#প্রনয়ের_প্রলয়
#মেহরিমা_সারা
পর্ব ৫৩ (প্রথমাংশ)
রাহা নীরবে বসে আছে শানের দিকে তাকিয়ে। এতক্ষণে সবাই টুকটাক কথা বলেছে, কেউ শানের শরীরের খোঁজ নিয়েছে, কেউ দু-একটা কথা বলে তাকে সাহস দেওয়ার চেষ্টা করেছে। কিন্তু রাহা কিছুই বলেনি। শুধু একদৃষ্টিতে ভাইয়ের দিকে তাকিয়ে ছিল। শানও বোনের সেই নীরবতা লক্ষ্য করেছে। তাই সেও চুপচাপ ছিল। রাহার চোখের দিকে তাকিয়েই যেন বুঝতে পারছিল, তার ভেতরে কতটা কথা জমে আছে।
আরমান, নওরিন, ইয়াসমিন, অভয়—সবাই এর আগেই শানের সঙ্গে দেখা করে বের হয়ে গেছেন। সাত ঘণ্টা পর শানের জ্ঞান ফিরেছে। এখন তাকে বেশি সময় কথা বলানো যাবে না, বেশি চাপও দেওয়া যাবে না। তাই অল্প সময়ের জন্য একে একে সবাই তার সঙ্গে দেখা করে বেরিয়ে যাচ্ছে।
তাদের বেরিয়ে যাওয়ার পরই রাহারা এসেছে।
হঠাৎ শান দুর্বল কণ্ঠে বলে উঠল,
— ইরা আপু কোথায়?
প্রশ্নটা শুনে উপস্থিত সবাই একটু অবাক হয়ে গেল। এই মুহূর্তে শান ইরার কথা জিজ্ঞেস করবে, সেটা কেউ ভাবেনি। শান আবারও ধীরে ধীরে বলল,
— ইরা আপুকে আসতে বলো। আমি আপুর সঙ্গে কথা বলব।
রাহার চোখ দুটো ধীরে ধীরে সরু হয়ে এলো।
কোনো কথা বলল না সে। নীল আর নিশা একে অপরের দিকে তাকিয়ে কেবিন থেকে বেরিয়ে গেল। কিয়ারা তখনও এক জায়গায় দাঁড়িয়ে ছিল। মুখটা অভিমানে ভার হয়ে আছে। শান সেটা দেখেছে। কিন্তু বড় বোনের সামনে কিছু বলতেও পারছে না। শুধু একবার চোখের ইশারায় যেন কিয়ারাকে আশ্বস্ত করল।
কিয়ারা ধীরে ধীরে মুখ ফিরিয়ে বেরিয়ে গেল। রাহা একবার কিয়ারার চলে যাওয়ার দিকে তাকাল। তারপর আবার শানের দিকে ফিরে তাকাল।
শান এখনও তার এক হাত ধরে আছে। কিন্তু কোনো কথা বলছে না। রাহা ধীরে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলতেই তখনই কেবিনের দরজা খুলে গেল।
ইরা দ্রুত পায়ে ভেতরে ঢুকল। শান ইরাকে দেখামাত্রই হঠাৎ আবেগে আপ্লুত হয়ে হাত বাড়িয়ে দিল।
— আপু...!
ইরা যেন এক মুহূর্তের জন্য থমকে গেল। শানের মুখে ‘আপু’ ডাকটা আজ কেমন যেন আলাদা লাগল তার কাছে। দ্রুত এগিয়ে এসে শানের পাশে বসল। একবার রাহার দিকে তাকাল। তারপর সঙ্গে সঙ্গেই চোখ সরিয়ে নিল। রাহার চোখ তখন শানের হাতের দিকে। হাতে ক্যানুলা লাগানো। দুর্বল হাতটা কাঁপছে সামান্য। ইরা শানের বাড়িয়ে দেওয়া হাতটা নিজের হাতে আঁকড়ে ধরে বলল,
— কী অবস্থা করেছিস নিজের? একটু সাবধান হওয়া উচিত ছিল তোর।
শান হঠাৎ মৃদু হেসে উঠল। দুর্বল শরীরে স্বভাবসুলভ হেসে উঠলো।
— যার কাছে বড় বোনেরা আছে, তার সাবধান হলে চলে না..! বোনদের দায়িত্ব কমে যাবে তো...!
ইরা রাহার দিকে একবার তাকিয়ে শানের কানের লতিটা আলতো করে মুচড়ে দিয়ে বলল,
— ওরে দুষ্টু রে!
