুঁকে হাস্কিস্বরে বলে উঠলো,
— আমি কিন্তু লাইসেন্স পেয়ে গেছি।
ইরা অবুঝ কণ্ঠে জিজ্ঞেস করল,
— কিসের লাইসেন্স?
আদি মুচকি হেসে বলল,
— ফরজ কাজ করার লাইসেন্স।
— মানে? কী বলছ?
আদি দুষ্টুমিভরা চোখে ইরার দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর শান্ত গলায় বলল,
— এখন বুঝবে না। পরে সময় নিয়ে, পুরো দায়িত্বসহকারে সব বুঝিয়ে দেব।
ইরা এলোমেলো দৃষ্টিতে চারদিকে তাকাল। উঁহু... বুঝবে না নাকি!' মনে মনে ঠোঁট বাঁকিয়ে প্রতিবাদ করল সে। সে কি আর এতটাই কচি খুকি? সবই বুঝছে। আদির কথার প্রতিটা ইঙ্গিত তার অজানা নয়। শুধু ইচ্ছে করেই না বোঝার ভান করছে।
কারণ ইরা খুব ভালো করেই জানে, একবার যদি নিজের বোঝার কথা স্বীকার করে ফেলে, তাহলে এতক্ষণ ভদ্র-সভ্য সেজে থাকা ছেলেটা মুহূর্তের মধ্যেই আরও ভয়ানক দুষ্টু হয়ে উঠবে।
____________________________
— এই, ছাড়ো আমার হাত!
রাহা ঝটকা মেরে নীলের হাত থেকে নিজের হাত ছাড়িয়ে নিল। নীলও আর জোর করল না, শান্তভাবেই হাত ছেড়ে দিল। ঘরে ঢুকেই নীল প্রথমে দরজাটা ভেতর থেকে আটকে দিল। তারপর চারপাশে একবার চোখ বুলিয়ে নিল। মাঝখানে একটা নড়বড়ে, পাতলা কাঠের খাট। একপাশে তিন-চারটা চেয়ার, তার মধ্যে একটা আবার ভাঙা পায়ের ভরসায় কোনোমতে দাঁড়িয়ে আছে।
দৃশ্যটা দেখে বিরক্তিতে মুখ কুঁচকে নীল বিড়বিড় করে বলল,
— ধুর! এই বালের খাট তো মনে হয় একবারে ভেঙে পড়বে।
কথাটা বলেই রাহার দিকে তাকাতেই দেখল, মেয়েটা কটমট করে তার দিকেই তাকিয়ে আছে।
মুহূর্তেই মুখের বিরক্তি সরিয়ে নীল একেবারে নিষ্পাপ চেহারা বানিয়ে ধীরে ধীরে রাহার সামনে এসে দাঁড়াল। ঠোঁটের কোণে মুচকি হাসি টেনে বলল,
— কংগ্র্যাচুলেশন, বউ!
রাহার চোখ যেন রাগে জ্বলে উঠল।
— কংগ্র্যাচুলেশন মাই ফুট! তোমাকে আমি... তোমাকে আমি...
বাকিটা আর বলতে পারল না। যতই রাগ হোক, এখন নীল ধর্মীয়ভাবে রাহার... মুখে "মেরে ফেলব" ধরনের কথা উচ্চারণ করতেও নিজের মন বাধা দিল। নিজের রাগটা কোনোভাবে সংযত করে দাঁতে দাঁত চেপে বলল,
— ঘড়ির বিনিময়ে বিয়ে করা! এসব আজব কাণ্ড শুধু তোমার দ্বারাই সম্ভব।
নীল বাঁকা হেসে উত্তর দিল,
— আমার মতো সৌভাগ্যবান আর কে আছে বলো? যার বউ কিনা স্বামীর প্রতিটা কাজ বলার আগেই বুঝে ফেলে।
কথা বলতে বলতেই নীল এক পা, এক পা করে এগিয়ে আসতে লাগল। রাহা সঙ্গে সঙ্গে উদ্দেশ্য বুঝে পিছিয়ে গেল। নীল আবারও এগোতেই রাহা আরেক ধাপ পিছিয়ে আঙুল তুলে কঠোর গলায় বলে উঠল,
— নাটক বন্ধ করো। আজ সত্যিটা বলবে। আমার সাইন কীভাবে নিয়েছ? কখন নিয়েছ?
রাহার প্রশ্নকে সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে নীল আচমকাই নিজের বুকে টেনে নিল। রাহা সঙ্গে সঙ্গে ধাক্কা দিয়ে নিজেকে ছাড়ানোর চেষ্টা করল। কিন্তু নীলের শক্ত বাহুর বাঁধন একটুও আলগা হলো না। নীল মুখটা রাহার ঘাড়ের কাছে নিয়ে গভীর করে একটা নিশ্বাস টেনে নিল। তারপর জড়ানো, নিচু স্বরে বলল,
— যেদিন তুমি আমার অধিকার অন্য কাউকে দিয়ে দিতে চেয়েছিলে... সেদিনই নিয়েছিলাম।
রাহা ভ্রু কুঁচকে অবাক হয়ে বলল,
— মানে?
