#প্রনয়ের_প্রলয়
#মেহরিমা_সারা
পর্ব ৫২
সামিনের আসার পথেই ব্যথাটা আরও বেড়ে গিয়েছিল। সেই সঙ্গে আদির মাথাতেও হালকা যন্ত্রণা শুরু হয়েছে। তাই সবাই আর দেরি না করে আগে হাসপাতালে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিল। ঢাকায় পৌঁছেই সবার প্রথম গন্তব্য হলো হাসপাতাল। তবে কেউই ভাবতে পারেনি, এখানে তাদের জন্য আরও বড় কী অপেক্ষা করছে। এক জায়গার ঝামেলা মিটিয়ে আরেক জায়গায় এসে যে এত বড় ঝামেলায় জড়িয়ে পড়বে, সেটা কেউ ঘুর্নাক্ষরেও টের পায়নি।
হাসপাতালে পৌঁছানোর পর সামিনকে প্রথমেই ইমার্জেন্সিতে ভর্তি করা হলো। এরপর আদিকে নিয়ে সবাই উপরের তলায় উঠতে লাগল। নিশাকে নিচেই রেখে এসেছে তারা।
রাহার পায়ের ক্ষতটা নিয়েও নীলের চিন্তার শেষ নেই। ক্ষতটা ঠিক কী অবস্থায় আছে, সেটা দেখানো দরকার— নীল একপ্রকার জোর করেই রাহাকে সঙ্গে নিয়ে উপরে উঠল। রাহা যেতে চাইছিল না, কিন্তু নীলের জেদের কাছে শেষ পর্যন্ত বাধ্য হলো। আদি, ইরা, নীল আর রাহা উপরের তলায় উঠেই হঠাৎ থমকে দাঁড়াল।
ডান পাশের দীর্ঘ করিডোরজুড়ে চৌধুরী বাড়ির প্রায় সবাই উপস্থিত। তাদের সঙ্গে আছে সাজিদ খান, রুবিনা খান আর কিয়ারাও। রাহা কিছুই বুঝতে পারল না। হঠাৎ এতগুলো পরিচিত মানুষকে এখানে দেখে তার ভ্রু কুঁচকে গেল। অথচ কোনো কারণ ছাড়াই বুকের ভেতরটা কেমন যেন কেঁপে উঠল। একটা অজানা আশঙ্কা ধীরে ধীরে বুকের মধ্যে শেকড় গাড়তে শুরু করল। রাহা প্রায় নীলের হাত থেকে নিজেকে ছাড়িয়ে এক পা এগিয়ে গেল। নীলও বুঝতে পারল না হঠাৎ কী হলো। রাহার মুখের দিকে তাকিয়ে সেও দ্রুত তার পিছু নিল। বাকিরাও আর দেরি না করে সবাই রাহার পেছনে এগিয়ে গেল।
আরমান চৌধুরী করিডোরের একপাশের চেয়ারে বসে ছিলেন। তাঁর পাশেই নওরিন বসে কাঁদছিলেন, আর আরমান চৌধুরীর মাথায় হাত বুলিয়ে তাকে শান্ত করার চেষ্টা করছিলেন। দৃশ্যটা দেখেই রাহার বুকের ভেতরটা হঠাৎ মোচড় দিয়ে উঠল। ইয়াসমিন চৌধুরীর চোখেও পানি। আশপাশের সবার মুখে এমন এক শোকের ছাপ, যা দেখেই রাহার শরীর যেন ধীরে ধীরে অসাড় হয়ে যেতে লাগল। অজানা এক ভয়ে বুক দুরুদুরু করতে লাগল। রাহা জীবনে অনেক কিছুই ভয় পায়নি। কিন্তু একটা জিনিসকে সে ভীষণ ভয় পায়—হারিয়ে ফেলাকে। কাউকে হারানোর ভয় তাকে ভেতর থেকে দুমড়ে-মুচড়ে দেয়। এই তো কিছুক্ষণ আগেই একজনকে হারানোর আশঙ্কা তাকে গ্রাস করেছিল। কত কষ্টে সেই ভয় থেকে নিজেকে সামলে উঠেছিল সে। তাহলে আবার কেন? এবার কার পালা? কাকে হারানোর ভয় তাকে আবার গ্রাস করতে এসেছে?
নওরিন চৌধুরী সবার আগে রাহার দিকে তাকালেন। রাহাকে দেখেই তিনি ধীরে ধীরে দাঁড়িয়ে পড়লেন। আরমান চৌধুরী নওরিন চৌধুরীর চোখ অনুসরণ করে রাহার দিকে তাকাতেই তাঁর চোয়াল শক্ত হয়ে উঠল। চোখ দুটো অস্বাভাবিক রকম লাল। মনে হচ্ছে, অনেক কষ্টে কান্না আটকে রেখেছেন। রাহার পা থেমে গেল।
সে একবার পাশের বন্ধ দরজাটার দিকে তাকাল। তারপর ধীরে ধীরে বাবার দিকে তাকিয়ে প্রশ্নবোধক দৃষ্টিতে চেয়ে রইল। কিয়ারাও মাথা নিচু করে কাঁদছিল। কারও পায়ের শব্দে সে মাথা তুলে তাকাতেই রাহাকে দেখতে পেল। সঙ্গে সঙ্গে একটু দূরে স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা নীলের দিকে এগিয়ে গেল। পরমুহূর্তেই নীলের বুকে ঝাঁপিয়ে পড়ল কিয়ারা। রাহার নিঃশ্বাস যেন আটকে গেল। সে কিছুই বুঝতে পারছে না। কী হয়েছে? কাকে নিয়ে সবাই এভাবে কাঁদছে?
কিয়ারা নীলকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে নিচু স্বরে বলে উঠল—
— ভাইয়া... শান... আ...
এরপর আর কথাটা শেষ করতে পারল না। কিন্তু এতটুকুই যথেষ্ট ছিল। নীল কিয়ারার অবস্থা আর তার অস্পষ্ট কথাটা শুনেই বুঝে গেল—শানের কিছু একটা হয়েছে। আর ঠিক তখনই— হঠাৎ বিকট শব্দে পুরো করিডোর কেঁপে উঠল।
— ঠাস!