শানের মুখে আবারও ক্ষীণ হাসি ফুটে উঠল। মুহূর্তটার মধ্যে কেবিনের ভারী পরিবেশটা যেন সামান্য হলেও হালকা হয়ে এলো কিন্তু সেই স্বস্তি বেশিক্ষণ স্থায়ী হলো না।
কিছুক্ষণ পর একজন নার্স এসে জানালেন,
— এখন রোগীকে বিশ্রাম নিতে হবে। আর বেশি কথা বলা যাবে না।
ইরা আর কিছু বলল না। শানের হাতটা আলতো করে ছেড়ে দিয়ে উঠে দাঁড়াল।
— ভালো থাকিস। এখন চুপচাপ রেস্ট নে।
শান মৃদু মাথা নাড়ল। ইরা একবার রাহার দিকে তাকিয়ে ধীরে ধীরে কেবিন থেকে বেরিয়ে গেল।
দরজাটা বন্ধ হওয়ার পর কেবিনে আবার নীরবতা নেমে এলো। শান এবার ধীরে ধীরে রাহার দিকে তাকাল। তারপর বোনের হাতটা ছেড়ে দিয়ে মলিন একটা হাসি দিল। কিছুক্ষণ চুপ করে থাকার পর ধীর কণ্ঠে বলল,
— ওই সময়... আমার চোখে সবার আগে তোমার প্রতিচ্ছবিটাই ফুটে উঠেছিল...!
রাহা স্থির হয়ে শুনছে। শান একটু থামল। শ্বাস নিতে সামান্য কষ্ট হচ্ছে। তবুও কথাগুলো শেষ করতে চাইল।
— তারপর বাবা-মায়ের শেষ সময়টা... তারপর কোনো এক প্রিয়বতীর মুখ... তারপর নীল... আমার পরিবারের সবাই... আর যে থেকেও ছিল না, তাকেও...
শেষ কথাটার পর শান চুপ করে গেল। রাহার বুকের ভেতরটা কেমন করে উঠল। সে তপ্ত একটা শ্বাস ফেলে নিজেকে সামলে নিল। তারপর ধীরে ধীরে বলল,
— নীল এতদিন ভুল বলেনি...! যতটা সহজ-সরল মনে হয়, ততটাও না... তাই না?
শানের ঠোঁটের একপাশে মৃদু হাসি ফুটে উঠল।
— তোমার ধারণাও ভুল না। নীলের সঙ্গে থেকেই আমি এমন হয়েছি।
রাহা কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়াল।
জীবনে কিছু মুহূর্ত আসে, যেগুলো আমরা যতই চাই না কেন, কোনোভাবেই ভুলতে পারি না। কিছু স্মৃতি সময়ের সঙ্গে মুছে যায় না।
____________________
অতীত....
— ভাই, আমি তোমাকে আগেই বলেছিলাম—নওরিন বিয়ে করতে চাচ্ছিল না। তোমরা জোর করে বিয়ে দিয়েছো। এখন আফসোস করে তো কোনো লাভ নেই। ও যখন একবার সিদ্ধান্ত নিয়েই নিয়েছে যে ডিভোর্স দিয়ে দেবে, তাহলে এখানে আমাদের কিছু করার নেই। ছোট বাচ্চা তো না, পঁচিশ বছরের একজন মানুষকে তোমরা জোর করতে পারো না। ওকে ওর মতো থাকতে দাও।
নীলিমা অনেক দিন পর আজ বড় ভাইয়ের সঙ্গে কথা বলছে। দেড় বছরের মতো হয়েছে নওরিনের বিয়ে হয়েছে। অথচ বিয়েটা নওরিন নিজের ইচ্ছায় করেনি। বড় ভাই জোর করেই বিয়ে দিয়েছিল। বাবা মারা যাওয়ার সময় নওরিনের দায়িত্ব নীলিমা আর তার বড় ভাইয়ের হাতে দিয়ে গিয়েছিলেন। সেই দায়িত্ব থেকেই দুজন মিলে নওরিনের বিয়ে দিয়েছিল।
কিন্তু যেখানে দুজন মানুষের মধ্যে মনের মিল নেই, সেখানে শুধু সম্পর্কের নামটুকু ধরে একটা সংসার কতদিন টেকে? প্রায় প্রতিদিনই নওরিন আর তার স্বামীর মধ্যে কোনো না কোনো বিষয় নিয়ে ঝামেলা লেগেই থাকত। ছেলেটা খারাপ ছিল না। বাংলাদেশি একটা সাধারণ পরিবারের ছেলে, নিজের মতো করে সংসারটা টিকিয়ে রাখার চেষ্টা করেছে। নীলিমাও কম চেষ্টা করেনি। কতবার নওরিনকে বুঝিয়েছে, সবকিছু একটু মানিয়ে নিতে। সম্পর্কটাকে আরেকটু সময় দিতে। রাগের মাথায় যেন কোনো সিদ্ধান্ত না নেয়। কিন্তু কিছুতেই কিছু হয়নি। ধীরে ধীরে নওরিন যেন পাথরে পরিণত হয়েছে।
যা করতে বলা হয়, করে। নিজের ইচ্ছা, নিজের অনুভূতি—কোনো কিছুই যেন প্রকাশ করতে চায় না। একটা মানুষের কাছে যদি নিজের মনের কথা বলতেই না পারে, নিজের ইচ্ছা-অনিচ্ছা প্রকাশ করার সুযোগই না থাকে, তাহলে তার সঙ্গে সংসার করা কতটা সম্ভব? শেষ পর্যন্ত নওরিনের স্বামী নিজেই বলেছিল, তারা আলাদা হয়ে যাবে। নওরিনও একবাক্যে রাজি হয়ে যায়। আর নওরিনের সেই সহজ সম্মতিই ছেলেটাকে আরও হতাশ করে দিয়েছিল। পরশুদিন নওরিন শেষ পর্যন্ত ভাইয়ের বাড়িতে এসে উঠে বলেছে— আর সম্ভব নয়। সে আর ওই সংসারে ফিরে যাবে না।নীলিমা ফোনটা নামিয়ে পাশে বসে থাকা আরমানের দিকে তাকাল। এতক্ষণ আরমান চুপচাপ বসে সবকিছু শুনছিল। তার বুকের ভেতর একটা অস্বস্তি জমে আছে। নিজেকে কোথাও যেন অপরাধী মনে হচ্ছে। মনে হচ্ছে, তার কারণেই হয়তো একটা মেয়ের সংসার ভেঙে যাচ্ছে। অথচ আরমান কোনোদিন নীলিমা ছাড়া অন্য কাউকে প্রশ্রয় দেয়নি। মানুষের চোখের ভাষা বোঝা কঠিন নয়। আরমান অনেক আগেই কিছু বিষয় বুঝে গিয়েছিল। আর যেদিন থেকে বুঝেছে, সেদিন থেকেই সে অনেকটা দূরত্ব বজায় রেখেছে।
তবুও তার একটাই চাওয়া ছিল— ছোট মেয়েটা ভালো থাকুক। নওরিন যেমন নীলিমার ছোট বোন, তেমনি আরমানের কাছেও সে নিজের ছোট বোনের মতোই। কিন্তু সবকিছু কি আর মানুষের ইচ্ছেমতো হয়? ভাগ্যে যা লেখা থাকে, শেষ পর্যন্ত হয়তো সেটাই ঘটে। মেয়েটা চাইলে হয়তো একটু মানিয়ে নিতে পারত। কিন্তু নওরিনের স্বভাবটাই এমন। একটু জেদি, একটু রাগী। নিজের সিদ্ধান্তে অটল। যা একবার ঠিক করে, সেটা করেই ছাড়ে। আর রাগ উঠলে অনেক সময় সামনে কী আছে, কী হারিয়ে যেতে পারে—কিছুই ভাবে না। নীলিমা ফোনটা পাশে রেখে আরমানের দিকে তাকিয়ে ধীরে বলল,
— ছোট নওরিন কত বড় হয়ে গেল! সব সময় চঞ্চল, রাগ আর জেদে ভরপুর ছিল। অথচ এখন দেখলে মনে হয়, একেবারে বরফের মতো হয়ে গেছে। কত করে বললাম, এখানে এসে কয়েকটা দিন থেকে যেতে। অথচ আসলই না।
আরমান স্ত্রীর মন খারাপ বুঝতে পেরে শান্ত গলায় বলল,
— মন খারাপ করো না। ওর হয়তো এখানে থাকতে ভালো লাগে না।
ঠিক তখনই ঘরের ভেতর থেকে দৌড়ে বেরিয়ে এলো রাহা। চোখেমুখে এখনও ঘুমের ছাপ।
মায়ের পাশে এসে সোফায় বসে অলস ভঙ্গিতে জিজ্ঞেস করল,
— মা, আদি আর শান কোথায়?
নীলিমা মেয়ের কোমরসমান এলোমেলো চুলগুলো হাত দিয়ে ঠিক করে দিলেন। তারপর কপালে আলতো করে চুমু খেয়ে বললেন,
— ওরা অনেক আগেই ঘুম থেকে উঠে গেছে। নীলও এসেছে। সবাই বাগানে খেলছে।
রাহা কিছুক্ষণ মায়ের বাহুতে মাথা ঠেকিয়ে বসে রইল। তারপর ঘুমঘুম গলায় বলল,
— মা, আদির মন খারাপ থাকে বেশিরভাগ সময়। আন্টি কি ওকে এখনো মাফ করেনি?
নীলিমা মেয়ের মাথায় হাত বুলিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।
— করবে। তুমি এসব কথা ছাড়ো। যাও, বাগানে যাও। সবাই খেলছে।
রাহা আর কিছু না বলে সঙ্গে সঙ্গে উঠে দাঁড়াল।
দৌড়ে বাগানের দিকে চলে গেল। রাহা বেরিয়ে যাওয়ার কিছুক্ষণ পরই ইয়াসমিন চৌধুরী ছোট মেয়ে তৃধাকে কোলে নিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে এলেন। এসে নীলিমার পাশে সোফায় বসলেন।
আরমান তখনও পত্রিকা মনোযোগ দিয়ে পড়ছিল। তৃধাকে কোলে নিয়ে ইয়াসমিন বসতেই তিনি পত্রিকা থেকে মুখ তুলে তাকালেন।
তারপর স্বাভাবিক গলায় জিজ্ঞেস করলেন—
— তা তৃধামনি কেমন আছে? রাতে বেশি জ্বালাতন করে?
ইয়াসমিন মেয়ের দিকে তাকিয়ে মৃদু হেসে বললেন,
— সব সময় না। মাঝে মাঝে রাতে উঠে। তবে রাতের বেলা উঠলেও আমার খুব একটা কষ্ট হয় না। আপনার ভাই একাই দেখে।
আরমান মনে মনে ছোট ভাইয়ের প্রতি সন্তুষ্ট হলো।
অভয় বড় মেয়ের প্রতি খুব একটা আগ্রহ বা যত্ন দেখায় না—এটা আরমান জানে। কিন্তু ছোট তৃধার প্রতি টান টা যেন একটু আলাদা। কথাটা ভেবেই আরমান মুখ ফসকে বলে ফেলল,
— বড় দুটোর প্রতি অনীহা থাকলেও এটাকে অভয় ভালোই যত্নে রাখে।
কথাটা শুনেই নীলিমা সঙ্গে সঙ্গে আরমানের দিকে রাগী চোখে তাকালেন। আরমানও স্ত্রীর দৃষ্টি বুঝতে পেরে একটু অপ্রস্তুত হয়ে গেল। নীলিমা অবশ্য কথাটাকে স্বাভাবিক করতে হালকা হেসে বলল,
— হ্যাঁ। রাহা, নিশা, শান—ওদের অভয় খুব একটা গুরুত্ব দেয় না। তবে তৃধাকে খুব ভালোবাসে।
আরমান ধীরে মাথা নাড়ল। আরমানের মুখে অজান্তেই একটুখানি হাসি ফুটে উঠল।
ইয়াসমিন অবশ্য আরমান এর কথাটাকে আর তেমন গুরুত্ব দেয়নি।
রাতে সবাই একসঙ্গে বসেছিল খেতে। তবে আদি নেই। খাওয়ার সময়ও ছেলেটাকে দেখা যাচ্ছে না দেখে নীলিমা কিছুক্ষণ অপেক্ষা করলো। যখন আদি এলো না, তখন তিনি উঠে সোজা আদির ঘরের দিকে গেলেন। ঘরে ঢুকেই দেখলেন, আদি বিছানায় শুয়ে আছে। বুকের সঙ্গে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে আছে একটা ফটোফ্রেম। নীলিমা কিছুক্ষণ ছেলের দিকে তাকিয়ে রইলেন। তারপর ধীরে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। আদি এক কথায় রুবিনার ন্যাওটা। মাকে ছাড়া যেন ছেলেটার চলেই না। আর রুবিনার সঙ্গে সম্পর্কটা এমন জায়গায় গিয়ে পৌঁছেছে যে, মায়ের কাছ থেকে দূরে থাকার প্রতিটা দিনই আদির কাছে কষ্টের। প্রতিদিনই কোনো না কোনোভাবে মন খারাপ করে থাকে ছেলেটা। নীলিমা ধীরে ধীরে বিছানার পাশে গিয়ে বসলেন। তারপর আদির হাত থেকে ফটোফ্রেমটা আলতো করে নিয়ে পাশে রেখে দিলেন।
এরপর ছেলেটাকে ধীরে ধীরে বসিয়ে মাথায় হাত বুলিয়ে জিজ্ঞেস করলেন,
— কী হয়েছে? মন খারাপ?
আদি সঙ্গে সঙ্গে মাথা নাড়ল। অর্থাৎ, মন খারাপ না। নীলিমা ছেলের মুখের দিকে তাকিয়ে মৃদু হেসে বললেন,
— তাহলে চলো, খেয়ে নেবে।
আদির মুখটা সঙ্গে সঙ্গে চুপসে গেল। খেতে ইচ্ছে করছে না তার। কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে নিচু গলায় বলল,
— আমি খাব না।
নীলিমা কিছুক্ষণ আদির দিকে তাকিয়ে রইলেন।
তারপর শুধু শান্ত গলায় বললেন,
— ঠিক আছে। আমি খাবার নিয়ে আসছি। এবার কিন্তু কোনো অজুহাত মানবো না।
কথাটা বলে তিনি ঘর থেকে বেরিয়ে গেলেন। কিছুক্ষণ পর খাবার নিয়ে আবার ফিরে এলেন।
আদির পাশে বসে খাওয়াতে শুরু করতেই হঠাৎ হুড়মুড় করে ঘরে ঢুকে পড়ল রাহা, শান আর নীল।
তিনজনকে একসঙ্গে আসতে দেখে নীলিমা প্রশ্নবোধক দৃষ্টিতে তাকালেন। রাহা সঙ্গে সঙ্গে চোখ নামিয়ে ফেলল। সে আসতে চায়নি শান আর নীল টেনে এনেছে। তারপর একটু ইতস্তত করে নিচু গলায় বলল,
— আমিও তোমার হাতে খাব।