নীল রাহার ঘাড়ে আলতো একটা শুকনো চুমু এঁকে দিয়ে বলল,
— যেদিন হঠাৎ করে ভাইয়ার সঙ্গে তোমার এনগেজমেন্ট হলো... তার পরের দিনই হাসপাতালে তোমার আঙুলের ছাপ নিয়েছিলাম।
রাহার বিস্ময়ের যেন শেষ রইল না।
— কিন্তু তুমি তো তখন জ্বরে অসুস্থ ছিলে! হাসপাতালে ভর্তি ছিলে! তাহলে কাগজপত্র তৈরি করলে কখন?
নীল মনে মনে রাহাকে আরও কয়েকবার আদর করে ফেলল। হালকা হেসে বলল,
— যার চিন্তায় জ্বর এসেছিল তাকে নিজের না করা পর্যন্ত যে সুস্থ হতাম না। তাই তো রাতের মধ্যেই পেপার রেডি করে ফেললাম। 
মুহূর্তেই সবকিছু পরিষ্কার হয়ে গেল রাহার কাছে।সেদিন শানের কথা বলে কাগজে আঙুলের ছাপ নেওয়া... তাকে অজ্ঞান করে রাখা... সবকিছুই ছিল নীলের সাজানো পরিকল্পনা। আসল উদ্দেশ্য ছিল কন্ট্রাক্ট ম্যারেজের কাগজে আঙুলের ছাপ নেওয়া। রাহা স্তব্ধ হয়ে গেল। একটা মানুষ কতটা ধূর্ত, আর কতটা শয়তান হলে এত নিখুঁত পরিকল্পনা করতে পারে—সেটা নীলকে না দেখলে হয়তো কোনোদিন বিশ্বাসই করত না।
এরই মধ্যে নীল ধীরে ধীরে রাহার চুলগুলো এক পাশে সরিয়ে দিল। তারপর শার্টের কলারের ওপর দিয়েই আলতো করে কাঁধে দাঁত বসিয়ে দিল। রাহা বিরক্তিতে নীল কে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দিল।
— এই! ওই সময় তো বড় বড় কথা বলে সাত কোটি টাকা কাবিন লিখিয়েছিলে। আগে টাকা দাও। টাকা না দিয়ে আমার ধারেকাছেও আসবে না।
নীল বিরক্তিতে মুখ কুঁচকে বলল,
— আরে ধুর! কিসের টাকা? বাড়ি গিয়ে একটা চেক লিখে দিলেই তো হয়ে যাবে।
রাহা ঠোঁট বাঁকিয়ে তাচ্ছিল্যের হাসি হাসল।
— নিজেকে খুব চালাক ভাবো, তাই না? আঙ্কেল তোমার সব ব্যাংক অ্যাকাউন্ট, সব ক্রেডিট কার্ড বন্ধ করে দিয়েছেন। তাই এবার সাত কোটি টাকা তোমাকেই জোগাড় করতে হবে।
কথাটা শুনেই নীলের মুখের হাসি মুহূর্তে মিলিয়ে গেল। অবিশ্বাসের দৃষ্টিতে রাহার দিকে তাকিয়ে বলল,
— মানে... কী বললে?
নীলের মুখের অবস্থা দেখে রাহা মনে মনে একদফা হেসে ফেলল।
— মানুষকে নিজের পায়ে কুড়াল মারতে দেখেছি। কিন্তু কুড়ালের ওপর নিজেই পা মারতে আজ প্রথম তোমাকেই দেখলাম।
___________________
সামিনের বুকটা প্রচণ্ড ব্যথা করছে। এত বড় একটা অপারেশনের পর দীর্ঘক্ষণ একই ভঙ্গিতে বসে থাকাটা কষ্টকর। অথচ নিশা যেন সেসবের কিছুই খেয়াল করছে না। কখনো চুপচাপ মাথা নিচু করে বসে থাকে, আবার হঠাৎ করেই ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কেঁদে ওঠে। প্রায় এক ঘণ্টা ধরে একই দৃশ্য দেখে শেষ পর্যন্ত বিরক্ত হয়ে সামিন ঠোঁট বাঁকিয়ে টিপ্পনী কাটল,
— এবার বুঝলাম, বাংলাদেশে এত বন্যা কেন হয়!
কান্নার মাঝেই নিশা ভেজা চোখ তুলে সামিন এর দিকে তাকাল। বিস্ময়ভরা দৃষ্টিতে জিজ্ঞেস করল না, কিন্তু চোখদুটোতেই প্রশ্ন স্পষ্ট। সামিন মনে মনে হেসে ফেলল। আজব মেয়ে একটা! তারপর গম্ভীর মুখে বলল,
— তোমাদের মতো মেয়েদের চোখের পানিতেই তো বন্যা হয়। অথচ দোষ হয় বৃষ্টির।
নিশা নাক টেনে নিষ্পাপ গলায় জিজ্ঞেস করল,
— বৃষ্টি কে?