হাসপাতালের নিস্তব্ধ করিডোরজুড়ে তীব্র এক থাপ্পড়ের শব্দ প্রতিধ্বনিত হলো। মুহূর্তের জন্য যেন সময় থমকে গেল। আকস্মিক আঘাতে রাহার শরীর কেঁপে উঠল। মুখের বাম পাশটা আঘাতের ধাক্কায় একদিকে হেলে গেল। চুলের কয়েক গোছা এসে পড়ল মুখের ওপর। চোখ দুটো বিস্ফারিত—সেখানে ফুটে উঠেছে বিস্ময়, কষ্ট আর গভীর অবিশ্বাস। উপস্থিত সবাই স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল।
কারও মুখে কোনো শব্দ নেই। সবার দৃষ্টি গিয়ে থামল রাগে লাল হয়ে ওঠা আরমান চৌধুরীর মুখে। তাঁর বুক দ্রুত ওঠানামা করছে। চোখ দুটো ক্রোধে জ্বলছে। অথচ সেই তীব্র ক্রোধের আড়ালেও স্পষ্ট হয়ে আছে গভীর অভিমান, অসহায়ত্ব আর ভেঙে পড়া এক বাবার যন্ত্রণা। রাহা ধীরে ধীরে মুখ তুলে বাবার দিকে তাকাল।
চোখভর্তি অবিশ্বাস। ঠোঁট দুটো সামান্য কাঁপছে।
যেন সে এখনও বিশ্বাস করতে পারছে না—যে মানুষটা সারাজীবন তাকে আগলে রেখেছে, ফুলের টোকাটুকুও যার কাছ থেকে কখনো পায়নি, সেই মানুষটার হাত আজ তার গালে এসে পড়েছে। গালের পাশটা টনটন করছে। কাঁপা কণ্ঠে, প্রায় অস্ফুট স্বরে রাহার ঠোঁট থেকে শুধু একটা শব্দ বেরিয়ে এলো,
— বাবা...!
আরমান চৌধুরীর চোখ আরও কঠিন হয়ে উঠল।
— বাবা বলবে না তুমি আমায়! তোমার মায়ের সঙ্গে ওইদিন তোমার বাবা মরে গেছে, রাহা।
কথাটা যেন ছুরি হয়ে এসে রাহার বুকের ঠিক মাঝখানে বিঁধল। রাহার দুনিয়া বুঝি সত্যিই থমকে গেল। সে অবিশ্বাস্য চোখে ফ্যালফ্যাল করে বাবার দিকে তাকিয়ে রইল। এ কোন বাবা তার? যে বাবা জীবনে ফুলের টোকা অব্দি লাগতে দেয়নি, সেই বাবা আজ তাকে আঘাত করেছে। শুধু আঘাতই করেনি—এক মুহূর্তে অস্বীকার করে দিল তার বাবার পরিচয়টুকুও। রাহা যেন নিজের অস্তিত্বটাই চিনতে পারছে না। ফর্সা গাল মুহূর্তেই লাল টকটকে বর্ণ ধারণ করেছে। কিন্তু রাহা ব্যথার দিকে খেয়ালই করল না। তার চোখ শুধু বাবার মুখে আটকে আছে।আরমান চৌধুরী দাঁতে দাঁত চেপে বললেন,
— কেন করলে এসব? কেন যেচে বিপদ ডেকে আনলে? তোমার মা তোমাদের মা হওয়ার আগে আমার স্ত্রী ছিল! ওই মানুষটার চলে যাওয়ায় তুমি আমার থেকে বেশি কষ্ট পেয়েছো?
কথাগুলো বলতে বলতে তাঁর গলার স্বর কেঁপে উঠল, রাহা নির্বাক। একটা কথাও বের হলো না তার মুখ থেকে।
আদি তখন নীলের হাত শক্ত করে ধরে রেখেছে।
রাহার গালে চড় পড়ার সঙ্গে সঙ্গেই নীল এক পা সামনে বাড়তে চেয়েছিল। কিন্তু আদি তাকে আটকে দিয়েছে। বাবা-মেয়ের মাঝখানে যাওয়া উচিত হবে না—এই বোধটাই কোনোভাবে নীলকে থামিয়ে রেখেছে। নীলের দুই হাত শক্ত মুষ্টিবদ্ধ হয়ে আছে। রাগে তার পুরো শরীর কাঁপছে। চোয়াল শক্ত হয়ে আছে, চোখে জমে উঠেছে তীব্র ক্ষোভ।
তবুও সে নিজেকে সামলানোর চেষ্টা করছে।
নীল জানে, আরমান চৌধুরী কোনো কারণ ছাড়া এভাবে রাগ করেননি। সে এটাও জানে, নিশ্চয়ই এমন কিছু ঘটেছে যার কথা তারা কেউ জানে না।
তবুও— নিজেকে সামলানো তার জন্য অসম্ভব হয়ে উঠছে। পৃথিবীর যে মানুষই হোক, রাহার সঙ্গে কেউ শক্ত গলায় কথা বলবে—এটা নীল কোনোভাবেই পছন্দ করে না। যেখানে নীল নিজেও রাহার সঙ্গে সবসময় নরম হয়ে কথা বলে, সেখানে রাহার ওপর কারও সামান্য আঘাত নীল সহ্য করতে পারে না। আরমান চৌধুরী কিছুক্ষণ থেমে বড় করে নিঃশ্বাস টেনে নিলেন। রাহার শরীর যেন জমে পাথর হয়ে গেছে। আরমান চৌধুরীর প্রতিটি কথা তার কানে নয়, বুকের ভেতর গিয়ে আঘাত করছে। শক্ত ধাঁচের মেয়েটার ভেতরটা যেন আজ প্রথমবারের মতো দুলে উঠেছে।
তবুও বাবার কথার আড়ালে লুকিয়ে থাকা একটা সত্য সে বুঝে ফেলেছে, আরমান চৌধুরী সবকিছু জেনে গেছেন। কিন্তু কীভাবে? কখন? রাহার মাথার ভেতর একসঙ্গে অসংখ্য প্রশ্ন ঘুরপাক খেতে লাগল। আরমান আবারও বলে উঠলেন—
— কেন করলে? কতবার বলেছি তোমাকে আমি—কেঁচো খুঁড়তে গিয়ে সাপ বের করে এনো না, রাহা! তুমি এত সাধনা করে আমাকে মারতে চাইছো? তোমার বাবা তো তোমার মায়ের সঙ্গেই মরে গেছে, বাচ্চা...!
নওরিন চৌধুরী এবার আর নিজেকে সামলাতে না পেরে আরমানকে থামানোর চেষ্টা করলেন। কিন্তু তিনি শুনলেন না।বুকের বাঁ পাশে হাত দিয়ে ধীরে ধীরে ডলে নিয়ে আবারও ভারী কণ্ঠে বলে উঠলেন,
— তোমার মা মানুষের ভালো করতে গিয়ে আমায় মেরেছে, আর তুমি তোমার মায়ের ইনসাফ করতে গিয়ে আমার ছেলেকে মারতে চাইছো!
"আমার ছেলে কে মারতে চাইছো?" বাক্যটার অর্থ রাহার মাথায় ঠিকমতো ঢুকল না।কিন্তু অবচেতন মন যেন তার আগেই উত্তর খুঁজে ফেলল। সে ধীরে ধীরে আশপাশে চোখ বুলিয়ে দেখল, শান নেই।
ইয়াসমিন চৌধুরী এখনও কাঁদছেন। তাঁর পাশে বসে থাকা অভয় চৌধুরী মুখে হাত ঠেকিয়ে নিথর হয়ে বসে আছেন। কেউ যেন রাহার দিকে খেয়ালই করছে না। রাহার দৃষ্টি ধীরে ধীরে গিয়ে থামল সামনে থাকা বন্ধ দরজাটার ওপর। দরজার ওপরে লাল বাতি জ্বলছে। লাল আলোটা যেন তার বুকের ভেতরেও একটা অদৃশ্য আতঙ্ক জ্বেলে দিল।
ঠিক তখনই রুবিনা খান এগিয়ে এসে রাহাকে পাশ থেকে আগলে ধরলেন। রাহার মুখের দিকে তাকিয়েও বোঝার উপায় নেই তার ভেতরে কী চলছে। তার চোখ স্থির হয়ে আছে শুধু সেই বন্ধ দরজার দিকে। শানের কী হয়েছে? কেন সবাই কাঁদছে? কেন বাবা বলছে, সে তার ছেলেকে মেরে ফেলতে চাইছে? একটার পর একটা প্রশ্ন মাথার ভেতর ঘুরছে। কিন্তু কোনো প্রশ্নের উত্তর নেই।
ঠিক তখনই দরজাটা খুলে একজন মহিলা ডাক্তার বাইরে বেরিয়ে এলেন। এত মানুষকে করিডোরে দেখে তিনি কিছুটা বিরক্ত হয়ে বললেন—
— আপনারা এত আওয়াজ করছেন কেন? আর এত মানুষ ভিড় করে রেখেছেন কেন? প্লিজ, জায়গাটা ক্লিয়ার করুন।
রাহা একপলক ডাক্তারের দিকে তাকাল। তারপর কাঁপতে থাকা ঠোঁট দুটো নড়ে উঠল।
— ভাই... আ... আমার শা...ন...!
শব্দগুলো যেন গলা পেরোতেই চাইছে না। মহিলা ডাক্তার কপাল কুঁচকে রাহার কথাটা বোঝার চেষ্টা করলেন। তারপর বুঝতে পারলেন, মেয়েটি সম্ভবত রোগীর পরিবারের কেউ। বিরক্তি কিছুটা সরিয়ে নরম স্বরে বললেন,
— চিন্তার কারণ নেই। অল্পের জন্য বেঁচে গেছে। ছুরিটা হাড়ে লাগেনি।
কথাটা শুনেই চারপাশের বাতাস যেন এক মুহূর্তের জন্য থেমে গেল। নীল ছোট বোন কিয়ারাকে আগলে ধরে কিছুক্ষণ আগেও চঞ্চল থাকা রাহার দিকে তাকিয়ে রইল। মাত্র কয়েক মিনিট। এই কয়েক মিনিটের মধ্যেই মেয়েটার চেহারা যেন সম্পূর্ণ বদলে গেছে। নীল দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
তারপর একবার দরজাটার দিকে তাকিয়ে মনে মনে বন্ধুর জন্য দোয়া করল। শান শুধু তার বন্ধু নয়। শান নীলের জীবনের একটা অংশের মতো।
ছোটবেলা থেকে বড় হওয়া পর্যন্ত কত স্মৃতি, কত সময়, কতটা পথ—সবকিছুর সঙ্গেই শান জড়িয়ে আছে। ওকে হারানোর কথা নীল ভাবতেও পারে না। আর এদিকে রাহার মাথার ভেতর যেন সবকিছু এলোমেলো হয়ে যাচ্ছে। ওর ভাইয়ের কী হয়েছে? কেন হয়েছে? কে করেছে?
আর বাবা কেন বলছে—সে তার ভাইকে মারতে চেয়েছে? প্রশ্নগুলো একসঙ্গে মাথায় আছড়ে পড়ছে। এর মাঝেই হঠাৎ আরমান চৌধুরীর শরীরটা একদিকে হেলে পড়ল।
— বাবা!
সবাই দ্রুত ছুটে এসে আরমান চৌধুরীকে ধরে ফেলল। কোনোমতে তাঁকে সামলে একটি কেবিনে নিয়ে যাওয়া হলো। ডাক্তার দেখে জানালেন, অতিরিক্ত মানসিক চাপ ও উচ্চ প্রেশারের কারণে তিনি জ্ঞান হারিয়েছেন। সাজিদ খান বন্ধুর কাছেই থেকে গেলেন। এদিকে রুবিনা খান উদ্বিগ্ন চোখে বড় ছেলের দিকে তাকিয়ে বললেন,
— আদি, তোর কী হয়েছে? এমন লাগছে কেন?
আদি মায়ের দিকে একবার তাকাল। তারপর ধীরে ধীরে মাথা নেড়ে বোঝাল—সে ঠিক আছে। চিন্তা করার কিছু নেই।
____________________________
ওদিন রাতে সবাই একে একে চলে যাওয়ার পর সামিন নিজের লোকজনকে চৌধুরী মেনশনে পাঠিয়ে দিয়েছিলো পাহারার জন্য। শত গার্ড একসাথে দাঁড়িয়ে পাহারা দিচ্ছিলো। তবে কিছুক্ষণ পরই সেখানে নতুন করে বিপত্তি বাধল। সবাই যখন একসঙ্গে হল, তখন হঠাৎ কারও খেয়াল হলো— ত্রিধা নেই।
প্রথমে ভেবেছে হয়তো অন্য কোনো ঘরে আছে,। কিন্তু কিছুক্ষণ পরও যখন ত্রিধার কোনো খোঁজ পাওয়া গেল না, তখন সবার মধ্যে অস্বস্তি ছড়িয়ে পড়ল। ইয়াসমিন চৌধুরী, নওরিনসহ সবাই মিলে ত্রিধাকে খুঁজতে শুরু করল। উপরে, নিচে, একেকটা ঘর থেকে আরেকটা ঘর—পুরো বাড়ি খুঁজে ফেলল তারা। কিন্তু কোথাও ত্রিধাকে পাওয়া গেল না।
নরম মনের ইয়াসমিনের মুখের চিন্তা ধীরে ধীরে ভয়ে পরিণত হলো। কেউ কোনো উত্তর দিতে পারল না। শান আর অপেক্ষা না করে বাধ্য হয়ে ত্রিধার কয়েকজন বান্ধবীকে ফোন করল।একজনের সঙ্গে কথা বলতেই জানা গেল,আজ ওদের সবার পিকনিকে যাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু ত্রিধা সেখানে যায়নি। তাই ওরা বাকিরা ত্রিধার জন্য অপেক্ষা না করে চলে গেছে। শানের বুকের ভেতরটা কেমন ধক করে উঠল। তাহলে ত্রিধা কোথায় গেল? সে দ্রুত বাড়ির বাইরের সিসিটিভি ফুটেজ চেক করতে বলল। কিছুক্ষণ পর ফুটেজে দেখা গেল, ত্রিধা প্রায় তিন ঘণ্টা আগেই বাড়ি থেকে বের হয়ে গেছে। কিন্তু তিন ঘণ্টা পেরিয়ে গেলেও মেয়েটা এখনো কোথাও পৌঁছায়নি।
ঘরে উপস্থিত সবার হাত-পা ঠান্ডা হয়ে গেল। কী হয়েছে, কেউ বুঝতে পারছে না। ত্রিধা কোথায় গেছে? কেন গেছে? কার সঙ্গে গেছে? আর সবচেয়ে বড় কথা—এতক্ষণেও সে বাড়ি ফেরেনি কেন? শেষ পর্যন্ত বাধ্য হয়ে ত্রিধার মোবাইল নম্বর ট্র্যাক করা হলো। লোকেশন দেখে শান কয়েক মুহূর্তের জন্য চুপ হয়ে গেল।
আশুলিয়া? ওখানে ত্রিধার কী কাজ? এত দূরে সে একা গেল কেন? ইয়াসমিন চৌধুরী আরও অস্থির হয়ে উঠলেন।
— আমার মেয়েটা আশুলিয়ায় কী করছে?
কেউ উত্তর দিতে পারল না। শান আর এক মুহূর্তও অপেক্ষা করল না। সে দ্রুত বেরিয়ে যাওয়ার জন্য এগিয়ে গেল। কিন্তু বাড়ির গেটের কাছে গিয়েই গার্ডরা তাকে আটকে দিল।
— স্যার, বাইরে যাওয়া যাবে না।
শান রাগী চোখে তাকাল।
— সরো।
— সরি স্যার। আমাদের পরিষ্কার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, বাড়ি থেকে একটা পাখিও যেন বের হতে না পারে। আবার বাইরে থেকেও কেউ যেন ভেতরে ঢুকতে না পারে।
নির্দেশটা সামিন দিয়েছিল। কিন্তু শান তখন কারও নির্দেশ মানার অবস্থায় নেই। তার বোন বিপদে পড়তে পারে। ত্রিধা এমনিতেই সরল-সোজা মেয়ে। পৃথিবীর কোন মানুষ কী উদ্দেশ্য নিয়ে তার কাছে আসছে, সেটা সবসময় বুঝে উঠতে পারে না। আর এই অবস্থায় সে কোথায়, কার সঙ্গে আছে—কিছুই জানা নেই। শান আবারও গার্ডদের বলল—
— শেষবারের মতো বলছি, সরে দাঁড়াও।
কিন্তু গার্ডরা এবারও নড়ল না। তারা জানে, সামিনের নির্দেশ অমান্য করার পরিণতি কতটা ভয়ংকর হতে পারে। সামিন পরিষ্কার করে বলে দিয়েছে—বাড়ির নিরাপত্তায় কোনো ধরনের অসতর্কতা বা ভুল সে মেনে নেবে না। শান বুঝতে পারল, এভাবে তাদের দিয়ে সরে দাঁড় করানো সম্ভব হবে না। তাই বাধ্য হয়ে গার্ডদের চোখ এড়িয়ে অন্য পথ দিয়ে বাড়ি থেকে বের হয়ে গেল সে। কিছুক্ষণ পর শান যে বাড়িতে নেই, সেটা বুঝতে পেরে নওরিন চৌধুরী প্রচণ্ড রেগে গেলেন।
— তোমরা শানকে যেতে দিলে কীভাবে? আমি বলেছিলাম ওকে বাইরে যেতে দেবে না!
গার্ডরা ভয়ে চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল। তারা জানে, শানকে আটকাতে না পারার খবর সামিনের কানে গেলে কী হতে পারে। সামিন তাদের বারবার সতর্ক করে দিয়েছে। তার কাজে সামান্য অসতর্কতা, একটা ভুল—সবকিছুর পরিণতি তাদের জন্য ভয়াবহ হতে পারে। কিন্তু এখন আর কিছু করার নেই। শান বেরিয়ে গেছে। আর সে কোথায় গেছে, সেটা জানার জন্য সবাই উৎকণ্ঠায় অপেক্ষা করতে লাগল। এদিকে ইয়াসমিন চৌধুরীর অবস্থা আরও খারাপ হয়ে গেল। মেয়ের কোনো খোঁজ নেই—এই চিন্তায় তিনি প্রায় ভেঙে পড়েছেন।
বারবার শুধু একই কথা বলছেন—
— আমার মেয়েটা কোথায়? আমার ত্রিধার কী হয়েছে?
কেউ তাকে কোনো উত্তর দিতে পারছে না। চৌধুরী মেনশনের রাতটা হঠাৎ করেই যেন অস্বস্তি আর আতঙ্কে ভারী হয়ে উঠল। গার্ডরা অর্ধেক প্রায় বেরিয়ে পড়ল শান আর তৃধার খোঁজে।
____________________________
শুনশান নীরব রাস্তায় ছোট একটা ব্যাগ বুকের সঙ্গে শক্ত করে চেপে ধরে দাঁড়িয়ে আছে তৃধা। ভয়ার্ত চোখে বারবার আশপাশে তাকাচ্ছে সে।
বান্ধবীরা যেভাবে বলেছিল, তৃধা সেভাবেই তাড়াতাড়ি চলে এসেছে। কিন্তু এখানে এসে দেখল—ওদের কেউই নেই। চারপাশটা কেমন অচেনা।এদিকে তার ফোনেও রিচার্জ নেই। কাউকে কল করে জিজ্ঞেস করারও উপায় নেই। আশপাশে অপরিচিত বড় বড় মানুষজনকে দেখেই তৃধার বুক কেঁপে উঠছে। কী করবে, কিছুই বুঝতে পারছে না।
বাড়ির কাউকে ফোন করবে? কিন্তু ফোনই তো করা যাচ্ছে না। আর যদি কোনোভাবে ফোন করতেও পারে, তাহলে সবাই তো তাকে বকা দেবে। একা কোথাও যেতে নিষেধ করেছিল সবাই। বিশেষ করে শান ভাই আর নিশা আপু কতবার বলেছে, একা কোথাও যেন না যায়। কিন্তু তৃধা কারও কথা শোনেনি। নিজের মতো করে চলে এসেছে। এখন কী করবে? কোনো উত্তরই খুঁজে পেল না মেয়েটা। সময় ধীরে ধীরে বাড়তে লাগল। সেই সঙ্গে রাতও আরও গভীর হয়ে এলো। তৃধার বুকের ভেতরটা কেমন হু হু করে উঠল। কেন যে এখানে এসেছিল! এখন যদি কোনো বিপদ হয়?তাহলে তাকে কে বাঁচাবে? তৃধার চোখে পানি চলে এলো। উফফ!
শান ভাই আর নিশা আপু ঠিকই বলত—তৃধা সত্যিই বোকা। নিজের অজান্তেই তৃধার চোখ বেয়ে পানি গড়িয়ে পড়ল। আর নিজেকে সামলাতে না পেরে সে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল। ঠিক তখনই কয়েকজন মাতাল লোক ওই রাস্তা দিয়ে হেলতে দুলতে যাচ্ছিল। তৃধাকে একা দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে তারা নিজেদের মধ্যে কিছু বলতে বলতে হাসাহাসি শুরু করল। রাত তখন প্রায় সাড়ে বারোটা। আশপাশের কোনো দোকানপাট খোলা নেই। রাস্তার কিছু জায়গায় বালুর স্তূপ, কোথাও ইটের গুঁড়ো ছড়িয়ে আছে। তার ওপর ঝিরিঝিরি বৃষ্টিতে বালুগুলো ভিজে গেছে। চারপাশে এক অস্বস্তিকর নীরবতা। তৃধা লোকগুলোর দৃষ্টি লক্ষ্য করল। ওদের চোখের ভাষা ভালো লাগল না তার।ভয়ে সে সেখান থেকে সরে যেতে চাইল। কিন্তু তার আগেই লোকগুলো চারদিক থেকে তাকে ঘিরে ফেলল। একজন কুৎসিতভাবে হেসে বলল,
— ওরে কচি খোকা, সাইজ কত রে?
তৃধা কথাটার অর্থ বুঝতে পারল না। ফ্যালফ্যাল করে তাদের দিকে তাকিয়ে ভীত গলায় বলল,
— আঙ্কেল, আপনারা আমার পথ আটকেছেন কেন? আমি বাড়ি যাব।
লোকগুলো একে অপরের দিকে তাকিয়ে হাসল।তখনই তারা বুঝতে পারল, মেয়েটা একা। তার সঙ্গে কেউ নেই। এমনকি পরিস্থিতিটা কতটা বিপজ্জনক, সেটাও তৃধা ঠিকমতো বুঝতে পারছে না। একজন আরও কাছে এগিয়ে এসে বিশ্রীভাবে হেসে বলল,
— বাড়ি যেতে দিব তো। আগে আমাদের একটু খুশি করো।
এবার তৃধা বুঝতে পারল, লোকগুলোর উদ্দেশ্য ভালো নয়। তার বুকের ভেতরটা ধক করে উঠল।
কিছু একটা একটা করতে হবে। কিন্তু কী?পরমুহূর্তেই সুযোগ বুঝে তৃধা দৌড়ে দিল। তার পেছন পেছন লোকগুলোও ছুটতে শুরু করল।
তৃধা প্রাণপণে দৌড়াচ্ছে। সে জানে, ওদের হাতে ধরা পড়লে বড় বিপদ হবে। কোনোমতে বাঁ দিকে ঘুরে একটা বালুর স্তূপের আড়ালে গিয়ে লুকিয়ে পড়ল সে। বুক ধড়ফড় করছে। শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে। তবুও মুখ চেপে ধরে নিঃশব্দে থাকার চেষ্টা করল। কিছুক্ষণ পর চারপাশটা আবার নীরব হয়ে গেল। তৃধা ভাবল, হয়তো লোকগুলো চলে গেছে।
কিন্তু পরমুহূর্তেই পেছন থেকে একটা আওয়াজ ভেসে এলো। তৃধা নিঃশ্বাস আটকে ধীরে ধীরে পেছনে তাকাল। লোকগুলো দাঁড়িয়ে আছে। তার দিকে তাকিয়ে বিশ্রীভাবে হাসছে। তৃধার মুখ শুকিয়ে গেল।
এদিকে শান বাড়ি থেকে বের হওয়ার পরপরই একটি গাড়ি তার পিছু নিয়েছিল। শান সেটা জানেও না। সে শুধু তৃধার লোকেশন মাথায় রেখে দ্রুত গাড়ি চালিয়ে যাচ্ছিল। কিছুক্ষণ পর লোকেশনের কাছাকাছি পৌঁছে গাড়ি থামিয়ে দ্রুত নেমে পড়ল শান। চারপাশে তাকিয়ে তৃধাকে খুঁজতে লাগল। একবার এদিকে, একবার ওদিকে।
কিন্তু কোথাও তৃধার দেখা নেই। হঠাৎ রাস্তার ওপর পড়ে থাকা একটা জিনিস তার চোখে পড়ল। তৃধার ফোন। শান ছুটে গিয়ে ফোনটা তুলে নিল। তার বুকের ভেতরটা ধক করে উঠল।
— তৃধা...
চারপাশে তাকিয়ে এক মুহূর্তের জন্য শানের মাথা কাজ করা বন্ধ হয়ে গেল। বোনটা কোথায়? ওর কিছু হয়নি তো? আপুনি ফিরে কি বলবে শানকে! যে বড় ভাই হয়ে ছোট বোনটাকে দেখে রাখতে পারল না? শান আল্লাহকে ডাকতে ডাকতে চারপাশে খুঁজতে লাগল। কণ্ঠে আতঙ্ক নিয়ে বারবার ডাকতে লাগল—
— তৃধাআআআ...!
কোনো উত্তর নেই। শান আরও দিশেহারা হয়ে পড়ল।
— তৃধা! কোথায় তুই?
ঠিক তখনই, দূর থেকে ক্ষীণ একটা চিৎকার ভেসে এলো। শান থমকে দাঁড়াল। কণ্ঠটা তার অচেনা নয়। তৃধা! শান নিঃশ্বাস আটকে শব্দটার দিকে তাকাল। ইটের স্তূপের পাশ থেকে আওয়াজটা আসছে। আর এক মুহূর্তও দেরি না করে সেদিকেই ছুটে গেল সে। কিন্তু তৃধা তখন ভয়ংকর পরিস্থিতির মধ্যে আটকে গেছে।
কয়েকজন লোক তাকে জোর করে আটকে রেখেছে। তৃধা প্রাণপণে নিজেকে ছাড়ানোর চেষ্টা করছে। ভয়ে তার চোখ দুটো বড় হয়ে গেছে। সে বারবার ছটফট করছে। নিজেকে বাঁচানোর জন্য যতটুকু শক্তি আছে, সবটুকু দিয়ে চেষ্টা করছে।
মনে হচ্ছে, আজ বুঝি সত্যিই সে আর বাড়ি ফিরতে পারবে না। হঠাৎ শানের চোখে পড়ল বোনের দিকে। তার চোখের সামনে দৃশ্যটা আসতেই মুহূর্তের মধ্যে শানের মাথা গরম হয়ে গেল।
— তৃধা!
শানের কণ্ঠ শুনে তৃধা প্রাণপণে চিৎকার করে উঠল,
— ভাইয়াআআআ...!
বোনের সেই চিৎকার শানের বুকটা যেন ছিঁড়ে দিল। এক মুহূর্তের মধ্যেই সে ছুটে গিয়ে লোকগুলোর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল। রাগে তার শরীর কাঁপছে। তৃধার কাঁধ থেকে জামা ছেড়ে নেমে এসেছে, ঠোঁটের কোণে রক্ত জমাট বেঁধে আছে, গলায় দাতের দাগ বসে আছে, কিছু জায়গা থেকে রক্ত বের হয়ে গড়িয়ে পড়ছে। বোনকে ওই অবস্থায় দেখে সে আর নিজেকে সামলাতে পারল না। কয়েকজন লোক মিলে শানকে আটকানোর চেষ্টা করলেও শানের প্রচণ্ড রাগের সামনে তারা বেশিক্ষণ টিকতে পারল না। কিন্তু শান জানত না—বিপদ এখনও শেষ হয়নি। যে গাড়িটা তার পিছু নিয়েছিল, সেটাও ততক্ষণে সেখানে পৌঁছে গেছে।
শান যখন সামনে থাকা লোকগুলোর সঙ্গে ব্যস্ত, ঠিক তখনই পেছন থেকে অতর্কিতে আঘাত এলো।
শানের শরীর হঠাৎ থেমে গেল। ব্যথায় তার মুখ শক্ত হয়ে উঠল। পেছন থেকে তাকে ছুরি দিয়ে আঘাত করা হয়েছে। মেরুদন্ডের হাড় বরাবর। একবার নয়—পরপর আঘাত করা হলো। শানের শরীরের শক্তি যেন মুহূর্তেই কমে গেল। সে টলতে টলতে মাটিতে পড়ে গেল।
তৃধা নিজের ভয় ভুলে ভাইয়ের দিকে ছুটে যেতে চাইল।
— ভাইয়া!
কিন্তু তার আগেই একজন তাকে আবার আটকে ফেলল। তৃধা মরিয়া হয়ে নিজেকে ছাড়ানোর চেষ্টা করতে লাগল। তার চোখের সামনে তখন শুধু শান। রক্তাক্ত অবস্থায় মাটিতে পড়ে আছে তার ভাই। তৃধার নিজের শরীরও কাঁপছে, তবুও ভাইয়ের দিকে তাকিয়ে সে বারবার সাহায্যের জন্য চিৎকার করছে।
— ভাইয়া! ভাইয়া, ওঠো!
শান চোখ মেলে তাকানোর চেষ্টা করল। কিন্তু শরীর আর সাড়া দিচ্ছে না। বোনকে নিজের চোখের সামনে বিপদের মধ্যে দেখেও সে কিছু করতে পারছে না—এই অসহায়ত্বটাই যেন তাকে ভেতর থেকে আরও ভেঙে দিচ্ছে। ঠিক তখনই পেছন থেকে প্রচণ্ড এক আঘাত এসে শানের মাথা ঝিমঝিম করে দিল। সে মাটিতে পড়ে গেল। চোখ ধীরে ধীরে ঝাপসা হয়ে আসছে। তবুও শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত তার দৃষ্টি তৃধার দিকেই। চোখে থেকে যেন অশ্রু না রক্ত ঝরছে।
__________________________________
কেবিনজুড়ে গভীর নীরবতা বিরাজ করছে। বেডে আধশোয়া হয়ে বসে আছে তৃধা। তার পাশে বসে নিশা শক্ত করে তৃধার হাত ধরে রেখেছে। কেবিনে ইরা, আদি, নীল, রাহা আর নিশাও রয়েছে। সবাই এরই মধ্যে পোশাক বদলে নিয়েছে। রাহা বুকের ওপর হাত জড়িয়ে দাঁড়িয়ে আছে। আদি, নীল আর ইরা পাশের কাউচে বসে আছে। সবার মুখেই দুশ্চিন্তার ছাপ স্পষ্ট। আদি একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে তৃধার দিকে তাকিয়ে ধীরে ধীরে জিজ্ঞেস করল,
— ওদের দেখতে কেমন ছিল? পোশাক কেমন ছিল? যেটাতে..
তৃধা সঙ্গে সঙ্গে কোনো উত্তর দিল না। তার শ্বাস-প্রশ্বাস এখনও কিছুটা ভারী। ডাক্তার স্পষ্টভাবে বলে দিয়েছেন, তাকে বেশি প্রশ্ন করা যাবে না। তৃধা মানসিকভাবে প্রচণ্ড ধাক্কার মধ্যে আছে। এই মুহূর্তে তাকে কোনো ধরনের চাপ দেওয়া ঠিক হবে না। কিন্তু ঘটনাটা সম্পর্কে তৃধা ছাড়া আর কেউ জানে না। তাই বাধ্য হয়েই কয়েকটা প্রশ্ন করতে হচ্ছে। তৃধা কিছুক্ষণ চুপ থেকে ধীরে ধীরে বলল,
— ওরা... কালো পোশাক পরেছিল।
কণ্ঠটা এখনও কাঁপছে। একটু থেমে আবার বলল,
— পোশাকে... ছোট ছোট নেকড়ের মুখের মতো ছবি ছিল।
রাহা চোখ বন্ধ করে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল নেকড়ের মুখ। শব্দ দুটো যেন তার মাথার ভেতর কোথাও গিয়ে আটকে রইল। ওই সময় লোকগুলো চলে যাওয়ার পরপরই সামিনের গার্ডরা সেখানে পৌঁছে গিয়েছিল। তাদের কারণেই তৃধাকে দ্রুত সেখান থেকে নিরাপদে বের করে আনা সম্ভব হয়।
আল্লাহর রহমতে তৃধার তেমন কোনো শারীরিক ক্ষতি হয়নি। তবে ঘটনাটার ধাক্কায় সে জ্ঞান হারিয়েছিল। অন্যদিকে শানকে গুরুতর অবস্থায় দ্রুত হাসপাতালে নিয়ে আসা হয়।
কিছুক্ষণ আগেই তৃধার জ্ঞান ফিরেছে। জ্ঞান ফেরার পর সবাই প্রথমে স্বাভাবিকভাবে তার সঙ্গে কথা বলেছে, তাকে শান্ত করার চেষ্টা করেছে। কিন্তু এখন ঘটনাটা কীভাবে ঘটেছিল, সেটা জানার জন্য রাহাকে বাধ্য হয়েই একের পর এক প্রশ্ন করতে হচ্ছে। শানের অপারেশন সফল হয়েছে।তবে এখনও তার জ্ঞান ফেরেনি। আরমান চৌধুরীও এখন শারীরিকভাবে ঠিক আছেন। কিন্তু তিনি রাহার সঙ্গে এখনও কোনো কথা বলেননি।
বাবার সেই নীরবতাটা রাহা বুঝতে পেরেছে। তাই ধীরে ধীরে সবার কাছ থেকে নিজেকে সরিয়ে নিয়েছে। এখানে আর কিছু বলার নেই। রাহা নিজের মনে সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছে। যা-ই হোক, সে আর পিছিয়ে যাবে না। লাময়াকের শেষ না দেখে এবার সে থামবে না। অনেক ভেবেচিন্তেই সিদ্ধান্তটা নিয়েছে সে। আর এই পথ থেকে ফিরে আসার কোনো ইচ্ছা তার নেই। কিছুক্ষণ পর একজন নার্স কেবিনে এসে জানিয়ে দিলেন,
— এখন আর রোগীকে কোনো প্রশ্ন করা যাবে না। ওকে বিশ্রাম নিতে দিন।
কয়েক ঘণ্টা আগেও আরমান চৌধুরী আর সাজিদ খান ঢাকার বাইরে ছিলেন কাজের সূত্রে। হঠাৎ আরমান চৌধুরীর ফোনে একটা কল আসে।
প্রথমে নম্বরটা চিনতে পারেননি তিনি। কিন্তু অপর প্রান্তের কণ্ঠ শুনে বহু বছর পর মানুষটাকে চিনতে পারেন। এত বছর পর হঠাৎ ফোন করার কারণটা বুঝতে পারেননি আরমান। কিন্তু পরের কথাগুলো শুনেই তাঁর বুকের ভেতরটা কেঁপে ওঠে।
লাময়াক জানিয়েছিল,
— মেয়েকে পেছনে লাগিয়ে ভালো করোনি।
এমন হুমকিতে আরমান যারপরনাই অবাক হয়ে যায়। লাময়াক আরো জানিয়েছিল এবার সে কাউকেই ছাড়বে না। আগেরবার দয়া করে ছেড়ে দিয়েছিল, কিন্তু এবার আর কাউকে ছাড়বে না।
আরমান কিছুই বুঝতে না পেরে দ্রুত প্রশ্ন করেছিলেন,
— কী বলছো এসব?
ওপাশ থেকে লামিয়ার কণ্ঠ ভেসে এসেছিল—
— তোমার বড় মেয়েকে সাবধান করে দাও। মেয়েটা বেশি ডানা মেলছে। ওর ডানা ছাঁটতে আমার বেশি সময় লাগবে না।
সেই কথার পরই আরমান বুঝতে পেরেছিলেন, রাহা নিষেধ করা সত্ত্বেও পুরোনো বিষয়গুলো ঘাঁটাঘাঁটি করেছে। শুধু ঘাঁটাঘাঁটি করেই থামেনি—লাময়াকের পেছনেও লেগেছে। তাই লাময়াক এতটা ক্ষেপে গেছে। কিন্তু আরমানও বুঝতে পারেননি, বিষয়টা এতটা আক্রমণাত্মক পর্যায়ে চলে যাবে। এরপরই নওরিন চৌধুরীর ফোন।ওপাশ থেকে তাঁর কান্নার শব্দ শুনেই আরমান বুঝে গিয়েছিলেন, নিশ্চয়ই বড় কিছু ঘটেছে।
আর দেরি না করে দ্রুত ঢাকায় ফিরে আসেন তিনি। কিন্তু ঢাকায় এসে সামনের পরিস্থিতি দেখে তিনি যেন পুরোপুরি ভেঙে পড়েন। বিশেষ করে বাড়ির সবচেয়ে চঞ্চল মেয়ে তৃধার এমন অবস্থা দেখে তাঁর ভেতরের ভয়, কষ্ট আর রাগ একসঙ্গে বেরিয়ে এসেছিল। আর সেই রাগের একটা বড় অংশ গিয়ে পড়েছিল রাহার ওপর। কারণ বারবার নিষেধ করার পরও রাহা থামেনি। নিজের মায়ের সত্য জানতে গিয়ে রাহা যে পথটা বেছে নিয়েছে—সেই পথেই এখন একের পর এক বিপদ নেমে আসছে। সেই মুহূর্তে আরমান নিজেকে সামলাতে পারেননি। নিজের সবচেয়ে আদরের মেয়েটাকেই আঘাত করে বসেছিলেন। এখন সেই কথাটাই হয়তো তাঁর ভেতরটাকে আরও বেশি পোড়াচ্ছে।
নার্সের কথা শুনে সবাই একে একে কেবিন থেকে বেরিয়ে এলো। রাহা কারও দিকে না তাকিয়ে নিজের মতো করে হাঁটতে হাঁটতে দোতলার করিডোরের একেবারে শেষ মাথায় চলে গেল।
সেখানে রাখা একটা চেয়ারে গিয়ে চুপচাপ বসে পড়ল সে। হাঁটুর ওপর কনুই রেখে দুই হাত মুঠো করে তার ওপর মাথা ঠেকিয়ে বসে রইল। নীল দূর থেকে রাহার দিকে তাকিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
কী থেকে কী হয়ে গেল! এখানে রাহার কোনো দোষ নেই। আবার আরমান চৌধুরীরও পুরোপুরি কোনো দোষ নেই। রাহা তখনও একইভাবে বসে আছে। দুই হাতের ওপর মাথা রেখে একদৃষ্টিতে মেঝের দিকে তাকিয়ে। চারপাশে মানুষজনের চলাচল আছে, নার্সদের যাতায়াত আছে, দূরে কোথাও কোনো দরজা খোলার শব্দ হচ্ছে—কিন্তু রাহার কাছে যেন কিছুই পৌঁছাচ্ছে না। তার মাথার ভেতর শুধু একটার পর একটা কথা ঘুরছে, শান... তৃধা... বাবা...
সবকিছু যেন একসঙ্গে এসে ওকে ভেতর থেকে চেপে ধরেছে। হঠাৎ নিজের পাশে কারও উপস্থিতি টের পেল রাহা। কে হতে পারে, সেটা বুঝতে তার এক মুহূর্তও লাগল না। ধীরে ধীরে মাথা তুলে সোজা হয়ে বসল সে। নীল তার পাশে এসে বসেছে। কিছুক্ষণ চুপ করে রাহার দিকে তাকিয়ে থেকে নীল ধীরে করে তার মাথাটা নিজের বুকের কাছে টেনে নিল। কোনো প্রশ্ন করল না। কোনো উপদেশও দিল না। শুধু শান্ত গলায় বলল,
— যত অভিযোগ, কষ্ট আর হতাশা আছে—সব এই বুকে ঢেলে দাও। আমি সবটুকু শুষে নিবো।
রাহা আর নিজেকে শক্ত করে রাখতে পারল না।সত্যিই নীলের বুকে মুখ গুঁজে দিল সে। নীল দুই হাতে রাহাকে আগলে রাখল। রাহার শরীর কাঁপছে। কাঁপা কণ্ঠে সে শুধু বারবার বলতে লাগল,
— নীল... আমার ছোট ভাই-বোনগুলো...! আমার শান, নীল...!
নীল চোখ বন্ধ করে গভীর একটা শ্বাস নিল। তারপর ধীরে ধীরে রাহার মাথায় হাত বুলিয়ে চুমু খেয়ে বলল,
— সব ঠিক হয়ে যাবে জান।
রাহা কোনো উত্তর দিল না। তারপর মাথা তুলে নীলের দিকে তাকাল। চোখ দুটো পানিতে ভরে আছে। কণ্ঠটা ভেঙে গিয়ে বের হলো—
— বাবা...!
নীল কিছুক্ষণ চুপ করে রাহার দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর রাহার কপালে গালে চুমু খেয়ে বলল,
— হুঁশ। সব ঠিক হয়ে যাবে। আমরা দুজন মিলে সব ঠিক করার চেষ্টা করব, ঠিক আছে?
রাহা চুপ করে রইল। কোনো উত্তর দিল না।
শুধু নীলের কথাগুলো নীরবে শুনতে থাকল। নীল কপালে গালে নাকে থুতনিতে ঠোটে ছোট ছোট চুমুতে ভরিয়ে দিতে লাগল। রাহার ভেতরের অস্থিরতা কিছুতেই কমছে না। রাহাকে শান্ত করতে গিয়ে অধৈর্য নীল ক্রমশ নিজেই অশান্ত হয়ে উঠলো।রাহার ঠোঁটে থেমে থেমে চুমু খেতে লাগল একপর্যায়ে হঠাৎ আঁকড়ে ধরল। রাহা তো নিজের দুনিয়ায় ছিলো। ছোট ভাই বোনের কথা মায়ের প্রতি ইনসাফ, বাবার মুখ ফিরিয়ে নেওয়া যে ওকে পুড়াচ্ছে। হঠাৎ রাহার মনে হলো নিঃশ্বাস নিতে পারছে না ঠিকমত তখন খেয়াল করলো নিঃশ্বাস নিতে না পারার কারন সামনে বসে থাকা ছেলেটা। রাহা নীল এর বুকে হাত দিয়ে নীল কে সরিয়ে দিল। তখনই পেছন থেকে ইরা বলে উঠলো,
— শান এর জ্ঞান ফিরেছে...!
চলবে...