নীলিমার মুখে সঙ্গে সঙ্গে হাসি ফুটে উঠল। তিনি কিছু বললেন না। তারপর একে একে সবাইকে নিজের হাতে খাইয়ে দিতে লাগলেন। রাহা চুপচাপ খাচ্ছিল আর পুরো ব্যাপারটা দেখছিল। ছোটবেলা থেকেই মায়ের আদরের ব্যাপারে রাহা ভীষণ স্পর্শকাতর। মাকে ভাগ করে নেওয়ার ব্যাপারটা সে সহজে মেনে নিতে পারে না। তার মা শুধু তার মা। তবুও আজ সে কিছু বলল না। শুধু চুপচাপ বসে রইল। মাঝেমধ্যে মায়ের মুখের দিকে তাকাচ্ছে, আবার খাবারের দিকে চোখ নামিয়ে নিচ্ছে। নীলিমা অবশ্য মেয়ের মনের ভেতরটা বুঝতে পারলেন। তবুও তিনি নিজের মতো করেই সবাইকে খাইয়ে যাচ্ছেন। রাত প্রায় দশটার দিকে সাজিদ খান এলেন। আদিকে দেখতে এসেছেন। সঙ্গে করে বাচ্চাদের সবার জন্য অনেকগুলো চকলেটও নিয়ে এসেছেন। বাড়িতে ঢুকেই সবার সঙ্গে কিছুক্ষণ কথা বললেন। বাচ্চাদের চকলেট দিলেন। তারপর নীলকে সঙ্গে নিয়ে বের হওয়ার জন্য ডাকলেন। নীল যেতে চাইছিল না। কিন্তু সাজিদ খান তাকে জোর করেই সঙ্গে নিয়ে গেলেন। কারণ রুবিনা বাসায় একা। আর শিরিনও খুব একটা কারও সঙ্গে কথা বলে না। লাময়াক জেলে যাওয়ার পর থেকেই শিরিন যেন নিজেকে সবার কাছ থেকে গুটিয়ে নিয়েছে। আগের মতো কারও সঙ্গে মেশে না। কারও সঙ্গে দীর্ঘক্ষণ কথা বলে না। বেশিরভাগ সময় একাই থাকে। ঘরের এক কোণে চুপচাপ বসে থাকে, নিজের মতো করে সময় কাটায়। লাময়াককে সে এক কথায় পাগলের মতো ভালোবাসত। সেই ভালোবাসার জায়গা থেকেই হয়তো আজকের এই একাকীত্ব।
লাময়াক এর ফাঁসি হওয়ার পর শিরিনের জীবনের একটা বড় অংশ যেন হঠাৎ করেই থেমে গেছে।
আদি আজ প্রায় তিন মাস হলো খান বাড়িতে নেই। এই তিন মাসে খান বাড়িটা যেন কেমন নিস্তব্ধ হয়ে গেছে। আগে যে বাড়িটা সব সময় বাচ্চাদের হাসি-আনন্দ আর ছোটাছুটিতে মুখর থাকত, সেখানে এখন অদৃশ্য একটা শূন্যতা জমে আছে। নীল মায়ের সঙ্গেও ঠিকমতো কথা বলে না। তার ছোট্ট মনে একটাই ধারণা—মায়ের কারণেই তার ভাই আজ বাড়িতে নেই। ভাইকে ছাড়া তার একটুও ভালো লাগে না। কিয়ারার বয়স তো মাত্র দুই বছর। ওর সঙ্গে আর কতটুকুই বা খেলা যায়? কিয়ারা সারাদিন নিজের মতো ছোটাছুটি করে।
এদিকে রুবিনার দিন কাটে একরাশ হাহাকারে।
নিজের চারপাশটা কেমন ফাঁকা ফাঁকা লাগে তার।
স্কুল থেকে ফিরেই যে ছেলেটা সবার আগে মাকে খুঁজত, দরজায় ঢুকেই মায়ের কাছে ছুটে আসত, সেই ছেলেটাই আজ নেই। আগে আদি স্কুল থেকে ফিরলে রুবিনার ঘরটা মুহূর্তেই প্রাণ ফিরে পেত। ছেলের কণ্ঠ, তার টুকটাক কথা, মায়ের কাছে সারাদিনের গল্প—সব মিলিয়ে ব্যস্ত হয়ে থাকত রুবিনার দিন। এখন স্কুল থেকে ফিরে সেই অপেক্ষাটুকুও নেই। ছোটজন অবশ্য কোনোদিনই মায়ের বুকে লেগে থাকত না। নিজের মতো দৌড়ঝাঁপ করেই তার দিন কাটত। এখনও তাই কাটে। সে হয়তো এত কিছু বোঝে না, ভাইয়ের অনুপস্থিতির গভীরতাও তার কাছে স্পষ্ট নয়।
কিন্তু রুবিনা বোঝে। প্রতিটা মুহূর্তে বোঝে। সাজিদ খানও ছেলের কষ্টটা বুঝতে পারেন। সেই কষ্ট তাকেও ভেতর থেকে পোড়ায়। রুবিনার উপর চাপা রাগে ইদানীং তিনি প্রায় প্রতিদিন রাত দশটা পর্যন্ত অফিসে থাকেন। কাজের মধ্যে নিজেকে ব্যস্ত রাখার চেষ্টা করেন। কারণ বাড়িতে ফিরলেই ছেলের অনুপস্থিতিটা আরও বেশি করে চোখে পড়ে।
সেদিন আরমান চৌধুরী আর সাজিদ খান কাজের সূত্রে কুমিল্লায় গিয়েছিলেন। বাড়িতে পুরুষ বলতে তখন শুধু অভয় ছিল। ইয়াসমিনও ছোট তৃধাকে নিয়েই ব্যস্ত। রাত তখন প্রায় সাড়ে বারোটা। হঠাৎ নীলিমার ফোনটা বেজে উঠল। স্ক্রিনে রুবিনার নাম দেখে নীলিমা অবাক হলো। এত রাতে রুবিনা ফোন করেছে কেন? কী হয়েছে? নীলিমা দ্রুত ফোনটা ধরতে যাওয়ার আগেই কলটা কেটে গেল।
কয়েক মুহূর্ত নীলিমা স্থির হয়ে ফোনের দিকে তাকিয়ে রইল। মনের ভেতর অজানা একটা অস্বস্তি জন্ম নিল। তারপর ফোন কেটে যাওয়ার কিছুক্ষণের মধ্যেই আবার রুবিনার নম্বর থেকেই একটা মেসেজ এলো। নীলিমা মেসেজটা খুলতেই চোখ আটকে গেল,
— নীলিমা আপা, আমরা বিপদে পড়েছি। প্লিজ, তাড়াতাড়ি আসুন। আমাদের বাঁচান।
একটা ছোট মেসেজ। কিন্তু সেই কয়েকটা শব্দই যেন মুহূর্তের মধ্যে নীলিমার শরীরের সমস্ত রক্ত হিম করে দিল। কোন বিপদ? কী হয়েছে? নীলিমা সঙ্গে সঙ্গে রুবিনার নম্বরে কয়েকবার ফোন করলেন।
কোনো উত্তর নেই, ফোন বন্ধ। আরও অস্থির হয়ে তিনি শিরিনের নম্বরেও ফোন করলেন। সেখানেও কোনো সাড়া নেই। বাড়ির ল্যান্ডলাইনেও কল করলেন। কেউ ফোন ধরল না। নীলিমা ফোনটা নামিয়ে মুখে হাত বুলিয়ে নিলেন।
মাথার ভেতর একের পর এক আশঙ্কা ঘুরপাক খাচ্ছে। এত রাতে এমন একটা মেসেজ পাঠিয়ে ফোন বন্ধ করে রাখার মানে কী? কিছু একটা হয়েছে। নিশ্চয়ই কিছু একটা হয়েছে। নীল কিয়ারার কিছু হয়েছে কি? কিসের বিপদের কথা বলল?
সাজিদ বাড়িতে নেই। এই মুহূর্তে যদি সত্যিই কোনো বিপদ হয়ে থাকে, তাহলে, আর ভাবতে পারলেন না। দ্রুত কাপড় বদলে নিলেন নীলিমা।
আরমান না থাকায় রাহা, শান তার সঙ্গেই ঘুমিয়েছিল। অন্য ঘরে আদি ঘুমাচ্ছিল। ছেলেটার বয়স এখন দশ ছুঁইছুঁই। নীলিমা বিছানা থেকে ওঠার সময়ই রাহা নড়েচড়ে উঠে বসল।
ঘুমজড়ানো চোখে মাকে দেখে সঙ্গে সঙ্গে জিজ্ঞেস করল,
— মা, কোথায় যাচ্ছো?
নীলিমা মেয়ের দিকে তাকালেন। এই মেয়েটার ঘুমটা একটু শব্দ হলেই ভেঙে যায়। তিনি স্বাভাবিক থাকার চেষ্টা করে বললেন,
— কিছু না। একটু ওই বাড়ি যাব।
রাহা সঙ্গে সঙ্গে বলল,
— এতো রাতে? আমিও যাব।
তারপর নিজেও যেতে চায়।
— না রাহা। এত রাতে তোমাকে নিয়ে যেতে পারব না।
— না না, আমি যাবই।
নীলিমা কয়েকবার না করলেন। কিন্তু রাহা নিজের জেদে অনড়।
— আমি যাবই মা।
মেয়ের কণ্ঠ একটু জোরে হয়ে যেতেই পাশে ঘুমিয়ে থাকা শানেরও ঘুম ভেঙে গেল। নীলিমা বিরক্ত চোখে রাহার দিকে তাকালেন। এমন একটা সময়ে এসেও মেয়েটা জেদ ধরেছে! কিন্তু রাহা থামল না।
তার সঙ্গে শানও যেতে চাইবে—এটা নীলিমার বুঝতে বাকি রইল না। শানও উঠে বসে বোনের সঙ্গে যাওয়ার জন্য কান্না জুড়ে দিল। নীলিমা হতাশ হয়ে চোখ বন্ধ করে এক মুহূর্ত দাঁড়িয়ে রইলেন। এই মুহূর্তে এদের বোঝানোর মতো সময় তার হাতে নেই। মাথায় শুধু একটা কথাই ঘুরছে—
রুবিনা কেন এমন একটা মেসেজ পাঠিয়ে ফোন বন্ধ করে রাখল? কী হয়েছে? চিন্তায় বুকটা ধড়ফড় করছে।
বের হওয়ার আগে নীলিমা ইয়াসমিনের ঘরের সামনে গিয়ে দরজায় টোকা দিলেন। তৃতীয়বার টোকা দিতেই দরজা খুলে গেল। সামনে ইয়াসমিন চোখ-মুখ ফুলে আছে। নীলিমা কপাল কুঁচকে তাকাল।
— কী হয়েছে?