প্রশ্নটা শুনে সামিন কয়েক সেকেন্ড নির্বাক হয়ে নিশার দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর দীর্ঘশ্বাস ফেলে নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে বলল,
— আমার এক্স গার্লফ্রেন্ড।
মুহূর্তেই নিশার কান্না যেন আরও বেড়ে গেল। এবার আর ফুঁপিয়ে নয়, প্রায় জোরেই কেঁদে উঠে বলল,
— আমি আপনাকে স্বামী হিসেবে মানি না! এমন চরিত্রহীন স্বামী আমার চাই না!
সামিনও একটুও দেরি না করে উত্তর দিল,
— আমিও তোমাকে আমার বউ হিসেবে মানি না।
সামিন এবার বুঝতে পারছে—এই মেয়েটা একেবারে ছিঁচকাদুনে। সেই কখন থেকে কেঁদেই যাচ্ছে, থামার নামই নেই। ঠিক তখনই সামিনের চোখ হঠাৎ নিশার কাঁধে আটকে গেল।
কাঁদতে কাঁদতে কখন যে শাড়ির আঁচল একটু সরে গেছে, নিশার নিজেরও খেয়াল নেই। ঢিলেঢালা ব্লাউজের কারণে কাঁধের একাংশ উন্মুক্ত হয়ে পড়েছে, আর ভেতরের কালো সরু ফিতেটাও স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। সামিন অস্বস্তিতে দৃষ্টি সরিয়ে নিল।
যতই অনুভূতি না থাকুক, নিজের বৈধ স্ত্রীর প্রতি অজানা একটা টান সৃষ্টি হয়ে যায়। শুকনো ঢোক গিলে সামিন নিচু স্বরে বলল,
— হয়েছে, এবার থামো। আমি তো আর তোমাকে বলিনি আমাকে স্বামী মানতেই হবে।
নিশা চোখ মুছতে মুছতে বলল,
— বাড়ি ফিরে সবার আগে আপনি আমাকে তালাক দেবেন।
— ওকে... তালাক...
কথাটা শেষ করার আগেই সামিন নিচু হয়ে বিছানায় পড়ে থাকা বালিশটা তুলতে গেল। হঠাৎ বুকে প্রচণ্ড টান লাগতেই পুরো মুখ যন্ত্রণায় কুঁচকে গেল। মুখ দিয়ে চাপা একটা আর্তনাদ বেরিয়ে এল। নিশা মুহূর্তেই কান্না থামিয়ে দিল। সব অভিমান ভুলে দ্রুত সামিন এর কাছে ছুটে এসে উৎকণ্ঠিত গলায় বলল,
— কী হয়েছে? খুব ব্যথা করছে? আরে, কিছু তো বলুন!
সামিন ব্যথার মধ্যেও নিশার উদ্বিগ্ন মুখটার দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর আবারও অনিচ্ছাসত্ত্বেও চোখ গিয়ে পড়ল সেই অনাবৃত কাঁধে। মুখে কষ্টের ছাপ রেখেই ধীর গলায় বলল,
— ঠিক নেই... আমার সবকিছুই যেন গুলিয়ে যাচ্ছে...
এতক্ষণ দুজন বিছানার দুই প্রান্তে বসে ছিল। নিশা আর কোনো দ্বিধা না করে দ্রুত সামিন এর অনেকটা কাছে সরে এল। উদ্বিগ্ন হাতে সামিনের শার্টের বোতাম খুলতে খুলতে বিড়বিড় করে বলল,
— কী যে করেন আপনি! উফ! মামুনি আপনাকে দেখে রাখতে বলেছেন। আপনার কিছু হলে আমি কী জবাব দেব?
বলতে বলতেই একে একে তিনটা বোতাম খুলে ফেলে নিশা।
— দেখি... আবার রক্ত বের হচ্ছে কি না। বেশি সমস্যা হলে আপুকে ডাকতে হবে...
শার্টটা সরাতেই নিশার চোখ থমকে গেল। বুকে বাঁধা সাদা ব্যান্ডেজের একাংশ রক্তে লাল হয়ে উঠেছে।
দৃশ্যটা দেখেই নিশার মুখ ফ্যাকাশে হয়ে গেল। আতঙ্কে মুখে হাত চাপা দিয়ে সে দ্রুত ঘুরে নামার জন্য পা বাড়াতেই— সামিন হঠাৎ নিশার কব্জিটা শক্ত করে ধরে ফেলল। এক ঝটকায় নিশাকে নিজের দিকে টেনে এনে রক্তাক্ত বুকের ওপর আলতো করে নিশার মাথাটা চেপে ধরে মৃদু, মলিন স্বরে বলল,
— মেয়ে তুমি এতো বোকা কেন? যার জন্য তোমার স্বামীর হৃদয়ে রক্তক্ষরণ হয়েছে... বউ হয়ে তুমি তাকেই ডাকতে যাচ্ছ?
চলবে... 

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ৫২তম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন