#প্রনয়ের_প্রলয়
#মেহরিমা_সারা
পর্ব ৫১ (শেষাংশ)
নীল এমনিতেই কারও কথা খুব একটা কানে তোলে না। নিজের ইচ্ছেমতো চলাই তার স্বভাব। আশপাশে কে কী ভাবল, কী বলল—সেসব নিয়ে মাথাব্যথা নেই। নীল ঠোঁট বাঁকিয়ে রাহার দিকে তাকিয়ে দুষ্টু হেসে বলল,
— বললেই হলো কাছে আসব না? বিয়ে করেছি কি শুধু বসে বসে ফর্মুলা মিল্ক খাওয়ার জন্য?
কথাটা শুনে রাহা প্রথমে ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে রইল। নীলের কথা থেকে কোন কথার মানে বের করতে হয়, সেটা বুঝতেই যেন আলাদা প্রতিভা লাগে। কয়েক সেকেন্ড পর হঠাৎ কথার ইঙ্গিতটা মাথায় আসতেই রাহার পুরো মুখ লাল হয়ে উঠল। মনে হলো লজ্জা আর রাগে দুই গাল দিয়ে আগুন বেরোবে। রাহা কটমট করে নীলের দিকে তাকিয়ে দাঁত চেপে বলল,
— নীইইল! আর একবার এসব আজেবাজে কথা বললে কিন্তু সত্যিই মেরে ফেলব!
নীল নির্বিকার মুখে কাঁধ ঝাঁকাল।
— আরে ধুর! মারামারি পরে হবে। আগে একটু খেয়ে-দেয়ে নিই।
রাহা ভেবে পেল না ছেলেটা আবার কী বলতে চাইছে।
— কী খাবে?
প্রশ্নটা শুনে এবার নীলই একটু থমকে গেল। হয়তো ভাবেনি রাহা সত্যিই জিজ্ঞেস করবে। কাশির ভান করে মুখ আড়াল করল, তারপর নিচু গলায় বলল,
— ওই... টুইন্স মিল্ক মানে... আমার একটু পছন্দ...
কথা শেষ করার সুযোগই পেল না। পাশে রাখা প্লাস্টিকের চেয়ারটা তুলে এক ঝটকায় নীলের দিকে ছুড়ে মারল রাহা। নীল দ্রুত সরে যাওয়ায় চেয়ারটা গিয়ে পাশেই পড়ল। রাহা আঙুল উঁচিয়ে গর্জে উঠল,
— কতবার বলেছি এসব নির্লজ্জের মতো কথা বলবে না! মানুষ এতটাও বেহায়া হয়? আমার জানামতে তোমার চৌদ্দগুষ্টিতেও এমন নমুনা ছিল না। নির্লজ্জতার সব রেকর্ড তুমি একাই ভেঙে ফেলেছ!
নীল রাহার এসব বাঁকা কথাকে উপেক্ষা করে হঠাৎ রাহার হাত ধরে হেঁচকা টানে নিজের দিকে নিয়ে এলো। তারপর রাহার দুই হাত পিছনে পেঁচিয়ে ধরল নিজের হাত দিয়ে। রাহাকে নিজের সাথে পরিপূর্ণ মিশিয়ে নিল। রাহা ছটফটিয়ে সরতে চাইলেও নীল সরতে দিল না। বরং আরো শক্ত করে ধরে রাখল নিজের সাথে। রাহার মুখের কাছে মুখ নিবে তার আগেই রাহা মাথা পেছনে হেলিয়ে দিল। নীল রাহার বোকামো কাজে ঠোঁট কামড়ে হেসে ফেলল। তারপর অপর হাত দিয়ে রাহার ঘাড় গলিয়ে চুলের পিছন দিক আঁকড়ে নিজের দিকে টেনে আনল। ধীরে ধীরে নিজের ওষ্ঠপুট দিয়ে রাহার শুকনো ঠোঁটে গভীর ভাবে চুমু খেতে থাকল, নিজের কার্যসিদ্ধি হতেই আচমকা রাহাকে কোলে তুলে নেয় নীল। রাহাকে নিয়ে খাটে বসতে বসতে বলল,
— বিয়ে করার আগে মনে ছিলো না— যে আমি নির্লজ্জ? বিয়ে করে এমন শুকনো থাকতে পারবো না আমি!
— নীইইল এর বাচ্চা ছাড়ো আমায়!
নীল রাহাকে কোলে রাখা অবস্থায় রাহার ঘাড়ে মুখ গুজে বলে উঠলো,
— ওটা দিবো বলেই তো ছাড়ছি না।
— মানে? কি দিবে?
রাহা বুঝতে না পেরে অবুঝ কন্ঠে বলে উঠলো।
— আমার বাচ্চা!
— হোয়াটটট???
নীল আর কিছুই বলল না। চুপচাপ রাহাকে বুকের সাথে মিশিয়ে খাটের দিকে হাটা ধরল
— ছাড়ো!
— না।
— নীল!
— না মানে না।
রাহা বিরক্ত হয়ে কাঁধে দু-একটা কিল বসিয়ে দিল। নীল হাসতেই থাকল। শেষে দুজনের এই টানাহেঁচড়ার মধ্যেই খাটের কিনারায় এসে নীল ধপ করে বসতেই মট... মট... করে একটা অদ্ভুত শব্দ হলো। পরের মুহূর্তেই পুরো খাট দুলে উঠে মাঝখান দিয়ে বসে গেল। দুজন একসঙ্গে নিচে দেবে যেতেই রাহা চমকে উঠে ভারসাম্য রাখতে নীলকে শক্ত করে আঁকড়ে ধরল। নীলও স্বভাবতই তাকে সামলে নিল। কয়েক মুহূর্ত দুজনেই বোকার মতো একে অপরের মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর নীল চোখ বন্ধ করে বড় একটা নিঃশ্বাস ছেড়ে দাঁত চেপে বিড়বিড় করল,
— বা*ল! কিছুই করার আগেই বালের খাট বিদায় নিয়ে নিল!
রাহা আর নিজেকে সামলাতে পারল না। রাগের মাঝেও রাহার ঠোঁট বেকে গেল। হয়তো হেসেছে। তারপর হালকা করে মাথা দিয়ে নীলের কপালে ঠুকরিয়ে বলল,
— তোমার এসব আজগুবি কথা বাদ দিয়ে আগে ওঠো!
নীল প্রফুল্ল হয়ে থাকাকে রাহাকে কয়েক পল দেখল। তারপর কোনো রকমে নিজেকে সামলে উঠে দাঁড়াতে গেল। কিন্তু তাতেই আবার কড়াৎ! করে শব্দ করে ভেতরের কাঠটাও ভেঙে গেল। নীল অসহায় মুখে চারদিকে তাকিয়ে বিড়বিড় করল,
— বাহ! দুনিয়ার সব ষড়যন্ত্র আমার সাথেই।
নীল কোমরে হাত দিয়ে নাটকীয় ভঙ্গিতে দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
— বিয়ে হয়েছে তিন মাস আগে। আজও বাসর করতে পারলাম না খাট আগেই আমার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করল!
রাহা ভ্রু তুলে বলল,
— পারবেও না! বিগত সাত বছরেও তুমি কিছু করতে পারবে না। সাত...! সাত কোটি..!
নীল চোখ সরু করে তাকাল।
— আমাকে এত হালকাভাবে নিও না, ম্যাডাম। আমি কিন্তু সাজিদ খানের ছেলে। বাবা যদি তিন বছরে ইন্টারন্যাশনাল কোম্পানি দাঁড় করাতে পারেন, তাহলে আমি আরো কম সময়ে করে দেখাতে পারব।
রাহা একটু খোঁচা মের বলে উঠলো,
— আমার বাবাও সাথে ছিলেন?
নীলও মৃদু স্বরে বলল,
— তো? বাবার সাথে আমার শশুর ছিলো আমার সাথে শশুড়ের মেয়ে আছে। দুজনে মিলে দেনমোহর আদায় করে দিবো।
— আমি কেনো করবো?
— বাহ রে! কিছুমিছু বুঝি আমি একাই করবো?
রাহা কটমটিয়ে উঠলো, বিরবির করে বলে উঠলো,
— বেয়াদব!
মুখে মুখে তর্ক করলেও ভেতরে ভেতরে নিজেকেই কয়েক দফা ধমক দিল নীল। কী দরকার ছিল ভাইয়ের কথায় এত বড় অংকে রাজি হওয়ার? তার ওপর আবেগের মাথায় আবার নিজেই এক কোটি টাকা বাড়িয়ে দিয়েছিল! তখন বিবেকটা কোথায় ছিল? এখন নিজেরই মাথায় হাত পড়েছে... মুখে অবশ্য সেসবের কিছুই প্রকাশ করল না।
ওদের কথোপকথনের মাঝেই হঠাৎ—
ঠক... ঠক... ঠক... দরজায় কড়া নাড়ার শব্দ ভেসে এলো। নীল আর রাহা দুজনেই একসঙ্গে দরজার দিকে তাকাল। রাহা দ্রুত নিজেকে সামলে নিয়ে এগিয়ে গিয়ে দরজা খুলতেই অবাক হয়ে গেল। বাইরে আদি, ইরা, আইয়ুব কাজী আর কাজীর স্ত্রী—চারজনই দাঁড়িয়ে আছেন।
একসঙ্গে সবাইকে দেখে রাহার মুখে অস্বস্তির ছাপ ফুটে উঠল। কিছু না বলে সে একপাশে সরে দাঁড়াতেই আদি আর ইরা প্রায় হুড়মুড় করে ভেতরে ঢুকে পড়ল।
ঘরে ঢুকেই আদি উদ্বিগ্ন কণ্ঠে বলল,
— এত জোরে কিসের আওয়াজ হলো? সব ঠিক আছে তো?
কথাটা শেষ করার আগেই চোখ গিয়ে পড়ল খাটটার ওপর। খাটের মাঝের অংশ পুরোপুরি বসে গিয়ে ভেঙে আছে। আদি কয়েক সেকেন্ড নির্বাক হয়ে তাকিয়ে রইল। অন্যদিকে ইরা মুখে হাত চাপা দিয়ে বিস্মিত গলায় বলে উঠল,
— হায় আল্লাহ! এত তাড়াতাড়ি খাট ভেঙে গেল?
— জাস্ট শাট আপ, ইরা! এমন কিছুই হয়নি।
আদির কড়া ধমক খেয়ে ইরা সঙ্গে সঙ্গে চুপসে গেল। ঠোঁট কামড়ে মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে রইল।
রাহা লজ্জায় আর অস্বস্তিতে মাথায় হাত রেখে মুখ ফিরিয়ে নিল। মনে হচ্ছিল, এই মুহূর্তে মাটির নিচে গর্ত থাকলে সেখানেই লুকিয়ে পড়ত।
আইয়ুব কাজী ধীর পায়ে ভেতরে এসে ভাঙা খাটটার দিকে একবার তাকালেন। তারপর দুই হাত পেছনে জড়িয়ে গম্ভীর মুখে নীলকে উদ্দেশ্য করে বললেন,
— বাবা, সব কাজেই একটু রয়ে-সয়ে চলতে হয়।
কথাটা শুনে নীলের মুখ মুহূর্তেই কুঁচকে গেল।
— আরে চাচা, এমন কিছুই না! এই বালের খাটটা আগেই ভাঙা ছিল। এখন সব দোষ আমার ঘাড়ে চাপাচ্ছেন কেন?
ঠিক তখনই পেছন থেকে কাজীর স্ত্রী কথায় যোগ দিলেন,
— আরে, এই খাট তো আগেরবার যারা ছিল, তারাই অর্ধেক ভেঙে রেখে গিয়েছিল। আমি তো আপনাকে কতবার বলছিলাম নতুন খাট আনতে!
আইয়ুব কাজী যেন হঠাৎ সব মনে পড়ে যাওয়ার ভঙ্গিতে মাথা নাড়লেন।
— হুম... ঠিকই তো। বিবি বলছিল বদলাতে। এত দম্পতি আসে-যায়, খাটটার অবস্থাই তো শেষ!
কথাটা শেষ হতেই নীল বিরক্ত হয়ে বলল,
— ইয়াক..!
আর ওদিকে রাহার অবস্থা আরও করুণ। কথাগুলো শুনে লজ্জায় তার কান পর্যন্ত লাল হয়ে গেছে। আর এক মুহূর্তও এই প্রসঙ্গ টেনে নিতে চাইল না। দ্রুত আদির দিকে তাকিয়ে বলল,
— আদি, অলরেডি সাড়ে চারটা বাজে। এখনই বের হওয়া উচিত। আর কিছুক্ষণ পরেই ভোরের আলো ফুটে যাবে।
আদি যেন সেই সুযোগেরই অপেক্ষায় ছিল। সেও বিব্রত মুখে মাথা নাড়ল।
— হ্যাঁ, ঠিক বলেছ। আমাদের এখনই রওনা হওয়া উচিত।
এরপর সে আইয়ুব কাজীর দিকে ফিরে বিনীতভাবে জিজ্ঞেস করল,
— চাচা, বাসস্ট্যান্ড বা কোনো লোকালয় পর্যন্ত যাওয়ার মতো কোনো ব্যবস্থা হবে?
আইয়ুব কাজী কিছুক্ষণ ভেবে বললেন,
— শহরের মতো গাড়িঘোড়া তো আমাদের এখানে নেই বাবা। তবে একটা ভ্যানের ব্যবস্থা করে দিতে পারব। ওটা দিয়েই তোমাদের বাসস্ট্যান্ড পর্যন্ত পৌঁছে দেওয়া যাবে।
আদি কৃতজ্ঞতার হাসি হেসে মাথা নাড়ল।
— তাহলেই হবে, চাচা। অনেক উপকার হবে।
_______________________________
সামিনের মুখে কথাটা শোনার পর নিশা যেন কয়েক মুহূর্তের জন্য স্থির হয়ে গেল। কী ঘটছে, কিছুই বুঝে উঠতে পারছিল না সে। কিন্তু পরক্ষণেই বাস্তবতা উপলব্ধি হতেই বুক কেঁপে উঠল। এই পাগল মানুষটা নিজের রক্তাক্ত বুকের সঙ্গেই ওকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরেছিল!
ভয় আর অস্থিরতায় নিশা হঠাৎই ছিটকে সরে আসে। সামিন তখন চোখ বন্ধ করে বালিশে হেলান দিয়ে নিথর হয়ে পড়ে আছে। নিশা দ্রুত নিজের হাত ছাড়িয়ে দরজার দিকে এগিয়ে যায়। ঠিক তখনই দরজায় নক করার শব্দ ভেসে আসে।
তাড়াহুড়ো করে দরজা খুলতেই দেখতে পায় বাইরে রাহা, নীল, আদি আর ইরা দাঁড়িয়ে আছে। সবাইকে একসাথে দেখে নিশার বুকের ভেতর জমে থাকা অভিমানটা যেন আবারও মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে। কারও মুখের দিকে না তাকিয়ে দৃষ্টি নিচু রেখেই শান্ত অথচ কাঁপা গলায় বলল,
— উনার বুক থেকে এখনও রক্ত বের হচ্ছে... আমাদের দ্রুত এখান থেকে যাওয়া উচিত।
রাহা একবার সামিনের দিকে, আরেকবার নিশার দিকে তাকিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলল। মৃদু স্বরে বলল,
— হ্যাঁ... আমরাও এখনই বের হবো।
এরপর চোখের ইশারায় নীলকে সামিনকে ধরে উঠাতে বলল। নীল না চাইতেও সাহায্য করার জন্য এগিয়ে গেল, আদি নিজেও উইক তাই আর যায় না। কিন্তু নীল সামিনকে ধরতে যেতেই সামিন বিরক্ত মুখে নিজের হাত সরিয়ে নিল। নীল ভ্রু কুঁচকে বিরক্ত দৃষ্টিতে রাহার দিকে তাকাল, যেন নীরব ভাষায় বলছে, "দেখলে? লোকটার অ্যাটিটিউড!" কিন্তু সামিন নির্বিকার ভঙ্গিতে নিজের হাতটা নিশার দিকে বাড়িয়ে দিল। স্পষ্টই বোঝা যাচ্ছে, সে নিশাকেই তাকে ধরতে বলছে।
নিশা দ্বিধায় এগিয়ে আসতেই সামিনের চোখ হঠাৎ ওর পোশাকের দিকে আটকে গেল। মেয়েটা এখনও নিজের এলোমেলো কাপড় ঠিক করেনি। সঙ্গে সঙ্গে দাঁতে দাঁত চেপে হিসহিসে গলায় বলে উঠল,
— এই মেয়ে, তোমার কি কোনো বোধবুদ্ধি আছে? আগে কাপড় ঠিক করো।
সামিনের কথায় নিশা লজ্জায় থমকে গেল। তাড়াতাড়ি নিজের কাপড় ঠিক করে নিল। তবুও যেন সামিনের মন ভরল না। সে চোখ বন্ধ করে একটা দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলল। তারপর এক পাশে পড়ে থাকা নিজের ওভারসাইজ জ্যাকেটটা এক হাতে তুলে নিশার দিকে বাড়িয়ে দিয়ে কঠিন গলায় বলল,
— বেয়াদব! এটা পরে নাও। তোমার শরীরের একটুও যদি বাইরে দেখা যায়... তাহলে কিন্তু আগুন দিয়ে জ্বালিয়ে দেব।
নিশা বিস্ময়ে চোখ বড় বড় করে সামিনের দিকে তাকাল। তারপর নিচু স্বরে বিরক্তি নিয়ে বিড়বিড় করে বলল,
— অসভ্য... ফাজিল লোক! নিজেই একটা বেয়াদব, আবার আমাকেই বেয়াদব বলে!
কথাটা সামিনের কানে যেতেই সে কটমট করে তাকিয়ে বলল,
— আমি তোমার হাসবেন্ড। নিজের হাসবেন্ডকে বেয়াদব বলছ? এতেই তো প্রমাণ হয়ে যায়, আসল বেয়াদবটা তুমিই।
ওদের এই নীরব খুনসুটি আর অদ্ভুত ঝগড়াটা চুপচাপ দাঁড়িয়ে পর্যবেক্ষণ করছিল রাহা। অজান্তেই তার ঠোঁটের কোণে একটুখানি হাসি ফুটে উঠল। নীল ভুল বলেনি— সত্যিই হয়তো এই দু'জনই পারবে একে অপরের বুকের গভীর ক্ষতগুলো ধীরে ধীরে সারিয়ে তুলতে।
একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে রাহা সবাইকে উদ্দেশ্য করে বলল,
— হয়েছে এবার থামো, এখন বের হওয়া উচিত। অনেক দেরি হয়ে গেছে। বাসায় ফিরতে হবে। অনেক সময় কারও সঙ্গে যোগাযোগ নেই, সবাই হয়তো চিন্তা করছে।
____________________________
বাইরে বের হতেই সবাই দেখতে পেল আইয়ুব কাজী একটা ভ্যান নিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন। দৃশ্যটা দেখে সবাই কিছুটা বিচলিত হয়ে পড়ল। কারণ ছোটবেলা থেকেই তারা গাড়িতে চলাফেরা করতেই অভ্যস্ত। এভাবে ভ্যানে চড়ার অভিজ্ঞতা প্রায় কারও নেই। তবে সবার অবাক করে দিয়ে ইরাই হেসে উঠল। এক মুহূর্তও দেরি না করে সবার আগে ভ্যানে উঠে বসে উচ্ছ্বসিত কণ্ঠে বলে উঠল,
— ইশ! কতদিন পর ভ্যানে উঠলাম! ছোটবেলায় নানাবাড়িতে গেলে গ্রামের পথে এমন ভ্যানেই ঘুরতাম।
ইরার মুখভরা সেই শিশুসুলভ আনন্দ দেখে বাকিরাও নিজেদের অস্বস্তি ভুলে গেল। একে একে সবাই ভ্যানে ওঠার চেষ্টা করতে লাগল। নীল দ্রুত রাহার কাছে এগিয়ে গেল। দু'হাতে আলতো করে রাহার কোমর জড়িয়ে সহজেই তুলে ভ্যানে বসিয়ে দিল। পুরো ঘটনাটা এতটাই স্বাভাবিকভাবে করল যে রাহা প্রতিবাদ করার সুযোগই পেল না।
অন্যদিকে শাড়ি পরে থাকায় নিশার ভ্যানে উঠতে বেশ কষ্ট হচ্ছিল। আর সামিন নিজেই বুকের ব্যাথায় প্রায় কাবু হয়ে আছে। চাইলেও নিশাকে ধরে বসাতে পারবে না তাই বলে ওকে কষ্ট করেও উঠতে দেবে— এমন মানুষও সামিন নয়। হঠাৎই সামিন নিচে এক হাঁটু গেড়ে বসে পড়ল। নিজের এক পা সামনের দিকে উঁচু করে রেখে নিশার দিকে হাত বাড়িয়ে দিল। তারপর চোখের ইশারায় বুঝিয়ে দিল, তার পায়ের ওপর ভর দিয়ে উঠে যেতে।
নিশা প্রথমে কিছুই বুঝতে পারল না। বিস্মিত চোখে সামিনের দিকে তাকিয়ে রইল।
শেষ পর্যন্ত সামিন নিজেই নিচু স্বরে বলল,
— আমার পায়ের ওপর পা রেখে ওঠো।
কথাটা শুনে নিশা সঙ্গে সঙ্গে মাথা নেড়ে না করতে চাইল। আহত একজন মানুষের পায়ের ওপর পা রাখা— ভাবতেই তার অস্বস্তি হচ্ছিল। কিন্তু অন্য কোনো উপায়ও ছিল না। শেষ পর্যন্ত বাধ্য হয়েই খুব সাবধানে সামিনের পায়ের ওপর এক পা রেখে ভ্যানে উঠে পড়ল। নিশা নিরাপদে উঠে বসতেই সামিনও ধীরে ধীরে উঠে ভ্যানে চড়ল। বুকের ব্যথায় মুখটা কুঁচকে গেলেও একবারের জন্যও সেটা প্রকাশ করল না। এসে নিঃশব্দে নিশার পাশেই বসে পড়ল।
সামনে ভ্যানচালকের আসন। আর দুই পাশে মুখোমুখি হয়ে বসে আছে দুই জোড়া মানুষ। একপাশে সামিন আর নিশা, অন্যপাশে আদি আর ইরা। রাহা নীল পিছনের দিকে, অর্থাৎ ভ্যানচালকের বিপরীত দিকে।
সবাই ঠিকঠাক বসে গেলে নীল একবার চারপাশে তাকিয়ে নিল। তারপর কেউ খেয়াল করার আগেই এক হাত রাহার পেছন দিয়ে বাড়িয়ে তার কোমর জড়িয়ে আলতো টানে নিজের একেবারে কাছে নিয়ে এল। রাহা হকচকিয়ে নীলের দিকে তাকাল। তারপর দ্রুত দু'পাশে চোখ বুলিয়ে নিচু স্বরে ফিসফিস করে বলল,
— কী করছো?
নীল নির্বিকার মুখে ঠোঁটের কোণে দুষ্টু হাসি টেনে বলল,
— বউ তো আর নিজের ইচ্ছায় কাছে আসবে না... তাই আমিই না হয় একটু জোর করলাম।
কথাটা বলেই কোনো রকম সংকোচ না রেখে নিজের মাথাটা আলতো করে রাহার কাঁধে ঠেকিয়ে দিল। তারপর চোখ বন্ধ করে প্রশান্তির নিঃশ্বাস ফেলে আবারও বলল,
— বউ তো আবার আহ্লাদীও না, যে নিজের থেকে স্বামীর কাঁধে মাথা রাখবে। তাই ভাবলাম, আমিই না হয় বউয়ের কাঁধে মাথা রেখে একটু আদরটা আদায় করে নিই।
রাহা বিরক্ত মুখে চোখ-মুখ কুঁচকে রইল। বাইরে থেকে যতই রাগ দেখাক না কেন, নীল এর এসব অবুঝ, জেদি আদিখ্যেতায় তার মনটা অদ্ভুতভাবে নরম হয়ে যায়। যেটা রাহা নিজেও জানে না।
_______________________
চলবে....