ইয়াসমিন সঙ্গে সঙ্গে চোখ সরিয়ে নিয়ে বলল—
— কিছু না আপা।
নীলিমা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। হয়তো আবারও অভয়ের সঙ্গে রাগারাগি হয়েছে। এই মুহূর্তে আর সেটা নিয়ে ঘাঁটাঘাঁটি করার সময় নেই। রুবিনা একা আছে। যদি কোন কিছু হয়ে থাকে একা সামলাবে কীভাবে? গাকি হয়েছে বুঝতে পারছে না। আর শিরিন—তাকে ধরতে গেলে সে নিজের জগতেই থাকে। তার কাছ থেকে কোনো সাহায্য পাওয়ার আশাও নেই।
নীলিমা অস্থির গলায় বললেন,
— অভয় কোথায়? ওকে ডাকো।
ইয়াসমিন কিছুক্ষণ চুপ থেকে এলোমেলো দৃষ্টিতে বলল,
— উনি তো একটু আগেই এসেছেন। এখন ডাকলে যদি না...
কথাটা শেষ করতে হলো না নীলিমা বুঝে গেল
আবারও মদ খেয়ে ফিরেছে অভয়। ভাই বাড়িতে নেই দেখেই কি আবার নিজের কষ্ট ভুলতে সেই পথটাই বেছে নিয়েছে? নীলিমা আর কিছু বলল না। শুধু ঘুরে বেরিয়ে আসতে গেলেন। ঠিক তখনই তার চোখ পড়ল সামনে দাঁড়িয়ে থাকা তিনজনের ওপর। আদি, রাহা আর শান তিনজনই চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছে। নীলিমা অবিশ্বাসের দৃষ্টিতে ওদের দিকে তাকালো রাহা সঙ্গে সঙ্গে আঙুল তুলে শানের দিকে দেখিয়ে বলল,
— শান ডেকেছে।
নীলিমা শানের দিকে তাকাতেই ছেলেটা মাথা নিচু করে বলল—
— আদি ভাই আন্টির জন্য কাঁদে... তাই ডেকেছি। একবার দেখে আসুক...!
নীলিমা হতাশ হয়ে তিনজনের দিকে তাকালেন।
এই রাত সাড়ে বারোটায় তিনটা বাচ্চাকে একসঙ্গে নিয়ে বের হতে হবে! কিন্তু এখন আর কিছু করারও নেই। তিনজনই পিছু ছাড়বে না, তাহলে একা যাওয়ার উপায়ও নেই। অগত্যা ইয়াসমিনকে সবকিছু বুঝিয়ে দিয়ে ড্রাইভারকে সঙ্গে নিয়ে গাড়ি বের করার ব্যবস্থা করলেন। গাড়িতে ওঠার পর থেকেই নীলিমা অনবরত রুবিনাকে ফোন করতে লাগলেন। একবার মোবাইলে। আবার বাড়ির ল্যান্ডলাইনেও। কিন্তু কোনো ফোনই কেউ রিসিভ করল না। নীলিমা ফোনটা শক্ত করে হাতে ধরে বসে রইলেন। মনের ভেতর অজানা আশঙ্কাটা ততক্ষণে আরও গভীর হয়ে গেছে। কি হয়েছে? আর রুবিনা এমন একটা মেসেজ পাঠিয়ে হঠাৎ নিখোঁজই বা কেন? নীলিমার বুকের ভেতর শুধু একটা কথাই বারবার প্রতিধ্বনিত হতে লাগল— কিছু একটা নিশ্চয়ই ঘটেছে। তাই দ্রুত আজমল আলি (মাহিনের বাবা ) কে ফোন করে সবটা খুলে বলল। লোকটা আশ্বস্ত করলো নীলিমা কে যে উনি দেখছেন, বড় কিছু না হলে তো একটা মেসেজ এর ভিত্তিতে পুলিশ কে জড়ানো করা যাবে না।
গাড়িটা চলতে শুরু করার কয়েক মুহূর্তের মধ্যেই হঠাৎ ঝাঁকুনি দিয়ে থেমে গেল। নীলিমা বিরক্ত চোখে সামনের দিকে তাকিয়ে কিছু জিজ্ঞেস করার আগেই ড্রাইভারের কণ্ঠ ভেসে এলো,
— আফা, সামনে তো রাস্তা ভাঙা।
নীলিমা কপাল কুঁচকে সামনের অন্ধকার রাস্তার দিকে তাকাল। বিকেলেই তো এই রাস্তা দিয়ে হসপিটাল থেকে ফিরেছে তখন তো ভালোই ছিল।
— কী বলছো রমিজ? বিকেলে হসপিটাল থেকে ফেরার সময় তো রাস্তা ভালোই ছিল।
রমিজ সামনের দিকে তাকিয়ে থেকেই বলল,
— হইতে পারে সন্ধ্যার পর কাজ ধরছে রাস্তার।
কথাটা শুনে নীলিমার ভেতরটা কেমন যেন বিরক্তিতে ভরে উঠল। আজ সারাদিনই যেন একটার পর একটা অস্বস্তিকর পরিস্থিতি তৈরি হচ্ছে। কিছুতেই যেন স্বস্তি মিলছে না।
নীলিমা বিরক্ত গলায় বলল,
— উফ্! অন্য রাস্তা দিয়ে যাও রমিজ। এভাবে এখানে বসে থাকলে তো হবে না।
রমিজ আর কথা না বাড়িয়ে গাড়ি ঘুরিয়ে অন্য রাস্তা ধরল। কিন্তু অজানা কোনো এক কারণে নীলিমার বুকের ভেতরটা কেমন যেন কু ডাকতে লাগল। নিজের অজান্তেই বুকের ভেতর অস্বস্তির একটা চাপ অনুভব করছিল। এসব কুসংস্কার কিংবা অশুভ ইঙ্গিতে নীলিমা বিশ্বাস করে না। তবুও আজ কেন যেন নিজের মনকে কিছুতেই শান্ত করতে পারছে না। মনে হচ্ছে, কোথাও একটা সমস্যা আছে। কিন্তু কী? তার উত্তর নীলিমার জানা নেই।
গাড়ি আবার চলতে শুরু করল। পেছনের সিটে শান নিস্তেজভাবে চোখ বন্ধ করে ঝিমাচ্ছে। অসুস্থতার কারণে ছেলেটার চোখেমুখে অবসাদ স্পষ্ট। রাহা এক মুহূর্তের জন্যও ভাইয়ের হাত ছাড়েনি। শানের হাতটা নিজের দুই হাতের মাঝে ধরে বসে আছে। আদি চুপচাপ জানালার বাইরে তাকিয়ে ছিল। মায়ের ভাইয়ের ছোট বোনের কথা খুব মনে পড়ছে তার। কি হয়েছে ওখানে যে এতো রাতে তারা যাচ্ছে। চারপাশ ক্রমেই অন্ধকার হয়ে আসছিল। হঠাৎ আবারও গাড়িটা থেমে গেল।
এবার নীলিমার বুকের ভেতরটা ধক করে উঠল।
সে তৎক্ষণাৎ সামনের দিকে ঝুঁকে উৎকণ্ঠিত গলায় বলল,
— আবার কী হলো?
রমিজ সামনের দিকে তাকিয়ে কিছুক্ষণ বোঝার চেষ্টা করে বলল,
— আপা, সামনে কিছু একটা আছে মনে হইতেছে। গাড়ি আগাইতেছে না। আমি দেইখা আসি।
কথাটা বলেই রমিজ গাড়ির দরজা খুলে নেমে গেল। নীলিমা চুপ করে সামনের অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে রইল। রমিজ ধীরে ধীরে রাস্তার অন্ধকারের ভেতর মিলিয়ে গেল। এক মিনিট, দুই মিনিট, পাঁচ মিনিট। সময় যেন অস্বাভাবিক ধীর হয়ে গেল। নীলিমা বারবার হাতের ঘড়ির দিকে তাকাচ্ছিল। তারপর আবার সামনের অন্ধকারে চোখ আটকে যাচ্ছিল। রমিজের কোনো সাড়াশব্দ নেই। দশ মিনিট পেরিয়ে গেল। তবুও রমিজ ফিরল না। এবার নীলিমা অজান্তেই নিজের ওড়নার কোনা শক্ত করে খামচে ধরল। আঙুলগুলো শক্ত হয়ে উঠেছে, অথচ সে নিজেই বুঝতে পারছে না কেন এতটা ভয় লাগছে। কেন যেন মনে হচ্ছে, কিছু একটা ঠিক নেই। একদমই ঠিক নেই
নীলিমা বাচ্চাদের দিকে তাকাল। রাহা আর আদি দুজনেই উৎকণ্ঠিত চোখে তার দিকে তাকিয়ে আছে। শান এখনো ঝিমিয়ে আছে।
নীলিমা নিজের অস্বস্তি আড়াল করার চেষ্টা করে বলল,
— আমি একটু দেখে আসি।
— আম্মি, যেও না।
আদির গলাতেও সঙ্গে সঙ্গে ভয়ের সুর ফুটে উঠল,
— মা, যেও না।
নীলিমা থেমে গেল। দুজনের মুখের দিকে তাকিয়ে তার বুকটা আরও ভারী হয়ে উঠল। গাড়ির ভেতরটায় হঠাৎ যেন অদ্ভুত এক নিস্তব্ধতা নেমে এসেছে। কোথাও একটা অদৃশ্য টান তাকে বারবার গাড়ির দরজার দিকে টেনে নিচ্ছে। মনে হচ্ছে, গাড়ির ভেতরে বসে থাকলে চলবে না। কিন্তু ঠিক সেই মুহূর্তেই— অন্ধকার রাস্তার ওপাশ থেকে হঠাৎ বিকট একটা শব্দ ভেসে এলো। নীলিমা স্থির হয়ে গেল। রাহা আর আদি ভয়ে মায়ের আরও কাছে সরে এলো। নীলিমা নিঃশ্বাস বন্ধ করে পড়ে রইলো।
চলবে...